অনুপ্রাণন পঞ্চদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা – সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা (চতুর্থ পর্ব)
সম্পাদকীয়- অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক, পঞ্চদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা : সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা (চতুর্থ পর্ব)
অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিক কালের ১০০ গল্পকারকে নিয়ে চতুর্দশ/পঞ্চদশ বর্ষের বিশেষ আয়োজনের পারম্পরিক ধারাবাহিকতার চতুর্থ পর্বে এসে আরও ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে প্রকাশিত হলো সাম্প্রতিকের (জন্ম : ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫) গল্প ও গল্পকার সংখ্যা, চতুর্থ পর্ব। সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার ১ম, ২য় ও ৩য় পর্বের মতো এই পর্ব অর্থাৎ চতুর্থ পর্বে ২৫ জন গল্পকারের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা প্রকাশের মাধ্যমে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন নির্বাচিত ১০০ গল্পকারকে নিয়ে তথ্য ও আলোচনাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ প্রকাশের কাজ সম্পন্ন হলো।
সাম্প্রতিকের ১০০ নির্বাচিত গল্পকারদের রচিত গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখা গেছে যে একবিংশ শতাব্দীতে এসে সাম্প্রতিকের গল্পকারদের অনেকেই বেশ কিছু নিরীক্ষাধর্মী গল্প লিখছেন। নিরীক্ষাধর্মী অথবা পরীক্ষামূলক গল্প বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমেই বলা যেতে পারে, পরীক্ষামূলক ছোটগল্প হলো একটি অনন্য সাহিত্যিক রূপ যা ঐতিহ্যবাহী গল্প বলার কাঠামো থেকে আলাদা, প্রায়শই অরৈখিক প্লট এবং অপ্রচলিত আখ্যান কৌশল গ্রহণ করেছে। প্রচলিত ছোটগল্প নির্মাণ কৌশলকে ফ্রিট্যাগ পিরামিডের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। ফ্রিট্যাগ পিরামিড (Freytag Pyramid) হলো নাটক বা গল্পের কাহিনীবিন্যাসের একটি কাঠামোগত মডেল, যা ঊনবিংশ শতাব্দীতে জার্মান নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক গুস্তাভ ফ্রিট্যাগ (Gustav Freytag) তৈরি করেছিলেন। এটি মূলত ট্র্যাজেডি বা নাটকের কাহিনীকে পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করে একটি পিরামিড আকৃতিতে উপস্থাপন করে, যা ‘ড্রামাটিক আর্ট’ বা নাট্যরীতি নামেও পরিচিত। প্রচলিত ছোটগল্পসমূহের কাঠামো উপাদানগুলোর ক্রম বিন্যাস প্রক্রিয়ার দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা পাই- ১. সূচনা অর্থাৎ কাহিনীর শুরুতে চরিত্র, পরিবেশ এবং প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়; ২. উত্থান ক্রিয়া অর্থাৎ যেখানে গল্পের মূল সংঘাত বা দ্বন্দ্বের সূচনা হয় এবং একই সাথে ঔৎসুক্য ও উত্তেজনা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে; ৩. চূড়ান্ত পরিণতি অর্থাৎ এটি গল্পের সবচেয়ে উত্তেজনাকর এবং মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া বিন্দু; ৪. পতন ক্রিয়া অর্থাৎ চূড়ান্ত পরিণতি বা ক্লাইম্যাক্সের পর দ্বন্দ্ব প্রক্রিয়া যা ক্রমে সমস্যা সমাধানের দিকে এগোতে থাকে; এবং ৫. সমাধান অর্থাৎ গল্পের সমাপ্তি, যেখানে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় এবং দ্বন্দ্ব চূড়ান্তভাবে মিটে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিকের নিরীক্ষাধর্মী গল্পগুলোতে প্রচলিত উপাদানগুলোর সবগুলোর উপস্থিতি নাও থাকতে পারে বা প্রচলিত ক্রমবিন্যাস পদ্ধতি অনুসরণ নাও করে থাকতে পারে। অর্থাৎ প্রচলিত রৈখিক গল্পের বদলে খণ্ডিত বা বৃত্তাকার বর্ণনারীতি ব্যবহার করা হতে পারে। বাংলা নিরীক্ষাধর্মী গল্প কেবল কাহিনী বলা নয়, বরং অভিজ্ঞতার নতুনতর প্রকাশ। এই ধারার গল্পসমূহ পাঠককে সক্রিয়ভাবে অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজে নিতে বাধ্য করে এবং নানাভাবে সাহিত্যকে নতুন ভাষিক ও শৈল্পিক উচ্চতা প্রদানে সফল