Additional information
| Weight | 0.467 kg |
|---|
$ 2.94
অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব- সম্পাদকীয়
সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম পর্ব প্রকাশিত হওয়ার পর সাম্প্রতিকের আরো ২৫ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কবিতা ও কবিতা নিয়ে সামষ্টিক আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হলো শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব। দ্বিতীয় পর্বের এই ২৫ জন কবির নাম ইতোপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম পর্বের ন্যায় অনুপ্রাণনের ১০০ নির্বাচিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের কবি তালিকা থেকে নেয়া যাদের জন্ম ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হয়েছে। তালিকার অবশিষ্ট ৫০ জন নির্বাচিত কবি নিয়ে লেখা প্রকাশিত হবে আগামীতে প্রকাশিতব্য শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় ও চতুর্থ সংখ্যায়।
সংখ্যাটিতে অন্তর্ভুক্ত সাম্প্রতিকের কবিদের কবিতা নিয়ে আলোচনায় কয়েকটি বিষয় এসেছে যেমন- প্রতিকবিতা, উত্তর-আধুনিকতা, নৈরাজ্যবাদ ইত্যাদি। শুধু কবিতা নয় সামগ্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে নানা পর্যায়ে পরিবর্তনের সূত্র হিসেবে এই দর্শনগুলো নিয়ে আলোচনা আছে। দর্শন হিসাবে উত্তরাধুনিকতাবাদ- যুক্তিবাদীতার বিরুদ্ধে, বস্তুনিষ্ঠতার বিরুদ্ধে এবং সর্বজনীন সত্যের ধারণাগুলিকে প্রত্যাখ্যান করে। যার পরিবর্তে, এটি মানুষের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির বিচিত্রতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির বহুবিধ আপেক্ষিকতার উপর জোর দেয়। উত্তর-আধুনিক কবিতা প্রায়ই অর্থহীনতা অথবা বাস্তবতার অনুপস্থিতি প্রসঙ্গ নিয়ে কাজ করে এবং একটি অস্তিত্বগত দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করে। উত্তর-আধুনিক প্রতিকবিতায় প্রায়ই অস্থিরতার বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করে সাধারণত মুক্ত বিন্যাসে লেখা হতে পারে। কবিতায় অপ্রত্যাশিত লাইন বিরতি, বিশৃঙ্খল কাঠামো- এসব আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন হতে পারে। উত্তর-আধুনিক কবিতা প্রায়শই অস্তিত্ববাদী বা নিহিলিস্টিক প্রসঙ্গ নিয়ে কাজ করতে পারে। যদিও অস্তিত্ববাদ এবং উত্তর-আধুনিকতা সমার্থক নয়, তারা প্রায়শই সম্প্রর্কিত হতে দেখা যেতে পারে।
উত্তর-আধুনিক কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো কী- এই প্রশ্নটির উত্তরে একটা ধারনা দাড় করানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। আপাতত যে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে সেগুলো যেমন, প্রথমত, এলোমেলো ভাব- কেননা উত্তরআধুনিক রচনাগুলি শব্দের পরম অর্থের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। দ্বিতীয়ত, কৌতুকপূর্ণতা- কোন কোন ক্ষেত্রে কালো হাস্যরস, শব্দ নিয়ে খেলা, বিরোধালঙ্কার, বিড়ম্বনা এবং কৌতুকপূর্ণতার অপরাপর কৌশলগুলি যা কিনা প্রায়শই অর্থগুলোকে ঘোলাটে করার জন্য নিযুক্ত করা হয় যেন পাঠক দুর্বোধ্যতার ঘোরে একটি ভিন্নধরনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। তৃতীয়ত, বিবরণে- এমন কতগুলো অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিভাজন নিয়ে আসা যে টুকরোগুলি যুক্ত করে যে কোলাজ হতে পারে সেটা যেনো প্রায়শই অস্থায়ী বিকৃতরূপ ধারণ করে। চতুর্থত, মেটাফিকশন হতে পারে- অর্থাৎ কল্পকাহিনীর এমন বিশেষ একটি রূপ হতে পারে যা প্রকাশের জন্য রচনার বর্ণনামূলক কাঠামোকে এমনভাবে সাজানো হয় যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যই যেন পাঠক/দর্শকদের মনে করিয়ে দেয়া যে তারা একটি কাল্পনিক কাজ পড়ছে বা দেখছে। এবং পঞ্চমত ইন্টারটেক্সচুয়ালটি বা আন্তঃপাঠ্যতা- অর্থাৎ একটি পাঠ্যের অর্থ অন্য এক/একাধিক পাঠ্য দ্বারা প্রকাশ করা- যেটা হতে পারে একটি ইচ্ছাকৃত সৃজনশীল রচনাকৌশল যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে উদ্ধৃতি, ইঙ্গিত, অনুহরণ, কুম্ভিলকবৃত্তি, অনুবাদ, অনুকরণ অথবা প্যারোডি। তবে খেয়াল রাখতে হয় যে প্রতিকবিতা তখনই সফল হয় যখন ছন্দঃপ্রকরণ, ব্যাকরণ এবং অন্ত্যমিলে ইচ্ছাকৃতভাবে করা ভুলগুলোর বিশৃঙ্খলার মাঝে নান্দনিক প্রকাশভঙ্গী নিহিত থাকে।
মধ্যযুগের সাহিত্যে প্রবণতা ছিল সত্য ও মিথ্যার দ্বিমাত্রিক বয়ানের যেখানে পারলৌকিক শক্তি ও পরলৌকিকতা প্রকাশ্যে অথবা আড়ালে ঢুকে পড়েছে সর্বভারত উৎসারিত নিজস্ব নানা কথন বা বয়ান। এর অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও উপলব্ধি নিতান্তই ব্যক্তিক। যখন থেকে নির্ভেজাল ইহজাগতিক সত্যের উপর ভিত্তি করে সাহিত্য নির্মিত হতে থাকল তখন থেকে শুরু হলো আধুনিক সাহিত্য। কবিতায় যেমন উপন্যাসেও তেমন আধুনিক লেখক বস্তুবাদী, নৈর্ব্যক্তিক এবং নির্মোহ। বাঙলার আধুনিক সাহিত্য গঠনে ইউরোপের রেনেসাঁ পরবর্তী কালে রচিত সাহিত্যের প্রভাব রয়েছে। একইভাবে উত্তর-আধুনিক প্রবণতা আমাদের দেশজ দর্শন থেকে উৎসারিত না। কিন্তু, ব্যাপ্তি ও গভীরতায় আধুনিকতার তুলনায় উত্তর-আধুনিকতার বিষয় এবং মিথস্ক্রিয়া বহুবিস্তৃত। বৃহৎ নয়, ক্ষুদ্র; সমগ্র নয়, অংশ; গোছানো কিন্তু শৃঙ্খলাবদ্ধ নয়, এলোমেলো অথবা উদ্ভট; প্রথাগত নয়, নিরীক্ষামূলক; বিভিন্ন ক্ষেত্রের মিশ্রণ এবং মিথস্ক্রিয়া; ন্যারেটিভের অস্পষ্টতা; কোনো সাংস্কৃতিক প্রকল্পে একটি নয় বহু স্বরের সমাহার ইত্যাদিকে মনে করা যেতে পারে উত্তর-আধুনিকতার গুণ বা বৈশিষ্ট্য হিসেবে।
প্রাক-বাংলাদেশ পর্বে কোন কবি নয় বরঞ্চ সাঈদ আহমদ-ই বলা যায় উত্তর-আধুনিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে প্রথম অ্যাবসার্ড ঘরানার নাটক লিখেন। তিনি-ই প্রথম রূপকথা নিয়ে ফ্যান্টাসি ঘরানার নাটক লিখেন যা একই সঙ্গে ছিল এলেগরিকাল। অন্যদিকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অস্তিত্ববাদের ওপর ভিত্তি করে উপন্যাস লিখেন। এঁরা দুজনই বিদেশে প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন এবং পশ্চিম ইউরোপীয় সাহিত্য এবং দর্শনের সঙ্গে বেশ পরিচিত ছিলেন।
রেফারেন্স, প্রতীক, উৎপ্রেক্ষা ব্যবহার করে কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কবিতা এক জটিল সমীকরণে সম্পর্কিত হয়ে একইসাথে আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক স্বভাব ধারণ করেছিলো। উত্তর-আধুনিকতার উল্লিখিত এই প্রধান বৈশিষ্ট্যসমুহ রপ্ত করার পর বাকি যা থাকে সেসব কবিকে তাঁর নিজস্ব শৈলী উদ্ভাবনের মাধ্যমেই স্বাক্ষর রাখার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। উত্তর আধুনিকতার বিশাল ক্যানভাসে বাংলাদেশের কবিতা ক্রমেই মৌলিক, সৃজনশীল ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে।
| Weight | 0.467 kg |
|---|
সম্পাদকীয়, নবম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা-
কবি ও কবিতার অনুপ্রাণন—
