অনুপ্রাণন পঞ্চদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা – বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রে যুদ্ধ ও সংঘাত (দ্বিতীয় পর্ব)
অনুপ্রাণন পঞ্চদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রে যুদ্ধ ও সংঘাত (দ্বিতীয় পর্ব) – সম্পাদকীয়-
মধ্যযুগের বাংলা গীতিকবিতা, পদ্য, সুর ও সঙ্গীত সাধারণ বাঙালিকে তার ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছিল। বস্তুত বিকশিত এই সাংস্কৃতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল। যদিও আধুনিক অর্থে ‘জাতীয়তাবাদ’ ধারণার জন্ম তখনো হয়নি, তবে সঙ্গীতই প্রথম বাঙালিকে একটি অভিন্ন ভাষিক, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিক পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে শিখিয়েছিল। মধ্যযুগের ঠিক প্রাক্কালে রচিত চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধন সঙ্গীত। এটিই প্রথম প্রমাণ করে যে, বাংলা ভাষা উচ্চমার্গের আধ্যাত্মিক ও শৈল্পিক ভাব প্রকাশের উপযুক্ত। চর্যাপদের গীতিগুলোতে তৎকালীন বাংলার নদী, নৌকা, শবর-শবরীদের জীবনযাত্রা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ফুটে উঠেছে, যা বাঙালির নিজস্ব ভৌগোলিক সত্তাকে প্রথম আকার দেয়। চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি ও জ্ঞানদাসের বৈষ্ণব পদাবলী জাত-পাত এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠার গান গেয়েছে। চণ্ডীদাসের অমর বাণী—”সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”—বাঙালিকে প্রথম চরম মানবতাবাদের পাঠ দেয়। শ্রী চৈতন্যদেবের সংকীর্তন আন্দোলন সঙ্গীতকে প্রাসাদের চার দেয়াল থেকে বের করে সাধারণ মানুষের মাঝে নিয়ে আসে। এই সাম্যবাদী চেতনা পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান ভিত্তি (ধর্মনিরপেক্ষতা) হয়ে দাঁড়ায়। মনসামঙ্গল বা চণ্ডীমঙ্গলের গানগুলোতে আর্য দেবতাদের পরিবর্তে বাংলার নিজস্ব লৌকিক দেব-দেবীর আরাধনা করা হতো। এই সঙ্গীতগুলোতে কোনো স্বর্গীয় দেবরাজ্যের কথা ছিল না, বরং ছিল বাংলার সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য, ঝড়-ঝঞ্ঝা এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প। এটি বাঙালির নিজস্ব স্বাজাত্যবোধ ও আত্মপরিচয়কে তীব্র করে তোলে। নাথ গীতি, ময়নামতীর গান এবং পরবর্তী সময়ে লালন শাহ ও অন্যান্য বাউলদের গান ছিল সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মবিরোধী। এই সঙ্গীতধারা হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছিল। বাঙালি যে ধর্মের চেয়েও বড় একটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, এই বোধ বাউল ও সুফি সঙ্গীতের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি সুসংহত হয়। নদীমাতৃক বাংলার মাঝিদের ভাটিয়ালি গান বা উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া গান ছিল একান্তই মাটির গান। এই সুরগুলো কোনো কৃত্রিম রাজকীয় প্রভাবে তৈরি হয়নি। এগুলো বাঙালির অবচেতন মনে একটি অভিন্ন “সাংস্কৃতিক স্বদেশ” গড়ে তুলেছিল। মধ্যযুগের সঙ্গীত বাঙালিকে তার ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছিল। এই সাংস্কৃতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল।
মধ্য ও আধুনিক যূগে বাঙ্গালীর জাতীয়তাবাদী সংগ্রামী চেতনা গঠনে গীত-কবিতা চর্চা ও সঙ্গীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মধ্যযুগের সাহিত্য মূলত ছিল দেব-দেবী বা ধর্মকেন্দ্রিক (যেমন: মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী)। তবে এই যুগেই প্রথম বাঙালি নিজের ভাষা ও ভূখণ্ডের প্রতি মমত্ববোধ প্রকাশ করতে শুরু করে, যা ছিল জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক ভিত্তি। সপ্তদশ শতকে যখন বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করা হতো, তখন কবি আব্দুল হাকিম তাঁর ‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় তীব্র ক্ষোভের সাথে লিখেছিলেন: “যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী / সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”
