এই ঋণ শোধ হবে না – জোনাকী দত্ত
১৯৫২ থেকে ১৯৭১ আমরা বাঙালিরা চরম চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে পেয়েছি লাল-সবুজ পতাকা। বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামক দেশটি স্থান করে নিয়েছে সগৌরবে। যাঁদের নিঃস্বার্থ অবদানের জন্য আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি তাঁদের ঋণ কখনো শোধ হবার নয়। তাঁদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। আমার এই বইটি লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো গল্পের মাধ্যমে সেই মহান ব্যক্তিদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ঘটনা, ভাষা আন্দোলন, গণ আন্দোলন, পঁচিশে মার্চ, তাদের জন্য নির্মিত শহিদ মিনার, স্মৃতিসৌধ আরো নানান ঘটনা পাঠকের কাছে তুলে ধরা। আশা করছি ছোটো-বড়ো সকল পাঠকের গল্পগুলো ভালো লাগবে।
Ei Reen Shodh Hobe Na - Jonaki Dutta
মুক্তির মিছিল দেখবে বলে – আবু রেজা
‘মুক্তির মিছিল দেখবে বলে’ একটি ট্রিলজির সূচনাখণ্ড। দশটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই উপন্যাসে লেখক আবু রেজা মহান মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর সময়কে এক অনন্য কাঠমোয় রূপায়িত করেছেন। একটি পরিবারের শীর্ষকর্তা থেকে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য পর্যন্ত সবার আনন্দ-বেদনা, উদ্বাস্তু জীবন, অনিশ্চয়তা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে এক উত্তাল সময়ের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। এ আখ্যানের চরিত্রগুলোর যুদ্ধদিনের অভিজ্ঞতা পরিবারের ইতিহাস অতিক্রম করে স্বাধীনতাকামী জাতির আত্মত্যাগ, বেদনা ও মুক্তির অভিযাত্রার দলিলে পরিণত হয়েছে।
গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের অভিঘাত, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর নানান ঘটনা এবং বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আবেগঘন মুহূর্ত। শিশুমনের বিস্ময়, ভয়, কৌতূহল ও স্বপ্নের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে গেছে যুদ্ধদিনের নির্মম বাস্তবতা। এ আখ্যানের চরিত্রগুলোর প্রত্যক্ষ করা রক্তাক্ত দিনের স্মৃতি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে অতিক্রম করে জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।
এ উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য গ্রাম ও শহরের জীবনবাস্তবতার সমান্তরাল উপস্থাপন। যুদ্ধের প্রতিঘাতে উদ্বাস্তু হয়ে ছুটে বেড়ানো একটি পরিবারের জীবন, মৃত্যুভয়, জীবনসংকট, আপনজনের নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা সংযত অথচ হৃদয়স্পর্শী ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা, তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকারদের দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড যেমন উঠে এসেছে, বিপরীতে সেই অন্ধকার সময়ে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের ভূমিকাও গভীর মমতায় বিধৃত হয়েছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার প্রতি লেখকের অবস্থান সুদৃঢ়, স্পষ্ট ও আপসহীন। তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধ কেবল ইতিহাস নয়, জীবনবোধের ভিত্তি। তাই গ্রন্থের শেষে লেখক একটি প্রশ্ন রেখেছেন, যা পাঠককে ভাবিয়ে তুলবে—‘একাত্তরের যুদ্ধে শহীদ হয়েছে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ। আবার এই বছরে জন্মেছেও পঁয়ত্রিশ লক্ষের বেশি শিশু। মহৎপ্রাণের বিনিময়ে শিশুপ্রাণ। এই শিশুরা বড়ো হয়ে পারবে কি পূর্বপুরুষের মহত্ত্বের মূল্য দিতে?’ নিশ্চয়ই বর্তমান সময়ই এর উৎকৃষ্ট উত্তর।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার, ইতিহাসচেতনা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়বোধ নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে এই গ্রন্থ। তাই ‘মুক্তির মিছিল দেখবে বলে’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সময়ের নির্মোহ সত্যকে ধারণ করা এক অতুলনীয় সৃষ্টি। গ্রন্থটি সময়ের দলিল এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থমালায় একটি মূল্যবান সংযোজন।
সাইফুল ইসলাম
লোকগবেষক ও গীতিকবি
Muktir Michil Dekhbe Bole - Abu Reza
নরকের Wi-Fi ও কয়েকশ ভবিষ্যৎ – শারদুল সজল
নরক পৃথিবীর সংযোগে আছে
প্রতিটি মস্তিষ্ক এখন অনলাইনে
পাসওয়ার্ড বদলালেও
নরকের সিগন্যাল ঠিক থাকে
অপমান, ক্ষুধা, যুদ্ধ, হতাশা ও একাকিত্ব
যেন অস্তিত্বের ছেঁড়া স্নায়ু
যাকে সেলাই করে মানুষ দৌড়ায়…
আর ভবিষ্যৎ?