সূচনা লগ্ন থেকেই শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন, সাহিত্যের এই বিশেষ শাখা অর্থাৎ কবিতা বিভাগটির উপর বিশেষ যত্ন দিয়ে এসেছে। কেননা সাহিত্য রচনায় কবিতাই একমাত্র শাখা যেখানে কবির অন্তরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা অনুভূতিটি উপচে বের হয় কবিতায়। যেখানে কোনো প্লট-পরিকল্পনা বা পূর্বপ্রস্তুতির চিহ্ন খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। হতে পারে কবির সেই কথাগুলো নির্গত হয়েছিল কোনো অস্থির অথবা কোনো বেদনার অথবা কোন শান্ত-সমাহিত ধ্যানের মুহূর্তে। হৃদয় মথিত কোনো নান্দনিক অথবা কোনো মানবতবাদী ভাব সৃষ্টি ও রচনার গভীর অনুপ্রেরণায়। কিন্তু স্বতস্ফুর্তভাবে নির্গত শক্তিশালী কোনো অনুভূতি যে কোনো আকারে প্রকাশিত হলেই কী সেটা কবিতা হয়ে উঠতে পারে? কবিতা—সাহিত্য রচনাশৈলীর এমনই একটি বিশেষ ধারা যেখানে শব্দ ও ছন্দ পার¯পরিকভাবে ক্রিয়াশীল থাকতে দেখা যায়। কবিতায় শব্দগুলো একসাথে জুড়ে থেকে কোনো প্রকার উচ্চারণ, ধ্বনি, চিত্র অথবা চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে থাকে যা কি-না সরাসরি বর্ণনা করতে গেলে হতে পারে অনেক জটিল অথবা বিমূর্ত। কবিতা রচনায় প্রচ্ছন্ন থাকে ছন্দ ও মাত্রা অর্থাৎ অক্ষর অথবা শব্দাংশের সংখ্যার সম্মিলন অথবা বিন্যাস। কিন্তু, কবিতার এসব গঠন প্রক্রিয়া সবসময় সচেতনভাবে কতটুকু কবির মনে ঘটে থাকে, সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুমান করা কঠিন।
বাংলা ভাষার হাজার বছরের ইতিহাসে সাহিত্যের আরম্ভ অনেকটাই গীতিকবিতা দিয়েই। যেখানে উচ্চারণ ও ছন্দের মিলের সাথে যুক্ত ছিল সুর। বিষয়বস্তুতে গভীর ব্যক্তি অনুভূতির থেকে অগ্রাধিকার পেল সামাজিক-রাজনৈতিক কাহিনী। কেননা, তখন সমাজই ছিল সব, ব্যক্তির অস্তিত্ব একপ্রকার ছিল না বললেই চলে। তাই সেসব কাহিনীতে ছিল সমাজ ও রাজনীতি, ক্ষেত্রবিশেষে শাসকের গুনকীর্তন আবার ক্ষেত্রবিশেষে প্রথা-প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা, রোমান্টিক প্রেমের জনপ্রিয় আখ্যান, যৌনতা, অথবা বীরের শৌর্য-বীর্য, জন্ম-মৃত্যু, প্রেম অথবা বিবাহ।
চর্যাপদ দিয়েই বাংলা কবিতার গোড়াপত্তন। চর্যাপদ কতগুলো আশ্চর্য বিপরীতধর্মী কবিতার সমাহার। তাই চর্যাপদের আরেক নাম—চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয়। চর্যাপদে বর্ণিত সাধন তত্ত্ব, তৎকালীন বাংলার সমাজ জীবনের চিত্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশের অপরূপ বর্ণনা, সকলই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে প্রমাণিত ও গৃহীত। কিন্তু, চর্যাপদের ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধীতা, অভিজাতদের ধর্মদর্শন ও ধর্মানুষ্ঠানের প্রতি বিদ্রুপ উচ্চারণ ইত্যাদী’তে লোকায়তিক বৌদ্ধ ও জৈনরা যে সেই খ্রিস্টপূর্ব থেকেই ব্রাহ্মণ্য-বিধানকে অমান্য করে এসেছে, তারই কতক প্রতিচ্ছবি মেলে চর্যাপদের কোনো কোনো পদ্যে। বাঙালি জাতিসত্ত্বার মূলে রয়েছে—হিন্দু লৌকিক, বৌদ্ধ লৌকিক, ইসলাম লৌকিক; এরকম সকল লৌকিকগণ। এই লৌকিক অনভিজাত বা প্রাকৃত বাঙালিই হচ্ছে প্রকৃত বাঙালি। আঠারো শতক পর্যন্ত রচিত সাহিত্য এই প্রাকৃত বাঙালির উপভোগ্য ছিল। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য, বাংলায় রূপান্তরিত রামায়ণ-মহাভারত-ভগবত, বৈষ্ণব পদাবলি, চৈতন্যের জীবনী, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, ইত্যাদী সকল সাহিত্যের ক্ষেত্রেই একথা প্রযোজ্য। সে সময়ের লোকসাধারণের কবিরা এই ‘লৌকিক করিয়া’ ‘লৌকিকের মতে’, মূলধারায় কবিতা তথা সাহিত্য রচনা করতেন।
কিন্তু তারপর পরে একটি দীর্ঘ ছেদ। বাংলা সাহিত্যে কথিত অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে বড়ু চণ্ডীদাস নিয়ে আসেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। এ কাব্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়লীলাচ্ছলে জীবাত্মা-পরমাত্মা লীলা লীলায়িত হলেও মধ্যযুগের শুরুতে একাব্য অনবদ্য ভূমিকা রাখে। তবে মধ্যযুগ বিশেষভাবেই বিখ্যাত মঙ্গলকাব্যের জন্য। প্রায় পাঁচশ বছর ধরে বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন শ্রেণির মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছে। যদিও মঙ্গলকাব্যগুলোর রূপ প্রায় একই রকম। কতিপয় মঙ্গলকাব্যে কবিতার ভারী যাদু থাকলেও সবচেয়ে বেশি ছিল সমকালীন সামাজিক জীবনের বোধ ও পরিচয়। বাংলাদেশের মধ্যযুগের ইতিহাস জানতে হলে মঙ্গলকাব্য অবশ্যপাঠ্য। বৈষ্ণব পদাবলি আমাদের স্বপ্নে বিভোর করে। বৈষ্ণব পদাবলির পাত্র-পাত্রী কৃষ্ণ-রাধাকে কেন্দ্র করে যে কবিতাগুলো রচিত হয়েছিলো সেগুলো বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
রাজসভায় রচিত হলেও মধ্যযুগের সাহিত্য কেবল অভিজাতদের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেনি। মধ্যযুগে সামাজিক বৈষম্য প্রকট থাকলেও, পুরোহিত-মোল্লাদের দাপট থাকলেও, অভিজাত কর্তৃক উৎপীড়ন থাকলেও, সে যুগের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বাংলার প্রাকৃতজনেরই প্রাধান্য ছিল। যারা আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসবিদ, তাদের অনেকের মতে, মধ্যযুগের সর্বশেষ কবি হলেন ভারতচন্দ্র আর আধুনিক যুগের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন। মাঝখানে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত হলো ‘যুগসন্ধির কবি’।
মধ্যযুগের বিদায়ী দামামা বেজে ওঠে, যখন ১৭৫৭-তে আমরা স্বাধীনতা হারাই। বণিক শাসক হয়। অনেক পরিবর্তনের সাথে সাথে সাহিত্যের পরিবর্তন বা পতন ঘটে। ভারতচন্দ্রের রচনায় দেখা যায় পতনের ছাপ। বলা হয়ে থাকে ১৭৬০ থেকে ১৮৩০ এই সত্তর বছর বাংলা সাহিত্যের পতন ঘটেছিল। সে সময় কবিয়াল ও শায়েরদের উদ্ভবে এক নিম্নরুচি সম্পন্ন সাহিত্য রচিত হয়। অর্থাৎ, কবিগান। কবিগানকে গর্ব করার মতো সাহিত্য বলতে অনেকে নারাজ। কবিয়াল ও শায়েররা বিকিয়ে গেলেও কোনো কোনো কবিগান বা শায়েরি আজো বাংলার প্রাকৃতজনের মনে শেকড় গেড়ে আছে সেসবের অনবদ্য ছন্দ ও সুরের নান্দনিকতার কারণে।
বাংলা কবিতায় আধুনিকতা আনেন মাইকেল মধুসূদন। মহাকাব্য রচনা করে বাংলা কবিতার রূপ বদলে দেন। শুধু তাই নয় তিনি বাংলা পয়ারকে এক নতুন রূপে উপস্থাপন করেন। ব্যবহার ক্লান্ত ছন্দরীতিকে মধুসূদন করে তোলেন প্রবাহমান (অমিত্রাক্ষর)। এর আগে অবশ্য ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতায় আধুনিকতার হাল্কা আলোকচ্ছটা দেখা যায়। তবে মধুসূদন একাই এক ধাক্কায় বাংলা সাহিত্যকে অনেক এগিয়ে দিয়ে গেছেন। মধুসূদনের দেখাদেখি অনেকে (হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, কায়কোবাদ) মহাকাব্য রচনার চেষ্টা করেন। কিন্তু, শেষপর্যন্ত ওগুলো মহাকাব্য না হয়ে আখ্যানকাব্য হয়ে ওঠে।
বাংলা কবিতায় মহাকাব্যের ধুমধাম চলাকালে রোমান্টিকতা নিয়ে উঁকি দেন বিহারীলাল। বাংলা কবিতার তিনি-ই প্রথম রোমান্টিক ও খাঁটি আধুনিক কবি। রবীন্দ্রনাথ যাকে ‘ভোরের পাখি’ বলেছেন। আত্মভাবপ্রধান কবিতার জন্ম বিহারীলালের হাতে হলেও বিকাশ ঘটে রবীন্দ্রনাথের হাতে। অগ্নিকুণ্ডে পতঙ্গ পতনের মত বিহারীলাল চলে গেলেও তার কবিতার পথ ধরে আসে—সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, দেবেন্দ্রনাথ সেন, গোবিন্দচন্দ্র দাস, অক্ষয়কুমার বড়াল, ডিএল রায় ও রবীন্দ্রনাথ। প্রথম মহাযুদ্ধের মাধ্যমে বদলে যাওয়া ইউরোপীয় চেতনার প্রভাব পড়ে আমাদের জীবন ও সাহিত্যে। দু’দণ্ড দেরিতে হলেও সেই প্রভাব আমাদের কবিতায় এসে ভালভাবেই পড়ে। আধুনিক কবিতাগুলো বিশশতকের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হয়ে ওঠে।
