Additional information
| Weight | 0.210 kg |
|---|---|
| Published Year |
$ 0.99 $ 1.65
লেখকের কথা-
পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। এর দ্বারা একটি সময়ে সংঘটিত নানান ঘটনার বিশ্লেষণ করা যায়। তাই, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও বহুমুখী দিকগুলো অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করতে সেই সময়ে প্রকাশিত পত্রিকার রিপোর্টগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।
২০১৬’র নভেম্বরে দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক আশফাক ভাই একদিন বললেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষ ১৭ দিনে (ডিসেম্বর ০১ – ডিসেম্বর ১৭) আন্তর্জাতিক পত্রিকায় প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক রিপোর্টগুলোর অনুবাদ নিয়ে একটি ধারাবাহিক সিরিজ করে দেয়ার জন্য। শুনেই আমি রাজি হয়ে যাই। দৈনিক ইত্তেফাকে ২০১৬’এর ০১ ডিসেম্বর হতে ১৫ ডিসেম্বর (১৪ ডিসেম্বর বাদে) পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ১৪টি রিপোর্টের অনুবাদ প্রকাশ হয়েছিল।
এই বইতে সেই ১৪টি রিপোর্টের অনুবাদ সহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মোট ২০টি রিপোর্টের অনুবাদ রয়েছে। ডিসেম্বর ০১-১৭ এর ১৮টি রিপোর্ট ও মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় মার্চের ০২ টি রিপোর্টের অনুবাদ সংযুক্ত হলো।
অনুবাদগুলো ভাবানুবাদ এবং পত্রিকার রিপোর্টগুলো মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টের সংগ্রহশালা হতে সংগ্রহীত।
এই অনুবাদ রিপোর্টগুলো বই আকারে প্রকাশের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন সহযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টের সভাপতি শান্তা আনোয়ার।
| Weight | 0.210 kg |
|---|---|
| Published Year |
আফরোজা আলমের গদ্য পড়তে ভালো লাগে। একটা আটপৌরে ভাব আছে আর আছে একটা ভিতর থেকে টান। বিষয় যখন পরিবারের কথা নিজের স্মৃতি-গ্রন্থের পাতাগুলি উল্টে যাওয়া, প্রায় নিজের পুরোনো ডায়েরি খুলে পড়ার মতো তখন ভালো তো লাগবেই। তার সঙ্গে যদি যোগ হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার কিছু বর্ণনা। এইসব কারণে আফরোজার লেখা ভালো লাগলো।

হাসান আজিজুল হক
Fanush - ফানুস
প্রত্যেক মানুষের জীবনে স্মৃতি থাকে। স্মৃতি মানেই ঘটনা। অমøমধুর, বেদনাবিধুর যতো ঘটনা ঘটে মানুষের জীবনে সে-সবই স্মৃতি।
স্মৃতি- স্মৃতিকাতর করে অর্থাৎ নস্টালজিক করে তোলে মানুষকে। স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্ক থাকে মানুষের। তারা নানা মুখাবয়বের, নানা পেশার এবং নানা চরিত্রের। আবার তাদেরকে ঘিরে আরও অনেক মানুষের সম্পর্ক জড়িত থাকে। আর এই নিয়েই মানবজীবন।
আমার জীবননৌকোও অগণন স্মৃতিসম্ভারে ভরপুর, সজ্জিত। বিশেষ করে, আমার শৈশব থেকে যৌবনের উত্থানকালের ২৪-২৫টি বছরের অসংখ্য স্মৃতি আছে, যেগুলো নিয়েই এই আত্মজৈবনিক উপন্যাস “অতলান্ত পিতৃস্মৃতি” গ্রন্থটি। আমার এই সময়টাকে আমি যাঁর চোখ দিয়ে ফিরে দেখতে চেয়েছি তিনি আমার জন্মদাতা পরম শ্রদ্ধেয় পিতা। যা কিছু ঘটেছে, যা আজকে স্মৃতি- সবকিছুরই সাক্ষী আমার বাবা। আর সেখানেই পিতা-পুত্রের সম্পর্কটা সৃষ্টি হয়েছে। কী সেই সম্পর্ক? সেই সম্পর্ক যা সহজে লেখা যায় না। না পড়লে তা জানাও যাবে না।
পড়ার পর হয়তো অনেকেই মিলিয়ে দেখবেন তাঁদের জীবনের সঙ্গে, কেউ কেউ বিষণœও হতে পারেন। কেউ কেউ পড়ে বিস্মিত হবেন! আবার কেউবা ক্ষোভ প্রকাশ করবেন, ক্ষুব্ধ হবেন। কিন্তু যা সত্য, তাই তুলে ধরতে গিয়ে আদৌ কার্পণ্য করিনি। কাউকে ছোটও করিনি, কাউকে বড়ও করিনি। মানুষ হিসেবে এখানেই আমার সীমাবদ্ধতা, পরিপূর্ণতা এবং তৃপ্তি বলে মনে করি।
অতলান্ত পিতৃস্মৃতি
জন্ম ১৯৫৯ সালে পাবনার বেড়া উপজেলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। পিএইচডি করেন ১৯৯৯-এ। রাজশাহী বিশ্ব বিদ্যালয় ফোকলোর বিভাগে কর্মরত। বিশেষ আগ্রহের বিষয় লোক সংগীত, দর্শন, ধর্ম।
প্রকাশিত গ্রন্থÑ বাংলাদেশের লোকসংগীতে প্রেম চেতনা, রবীন্দ্রকাব্যে লোক উপাদান, বাংলা লোকসংগীতে নারী।
রঙ্গনামা
জন্ম ২৩ নভেম্বর, গোপালগঞ্জ জেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর শেষে বর্তমানে একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত। শৈশব থেকেই লেখলেখিতে আগ্রহী। প্রথম প্রকাশিত বই ‘চাঁদ চোয়ানো জোৎস্নায় ফিরে এসো নদীবতী মেয়ে’।
তোমার জন্য মেয়ে
১৯৫৮ সালে জিম ম্যাকিনলি নামের এক আমেরিকান মিশনারি কার্যক্রম চালানোর উদ্দেশ্যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে সপরিবারে ফেনী অবস্থানকালে পাক বাহিনীর অতর্কিত বিমান হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিল তাঁর পরিবার। সুযোগ পেয়েও তিনি পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ ত্যাগ করতে রাজি হননি। নিজের জীবন বাজি রেখে বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের ফসল ৮ মাসের দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত ‘ডেথ টু লাইফ’। নাহার তৃণার বাংলা রূপান্তর ‘মৃত্যু পেরিয়ে জীবন’। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকার মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিলেও সেদেশের অসংখ্য হৃদয়বান মানুষ নিজ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বাঙালিদের জন্য খুলে দিয়েছিলেন উদারতা ও মমত্বের দুয়ার। ম্যাকিনলি রচিত এই স্মৃতিকথা তারই এক অনন্য উদাহরণ।
Mrittu Periye Jibon By JIm Mckinley, Translated By Nahar Trina - এক আমেরিকান মিশনারির একাত্তরের স্মৃতি
সুপ্রিয় দিনলিপি
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত সাহিত্যকর্ম খুবই অপ্রতুল। অথচ আমরা আমাদেরকে বীরের জাতি বলে শ্লাঘা বোধ করতে কার্পণ্য করি না। কিন্তু হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিশাল পটভূমিতে আমাদের স্বাধিকারের লড়াই আমাদের সাহিত্যকর্মে বিস্ময়কর রকমে অনুপস্থিত।
বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের পঞ্চাশ বছর পরে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিশাল পটভূমিতে রচিত হল, ”চন্দনা উড়ে গেছে” উপন্যাস। কালের ব্যবধান থাকা সত্বেও এ কাহিনীর বিস্ময়কর ঘটনাপ্রবাহ, গেরিলা যুদ্ধের বুদ্ধিদীপ্ত সাহসিকতা, সফলতা, তাদের বীরত্ব ও বিশাল ত্যাগের বলিষ্ঠ চিত্রায়ন পাঠককে এক মুগ্ধতার আবেশে মোহাবিষ্ট করে শেষ পাতা পর্যন্ত আঠার মত জুড়ে রাখবে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বড় অংশটি ছিল গণযোদ্ধার। এরা সংখ্যার দিক থেকে নিয়মিত বাহিনীর চেয়ে অনেক বড় ছিল। এই গণযোদ্ধারা কয়েক সপ্তাহের ট্রেনিং নিয়ে বাংলার গ্রাম-গঞ্জে, হাটে-বাজারে, শহরে-বন্দরে ছড়িয়ে পড়ে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদরকে কোণঠাসা করে রাখে। মুক্তিবাহিনীর এ সব গণযোদ্ধা গেরিলাদের নিয়ে খুব একটা সাহিত্যকর্ম রচিত হয়নি। তাই আমাদের মহান গেরিলা যুদ্ধের অনেক কাহিনী এখনো অজানা। এ উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহ এমন এক স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও অপার দক্ষতায় বিন্যাস করা হয়েছে, যা পাঠককে কব্জা করে রাখে।
