অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা – সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা (তৃতীয় পর্ব)
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা : সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা তৃতীয় পর্ব- সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিক কালের ১০০ গল্পকারকে নিয়ে চতুর্দশ বর্ষের বিশেষ আয়োজনের পারম্পরিক ধারাবাহিকতার তৃতীয় পর্বে এসে আরও ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে প্রকাশিত হলো সাম্প্রতিকের (জন্ম : ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫) গল্প ও গল্পকার সংখ্যা, তৃতীয় পর্ব। সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার ১ম ও ২য় পর্বের মতো এই পর্ব অর্থাৎ ৩য় পর্বে ২৫ জন গল্পকারের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা প্রকাশের মাধ্যমে নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে এ-পর্যন্ত মোট ৭৫ জন গল্পকারকে নিয়ে তথ্য ও আলোচনাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ প্রকাশের কাজ সম্পন্ন হলো। অবশিষ্ট ২৫ জন গল্পকারদের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা আগামী চতুর্থ পর্বে প্রকাশিত হবে বলে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব নির্মাণের মূল উপাদান হচ্ছে, সময় ও মানুষ। মানুষের চেতনাজাত রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম ও ভৌত প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রভাবিত সমাজ ও সংস্কৃতির বিচার ও বয়ান। গত চার বছর ধরে অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক শিল্প-সাহিত্য ম্যাগাজিনে গত শতাব্দীর প্রথম থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিকদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা প্রবন্ধসমূহ সংকলিত করে যে সহায়ক সাহিত্যসম্পদ প্রস্তুত করা হচ্ছে সে-সকল সহায়ক সম্পদ বা উৎস ব্যবহার করে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গবেষণা হতে পারে। সেই গবেষণার একটি হতে পারে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের সমাজতত্ত্বের বস্তুনিষ্ঠ বয়ান।
আমরা এটা অধ্যয়ন করতে পারি- বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য কীভাবে সমাজ থেকে উদ্ভূত হলো, কী কী বৈশিষ্ট্য ধারণ করল, কীভাবে সাহিত্যে সমাজের প্রতিফলন ঘটাল এবং পাশাপাশি সমাজের ওপর সাহিত্য কী প্রভাব ফেলল? সাহিত্যে, ক্ষমতা, প্রতিযোগিতা ও সামাজিক কাঠামো কীভাবে কাজ করেছিল বা করে যাচ্ছে? এসব অধ্যয়ন থেকে হয়তো আমরা পেতে পারি এই তথ্য যে বাংলা দীর্ঘদিন উপনিবেশ থেকেছে। উপনিবেশ থাকাকালে ভিনদেশি শাসকের রাজনীতি, অর্থনীতির প্রভাবে পড়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির যেমন রূপান্তর ঘটেছে তেমনি বিকৃতিও ঘটেছে। ভিনদেশি উপনিবেশবাদী শক্তির প্রভাবের ফলে বাঙালির মননে এক গভীর আত্মপরিচয় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আর যখনই এই উপনিবেশবাদী মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে ভাষা, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে বাংলার মাটি ও পরিবেশজাত নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ধারায় নিয়ে এসে মুক্তচর্চা করার চেষ্টা বাঙালি করেছে তখনই ঔপনিবেশিক ধারার পৃষ্ঠপোষক ও কট্টরপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীর দিক থেকে আঘাত ও আক্রমণ এসেছে।
এই বিষয় ছাড়াও আমাদের অধ্যয়ন অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হতে পারে। যেমন, সমসাময়িক ছোটগল্পের আলোচনায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- গল্পকারেরা তাদের গল্পে কীভাবে সীমিত স্থান ব্যবহার করে পরিচয়, বিচ্ছিন্নতা, মনস্তাত্ত্বিক বাস্তববাদ এবং সামাজিক বিষয়গুলো (জাতি, শ্রেণি, ভোগবাদ) গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন। তাছাড়াও এই বিষয়েও আলোকপাত করা যেতে পারে যে কীভাবে প্রাণবন্ত চরিত্র, প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রাঞ্জল বর্ণনায় আধুনিক জটিলতাগুলো প্রতিফলিত করার জন্য বিভিন্ন শৈলী (ব্যঙ্গ, ভৌতিক, জাদুকরী বাস্তববাদ) ব্যবহার করা হয়েছে। আলোচনা ও অধ্যয়নে উঠে আসতে পারে যে কোনো কোনো সমালোচক সাম্প্রতিক রচিত গদ্যভাষায় নীরসতা বা অতি-সরলীকরণের প্রবণতার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দ্রুত পড়ে ফেলার উপযোগী করে রচনা করার বাইরে এসে ফর্ম এবং থিমকে আরও গভীরভাবে জড়িত করার প্রত্যাশা করেছেন। কোনো কোনো আলোচক কেবল গল্পের সারাংশে সীমাবদ্ধ না থেকে তার বাইরে গিয়ে গল্পের অর্থ প্রকাশে প্লট, চরিত্র, থিম এবং সাহিত্য কৌশলের (প্রতীকীকরণ, চিত্রকল্প) মতো উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে গল্পের অর্থ প্রকাশে তাদের কার্যকারিতা যথাযথ মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন।
অধ্যয়নে তুলে ধরা যেতে পারে যে সাহিত্য আলোচনাগুলো প্রস্তুত করতে গিয়ে বিশেষ করে চারটি বিষয়ের দিকে গভীর দৃষ্টি প্রদান করার প্রয়োজন হয়েছে। প্রথমেই এসেছে পরিচয় এবং অন্তর্ভুক্তি বোধের মতো বিষয়গুলো। যেমন সাংস্কৃতিক স্থানচ্যুতি, অভিবাসী মনস্তত্ব ও অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বায়িত বিশ্বে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত অথবা জাতীয় আত্ম-অনুসন্ধান। দ্বিতীয়ত, চরিত্র রূপসমূহের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। যেমন, বাস্তব ঘটনাসমূহের সাক্ষাৎ ব্যাখ্যা অথবা স্বগত ও বহুপাক্ষিক সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রগুলোর মনের অভ্যন্তরের জটিল ও অন্ধকার জগৎ উন্মোচন করা। তৃতীয়ত, গল্পের সামাজিক ভাষ্য অর্থাৎ ভোগবাদ, রাজনীতি, জাতি এবং শ্রেণি বিভাজনের সমালোচনা করার জন্য ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ও অ্যাবসার্ডবাদ ব্যবহার করা। এবং চতুর্থত, রূপ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা অর্থাৎ অনন্য কাঠামো, বিভিন্ন অথবা বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গি (উত্তর-ঔপনিবেশিক, নারীবাদী ইত্যাদী) ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, ফ্যান্টাসি এবং জাদুকরী বাস্তবতার মতো ধারাগুলোর সাথে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে ছোটগল্পের আধুনিক বিভাজন বৈশিষ্ট্য আয়ত্তে নিয়ে আসা। কেউ কেউ এটাও মনে করেছেন যে সমসাময়িক গল্পগুলো সংকীর্ণ জনতাত্ত্বিক বা উপরে ভাসা বিষয়গুলোর উপর খুব বেশি কেন্দ্রীভূত হতে দেখা গেছে। তাছাড়া দ্রুত, সহজে হজমযোগ্য গল্পের বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে গভীর, জটিল অভিজ্ঞতা প্রদানের জন্য প্রস্তুত প্রকৃত শৈল্পিক সম্ভাবনাময় গল্পের চাহিদার ক্ষেত্রে ভাটা সৃষ্টি করে থাকতে পারে। সত্যিকার অর্থে উদ্ভাবন না করে নির্দিষ্ট ‘ধরনের’ (যেমন, অকার্যকর পরিবার, সমাজবিচ্ছিন্ন যুবক) উপর খুব বেশি নির্ভরশীল গল্পগুলো একঘেয়েমির উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শিল্প-সাহিত্য মানুষকে ধ্বংস নয় সৃজনশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। গভীর অনুভূতি, বোধ ও সংযোগের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যা ভাষাগত সীমানা ছাড়িয়ে মানুষে মানুষে, সংস্কৃতিতে সংস্কৃতিতে মেলবন্ধন ঘটায়। ব্যক্তি ও সমাজকে সৌন্দর্য, আনন্দ, দুঃখ, প্রেম, বেদনা ও জীবনের গভীরে নিয়ে যায়, যা তাকে আত্ম-অনুসন্ধান ও বিশ্বকে নতুনভাবে উপলব্ধিতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যচর্চা সকল প্রকার সংরক্ষণবাদ মুক্ত হয়ে মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন চেতনাবোধ অব্যহতভাবে ধারণ করে যাবে। সংরক্ষণবাদ মুক্ত মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন এই চেতনাবোধ থেকে বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্যচর্চা বিচ্ছিন্ন করার সকল অপচেষ্টা বাংলাদেশের কবি, গল্পকার, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকেরা মিলিতভাবে রুখে দেবে এটাই বাস্তব।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 4; Contemporary Stories & Storytellers (Part-3)
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা – সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা (দ্বিতীয় পর্ব)
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার দ্বিতীয় পর্ব—সম্পাদকীয়
প্রকাশিত হয়েছে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা—সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার দ্বিতীয় পর্ব। অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিকের ১০০ গল্প ও গল্পকার আয়োজনের এটা দ্বিতীয় পর্বের প্রকাশনা। ইতিপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকারে প্রথম পর্বে আমরা নির্বাচিত ১০০ জন গল্পকারের মধ্যে বয়স অনুক্রমে জ্যেষ্ঠ থেকে কনিষ্ঠ এবং লেখা প্রাপ্যতার ভিত্তিতে ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি তাদের একটি করে উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা প্রকাশ করেছি। একইভাবে এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে নির্বাচিত ১০০ জন সাম্প্রতিকের গল্পকার থেকে বয়স অনুক্রমে জ্যেষ্ঠ থেকে কনিষ্ঠ এবং লেখা প্রাপ্যতার ভিত্তিতে আরও ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি তাদের একটি করে উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা।
সাম্প্রতিকের গল্পের বিষয় ও বৈশিষ্ট্যে বাঁকবদল এবং বিশেষ করে গল্পে উত্তর-আধুনিক প্রবণতা নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হয়েছে, লেখালেখি হচ্ছে। উত্তর আধুনিক সাহিত্য, বিশেষ করে উত্তর-আধুনিক ছোটগল্পের বিষয় ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে স্বতন্ত্র এবং অধিকাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য বয়ান, সুনিশ্চিত বর্ণনা পাওয়া কঠিন। তাছাড়া উত্তর-আধুনিক প্রবণতা বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত। কোনো কোনো সময় এই প্রবণতার মধ্যে ভূতের মতো পেছনে হাঁটার অর্থাৎ পশ্চাদপদতার ভূত সওয়ার হতেও দেখা যায়।
উত্তর-আধুনিক গল্পে প্রায়শই ক্ষমতা, আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এটি রাষ্ট্রীয়, সামাজিক বা পারিবারিক হতে পারে। ব্যক্তি কীভাবে একটি নির্দিষ্ট সিস্টেম বা কাঠামোর মধ্যে শৃঙ্খলিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়, গল্পগুলোতে তা দেখানো হয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক বন্দোবস্তের চাপ কীভাবে মানুষের মনন ও আচরণকে প্রভাবিত করে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে গল্পগুলোতে প্রস্ফুটিত হয়েছে। প্রচলিত বাস্তবতার বাইরে গিয়ে মানুষের মানসিক ও অস্তিত্বের গভীর জটিলতা, দ্বিধা ও সংঘাতকে তুলে ধরা হয়েছে। আধুনিক সমাজে ব্যক্তি কীভাবে বিচ্ছিন্ন ও অসহায় বোধ করে, বা কীভাবে ব্যক্তি তার চারপাশের সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে লড়াই করে, তা উত্তর-আধুনিক গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দেখা যায়। তাছাড়া গল্পে ঘটনার ক্রম প্রায়শই অ-রৈখিক অর্থাৎ ধারাবাহিক না হয়ে খণ্ডিত ও বিক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। রূপ ও আঙ্গিকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে যেখানে গল্প বলার ধরন ও ভঙ্গিতে নতুনত্ব আনা হয়েছে। প্রচলিত ধারা বা কাঠামোর বাইরে গিয়ে পরীক্ষামূলক আঙ্গিক ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো কোনো গল্পে একটি একক ও সম্পূর্ণ আখ্যানের পরিবর্তে, খণ্ডিত আখ্যান কাঠামোতে গল্পগুলো অনেক সময় খণ্ড খণ্ড অংশ নিয়ে গঠিত হতে দেখা গেছে যা পাঠককে নিজস্বভাবে একটি অর্থ সৃষ্টি করতে উৎসাহিত করতে পারে। তাছাড়া উত্তর-আধুনিক গল্পে ঐতিহ্যগত কাঠামোর ভাঙন ঘটতে দেখা যায় যেমন কোন একটি নির্দিষ্ট প্লটের অনুপস্থিতি। উত্তর-আধুনিক গল্পগুলোতে বাস্তবতার নতুন ব্যাখ্যা অর্থাৎ প্রচলিত বা বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতার বাইরে গিয়ে এক নতুন ও ভিন্ন বাস্তবতাকে উপস্থাপন করতে দেখা গেছে, যেখানে মনস্তাত্ত্বিক বা প্রতীকী দিকগুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। একে অপরকে ছাড়া এগুলোর অস্তিত্ব থাকতে পারে না। শিল্প-সাহিত্য যেমন মানুষের আবেগ, চিন্তাভাবনা ও অভিজ্ঞতার সৃজনশীল প্রকাশ, অন্যদিকে সংস্কৃতি হলো একদল মানুষের ভাগ করা জীবনযাত্রার মধ্যে রয়েছে তাদের ঐতিহ্য, বিশ্বাস, সভ্যতা, জীবনযাত্রা, মূল্যবোধ ও রীতিনীতি। শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত হয় এবং সংস্কৃতি শিল্পকে অর্থ ও দিকনির্দেশনা দেয়। শিল্প ও সংস্কৃতির মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক দেখায় যে মানুষ কীভাবে তাদের পরিচয় প্রকাশ করে এবং কীভাবে তারা জীবনযাপন করে। সংস্কৃতি থেকেই শিল্প-সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। প্রতিটি সমাজ নিজস্ব শিল্প-সাহিত্যের রূপ সৃষ্টি করে—চিত্রকলা, সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য, স্থাপত্য ও কারুশিল্প- যা তার ইতিহাস ও পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করে। উদাহরণস্বরূপ, ধ্রুপদি নৃত্য ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে লোকগান গ্রামীণ জীবনের আনন্দ ও দুঃখকে প্রতিফলিত করে। একইভাবে, বিভিন্ন দেশের শিল্প-সাহিত্য তাদের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য দেখায়। শিল্প ও সাহিত্যের মাধ্যমেই মানুষ তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেয়।
