Additional information
| Weight | 0.210 kg |
|---|---|
| Published Year |
$ 0.99 $ 1.65
লেখকের কথা-
পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। এর দ্বারা একটি সময়ে সংঘটিত নানান ঘটনার বিশ্লেষণ করা যায়। তাই, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও বহুমুখী দিকগুলো অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করতে সেই সময়ে প্রকাশিত পত্রিকার রিপোর্টগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।
২০১৬’র নভেম্বরে দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক আশফাক ভাই একদিন বললেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষ ১৭ দিনে (ডিসেম্বর ০১ – ডিসেম্বর ১৭) আন্তর্জাতিক পত্রিকায় প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক রিপোর্টগুলোর অনুবাদ নিয়ে একটি ধারাবাহিক সিরিজ করে দেয়ার জন্য। শুনেই আমি রাজি হয়ে যাই। দৈনিক ইত্তেফাকে ২০১৬’এর ০১ ডিসেম্বর হতে ১৫ ডিসেম্বর (১৪ ডিসেম্বর বাদে) পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ১৪টি রিপোর্টের অনুবাদ প্রকাশ হয়েছিল।
এই বইতে সেই ১৪টি রিপোর্টের অনুবাদ সহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মোট ২০টি রিপোর্টের অনুবাদ রয়েছে। ডিসেম্বর ০১-১৭ এর ১৮টি রিপোর্ট ও মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় মার্চের ০২ টি রিপোর্টের অনুবাদ সংযুক্ত হলো।
অনুবাদগুলো ভাবানুবাদ এবং পত্রিকার রিপোর্টগুলো মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টের সংগ্রহশালা হতে সংগ্রহীত।
এই অনুবাদ রিপোর্টগুলো বই আকারে প্রকাশের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন সহযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টের সভাপতি শান্তা আনোয়ার।
| Weight | 0.210 kg |
|---|---|
| Published Year |
সুপ্রিয় দিনলিপি
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির হাজার বছরের সংগ্রামের বিরল দৃষ্টান্ত। আমাদের এই গৌরবময় অর্জনের কারিগর বাংলা মায়ের সূর্য সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর মোহন বাঁশির সুরে মোহিত হয়ে বাংলার এই দামাল ছেলেরাই সেদিন ছিনিয়ে এনেছিল আমাদের স্বাধীনতা।
যাহিদ সুবহান আমার স্নেহের অনুজ। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার গভীর আগ্রহ প্রশংসার দাবী রাখে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার ধারাবাহিক কাজের অন্যতম ‘অচেনা রোদ্দুরে হেঁটেছিল যাঁরা’ গ্রন্থটি। নানা সীমাবদ্ধতা সত্বেও সে মাটিবর্তী উৎস থেকে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে আনার চেষ্টা করছে, যা প্রশংসার দাবীদার। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে তার এই চেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। জয় বাংলা।
মো. শফিউল্লাহ্
লেখক-মুক্তিযুদ্ধ গবেষক
সভাপতি, প্রজন্ম’৭১, আটঘরিয়া, পাবনা
Ochena Roddure Hetechilo Zara by Zahid Subhan
জন্ম ২ জানুয়ারি ১৯৮৩ নোয়াখালীতে। ২০০০ সালের মাঝামাঝিতে লেখালেখিতে সচেতনভাবে মনোযোগী হন। সিরিয়াস লেখার পাশাপাশি রম্য রচনাও করেছেন। পেশায় পা-ুলিপি সম্পাদক এবং সাংবাদিক।
গল্পকথায় ৩৫ গল্পকার
১৯৫৮ সালে জিম ম্যাকিনলি নামের এক আমেরিকান মিশনারি কার্যক্রম চালানোর উদ্দেশ্যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে সপরিবারে ফেনী অবস্থানকালে পাক বাহিনীর অতর্কিত বিমান হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিল তাঁর পরিবার। সুযোগ পেয়েও তিনি পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ ত্যাগ করতে রাজি হননি। নিজের জীবন বাজি রেখে বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের ফসল ৮ মাসের দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত ‘ডেথ টু লাইফ’। নাহার তৃণার বাংলা রূপান্তর ‘মৃত্যু পেরিয়ে জীবন’। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকার মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিলেও সেদেশের অসংখ্য হৃদয়বান মানুষ নিজ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বাঙালিদের জন্য খুলে দিয়েছিলেন উদারতা ও মমত্বের দুয়ার। ম্যাকিনলি রচিত এই স্মৃতিকথা তারই এক অনন্য উদাহরণ।
Mrittu Periye Jibon By JIm Mckinley, Translated By Nahar Trina - এক আমেরিকান মিশনারির একাত্তরের স্মৃতি