এ উপন্যাসের বিশাল পটভূমিতে রয়েছে, শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ থেকে প্রত্যন্ত হাট-বাজার, পাহাড়ী নৃ-গোষ্ঠীর জনপদ, তাদের জুমিয়া জীবন ও মাতৃভুমিকে হানাদারদের দখল মুক্ত করার বিস্ময়কর সম্প্রীতি নিয়ে গণযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ও প্রতি-আক্রমণ, এক তেজোদীপ্ত বীরত্ব গাথার উপাখ্যান। এবং যুদ্ধ শেষে মানবিক উষ্ণতায় বীর বন্দনা।
এটি শুধু বলিষ্ঠ দক্ষতায় কারুকার্যময় এক কাহিনীই নয়, এটি সত্তর দশকের শুরুর দিকের এক এনালগ সমাজের বিশ্বাসযোগ্য সামাজিক দলিল, যার আজকের ডিজিটাল যুগে মহামূল্যবান গুরুত্ব রয়েছে। উপন্যাসটির পরতে পরতে আছে সত্তর দশকের আর্থসামাজিক, মানবিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বর্ণনা, আছে বাংলাদেশের তরুণ-যুবাদের প্রতিরোধ যুদ্ধের কাহিনী, কিভাবে তারা খুবই স্বল্প প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রায় খালি হাতে গেরিলা পদ্ধতিতে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসর জামাত, রাজাকার, আলবদর বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদেরকে রুখে দিয়েছিল। কীভাবে তাদের বাংলার কাদা-মাটিতে পর্যুদস্ত করেছিল, সেইসব ঘটনার রোমহর্ষক অনুপুঙ্খ বর্ণনা। আছে গেরিলাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব , দুঃখ-কষ্ট, আপোষহীন লড়াই, আত্ম-বলিদান, বীরত্ব এবং. গৌরব গাথা।
বিজয়ের পঞ্চাশ পরেও বাঙালীর বিজয় গাঁথার এই অনন্য আখ্যান পাঠককে মুগ্ধতার আবেশে বিমোহিত করে রাখবে, তাদের পূর্বসূরির মহান বীরত্বের কাহিনী তাদেরকে ও তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ধারাবাহিকভাবে উজ্জীবিত করবে। নিঃসন্দেহে এ উপন্যাস এক উচ্চমার্গীয় সাহিত্যমূল্য ধারণ করে।
স্বাধিকার, অধিকার, ভালবাসা, গন্ধক, রক্ত, এবং নাইট্রিক এসিডের সংমিশ্রণে এ এক মুক্তির পথ যাত্রা।
Chandana Ure Gache - Ali Reza
জন্ম ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট, ঢাকায়। শৈশব কৈশোর কেটেছে হাইকোর্ট কম্পাউন্ডের সবুজ গাছ, অবারিত খেলার মাঠ আর টিনের চালে রিমঝিম বৃষ্টির সাথে। প্রথাগত পড়াশোনায় ইতি ঘটে প্রবল অনাগ্রহে। প্রকৌশল বিদ্যা শেষ না করে বেরিয়ে পড়েন শব্দের সন্ধানে। লম্বা সময় বোহেমিয়ান ঘুরে বেড়িয়েছেন। এ দেশ-ও দেশ আর অলি-গলি পেরিয়ে রাজপথ। পেশায় গীতিকার।
পরিচিত গান- আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে, বৃষ্টি পড়ে, আই সি সি বিশ্বকাপ ২০১১-এর থিম সং মার ঘুরিয়ে প্রভৃতি।
রুল টানা খাতা
Zuddhodiner Golpo by Sankari Das
ভূমিকা
১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে সক্রিয় প্রচার-কর্মী, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচন ছিল বাঙালি জাতির চূড়ান্ত মুক্তির লড়াইয়ের প্রস্তুতি পর্ব। বাংলার গণমানুষের মুক্তির অগ্রদূত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর বাসভবন ৩২ নম্বর ধানমন্ডিই হয়ে ওঠে বাঙালি জাতির মূল ঠিকানা। অধীর আগ্রহে জাতি, দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় যেমন বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ৭০-এ নৌকায় আমাকে ও আওয়ামী লীগকে ভোট দাও, আমি তোমাদের চূড়ান্ত বিজয় এনে দিব। তাই জাতির বিজয়ের স্বাদের অপেক্ষায় ’৭১-এর অগ্নিঝরা মার্চ-বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির উদ্দেশে নির্দেশনা দেন। শহর-বন্দর, গ্রামগঞ্জে সর্বত্র শত্রুর বিরুদ্ধে প্রস্তুত হওয়ার জন্যÑ যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক এবং এলাকায় এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গঠনের নির্দেশ দিলেন। আমি আমাদের এলাকায় শরণখোলা থানা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের কর্মী। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাÑ মাতৃভূমি হানাদারমুক্ত করতে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। আমাদের দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবনে মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী সংগঠিত হয়। অতঃপর সুন্দরবনে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা ঘাঁটি গড়ে ওঠে। বিশাল মুক্তিবাহিনীর দল, মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনের তত্ত্বাবধানে অস্ত্র চালানো যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শুরু হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে যা সুন্দরবন সাবসেক্টর হেডকোয়ার্টার হিসেবে পরিচিত। আমি সুন্দরবন সাবসেক্টর অঞ্চল সুন্দরবন মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেই। বগী মুক্তিবাহিনীর রিক্রুটিং সেন্টারে রিক্রুট হই নিয়মিত যোদ্ধা হিসেবে। এখানে পহেলা অক্টোবরে পাঞ্জাবীর গানবোট প্রতিরোধ সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হাবিলদার আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করি। এরপরে সুন্দরবন মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্প হয়লাতলা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। তখন ওই ক্যাম্প ইনচার্জ কমান্ডার ছিলেন এম. আফজাল হুসাইন, আমাদের প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন বীরপ্রতীক আলী আহমে¥দ খান। অতঃপর হানাদার শত্রুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেই। বিশেষ করে সাবসেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনের নির্দেশে শেখ শামসুর রহমানের কমান্ডে সুন্দরবন নারকেলবাড়িয়া অ্যান্টি স্মাগলিং স্কোয়াডে যোগ দেই। মহান মুক্তিযুদ্ধে আমার অংশগ্রহণ ও ভূমিকা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ গর্ব ও সৌভাগ্যের বিষয়।
একাত্তরের সুন্দরবন
একটি জাতির কাছে স্বাধীনতার চেয়ে বেশি গৌরবের আর কিছু থাকতে পারে না এবং একই সঙ্গে বলতে হয় স্বাধীনতা অর্জন করা সহজ কোনো কাজ নয়। ইতিহাস বলে, যে কোনো দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন আত্মত্যাগের দীর্ঘ বিপ্লব ও সংগ্রামের প্রেক্ষাপট, মানুষকে সহ্য করতে হয় নির্মম নির্যাতন এবং বরণ করতে হয় মৃত্যু। ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতেও ধারবাহিক সংগ্রাম ও লক্ষ লক্ষ মানুষকে আত্মত্যাগ করতে হয়েছে এবং সহ্য করতে হয়েছে অকথ্য নির্যাতন। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ স্বাধীন হলেও ব্রিটিশদের হাত থেকে আজকের বাংলাদেশ বস্তত পাকিস্তানিদের কাছে পরাধীন ছিল। ১৯৪৮ সাল থেকে ভাষা আন্দোলনের দাবির ভিত্তিতে প্রথম সংগ্রাম ও বিপ্লবের সূত্রপাত হয় এবং এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আওয়ামী লীগের একক সংখ্যা গরিষ্ঠতার বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার মহাসড়ক তৈরি হয় এবং ১৯৭১ সালে রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ মানুষের প্রাণের এবং তিন লক্ষ নারীর অকথ্য নির্যাতন ও ইজ্জতের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। এই দীর্ঘ সংগ্রাম ও স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে প্রথম রচিত উপন্যাস কোনটি? মূলত এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে গিয়ে সত্তর দশকের চৌদ্দ জন লেখকের মোট উনিশটি উপন্যাসের ওপর লেখা হয় প্রবন্ধগ্রন্থটি। প্রতিটি প্রবন্ধে রয়েছে লেখক পরিচিতি, কাহিনি সংক্ষেপ, নির্মাণশৈলী এবং লেখকের মতামত। আশা করা যায় পাঠকরা উপন্যাসের সঙ্গে পরিচিতিসহ বিভিন্ন তথ্যাদিও জানতে পারবেন। পাঠককুল বইটি গ্রহণ করলে শ্রম সার্থক হয়েছে বলে ধরে নেব।