সংস্কৃতি আমাদের শিল্প ও সাহিত্যকে বোঝার এবং মূল্য দেওয়ার ধরনকেও প্রভাবিত করে। একটি সমাজ যাকে সুন্দর বা অর্থবহ বলে মনে করে তা অন্য সংস্কৃতিতে ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, উপজাতীয় শিল্প সম্প্রদায়ের জীবন প্রকৃতির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, অন্যদিকে আধুনিক শিল্প প্রায়শই ব্যক্তিগত আবেগ ও সংগ্রাম প্রকাশ করে। এটি দেখায় যে শিল্প ও সাহিত্য কেবল একটি ব্যক্তিগত সৃষ্টি নয় বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পণ্যও। একই সঙ্গে, শিল্প সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতাকে প্রভাবিত করে। এটি মানুষের ধারণা পরিবর্তন করতে পারে, সামাজিক আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং ঐক্য তৈরি করতে পারে। শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা তাদের কাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা, শান্তি প্রচার করতে এবং মানবিক মর্যাদা উদযাপন করতে ব্যবহার করেন। এইভাবে, শিল্প ও সাহিত্য সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং রূপান্তরের জন্য একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। যখন মানুষ গল্প, সংগীত বা চিত্রের মাধ্যমে শিল্প অনুভব করে তখন তারা আবেগ এবং ধারণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় যা তাদের সংস্কৃতিকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে। তাই শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক— প্রতিফলিত ও গতিশীল উভয়ই। শিল্প ও সাহিত্য যে সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত সেখানে তার প্রতিফলন ঘটায় এবং একইসঙ্গে সংস্কৃতি শৈল্পিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিকশিত হয়। পারস্পরিকভাবে তারা মানবতাকে তার অতীত সংরক্ষণ করতে, তার বর্তমান বুঝতে এবং তার ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে সহায়তা করে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের যোগসূত্রের সেতু ভাঙার যারা আয়োজন করতে চায় তারা জাতির শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির কোনো না কোনো অঙ্গ পঙ্গু করার অপকর্মটাই করতে চায়।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 3; Contemporary Stories & Storytellers (Part-2)
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা – সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা (প্রথম পর্ব)
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা – সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা, প্রথম পর্ব- সম্পাদকীয়-
গত কয়েকবছর ধরে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিক এবং তাদের রচিত কবিতা ও গল্প নিয়ে আলোচনার চর্চা বিস্তৃত করে চলেছে। ২০২২ এ বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ কবি (যাদের জন্ম : ১৯১১ – ১৯৬৫), ২০২৩ এ বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার (যাদের জন্ম : ১৮৯৫ – ১৯৬৫) এবং ২০২৪ এ বাংলাদেশের নির্বাচিত সাম্প্রতিকের ১০০ কবি (যাদের জন্ম : ১৯৬৫ – ১৯৮৫); এসকল কবি ও গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা বিষয়ে তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলার পাশাপাশি তাদের উল্লেখযোগ্য কবিতা অথবা গল্প এবং তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা সংকলিত করে প্রকাশ করার মাধ্যমে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কবি ও গল্পকারদের পরিচিতি এবং তাদের রচিত সাহিত্য সম্পর্কে সামষ্টিক আলোচনা সমূহ দেশের সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করে যাচ্ছে। আমরা মনে করি এভাবে বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিকদের মূল্যায়ণ করার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করার মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশের সাহিত্যের পরিচিতির ক্ষেত্রটি বিস্তার লাভ করতে পারে।
এই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ এ এসে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন বাংলাদেশের সাম্প্রতিকের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার যাদের জন্ম ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫ এর মধ্যে হয়েছে, তাদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা বিষয়ে তথ্যের পাশাপাশি তাদের উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের রচিত গল্পসাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা সংকলিত করার কাজ হাতে নিয়েছে।
এই সংখ্যায় প্রকাশিত হলো আলোচকদের থেকে লেখা প্রাপ্তির ভিত্তিতে গল্পকারদের বয়সানুক্রমে নির্বাচিত ১০০ জন সাম্প্রতিকের গল্পকারের মধ্যে থেকে ২৫ জন গল্পকারের জীবিনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য গল্প ও রচিত গল্পসাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা।
বিগত তিন বছর অর্থাৎ ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ এ যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আমরা বাংলাদেশের ১০০ কবি ও গল্পকার নির্বাচিত করেছি বাংলাদেশের নির্বাচিত সাম্প্রতিকের গল্পকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা মোটামুটি একই নির্ণায়ক মানদণ্ড অনুসরণ করেছি।