নিজের ভাষা ও দেশের প্রতি এই চরম আনুগত্যই পরবর্তীকালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান স্তম্ভ (ভাষাকেন্দ্রীক জাতীয়তাবাদ) হয়ে ওঠে। ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভাঙার প্রয়াসে আধুনিক যুগে তীব্র স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী কবিতার জন্ম হয়। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’-এ পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রথম জোরালো সুর তোলেন: “স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, / কে বাঁচিতে চায়? / দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, / কে পরিবে পায়?” মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর সনেট এবং মেঘনাদবধ কাব্যের মাধ্যমে বাঙালির ভেতর আত্মমর্যাদাবোধ ও বীরত্বের চেতনা জাগিয়ে তোলেন। তাঁর ‘কপোতাক্ষ নদ’ সনেটে বিদেশের মাটিতে বসেও স্বদেশের প্রতি যে আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা বাঙালিকে নিজের মাটির প্রতি টান অনুভব করতে শিখিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অসংখ্য কবিতা ও গীতিকবিতার (গান) মাধ্যমে বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলেন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তাঁর রচিত গীতকবিতাগুলো রাস্তায় রাস্তায় গেয়ে বাঙালিরা বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তাঁর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি বাঙালির জাতীয় ঐক্য ও আবেগের চিরন্তন প্রতীক হয়ে ওঠে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বিদ্রোহী’, ‘ভাঙার গান’ ও ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এর মতো কবিতা ও গানের মাধ্যমে বাঙালিকে সরাসরি সশস্ত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুপ্রেরণা দেন। তিনি ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন।ষাটের দশকে পাকিস্তানি নিপীড়নের বিরুদ্ধে শামসুর রাহমান তাঁর ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ বা ‘আসাদের শার্ট’ কবিতার মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেন। আল মাহমুদ, সুকান্ত ভট্টাচার্য (রবীন্দ্রোত্তর পর্বে), এবং নির্মলেন্দু গুণ-এর কবিতা বাঙালিকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গোবিন্দ হালদারের ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ বা ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’—এই গীতকবিতাগুলো রণক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের ও অবরুদ্ধ দেশবাসীকে মানসিকভাবে বাঁচিয়ে রেখেছিল এবং চূড়ান্ত বিজয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মধ্যযুগের কবিতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে সুপ্ত আত্মপরিচয় শুরু হয়েছিল, আধুনিক যুগে এসে তা তীব্র ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী এবং পরবর্তীতে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র (বাংলাদেশ) গঠনের প্রধান সাংস্কৃতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়।
Quarterly Anupranan Year- 15 Issue- 3 : War and Conflict in Art, Leterature and Movies of Bangladesh (2nd part)
কবিতার গৃহস্থালি – ডালিয়া চৌধুরী
সবুজ গালিচায় বসে আছে দুজন
দু-দিকে মুখ করে
মধ্যিখানে গাঢ় সবুজ রয়ে যায় স্পর্শহীন,
বুকের ভেতর উথাল-পাথাল ঢেউ
রাজ্যের বিষণ্নতা।
দুজনের পথে ছড়িয়ে আছে ফণীমনসার কাঁটা
রোদ শাদা কপোতের সতর্কবাণী
ধ্রুব নক্ষত্র ঝরা রাতের অনিদ্র গতিরেখা।
ঘাসবনে শালিক জোড়ার কথোপকথনে
প্রজাপতি প্রদক্ষিণ করে সবুজ বেষ্টনী,
বাতাসে ভেসে আসা প্রণয় প্রতিস্বরে
দুজনে নদী অববাহিকায় ভেসে যেতে উদগ্রীব,
স্বপ্ন স্রোতের অনুকূলে, অথচ
প্রতিকূল স্রোত থেকে দীর্ঘশ্বাস নেয়।
শীতল দাঁড় টানা নাবিকের মতো
পাড়ি দিতে থাকে কুয়াশার উপকূল।
দুজন শুনতে থাকে মেঘের সংগীত,