একটা নয়—কয়েকহাজার
প্রতিটি—
অন্য ১ পৃথিবী, অন্য ১ তুমি
অন্য ১ আমি, অন্য ১ শেষ
নরক কী পৃথিবীর বাইরে?
নাকি পৃথিবীই নরক?
এই প্রশ্নে সক্রেটিস নক্ষত্র সেদ্ধ করে
ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঢেলে দিল জন্ম ও মৃত্যুর
মধ্যকার দূরত্ব
আর জন্ম হলো—
(শূন্যস্থান পূরণ করুন, যার যা মনে হয়…)
Naroker Wi-Fi O Kayeksha Vobisshat - Shardul Sajal
অক্ষরবৃত্তের জলে নামি – মোস্তফা তারিকুল আহসান
জীবনকে প্রচল ভেবে নিতে পারি নি বলেই হয়তোবা আমার ধানের ক্ষেতে অসময়ে
আসে বানের জল; পাকা ধান ডুবে যায় তবু মাছ ধরার স্বপ্ন উকি দেয় স্বপ্নভুক মাতালের মতো
আমি বানান ভুল করা বালকের দলে সারাজীবন ভাঙা টিনের চালের স্কুলের ছাত্র, মাস্টার
মশাইয়ের পাঠে বুঁদ হয়ে শিখতে পারিনি পাণিনি পতঞ্জলি; প্রকৃতির পাঠশালায় বনমোরগের ডাক
অথবা ভোরের কুয়াশামাখা মাঠ আমাকে কতিপয় ঘাসের ব্যাকরণ শিখিয়েছে। এই পথ্য নিয়েই
আমার জীবন বাহিত হয়েছে যমুনা মেঘনার বহতায়; নদী পয়োপ্তির ঘরে আমার ঘাসের
ছোট্ট মাঠে প্রজাপতির ঝাঁক আমাকে কবিতা শেখাতো, পলিমাটির লবণ নিয়ে মাছেদের কাছে
Aksharbretter Jale Nami
কুড়িয়ে পাওয়া ছায়া – ইসরাত জাহান
কেউ কেউ নিরন্তন হেঁটে চলে। চলতে চলতে মুখোমুখি হয় অগুনতি মানুষের। যাদের ছায়া দীর্ঘ অথবা হ্রস্ব। ছায়া পেরিয়ে ঐসব মানুষের প্রকৃত নাগাল পাওয়ার চেষ্টাও থেমে থাকে না।
প্রাগৈতিহাসিকের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে সে-ই সন্ধান মানিক বন্দোপাধ্যায়ই হয়তো শুরু করেছিলেন। এরপর আরও অনেকেই ঐ পথ অনুসরণ করেছে। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে কখনও কখনও ছায়ার ওপারের মানুষকে অস্বীকারও করা হয়েছে। ঘোষিত হয়েছে, ‘থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার।’ অন্ধকারের ফ্রেমে যদিও এভাবেই তারা অবয়বহীন থেকেছে, তবু লীন হয়ে যায়নি।
‘কুড়িয়ে পাওয়া ছায়া’ সেইসব অবয়বহীন মানুষের গল্প, যেখানে গল্প নির্মাণে অন্ধকার মূখ্য হয়ে উঠলেও আলোকে অস্বীকার করা হয়নি।
Kuriye Pauya Chaya - Israt Jahan
স্ট্রিট ডকুমেন্টারি – শেখর সিরাজ
ঢাকা শহর কখনও ঘুমায় না। শুধু আলো নিভে গেলে তার আরেকটি মুখ দেখা যায়। একজন তরুণ লেখক ও নাট্যকর্মী আরমান রহমান, রাজনৈতিক মামলার পর ফিরে এসে আবিষ্কার করে—শহরের নিখোঁজ মানুষ, ভাঙা সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক মুখোশ আর ক্ষমতার অদৃশ্য নেটওয়ার্ক একই সুতোয় বাঁধা। তার পাশে দাঁড়ায় মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী ঋতভা, যে মানুষের মন বুঝতে গিয়ে উন্মোচন করে এমন এক গোপন নথি, যা বহু প্রভাবশালী মানুষের অন্ধকার মুখ প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু সত্যের মূল্য সবসময় রক্তে পরিশোধ করতে হয়। থিয়েটার, বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ, বইমেলা, ফুটপাত, প্রেম, প্রতিবাদ এবং রাষ্ট্রীয় নীরবতার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলে স্ট্রিট ডকুমেন্টারি—একটি সিনেম্যাটিক রাজনৈতিক থ্রিলার, যেখানে অসমাপ্ত প্রেম ও অসমাপ্ত সত্য একই গল্পের দুই প্রান্ত। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—একজন মানুষ মারা গেলে কি তার ভাষাও মরে যায়?