ভূমিকা-
১৯৭১সাল। তখন আমি খুবই ছোট।চারিদিকে অবিরাম গুলাগুলির শব্দ।নারকেল গাছের মাথা ছুঁয়ে উড়ে যাচ্ছে যুদ্ধ বিমান।বড়দের কাছে শুনেছি- শেখসাবকে বন্ধি করে পাকিস্তান নিয়ে গেছে।শান্তি প্রিয় বাঙ্গালিরা সেদিন- যতটাই না হয়েছিলো আতঙ্কিত!ততবেশিই হয়েছিলো ক্ষুব্ধ এবং অপ্রতিরোধ্য। চাপা ক্ষোভে ছিলো দাবানলের তীব্রতা।
মাঝে মাঝে বাতাসে ভেসে আসছে- অগ্নি সংযোগ,ধর্ষণ লুন্ঠন আর বিবর্ষ অত্যাচারের গন্ধ।আর রক্তহিম করা মানুষের করুণ চিৎকার! । চারিদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।বাতাসে কান পাতলেই শোনা যায়- অসহায় মানুষের অসহায় হাহাকার! শক্ত মনেও ধরেছিলো,মাঘের কাঁপুনি। মানসিকভাবে অনেকেরই ভেঙে পড়েছিলো সেদিন।মান আর প্রাণ বাঁচাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ,বাধ্য হয়েছিলো,দেশ ছাড়তে।কারণ সেদিন দেশের কিছু সংখ্যক মানুষ, দেশের সাথে এবং দেশের মানুষের সাথে বেইমানি করেছিলো।তারা বিশেষ এক সম্প্রদায়কে টার্গেট করে,চালাছিলো-তাদের অপারেশন ব্লু-প্রিন্ট।
সেদিনের আতঙ্কগ্রস্থ দিনগুলোর ঘটানারই একটা সরল চিত্র, এই লেখার উপকরণ। যা আমারই চোখের সামনে ঘটেছে।সেদিন যেমনটা দেখেছিলাম- তেমনটাই বলার চেষ্টাই-এই লেখার প্রেক্ষাপট।বিবেকের তাড়নাই- আমাকে এই লেখা লিখতে প্উৎসাহ যোগিয়েছে।
আজ যাদের অনুপ্রেরণা আর আত্মিক প্রচেষ্টায় এই লেখাটা আলোর মুখ দেখতে প্রয়াস পেয়েছে! তাদের কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ।আর তারা হলেন- আমারই অতি প্রিয় বোন লিনা ফেরদৌস।আরো আছেন- মনির ভাই।যাঁরা আমাকে উৎসাহ ও সাহস যোগিয়ে এগিয়ে আসতে অনুপ্রানিত করেছেন।পরিচয় করিয়েছেন-অনুপ্রাননের কর্ণধার আবু,ম ইউনুস ভাইয়ের সাথে।তাঁর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।আজ তাঁর আত্মিক উৎসাহেই আমার লেখা জীবন পেলো।
আরো অনেকের কাছেই আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।যারা সর্বদা আমার পাশে থেকেছেন,সাহস যোগিছেন।ভরসা দিয়েছেন।তারা যে আমার কতটা আত্মীয়! এবং আপনার আর আপন জন! প্রকাশের ভাষা নেই।সকলকেই আমি কৃতজ্ঞ চিত্তে স্বরণ করছি।এই লেখা কারো মনে একটুও দাগ ফেলতে পারলেই- মনে করবো,আমার লেখা কিছুটা হলেও সার্থক হয়েছে।পরিশেষে সকল পাঠকদের প্রতি থাকলো- আমার শুভেচ্ছা ও আন্তরিক ভালোবাসা।
— লেখক
৭১ এর এক সন্ধ্যায়
ননসেন্স সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ সম্ভবত শৈশব থেকে। ১৯৭০-এর দশকে সুকুমার রায়ের সাথে সম্যক পরিচয়ের পর তা বিশেষ আকর্ষণে পরিণত হয়। ৯০-এর দশকের প্রথম দিকে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার আগে লিমেরিকের সাথে জানাশোনা অল্পই ছিল। ফিরলাম এডওয়ার্ড লিয়ারের লিমেরিক এবং আরও অন্য অনেক ‘ননসেন্স’ পদ্য হাতে করে। পরে শুরু হয় তার থেকে অনুবাদের চেষ্টা। লিয়ারের লিমেরিক ছাড়া অন্য লিমেরিকও হাতে আসে। তার থেকেও চলে বঙ্গানুবাদ।
বঙ্গানুবাদের পাশাপাশি নিজের লিমেরিক লেখাও চলতে থাকে। তার থেকে কিছু লিমেরিক এখানে ছাপা হল। সুখ ও স্বাস্থ্যের জন্য হাসি বা আনন্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এই লিমেরিকগুলি যদি পাঠকের জন্য কিছু হাসি বা আনন্দের জোগান দিতে পারে তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করব।
-হোসাইন রিদওয়ান আল খান
১ জুলাই, ২০১৮
খ্যাংড়া ঠ্যাঙা চিমশে ঢ্যাঙা
খোঁচা
খোঁচা খুব ঔষধী
খোঁচা খুব বেয়াড়া,
খেলে খায় খুশিতে
কারো লাল চেহারা।
খোঁচা খায় বঁধুয়া
কলতান হাসিতে,
খোঁচা চায় প্রেমিকা
চায় ভালোবাসিতে।
খোঁচা দাও বাবুকে
সারাক্ষণ জ্বালাতো,
হবে ভাব ত্বরিতে
আগে দূর পালাতো।
খোঁচা দাও সুযোগে
খোঁচা দাও বুঝিয়া
খোঁচা দাও সমাজে
খোঁচা দাও খুঁজিয়া।
খোঁচা দাও জাগাতে
যারা ঘুম জাগে না,
বসে দাও চেয়ারে
যাঁরা পদ মাগে না।
খোঁচা
ভূমিকা