তীব্র বর্ণিল বর্ষণে ভেসে যাওয়ার অপেক্ষায়
নোঙর ফেলে মহাকালের সমুদ্রে।
Kobitar Grihosthali
জলসন্ধি – সানজিদা সিদ্দিকা
ফুল হতে ফলে পরিণত হওয়ার জন্য প্রয়োজন পরাগায়নের। তাতে সাহায্য করে পাখি, বাতাস, ভ্রমর, প্রজাপতি প্রভৃতি। তেমনি কবির অন্তর্নিহিত ভাবকে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে কবিতা। আবার কবির ভাবকে নিজের ভাবের সাথে মিলিয়ে পাঠ করেন পাঠক। অতএব, বইয়ের অন্দরের কবিতা পড়ে পাঠক অন্তরে যা অনুভব করবেন তা-ই হলো জলসন্ধি-র নির্যাস। সেই নির্যাস আস্বাদন করতে কবির আহ্বান—পড়ুন পাঠক, কবির নামে।
Jolsondhi - Sanjida Siddiqua
অবসরভাতা ও বিবিধ দায়ভার – মাহবুব আলী
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত শিক্ষকদের জন্য অবসরকালীন সময়ে নিয়মিত মাসিক পেনশন পদ্ধতি নেই। শিক্ষকগণ সরকারি অনুদান বা তাঁদের বেতন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অঙ্কের সঞ্চয় করেন, সেই সঞ্চয়ে সরকারের অংশ রয়েছে। চাকরি শেষে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ সেই অর্থ এককালীন পেয়ে থাকেন; তার একটি কল্যাণ ট্রাস্ট তহবিল ও অন্যটি অবসরভাতা। এই অর্থ শিক্ষকের হাতে পৌঁছাতে-পৌঁছাতে তিন-সাড়ে তিন কিংবা চার বছর লেগে যায়। এই সময়টুকু অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষার। কোনো কোনো শিক্ষক এই সময়ের বিন্দু বিন্দু মুহূর্ত গুনতে গুনতে পরপারে চলে যান। এমনই কষ্টকর অপেক্ষা, বেঁচে থাকার ক্লেশ ও অপমানের কাহিনি নিয়ে ‘অবসরভাতা ও বিবিধ দায়ভার’। একইসঙ্গে যোগ হয়েছে মানুষের জীবনযাপনের আকুলতা-স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ-বাস্তব-পরাবাস্তব-বঞ্চনা ও মানবিকতার পরিসরে চেনা-অচেনা অন্য কয়েকটি কাহিনি। সেই সকল কাহিনি বা গল্পের তেপান্তরে হারিয়ে যেতে স্বাগতম।
Oboshorvata O Bibidho Dayvar - Mahbub Ali
সমুদ্রলতা ও অন্যান্য গল্প – রুখসানা কাজল
নব্বই দশক থেকে রুখসানার লেখালিখির শুরু। খুব কম লিখেই বিদগ্ধ পাঠকদের কাছে তিনি কিছু প্রত্যাশা সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছেন। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বেশ কয়েকটি বই। অনুবাদ করেছেন, আফগানিস্তানের নারী লেখকদের লেখা নিয়ে একটি গল্পগ্রন্থ। রুখসানার সাহিত্যকর্মের মৌলিক প্রবণতা হল তাঁর চেনাজানা জগতকে চারমাত্রা থেকে( ফোর ডাইমেনশন) দেখে একটি পরোক্ষ প্রতিবাদ ছুঁড়ে দেওয়া। ঘটনা বর্ণনা করে গভীর তল্লাসি চালিয়ে যেন তিনি খুঁজে আনেন চরিত্রগুলোর বিভিন্ন আবর্তন। এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলোর ক্ষেত্রেও তাঁর সেই স্বতন্ত্র শিল্পধারা কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। গল্পগুলোতে রয়েছে বিচিত্র পটভূমি ও বহুবিধ অভিজ্ঞতা। রুখসানার গল্পের চরিত্ররা গ্রাম, মফস্বলি শহর ব্যস্ত মহানগরের গন্ডি ছাড়িয়ে আমেরিকা প্রবাসী আবার কখনও মরুভূমির কোনো যাযাবর গোষ্ঠীর জীবনযাপন করে। ‘জোহেবা’ গল্পটি মাতৃত্বের গৌরব ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানে একরোখা। ‘বিষমপদী’ গল্পে অন্তরার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর নিঃসঙ্গতার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। আবার ‘কেভ’ গল্পে বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশের পরিসরে থেকেও একজন স্বনির্ভর বাঙালী তরুণীর ধর্মের দড়ি ছিঁড়ে বেরুতে না পারার যন্ত্রণার পাশে খাদিজা গল্পের খাদিজার দ্বিধাহীন সিদ্ধান্ত গ্রহনের সক্ষমতা চোখে পড়ে। রুখসানার গল্পের ধনী গরীব নারীচরিত্রগুলো কেউই মূক নয়। সাদা চোখে রুখসানার নারীদের সামান্য মনে হলেও অসামান্যা নারী চরিত্র এঁকেছেন। সব মিলিয়ে এ ধরণের গল্প পাঠককে চেনাঅচেনা নারীদের নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। গল্পগুলো পড়ার পর পাঠকের হয়ত আরও একবার খুঁজে দেখতে মন চাইবে, কোথায় কোন গল্পের কোন পৃষ্ঠায় রুখসানা লিখেছেন, ‘বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কে কবে হারাতে পেরেছে নারীদের?