বিশশতকের গোড়ার দিকে বাংলা কবিতায় রবীন্দ্র-যুগ চলাকালে রবীন্দ্রাগুনে পুড়েছেন অনেকেই। তবে রবীন্দ্র-বলয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টাও করেছেন অনেকে। তাদের মধ্যে মোহিতলাল, যতীন্দ্রনাথ বিশেষ করে কাজী নজরুল ইসলাম। যিনি একইসাথে প্রেম ও দ্রোহের কবি। তার কবিতায় যেমন বিদ্রোহ আছে তেমনি আছে কৈশোরিক প্রেমের কাতরতা। বিশ শতকের তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি সময়ে আধুনিক কবিতার রমরমা হাট বসে বাংলা সাহিত্যে। বাংলা কবিতায় বাঙালির প্রথাগত বিশ্বাস, সুন্দর, কল্যাণ, আবেগ, স্বপ্ন, সুখ-দুঃখ ও কাতরতা বিসর্জন দিয়ে আধুনিক কবিগণ নগরের কথা ও ক্লান্তি, অবিশ্বাস, নিরাশার কথা ফুটিয়ে তোলেন কবিতায়। কবিতায় পাল্টে যায় বাঙালির চেতনা। বুদ্ধদেব, জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু ও অমিয়, এই পাঁচজন কবিকে রবীন্দ্রনাথের পর আধুনিক কবিতা সৃষ্টিকারী বাংলা ভাষার প্রধান কবি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কিন্তু তারপর অচিরেই এই পঞ্চকবিকে অনুসরণ করে আসলেন সমর ও সুকান্ত।
সাহিত্যে রক্ষণশীলতা ও প্রগতিশীলতা মুখোমুখী দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় প্রায়শই। বিশ শতকের গোড়াতেই আধুনিক সাহিত্যকে অশালীন বলে গালিগালাজ করে প্রবন্ধ ও বই ছাপেন ঊনিশ শতকের বিভিন্ন রক্ষণশীলেরা। আসলে সাহিত্য কখনো অশালীন বা অশ্লীল হয় না। বিশেষ করে কবিতা। কবিতায় সব বলা যায় সব রকম ভাবে। এছাড়া অশ্লীল কথাটি আপেক্ষিক। শ্লীল-অশ্লীল নিয়ে বাগ-বিতণ্ডা না করে বরং সাহিত্যকে নিরপেক্ষ মন ও মননেই দেখা উচিত। ইতিহাস থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, যখনই রাষ্ট্রযন্ত্র বা শাসকশ্রেণি সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর শাসন-শোষণ, অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে তখনই যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখচ্ছবি, অর্থাৎ কবি-সাহিত্যিকরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন কবিতা অথবা নানা ধরনের গদ্য রচনার মাধ্যমে। যে সাহিত্যগুলো নানাভাবে বিভিন্ন আন্দোলনেও প্রেরণা জুগিয়েছে। ঊনবিংশ শতককে কখনো বলা যায় বাংলা গণসংগীতের স্ফুরণকাল। সেভাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও দেশ ভাগের পর পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন আন্দোলনের হাত ধরে রচিত হয়েছে বহু প্রতিবাদী সাহিত্য, কবিতা ও গণসংগীত। পাকিস্তানিরা প্রথম যখন আমাদের ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানলো, শুরু হলো আন্দোলন। মাহবুব উল আলম চৌধুরী লিখলেন একুশের প্রথম এবং অমর এক কবিতা—‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসীর দাবী নিয়ে এসেছি’। তবে একুশের প্রথম কবিতাটি ইতিহাস থেকে প্রায় হারিয়েই গেছে। অর্থাৎ, হানাদারদের বহু হয়রানি ও তল্লাশির দাপটে কবিতাটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারিসহ কবির বাসা কয়েকবার সার্চ করে লুকানো দু’একটি কপি পর্যন্ত নিয়ে যায় পুলিশ। পরবর্তীতে কবিতাটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে শহীদ আসাদের শার্ট নিয়ে লিখলেন শামসুর রাহমান, যা আন্দোলনকে বেগবান ও সফল করে তুললো। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রচিত হয়েছে বহু প্রতিবাদী ও প্রেরণাদীপ্ত কবিতা, সাহিত্য এবং গণসংগীত। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর নির্মলেন্দু গুণ সামরিক শাসনের কড়া পাহারার মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে (১৯৭৭) বীরদর্পে পড়ে শোনালেন তার অগ্নিঝরা কবিতা—
“সমবেত সকলের মত আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি
রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেই সব গোলাপের একটি গোলাপ
গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায়
শেখ মুজিবের কথা বলি।”
নির্মলেন্দু গুণ-ই প্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কবিতার বিষয় করে তুললেন। তারপর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখলেন জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামালসহ আরো অনেকে। অর্জুনের মত বীর সময় দোষে নপুংসক সাঁজলেও কবি কখনো তেমনটি হয় না বা হওয়া উচিত না। কবি হবে মজলুম, প্রয়োজনে নির্বাসিত। বলবে মানুষের (সংখ্যাগরিষ্ঠ) কথা, মানবতার কথা। রুদ্র পেলেন বাতাসে লাশের গন্ধ আর তসলিমা সব বয়স্কা বালিকাদের গোল্লা হতে ছুটে বেরুনোর আহ্বান জানালেন কবিতায়। তারপর ’৯০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত হয় কিছু প্রতিবাদী কবিতা ও গণসংগীত।
ইতিহাসের একটি বিশ্লেষণে প্রতিভাত হয় যে, ’৯০-এর দশকের পর থেকে কবিতার পাঠক সংখ্যায় যেন ভাটা পড়েছে। ইদানীং কবি দেখলেই বলাবলি শুরু হয়—কবিতার এখন আর দিন নেই, কবিতা এখন পাঠক খায় না, কবিতার বই বাজারে কাটে না ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে এখানেই ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে যে তথাপি কবির সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে বৈ কমছে না। বিশেষতঃ কবিতা প্রকাশ করতে এখন আর প্রকাশকের পেছনে লাইন দিতে হয় না। চাইলেই ফেসবুক ওয়ালে কবিতা ছুড়ে দেয়া যায়। হাইকোর্টের সামনে থেকে মূর্তি সরানো ও অন্যত্র স্থাপন নিয়ে এখনি সহস্র কবিতা ছুড়ে দেয়া যায়। এখন মিনিটে মিনিটে রচিত হচ্ছে কবিদের ভ্রুণের চেয়েও বেশি সংখ্যক কবিতা। প্রযুক্তির কল্যাণে কবি ও কবিতার পাঠক এখন একবারে মুখোমুখী দণ্ডায়মান। এটা ভাল। কিছুদিন পূর্বেও যেটা সম্ভব ছিল না খুব বেশি। শাসন-শোষণ, অত্যাচার-নির্যাতন বা আগ্রাসন কি এখন হচ্ছে না? তবে আমরা সে রকম কোনো কবিতা পাচ্ছি না—কিন্তু কেন?
আজকাল কবিতার বিষয় কী কী, সেটা কিন্তু আমরা হাতের মুঠোয়-ই দেখতে পাচ্ছি। আমরা আজ যা হাতের মুঠোয় দেখতে পাচ্ছি তা যদি নজরুল আগেই বলে যেতে পারেন তার কবিতায়, তাহলে কী আমাদের এখনকার কবিগণ আগামী বিশ্ব সম্পর্কে ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাদের কবিতায়, অথবা এর চেয়েও পরবর্তী কিছু। আজকাল কবিতায় নারীকে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, বিদ্যমান প্রাকৃতিক পরিবেশের চিত্র কবিতায় কতোটা স্থান পাচ্ছে নিশ্চয়ই চর্যাপদে বর্ণিত বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর এখনকার সৌন্দর্য এক হবে না। মঙ্গলকাব্য পড়ে যদি বাংলাদেশের মধ্যযুগের সামাজিক অবস্থা (ইতিহাস) জানা যায়, তবে আমাদের আজকের কবিদের কবিতা বা সাহিত্যে সমকালীন পঁচনশীল পুঁজিবাদের ভোগসর্বস্ব কায়েমী স্বার্থবাদী ও পাশাপাশি আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তি মানসিকতার যে সমকালীন সমাজ বাস্তবতা, সেই সমাজ বাস্তবতার ঠাঁই পাওয়াটাই স্বাভাবিক।
বাঙালির জমিতে কলের লাঙল পড়েছে, ছনের চাল হয়েছে টিনের এবং সেই চালে বসেছে কাক, শাদা কাক। মোড় নিচ্ছে আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা। নেওয়াটাই হয়তো স্বাভাবিক। সময়কে তো আর অস্বীকার করা যায় না। কালে কালে মহাকাল অবধি কবিগণই মানুষের সমস্ত অনুভূতি কে বাঁচিয়ে রাখে। কবিদের গর্ভেই বাঁচে মানুষ। আমাদের এই কবিসকল কি পারবেন মানুষের মানবিক অনুভূতিগুলোকে কবিতায় বন্দি করে মহাকাল অবধি দীর্ঘজীবন দিতে নাকি ফেসবুক বা প্রযুক্তি নামক কালের গর্ভে হারিয়ে যাবেন কাক ও কাল যত কিছুকেই আমরা আপন করে নিই না কেন? তাতে কোনো দোষ নেই, তবে লৌকিক বাংলার গভীর মানবিক চেতনার স্বকীয়তা কতটুকু বজায় থাকছে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যে বাংলা সাহিত্যের দেবী চিরকাল কাব্যজীবি, কবিতার স্বাদ ছাড়া সে বাঁচবে কী করে। আমরা কি কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি?