১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে সক্রিয় প্রচার-কর্মী, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচন ছিল বাঙালি জাতির চূড়ান্ত মুক্তির লড়াইয়ের প্রস্তুতি পর্ব। বাংলার গণমানুষের মুক্তির অগ্রদূত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর বাসভবন ৩২ নম্বর ধানমন্ডিই হয়ে ওঠে বাঙালি জাতির মূল ঠিকানা। অধীর আগ্রহে জাতি, দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় যেমন বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ৭০-এ নৌকায় আমাকে ও আওয়ামী লীগকে ভোট দাও, আমি তোমাদের চূড়ান্ত বিজয় এনে দিব। তাই জাতির বিজয়ের স্বাদের অপেক্ষায় ’৭১-এর অগ্নিঝরা মার্চ-বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির উদ্দেশে নির্দেশনা দেন। শহর-বন্দর, গ্রামগঞ্জে সর্বত্র শত্রুর বিরুদ্ধে প্রস্তুত হওয়ার জন্যÑ যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক এবং এলাকায় এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গঠনের নির্দেশ দিলেন। আমি আমাদের এলাকায় শরণখোলা থানা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের কর্মী। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাÑ মাতৃভূমি হানাদারমুক্ত করতে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। আমাদের দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবনে মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী সংগঠিত হয়। অতঃপর সুন্দরবনে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা ঘাঁটি গড়ে ওঠে। বিশাল মুক্তিবাহিনীর দল, মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনের তত্ত্বাবধানে অস্ত্র চালানো যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শুরু হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে যা সুন্দরবন সাবসেক্টর হেডকোয়ার্টার হিসেবে পরিচিত। আমি সুন্দরবন সাবসেক্টর অঞ্চল সুন্দরবন মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেই। বগী মুক্তিবাহিনীর রিক্রুটিং সেন্টারে রিক্রুট হই নিয়মিত যোদ্ধা হিসেবে। এখানে পহেলা অক্টোবরে পাঞ্জাবীর গানবোট প্রতিরোধ সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হাবিলদার আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করি। এরপরে সুন্দরবন মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্প হয়লাতলা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। তখন ওই ক্যাম্প ইনচার্জ কমান্ডার ছিলেন এম. আফজাল হুসাইন, আমাদের প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন বীরপ্রতীক আলী আহমে¥দ খান। অতঃপর হানাদার শত্রুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেই। বিশেষ করে সাবসেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনের নির্দেশে শেখ শামসুর রহমানের কমান্ডে সুন্দরবন নারকেলবাড়িয়া অ্যান্টি স্মাগলিং স্কোয়াডে যোগ দেই। মহান মুক্তিযুদ্ধে আমার অংশগ্রহণ ও ভূমিকা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ গর্ব ও সৌভাগ্যের বিষয়।
একাত্তরের সুন্দরবন
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত সাহিত্যকর্ম খুবই অপ্রতুল। অথচ আমরা আমাদেরকে বীরের জাতি বলে শ্লাঘা বোধ করতে কার্পণ্য করি না। কিন্তু হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিশাল পটভূমিতে আমাদের স্বাধিকারের লড়াই আমাদের সাহিত্যকর্মে বিস্ময়কর রকমে অনুপস্থিত।
বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের পঞ্চাশ বছর পরে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিশাল পটভূমিতে রচিত হল, ”চন্দনা উড়ে গেছে” উপন্যাস। কালের ব্যবধান থাকা সত্বেও এ কাহিনীর বিস্ময়কর ঘটনাপ্রবাহ, গেরিলা যুদ্ধের বুদ্ধিদীপ্ত সাহসিকতা, সফলতা, তাদের বীরত্ব ও বিশাল ত্যাগের বলিষ্ঠ চিত্রায়ন পাঠককে এক মুগ্ধতার আবেশে মোহাবিষ্ট করে শেষ পাতা পর্যন্ত আঠার মত জুড়ে রাখবে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বড় অংশটি ছিল গণযোদ্ধার। এরা সংখ্যার দিক থেকে নিয়মিত বাহিনীর চেয়ে অনেক বড় ছিল। এই গণযোদ্ধারা কয়েক সপ্তাহের ট্রেনিং নিয়ে বাংলার গ্রাম-গঞ্জে, হাটে-বাজারে, শহরে-বন্দরে ছড়িয়ে পড়ে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদরকে কোণঠাসা করে রাখে। মুক্তিবাহিনীর এ সব গণযোদ্ধা গেরিলাদের নিয়ে খুব একটা সাহিত্যকর্ম রচিত হয়নি। তাই আমাদের মহান গেরিলা যুদ্ধের অনেক কাহিনী এখনো অজানা। এ উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহ এমন এক স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও অপার দক্ষতায় বিন্যাস করা হয়েছে, যা পাঠককে কব্জা করে রাখে।