প্রথমত আমরা বিবেচনা করেছি আধুনিক বাংলা ভাষায় চর্চাকারী সাম্প্রতিকের গল্পকার যারা ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জন্ম লাভ করেছেন অথবা যিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময়ই বাংলাদেশে বসবাস করেছেন অথবা যার প্রকাশনা ও পাঠকের মূল অংশটি ভৌগলিক ভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। দ্বিতীয়ত আমরা বিবেচনা করেছি যে গল্পকারের গল্পে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অবিভক্ত বাংলা সাহিত্যের সাধারণ ঐতিহ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জনগণের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সমাজ-বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে। তৃতীয়ত যে গল্পকারের এক বা একাধিক গল্প বাঙালি পাঠক মহলের বড় অংশে উল্লেখিত ও সমাদৃত হয়েছে। চতুর্থত আমরা মনে করি শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো জাতি তথা মানবজাতির সাধারণ ও উন্মুক্ত অধিকারের বিষয়। কোনো সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো বিবেচিত না হওয়াই কাম্য। কিন্তু তারপরও কতগুলো বিষয় থেকে যায় যেগুলো নিয়ে আপস করা কঠিন। আর তাছাড়া প্রজন্মকে কিছু বার্তা দেওয়া প্রয়োজন, যে বার্তা, বক্তব্য অথবা কর্ম, সমাজে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কারা বাঙালীর স্বাধীনতার পক্ষে ছিল আর কারা বিপক্ষে ছিল? যুদ্ধকালীন পক্ষ-বিপক্ষের প্রশ্নটি মানবতার পক্ষে অথবা বিপক্ষে থাকার মতোই একটি প্রশ্ন। যখন জাতীয় বিদ্বেষপ্রসূত হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা নিয়ে জেনোসাইড চলে তখন পক্ষের বিষয়টা শুধু রাজনৈতিক থাকে না, মানবিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই যখন কোনো শিল্পী বা সাহিত্যিক এরকম সঙ্কটপূর্ণ সময়ে বা পরবর্তী সময়ে মানবতার পক্ষে না গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী যুদ্ধাপরাধীদের সাথে যুক্ত হয়ে থাকেন তাহলে সেটাকে নিছক ব্যক্তিগত বিষয় বলে গণ্য করা কঠিন হয়ে যায়। আর এই গণ্য করতে না পারার বিষয়টি অনুপ্রাণনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
একজন সাহিত্যিকও তার চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন নিয়ে আসেন কখনো সচেতনভাবে অথবা কখনো অবচেতনভাবেই। বাংলাদেশের সাম্প্রতিকের গল্পকারদের গল্পে পূর্বসুরীদের গল্পে নারী-পুরুষের প্রেম, পরকীয়া, বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের মনস্তত্ত্ব যেমন অনেকটা গ্রামীণ ছিলো, সেটা আর থাকেনি। চরিত্রের বাইরের চরিত্র অর্থাৎ পরিবার ও সমাজের সাথে যুক্ততা থেকে মুক্ত হতে কোন কোন সাম্প্রতিকের গল্পকার সফল হয়েছেন। তাই দেখা যায় প্রেম, পরকীয়া ও বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে কেউ না কেউ নাক গলানোর বিষয়টা পূর্বের মতো আর শক্তিশালী থাকেনি। আমরা এখন চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে ডিজিটাল বিষয়গুলোর উত্তরণ ঘটছে, ঘটছে জীবন-যাপনের চালচিত্র। মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে যেমন মানুষ সোচ্চার হচ্ছে তার পাশাপাশি ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রগুলোতে মানুষের অবস্থান দৃঢ়তর হতে দেখা যাচ্ছে। গ্রামের রূপান্তর কাহিনী হোক অথবা শহর থেকে নগরায়ণের দিকে উত্তরণের কাহিনী হোক প্রায় সকল ক্ষেত্রেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও পরিবার থাকলেও সাম্প্রতিকের গল্পকারদের মধ্যে ক্রমেই কাহিনী যতটা না পারিবারিক অথবা সামাজিক তার থেকে ব্যক্তিকে নিয়েই চর্চা বেশি হয়ে ওঠার প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে। গল্পের চরিত্রগুলোকে দেবতাতুল্য অথবা উল্টোদিকে শয়তানতুল্য করে অবাস্তব কাল্পনিক চরিত্র করে গড়ে তোলার ধারা থেকে বেরিয়ে এসে সাম্প্রতিকের গল্পকাররেরা কখনও বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বহুমাত্রিক ও বহুরৈখিক অথবা স্বপ্ন, অবাস্তব মানসিক চিত্র বা কাল্পনিকভাবে সৃষ্ট যা কিনা কোনো বাস্তবতার একটি রূপ হতে পারে অথবা সম্পূর্ণ কাল্পনিক ফ্যন্টাসি চরিত্র নির্মানে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিকের গল্পকারদের গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আলোচকরা এসব বিষয়কে আরো বিস্তৃতভাবে মূল্যায়ণ করেছেন।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 2; Contemporary Stories & Storytellers (Part-1)
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা- সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতি সংখ্যা
সম্পাদকীয়-
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা- সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতি সংখ্যা
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যাটি সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতিসংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হলো। সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ ২০১৩ সালে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বিতীয় বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশের সময় অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদে যুক্ত হন। গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি অনুপ্রাণনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তাঁর অকাল মৃত্যু আমাদের শোকগ্রস্ত করেছে। তাঁর স্মৃতি বারবার ফিরে এসে আমাদের মন ভারাক্রান্ত করে তুলছে। স্বামী-পুত্র-কন্যা-পরিবার-পরিজন নিয়ে সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের একটা সংসার ছিল। নারী হিসেবে সংসার ও পরিবারের প্রতি কতগুলো স্বাভাবিক দায়িত্ব ছিল। কিন্তু পাশাপাশি সাহিত্য, সংগীত, সংস্কৃতি, ফ্যাশন ও পরিবেশ নিয়ে তাঁর ভাবনা ছিল, কর্মকাণ্ড ছিল। কবিতা লিখতেন, অনুবাদ করতেন, গল্প লিখেছেন। সম্পাদনা পরিষদে অংশ নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ও অনুপ্রাণন প্রকাশনের কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তরুণদের সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী করে তোলার লক্ষে প্রথম দুই বছর (২০১২-২০১৪) কনকর্ডের চত্বরে একটি দেয়াল পত্রিকার সম্পাদনাও করেছেন। ত্রৈমাসিক পত্রিকা ছাড়াও শিল্প-সাহিত্য জগতে অনুপ্রাণনের কর্মকাণ্ড প্রসারের জন্য বিভিন্ন সময় নেওয়া কর্মসূচি সফল