নবম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা
তৃতীয় বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
সম্পাদকীয়-
মহান একুশে- আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও এক দুঃখিনী বর্ণমালার ইতিহাস
বাংলা ভাষা ও বাংলা বর্ণমালার উদ্ভব ও বিবর্তনের একটি স্বতন্ত্র ও মৌলিক ইতিহাস রয়েছে। আমরা জানি যে, প্রাচীন কাল থেকে পাঁচটি স্তর পার হয়ে আধুনিক বর্ণমালা এসেছে। প্রাচীনকালে কোনো বর্ণমালা ছিলো না। গাছপালা-মানুষ-প্রাণী’র ছবি এঁকে মনের ভাব প্রকাশ করা হতো। এটা হচ্ছে বর্ণমালার প্রথম স্তর- “গ্রন্থিলিপি”। আনুমানিক দশ-বারো হাজার বছর আগে মানুষ গ্রন্থিলিপি দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করতো। এরপর এলো “ভাবলিপি”- সম্পূর্ণ ছবি না এঁকে সংকেত বা চিহ্ন বা প্রতীকের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম। ভাবলিপি ছিলো অনেকটা এমন- দিন বোঝাতে পূর্ণ বৃত্ত, অর্থাৎ সূর্য আঁকা হতো, আর রাত বোঝাতে অর্ধ বৃত্তের সাথে তারকা আঁকা হতো। এরপর এলো তৃতীয় স্তর- “শব্দলিপি”, এই স্তরে ব্যাপক হারে ছবির বদলে চিহ্নের ব্যবহার হতে লাগলো। শব্দলিপি আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে এলো চতুর্থ স্তর- “অক্ষরলিপি”। অক্ষরলিপি আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে পঞ্চম স্তর হিসেবে এলো “ধ্বনিলিপি”। এই ধ্বনিলিপি থেকেই আধুনিক বর্ণমালার উৎপত্তি। সেই সময় বিভিন্ন বর্ণে বা রঙে বিভিন্ন অক্ষর লিখা হতো, সেখান থেকেই অক্ষরের নাম হয়েছে বর্ণ, বর্ণমালা।
আমাদের বাঙলা বর্ণমালা এসেছে প্রাচীন ভারতীয় “ব্রাহ্মীলিপি” থেকে। পৌরাণিক উপ-কথামতে হিন্দু দেবতা ব্রহ্মা ভারতবর্ষের প্রাচীন লিপি আবিষ্কার করেছিলেন এবং ধ্বনির সাথে মানুষকে এই লিপি দান করেছিলেন, তার নামানুসারে ঐ লিপির নাম হয় ব্রাহ্মীলিপি। কেউ কেউ বলেন, বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণরা ছিলেন শ্রেষ্ঠ পুরোহিত। ব্রাহ্মণদের দ্বারা এই লিপি আবিষ্কৃত হয়েছিল বলেই এর নাম ব্রাহ্মীলিপি। যে যাই বলুক, ভারতবাসী নিজেরাই সৃষ্টি করেছিলেন ব্রাহ্মীলিপি। ব্রাহ্মীলিপির পেছনে ফিনিশীয় লিপির প্রভাব আছে বলে দাবী করা হয়। তবে প্রাচীন ভারতীয়রা সম্ভবত স্বাধীনভাবেই নিজেদের লিপি উদ্ভাবন করেছিল- কারণ ফিনিশীয় লিপির চেয়ে ব্রাহ্মীলিপির পার্থক্য অনেক। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতক থেকে ৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে ব্রাহ্মীলিপি প্রচলিত ছিল। এরপর “অশোক লিপি” বা “মৌর্য লিপি”তে এর বিবর্তন শুরু হয়। এর পরের ধাপে আসে “কুষাণ লিপি”, এগুলি কুষাণ রাজাদের আমলে প্রচলিত ছিল। এরপর ব্রাহ্মীলিপিটি উত্তরী ও দক্ষিণী- এই দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়। উত্তরী লিপিগুলির মধ্যে পূর্বদেশীয় গুপ্তলিপি প্রধান, এটি ৪র্থ ও ৫ম শতাব্দীতে প্রচলিত ছিল। গুপ্তলিপি থেকে আবির্ভাব হয় “কুটিল লিপির”, এটি ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শতক পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। কুটিল লিপি থেকে উদ্ভব হয় নাগরী লিপির। প্রাচীন নাগরী লিপির পূর্ব শাখা থেকে ১০ম শতকের শেষভাগে এসে উৎপত্তি হয়েছে বাঙলা লিপির। অর্থাৎ ব্রাহ্মীলিপি > অশোক লিপি বা মৌর্য লিপি > কুষাণ লিপি > উত্তরী গুপ্তলিপি (পূর্বদেশীয়) > কুটিল লিপি > নাগরী লিপি > বাঙলা লিপি।
ব্রাহ্মীলিপি থেকে সৃষ্ট বাঙলা বর্ণমালা দেখতে কিন্তু এখনকার বর্ণমালার মতো ছিলো না, সময়ের পরিবর্তনে বর্ণ’র চেহারারও পরিবর্তন হয়েছে। তখন যেহেতু ছাপাখানা ছিলো না, শুদ্ধতা বজায় থাকবে কী করে? তখন মানুষ হাতে কাব্য লিখতো, পুঁথি লিখতো। একেকজনের হাতের লেখা একেকরকম, দশজন দশরকম করে “ক” “খ” লিখেছে। এভাবেই পরিবর্তিত হতে হতে পাল্টে গেছে বাঙলা বর্ণমালা। কম্বোজের রাজা নয়পালদেবের ইর্দার দানপত্রে এবং প্রথম মহীপালের বাণগড়ের দানপত্রে সর্বপ্রথম আদি বাংলা বর্ণমালা দেখতে পাওয়া যায়। ব্রাহ্মীলিপি’র প্রথম পাঠোদ্ধার করেন প্রাচ্যবিদ্যা-বিশারদ প্রিন্সসেপ। আমাদের দেশের সিলেটের উপভাষারও কিছু বর্ণমালা ছিলো, আধুনিক বাঙলা বর্ণমালা থেকে একটু আলাদা, প্রায় অবিকৃত ‘নাগরী লিপি’র মতো।
এখন পর্যন্ত তিন ধরনের ব্রাহ্মীলিপির নমুনা আবিষ্কৃত হয়েছে, যাতে ৪৪টি বর্ণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে স্বরবর্ণ ৯টি, ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৫টি। বাঙলা বর্ণমালার “ঔ” ও “ঋ” ব্রাহ্মীলিপির স্বরবর্ণে না পাওয়া গেলেও ব্যঞ্জনবর্ণে এ দুটি বর্ণের নমুনা পাওয়া গেছে। আমরা এখন যে কয়টি স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ দেখি, আগে এর চেয়ে কয়েকটি বেশি ছিলো। এই তো কিছুদিন আগেও স্বরবর্ণতে ৯ ছিলো, এখন আর ৯-এর অস্তিত্ব নেই। এর সাথে ছিলো ঋৃ। ব্যঞ্জনবর্ণতে ছিলো ল (মূর্ধন্য ল), ছিলো হ্ল (মহাপ্রাণ ল), ছিলো ব (অন্তঃস্থ ব)। যুগে যুগে বাঙলা বর্ণমালার আকার-আকৃতি বদলাতে বদলাতে মুদ্রণযন্ত্রের ঢালাই ধাতুতে তৈরি বর্ণের কল্যাণে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা বর্ণমালার স্বরূপ মোটামুটি স্থির রূপ পায়।
বাংলা বর্ণমালা একসময় ব্রাহ্মীলিপি থেকে উদ্ভূত হলেও মধ্যযুগে এসে বাংলা বর্ণমালা বাংলার স্বাধীন শাসন ব্যবস্থার মতোই স্বতন্ত্র পথ ধরে বিবর্তিত হয়ে নিজস্ব একটি মৌলিক রূপ পরিগ্রহ করে। বাংলা বর্ণমালার এসব বিবর্তনের ইতিহাসের মধ্যেও বাংলার স্বাধীন পরিচয় নির্মাণ ও পরিগ্রহণের আকাক্সক্ষা সম্পৃক্ত রয়েছে।
অথচ ১৯৪৭-এর পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের অপরাপর প্রাদেশিক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ সিন্ধি, বেলুচি, পাঞ্জাবি ও পশতু ভাষার বর্ণলিপির মতোই বাংলা বর্ণমালা পরিবর্তন করে ফারসি-আরবি অথবা ল্যাটিন বর্ণমালা ব্যবহার করে লেখার পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। বাংলা ভাষা ও বাংলা বর্ণমালা তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর ভাষা ও ভাষায় ব্যবহৃত বর্ণমালা হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যালঘু ভারতীয় মুসলমান অভিজাত শ্রেণির ভাষা ও বর্ণমালা অর্থাৎ উর্দুকেই এবং ফারসি-আরবি লিপিকেই পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ও বর্ণমালা হিসেবে চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। পাকিস্তানের সিন্ধ, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও উঃ পঃ সীমান্ত প্রদেশে এখনও শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাদেশিক ভাষা স্থান করে নিতে পারেনি। পাকিস্তানের এরকম অসভ্য, আধিপত্যবাদী, অমানবিক এবং অন্যায় পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বাঙলায় গর্জে ওঠে প্রতিবাদ কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে বাঙালির এই দাবি এবং প্রতিবাদের যুক্তি অনুধাবন করার চেষ্টা গ্রহণ না করে তৎকালীন পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বুলেটের মাধ্যমে জবাব দেওয়ার পথ গ্রহণ করে। বুকের রক্ত দিয়ে সেদিন বাঙালি তাদের মাতৃভাষা ও বর্ণমালার অধিকার আদায় করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং এই বাঙলায় বাঙলা ভাষা ও বর্ণমালা ব্যবহারের দাবি মেনে নিতে পাকিস্তানি শাসকদের বাধ্য করেছিল। এটাই ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস।
সভ্যতা, মানবতা ও ন্যায়ের পক্ষে ১৯৫২ সনে বাঙালির এই ভাষা সংগ্রাম প্রতিষ্ঠিত মানবিকতার ন্যায্য যুক্তির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে পরিচালিত ছিল বলেই এই আন্দোলন সারা বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে আজ পৃথিবীতে প্রত্যেক মাতৃভাষার মর্যাদাবোধ জাগ্রত হয়েছে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালনের জন্য জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভ করেছে।
সপ্তম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
অষ্টম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা
অনুপ্রাণনের চড়াই উৎরাই-
তরুণ লেখকদের শিল্প ও সাহিত্য চর্চার একটি মঞ্চ বা জমিন নির্মাণ করার কাজের অঙ্গীকার নিয়েই শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, যাত্রার সূচনা করেছিল। আজ দশ বছর পরে এসে যদি এই প্রশ্ন নিয়ে ফিরে তাকাই যে, এই অঙ্গীকার পূরণে অনুপ্রাণন কতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছে? অথবা, যদি প্রশ্ন রাখা যায় যে নবীন ও তরুণদের শিল্প-সাহিত্যের চর্চার ক্ষেত্রে অনুপ্রাণনের মঞ্চ বা জমিনটাই বা কতটুকু প্রসারিত? প্রশ্নের জবাবে অনুপ্রাণনের সফলতা ও ব্যর্থতার একটা প্রতিবেদন হয়তো দেয়া যাবে কিন্তু সে চিত্রটিকে আমাদের সমাজের সামগ্রিক প্রেক্ষিত ও সেটার সাথে সম্পর্কিত মানবিক বোধের ধারায় শিল্প-সাহিত্যের চর্চার বাস্তব পরিধি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।