করে তুলেছে। উপভাষার ব্যবহার, কাব্যিক ভাষা বা ভাঙা গদ্যের প্রয়োগ; চরিত্রের অবচেতন মনের জগতকে কাব্যিকভাবে খণ্ড খণ্ড তুলে ধরা; বাস্তব ঘটনার সাথে অলৌকিক বা অদ্ভুত উপাদান মিশিয়ে গল্প বলা; বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, পরাবাস্তববাদ এবং মেটা-ফিকশন ব্যবহার করে সাম্প্রতিকের গল্পকারেরা গল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন। এছাড়াও সমকালীন নিরীক্ষাধর্মী গল্পে রূপক ও অদ্ভুত সব চরিত্রের মাধ্যমে সামাজিক সহিংসতা ও বিচ্ছিন্নতা, সমকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, দাম্পত্য ও নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নিয়ে নতুন নিরীক্ষা পাওয়া যায়।
সাহিত্যে যুদ্ধ ও সংঘাত মানব অভিজ্ঞতার এক অবিচ্ছেদ্য প্রতিফলন। যেখানে আমরা যুদ্ধের ভয়াবহতা, বীরত্ব, মানবিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক জটিলতা, নানামুখী আবেগ ও মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রামকে দেখতে পাই। যুদ্ধ-সাহিত্য একদিকে যেমন ধ্বংসের চিত্র আঁকে, অন্যদিকে শান্তির আকাঙ্ক্ষা ও মানবিক দৃঢ়তা ফুটিয়ে তোলে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এমন একটি ঘটনা যে ঘটনার চিহ্ন বাংলাদেশের সমসাময়িক সাহিত্যিকদের কাজেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত অগণিত কবিতা, গল্প ও উপন্যাসে পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার, মানবিক বিপর্যয় ও সামাজিক সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে। একবিংশ শতাব্দীর বাংলা গল্পে যুদ্ধ ও সংঘাত সরাসরি ময়দানের চেয়ে ব্যক্তিমানস, মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত, উদ্বাস্তু জীবন, এবং নব্য-বাস্তববাদের আলোকে চিত্রিত হয়েছে। ১৯৭১-এর যুদ্ধস্মৃতি, সমকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশ্বায়নজনিত সংঘাত, এবং ধর্মীয় বা সামাজিক বিভেদ এই সময়ের গল্পগুলোতে গুরুত্ব পেয়েছে। তবে পোস্টমডার্ন বিদ্রূপের বদলে মানবিক দায়বদ্ধতা এখানে মুখ্য হতে দেখা গেছে।
বাংলাদেশের সমকালীন গল্পে পরিবেশ সচেতনতা কেবল নিসর্গ বর্ণনা নয়, বরং বাস্তুসংস্থান ও মানুষের অস্তিত্বের সংকটের এক গভীর আখ্যান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সমসাময়িক লেখকদের কলমে জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল, এবং নগরায়ণের কুফল স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন সংগ্রাম, লোনা পানির আগ্রাসন এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগের শিকার মানুষের গল্প এখন ছোটগল্পের অন্যতম প্রধান উপজীব্য হয়ে উঠতে দেখা গেছে। তাদের গল্পে নদী দখল, বালু উত্তোলন ও জলাভূমি ভরাট করে আবাসন নির্মাণের মাধ্যমে যে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে, তার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা রয়েছে। শহরের বদ্ধ জীবন, ইট-পাথরের দেয়াল আর দূষিত বায়ুর বিপরীতে সবুজের আকাক্সক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ভয়াবহতা বারবার ফিরে এসেছে। মানুষের সীমাহীন লোভের কারণে প্রকৃতি কীভাবে রূঢ় হয়ে উঠছে এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবন কীভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে, তা ছোটগল্পের ভাষায় মূর্ত হয়ে উঠতে দেখা গেছে। মূলত বাংলাদেশের সমকালীন গল্পকাররা তাদের লেখায় পরিবেশবাদী সাহিত্যপাঠ বা ইকোক্রিটিসিজম (Echocriticism) চর্চার মাধ্যমে পাঠকদের মনে পরিবেশ রক্ষার তাগিদ সৃষ্টি করার প্রয়াস গ্রহণ করেছেন।
Quarterly Anupranan - Year- 15 Issue- 1; Contemporary Stories & Storytellers (Part-4)
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা – সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা (তৃতীয় পর্ব)