এ উপন্যাসের বিশাল পটভূমিতে রয়েছে, শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ থেকে প্রত্যন্ত হাট-বাজার, পাহাড়ী নৃ-গোষ্ঠীর জনপদ, তাদের জুমিয়া জীবন ও মাতৃভুমিকে হানাদারদের দখল মুক্ত করার বিস্ময়কর সম্প্রীতি নিয়ে গণযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ও প্রতি-আক্রমণ, এক তেজোদীপ্ত বীরত্ব গাথার উপাখ্যান। এবং যুদ্ধ শেষে মানবিক উষ্ণতায় বীর বন্দনা।
এটি শুধু বলিষ্ঠ দক্ষতায় কারুকার্যময় এক কাহিনীই নয়, এটি সত্তর দশকের শুরুর দিকের এক এনালগ সমাজের বিশ্বাসযোগ্য সামাজিক দলিল, যার আজকের ডিজিটাল যুগে মহামূল্যবান গুরুত্ব রয়েছে। উপন্যাসটির পরতে পরতে আছে সত্তর দশকের আর্থসামাজিক, মানবিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বর্ণনা, আছে বাংলাদেশের তরুণ-যুবাদের প্রতিরোধ যুদ্ধের কাহিনী, কিভাবে তারা খুবই স্বল্প প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রায় খালি হাতে গেরিলা পদ্ধতিতে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসর জামাত, রাজাকার, আলবদর বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদেরকে রুখে দিয়েছিল। কীভাবে তাদের বাংলার কাদা-মাটিতে পর্যুদস্ত করেছিল, সেইসব ঘটনার রোমহর্ষক অনুপুঙ্খ বর্ণনা। আছে গেরিলাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব , দুঃখ-কষ্ট, আপোষহীন লড়াই, আত্ম-বলিদান, বীরত্ব এবং. গৌরব গাথা।
বিজয়ের পঞ্চাশ পরেও বাঙালীর বিজয় গাঁথার এই অনন্য আখ্যান পাঠককে মুগ্ধতার আবেশে বিমোহিত করে রাখবে, তাদের পূর্বসূরির মহান বীরত্বের কাহিনী তাদেরকে ও তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ধারাবাহিকভাবে উজ্জীবিত করবে। নিঃসন্দেহে এ উপন্যাস এক উচ্চমার্গীয় সাহিত্যমূল্য ধারণ করে।
স্বাধিকার, অধিকার, ভালবাসা, গন্ধক, রক্ত, এবং নাইট্রিক এসিডের সংমিশ্রণে এ এক মুক্তির পথ যাত্রা।
Chandana Ure Gache - Ali Reza
একটি জাতির কাছে স্বাধীনতার চেয়ে বেশি গৌরবের আর কিছু থাকতে পারে না এবং একই সঙ্গে বলতে হয় স্বাধীনতা অর্জন করা সহজ কোনো কাজ নয়। ইতিহাস বলে, যে কোনো দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন আত্মত্যাগের দীর্ঘ বিপ্লব ও সংগ্রামের প্রেক্ষাপট, মানুষকে সহ্য করতে হয় নির্মম নির্যাতন এবং বরণ করতে হয় মৃত্যু। ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতেও ধারবাহিক সংগ্রাম ও লক্ষ লক্ষ মানুষকে আত্মত্যাগ করতে হয়েছে এবং সহ্য করতে হয়েছে অকথ্য নির্যাতন। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ স্বাধীন হলেও ব্রিটিশদের হাত থেকে আজকের বাংলাদেশ বস্তত পাকিস্তানিদের কাছে পরাধীন ছিল। ১৯৪৮ সাল থেকে ভাষা আন্দোলনের দাবির ভিত্তিতে প্রথম সংগ্রাম ও বিপ্লবের সূত্রপাত হয় এবং এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আওয়ামী লীগের একক সংখ্যা গরিষ্ঠতার বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার মহাসড়ক তৈরি হয় এবং ১৯৭১ সালে রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ মানুষের প্রাণের এবং তিন লক্ষ নারীর অকথ্য নির্যাতন ও ইজ্জতের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। এই দীর্ঘ সংগ্রাম ও স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে প্রথম রচিত উপন্যাস কোনটি? মূলত এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে গিয়ে সত্তর দশকের চৌদ্দ জন লেখকের মোট উনিশটি উপন্যাসের ওপর লেখা হয় প্রবন্ধগ্রন্থটি। প্রতিটি প্রবন্ধে রয়েছে লেখক পরিচিতি, কাহিনি সংক্ষেপ, নির্মাণশৈলী এবং লেখকের মতামত। আশা করা যায় পাঠকরা উপন্যাসের সঙ্গে পরিচিতিসহ বিভিন্ন তথ্যাদিও জানতে পারবেন। পাঠককুল বইটি গ্রহণ করলে শ্রম সার্থক হয়েছে বলে ধরে নেব।
Sattar Dashaker Muktizuddher Upannas : Bishay O Shilposhoilee by Mozammel Haque Neogi
জন্ম ১৯৫৯ সালে পাবনার বেড়া উপজেলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। পিএইচডি করেন ১৯৯৯-এ। রাজশাহী বিশ্ব বিদ্যালয় ফোকলোর বিভাগে কর্মরত। বিশেষ আগ্রহের বিষয় লোক সংগীত, দর্শন, ধর্ম।
প্রকাশিত গ্রন্থÑ বাংলাদেশের লোকসংগীতে প্রেম চেতনা, রবীন্দ্রকাব্যে লোক উপাদান, বাংলা লোকসংগীতে নারী।
রঙ্গনামা
“খুলনার মুক্তিযুদ্ধ : বটিয়াঘাটা” শীর্ষক গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধকালীন বটিয়াঘাটা উপজেলার সশস্ত্র সংগ্রাম, মানবতাবিরোধী অপরাধ (গণহত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, সন্ত্রাস), শরণার্থীসহ বিভিন্ন দিক আলোচিত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, প্রত্যেকটি ঘটনার পেছনে বাঙালি জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় রেখে বিষয় বিবরণ সন্নিবেশিত হয়েছে।