ব্যক্তিক প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে গড়ে উঠে সংগঠন এবং সুগঠিত সাংগঠনিক চেষ্টার মধ্য দিয়ে বস্তুগত শর্ত ও পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। যে শর্ত ও পরিবেশের উপর ভিত্তি করে ভৌত উন্নয়নের পাশাপাশি জনগোষ্ঠীর সৃজনশীল মন, মনন, উদ্ভাবন-মনস্কতা, নান্দনিক ও মানবিক বোধ জাগ্রত হতে পারে এবং সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি অর্জন করা যেতে পারে। তাই, এই লক্ষ্য অর্জনের পথে যৎসামান্য অবদান হিসেবে অনুপ্রাণনের উদ্যোগে পরিচালিত সৃজনশীল শিল্প-সাহিত্য চর্চার কাজে আমাদের ব্যক্তিক ও সাংগঠনিক প্রচেষ্টা কতটুকু কার্যকর ছিল সেই মূল্যায়নের ভার অনুপ্রাণনের বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের হাতে। এই বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনার দ্বার সবসময় উন্মুক্ত থেকেছে।
বিগত প্রায় দশ বছরের ইতিহাসে অনুপ্রাণনের সম্পাদনা পরিষদ নানা ভাঙ্গা গড়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, যার ফলে প্রচেষ্টার প্রত্যাশিত গমনপথ ও গতিতে পরিবর্তন হয়েছে। অর্থাৎ অনুপ্রাণনের চলার পথ মসৃণ ছিল না। চড়াই, উৎরাই, অথবা কখনো বন্ধুর পথ অতিক্রম করেই অনুপ্রাণনকে অগ্রসর হতে হয়েছে।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন এ-৪ সাইজের ১৬০টি পৃষ্ঠা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। ছাপার পূর্ববর্তী কাজ, কাগজ ও প্রেসের খরচ প্রতিটির বিনিময় মূল্য ৳ ১৫০/- দিয়ে হিসাব করলে পুরোটা খরচ উঠে আসে না। কর্পোরেট হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকার জন্য অনুপ্রাণন, বিজ্ঞাপন সংগ্রহ ও তা প্রকাশ করে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় নি। প্রথম থেকেই অনুপ্রাণনের সম্পাদকেরা কোন সম্মানী ছাড়াই একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। লেখকেরাও কোন সম্মানী ছাড়াই লেখা দিচ্ছেন। ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনুপ্রাণনের বিনিময় মূল্য বৃদ্ধি করার প্রস্তাব জোরালো যুক্তি নিয়ে সামনে চলে আসছে। কিন্তু, অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক পত্রিকার বিনিময় মূল্য বাড়ালে পাঠকের উপর যে বাড়তি চাপ পরবে এই বিষয়েও অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদ সচেতন রয়েছে।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন ১০ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা
সম্পাদকীয়-
শিল্পী গোষ্ঠীর সমাজ-সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন
শিল্পী ও সাহিত্যিকদের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধভাবে একমাত্র নান্দনিক সৃজনের ঘেরাটোপে বন্দী না থেকে সমাজে বসবাসের শর্তাবলী ও পরিবেশ একজন শিল্পী ও সাহিত্যিক’কে অন্য যে কোন সচেতন নাগরিকের মতোই একান্তভাবে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে উৎসারিত ও গৃহীত সকল মতামত প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে তাঁর কাজে প্রকাশ করতে দেখা যেতে পারে। বিশেষতঃ একজন শিল্পী ও সাহিত্যিক পরিবেশ ও সমাজের ক্ষেত্রে গভীরভাবে সংবেদনশীল হওয়ার কারনে তাদের সৃজনশীল কাজে ও রচনায় সমাজের রীতি-নীতি, অর্থনীতি ও রাজনীতির ভাল-মন্দ এবং দোষ-গুণের প্রতিফলন থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না বরঞ্চ এই থাকাটাই যেন স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্র মত প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা রকম সীমা বেঁধে দেয়। এসব সীমার মধ্য থেকেই শিল্প চর্চার বিভিন্ন মাধ্যম ও অবলম্বনের সাহায্য নিয়ে একজন শিল্পী অথবা সাহিত্যিকের যেমন প্রচ্ছন্নভাবে নিজের মতটি প্রকাশ করার প্রচেষ্টা থাকে তেমনই আবার শিল্পী-সাহিত্যিকবৃন্দ দ্রোহী হয়ে মত প্রকাশের ফলে রাষ্ট্রের অথবা কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর কোপানলে পড়ে নির্যাতিত হওয়া এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হাতে তাদের সহিংস আক্রমণের শিকার হতেও আমরা দেখেছি।
তাই, এখানে প্রশ্ন এটা নয় যে, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের সৃজনশীল কাজে ও রচনায় সমাজের রীতি-নীতি, পরিবেশ, অর্থনীতি ও রাজনীতির ভাল-মন্দ এবং দোষ-গুণ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ অথবা প্রচ্ছন্নভাবে তাদের ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন থাকবে কি-না? বাস্তবে প্রশ্নটা হচ্ছে সামাজিক-রাজনৈতিক এবং পরিবেশগত সমস্যা সম্পর্কে রাষ্ট্র ও জনগণকে সচেতন করা এবং সেসব সমস্যা দূর করার জন্য সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিল্পী ও সাহিত্যিকদের ভূমিকা কীভাবে নির্ধারিত হবে? বরঞ্চ, প্রশ্নটা দুটো হচ্ছে-
ক. শিল্পী ও সাহিত্যিকবৃন্দ নিজেরাই কোন সামাজিক সংগঠন করবে কি-না অথবা পেশাজীবীদের অন্য কোন বৃহত্তর সামাজিক সংগঠনে সম্পৃক্ত হবে কি-না? এবং
খ. স্রেফ শিল্পীদের নিজস্ব অথবা অন্য কোন বৃহত্তর সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে সমাজের কোন ন্যায্য দাবী অথবা সমাজের কোন বাস্তব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পরিচালিত রাজপথের আন্দোলনে ফেস্টুন-ব্যানার নিয়ে নিজেরা সম্পৃক্ত হবে কি-না? এবং
গ. যদি শিল্পী ও সাহিত্যিকবৃন্দ নিয়মিতভাবে কোন সামাজিক সংগঠনমূলক কার্যক্রমে সক্রিয় হয়ে যায় এবং সামাজিক ইস্যুতে রাজপথের আন্দোলনে নেমে পড়ে অথবা সরাসরি কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হয়ে যায় তাহলে সময় ও মনোসংযোগ দ্বিধান্বিত হয়ে বাধা পড়ে শিল্প ও সাহিত্য চর্চার মান ও গুণাগুণের ক্ষেত্রে শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা কোন ক্ষতি বা সমস্যার সম্মুখীন হবে কি-না?
এখানে উল্লেখ্য যে, অন্য সামাজিক সংগঠনের আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা অথবা সংহতি প্রকাশ, ঘড়ে বসে শিল্পী-সাহিত্যিকদের নিজস্ব সংগঠন করা অথবা ফেস্টুন ব্যানার নিয়ে রাজপথে নেমে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া ইত্যাদী নানা উপায়ে একজন শিল্পী অথবা সাহিত্যিকের পক্ষে সামাজিক আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। একজন শিল্পী অথবা সাহিত্যিক সামাজিক আন্দোলনের সাথে কীভাবে যুক্ত হবেন সেটা একান্তভাবেই তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এবং এটাও বাস্তব সত্য যে একজন সংবেদনশীল ও সচেতন শিল্পী অথবা সাহিত্যিক ন্যায্য দাবী ও বক্তব্য নিয়ে পরিচালিত চলমান সামাজিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আত্মকেন্দ্রিক চিন্তায় আবদ্ধ হয়ে কোনভাবেই নিষ্ক্রিয় এবং নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না।
১৯৬৯ এর গণভ্যুত্থান অথবা ১৯৭১ এর মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলিতে শিল্পী সমাজের সদস্যবৃন্দকে সংগঠিতভাবে ফেস্টুন-ব্যানার নিয়ে আন্দোলনে-সংগ্রামে-মিছিলে যুক্ত হতে আমরা দেখেছি। ৭১’এর স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে এমনকি প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে নিয়ে শিল্পী ও সাহিত্যিকদের মুক্তিযুদ্ধে সংযুক্ত হতে আমরা দেখেছি। এর পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা বিভিন্নভাবে সংগঠিত হয়েছেন। এসব আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র।
স্বাধীনতার পর শিল্পী ও সাহিত্যিকদের যেসব সংগঠন গঠিত হয়েছে সংগঠনভেদে সেগুলোর মূল লক্ষ্যই ছিল জোটবদ্ধভাবে শিল্প চর্চা, আলোচনা-সমালোচনা, শিল্পের প্রচার-প্রসার, পরোক্ষভাবে ব্যক্তির প্রচার ও প্রসারলাভের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা থেকে বিপণন কৌশল অবলম্বন করা পর্যন্ত। তাছাড়া, রাষ্ট্রীয়, সরকারী অথবা বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, সংবাদ-মাধ্যম, কর্পোরেট অথবা নন-কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পদক-পুরস্কার অথবা আনুকূল্য লাভের জন্য এসব কোন কোন ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংগঠন ও জোটের তৎপরতার সুযোগ গ্রহণ করতেও আমরা দেখেছি। শিল্প ও সাহিত্যকেন্দ্রিক নানা তৎপরতা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও এসব সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে সৃজনশীল অথবা মননশীল শিল্পগুণের মান ও রুচির উৎকর্ষতা লাভের ক্ষেত্রে এসব সংগঠন বিশেষ কোন অবদান রাখতে বিশেষ কোন সাহায্য করেছে বলে এরকম উদাহরণ পাওয়া যায় না। দলীয় অথবা ব্যক্তিগত লাভালাভের বিষয়গুলো সেখানে খুবই নগ্নভাবে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে এবং যার ফলে দেশে মাঝারী মানের শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতাই হয়েছে অত্যন্ত অধিকহারে। অন্যদিকে প্রচার, প্রসার ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে মৌলিক, মননশীল ও উচ্চতর মানসম্পন্ন শিল্প ও সাহিত্যকর্ম পাঠকদের কাছে ব্যপকভাবে পৌঁছানোর সুযোগ লাভ করতে পারেনি। এবং যার ফলে সত্যিকার প্রতিভাবান শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা হতাশা থেকে প্রচারবিমুখতা ও আত্মকন্দ্রিকতার ক্ষুদ্র গ-ির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছেন।