Street Documentary - Shekhor Siraj
নির্বাণমার্গের আগারিক কবি জীবনানন্দ – পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
এই বইটি জীবনানন্দের জীবন রহস্যের প্রগাঢ় এক পাঠ। মানবদেহ অর্থে নয়, যাপনের ধরন ও অর্থবহতায়। জীবনের টানাপোড়েন তাঁকে অস্বস্তি দিয়েছে। তবু তাঁকে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন। কে এই বনলতা? শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনালিসার মতোই সে রহস্যে ভরা। পাখির নীড়কে আশ্রয় করে চোখের উপমা চোখ বন্ধ করলেই যেন জীবন্ময় হয়ে ওঠে।
নির্জনতার কবি বলে তাকে অনেকেই লোকালয় থেকে দূরে ঠেলে দেয়। এ নিয়ে তার আপত্তি বরাবরই ছিলো। গুণমুগ্ধদের কাছে তিনি শুদ্ধতম কবি। কবিতার বিবেচনায় তিনি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম কবি। কবিতার সংখ্যা সাকুল্যে একশো বাষট্টি। ‘ঝরাপালক’ নিয়ে তিরস্কৃত হলেও পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ হতে নিজস্ব কাব্যভাষা ও শৈলীতে সিদ্ধ হয়ে ওঠেন।
শিক্ষক হিসেবে আদর্শ হলেও শিক্ষকতায় তার স্থিরতা মেলেনি। অনবরত প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষ পাল্টাতে হয়েছে। কখনও নিজের কারণে কখনও রোষানলে পড়ে। সংসার তার জন্যে আক্ষরিক অর্থেই ছিল কুরুক্ষেত্র। অস্বীকৃত ও অসংগত প্রেমের ছোট্ট ঘুলঘুলি দিয়েই তার জীবনে মিলেছিল কিছুটা আশার হাওয়া।
জীবনের ঘাতে পুড়ে পুড়ে খাঁটি সোনা হওয়া কবির লেখায় জগৎ শাস্তা বুদ্ধ প্রকট হয়ে ওঠেন অনিরুদ্ধ প্রজ্ঞায়, অতুলনীয় জ্যোতির্ময়তায়। নিবিড় পাঠে উপলব্ধি, তিনি নির্বাণমার্গের এক আগারিক কবি বুঝি। ছাপ্পান্ন বছরের জীবন সাহিত্যিক ব্যাপ্তিতে ছাড়িয়ে গেছে কয়েক হালি আকাশগঙ্গা। আপনভুবনে সুরসিক, বহির্ভুবনে রামগরুড়ের ছানার জীবনধারী কবি জীবনানন্দ দাশকে পড়ে পেরে ওঠা কঠিন। তবুও ভালোবেসে, অনুসন্ধিৎসা প্রশমনে উৎখননের প্রয়াসে ‘নির্বাণমার্গের আগারিক কবি’কে জাগিয়ে তোলা হলো কলমে, কল্পনায়।
Nirmanmarger Agarik Kobi Jibanananda - Pijush Kanti Barua
অতীতের আলপনা – সুরঞ্জনা মায়া
মানুষের জীবন কি কেবল কতগুলো বছরের সমষ্টি, নাকি সে এক পলল ভূমি? যেখানে জমে থাকে ইতিহাসের পলিমাটি, শৈশবের মায়া আর ঘ্রাণমাখা সব স্মৃতি? ‘অতীতের আলপনা’ বইটিতে সুরঞ্জনা মায়া তাঁর স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেছেন ঠিক সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে।