Samudralata O Anyanyo Golpo - Rukhsana Kazol
এই ঋণ শোধ হবে না – জোনাকী দত্ত
১৯৫২ থেকে ১৯৭১ আমরা বাঙালিরা চরম চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে পেয়েছি লাল-সবুজ পতাকা। বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামক দেশটি স্থান করে নিয়েছে সগৌরবে। যাঁদের নিঃস্বার্থ অবদানের জন্য আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি তাঁদের ঋণ কখনো শোধ হবার নয়। তাঁদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। আমার এই বইটি লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো গল্পের মাধ্যমে সেই মহান ব্যক্তিদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ঘটনা, ভাষা আন্দোলন, গণ আন্দোলন, পঁচিশে মার্চ, তাদের জন্য নির্মিত শহিদ মিনার, স্মৃতিসৌধ আরো নানান ঘটনা পাঠকের কাছে তুলে ধরা। আশা করছি ছোটো-বড়ো সকল পাঠকের গল্পগুলো ভালো লাগবে।
Ei Reen Shodh Hobe Na - Jonaki Dutta
মুক্তির মিছিল দেখবে বলে – আবু রেজা
‘মুক্তির মিছিল দেখবে বলে’ একটি ট্রিলজির সূচনাখণ্ড। দশটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই উপন্যাসে লেখক আবু রেজা মহান মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর সময়কে এক অনন্য কাঠমোয় রূপায়িত করেছেন। একটি পরিবারের শীর্ষকর্তা থেকে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য পর্যন্ত সবার আনন্দ-বেদনা, উদ্বাস্তু জীবন, অনিশ্চয়তা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে এক উত্তাল সময়ের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। এ আখ্যানের চরিত্রগুলোর যুদ্ধদিনের অভিজ্ঞতা পরিবারের ইতিহাস অতিক্রম করে স্বাধীনতাকামী জাতির আত্মত্যাগ, বেদনা ও মুক্তির অভিযাত্রার দলিলে পরিণত হয়েছে।
গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের অভিঘাত, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর নানান ঘটনা এবং বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আবেগঘন মুহূর্ত। শিশুমনের বিস্ময়, ভয়, কৌতূহল ও স্বপ্নের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে গেছে যুদ্ধদিনের নির্মম বাস্তবতা। এ আখ্যানের চরিত্রগুলোর প্রত্যক্ষ করা রক্তাক্ত দিনের স্মৃতি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে অতিক্রম করে জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।
এ উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য গ্রাম ও শহরের জীবনবাস্তবতার সমান্তরাল উপস্থাপন। যুদ্ধের প্রতিঘাতে উদ্বাস্তু হয়ে ছুটে বেড়ানো একটি পরিবারের জীবন, মৃত্যুভয়, জীবনসংকট, আপনজনের নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা সংযত অথচ হৃদয়স্পর্শী ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা, তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকারদের দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড যেমন উঠে এসেছে, বিপরীতে সেই অন্ধকার সময়ে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের ভূমিকাও গভীর মমতায় বিধৃত হয়েছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার প্রতি লেখকের অবস্থান সুদৃঢ়, স্পষ্ট ও আপসহীন। তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধ কেবল ইতিহাস নয়, জীবনবোধের ভিত্তি। তাই গ্রন্থের শেষে লেখক একটি প্রশ্ন রেখেছেন, যা পাঠককে ভাবিয়ে তুলবে—‘একাত্তরের যুদ্ধে শহীদ হয়েছে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ। আবার এই বছরে জন্মেছেও পঁয়ত্রিশ লক্ষের বেশি শিশু। মহৎপ্রাণের বিনিময়ে শিশুপ্রাণ। এই শিশুরা বড়ো হয়ে পারবে কি পূর্বপুরুষের মহত্ত্বের মূল্য দিতে?’ নিশ্চয়ই বর্তমান সময়ই এর উৎকৃষ্ট উত্তর।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার, ইতিহাসচেতনা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়বোধ নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে এই গ্রন্থ। তাই ‘মুক্তির মিছিল দেখবে বলে’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সময়ের নির্মোহ সত্যকে ধারণ করা এক অতুলনীয় সৃষ্টি। গ্রন্থটি সময়ের দলিল এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থমালায় একটি মূল্যবান সংযোজন।
সাইফুল ইসলাম
লোকগবেষক ও গীতিকবি
Muktir Michil Dekhbe Bole - Abu Reza
নরকের Wi-Fi ও কয়েকশ ভবিষ্যৎ – শারদুল সজল
নরক পৃথিবীর সংযোগে আছে
প্রতিটি মস্তিষ্ক এখন অনলাইনে
পাসওয়ার্ড বদলালেও
নরকের সিগন্যাল ঠিক থাকে
অপমান, ক্ষুধা, যুদ্ধ, হতাশা ও একাকিত্ব
যেন অস্তিত্বের ছেঁড়া স্নায়ু
যাকে সেলাই করে মানুষ দৌড়ায়…
আর ভবিষ্যৎ?