Sattar Dashaker Muktizuddher Upannas : Bishay O Shilposhoilee by Mozammel Haque Neogi
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির হাজার বছরের সংগ্রামের বিরল দৃষ্টান্ত। আমাদের এই গৌরবময় অর্জনের কারিগর বাংলা মায়ের সূর্য সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর মোহন বাঁশির সুরে মোহিত হয়ে বাংলার এই দামাল ছেলেরাই সেদিন ছিনিয়ে এনেছিল আমাদের স্বাধীনতা।
যাহিদ সুবহান আমার স্নেহের অনুজ। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার গভীর আগ্রহ প্রশংসার দাবী রাখে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার ধারাবাহিক কাজের অন্যতম ‘অচেনা রোদ্দুরে হেঁটেছিল যাঁরা’ গ্রন্থটি। নানা সীমাবদ্ধতা সত্বেও সে মাটিবর্তী উৎস থেকে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে আনার চেষ্টা করছে, যা প্রশংসার দাবীদার। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে তার এই চেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। জয় বাংলা।
মো. শফিউল্লাহ্
লেখক-মুক্তিযুদ্ধ গবেষক
সভাপতি, প্রজন্ম’৭১, আটঘরিয়া, পাবনা
Ochena Roddure Hetechilo Zara by Zahid Subhan
সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা- সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা (চতুর্থ পর্ব)
সর্বশেষ প্রকাশিত চতুর্থ পর্বে অবশিষ্ট ২৫ জন কবিকে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে মোট ৪টি পর্বে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিকের ১০০ কবির (যাদের জন্ম-সময়সীমা : ১৯৬৬-১৯৮৫) জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার, উল্লেখযোগ্য কবিতা ও কবি রচিত কবিতাসমূহের উপর সামগ্রিক আলোচনা সংকলিত করার আয়োজন সম্পন্ন হলো। সাম্প্রতিকের ১০০ কবিকে নিয়ে লেখা এসব প্রবন্ধ পাঠ করলে বাংলাদেশের সাহিত্যের বিশেষ করে কবিতার পাঠকরা আধুনিক, উত্তরাধুনিক ও নতুন ধারা- এই তিন ধারার কবি ও কবিতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। পাঠকরা অনুধাবন করবেন, বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের কবিদের কবিতা এবং সাম্প্রতিকের অর্থাৎ গত তিন দশকের কবিদের কবিতার মধ্যে সুস্পষ্ট একটি বাঁক বদল ঘটেছে। অত্যন্ত মেধাসম্পন্ন এই কবিদের অনেকেই তাদের শক্তিশালী উদ্ভাবনী শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছেন এবং তাদের এসব সাফল্য যথাযথ স্বীকৃতি লাভ করেছে। কবিতার পরিধি, গঠনশৈলী ও আবৃত্তির কারণে দশকের পর দশকে বিকশিত কবিতা অভিনব ধারায় পৌঁছেছে এবং শাখা উপশাখা ধরে বিচিত্র বিস্তার ঘটছে। ষাট, সত্তর ও আশি’র দশক বা এর পরবর্তী কবিরা কবিতায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন এবং ক্রমান্বয়ে কবিতায় এনেছেন নতুনত্ব। যেখানে কবির সৃষ্টিশীল রচনা সময়ের দাবিতে মানবিক চেতনা গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রেও অভিনব সাড়া জাগিয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিকের কবিদের অধিকাংশ কবিতায় আমরা দেখতে পাই সাবলীল ভাষা ব্যবহার করে সুচারুভাবে রচিত নান্দনিক চিত্রকল্প। পার্থিব অথবা অপার্থিব রূপক মিশ্রিত রিয়েলিজম, ম্যাজিক-রিয়েলিজম, সুররিয়েলিজম। আমরা দেখি, শহর কিংবা গ্রামীণ প্রান্তরের পটভূমিতে পাঠকের চেতনাকে জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত কিংবা বিচ্ছিন্ন করে দেখার একটি অভিনব প্রবণতা। সাম্প্রতিকের অধিকাংশ কবিতা গদ্য ছন্দে লেখা হলেও অনেকেই অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা ছাড়াও অন্ত্যমিলের কবিতা, পদ্য ও ছড়া লিখেছেন। অন্ত্যমিলের কবিতা, পদ্য ও ছড়ায় সামাজিক বিষয়বস্তু প্রাধান্য পেয়েছে যেখানে বেশ কিছু কবিতায় রম্য ঢঙের ব্যবহার পাঠকদের আকৃষ্ট করেছে।
একটি বিষয় লক্ষণীয়, রোমান্টিকতা পেরিয়ে বস্তুবাদের প্রভাব সত্ত্বেও বাংলাদেশের কবিতার ভুবন থেকে রোমান্টিকতার পরিপূর্ণ নির্বাসন কখনো ঘটেনি। যে বিষয়টি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য, মূলধারার সঙ্ঘবদ্ধ কবি ও কবিতার গোষ্ঠীবদ্ধতা থেকে বের হয়ে বাংলাদেশের কবিতা এখন প্রধানত ব্যক্তিবৃত্তে আবদ্ধ হচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কতিপয় বিচ্ছিন্ন কাব্যব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটেছে। তত্ত্ব এখন আর প্রভাবশালী কাব্য-প্রকল্প নয়। বর্তমান বাংলাদেশের কবিতাভুবনের বাস্তবতায় রাজনৈতিক মতাদর্শ কিছু সংখ্যক ব্যতিক্রম বাদে প্রভাব-বিস্তারকারী শক্তি নয়। একই কথা খাটে শিল্পসর্বস্বতার ক্ষেত্রে। এখানেও হয়তো দু-চারজন ব্যতিক্রমীকে দেখা যাবে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কবিতা বিচ্ছিন্ন যেসব ছোট ছোট ব্যক্তিক বৃত্তে বাঁধা সেখানে সৃজনশীলতার বিচারে সবাই নিজ নিজ ধারায় সর্বাধুনিক যেন তার কোনো পূর্বসূরি নেই।
বাংলার আধুনিক কবিতা সাহিত্যে সূচনা থেকেই পাশ্চাত্য, আফ্রিকা এমনকি ল্যাটিন আমেরিকার শক্তিশালী কবিদের কবিতার প্রভাব লক্ষ করা গেছে। সাম্প্রতিককালে বিদেশি প্রভাব মুক্ততার প্রবণতা গ্রহণ করে যে নতুন ধারার কবিতা লেখার প্রচেষ্টার প্রচলন ঘটেছে সেখানে প্রধানত গ্রামীণ সমাজ, পরিবেশ-প্রকৃতি, পারিবারিক গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের পাশাপাশি সমাজ ও রাজনীতির বিভিন্ন সংকটের প্রতিফলন দেখা যায়। এসব কবিতায় প্রমিত বাংলা শব্দের পাশাপাশি কিছু সংখ্যায় আঞ্চলিক বাংলা শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। আঞ্চলিক উচ্চারণের সঙ্গে মিল রেখে সেভাবে শব্দের বানান নিরূপণ করা হচ্ছে। বাংলা ভাষার বানান নির্ধারণ করার চার তত্ত্ব ও অন্যান্য প্রচলিত সূত্রের যৌক্তিকতা সম্পর্কে নতুন ধারার কবিরা প্রশ্ন তুলেছেন। একটি ভাষায় একই অর্থযুক্ত শব্দের বিভিন্ন বানান থাকতে পারে কিনা এটা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে। আলোচনা হওয়াও প্রয়োজন। কেননা বি-উপনিবেশবাদের যে দর্শনের উপর ভিত্তি করে নতুন ধারার কবিতা রচনা করার অনুপ্রেরণা গ্রহণ করা হয়েছে সেখানে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ প্রবেশের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর সেটা যদি ঘটে তাহলে কবিতার বিশ্বজনীন আবেদন হারিয়ে বাংলা কবিতা বাংলা সাহিত্যের সর্বোৎকৃষ্ট স্থান হারিয়ে ফেলতে পারে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের কবিতা সাহিত্যের যে মজবুত ভিত্তি আজ গড়ে উঠেছে তার উপরে দাঁড়িয়ে বাংলা কবিতাকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাহিত্যামোদীর কাছে পৌঁছানোর জন্য একদিকে যেমন অনুবাদ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন অন্যদিকে খেয়াল রাখা দরকার কবিতাও সৃজনশীল বিষয়, বোধ ও অভিব্যক্তিতে যেন সর্বজনীন রূপ গ্রহণ করার মাধ্যমে বিশ্বজনীন হতে পারে।