করে তোলার জন্য সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ তাঁর অন্য সকল কাজের ভিড়ে অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদে পর্যাপ্ত সময় ও স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়নভিত্তিক প্রবন্ধগুলোতে শুধু যে তাঁর বহুমাত্রিক কাজের পরিচয় আমরা পাই তা নয়, পাশাপাশি আমরা খুঁজে পাই তাঁর মন-মানস। সেই সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ’কে যিনি ছিলেন একজন রুচিশীল, স্নেহশীল, মানবিক মানুষ। যিনি সুন্দরকে ভালোবাসতেন। সমাজে ঘৃণা, কদর্যতা, সংকীর্ণতা, বিভেদ, বৈষম্য ও নীচতা তাঁকে পীড়িত করেছে। প্রকৃতির মাঝে তিনি বিচিত্র সুন্দরের সন্ধান করতেন। প্রকৃতির মাঝে থেকেই তিনি দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের জীবন থেকে মুক্তি পেতে ভালোবাসা ও সহনশীলতার পাঠ নিয়েছেন। জীবনে ও পরিবেশে তিনি প্রতিনিয়ত সবুজ, সরলতা ও শান্তির সরোবর সন্ধান করেছেন, আহরণ করেছেন। তাঁর চারপাশটা সুন্দর করে সাজিয়ে তোলার জন্য সাজিয়ে রাখার জন্য সবসময় ব্যাকুল থেকেছেন।
সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ বিশ্বাস করতেন একটি দেশের দার্শনিক ও আদর্শিক স্থান চিহ্নিত হয় সে দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে। ক্রমাগত চর্চা ও সাধনার মধ্য দিয়ে একটি জাতির শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভিত মজবুত করা যায়। শিল্প-সাহিত্য ও সংগীত সাধনা ছাড়া শান্তির ও সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তোলা যায় না। শিল্প ও সাহিত্য সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একটি দেশের শিল্প-সাহিত্যে সে দেশের সমাজ প্রতিফলিত হয়। আবার শিল্প-সাহিত্যের চর্চার মধ্য দিয়েই সমাজের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, সামাজিক রীতিনীতি ও ঐতিহাসিক আখ্যানের নির্মাণ ও রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলমান থাকে। শিল্প-সাহিত্য মানব অবস্থার উপর অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আবেগ অন্বেষণ করতে, সামাজিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং আরও ন্যায়সঙ্গত ও সহানুভূতিশীল বিশ্ব গঠনে অবদান রাখতে সাহায্য করে। কেবল সমাজের সাজসজ্জার উপাদান হিসেবে নয় বরং সমাজকে বোঝার এবং রূপান্তরের জন্য শিল্প ও সাহিত্যচর্চা অপরিহার্য। শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমে সৃজনশীল ও নান্দনিক প্রকাশের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রক্রিয়া ব্যক্তির মানবিক অভিজ্ঞতার গভীরতর উপলব্ধি অর্জন করে তুলতে সক্ষম করে, চিন্তার বিকাশ সাধন প্রক্রিয়ায় জারিত হয়ে অমানবিক সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে, চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়সঙ্গত বিশ্ব নির্মাণে অবদান রাখতে পারে। এই বোধ ও অনুভূতিগুলোই সুলতানা শাহ্রিয়া পিউকে ক্রমাগত অনুপ্রাণিত করেছে এবং চালিকাশক্তি হিসেবে শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার সকল পরিসরে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।
বস্তুত পৃথিবীর সব কিছুই সুন্দর বা নান্দনিক হয় না। আমাদের চারপাশের দৃশ্য ও ঘটনাবলি থেকে উৎসারিত সকল অনুভূতি নান্দনিক বা শিল্পিত হয় না। এর মাঝে যে-সকল অনুভূতি ও প্রকাশভঙ্গি আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি আনে, মনে চঞ্চলতা আনে, আনন্দ দেয়, মনের আধ্যাত্মিক স্তরটিকে বিকশিত করে, সেগুলোকেই আমরা বলি, সুন্দর। এ যেন এক যাদু। এই যাদুর কাঠির পরশ যে শিল্পে, যে সাহিত্যে থাকে না সেই শিল্প সেই সাহিত্য মানুষের হৃদয়ের উষ্ণ ছোঁয়া থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়। বাংলা ভাষায় ‘নন্দনতত্ত্ব’ শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মূলত নান্দনিকতা আঠারো ও উনিশ শতকের একটি সাহিত্যিক ও শৈল্পিক আন্দোলন, যা সৌন্দর্যের গুরুত্বের উপর আলোচনার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল। এই ধারণা দিতে সচেষ্ট হয়েছিল যে সৌন্দর্য ছিল শিল্প ও সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সৌন্দর্য কী, তা বর্ণনা দিয়ে অপরকে বোঝানো যায় না, এটি অসংজ্ঞায়িত। সৌন্দর্য উপলব্ধির বিষয়, তাই এটি বুঝে নিতে হয়। ভাবের পরিপূর্ণতা এবং প্রকাশের তীব্র আকুতি নিয়ে সৌন্দর্যের নিজস্ব মূল্য সৃজন-চেষ্টার কৌশল অনুসরণ করা প্রতিটি শিল্পী ও সাহিত্যিকের জন্য মূল্যবান। সামষ্টিক সংস্কৃতি বিশুদ্ধ বুদ্ধির বিষয়, যা কিনা শিল্পের মাধ্যমে উদ্ভাসিত সৌন্দর্যের বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং সর্বদা একটি প্রতি-পরিবেশ হিসেবে কাজ করে যেখানে মানবিকতার ভূমিকাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের মাঝে ছিল গভীর সৌন্দর্যবোধ। তাঁর প্রতিটি কর্ম তাই হয়ে ওঠে এমন একটি ব্যতিক্রম যেখানে সম্পৃক্ত থেকেছে নান্দনিকতার বিশেষ ছোঁয়া। তাঁর কবিতা অথবা গল্প রচনায়, বাচিক শিল্প অথবা সংগীতচর্চায়, ফ্যাশন ডিজাইনে অথবা তাঁর ছাদবাগানে, কিংবা বৃক্ষ রোপণ ও বৃক্ষ উপহার কার্যক্রমে সদা প্রকাশ পেয়েছে গভীর নান্দনিকবোধ ও মানবিকতাবোধ। যার ছাপ তিনি রেখে গেছেন আমাদের সবার হৃদয়ে। তাই, সশরীরে না থাকলেও আগামীতে অনুপ্রাণনের সৃজন-নন্দনের পরিসরে পরিচালিত সকল কর্মকাণ্ডে নান্দনিকতা, শুভবোধ ও মানবিকতার উদাহরণ হয়ে পিউ আমাদের সঙ্গে থাকবেন।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 1; Sultana Shahria Pieu Memorial Issue
অনুপ্রাণন ১৩তম বর্ষ ১ম সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা- প্রথম পর্ব
সম্পাদকীয়- অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা (প্রথম পর্ব)
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষে পদার্পণ করল। অনুপ্রাণনের লেখক, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী জানেন, একাদশ বর্ষ থেকে বছরের ৪টি সংখ্যাই বিশেষ সংখ্যা হিসেবে প্রকাশ করছে এবং পুরো এক বছরের চারটি সংখ্যা বস্তুত একটি বিশেষ বিষয়কেই সম্পূর্ণ করেছে।