এছাড়া, রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্য চর্চা ও গবেষণা এবং তাঁদের সাহিত্যকর্মকে আধুনিক শিশু-কিশোর ও তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য দেশে কয়েকটি সরকারী-বেসরকারী সংগঠন কাজ করছেন। কিন্তু, রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্যকর্মের আক্ষরিক পঠন ও মুখস্থ করার উপরই এসব সংগঠনকে বেশী জোর দিতে দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের মাঝে যে মানবিক চেতনা ও যে দার্শনিক নির্যাস রয়েছে তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের সাথে অধিকহারে দেশের শিশু-কিশোর ও তরুণদের পরিচয় করিয়ে দেয়া খুব জরুরী। কেননা এতে করে দেশের নতুন প্রজন্মের মনের মাঝে মানবিক চেতনা ও সুন্দর রুচিবোধ স্থান করে নিতে পারে। এসব বিবেচনা করে রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্য চর্চা ও গবেষণার জন্য যেসকল সংস্থা ও সংগঠন কাজ করছেন সেসকল সংগঠন দক্ষতার সাথে তাঁদের কাজের পরিধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে চলুক- এটাই প্রত্যাশা করি।
প্রথম থেকেই শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, ব্যক্তি, দলীয়, গোষ্ঠী অথবা কর্পোরেট তৎপরতার বাইরে নিজের স্বাধীন অবস্থান রক্ষা করে দেশের নবীন ও তরুণ প্রতিভাবান শিল্পী ও সাহিত্যকদের পরিচ্ছন্ন ও মানসম্পন্ন শিল্প-চর্চার জন্য অনুপ্রেরনা যুগিয়ে এসেছে। সপ্তম বর্ষে পদার্পন করে ‘অনুপ্রাণন’ অবিচলভাবেই ঐ ঘোষিত পথেই তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে চায়। অনুপ্রাণন-এর মূল পৃষ্ঠপোষক অনুপ্রাণন-এর পাঠকেরাই। তাই, বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সপ্তম বর্ষে পদার্পণ করতে পেরে অনুপ্রাণন-এর লেখক এবং পাঠকেরা অবশ্যই বিশেষ অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য।
সপ্তম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা
অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব- সম্পাদকীয়
সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম পর্ব প্রকাশিত হওয়ার পর সাম্প্রতিকের আরো ২৫ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কবিতা ও কবিতা নিয়ে সামষ্টিক আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হলো শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব। দ্বিতীয় পর্বের এই ২৫ জন কবির নাম ইতোপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম পর্বের ন্যায় অনুপ্রাণনের ১০০ নির্বাচিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের কবি তালিকা থেকে নেয়া যাদের জন্ম ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হয়েছে। তালিকার অবশিষ্ট ৫০ জন নির্বাচিত কবি নিয়ে লেখা প্রকাশিত হবে আগামীতে প্রকাশিতব্য শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় ও চতুর্থ সংখ্যায়।
সংখ্যাটিতে অন্তর্ভুক্ত সাম্প্রতিকের কবিদের কবিতা নিয়ে আলোচনায় কয়েকটি বিষয় এসেছে যেমন- প্রতিকবিতা, উত্তর-আধুনিকতা, নৈরাজ্যবাদ ইত্যাদি। শুধু কবিতা নয় সামগ্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে নানা পর্যায়ে পরিবর্তনের সূত্র হিসেবে এই দর্শনগুলো নিয়ে আলোচনা আছে। দর্শন হিসাবে উত্তরাধুনিকতাবাদ- যুক্তিবাদীতার বিরুদ্ধে, বস্তুনিষ্ঠতার বিরুদ্ধে এবং সর্বজনীন সত্যের ধারণাগুলিকে প্রত্যাখ্যান করে। যার পরিবর্তে, এটি মানুষের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির বিচিত্রতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির বহুবিধ আপেক্ষিকতার উপর জোর দেয়। উত্তর-আধুনিক কবিতা প্রায়ই অর্থহীনতা অথবা বাস্তবতার অনুপস্থিতি প্রসঙ্গ নিয়ে কাজ করে এবং একটি অস্তিত্বগত দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করে। উত্তর-আধুনিক প্রতিকবিতায় প্রায়ই অস্থিরতার বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করে সাধারণত মুক্ত বিন্যাসে লেখা হতে পারে। কবিতায় অপ্রত্যাশিত লাইন বিরতি, বিশৃঙ্খল কাঠামো- এসব আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন হতে পারে। উত্তর-আধুনিক কবিতা প্রায়শই অস্তিত্ববাদী বা নিহিলিস্টিক প্রসঙ্গ নিয়ে কাজ করতে পারে। যদিও অস্তিত্ববাদ এবং উত্তর-আধুনিকতা সমার্থক নয়, তারা প্রায়শই সম্প্রর্কিত হতে দেখা যেতে পারে।
উত্তর-আধুনিক কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো কী- এই প্রশ্নটির উত্তরে একটা ধারনা দাড় করানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। আপাতত যে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে সেগুলো যেমন, প্রথমত, এলোমেলো ভাব- কেননা উত্তরআধুনিক রচনাগুলি শব্দের পরম অর্থের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। দ্বিতীয়ত, কৌতুকপূর্ণতা- কোন কোন ক্ষেত্রে কালো হাস্যরস, শব্দ নিয়ে খেলা, বিরোধালঙ্কার, বিড়ম্বনা এবং কৌতুকপূর্ণতার অপরাপর কৌশলগুলি যা কিনা প্রায়শই অর্থগুলোকে ঘোলাটে করার জন্য নিযুক্ত করা হয় যেন পাঠক দুর্বোধ্যতার ঘোরে একটি ভিন্নধরনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। তৃতীয়ত, বিবরণে- এমন কতগুলো অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিভাজন নিয়ে আসা যে টুকরোগুলি যুক্ত করে যে কোলাজ হতে পারে সেটা যেনো প্রায়শই অস্থায়ী বিকৃতরূপ ধারণ করে। চতুর্থত, মেটাফিকশন হতে পারে- অর্থাৎ কল্পকাহিনীর এমন বিশেষ একটি রূপ হতে পারে যা প্রকাশের জন্য রচনার বর্ণনামূলক কাঠামোকে এমনভাবে সাজানো হয় যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যই যেন পাঠক/দর্শকদের মনে করিয়ে দেয়া যে তারা একটি কাল্পনিক কাজ পড়ছে বা দেখছে। এবং পঞ্চমত ইন্টারটেক্সচুয়ালটি বা আন্তঃপাঠ্যতা- অর্থাৎ একটি পাঠ্যের অর্থ অন্য এক/একাধিক পাঠ্য দ্বারা প্রকাশ করা- যেটা হতে পারে একটি ইচ্ছাকৃত সৃজনশীল রচনাকৌশল যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে উদ্ধৃতি, ইঙ্গিত, অনুহরণ, কুম্ভিলকবৃত্তি, অনুবাদ, অনুকরণ অথবা প্যারোডি। তবে খেয়াল রাখতে হয় যে প্রতিকবিতা তখনই সফল হয় যখন ছন্দঃপ্রকরণ, ব্যাকরণ এবং অন্ত্যমিলে ইচ্ছাকৃতভাবে করা ভুলগুলোর বিশৃঙ্খলার মাঝে নান্দনিক প্রকাশভঙ্গী নিহিত থাকে।
মধ্যযুগের সাহিত্যে প্রবণতা ছিল সত্য ও মিথ্যার দ্বিমাত্রিক বয়ানের যেখানে পারলৌকিক শক্তি ও পরলৌকিকতা প্রকাশ্যে অথবা আড়ালে ঢুকে পড়েছে সর্বভারত উৎসারিত নিজস্ব নানা কথন বা বয়ান। এর অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও উপলব্ধি নিতান্তই ব্যক্তিক। যখন থেকে নির্ভেজাল ইহজাগতিক সত্যের উপর ভিত্তি করে সাহিত্য নির্মিত হতে থাকল তখন থেকে শুরু হলো আধুনিক সাহিত্য। কবিতায় যেমন উপন্যাসেও তেমন আধুনিক লেখক বস্তুবাদী, নৈর্ব্যক্তিক এবং নির্মোহ। বাঙলার আধুনিক সাহিত্য গঠনে ইউরোপের রেনেসাঁ পরবর্তী কালে রচিত সাহিত্যের প্রভাব রয়েছে। একইভাবে উত্তর-আধুনিক প্রবণতা আমাদের দেশজ দর্শন থেকে উৎসারিত না। কিন্তু, ব্যাপ্তি ও গভীরতায় আধুনিকতার তুলনায় উত্তর-আধুনিকতার বিষয় এবং মিথস্ক্রিয়া বহুবিস্তৃত। বৃহৎ নয়, ক্ষুদ্র; সমগ্র নয়, অংশ; গোছানো কিন্তু শৃঙ্খলাবদ্ধ নয়, এলোমেলো অথবা উদ্ভট; প্রথাগত নয়, নিরীক্ষামূলক; বিভিন্ন ক্ষেত্রের মিশ্রণ এবং মিথস্ক্রিয়া; ন্যারেটিভের অস্পষ্টতা; কোনো সাংস্কৃতিক প্রকল্পে একটি নয় বহু স্বরের সমাহার ইত্যাদিকে মনে করা যেতে পারে উত্তর-আধুনিকতার গুণ বা বৈশিষ্ট্য হিসেবে।
প্রাক-বাংলাদেশ পর্বে কোন কবি নয় বরঞ্চ সাঈদ আহমদ-ই বলা যায় উত্তর-আধুনিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে প্রথম অ্যাবসার্ড ঘরানার নাটক লিখেন। তিনি-ই প্রথম রূপকথা নিয়ে ফ্যান্টাসি ঘরানার নাটক লিখেন যা একই সঙ্গে ছিল এলেগরিকাল। অন্যদিকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অস্তিত্ববাদের ওপর ভিত্তি করে উপন্যাস লিখেন। এঁরা দুজনই বিদেশে প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন এবং পশ্চিম ইউরোপীয় সাহিত্য এবং দর্শনের সঙ্গে বেশ পরিচিত ছিলেন।
রেফারেন্স, প্রতীক, উৎপ্রেক্ষা ব্যবহার করে কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কবিতা এক জটিল সমীকরণে সম্পর্কিত হয়ে একইসাথে আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক স্বভাব ধারণ করেছিলো। উত্তর-আধুনিকতার উল্লিখিত এই প্রধান বৈশিষ্ট্যসমুহ রপ্ত করার পর বাকি যা থাকে সেসব কবিকে তাঁর নিজস্ব শৈলী উদ্ভাবনের মাধ্যমেই স্বাক্ষর রাখার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। উত্তর আধুনিকতার বিশাল ক্যানভাসে বাংলাদেশের কবিতা ক্রমেই মৌলিক, সৃজনশীল ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে।
Quarterly Anupranan 13th Year 2nd Issue, Samprotiker Kabi O Kobita- 2nd Part
‘চিন্তকের খসড়া খাতা’ একজন চিন্তাশীল লেখকের সৃজনশীল চর্চার একটি দলিল। আর এই দলিলটির মুসাবিদা করেছেন কবি, কথসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক স্বপঞ্জয় চৌধুরী। সাহিত্যের বহু বিচিত্র পথের বহুবর্ণিল প্রকৃতিকে তিনি যূথবদ্ধ করেছেন তেইশটি প্রবন্ধে। বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য তিনি এমনভাবে বিন্যন্ত করেছেন যাতে একজন জ্ঞানপিপাসু সাহিত্যামোদী যেমন জ্ঞানের এক বিস্তৃত ক্যানভাস পাবেন নিজেকে সমৃদ্ধ করতে তেমনি একজন গবেষক পেয়ে যাবেন অনেক তথ্য উপাত্ত।