নভেম্বর ২০১২ সূচনা সংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর যাত্রা শুরু হয়। যাদের হাত ধরে ম্যাগাজিনটির জন্ম তাদের অনেকেই আমাদের মাঝে আজ নেই। ২৮ আগস্ট ২০১৯ সালে আমরা হারিয়েছি সম্পাদনা পরিষদের অন্যতম সদস্য কবি কুহক মাহমুদকে; যিনি সূচনা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে সার্বক্ষণিক পত্রিকাটির জন্য কাজ করেছেন। সম্প্রতি, গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ আমাদের ছেড়ে গেছেন শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদের আরেকজন সদস্য কবি ও গল্পকার সুলতানা শাহ্রিয়া পিউকে। আগস্ট ২০১৩ সাল থেকে তিনি অনুপ্রাণন-এর সঙ্গে যুক্ত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি অনুপ্রাণন-এর সঙ্গে থেকেছেন একজন গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে। কবি ও গল্পকার সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের এই অকাল চলে যাওয়া অনুপ্রাণন-এর সকল কর্মী, লেখক ও শুভানুধ্যায়ীকে গভীরভাবে শোকবিদ্ধ করেছে। শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর এই সংখ্যা আমরা আমাদের সহকর্মী সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের স্মৃতিতে উৎসর্গ করছি। পাশাপাশি ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর আগামী সংখ্যা সুলতানা শাহরিয়া পিউ স্মৃতি সংখ্যা হিসেবে প্রকাশ করার ঘোষণা প্রদান করছি।
Quarterly Anupranan - Year- 13 Issue- 4; Samprotiker kobi O kobita Songkhya 4th Part
সম্পাদকীয়- দ্বাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, গল্পকার ও গল্প সংখ্যা প্রথম পর্ব।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষে পদার্পণ করেছে। ১১ বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে রয়েছে। যে অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা এখন বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে যৎসামান্য হলেও অবদান রাখার মতো কোন কাজের পরিকল্পনা গ্রহন করতে পারি। যেমন গত বছর আমরা পরিকল্পনা গ্রহন করেছিলাম বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য কবিতা এবং কবির কবিতাকর্ম নিয়ে সামগ্রিক আলোচনা চারটি সংখ্যায় সংকলিত করার। যে পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন নিজেদের সক্ষমতা মূল্যায়ণে আমাদের বিস্তর সাহায্য করেছে। কাজের মধ্য দিয়ে নিজেদের উপর আমাদের আস্থা বৃদ্ধির ফলাফল এ-বছরে বাংলাদেশের ১০০ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরষ্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য গল্প ও গল্পকারের সামগ্রিক গল্পকর্ম নিয়ে আলোচনা দ্বাদশ বর্ষের চারটি সংখ্যায় সংকলিত করার পরিকল্পনা গ্রহন। সেই পরিকল্পনার প্রথম পর্বে প্রকাশিত হলো বাংলাদেশের ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরষ্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য গল্প ও গল্পকারের কাজের উপর সামগ্রিক আলোচনা সংকলন অর্থাৎ গল্পকার ও গল্প সংখ্যা, প্রথম পর্ব।
একটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে আমরা বাংলাদেশের ১০০ জন গল্পকার নির্বাচন করেছি। প্রথমতঃ আমরা বিবেচনা করেছি আধুনিক বাংলা ভাষায় চর্চাকারী গল্পকার যাঁর জন্ম বাংলাদেশে অথবা যিনি তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময়ই বাংলাদেশে বসবাস করেছেন অথবা যাঁর প্রকাশনা ও পাঠকের মূল অংশটি ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। দ্বিতীয়ত আমরা বিবেচনা করেছি যাদের জন্ম ১৮৯৫ থেকে ১৯৬৫ খৃস্টাব্দের মধ্যে। তৃতীয়তঃ আমরা বিবেচনা করেছি যে গল্পকারের গল্পে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বাংলা সাহিত্যের সাধারণ ঐতিহ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালির স্বাধীনতা এবং জনগণের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সমাজ-বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে। চতুর্থতঃ যে গল্পকারের এক বা একাধিক গল্প বাঙালি পাঠক মহলের বড় অংশে উল্লেখিত হয়েছে এবং সমাদৃত হয়েছে। শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো জাতি তথা মানবজাতির সাধারণ এবং উন্মুক্ত অধিকারের বিষয়। কোন সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো বিবেচিত না হওয়াই কাম্য। কিন্তু তারপরও কতগুলো বিষয় থেকে যায় যে বিষয়গুলো নিয়ে আপস করা কঠিন। আর তাছাড়া প্রজন্মকে কিছু বার্তা দেয়া প্রয়োজন, যে বার্তা, বক্তব্য অথবা কর্ম, সমাজে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কারা পক্ষে ছিল আর কারা বিপক্ষে ছিল? এটা মানবতার পক্ষে অথবা বিপক্ষে থাকার মতোই একটি প্রশ্ন। যখন জাতীয় বিদ্বেষ প্রসূত হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা নিয়ে জেনোসাইড চলে তখন পক্ষের বিষয়টা শুধু রাজনৈতিক থাকে না মানবিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই যখন কোন শিল্পী বা সাহিত্যিক এরকম সঙ্কটপূর্ণ সময়ে বা পরবর্তী সময়ে মানবতার পক্ষে না গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী যুদ্ধাপরাধীদের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন তাহলে সেটাকে নিছক ব্যক্তিগত বিষয় বলে গণ্য করা কঠিন হয়ে যায়। আর এই গণ্য করতে না পারার বিষয়টি অনুপ্রাণনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
বাংলা সাহিত্যে ফর্ম হিসেবে আধুনিক ছোট গল্পের ধারণা খুব পুরানো নয়। কলকাতা কেন্দ্রিক লেখক ও বুদ্ধিজীবী আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অনেকটা ইউরোপীয় সাহিত্যের সংস্পর্শে এসেই ছোট গল্প রচনার ফর্মটি নিয়ে সাহিত্য চর্চার সূচনা করেন। তখন শুরুতে রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও প্রচার প্রোপাগান্ডার কাজে গদ্য লেখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেই গদ্য লেখার প্রয়োজনীয় ফর্মটাকে ধরে পাশাপাশি ছোটগল্প লেখার চল শুরু হলে ক্রমেই লেখক ও সাহিত্যিকদের কাছে কবিতা বা পদ্যের পাশাপাশি ছোট গল্পের ফর্মটি প্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু ছোট গল্প রচনার কৌশলটি আয়ত্ত করতে সময় লাগে। কেননা ছোটগল্প সম্পূর্ণভাবে আখ্যানভিত্তিক একটি রচনা না। আখ্যানের খণ্ডাংশকে ধারণ করে অথবা না করে অনুভূতির বিস্তৃত ক্যানভাসে কতগুলো জট সৃষ্টি এবং সেই জটের পাকানো এক একটা সুতা খোলার মধ্য দিয়ে পাঠককে ধরে রাখা, আবিষ্ট রাখার মুন্সিয়ানা না থাকলে ছোট গল্প ঠিক ছোট গল্প হয়ে ওঠে না।