যেমন- একাদশ বর্ষের (২০২২) চারটি সংখ্যায় চারটি ভাগে ভাগ করে বাংলাদেশের ১০০ জন নির্বাচিত কবিকে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। যে কবিদের জন্ম হয়েছে ১৯০০ সাল থেকে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। দ্বাদশ বর্ষে (২০২৩) চারটি ভাগে ভাগ করে বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকারদের নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। যে গল্পকারদের জন্ম হয়েছে ১৮৯৭ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে। উল্লেখ করা যেতে পারে, এই বিশেষ কবি ও কবিতা সংখ্যা এবং গল্পকার ও গল্পসংখ্যার প্রতিটি প্রবন্ধের বিন্যাসে কবি অথবা গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য কবিতা অথবা গল্প এবং তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে এটা স্পষ্ট হয়, গত দুই বছরে আমরা যে ১০০ জন বাংলাদেশের কবি ও যে ১০০ জন বাংলাদেশের গল্পকার নির্বাচিত করেছি তাদের হাত ধরেই বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি রচিত হয়েছে।
বিগত একাদশ ও দ্বাদশ বর্ষে অনুপ্রাণনের হাতে নেওয়া উল্লিখিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতার পথ ধরে এসে ত্রয়োদশ বর্ষে (২০২৪) সাম্প্রতিকের ১০০ জন কবিকে নির্বাচিত করেছে যাদের জন্ম ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের দুটি দশকে। একইভাবে চারটি ভাগে ভাগ করে নির্বাচিত এই ১০০ জন কবিকে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশের প্রথম পর্ব হিসেবে ২৫ জন কবিকে নিয়ে অনুপ্রাণনের চলতি সংখ্যা; অর্থাৎ সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো।
গত দুই বছর প্রকাশিত ত্রৈমাসিকের সম্পাদকীয়তে আমরা বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেছি কারা বাংলাদেশের কবি ও গল্পকার এবং কীভাবে আমরা সেই ১০০ জন কবি অথবা ১০০ জন গল্পকার নির্বাচন করেছি। ভুল বোঝার কোনো অবকাশ নেই, বাংলাদেশের সাহিত্য সারাবিশ্বে বসবাসকারী বাঙালি রচিত বাংলা সাহিত্যেরই অংশ যেখানে জাতীয় ও বৈশ্বিক চেতনার মেলবন্ধন হয়েছে। বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য- বাংলা সাহিত্যের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানুষের মুক্তি সংগ্রামের বৈশিষ্ট্য ধারণ করেই বিকশিত। তথাপি ধ্রুপদি সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য ভাষার সাহিত্য থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি। আধুনিক বৈশ্বিক ধারা ও রীতির ধ্রুপদি কবিতা রচনার বিষয়টি সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কবিদের কবিতায় আরও বেশি করে বিকশিত হতে আমরা দেখি।
পাকিস্তানি শাসকদের কুচক্রের কারণে বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে ছিল। স্বাধীন হওয়ার এক দশক পর অর্থাৎ ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যাপক বৃদ্ধি পেতে থাকে। পশ্চিমে বাংলাদেশের শক্তিশালী ডায়াসপোরা গড়ে ওঠার ফলে সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কবিরা বিদেশি সাহিত্যিক ও সাহিত্যের সঙ্গে আরও অধিক পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এর প্রভাব বাংলা কবিতায় দৃশ্যমান।
বাংলাদেশ একদিনে সৃষ্টি হয়নি। বহু বিস্ফোরণোন্মুখ রাজনৈতিক ঘটনা ও দেশের সাধারণ মানুষের জীবনদানের ভেতর দিয়ে তা ধীরে ধীরে একটা রূপ পেয়েছে। সেই জন্যই হয়তো বাংলাদেশের বেশির ভাগ কবির কবিতায় মেধার তুলনায় আবেগ ও উচ্ছ্বাস বেশি লক্ষ করা যায়। যে দেশকে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে বারবার যেতে হয়েছে সেই দেশের কবিতায় সেসব ঘটনা থেকে উৎসারিত আবেগ ও উচ্ছ্বাসের ছাপ থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আটের দশকের পর থেকে বাংলাদেশের কবিতা বাঁক নিতে শুরু করে। ক্রমে ক্রমে কবিতা সমষ্টির জায়গা থেকে ব্যক্তির জায়গায় সরে আসতে দেখা যায়। ব্যক্তির নিজস্ব আলো ও অন্ধকার, বিচ্ছিন্নতা, কেন্দ্রহীনতা ও নৈঃশব্দ্য প্রকাশিত হতে থাকে।
সাম্প্রতিকের কবিরা মুক্তিযুদ্ধের সময় শিশু ছিলেন। তাদের সেভাবে দেখতে হয়নি বাঙালি জাতিসত্তার উন্মেষ, ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য জাতির লড়াই, গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ভিন্নমতের অস্থিরতার ভেতর দিয়ে গেছে। স্বৈরাচারী শাসককে মেনে নিতে হয়েছে প্রায় দুই দশক। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, পরবর্তীকালে আধা-গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থার উন্মেষ, পুঁজি গঠনের প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের রাজনৈতিক-অর্থনীতির প্রভাব পড়েছে সাম্প্রতিক কবিতায়।
একদিকে নগর ও নগরায়ন, অন্যদিকে দেশের ভৌত কাঠামোর উন্নয়ন যা শহর ও গ্রামের দূরত্ব কমিয়েছে। এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে ডিজিটালাইজেশন যুক্ত হয়ে সাম্প্রতিক কবিদের কবিতাকে প্রভাবিত করেছে যা বেশ লক্ষণীয়। ফলে, যে আবেগ ও উচ্ছ্বাস পঞ্চাশ, ষাট, সত্তরে এমনকি আশি ও নব্বইয়ের দশকেও দেখা যাচ্ছিল তা অনেকটাই স্তিমিত হতে দেখা গেছে সাম্প্রতিক কবিদের কবিতায়। সাম্প্রতিক কবিদের একটা বড় অংশের মধ্যেই আমরা পাই অনুচ্চকিত, শান্ত ও সংহত আবেগের পাশাপাশি নির্মেদ মেধার ব্যবহার। তবে উচ্ছ্বাসময় কবিতা যে সাম্প্রতিক লেখা হয়নি, তা নয়। কারও কারও কবিতাতেই আবেগের আতিশয্য রয়েছে, রয়েছে কথার ফেনা, কিন্তু একটা বড় অংশের মধ্যে যা নেই তা হলো তারল্য, উচ্ছ্বাস অথবা প্রক্ষোভ।
সাম্প্রতিক সময়ের কবিদের অনেকেই ছন্দে লিখতে পছন্দ করেন, লেখেনও। প্রচলিত ছন্দের বাইরে আগেও লেখা হয়েছে, সাম্প্রতিক কবিরাও লিখেছেন। তবে, সাম্প্রতিকের কবিদের একটা বড় অংশ ছন্দের বাইরে দাঁড়িয়ে কবিতা লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন বলে প্রতিভাত হয়। সাম্প্রতিক এসব বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ নিয়েই থাকছে অনুপ্রাণনের সাম্প্রতিক কবি ও কবিতা সংখ্যার চারটি পর্ব।
Quarterly Anupranan 13th Year 1st Issue, Samprotiker Kabi O Kobita- 1st Part
অনুপ্রাণন ১১তম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা – কবি ও কবিতা সংখ্যা, চতুর্থ পর্ব

কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম পাঠক ও বোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য সংগঠন প্রয়োজন। বাংলাদেশের সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও আচার-আচরণের প্রেক্ষাপটে একটি কার্যকরী সংগঠন গড়ে তোলা অনেক শ্রম ও সময়সাপেক্ষ কাজ। বিশেষ করে দেখা যায় যে গণতান্ত্রিক ভাবে পরিচালিত একটি সংগঠনে ভাঙা গড়া লেগেই থাকে যার ফলে কাজের গতি ও পরিধি সবসময়েই ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। অনুপ্রাণন সবসময় নেতিবাচক আলোচনা-সমালোচনাকে এড়িয়ে চলেছে। এর অর্থ এই নয় যে উদ্ভূত সেসব নেতিবাচক বক্তব্যের জবাব আমাদের কাছে নেই কিন্তু আমরা চেয়েছি ইতিবাচক কাজের মাধ্যমেই সেসব নেতিকে নাকচ করার মানসিকতা যেন গড়ে ওঠে। তাই, অনুপ্রাণন সবসময় ইতিবাচক কাজ করে যাওয়ার পক্ষেই শক্তির যোগান দিয়েছে। আমাদের ভালো ভাবে ভেবে দেখা দরকার যে চলমান অস্থির প্রতিযোগিতার পরিবেশে কি-করে শিল্প-সাহিত্য বিশেষ করে কবিতা সাহিত্যের প্রতি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আগ্রহী করে তোলা যায়। একটি বিষয় উল্লেখ করতেই হয় যে, মনে হয় যেন কবিতা পাঠের থেকে কবিতা লেখার আগ্রহই প্রজন্মের বেশী। এই হিসাবটা হয়তো শতভাগ ঠিক না কিন্তু অনুপ্রাণন প্রকাশনে অনেক তরুণ কবিদের দুর্বল কবিতার পা-ুলিপি নিয়ে প্রকাশনার জন্য ভিড় করা দেখে এরকমই মনে হতে পারে। এই বক্তব্যের প্রতি যদিও ভিন্নমত আছে তবুও আমরা মনে করি যে, সর্বক্ষেত্রে না হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কবি, লেখক ও শিল্পীর সৃজনশীল কাজ সত্যিকার অর্থে মূল্যায়িত হতে পারে যদি প্রাতিষ্ঠানিক অথবা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে হলেও তার গড়ে ওঠার পেছনে একটা নির্দিষ্ট ও সুনিবিষ্ট প্রস্তুতি ও চর্চার পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে। ব্যতিক্রম থাকেই কিন্তু সেই ব্যতিক্রমকে উদাহরণ হিসেবে সাধারণের পক্ষে যুক্ত করাটা হয়তো ঠিক না।
তরুণ লেখকদের এই প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করেই অনুপ্রাণন সেরকমই একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কার্যক্রম গ্রহণ করার প্রয়াস পেয়েছে যেখানে তরুণ কবি ও সাহিত্যিকেরা প্রিন্ট পত্রিকা ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন এবং অনুপ্রাণন অন্তর্জালের সাথে যুক্ত হয়ে গ্রন্থ প্রকাশনা পূর্ববর্তী কালের প্রস্ততি গ্রহণের সুযোগ নিতে পারে।
Anupranan Troimasik Year 11 Issue 4, Kabi O Kabita Songkhya- Churtho Porrbo
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ১১ম বর্ষ ২য় সংখ্যা
অনুপ্রাণন ১১তম বর্ষ ১ম সংখ্যা
অনুপ্রাণন ১১তম বর্ষ ১ম সংখ্যা- সম্পাদকীয়
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণনের সূচনা সংখ্যা প্রকাশিত হয় নভেম্বর, ২০১২। এ-পর্যন্ত ৩২টি সংখ্যা প্রকাশ করে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ১০ টি বছর অতিক্রম করেছে। এ দশটি বছর অনুপ্রাণন’কে নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়েই এগিয়ে যেতে হয়েছে। আজ একাদশ বর্ষের প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশ করার মুহূর্তে পেছনের দশটি বছরের দিকে ফিরে স্মৃতিতে অনেক কিছুই ভেসে আসে। লেখক, পাঠক এবং সম্পাদনা পরিষদের সাথে ভাগ করে নেয়ার মতো অনেক কথাই হয়তো বলার থাকে, বলার ছিল। কেননা ১০ বছর তো কম সময় নয়। তবে, শিল্প-সাহিত্যের পত্রিকা অথবা লিটল ম্যাগ প্রকাশের ইতিহাসে প্রায় একই ধরনের ঘটনা হয়তো হর-হামেশাই ঘটে থাকে।
টেকসই সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি এবং সংগঠনের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক নির্মাণে পেশাদারিত্বের অভাব আমাদের সমাজের সব ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। এখনো সেখানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অহমবোধ প্রতিটি সংগঠনের ভিত কুরে কুরে খাচ্ছে। বাইরের থেকে যেটা দেখা যায় সেটা ঠিক ভেতরের চিত্র না। আর তাছাড়া অর্থনীতির বিষয়টা তো আছেই। আর সেটার গুরুত্ব অনুধাবন করার ঘাটতি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্রই বিদ্যমান। আমাদের দেশের শিল্প-সাহিত্য এবং সংস্কৃতির জগতে সাধারণভাবেই অর্থের সংকট রয়েছে। সাধারণভাবেই বলা যায় যে, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধির গুরুত্ব আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র এখনো যথার্থভাবে বুঝতে ব্যর্থ। ভাবা হচ্ছে ভৌত কাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নের মধ্য দিয়ে উন্নতির চাকা ঘুরলে দেশের উন্নয়ন হবে। কিন্তু আমরা জানি উন্নত সভ্যতা মানেই হচ্ছে উন্নত শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি।
তাই, অনুপ্রাণন যেসব সাংগঠনিক সমস্যা মোকাবেলা করে টিকে আছে সেসবের সাথে অন্যান্য শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য বা ব্যতিক্রম হয়তো নির্মাণ করা যায়নি। কেননা আমরা শেষ পর্যন্ত, এদেশের প্রকৃতি ও মনুষ্যসমাজেরই অঙ্গ। দেশের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি- এসবের সংকট ও সম্ভাবনা থেকে অনুপ্রাণন বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ তো নয়।
এটা ঠিক অনুপ্রাণন পত্রিকাটিকে ঘিরে এই দশ বছরে লেখক-পাঠক ও সুভানুধ্যায়ীদের একটি বৃত্ত তৈরি হয়েছে। এই বৃত্ত কোনো বিশেষ সীমানা রেখা দিয়ে ঘেরা কোনো বৃত্ত না। এই বৃত্ত শিল্প-সাহিত্যের মুক্ত চর্চার মতোই উন্মুক্ত। অনুপ্রাণন মুক্ত চিন্তার চর্চাকেই সবসময় সমর্থন করেছে, অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেছে। আর অনুপ্রাণন চেষ্টা করেছে এদেশের তরুণরা যেন বেশী বেশী করে বই পড়া আর শিল্প-সাহিত্যের চর্চায় আগ্রহী হয়ে উঠে। সারাদেশ জুড়ে অনুপ্রাণনকে ঘিরে আছে একদল তরুণ-তরুণী, যারা নিয়মিত শিল্প-সাহিত্য চর্চার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারাই অনুপ্রাণনের প্রাণশক্তি। যাদের সাথে অনুপ্রাণনের সম্পর্ক হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক সৌহার্দের। একে আরেকের পরিপূরক।
দশ বছর নিয়মিত বিভাগ নিয়ে ছাপার সংস্করণ আকারে অনুপ্রাণন পত্রিকাটি প্রকাশ করার পথে লেখক ও পাঠকদের কাছ থেকে ক্রমেই দুটি দাবী জোরালো হয়ে উঠেছে। প্রথমটি হচ্ছে, অনুপ্রাণনের একটি অন্তর্জাল সংস্করণ প্রকাশ করা। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের মুদ্রিত সংস্করণে সাহিত্য ও শিল্পের বিশেষ ধারা, ধরন অথবা বিষয়ভিত্তিক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করা।