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা : সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা তৃতীয় পর্ব- সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিক কালের ১০০ গল্পকারকে নিয়ে চতুর্দশ বর্ষের বিশেষ আয়োজনের পারম্পরিক ধারাবাহিকতার তৃতীয় পর্বে এসে আরও ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে প্রকাশিত হলো সাম্প্রতিকের (জন্ম : ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫) গল্প ও গল্পকার সংখ্যা, তৃতীয় পর্ব। সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার ১ম ও ২য় পর্বের মতো এই পর্ব অর্থাৎ ৩য় পর্বে ২৫ জন গল্পকারের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা প্রকাশের মাধ্যমে নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে এ-পর্যন্ত মোট ৭৫ জন গল্পকারকে নিয়ে তথ্য ও আলোচনাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ প্রকাশের কাজ সম্পন্ন হলো। অবশিষ্ট ২৫ জন গল্পকারদের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা আগামী চতুর্থ পর্বে প্রকাশিত হবে বলে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব নির্মাণের মূল উপাদান হচ্ছে, সময় ও মানুষ। মানুষের চেতনাজাত রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম ও ভৌত প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রভাবিত সমাজ ও সংস্কৃতির বিচার ও বয়ান। গত চার বছর ধরে অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক শিল্প-সাহিত্য ম্যাগাজিনে গত শতাব্দীর প্রথম থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিকদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা প্রবন্ধসমূহ সংকলিত করে যে সহায়ক সাহিত্যসম্পদ প্রস্তুত করা হচ্ছে সে-সকল সহায়ক সম্পদ বা উৎস ব্যবহার করে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গবেষণা হতে পারে। সেই গবেষণার একটি হতে পারে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের সমাজতত্ত্বের বস্তুনিষ্ঠ বয়ান।
আমরা এটা অধ্যয়ন করতে পারি- বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য কীভাবে সমাজ থেকে উদ্ভূত হলো, কী কী বৈশিষ্ট্য ধারণ করল, কীভাবে সাহিত্যে সমাজের প্রতিফলন ঘটাল এবং পাশাপাশি সমাজের ওপর সাহিত্য কী প্রভাব ফেলল? সাহিত্যে, ক্ষমতা, প্রতিযোগিতা ও সামাজিক কাঠামো কীভাবে কাজ করেছিল বা করে যাচ্ছে? এসব অধ্যয়ন থেকে হয়তো আমরা পেতে পারি এই তথ্য যে বাংলা দীর্ঘদিন উপনিবেশ থেকেছে। উপনিবেশ থাকাকালে ভিনদেশি শাসকের রাজনীতি, অর্থনীতির প্রভাবে পড়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির যেমন রূপান্তর ঘটেছে তেমনি বিকৃতিও ঘটেছে। ভিনদেশি উপনিবেশবাদী শক্তির প্রভাবের ফলে বাঙালির মননে এক গভীর আত্মপরিচয় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আর যখনই এই উপনিবেশবাদী মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে ভাষা, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে বাংলার মাটি ও পরিবেশজাত নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ধারায় নিয়ে এসে মুক্তচর্চা করার চেষ্টা বাঙালি করেছে তখনই ঔপনিবেশিক ধারার পৃষ্ঠপোষক ও কট্টরপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীর দিক থেকে আঘাত ও আক্রমণ এসেছে।
এই বিষয় ছাড়াও আমাদের অধ্যয়ন অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হতে পারে। যেমন, সমসাময়িক ছোটগল্পের আলোচনায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- গল্পকারেরা তাদের গল্পে কীভাবে সীমিত স্থান ব্যবহার করে পরিচয়, বিচ্ছিন্নতা, মনস্তাত্ত্বিক বাস্তববাদ এবং সামাজিক বিষয়গুলো (জাতি, শ্রেণি, ভোগবাদ) গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন। তাছাড়াও এই বিষয়েও আলোকপাত করা যেতে পারে যে কীভাবে প্রাণবন্ত চরিত্র, প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রাঞ্জল বর্ণনায় আধুনিক জটিলতাগুলো প্রতিফলিত করার জন্য বিভিন্ন শৈলী (ব্যঙ্গ, ভৌতিক, জাদুকরী বাস্তববাদ) ব্যবহার করা হয়েছে। আলোচনা