এটি কেবল এক ব্যক্তির আত্মজীবনী নয়, এটি একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলির এক অনন্য সামাজিক দলিল। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে শুরু করে সুরমা পাড়ের হাড়কাঁপানো শীত, কিংবা বীরাঙ্গনা মায়েদের দীর্ঘশ্বাস আর যুদ্ধশিশুদের বিদেশের মাটিতে শেকড় সন্ধানের যে হাহাকার- লেখিকার কলমে তা যেন এক একটি জীবন্ত চিত্রপট হয়ে ধরা দিয়েছে। ইতিহাসের সেই বিশাল ক্যানভাসে তিনি খুব নিপুণভাবে এঁকেছেন নিজের যাপিত জীবনকে। যেখানে ময়মনসিংহের কৈশোরের বন্ধুদের সাথে কাটানো রোদেলা দুপুর আছে, আছে সিলেটের সেই আসাম টাইপ বাংলোর বারান্দা, আর আছে সুরমা তীরের সেই মায়াভরা দিনগুলো।
এই বইটির অনন্যতা এর ডিটেইলিং-এ। লেখিকা যেভাবে সেই সময়ের রেশনিং ব্যবস্থার বিস্বাদ চাল, চর্বি ভাজা পিঠা কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের সেই অকৃত্রিম আতিথেয়তার স্বাদ বর্ণনায় এনেছেন, তা পাঠককে এক নস্টালজিক ভ্রমণে নিয়ে যাবে। বড়োদের ভুল বোঝাবুঝিতে কিশোরী মনের সেই ‘বাজে মেয়ে’ অপবাদ থেকে শুরু করে তেত্রিশ বছর পর বন্ধুর সাথে সেই অমীমাংসিত দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার যে দর্শন- তা আমাদের শিখিয়ে দেয় ক্ষমা আর ভালোবাসার শক্তি।
নাতনিদের কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে লেখা এই বইটি আসলে আমাদের ফেলে আসা সেই সময়ের প্রতিচ্ছবি। যারা ইতিহাসকে শুকনো তথ্যের বাইরে রক্ত-মাংসের আবেগ দিয়ে অনুভব করতে চান, তাঁদের জন্য ‘অতীতের আলপনা’ এক অনিবার্য পাঠ। এক জীবনের আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আর দেশপ্রেমের এই আলপনা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী দাগ কাটবে।
Otiter Alpona - Suranjona Maya
সোনালতার কবিতা – শেখ নাজমুল হাছান
ওভিদের কাব্যকথা অনেককালের ব্যবধানে আসলে রোমান্সস্বপ্নের গল্প হয়ে ওঠে, খুব সিরিয়াস জায়গাগুলো পেরিয়ে। মেটামরফোসিস সম্পর্কে এমন কথা সত্য। সোনালতার কবিতা সেরকমই রূপান্তর, গল্পের রূপান্তর; প্রেম-বাঁশরী-বিশ্রম্ভালাপ-মাতৃস্নেহ-প্রকৃতি সবটুকু যেন হীরকখণ্ডস্বরূপ স্থিত এক প্যাকেজ। অথচ এ লেখক যখন পাখিডুবি গ্রামের গল্প বলতেন তখন পাখি গল্প হলেও কড়া-উৎকোচে তা মেটাতে হতো কঠোর বাস্তবতা দিয়ে। বাস্তবতা ওই সময়ে তুমুল, কঠোর কিছু ছাড়িয়ে কুবলা খাঁ-র অশ্বক্ষুরের বদলে খুঁজে নিত কবি কোলরিজের ব্যথাতুর মনকে।
শেখ নাজমুল হাছানের সোনালতার কবিতা উইটসমেত মূলত এঁকে-বেঁকে চলা কঠোর ক্লান্তির গল্প। বাস্তবতাই তার পটভূমি; এটি ভাষণে আলাদা, একদম এ-সময়ের গল্প, আলাদা গল্প, ঝরাপাতার সন্নিহিত সম্পর্কের- নিজের কিন্তু সবার, সকলের। আবার জানুন, রোমান্টিকতার খোসা ছাড়িয়ে কীভাবে বুক চিতিয়ে চেনা গল্পটাও চেতনায় রাখা যায়। হাঁটুন ওর সবুজ আগাছা কিছু থেকে এই সোনালতার কবিতা পর্যন্ত। পরিতৃপ্তির অশেষ আনন্দ!