যদি তাঁর খসড়া খাতাকে আমরা বিন্যাস করি তাহলে তাতে বহুমুখী প্রবণতা আমরা চিহ্নিত করতে পারি। কবিতায় তিনি নিয়ে এসেছেন নন্দনতত্ত্ব ও শিল্পের কারুকাজ, কবিতার শত্রু-মিত্র, কবিতায় ব্যবহৃত উপমা, অলঙ্করণ ও প্রতীক ইত্যাদি। আলোচনায় তুলে এনেছেন কবি মোহাম্মদ রফিকের কবিতার জীবনবোধ ও প্রকৃতি ভাবনা, অধুনাবাদের কবি ওবায়েদ আকাশ, মাহফুজ আল হোসেনের প্রেম ও বিপ্লবের কবিতা, কবিতার নিভৃত অন্তঃপ্রাণ কবি মোহাম্মদ হোসাইন এবং নির্জনতার কবি পরিতোষ হালদার। তাঁর খসড়া খাতায় স্বপঞ্জয় চৌধুরী তীক্ষ্ণ আলো ফেলেছেন গদ্য সাহিত্যের বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গনে। তিনি বিশ্লেষণ করেছেন পঞ্চাশ বছরের ছোটগল্পের, সাদ কামালীর প্রান্তিক জীবন ভাবনা, শরৎচন্দ্রের প্রেম বিরহ পরিণয় ও পরকীয়া এবং উপন্যাস দিকু’র নিঃসঙ্গ জীবনোপাখ্যানে। বিশেষভাবে আলোকপাত করেছেন হাংরি জেনারেশন মুভমেন্ট, হুমায়ুন আজাদের বহুমাত্রিকতা ও প্রথাবিরোধিতা। পাশাপাশি মিথলজির অঙ্গনেও এঁকেছেন নিজের পদচিহ্ন। তুলে এনেছেন গ্রিক মিথলজির সৃষ্টিতত্ত্ব, নানান দেশের লোকাচার ও মিথ, বাংলা সাহিত্যে গান ও ঈদোৎসব। তিনি তাঁর খসড়ার সম্ভার আরো সমৃদ্ধ করেছেন সিরিয়ান প্রথাবিরোধী কবি নিজার কাব্বানির জীবন ও কবিতার উপর আলোকপাত করে।
বইটির বহুমুখীনতায় সাহিত্যের পাঠকের তৃষ্ণা নিবারণে সক্ষম হবে এই প্রত্যাশা অবশ্যই করতে পারি।
আলী সিদ্দিকী
কবি ও কথাসাহিত্যিক
সম্পাদকঃ মনমানচিত্র
Cintoker Khsra Khata by Swaponjoy Chowdhury

কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম পাঠক ও বোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য সংগঠন প্রয়োজন। বাংলাদেশের সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও আচার-আচরণের প্রেক্ষাপটে একটি কার্যকরী সংগঠন গড়ে তোলা অনেক শ্রম ও সময়সাপেক্ষ কাজ। বিশেষ করে দেখা যায় যে গণতান্ত্রিক ভাবে পরিচালিত একটি সংগঠনে ভাঙা গড়া লেগেই থাকে যার ফলে কাজের গতি ও পরিধি সবসময়েই ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। অনুপ্রাণন সবসময় নেতিবাচক আলোচনা-সমালোচনাকে এড়িয়ে চলেছে। এর অর্থ এই নয় যে উদ্ভূত সেসব নেতিবাচক বক্তব্যের জবাব আমাদের কাছে নেই কিন্তু আমরা চেয়েছি ইতিবাচক কাজের মাধ্যমেই সেসব নেতিকে নাকচ করার মানসিকতা যেন গড়ে ওঠে। তাই, অনুপ্রাণন সবসময় ইতিবাচক কাজ করে যাওয়ার পক্ষেই শক্তির যোগান দিয়েছে। আমাদের ভালো ভাবে ভেবে দেখা দরকার যে চলমান অস্থির প্রতিযোগিতার পরিবেশে কি-করে শিল্প-সাহিত্য বিশেষ করে কবিতা সাহিত্যের প্রতি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আগ্রহী করে তোলা যায়। একটি বিষয় উল্লেখ করতেই হয় যে, মনে হয় যেন কবিতা পাঠের থেকে কবিতা লেখার আগ্রহই প্রজন্মের বেশী। এই হিসাবটা হয়তো শতভাগ ঠিক না কিন্তু অনুপ্রাণন প্রকাশনে অনেক তরুণ কবিদের দুর্বল কবিতার পা-ুলিপি নিয়ে প্রকাশনার জন্য ভিড় করা দেখে এরকমই মনে হতে পারে। এই বক্তব্যের প্রতি যদিও ভিন্নমত আছে তবুও আমরা মনে করি যে, সর্বক্ষেত্রে না হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কবি, লেখক ও শিল্পীর সৃজনশীল কাজ সত্যিকার অর্থে মূল্যায়িত হতে পারে যদি প্রাতিষ্ঠানিক অথবা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে হলেও তার গড়ে ওঠার পেছনে একটা নির্দিষ্ট ও সুনিবিষ্ট প্রস্তুতি ও চর্চার পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে। ব্যতিক্রম থাকেই কিন্তু সেই ব্যতিক্রমকে উদাহরণ হিসেবে সাধারণের পক্ষে যুক্ত করাটা হয়তো ঠিক না।
তরুণ লেখকদের এই প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করেই অনুপ্রাণন সেরকমই একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কার্যক্রম গ্রহণ করার প্রয়াস পেয়েছে যেখানে তরুণ কবি ও সাহিত্যিকেরা প্রিন্ট পত্রিকা ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন এবং অনুপ্রাণন অন্তর্জালের সাথে যুক্ত হয়ে গ্রন্থ প্রকাশনা পূর্ববর্তী কালের প্রস্ততি গ্রহণের সুযোগ নিতে পারে।
Anupranan Troimasik Year 11 Issue 4, Kabi O Kabita Songkhya- Churtho Porrbo
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা : সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা তৃতীয় পর্ব- সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিক কালের ১০০ গল্পকারকে নিয়ে চতুর্দশ বর্ষের বিশেষ আয়োজনের পারম্পরিক ধারাবাহিকতার তৃতীয় পর্বে এসে আরও ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে প্রকাশিত হলো সাম্প্রতিকের (জন্ম : ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫) গল্প ও গল্পকার সংখ্যা, তৃতীয় পর্ব। সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার ১ম ও ২য় পর্বের মতো এই পর্ব অর্থাৎ ৩য় পর্বে ২৫ জন গল্পকারের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা প্রকাশের মাধ্যমে নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে এ-পর্যন্ত মোট ৭৫ জন গল্পকারকে নিয়ে তথ্য ও আলোচনাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ প্রকাশের কাজ সম্পন্ন হলো। অবশিষ্ট ২৫ জন গল্পকারদের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা আগামী চতুর্থ পর্বে প্রকাশিত হবে বলে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব নির্মাণের মূল উপাদান হচ্ছে, সময় ও মানুষ। মানুষের চেতনাজাত রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম ও ভৌত প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রভাবিত সমাজ ও সংস্কৃতির বিচার ও বয়ান। গত চার বছর ধরে অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক শিল্প-সাহিত্য ম্যাগাজিনে গত শতাব্দীর প্রথম থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিকদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা প্রবন্ধসমূহ সংকলিত করে যে সহায়ক সাহিত্যসম্পদ প্রস্তুত করা হচ্ছে সে-সকল সহায়ক সম্পদ বা উৎস ব্যবহার করে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গবেষণা হতে পারে। সেই গবেষণার একটি হতে পারে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের সমাজতত্ত্বের বস্তুনিষ্ঠ বয়ান।
আমরা এটা অধ্যয়ন করতে পারি- বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য কীভাবে সমাজ থেকে উদ্ভূত হলো, কী কী বৈশিষ্ট্য ধারণ করল, কীভাবে সাহিত্যে সমাজের প্রতিফলন ঘটাল এবং পাশাপাশি সমাজের ওপর সাহিত্য কী প্রভাব ফেলল? সাহিত্যে, ক্ষমতা, প্রতিযোগিতা ও সামাজিক কাঠামো কীভাবে কাজ করেছিল বা করে যাচ্ছে? এসব অধ্যয়ন থেকে হয়তো আমরা পেতে পারি এই তথ্য যে বাংলা দীর্ঘদিন উপনিবেশ থেকেছে। উপনিবেশ থাকাকালে ভিনদেশি শাসকের রাজনীতি, অর্থনীতির প্রভাবে পড়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির যেমন রূপান্তর ঘটেছে তেমনি বিকৃতিও ঘটেছে। ভিনদেশি উপনিবেশবাদী শক্তির প্রভাবের ফলে বাঙালির মননে এক গভীর আত্মপরিচয় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আর যখনই এই উপনিবেশবাদী মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে ভাষা, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে বাংলার মাটি ও পরিবেশজাত নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ধারায় নিয়ে এসে মুক্তচর্চা করার চেষ্টা বাঙালি করেছে তখনই ঔপনিবেশিক ধারার পৃষ্ঠপোষক ও কট্টরপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীর দিক থেকে আঘাত ও আক্রমণ এসেছে।
এই বিষয় ছাড়াও আমাদের অধ্যয়ন অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হতে পারে। যেমন, সমসাময়িক ছোটগল্পের আলোচনায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- গল্পকারেরা তাদের গল্পে কীভাবে সীমিত স্থান ব্যবহার করে পরিচয়, বিচ্ছিন্নতা, মনস্তাত্ত্বিক বাস্তববাদ এবং সামাজিক বিষয়গুলো (জাতি, শ্রেণি, ভোগবাদ) গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন। তাছাড়াও এই বিষয়েও আলোকপাত করা যেতে পারে যে কীভাবে প্রাণবন্ত চরিত্র, প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রাঞ্জল বর্ণনায় আধুনিক জটিলতাগুলো প্রতিফলিত করার জন্য বিভিন্ন শৈলী (ব্যঙ্গ, ভৌতিক, জাদুকরী বাস্তববাদ) ব্যবহার করা হয়েছে। আলোচনা ও অধ্যয়নে উঠে আসতে পারে যে কোনো কোনো সমালোচক সাম্প্রতিক রচিত গদ্যভাষায় নীরসতা বা অতি-সরলীকরণের প্রবণতার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দ্রুত পড়ে ফেলার উপযোগী করে রচনা করার বাইরে এসে ফর্ম এবং থিমকে আরও গভীরভাবে জড়িত করার প্রত্যাশা করেছেন। কোনো কোনো আলোচক কেবল গল্পের সারাংশে সীমাবদ্ধ না থেকে তার বাইরে গিয়ে গল্পের অর্থ প্রকাশে প্লট, চরিত্র, থিম এবং সাহিত্য কৌশলের (প্রতীকীকরণ, চিত্রকল্প) মতো উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে গল্পের অর্থ প্রকাশে তাদের কার্যকারিতা যথাযথ মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন।