একটা নয়—কয়েকহাজার
প্রতিটি—
অন্য ১ পৃথিবী, অন্য ১ তুমি
অন্য ১ আমি, অন্য ১ শেষ
নরক কী পৃথিবীর বাইরে?
নাকি পৃথিবীই নরক?
এই প্রশ্নে সক্রেটিস নক্ষত্র সেদ্ধ করে
ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঢেলে দিল জন্ম ও মৃত্যুর
মধ্যকার দূরত্ব
আর জন্ম হলো—
(শূন্যস্থান পূরণ করুন, যার যা মনে হয়…)
Naroker Wi-Fi O Kayeksha Vobisshat - Shardul Sajal
অক্ষরবৃত্তের জলে নামি – মোস্তফা তারিকুল আহসান
জীবনকে প্রচল ভেবে নিতে পারি নি বলেই হয়তোবা আমার ধানের ক্ষেতে অসময়ে
আসে বানের জল; পাকা ধান ডুবে যায় তবু মাছ ধরার স্বপ্ন উকি দেয় স্বপ্নভুক মাতালের মতো
আমি বানান ভুল করা বালকের দলে সারাজীবন ভাঙা টিনের চালের স্কুলের ছাত্র, মাস্টার
মশাইয়ের পাঠে বুঁদ হয়ে শিখতে পারিনি পাণিনি পতঞ্জলি; প্রকৃতির পাঠশালায় বনমোরগের ডাক
অথবা ভোরের কুয়াশামাখা মাঠ আমাকে কতিপয় ঘাসের ব্যাকরণ শিখিয়েছে। এই পথ্য নিয়েই
আমার জীবন বাহিত হয়েছে যমুনা মেঘনার বহতায়; নদী পয়োপ্তির ঘরে আমার ঘাসের
ছোট্ট মাঠে প্রজাপতির ঝাঁক আমাকে কবিতা শেখাতো, পলিমাটির লবণ নিয়ে মাছেদের কাছে
Aksharbretter Jale Nami
কুড়িয়ে পাওয়া ছায়া – ইসরাত জাহান
কেউ কেউ নিরন্তন হেঁটে চলে। চলতে চলতে মুখোমুখি হয় অগুনতি মানুষের। যাদের ছায়া দীর্ঘ অথবা হ্রস্ব। ছায়া পেরিয়ে ঐসব মানুষের প্রকৃত নাগাল পাওয়ার চেষ্টাও থেমে থাকে না।
প্রাগৈতিহাসিকের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে সে-ই সন্ধান মানিক বন্দোপাধ্যায়ই হয়তো শুরু করেছিলেন। এরপর আরও অনেকেই ঐ পথ অনুসরণ করেছে। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে কখনও কখনও ছায়ার ওপারের মানুষকে অস্বীকারও করা হয়েছে। ঘোষিত হয়েছে, ‘থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার।’ অন্ধকারের ফ্রেমে যদিও এভাবেই তারা অবয়বহীন থেকেছে, তবু লীন হয়ে যায়নি।
‘কুড়িয়ে পাওয়া ছায়া’ সেইসব অবয়বহীন মানুষের গল্প, যেখানে গল্প নির্মাণে অন্ধকার মূখ্য হয়ে উঠলেও আলোকে অস্বীকার করা হয়নি।
Kuriye Pauya Chaya - Israt Jahan
স্ট্রিট ডকুমেন্টারি – শেখর সিরাজ
ঢাকা শহর কখনও ঘুমায় না। শুধু আলো নিভে গেলে তার আরেকটি মুখ দেখা যায়। একজন তরুণ লেখক ও নাট্যকর্মী আরমান রহমান, রাজনৈতিক মামলার পর ফিরে এসে আবিষ্কার করে—শহরের নিখোঁজ মানুষ, ভাঙা সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক মুখোশ আর ক্ষমতার অদৃশ্য নেটওয়ার্ক একই সুতোয় বাঁধা। তার পাশে দাঁড়ায় মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী ঋতভা, যে মানুষের মন বুঝতে গিয়ে উন্মোচন করে এমন এক গোপন নথি, যা বহু প্রভাবশালী মানুষের অন্ধকার