কৃষক আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ- খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার সংগ্রামী ইতিহাস রয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা অপ্রতুল। ফলে আঞ্চলিক ইতিহাস তুলে ধরার তাগিদে এ গবেষণাগ্রন্থটি মৌলিক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে ।
khulnar Muktijuddho : Batiyaghata -- খুলনার মুক্তিযুদ্ধ : বটিয়াঘাটা
লেখকের কথা-
পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। এর দ্বারা একটি সময়ে সংঘটিত নানান ঘটনার বিশ্লেষণ করা যায়। তাই, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও বহুমুখী দিকগুলো অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করতে সেই সময়ে প্রকাশিত পত্রিকার রিপোর্টগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।
২০১৬’র নভেম্বরে দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক আশফাক ভাই একদিন বললেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষ ১৭ দিনে (ডিসেম্বর ০১ – ডিসেম্বর ১৭) আন্তর্জাতিক পত্রিকায় প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক রিপোর্টগুলোর অনুবাদ নিয়ে একটি ধারাবাহিক সিরিজ করে দেয়ার জন্য। শুনেই আমি রাজি হয়ে যাই। দৈনিক ইত্তেফাকে ২০১৬’এর ০১ ডিসেম্বর হতে ১৫ ডিসেম্বর (১৪ ডিসেম্বর বাদে) পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ১৪টি রিপোর্টের অনুবাদ প্রকাশ হয়েছিল।
এই বইতে সেই ১৪টি রিপোর্টের অনুবাদ সহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মোট ২০টি রিপোর্টের অনুবাদ রয়েছে। ডিসেম্বর ০১-১৭ এর ১৮টি রিপোর্ট ও মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় মার্চের ০২ টি রিপোর্টের অনুবাদ সংযুক্ত হলো।
অনুবাদগুলো ভাবানুবাদ এবং পত্রিকার রিপোর্টগুলো মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টের সংগ্রহশালা হতে সংগ্রহীত।
এই অনুবাদ রিপোর্টগুলো বই আকারে প্রকাশের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন সহযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টের সভাপতি শান্তা আনোয়ার।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের শেষ ১৬ দিন
সম্পাদকীয় – অনুপ্রাণন – দ্বাদশ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা, গল্পকার ও গল্পসংখ্যা (চতুর্থ পর্ব)
প্রকাশিত হলো ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা, গল্পকার ও গল্প সংখ্যা- চতুর্থ পর্ব। গল্পকার ও গল্পসংখ্যা চতুর্থ পর্ব প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশের ১০০ জন নির্বাচিত গল্পকার, তাদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা, গল্পকার রচিত গল্পসাহিত্য নিয়ে আলোচনা এবং একটি উল্লেখযোগ্য গল্প সংকলিত করার কাজ শেষ হলো। এই সংখ্যায় পূর্বের তিনটি সংখ্যার মতোই ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
দ্বাদশ বর্ষে এসে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন থেকে বাংলাদেশের ১০০ জন গল্পকার নিয়ে প্রবন্ধ একত্রিত করে সংকলন প্রকাশ করার কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। প্রথম কাজটি ছিল বাংলা সাহিত্যের গল্পকারদের মধ্য থেকে কারা বাংলাদেশের গল্পকার সেটা নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা, দ্বিতীয়তে এসে বাংলাদেশের গল্পকারদের মধ্য থেকে ১০০ জন গল্পকার বাছাই করা, তৃতীয়তে এসে গল্পকারদের গল্পসাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা বা প্রবন্ধ লেখার জন্য লেখক নির্ধারণ করা। এই কয়টা ধাপের কাজ যতটুকু না কঠিন ছিল তার থেকে বেশি কঠিন ছিল যেসকল গল্পকারের প্রকাশিত গল্পগ্রন্থগুলো সহজলভ্য ছিল না সেগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে জোগাড় করা। এই কাজ করতে আমাদের চেষ্টার সফলতার পেছনে যারা কাজ করেছেন, সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। আমরা তাদের কাছেও বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ যারা বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকারকে নিয়ে এক একটি প্রবন্ধ লিখে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কাজে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন একাদশ বর্ষে এসেও একইভাবে বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ কবি তাদের কবিতা নিয়ে চারটি সংকলন প্রকাশ করেছে। তারপর দ্বাদশ বর্ষে এসে বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকারকে নিয়ে আরও চারটি সংকলন অনুপ্রাণন থেকে প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং বাস্তবায়ন করার উদ্দেশ্য একটাই। সেটা হচ্ছে- যারা আমাদের কবিতা ও গল্প সাহিত্যের ভিত্তি গড়েছেন তাদের সাথে এবং তাদের কাজের সাথে প্রজন্মকে পরিচিত করে তোলা। আমাদের নির্বাচিত গল্পকারদের মধ্য যিনি সর্বজ্যেষ্ঠ তিনি হচ্ছেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন। তার জন্ম ১৮৯৭ সালে আর মৃত্যু ১৯৭৮ সালে। আর নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হচ্ছেন ইমতিয়ার শামীম। তিনি ১৯৬৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা পূর্ব সময় এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তাদের অধিকাংশই সাহিত্যচর্চা করেছেন। ফলে তাদের সাহিত্য এমন একটা বিশেষ সময়কে ধারণ করেছে যেখানে দুটি দেশভাগের অভিজ্ঞতা হয়েছে। দুটি দেশভাগের কার্যকারণের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে তাদের লেখায় যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ন্যায্যতা ভিত্তি পেয়েছে ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের স্বত্ব, সত্তা ও মৌলিকত্ব নির্মাণে গল্পকারগণ উদ্যোগী হয়েছেন। আমরা অনুপ্রাণন, বিশ্বের বাংলা সাহিত্যে বাংলাদেশের স্বকীয় অবস্থানের বাস্তবতাটিকে প্রবলভাবে অনুভব করি এবং গর্বিত হই।
বাংলাদেশের গল্প-সাহিত্যের চরিত্রদের জীবনের শেকড় অধিকাংশেই প্রাকৃত জীবনে প্রোথিত। মাটি ও সবুজের সাথে সম্পর্কিত। মাত্রই এক অথবা খুব বেশি হলে দুই প্রজন্ম যারা গ্রামের শ্যামলিমা থেকে নগরের কঠিনতায় অভিবাসিত হয়েছে। নগরে থেকেও তারা যেন শহরতলীতে বসবাস করছে। যাদের কারও কারও শরীর থেকে এখনও মাটির গন্ধ মিলিয়ে যায়নি। তাই অধিকাংশ গল্পের দৃশ্যপট হয় শহর না-হলে শহরতলী। গল্পের মানুষগুলো কৃষক না-হয় কৃষকের শিক্ষিত সন্তান। দৃশ্যপটের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়গুলোর বিন্যাসে তাই কখনও গ্রাম সম্পূর্ণভাবে তিরোহিত হয়ে যায়নি।
গ্রামের রূপান্তর কাহিনী হোক অথবা শহর থেকে নগরায়ণের দিকে উত্তরণের কাহিনী হোক প্রায় সকল ক্ষেত্রেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও পরিবার; তাই কাহিনী যতটা না ব্যক্তিকে নিয়ে তার থেকে বেশি হচ্ছে পারিবারিক অথবা সামাজিক। কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্তই বাংলাদেশের গল্পের প্রধান চরিত্র। ধনী পরিবারের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, কলহ, প্রেম-ভালোবাসার গল্প হাতে গোনা। বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পের প্লটে সংঘাত ও সংঘর্ষের নিরসনই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু এমন কিছু প্লট সৃষ্টি করতেও দেখা গেছে যেখানে সংকট নিরসন হয়নি। অর্থাৎ বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্প অধিকাংশই একটি ইতিবাচক সমাধান অথবা ইঙ্গিত পাওয়া যায় এবং নেতিবাচক চরিত্র খুব কমই গল্পের সম্পূর্ণতার ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের গল্প রোমান্টিক ভাব ও আবেগে ভারাক্রান্ত হতেই দেখা যায় বেশি এবং পাঠকেরা সেগুলো পছন্দও করছেন। কিন্তু গল্পকাররা তাদের গল্পে ভাব ও আবেগের ভারসাম্য রক্ষা করেছেন, বাস্তব বিচারে সেই গল্পগুলো বোদ্ধা ও পরিপক্ব পাঠক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