ও অধ্যয়নে উঠে আসতে পারে যে কোনো কোনো সমালোচক সাম্প্রতিক রচিত গদ্যভাষায় নীরসতা বা অতি-সরলীকরণের প্রবণতার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দ্রুত পড়ে ফেলার উপযোগী করে রচনা করার বাইরে এসে ফর্ম এবং থিমকে আরও গভীরভাবে জড়িত করার প্রত্যাশা করেছেন। কোনো কোনো আলোচক কেবল গল্পের সারাংশে সীমাবদ্ধ না থেকে তার বাইরে গিয়ে গল্পের অর্থ প্রকাশে প্লট, চরিত্র, থিম এবং সাহিত্য কৌশলের (প্রতীকীকরণ, চিত্রকল্প) মতো উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে গল্পের অর্থ প্রকাশে তাদের কার্যকারিতা যথাযথ মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন।
অধ্যয়নে তুলে ধরা যেতে পারে যে সাহিত্য আলোচনাগুলো প্রস্তুত করতে গিয়ে বিশেষ করে চারটি বিষয়ের দিকে গভীর দৃষ্টি প্রদান করার প্রয়োজন হয়েছে। প্রথমেই এসেছে পরিচয় এবং অন্তর্ভুক্তি বোধের মতো বিষয়গুলো। যেমন সাংস্কৃতিক স্থানচ্যুতি, অভিবাসী মনস্তত্ব ও অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বায়িত বিশ্বে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত অথবা জাতীয় আত্ম-অনুসন্ধান। দ্বিতীয়ত, চরিত্র রূপসমূহের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। যেমন, বাস্তব ঘটনাসমূহের সাক্ষাৎ ব্যাখ্যা অথবা স্বগত ও বহুপাক্ষিক সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রগুলোর মনের অভ্যন্তরের জটিল ও অন্ধকার জগৎ উন্মোচন করা। তৃতীয়ত, গল্পের সামাজিক ভাষ্য অর্থাৎ ভোগবাদ, রাজনীতি, জাতি এবং শ্রেণি বিভাজনের সমালোচনা করার জন্য ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ও অ্যাবসার্ডবাদ ব্যবহার করা। এবং চতুর্থত, রূপ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা অর্থাৎ অনন্য কাঠামো, বিভিন্ন অথবা বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গি (উত্তর-ঔপনিবেশিক, নারীবাদী ইত্যাদী) ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, ফ্যান্টাসি এবং জাদুকরী বাস্তবতার মতো ধারাগুলোর সাথে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে ছোটগল্পের আধুনিক বিভাজন বৈশিষ্ট্য আয়ত্তে নিয়ে আসা। কেউ কেউ এটাও মনে করেছেন যে সমসাময়িক গল্পগুলো সংকীর্ণ জনতাত্ত্বিক বা উপরে ভাসা বিষয়গুলোর উপর খুব বেশি কেন্দ্রীভূত হতে দেখা গেছে। তাছাড়া দ্রুত, সহজে হজমযোগ্য গল্পের বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে গভীর, জটিল অভিজ্ঞতা প্রদানের জন্য প্রস্তুত প্রকৃত শৈল্পিক সম্ভাবনাময় গল্পের চাহিদার ক্ষেত্রে ভাটা সৃষ্টি করে থাকতে পারে। সত্যিকার অর্থে উদ্ভাবন না করে নির্দিষ্ট ‘ধরনের’ (যেমন, অকার্যকর পরিবার, সমাজবিচ্ছিন্ন যুবক) উপর খুব বেশি নির্ভরশীল গল্পগুলো একঘেয়েমির উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শিল্প-সাহিত্য মানুষকে ধ্বংস নয় সৃজনশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। গভীর অনুভূতি, বোধ ও সংযোগের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যা ভাষাগত সীমানা ছাড়িয়ে মানুষে মানুষে, সংস্কৃতিতে সংস্কৃতিতে মেলবন্ধন ঘটায়। ব্যক্তি ও সমাজকে সৌন্দর্য, আনন্দ, দুঃখ, প্রেম, বেদনা ও জীবনের গভীরে নিয়ে যায়, যা তাকে আত্ম-অনুসন্ধান ও বিশ্বকে নতুনভাবে উপলব্ধিতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যচর্চা সকল প্রকার সংরক্ষণবাদ মুক্ত হয়ে মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন চেতনাবোধ অব্যহতভাবে ধারণ করে যাবে। সংরক্ষণবাদ মুক্ত মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন এই চেতনাবোধ থেকে বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্যচর্চা বিচ্ছিন্ন করার সকল অপচেষ্টা বাংলাদেশের কবি, গল্পকার, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকেরা মিলিতভাবে রুখে দেবে এটাই বাস্তব।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 4; Contemporary Stories & Storytellers (Part-3)