মুখ প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু সত্যের মূল্য সবসময় রক্তে পরিশোধ করতে হয়। থিয়েটার, বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ, বইমেলা, ফুটপাত, প্রেম, প্রতিবাদ এবং রাষ্ট্রীয় নীরবতার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলে স্ট্রিট ডকুমেন্টারি—একটি সিনেম্যাটিক রাজনৈতিক থ্রিলার, যেখানে অসমাপ্ত প্রেম ও অসমাপ্ত সত্য একই গল্পের দুই প্রান্ত। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—একজন মানুষ মারা গেলে কি তার ভাষাও মরে যায়?
Street Documentary - Shekhor Siraj
নির্বাণমার্গের আগারিক কবি জীবনানন্দ – পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
এই বইটি জীবনানন্দের জীবন রহস্যের প্রগাঢ় এক পাঠ। মানবদেহ অর্থে নয়, যাপনের ধরন ও অর্থবহতায়। জীবনের টানাপোড়েন তাঁকে অস্বস্তি দিয়েছে। তবু তাঁকে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন। কে এই বনলতা? শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনালিসার মতোই সে রহস্যে ভরা। পাখির নীড়কে আশ্রয় করে চোখের উপমা চোখ বন্ধ করলেই যেন জীবন্ময় হয়ে ওঠে।
নির্জনতার কবি বলে তাকে অনেকেই লোকালয় থেকে দূরে ঠেলে দেয়। এ নিয়ে তার আপত্তি বরাবরই ছিলো। গুণমুগ্ধদের কাছে তিনি শুদ্ধতম কবি। কবিতার বিবেচনায় তিনি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম কবি। কবিতার সংখ্যা সাকুল্যে একশো বাষট্টি। ‘ঝরাপালক’ নিয়ে তিরস্কৃত হলেও পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ হতে নিজস্ব কাব্যভাষা ও শৈলীতে সিদ্ধ হয়ে ওঠেন।
শিক্ষক হিসেবে আদর্শ হলেও শিক্ষকতায় তার স্থিরতা মেলেনি। অনবরত প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষ পাল্টাতে হয়েছে। কখনও নিজের কারণে কখনও রোষানলে পড়ে। সংসার তার জন্যে আক্ষরিক অর্থেই ছিল কুরুক্ষেত্র। অস্বীকৃত ও অসংগত প্রেমের ছোট্ট ঘুলঘুলি দিয়েই তার জীবনে মিলেছিল কিছুটা আশার হাওয়া।
জীবনের ঘাতে পুড়ে পুড়ে খাঁটি সোনা হওয়া কবির লেখায় জগৎ শাস্তা বুদ্ধ প্রকট হয়ে ওঠেন অনিরুদ্ধ প্রজ্ঞায়, অতুলনীয় জ্যোতির্ময়তায়। নিবিড় পাঠে উপলব্ধি, তিনি নির্বাণমার্গের এক আগারিক কবি বুঝি। ছাপ্পান্ন বছরের জীবন সাহিত্যিক ব্যাপ্তিতে ছাড়িয়ে গেছে কয়েক হালি আকাশগঙ্গা। আপনভুবনে সুরসিক, বহির্ভুবনে রামগরুড়ের ছানার জীবনধারী কবি জীবনানন্দ দাশকে পড়ে পেরে ওঠা কঠিন। তবুও ভালোবেসে, অনুসন্ধিৎসা প্রশমনে উৎখননের প্রয়াসে ‘নির্বাণমার্গের আগারিক কবি’কে জাগিয়ে তোলা হলো কলমে, কল্পনায়।
Nirmanmarger Agarik Kobi Jibanananda - Pijush Kanti Barua