বাংলাদেশের গল্পের আখ্যানবস্তুতে রোমান্টিকতার প্রভাব বেশি থাকলেও এক ঝাঁক গল্প আছে যেখানে জীবনজিজ্ঞাসার দর্শন চিন্তায় জাগরিত হতে দেখা যাচ্ছে। গল্পের গদ্যনির্মাণ যথেষ্ট পরিপক্ব। বানান, ব্যাকরণ, বাক্য গঠন, রূপকের নান্দনিক ব্যবহারে সমৃদ্ধ। গল্পের শুরুর চমক নিয়ে গল্পকারদের মধ্যে একটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যায়। এই ব্যাপারে ভিন্নমত আছে, যদিও পারিবারিক পটভূমিতে নির্মিত গল্পগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চমক দিয়ে শুরু করার একটা প্রবণতা রয়েছে। অপ্রাসঙ্গিক সংলাপ কোনো কোনো গল্পকে অহেতুক ভারাক্রান্ত করেছে। কিন্তু বলা যেতে পারে অধিকাংশ গল্পই দৃশ্যপট বর্ণনায় এবং সংলাপের ওপর গল্পকাঠামো নির্মাণ করার কাজটি করেছেন মেদহীন গদ্যে। গল্পগুলো একরৈখিক হয়নি আবার পার্শ্বচরিত্রের উপ-গল্পগুলো গল্পের প্রধান আখ্যানকে ভারাক্রান্ত করেনি। সময়, কালের প্রতি গল্পগুলো সুবিচার করেছে যেখানে সত্য ইতিহাসের সাথে অহেতুক বিতর্কে অবতীর্ণ হয়নি। গল্পের পক্ষ ও প্রতিপক্ষের অস্তিত্ব ও তাদের আচার-আচরণ অবাস্তব করে তোলা হয়নি। গল্পের চরিত্রগুলোকে দেবতাতুল্য অথবা উল্টোদিকে শয়তানতুল্য করে অবাস্তব কাল্পনিক চরিত্র করে গড়ে তোলা হয়নি। বাংলাদেশের গল্পে রূপকের ব্যবহারে ফ্যান্টাসির তুলনায় বাস্তবের বস্তুগুলোকেই নান্দনিক করে তোলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের গল্পগুলো সামগ্রিকভাবেই এমন একটি উচ্চতর স্তরে উত্তীর্ণ হয়েছে, যখন বাংলাদেশের গল্পসাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের গল্পের ভাণ্ডারে শামিল হওয়ার যোগ্যতাকে আর অস্বীকার করা যায় না।
অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- গল্পকার ও গল্প সংখ্যা চতুর্থ পর্ব
সম্পাদকীয়-
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা- সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতি সংখ্যা
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যাটি সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতিসংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হলো। সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ ২০১৩ সালে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বিতীয় বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশের সময় অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদে যুক্ত হন। গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি অনুপ্রাণনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তাঁর অকাল মৃত্যু আমাদের শোকগ্রস্ত করেছে। তাঁর স্মৃতি বারবার ফিরে এসে আমাদের মন ভারাক্রান্ত করে তুলছে। স্বামী-পুত্র-কন্যা-পরিবার-পরিজন নিয়ে সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের একটা সংসার ছিল। নারী হিসেবে সংসার ও পরিবারের প্রতি কতগুলো স্বাভাবিক দায়িত্ব ছিল। কিন্তু পাশাপাশি সাহিত্য, সংগীত, সংস্কৃতি, ফ্যাশন ও পরিবেশ নিয়ে তাঁর ভাবনা ছিল, কর্মকাণ্ড ছিল। কবিতা লিখতেন, অনুবাদ করতেন, গল্প লিখেছেন। সম্পাদনা পরিষদে অংশ নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ও অনুপ্রাণন প্রকাশনের কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তরুণদের সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী করে তোলার লক্ষে প্রথম দুই বছর (২০১২-২০১৪) কনকর্ডের চত্বরে একটি দেয়াল পত্রিকার সম্পাদনাও করেছেন। ত্রৈমাসিক পত্রিকা ছাড়াও শিল্প-সাহিত্য জগতে অনুপ্রাণনের কর্মকাণ্ড প্রসারের জন্য বিভিন্ন সময় নেওয়া কর্মসূচি সফল করে তোলার জন্য সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ তাঁর অন্য সকল কাজের ভিড়ে অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদে পর্যাপ্ত সময় ও স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়নভিত্তিক প্রবন্ধগুলোতে শুধু যে তাঁর বহুমাত্রিক কাজের পরিচয় আমরা পাই তা নয়, পাশাপাশি আমরা খুঁজে পাই তাঁর মন-মানস। সেই সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ’কে যিনি ছিলেন একজন রুচিশীল, স্নেহশীল, মানবিক মানুষ। যিনি সুন্দরকে ভালোবাসতেন। সমাজে ঘৃণা, কদর্যতা, সংকীর্ণতা, বিভেদ, বৈষম্য ও নীচতা তাঁকে পীড়িত করেছে। প্রকৃতির মাঝে তিনি বিচিত্র সুন্দরের সন্ধান করতেন। প্রকৃতির মাঝে থেকেই তিনি দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের জীবন থেকে মুক্তি পেতে ভালোবাসা ও সহনশীলতার পাঠ নিয়েছেন। জীবনে ও পরিবেশে তিনি প্রতিনিয়ত সবুজ, সরলতা ও শান্তির সরোবর সন্ধান করেছেন, আহরণ করেছেন। তাঁর চারপাশটা সুন্দর করে সাজিয়ে তোলার জন্য সাজিয়ে রাখার জন্য সবসময় ব্যাকুল থেকেছেন।
সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ বিশ্বাস করতেন একটি দেশের দার্শনিক ও আদর্শিক স্থান চিহ্নিত হয় সে দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে। ক্রমাগত চর্চা ও সাধনার মধ্য দিয়ে একটি জাতির শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভিত মজবুত করা যায়। শিল্প-সাহিত্য ও সংগীত সাধনা ছাড়া শান্তির ও সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তোলা যায় না। শিল্প ও সাহিত্য সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একটি দেশের শিল্প-সাহিত্যে সে দেশের সমাজ প্রতিফলিত হয়। আবার শিল্প-সাহিত্যের চর্চার মধ্য দিয়েই সমাজের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, সামাজিক রীতিনীতি ও ঐতিহাসিক আখ্যানের নির্মাণ ও রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলমান থাকে। শিল্প-সাহিত্য মানব অবস্থার উপর অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আবেগ অন্বেষণ করতে, সামাজিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং আরও ন্যায়সঙ্গত ও সহানুভূতিশীল বিশ্ব গঠনে অবদান রাখতে সাহায্য করে। কেবল সমাজের সাজসজ্জার উপাদান হিসেবে নয় বরং সমাজকে বোঝার এবং রূপান্তরের জন্য শিল্প ও সাহিত্যচর্চা অপরিহার্য। শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমে সৃজনশীল ও নান্দনিক প্রকাশের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রক্রিয়া ব্যক্তির মানবিক অভিজ্ঞতার গভীরতর উপলব্ধি অর্জন করে তুলতে সক্ষম করে, চিন্তার বিকাশ সাধন প্রক্রিয়ায় জারিত হয়ে অমানবিক সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে, চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়সঙ্গত বিশ্ব নির্মাণে অবদান রাখতে পারে। এই বোধ ও অনুভূতিগুলোই সুলতানা শাহ্রিয়া পিউকে ক্রমাগত অনুপ্রাণিত করেছে এবং চালিকাশক্তি হিসেবে শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার সকল পরিসরে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।
বস্তুত পৃথিবীর সব কিছুই সুন্দর বা নান্দনিক হয় না। আমাদের চারপাশের দৃশ্য ও ঘটনাবলি থেকে উৎসারিত সকল অনুভূতি নান্দনিক বা শিল্পিত হয় না। এর মাঝে যে-সকল অনুভূতি ও প্রকাশভঙ্গি আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি আনে, মনে চঞ্চলতা আনে, আনন্দ দেয়, মনের আধ্যাত্মিক স্তরটিকে বিকশিত করে, সেগুলোকেই আমরা বলি, সুন্দর। এ যেন এক যাদু। এই যাদুর কাঠির পরশ যে শিল্পে, যে সাহিত্যে থাকে না সেই শিল্প সেই সাহিত্য মানুষের হৃদয়ের উষ্ণ ছোঁয়া থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়। বাংলা ভাষায় ‘নন্দনতত্ত্ব’ শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মূলত নান্দনিকতা আঠারো ও উনিশ শতকের একটি সাহিত্যিক ও শৈল্পিক আন্দোলন, যা সৌন্দর্যের গুরুত্বের উপর আলোচনার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল। এই ধারণা দিতে সচেষ্ট হয়েছিল যে সৌন্দর্য ছিল শিল্প ও সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সৌন্দর্য কী, তা বর্ণনা দিয়ে অপরকে বোঝানো যায় না, এটি অসংজ্ঞায়িত। সৌন্দর্য উপলব্ধির বিষয়, তাই এটি বুঝে নিতে হয়। ভাবের পরিপূর্ণতা এবং প্রকাশের তীব্র আকুতি নিয়ে সৌন্দর্যের নিজস্ব মূল্য সৃজন-চেষ্টার কৌশল অনুসরণ করা প্রতিটি শিল্পী ও সাহিত্যিকের জন্য মূল্যবান। সামষ্টিক সংস্কৃতি বিশুদ্ধ বুদ্ধির বিষয়, যা কিনা শিল্পের মাধ্যমে উদ্ভাসিত সৌন্দর্যের বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং সর্বদা একটি প্রতি-পরিবেশ হিসেবে কাজ করে যেখানে মানবিকতার ভূমিকাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের মাঝে ছিল গভীর সৌন্দর্যবোধ। তাঁর প্রতিটি কর্ম তাই হয়ে ওঠে এমন একটি ব্যতিক্রম যেখানে সম্পৃক্ত থেকেছে নান্দনিকতার বিশেষ ছোঁয়া। তাঁর কবিতা অথবা গল্প রচনায়, বাচিক শিল্প অথবা সংগীতচর্চায়, ফ্যাশন ডিজাইনে অথবা তাঁর ছাদবাগানে, কিংবা বৃক্ষ রোপণ ও বৃক্ষ উপহার কার্যক্রমে সদা প্রকাশ পেয়েছে গভীর নান্দনিকবোধ ও মানবিকতাবোধ। যার ছাপ তিনি রেখে গেছেন আমাদের সবার হৃদয়ে। তাই, সশরীরে না থাকলেও আগামীতে অনুপ্রাণনের সৃজন-নন্দনের পরিসরে পরিচালিত সকল কর্মকাণ্ডে নান্দনিকতা, শুভবোধ ও মানবিকতার উদাহরণ হয়ে পিউ আমাদের সঙ্গে থাকবেন।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 1; Sultana Shahria Pieu Memorial Issue
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.






There are no reviews yet.