অতীতের আলপনা – সুরঞ্জনা মায়া
মানুষের জীবন কি কেবল কতগুলো বছরের সমষ্টি, নাকি সে এক পলল ভূমি? যেখানে জমে থাকে ইতিহাসের পলিমাটি, শৈশবের মায়া আর ঘ্রাণমাখা সব স্মৃতি? ‘অতীতের আলপনা’ বইটিতে সুরঞ্জনা মায়া তাঁর স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেছেন ঠিক সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে।
এটি কেবল এক ব্যক্তির আত্মজীবনী নয়, এটি একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলির এক অনন্য সামাজিক দলিল। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে শুরু করে সুরমা পাড়ের হাড়কাঁপানো শীত, কিংবা বীরাঙ্গনা মায়েদের দীর্ঘশ্বাস আর যুদ্ধশিশুদের বিদেশের মাটিতে শেকড় সন্ধানের যে হাহাকার- লেখিকার কলমে তা যেন এক একটি জীবন্ত চিত্রপট হয়ে ধরা দিয়েছে। ইতিহাসের সেই বিশাল ক্যানভাসে তিনি খুব নিপুণভাবে এঁকেছেন নিজের যাপিত জীবনকে। যেখানে ময়মনসিংহের কৈশোরের বন্ধুদের সাথে কাটানো রোদেলা দুপুর আছে, আছে সিলেটের সেই আসাম টাইপ বাংলোর বারান্দা, আর আছে সুরমা তীরের সেই মায়াভরা দিনগুলো।
এই বইটির অনন্যতা এর ডিটেইলিং-এ। লেখিকা যেভাবে সেই সময়ের রেশনিং ব্যবস্থার বিস্বাদ চাল, চর্বি ভাজা পিঠা কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের সেই অকৃত্রিম আতিথেয়তার স্বাদ বর্ণনায় এনেছেন, তা পাঠককে এক নস্টালজিক ভ্রমণে নিয়ে যাবে। বড়োদের ভুল বোঝাবুঝিতে কিশোরী মনের সেই ‘বাজে মেয়ে’ অপবাদ থেকে শুরু করে তেত্রিশ বছর পর বন্ধুর সাথে সেই অমীমাংসিত দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার যে দর্শন- তা আমাদের শিখিয়ে দেয় ক্ষমা আর ভালোবাসার শক্তি।
নাতনিদের কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে লেখা এই বইটি আসলে আমাদের ফেলে আসা সেই সময়ের প্রতিচ্ছবি। যারা ইতিহাসকে শুকনো তথ্যের বাইরে রক্ত-মাংসের আবেগ দিয়ে অনুভব করতে চান, তাঁদের জন্য ‘অতীতের আলপনা’ এক অনিবার্য পাঠ। এক জীবনের আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আর দেশপ্রেমের এই আলপনা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী দাগ কাটবে।
Otiter Alpona - Suranjona Maya