ইতোমধ্যেই গত ৯ ফেব্রুয়ারি অনুপ্রাণনের পক্ষ থেকে, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণনের সূচনা সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। অন্তর্জালভিত্তিক এই সংখ্যাটিতে থাকছে ২০ টি বিভাগ। যথাক্রমে- শ্রদ্ধাস্মরণ, স্মৃতিচারণ, প্রবন্ধ, অনুবাদ প্রবন্ধ, গুচ্ছ কবিতা, যুগল কবিতা, একক কবিতা, অনুবাদ কবিতা, বড়ো গল্প, ছোট গল্প, অণুগল্প, অনুবাদ গল্প, মুক্তগদ্য, ভ্রমণকাহিনী, বই আলোচনা, ম্যাগ আলোচনা, পাঠ প্রতিক্রিয়া, চলচ্চিত্রকথা, ধারাবাহিক উপন্যাস, নাট্যকথা এবং শিল্প-সাহিত্য সংবাদ।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন ইতিমধ্যে অনিয়মিতভাবে ৬ টি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। সেগুলো হচ্ছে, (১) তৃতীয় বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা- প্রিয় উপন্যাস সংখ্যা; (২) অষ্টম বর্ষ প্রথম সংখ্যা- গল্প সংখ্যা; (৩) অষ্টম বর্ষ তৃতীয় সংখা- অণুগল্প সংখ্যা; (৪) অষ্টম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা- কুহক মাহমুদ স্মৃতি সংখ্যা; (৫) নবম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা- কবি ও কবিতা সংখ্যা; এবং (৬) দশম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- বাংলাদেশের ১৫টি সেরা গল্প- পাঠ ও আলোচনা সংখ্যা।
একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যার মধ্য দিয়ে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, সকল মুদ্রিত সংস্করণে নিয়মিতভাবেই শুধুমাত্র দেশের শিল্প, সাহিত্য, ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে আরো নিবিড়ভাবে তুলে ধরার জন্য বিশেষ ধরন, বিশেষ বিভাগ, বিশেষ ধারা অথবা বিশেষ বিষয় নিয়ে লেখা প্রকাশ করার সূচনা করতে চায়।
লেখক, পাঠক এবং অনুপ্রাণনের সম্পাদনা পরিষদের সেই চাওয়া থেকেই ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের একাদশ বর্ষের প্রথম সংখ্যাটি নির্বাচিত কবি ও কবিতা সংখ্যা- প্রথম পর্ব হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এই সংখ্যাটিতে বাংলাদেশের ২৭ জন নির্বাচিত কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য কবিতা এবং আলোচনা প্রকাশিত হয়ছে। বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রবীণ ও তরুণ কবিদের নিয়ে এই ধরনের লেখা ও আলোচনা নিয়ে আরো কয়েকটি পর্ব প্রকাশিত হবে বলে আমরা আশা করি।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবিদের জীবনী ও সাহিত্য কর্ম নিয়ে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিকের কয়েকটি পর্বের এই আয়োজনগুলোর মধ্য দিয়ে আশা করি আমাদের দেশের তরুণ সমাজ বাংলাদেশের কবিদের কবিতার সাথে সুপরিচিত হবেন এবং আমাদের দেশের সম্মানিত এই কবিদের কবিতা নিয়ে আলাপ, আলোচনা এবং আড্ডার অনুষ্ঠানের আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের শিল্প ও সাহিত্য চর্চার বৃত্তটিকে প্রসারিত করতে পারবেন।
অনুপ্রাণন ১১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা
অনুপ্রাণন ১০ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা
অনুপ্রাণনের চড়াই উৎরাই-
তরুণ লেখকদের শিল্প ও সাহিত্য চর্চার একটি মঞ্চ বা জমিন নির্মাণ করার কাজের অঙ্গীকার নিয়েই শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, যাত্রার সূচনা করেছিল। আজ দশ বছর পরে এসে যদি এই প্রশ্ন নিয়ে ফিরে তাকাই যে, এই অঙ্গীকার পূরণে অনুপ্রাণন কতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছে? অথবা, যদি প্রশ্ন রাখা যায় যে নবীন ও তরুণদের শিল্প-সাহিত্যের চর্চার ক্ষেত্রে অনুপ্রাণনের মঞ্চ বা জমিনটাই বা কতটুকু প্রসারিত? প্রশ্নের জবাবে অনুপ্রাণনের সফলতা ও ব্যর্থতার একটা প্রতিবেদন হয়তো দেয়া যাবে কিন্তু সে চিত্রটিকে আমাদের সমাজের সামগ্রিক প্রেক্ষিত ও সেটার সাথে সম্পর্কিত মানবিক বোধের ধারায় শিল্প-সাহিত্যের চর্চার বাস্তব পরিধি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।
ব্যক্তিক প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে গড়ে উঠে সংগঠন এবং সুগঠিত সাংগঠনিক চেষ্টার মধ্য দিয়ে বস্তুগত শর্ত ও পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। যে শর্ত ও পরিবেশের উপর ভিত্তি করে ভৌত উন্নয়নের পাশাপাশি জনগোষ্ঠীর সৃজনশীল মন, মনন, উদ্ভাবন-মনস্কতা, নান্দনিক ও মানবিক বোধ জাগ্রত হতে পারে এবং সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি অর্জন করা যেতে পারে। তাই, এই লক্ষ্য অর্জনের পথে যৎসামান্য অবদান হিসেবে অনুপ্রাণনের উদ্যোগে পরিচালিত সৃজনশীল শিল্প-সাহিত্য চর্চার কাজে আমাদের ব্যক্তিক ও সাংগঠনিক প্রচেষ্টা কতটুকু কার্যকর ছিল সেই মূল্যায়নের ভার অনুপ্রাণনের বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের হাতে। এই বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনার দ্বার সবসময় উন্মুক্ত থেকেছে।
বিগত প্রায় দশ বছরের ইতিহাসে অনুপ্রাণনের সম্পাদনা পরিষদ নানা ভাঙ্গা গড়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, যার ফলে প্রচেষ্টার প্রত্যাশিত গমনপথ ও গতিতে পরিবর্তন হয়েছে। অর্থাৎ অনুপ্রাণনের চলার পথ মসৃণ ছিল না। চড়াই, উৎরাই, অথবা কখনো বন্ধুর পথ অতিক্রম করেই অনুপ্রাণনকে অগ্রসর হতে হয়েছে।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন এ-৪ সাইজের ১৬০টি পৃষ্ঠা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। ছাপার পূর্ববর্তী কাজ, কাগজ ও প্রেসের খরচ প্রতিটির বিনিময় মূল্য ৳ ১৫০/- দিয়ে হিসাব করলে পুরোটা খরচ উঠে আসে না। কর্পোরেট হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকার জন্য অনুপ্রাণন, বিজ্ঞাপন সংগ্রহ ও তা প্রকাশ করে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় নি। প্রথম থেকেই অনুপ্রাণনের সম্পাদকেরা কোন সম্মানী ছাড়াই একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। লেখকেরাও কোন সম্মানী ছাড়াই লেখা দিচ্ছেন। ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনুপ্রাণনের বিনিময় মূল্য বৃদ্ধি করার প্রস্তাব জোরালো যুক্তি নিয়ে সামনে চলে আসছে। কিন্তু, অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক পত্রিকার বিনিময় মূল্য বাড়ালে পাঠকের উপর যে বাড়তি চাপ পরবে এই বিষয়েও অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদ সচেতন রয়েছে।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন ১০ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা
অনুপ্রাণন ১০ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ১০ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা



