-শহীদ ইকবাল
Sonalatar Kobita - Shakh Najmul Hasan
ছায়ার ভোঁ – চঞ্চল নাঈম
মুহূর্তের সন্দর্ভ দানকারী ব্যঞ্জনাকে চঞ্চল নাঈম এই কাব্যে একান্তে এঁকেছেন। অতিরিক্ত শব্দের ও অনুষঙ্গবিহীন চিত্রকল্পের আসক্তি নেই। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতায় পর্যবেক্ষণগুলো স্বাভাবিক, তেমনি অস্বাভাবিকও। ছায়া, গণিত, ডট, অপেক্ষা, নৈঃশব্দ্য, শূন্যতা, সংখ্যা পরিমাপ, সম্ভাবনা ইত্যাদি বিষয়ে তীব্র উপলব্ধি আছে। বিমূর্তে না গিয়েও অপার বিস্ময় শিল্পদক্ষ কবির আয়ত্তে এসে গেছে। আমরা অনেক সময় ভাজ্য, ভাজক, ভাগফলকে মান্যতা দিই, ভাগশেষ ব্রাত্য থাকে। চঞ্চল নাঈম লিখছেন— ‘সব ভাগশেষ/অপ্রয়োজনীয় না।’ সত্যিই তো জীবনে কিছু না কিছু অবশিষ্ট থাকে বলেই, শুরু হয় নতুন কল্পনা। ‘বসে থাকা ঘড়ি’— নয়টি শব্দের কবিতা, যেখানে চিরকালীন বৈজ্ঞানিক সত্য আবর্তিত। আধুনিকতার নিয়ামক হলেও বিভিন্ন কারণে যন্ত্র রুদ্ধ হয়ে যায়। বাস্তবতার গতি কখনো রুদ্ধ হয় না। ‘ছায়ার ভোঁ’ নামকরণ থেকেই বিস্ময়। এরপর প্রতিটি কবিতায় চমক, ভিন্নভিন্ন পর্যবেক্ষণে। প্রতিটি কবিতার শিল্পসম্মত হয়ে ওঠা বিস্ময় সৃষ্টি করে। হয়ে ওঠার চারুশিল্পকে ভাষাদক্ষতার সঙ্গে নিষ্পন্ন করেছেন চঞ্চল নাঈম। কাঁথাস্টিচের সূক্ষ্ম-সূক্ষ্ম শৈল্পিক মেধা স্বল্পশব্দে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘আমার ছায়া/মাটিতে পড়ে/কিন্তু/ওজন অনুভব করি না’— সহজ সত্য, কাব্যের সত্যে পরিণত। ডট চিহ্নকে নিয়ে কতো মধুর বচন রচিত হয়, সেটা ‘ডট’ কবিতার পাঠে বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষণীয়। এই কাব্যের প্রতিটি কবিতা বিমূর্ততা ছাড়াই জীবনের বহু না-দেখা অবস্থাকে ইঙ্গিত করছেন কবি।
অলোক বিশ্বাস
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
Chayar Vo - Chanchal Nayeem
নীল আগুনে পুড়ে গেছে বিশটি আঙুল – রেহানা বীথি
পৃথিবী নানাবিধ যুদ্ধে জর্জরিত। মানুষের শরীরের রক্ত মনের রক্ত ঝরছে অবিরাম এইসব নিদারুণ যুদ্ধের আঘাতে আঘাতে। মানুষকে ঘিরে আছে বোমা-বন্দুক : ঘিরে আছে ঝড়-ঝঞ্ঝা-বন্যা-খরা : ঘিরে আছে ক্ষুদ্রতম ও দীর্ঘতম নানারকম স্বার্থের ফিতা। মানুষের মুক্তি যেন নাই।