অনুপ্রাণন প্রকাশিত গল্পকার ও গল্প সংখ্যার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে গল্পকারদের ছোট গল্পগুলি নিয়ে সামগ্রিক আলোচনার সাথে প্রত্যেক গল্পকারের একটি করে নির্বাচিত গল্প সংযুক্ত করা হয়েছে। এই গল্পগুলো আলোচকরাই নির্বাচন করেছেন। গল্পগুলো পাঠের এই সুযোগের মাধ্যমে এই সংখ্যাটির পাঠকরা প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত গল্পকারদের লেখার সাথে পরিচিত হতে পারবেন। বাংলাদেশের গল্পগুলো পাঠ করলে দেখা যাবে কতগুলো গল্প প্রেমবিষয়ক অর্থাৎ এসব গল্পে প্রেম ও রোমান্স প্রাধান্য পেয়েছে। কতগুলো গল্পে গ্রামীণ, আর কতগুলো গল্পে সামাজিক প্রতিবেশ এবং গ্রামীণ অথবা শহুরে সমাজের চিত্র মেলে। বাংলাদেশের গল্পে প্রকৃতি ও মানুষ সবসময় প্রাধান্য পেয়েছে, যেসব গল্পে প্রকৃতির পটভূমিতে চরিত্রাঙ্কন করা হয়েছে। কম হলেও আমরা এমন কিছু গল্প পেয়েছি যেখানে অতিপ্রাকৃত-ভাব বা রহস্য-আচ্ছন্নতা লক্ষ করা যায়। কোন কোন গল্পে হাস্যরস ও নিখাঁদ বিনোদন প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলাদেশের গল্পকারদের কতগুলো এমন গল্প আছে যে গল্পগুলোতে অসম্ভব বা অবাস্তব কাহিনী বর্ণিত হতে দেখা যায় যেখানে কতগুলো গল্পের পাত্রপাত্রী বা পরিবেশকে না বুঝিয়ে সাংকেতিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্থান বা চরিত্রকে বোঝানো হয়েছে অথবা বার্তা প্রদান করা হয়েছে। ইতিহাসভিত্তিক গল্পগুলোতে কোনও একটি বিশেষ ঐতিহাসিক কালে সংঘটিত ঘটনা বর্ণিত হতে দেখা গেছে। সেখানে দেশ ভাগ, ভাষা আন্দোলন, গণ-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। খুব কম হলেও কিছু গল্প আছে যেখানে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও তত্ত্বের সাহায্য নিয়ে গল্পটি রচিত হয়েছে। বাংলাদেশের গল্পে এধরণের গল্পের প্রাধান্য দেখতে পাওয়া যায় যেখানে শহুরে অথবা গ্রামীণ পরিবেশের প্রেক্ষাপটে পারিবারিক ও গৃহজীবন প্রাধান্য পেয়েছে। তুলনামূলক কম হলেও এরকম বেশ কয়েকটি গল্প দেখতে পাওয়া যায় যেখানে নর-নারীর মনস্তত্ত্ব ও মানসিক টানাপোড়েন নিয়ে রচিত হয়েছে। বাংলাদেশের গল্পে এরকম গল্প আছে যেখানে মনুষ্য নয় এমন কোন প্রাণী প্রধান চরিত্র হয়েছে। বাস্তবনিষ্ঠ গল্পে যেখানে জীবনের কোনও ঘটনা বা দিক অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ ও অকপট ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। কম হলেও কিছু গল্পে পুলিশি তদন্ত ও সত্যানুসন্ধানের রোমাঞ্চকর বর্ণনা পাওয়া যায়। কিছু গল্প আছে যেগুলো বিদেশি পটভূমিকায় বাংলাদেশী অভিবাসী অথবা বিদেশী নরনারীর চরিত্রাঙ্কন করা হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণভাবে ছোটগল্পের প্রায় সব শাখার গল্পই বাংলাদেশের গল্পকারেরা লিখেছেন।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা - গল্পকার ও গল্প সংখ্যাঃ প্রথম পর্ব
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার দ্বিতীয় পর্ব—সম্পাদকীয়
প্রকাশিত হয়েছে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা—সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার দ্বিতীয় পর্ব। অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিকের ১০০ গল্প ও গল্পকার আয়োজনের এটা দ্বিতীয় পর্বের প্রকাশনা। ইতিপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকারে প্রথম পর্বে আমরা নির্বাচিত ১০০ জন গল্পকারের মধ্যে বয়স অনুক্রমে জ্যেষ্ঠ থেকে কনিষ্ঠ এবং লেখা প্রাপ্যতার ভিত্তিতে ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি তাদের একটি করে উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা প্রকাশ করেছি। একইভাবে এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে নির্বাচিত ১০০ জন সাম্প্রতিকের গল্পকার থেকে বয়স অনুক্রমে জ্যেষ্ঠ থেকে কনিষ্ঠ এবং লেখা প্রাপ্যতার ভিত্তিতে আরও ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি তাদের একটি করে উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা।
সাম্প্রতিকের গল্পের বিষয় ও বৈশিষ্ট্যে বাঁকবদল এবং বিশেষ করে গল্পে উত্তর-আধুনিক প্রবণতা নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হয়েছে, লেখালেখি হচ্ছে। উত্তর আধুনিক সাহিত্য, বিশেষ করে উত্তর-আধুনিক ছোটগল্পের বিষয় ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে স্বতন্ত্র এবং অধিকাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য বয়ান, সুনিশ্চিত বর্ণনা পাওয়া কঠিন। তাছাড়া উত্তর-আধুনিক প্রবণতা বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত। কোনো কোনো সময় এই প্রবণতার মধ্যে ভূতের মতো পেছনে হাঁটার অর্থাৎ পশ্চাদপদতার ভূত সওয়ার হতেও দেখা যায়।
উত্তর-আধুনিক গল্পে প্রায়শই ক্ষমতা, আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এটি রাষ্ট্রীয়, সামাজিক বা পারিবারিক হতে পারে। ব্যক্তি কীভাবে একটি নির্দিষ্ট সিস্টেম বা কাঠামোর মধ্যে শৃঙ্খলিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়, গল্পগুলোতে তা দেখানো হয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক বন্দোবস্তের চাপ কীভাবে মানুষের মনন ও আচরণকে প্রভাবিত করে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে গল্পগুলোতে প্রস্ফুটিত হয়েছে। প্রচলিত বাস্তবতার বাইরে গিয়ে মানুষের মানসিক ও অস্তিত্বের গভীর জটিলতা, দ্বিধা ও সংঘাতকে তুলে ধরা হয়েছে। আধুনিক সমাজে ব্যক্তি কীভাবে বিচ্ছিন্ন ও অসহায় বোধ করে, বা কীভাবে ব্যক্তি তার চারপাশের সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে লড়াই করে, তা উত্তর-আধুনিক গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দেখা যায়। তাছাড়া গল্পে ঘটনার ক্রম প্রায়শই অ-রৈখিক অর্থাৎ ধারাবাহিক না হয়ে খণ্ডিত ও বিক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। রূপ ও আঙ্গিকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে যেখানে গল্প বলার ধরন ও ভঙ্গিতে নতুনত্ব আনা হয়েছে। প্রচলিত ধারা বা কাঠামোর বাইরে গিয়ে পরীক্ষামূলক আঙ্গিক ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো কোনো গল্পে একটি একক ও সম্পূর্ণ আখ্যানের পরিবর্তে, খণ্ডিত আখ্যান কাঠামোতে গল্পগুলো অনেক সময় খণ্ড খণ্ড অংশ নিয়ে গঠিত হতে দেখা গেছে যা পাঠককে নিজস্বভাবে একটি অর্থ সৃষ্টি করতে উৎসাহিত করতে পারে। তাছাড়া উত্তর-আধুনিক গল্পে ঐতিহ্যগত কাঠামোর ভাঙন ঘটতে দেখা যায় যেমন কোন একটি নির্দিষ্ট প্লটের অনুপস্থিতি। উত্তর-আধুনিক গল্পগুলোতে বাস্তবতার নতুন ব্যাখ্যা অর্থাৎ প্রচলিত বা বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতার বাইরে গিয়ে এক নতুন ও ভিন্ন বাস্তবতাকে উপস্থাপন করতে দেখা গেছে, যেখানে মনস্তাত্ত্বিক বা প্রতীকী দিকগুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। একে অপরকে ছাড়া এগুলোর অস্তিত্ব থাকতে পারে না। শিল্প-সাহিত্য যেমন মানুষের আবেগ, চিন্তাভাবনা ও অভিজ্ঞতার সৃজনশীল প্রকাশ, অন্যদিকে সংস্কৃতি হলো একদল মানুষের ভাগ করা জীবনযাত্রার মধ্যে রয়েছে তাদের ঐতিহ্য, বিশ্বাস, সভ্যতা, জীবনযাত্রা, মূল্যবোধ ও রীতিনীতি। শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত হয় এবং সংস্কৃতি শিল্পকে অর্থ ও দিকনির্দেশনা দেয়। শিল্প ও সংস্কৃতির মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক দেখায় যে মানুষ কীভাবে তাদের পরিচয় প্রকাশ করে এবং কীভাবে তারা জীবনযাপন করে। সংস্কৃতি থেকেই শিল্প-সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। প্রতিটি সমাজ নিজস্ব শিল্প-সাহিত্যের রূপ সৃষ্টি করে—চিত্রকলা, সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য, স্থাপত্য ও কারুশিল্প- যা তার ইতিহাস ও পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করে। উদাহরণস্বরূপ, ধ্রুপদি নৃত্য ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে লোকগান গ্রামীণ জীবনের আনন্দ ও দুঃখকে প্রতিফলিত করে। একইভাবে, বিভিন্ন দেশের শিল্প-সাহিত্য তাদের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য দেখায়। শিল্প ও সাহিত্যের মাধ্যমেই মানুষ তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেয়।
সংস্কৃতি আমাদের শিল্প ও সাহিত্যকে বোঝার এবং মূল্য দেওয়ার ধরনকেও প্রভাবিত করে। একটি সমাজ যাকে সুন্দর বা অর্থবহ বলে মনে করে তা অন্য সংস্কৃতিতে ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, উপজাতীয় শিল্প সম্প্রদায়ের জীবন প্রকৃতির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, অন্যদিকে আধুনিক শিল্প প্রায়শই ব্যক্তিগত আবেগ ও সংগ্রাম প্রকাশ করে। এটি দেখায় যে শিল্প ও সাহিত্য কেবল একটি ব্যক্তিগত সৃষ্টি নয় বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পণ্যও। একই সঙ্গে, শিল্প সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতাকে প্রভাবিত করে। এটি মানুষের ধারণা পরিবর্তন করতে পারে, সামাজিক আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং ঐক্য তৈরি করতে পারে। শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা তাদের কাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা, শান্তি প্রচার করতে এবং মানবিক মর্যাদা উদযাপন করতে ব্যবহার করেন। এইভাবে, শিল্প ও সাহিত্য সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং রূপান্তরের জন্য একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। যখন মানুষ গল্প, সংগীত বা চিত্রের মাধ্যমে শিল্প অনুভব করে তখন তারা আবেগ এবং ধারণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় যা তাদের সংস্কৃতিকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে। তাই শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক— প্রতিফলিত ও গতিশীল উভয়ই। শিল্প ও সাহিত্য যে সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত সেখানে তার প্রতিফলন ঘটায় এবং একইসঙ্গে সংস্কৃতি শৈল্পিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিকশিত হয়। পারস্পরিকভাবে তারা মানবতাকে তার অতীত সংরক্ষণ করতে, তার বর্তমান বুঝতে এবং তার ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে সহায়তা করে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের যোগসূত্রের সেতু ভাঙার যারা আয়োজন করতে চায় তারা জাতির শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির কোনো না কোনো অঙ্গ পঙ্গু করার অপকর্মটাই করতে চায়।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 3; Contemporary Stories & Storytellers (Part-2)
অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব- সম্পাদকীয়
সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম পর্ব প্রকাশিত হওয়ার পর সাম্প্রতিকের আরো ২৫ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কবিতা ও কবিতা নিয়ে সামষ্টিক আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হলো শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব। দ্বিতীয় পর্বের এই ২৫ জন কবির নাম ইতোপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম পর্বের ন্যায় অনুপ্রাণনের ১০০ নির্বাচিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের কবি তালিকা থেকে নেয়া যাদের জন্ম ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হয়েছে। তালিকার অবশিষ্ট ৫০ জন নির্বাচিত কবি নিয়ে লেখা প্রকাশিত হবে আগামীতে প্রকাশিতব্য শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় ও চতুর্থ সংখ্যায়।
সংখ্যাটিতে অন্তর্ভুক্ত সাম্প্রতিকের কবিদের কবিতা নিয়ে আলোচনায় কয়েকটি বিষয় এসেছে যেমন- প্রতিকবিতা, উত্তর-আধুনিকতা, নৈরাজ্যবাদ ইত্যাদি। শুধু কবিতা নয় সামগ্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে নানা পর্যায়ে পরিবর্তনের সূত্র হিসেবে এই দর্শনগুলো নিয়ে আলোচনা আছে। দর্শন হিসাবে উত্তরাধুনিকতাবাদ- যুক্তিবাদীতার বিরুদ্ধে, বস্তুনিষ্ঠতার বিরুদ্ধে এবং সর্বজনীন সত্যের ধারণাগুলিকে প্রত্যাখ্যান করে। যার পরিবর্তে, এটি মানুষের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির বিচিত্রতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির বহুবিধ আপেক্ষিকতার উপর জোর দেয়। উত্তর-আধুনিক কবিতা প্রায়ই অর্থহীনতা অথবা বাস্তবতার অনুপস্থিতি প্রসঙ্গ নিয়ে কাজ করে এবং একটি অস্তিত্বগত দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করে। উত্তর-আধুনিক প্রতিকবিতায় প্রায়ই অস্থিরতার বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করে সাধারণত মুক্ত বিন্যাসে লেখা হতে পারে। কবিতায় অপ্রত্যাশিত লাইন বিরতি, বিশৃঙ্খল কাঠামো- এসব আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন হতে পারে। উত্তর-আধুনিক কবিতা প্রায়শই অস্তিত্ববাদী বা নিহিলিস্টিক প্রসঙ্গ নিয়ে কাজ করতে পারে। যদিও অস্তিত্ববাদ এবং উত্তর-আধুনিকতা সমার্থক নয়, তারা প্রায়শই সম্প্রর্কিত হতে দেখা যেতে পারে।
উত্তর-আধুনিক কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো কী- এই প্রশ্নটির উত্তরে একটা ধারনা দাড় করানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। আপাতত যে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে সেগুলো যেমন, প্রথমত, এলোমেলো ভাব- কেননা উত্তরআধুনিক রচনাগুলি শব্দের পরম অর্থের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। দ্বিতীয়ত, কৌতুকপূর্ণতা- কোন কোন ক্ষেত্রে কালো হাস্যরস, শব্দ নিয়ে খেলা, বিরোধালঙ্কার, বিড়ম্বনা এবং কৌতুকপূর্ণতার অপরাপর কৌশলগুলি যা কিনা প্রায়শই অর্থগুলোকে ঘোলাটে করার জন্য নিযুক্ত করা হয় যেন পাঠক দুর্বোধ্যতার ঘোরে একটি ভিন্নধরনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। তৃতীয়ত, বিবরণে- এমন কতগুলো অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিভাজন নিয়ে আসা যে টুকরোগুলি যুক্ত করে যে কোলাজ হতে পারে সেটা যেনো প্রায়শই অস্থায়ী বিকৃতরূপ ধারণ করে। চতুর্থত, মেটাফিকশন হতে পারে- অর্থাৎ কল্পকাহিনীর এমন বিশেষ একটি রূপ হতে পারে যা প্রকাশের জন্য রচনার বর্ণনামূলক কাঠামোকে এমনভাবে সাজানো হয় যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যই যেন পাঠক/দর্শকদের মনে করিয়ে দেয়া যে তারা একটি কাল্পনিক কাজ পড়ছে বা দেখছে। এবং পঞ্চমত ইন্টারটেক্সচুয়ালটি বা আন্তঃপাঠ্যতা- অর্থাৎ একটি পাঠ্যের অর্থ অন্য এক/একাধিক পাঠ্য দ্বারা প্রকাশ করা- যেটা হতে পারে একটি ইচ্ছাকৃত সৃজনশীল রচনাকৌশল যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে উদ্ধৃতি, ইঙ্গিত, অনুহরণ, কুম্ভিলকবৃত্তি, অনুবাদ, অনুকরণ অথবা প্যারোডি। তবে খেয়াল রাখতে হয় যে প্রতিকবিতা তখনই সফল হয় যখন ছন্দঃপ্রকরণ, ব্যাকরণ এবং অন্ত্যমিলে ইচ্ছাকৃতভাবে করা ভুলগুলোর বিশৃঙ্খলার মাঝে নান্দনিক প্রকাশভঙ্গী নিহিত থাকে।
মধ্যযুগের সাহিত্যে প্রবণতা ছিল সত্য ও মিথ্যার দ্বিমাত্রিক বয়ানের যেখানে পারলৌকিক শক্তি ও পরলৌকিকতা প্রকাশ্যে অথবা আড়ালে ঢুকে পড়েছে সর্বভারত উৎসারিত নিজস্ব নানা কথন বা বয়ান। এর অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও উপলব্ধি নিতান্তই ব্যক্তিক। যখন থেকে নির্ভেজাল ইহজাগতিক সত্যের উপর ভিত্তি করে সাহিত্য নির্মিত হতে থাকল তখন থেকে শুরু হলো আধুনিক সাহিত্য। কবিতায় যেমন উপন্যাসেও তেমন আধুনিক লেখক বস্তুবাদী, নৈর্ব্যক্তিক এবং নির্মোহ। বাঙলার আধুনিক সাহিত্য গঠনে ইউরোপের রেনেসাঁ পরবর্তী কালে রচিত সাহিত্যের প্রভাব রয়েছে। একইভাবে উত্তর-আধুনিক প্রবণতা আমাদের দেশজ দর্শন থেকে উৎসারিত না। কিন্তু, ব্যাপ্তি ও গভীরতায় আধুনিকতার তুলনায় উত্তর-আধুনিকতার বিষয় এবং মিথস্ক্রিয়া বহুবিস্তৃত। বৃহৎ নয়, ক্ষুদ্র; সমগ্র নয়, অংশ; গোছানো কিন্তু শৃঙ্খলাবদ্ধ নয়, এলোমেলো অথবা উদ্ভট; প্রথাগত নয়, নিরীক্ষামূলক; বিভিন্ন ক্ষেত্রের মিশ্রণ এবং মিথস্ক্রিয়া; ন্যারেটিভের অস্পষ্টতা; কোনো সাংস্কৃতিক প্রকল্পে একটি নয় বহু স্বরের সমাহার ইত্যাদিকে মনে করা যেতে পারে উত্তর-আধুনিকতার গুণ বা বৈশিষ্ট্য হিসেবে।
প্রাক-বাংলাদেশ পর্বে কোন কবি নয় বরঞ্চ সাঈদ আহমদ-ই বলা যায় উত্তর-আধুনিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে প্রথম অ্যাবসার্ড ঘরানার নাটক লিখেন। তিনি-ই প্রথম রূপকথা নিয়ে ফ্যান্টাসি ঘরানার নাটক লিখেন যা একই সঙ্গে ছিল এলেগরিকাল। অন্যদিকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অস্তিত্ববাদের ওপর ভিত্তি করে উপন্যাস লিখেন। এঁরা দুজনই বিদেশে প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন এবং পশ্চিম ইউরোপীয় সাহিত্য এবং দর্শনের সঙ্গে বেশ পরিচিত ছিলেন।
রেফারেন্স, প্রতীক, উৎপ্রেক্ষা ব্যবহার করে কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কবিতা এক জটিল সমীকরণে সম্পর্কিত হয়ে একইসাথে আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক স্বভাব ধারণ করেছিলো। উত্তর-আধুনিকতার উল্লিখিত এই প্রধান বৈশিষ্ট্যসমুহ রপ্ত করার পর বাকি যা থাকে সেসব কবিকে তাঁর নিজস্ব শৈলী উদ্ভাবনের মাধ্যমেই স্বাক্ষর রাখার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। উত্তর আধুনিকতার বিশাল ক্যানভাসে বাংলাদেশের কবিতা ক্রমেই মৌলিক, সৃজনশীল ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে।
Quarterly Anupranan 13th Year 2nd Issue, Samprotiker Kabi O Kobita- 2nd Part
‘চিন্তকের খসড়া খাতা’ একজন চিন্তাশীল লেখকের সৃজনশীল চর্চার একটি দলিল। আর এই দলিলটির মুসাবিদা করেছেন কবি, কথসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক স্বপঞ্জয় চৌধুরী। সাহিত্যের বহু বিচিত্র পথের বহুবর্ণিল প্রকৃতিকে তিনি যূথবদ্ধ করেছেন তেইশটি প্রবন্ধে। বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য তিনি এমনভাবে বিন্যন্ত করেছেন যাতে একজন জ্ঞানপিপাসু সাহিত্যামোদী যেমন জ্ঞানের এক বিস্তৃত ক্যানভাস পাবেন নিজেকে সমৃদ্ধ করতে তেমনি একজন গবেষক পেয়ে যাবেন অনেক তথ্য উপাত্ত।
যদি তাঁর খসড়া খাতাকে আমরা বিন্যাস করি তাহলে তাতে বহুমুখী প্রবণতা আমরা চিহ্নিত করতে পারি। কবিতায় তিনি নিয়ে এসেছেন নন্দনতত্ত্ব ও শিল্পের কারুকাজ, কবিতার শত্রু-মিত্র, কবিতায় ব্যবহৃত উপমা, অলঙ্করণ ও প্রতীক ইত্যাদি। আলোচনায় তুলে এনেছেন কবি মোহাম্মদ রফিকের কবিতার জীবনবোধ ও প্রকৃতি ভাবনা, অধুনাবাদের কবি ওবায়েদ আকাশ, মাহফুজ আল হোসেনের প্রেম ও বিপ্লবের কবিতা, কবিতার নিভৃত অন্তঃপ্রাণ কবি মোহাম্মদ হোসাইন এবং নির্জনতার কবি পরিতোষ হালদার। তাঁর খসড়া খাতায় স্বপঞ্জয় চৌধুরী তীক্ষ্ণ আলো ফেলেছেন গদ্য সাহিত্যের বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গনে। তিনি বিশ্লেষণ করেছেন পঞ্চাশ বছরের ছোটগল্পের, সাদ কামালীর প্রান্তিক জীবন ভাবনা, শরৎচন্দ্রের প্রেম বিরহ পরিণয় ও পরকীয়া এবং উপন্যাস দিকু’র নিঃসঙ্গ জীবনোপাখ্যানে। বিশেষভাবে আলোকপাত করেছেন হাংরি জেনারেশন মুভমেন্ট, হুমায়ুন আজাদের বহুমাত্রিকতা ও প্রথাবিরোধিতা। পাশাপাশি মিথলজির অঙ্গনেও এঁকেছেন নিজের পদচিহ্ন। তুলে এনেছেন গ্রিক মিথলজির সৃষ্টিতত্ত্ব, নানান দেশের লোকাচার ও মিথ, বাংলা সাহিত্যে গান ও ঈদোৎসব। তিনি তাঁর খসড়ার সম্ভার আরো সমৃদ্ধ করেছেন সিরিয়ান প্রথাবিরোধী কবি নিজার কাব্বানির জীবন ও কবিতার উপর আলোকপাত করে।
বইটির বহুমুখীনতায় সাহিত্যের পাঠকের তৃষ্ণা নিবারণে সক্ষম হবে এই প্রত্যাশা অবশ্যই করতে পারি।
আলী সিদ্দিকী
কবি ও কথাসাহিত্যিক
সম্পাদকঃ মনমানচিত্র
Cintoker Khsra Khata by Swaponjoy Chowdhury
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা : সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা তৃতীয় পর্ব- সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিক কালের ১০০ গল্পকারকে নিয়ে চতুর্দশ বর্ষের বিশেষ আয়োজনের পারম্পরিক ধারাবাহিকতার তৃতীয় পর্বে এসে আরও ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে প্রকাশিত হলো সাম্প্রতিকের (জন্ম : ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫) গল্প ও গল্পকার সংখ্যা, তৃতীয় পর্ব। সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার ১ম ও ২য় পর্বের মতো এই পর্ব অর্থাৎ ৩য় পর্বে ২৫ জন গল্পকারের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা প্রকাশের মাধ্যমে নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে এ-পর্যন্ত মোট ৭৫ জন গল্পকারকে নিয়ে তথ্য ও আলোচনাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ প্রকাশের কাজ সম্পন্ন হলো। অবশিষ্ট ২৫ জন গল্পকারদের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা আগামী চতুর্থ পর্বে প্রকাশিত হবে বলে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব নির্মাণের মূল উপাদান হচ্ছে, সময় ও মানুষ। মানুষের চেতনাজাত রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম ও ভৌত প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রভাবিত সমাজ ও সংস্কৃতির বিচার ও বয়ান। গত চার বছর ধরে অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক শিল্প-সাহিত্য ম্যাগাজিনে গত শতাব্দীর প্রথম থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিকদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা প্রবন্ধসমূহ সংকলিত করে যে সহায়ক সাহিত্যসম্পদ প্রস্তুত করা হচ্ছে সে-সকল সহায়ক সম্পদ বা উৎস ব্যবহার করে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গবেষণা হতে পারে। সেই গবেষণার একটি হতে পারে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের সমাজতত্ত্বের বস্তুনিষ্ঠ বয়ান।