মুক্তি যে একবারেই নেই তা কিন্তু নয়, আছে। এই মুক্তির অপরূপ রূপ দেখার জন্য আমাদের প্রবেশ করতে হবে কবি রেহানা বীথির ‘নীল আগুনে পুড়ে গেছে বিশটি আঙুল’ কাব্যগ্রন্থে। প্রেমমাধুর্যে পূর্ণ কবিতার এই বইটি আমাদের দেখিয়ে দেয় হাজারও যুদ্ধ এবং যুদ্ধপ্রায় অবস্থা থেকে মুক্তির প্রয়োজন আর এই মুক্তি নিয়ে বসে আছে প্রেম। আমাদের পৌঁছতে হবে প্রেমের নরম পরশের কাছে। সেখানে পৌঁছতে পারলেই প্রেমের স্নিগ্ধ পরশে মানুষ পূর্ণ হবে; আনন্দের শস্যে ভরে উঠবে জীবন। এই আনন্দ শস্য থেকে জন্মে যাবে আরও আরও আনন্দ।
যুদ্ধের পক্ষে থাকা বোমা বারন্দ বন্দুক। যুদ্ধের পক্ষে থাকা ঝড় ঝঞ্ঝা বন্যা; যুদ্ধের পক্ষে থাকা ক্ষুদ্রতম বা দীর্ঘতম স্বার্থের ফিতা ক্ষয় হয়ে যাবে প্রেমের কোমল পরশে। কারণ ‘প্রীতিতে গন্ধরাজ’ ফোটে। কবিতাগুলো বলে দেয়- প্রেমের পাথর শুধু পাথর নয়, এ পাথর ‘আশ্চর্য পাথর’; প্রেমের যে আগুন তা ‘মিঠিমিঠি আগুন’ : প্রেমের ভেতর দিয়ে দেখা অন্ধকার ‘রঙিন অন্ধকার’, এ ‘অন্ধকারে সুগন্ধ’ আছে। প্রেমের ভেতর দিয়ে যা ঘটে তার সবই মানবিক; ব্যক্তিজীবনের জন্যেও, পৃথিবীয় জীবনের জন্যেও। সুতরাং প্রেমের ‘নীল আগুনে’ পোড়া বা প্রেমের জলে ভেজা দুই-ই শান্তির, দুই-ই অপার্থিব সুখের। প্রেম মধুর : প্রেমের কবিতা পড়া এবং তা অনুভব করাও মধুর। এসব কথা সত্য হয়ে আছে কবি রেহানা বীথির প্রেমবাস্তবতার কবিতাবই ‘নীল আগুনে পুড়ে গেছে বিশটি আঙুল’-এ। সুতরাং কবিতাবইটিতে ডুব দেওয়া যায় নির্দ্বিধায়।
আনিফ রুবেদ
কবি ও কথাকার
Neel Agune Pure Geche Bishti Angul - Rehana Bithi
ট্রুথ অর ডেয়ার – আব্দুল্লাহ্ আল বাকী
বইটিতে আধুনিক জীবনের জটিল মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, সম্পর্কের ঘাত-প্রতিঘাত, নৈতিক সংকট, প্রতারণা ও সামাজিক নির্মম বাস্তবতার এক বহুমাত্রিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে। বইটির বিভিন্ন পটভূমিতে কয়েকটি সতন্ত্র গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে, যার প্রতিটি মানবচরিত্রের অবচেতন মন ও জীবনের অন্ধকার দিকগুলোকে উন্মোচন করে। প্রতিটি গল্পেই প্রকাশ পেয়েছে, মানব মনের গোপন বাসনা, যৌনতা, সমাজ ও ব্যক্তির মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বের নিখুঁত বিশ্লেষণ। গল্পের চরিত্রগুলো অদ্ভুত এক টানাপোড়েনে ক্ষতবিক্ষত, যা পাঠককে জীবনের গভীর ও নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবে বলেই মনে করি।
Truth Or Dare - Abdulla Al Baky