আমরা এটা অধ্যয়ন করতে পারি- বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য কীভাবে সমাজ থেকে উদ্ভূত হলো, কী কী বৈশিষ্ট্য ধারণ করল, কীভাবে সাহিত্যে সমাজের প্রতিফলন ঘটাল এবং পাশাপাশি সমাজের ওপর সাহিত্য কী প্রভাব ফেলল? সাহিত্যে, ক্ষমতা, প্রতিযোগিতা ও সামাজিক কাঠামো কীভাবে কাজ করেছিল বা করে যাচ্ছে? এসব অধ্যয়ন থেকে হয়তো আমরা পেতে পারি এই তথ্য যে বাংলা দীর্ঘদিন উপনিবেশ থেকেছে। উপনিবেশ থাকাকালে ভিনদেশি শাসকের রাজনীতি, অর্থনীতির প্রভাবে পড়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির যেমন রূপান্তর ঘটেছে তেমনি বিকৃতিও ঘটেছে। ভিনদেশি উপনিবেশবাদী শক্তির প্রভাবের ফলে বাঙালির মননে এক গভীর আত্মপরিচয় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আর যখনই এই উপনিবেশবাদী মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে ভাষা, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে বাংলার মাটি ও পরিবেশজাত নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ধারায় নিয়ে এসে মুক্তচর্চা করার চেষ্টা বাঙালি করেছে তখনই ঔপনিবেশিক ধারার পৃষ্ঠপোষক ও কট্টরপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীর দিক থেকে আঘাত ও আক্রমণ এসেছে।
এই বিষয় ছাড়াও আমাদের অধ্যয়ন অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হতে পারে। যেমন, সমসাময়িক ছোটগল্পের আলোচনায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- গল্পকারেরা তাদের গল্পে কীভাবে সীমিত স্থান ব্যবহার করে পরিচয়, বিচ্ছিন্নতা, মনস্তাত্ত্বিক বাস্তববাদ এবং সামাজিক বিষয়গুলো (জাতি, শ্রেণি, ভোগবাদ) গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন। তাছাড়াও এই বিষয়েও আলোকপাত করা যেতে পারে যে কীভাবে প্রাণবন্ত চরিত্র, প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রাঞ্জল বর্ণনায় আধুনিক জটিলতাগুলো প্রতিফলিত করার জন্য বিভিন্ন শৈলী (ব্যঙ্গ, ভৌতিক, জাদুকরী বাস্তববাদ) ব্যবহার করা হয়েছে। আলোচনা ও অধ্যয়নে উঠে আসতে পারে যে কোনো কোনো সমালোচক সাম্প্রতিক রচিত গদ্যভাষায় নীরসতা বা অতি-সরলীকরণের প্রবণতার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দ্রুত পড়ে ফেলার উপযোগী করে রচনা করার বাইরে এসে ফর্ম এবং থিমকে আরও গভীরভাবে জড়িত করার প্রত্যাশা করেছেন। কোনো কোনো আলোচক কেবল গল্পের সারাংশে সীমাবদ্ধ না থেকে তার বাইরে গিয়ে গল্পের অর্থ প্রকাশে প্লট, চরিত্র, থিম এবং সাহিত্য কৌশলের (প্রতীকীকরণ, চিত্রকল্প) মতো উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে গল্পের অর্থ প্রকাশে তাদের কার্যকারিতা যথাযথ মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন।
অধ্যয়নে তুলে ধরা যেতে পারে যে সাহিত্য আলোচনাগুলো প্রস্তুত করতে গিয়ে বিশেষ করে চারটি বিষয়ের দিকে গভীর দৃষ্টি প্রদান করার প্রয়োজন হয়েছে। প্রথমেই এসেছে পরিচয় এবং অন্তর্ভুক্তি বোধের মতো বিষয়গুলো। যেমন সাংস্কৃতিক স্থানচ্যুতি, অভিবাসী মনস্তত্ব ও অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বায়িত বিশ্বে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত অথবা জাতীয় আত্ম-অনুসন্ধান। দ্বিতীয়ত, চরিত্র রূপসমূহের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। যেমন, বাস্তব ঘটনাসমূহের সাক্ষাৎ ব্যাখ্যা অথবা স্বগত ও বহুপাক্ষিক সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রগুলোর মনের অভ্যন্তরের জটিল ও অন্ধকার জগৎ উন্মোচন করা। তৃতীয়ত, গল্পের সামাজিক ভাষ্য অর্থাৎ ভোগবাদ, রাজনীতি, জাতি এবং শ্রেণি বিভাজনের সমালোচনা করার জন্য ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ও অ্যাবসার্ডবাদ ব্যবহার করা। এবং চতুর্থত, রূপ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা অর্থাৎ অনন্য কাঠামো, বিভিন্ন অথবা বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গি (উত্তর-ঔপনিবেশিক, নারীবাদী ইত্যাদী) ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, ফ্যান্টাসি এবং জাদুকরী বাস্তবতার মতো ধারাগুলোর সাথে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে ছোটগল্পের আধুনিক বিভাজন বৈশিষ্ট্য আয়ত্তে নিয়ে আসা। কেউ কেউ এটাও মনে করেছেন যে সমসাময়িক গল্পগুলো সংকীর্ণ জনতাত্ত্বিক বা উপরে ভাসা বিষয়গুলোর উপর খুব বেশি কেন্দ্রীভূত হতে দেখা গেছে। তাছাড়া দ্রুত, সহজে হজমযোগ্য গল্পের বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে গভীর, জটিল অভিজ্ঞতা প্রদানের জন্য প্রস্তুত প্রকৃত শৈল্পিক সম্ভাবনাময় গল্পের চাহিদার ক্ষেত্রে ভাটা সৃষ্টি করে থাকতে পারে। সত্যিকার অর্থে উদ্ভাবন না করে নির্দিষ্ট ‘ধরনের’ (যেমন, অকার্যকর পরিবার, সমাজবিচ্ছিন্ন যুবক) উপর খুব বেশি নির্ভরশীল গল্পগুলো একঘেয়েমির উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শিল্প-সাহিত্য মানুষকে ধ্বংস নয় সৃজনশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। গভীর অনুভূতি, বোধ ও সংযোগের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যা ভাষাগত সীমানা ছাড়িয়ে মানুষে মানুষে, সংস্কৃতিতে সংস্কৃতিতে মেলবন্ধন ঘটায়। ব্যক্তি ও সমাজকে সৌন্দর্য, আনন্দ, দুঃখ, প্রেম, বেদনা ও জীবনের গভীরে নিয়ে যায়, যা তাকে আত্ম-অনুসন্ধান ও বিশ্বকে নতুনভাবে উপলব্ধিতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যচর্চা সকল প্রকার সংরক্ষণবাদ মুক্ত হয়ে মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন চেতনাবোধ অব্যহতভাবে ধারণ করে যাবে। সংরক্ষণবাদ মুক্ত মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন এই চেতনাবোধ থেকে বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্যচর্চা বিচ্ছিন্ন করার সকল অপচেষ্টা বাংলাদেশের কবি, গল্পকার, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকেরা মিলিতভাবে রুখে দেবে এটাই বাস্তব।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 4; Contemporary Stories & Storytellers (Part-3)
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.













There are no reviews yet.