অধ্যয়নে তুলে ধরা যেতে পারে যে সাহিত্য আলোচনাগুলো প্রস্তুত করতে গিয়ে বিশেষ করে চারটি বিষয়ের দিকে গভীর দৃষ্টি প্রদান করার প্রয়োজন হয়েছে। প্রথমেই এসেছে পরিচয় এবং অন্তর্ভুক্তি বোধের মতো বিষয়গুলো। যেমন সাংস্কৃতিক স্থানচ্যুতি, অভিবাসী মনস্তত্ব ও অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বায়িত বিশ্বে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত অথবা জাতীয় আত্ম-অনুসন্ধান। দ্বিতীয়ত, চরিত্র রূপসমূহের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। যেমন, বাস্তব ঘটনাসমূহের সাক্ষাৎ ব্যাখ্যা অথবা স্বগত ও বহুপাক্ষিক সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রগুলোর মনের অভ্যন্তরের জটিল ও অন্ধকার জগৎ উন্মোচন করা। তৃতীয়ত, গল্পের সামাজিক ভাষ্য অর্থাৎ ভোগবাদ, রাজনীতি, জাতি এবং শ্রেণি বিভাজনের সমালোচনা করার জন্য ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ও অ্যাবসার্ডবাদ ব্যবহার করা। এবং চতুর্থত, রূপ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা অর্থাৎ অনন্য কাঠামো, বিভিন্ন অথবা বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গি (উত্তর-ঔপনিবেশিক, নারীবাদী ইত্যাদী) ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, ফ্যান্টাসি এবং জাদুকরী বাস্তবতার মতো ধারাগুলোর সাথে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে ছোটগল্পের আধুনিক বিভাজন বৈশিষ্ট্য আয়ত্তে নিয়ে আসা। কেউ কেউ এটাও মনে করেছেন যে সমসাময়িক গল্পগুলো সংকীর্ণ জনতাত্ত্বিক বা উপরে ভাসা বিষয়গুলোর উপর খুব বেশি কেন্দ্রীভূত হতে দেখা গেছে। তাছাড়া দ্রুত, সহজে হজমযোগ্য গল্পের বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে গভীর, জটিল অভিজ্ঞতা প্রদানের জন্য প্রস্তুত প্রকৃত শৈল্পিক সম্ভাবনাময় গল্পের চাহিদার ক্ষেত্রে ভাটা সৃষ্টি করে থাকতে পারে। সত্যিকার অর্থে উদ্ভাবন না করে নির্দিষ্ট ‘ধরনের’ (যেমন, অকার্যকর পরিবার, সমাজবিচ্ছিন্ন যুবক) উপর খুব বেশি নির্ভরশীল গল্পগুলো একঘেয়েমির উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শিল্প-সাহিত্য মানুষকে ধ্বংস নয় সৃজনশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। গভীর অনুভূতি, বোধ ও সংযোগের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যা ভাষাগত সীমানা ছাড়িয়ে মানুষে মানুষে, সংস্কৃতিতে সংস্কৃতিতে মেলবন্ধন ঘটায়। ব্যক্তি ও সমাজকে সৌন্দর্য, আনন্দ, দুঃখ, প্রেম, বেদনা ও জীবনের গভীরে নিয়ে যায়, যা তাকে আত্ম-অনুসন্ধান ও বিশ্বকে নতুনভাবে উপলব্ধিতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যচর্চা সকল প্রকার সংরক্ষণবাদ মুক্ত হয়ে মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন চেতনাবোধ অব্যহতভাবে ধারণ করে যাবে। সংরক্ষণবাদ মুক্ত মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন এই চেতনাবোধ থেকে বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্যচর্চা বিচ্ছিন্ন করার সকল অপচেষ্টা বাংলাদেশের কবি, গল্পকার, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকেরা মিলিতভাবে রুখে দেবে এটাই বাস্তব।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 4; Contemporary Stories & Storytellers (Part-3)
লেখকের কথা-
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির কথাসাহিত্যিক হিসেবে ড. শামসুদ্দীন আবুল কালাম একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। তিনি আমার একমাত্র মামা, বিষয়টি আমার অহংকার, গর্ব এবং উত্তরাধিকারের। জন্ম থেকেই দেখেছি তার সাহিত্যকর্ম এবং ব্যক্তিজীবনের চরম বেদনাদায়ক অধ্যায় বাংলা সাহিত্যের অনুসন্ধিৎসু পাঠকের কাছে আগ্রহের বিষয় ছিল। মামা মারা যাবার পরে আমার মায়ের ইচ্ছায় আমি পিএইচ.ডি করার চিন্তা করি।আমার মা তার ভাইয়ের অত্যন্ত আদরের ছোটবোন ছিলেন। মামার সাহিত্যকর্ম এদেশের মানুষের কাছে উল্লেখযোগ্যভাবে আলোচিত না হলে মা খুব কষ্ট পেতেন এবং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন। এ দেশের বড় বড় পত্রিকার সাহিত্যপাতায় প্রকাশিত বাংলা সাহিত্যের বড় বড় সমালোচক এবং গবেষকদের সমালোচনামূলক নিবন্ধ এবং গবেষণাগ্রন্থ তিনি পড়ে দেখতেন। কেউ কেউ মামার নাম উল্লেখ না করলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঘরে, চায়ের আসরে অথবা নিজ বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে এটা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন। আমি মায়ের সেই কষ্টটা বুঝতাম। একদিন তিনি আমাকে মামার কথাসাহিত্যের বিষয়ে গবেষণা করতে বললেন, যা আমার কাছে মা আদেশ করেছেন বলে মনে হয়েছে।
শামসুদদীন আবুল কালামের বিষয়ে সে সময় গবেষণা করা ছিল অসম্ভব প্রায়। কারণ লাইব্রেরীতে তার লেখা বই, বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত লেখা সংগ্রহ করা বেশ দুরূহ বিষয় ছিল। কেউ তার বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য দিতে পারতেন না যেহেতু তিনি (শামসুদদীন আবুল কালাম) প্রায় ৪০ বছর ধরে ইটালীর রোমে প্রবাসজীবন যাপন করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি এবং গবেষণা করার শর্তসমূহ আমার কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে তুলনামূলকভাবে সহজ মনে হওয়াতে সেখানেই ভর্তি হয়ে কাজ শুরু করি। ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশনের ৫০০০ টাকা হিসেবে মাসিক বৃত্তি বা অনুদান এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পর্যায়ক্রমে তিন বছরের ছুটির অনুমোদন লাভ করি । প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাঙলা কলেজের বাংলা বিভাগ থেকে ২০০৬ এর মাঝামাঝি সময়ে বিমুক্ত হয়ে তখন থেকে কাজ শুরু করি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার মা ২০০৮ এর জানুয়ারি মাসের ২৫ তারিখে হঠাৎ মারা যান। এতে আমার সমস্ত উৎসাহ উদ্দীপনা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এর মধ্যে ২০০৮ এ আমি প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে ইডেন কলেজে পদায়ণ লাভ করি, জয়েন করে ইউনিভার্সিটি ফেলোশিপের বৃত্তিসহ ছুটি ত্যাগ করে সেপ্টেম্বর মাসে জয়েন করে কর্মরত অবস্থায় পিএই্চ.ডির কাজটি সুসম্পন্ন করার চেষ্টায় নিয়োজিত থাকি। ইতোমধ্যে ২৮ আগস্ট মাস ২০১১সালে আমার ছোট ভাই যাত্রাবাড়ী থেকে হারিয়ে যায়, যাকে আজও ফিরে পাইনি। ২০১৩র জানুয়ারি মাসের ১৫তারিখে ঢাকার উত্তরায় আমার সর্বকনিষ্ঠ ভাই আততায়ীদের উপর্যুপরি ছুরির আঘাতে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়। এই সমস্ত দেখেশুনে আমার আর একটি ভাই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পারিবারিক এই বিষয়গুলি পিএইচ.ডির এই অভিসন্দর্ভ প্রকাশে আমাকে নিঃস্পৃহ করে তোলে। ১২ বছর পরে পারিবারিক রাহুগ্রস্ত অবস্থার সমাপ্তি হলে এবার আমার কর্মজীবনের সমাপ্তিকালে এই অভিসন্দর্ভটিকে আলোর মুখে আনার ইচ্ছে প্রকাশ করলে অনুপ্রাণনের কর্ণধার আবু মোহাম্মদ ইউসুফ ভাই সানন্দে গ্রন্থটি প্রকাশের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
শামসুদদীন আবুল কালামের কন্যা ক্যামেলিয়ার কাছে অসংখ্য অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি আছে যা এখনও প্রকাশিত হয়নি। শামসুদদীন আবুল কালামের একমাত্র জামাতা জনাব এ বি মঞ্জুর রহিম ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র সচিব এবং তৎকালীন সময়ের একজন রাষ্ট্রদূত। ২০০৫ এ তিনি জার্মানির রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এখন তিনি কানাডার ক্যালগারিতে অবস্থান করছেন।
শামসুদদীনের কথাসাহিত্য: জীবনবোধ ও শিল্পরূপ শিরোনামের অভিসন্দর্ভের জন্য ২০১১ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে ডক্টর অব ফিলজফি উপাধি প্রদান করে আমাকে সম্মানিত করেছে। আমার গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের আমার শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক ড. সৌদা আখতার। পরীক্ষা পরিষদের সভাপতি এবং পরীক্ষক ছিলেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. সৈয়দ আকরাম হোসেন। এ ছাড়াও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শিপ্রা দস্তিদার ছিলেন আমার পরীক্ষক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দানীয়ুল হক স্যারের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, তিনি এ বিভাগে ভর্তি থেকে শুরু করে সব সময় গবেষণার অগ্রগতি বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে কাজটি সুসম্পন্ন করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের সকল কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের সার্বিক সহযোগিতা বিশেষভাবে স্মরণ করার মত।
গবেষণার সময়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, ( বিশেষ অনুমতিক্রমে)। বাংলা একাডেমী, গুলশানের ইন্ডিয়ান লাইব্রেরী, ব্রিটিশ কাউন্সিল, আজিমপুর লাইব্রেরী এবং ইডেন কলেজের সমৃদ্ধ লাইব্রেরী ব্যবহার করেছি। অভিসন্দর্ভের সার্বিক মুদ্রণের দায়িত্ব পালন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম।
আমার স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম মজনুর সহযোগিতা, সহনশীলতা এ কাজটি শেষ করতে বিশেষভাবে সহায়তা করেছে। আমার দুইজন সন্তান তাদের শিক্ষা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমার মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সেজন্য আমি আসলেই অনুতাপ করছি।
ব্যক্তিগত জীবনের নানা সমস্যা এবং সীমাবদ্ধতার পরেও ড. শামসুদ্দীন আবুল কালামের কথাসাহিত্যের উপর এই গবেষণাকর্মকে আমার শ্রদ্ধেয় পরমগুরু অধ্যাপক ড. সৈয়দ আকরাম হোসেন স্যার মৌলিক এবং আঁকর গ্রন্থ হিসেবে মূল্যায়ণ করেছেন।এটা আমার পরিশ্রমের একটা পরিপূর্ণ স্বীকৃতি এবং সম্মান বলে আমি মনে করি।
বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্পের ইতিহাসে শামসুদ্দীন আবুল কালামের গল্প একটি অসাধারণ উচ্চতায় অবস্থান করে আছে, বিশেষ করে তার পথ জানা নাই গল্পটি যুগে যুগে এই দেশের সমাজবাস্তবতা এবং রাজনৈতিক চেতনার একটি উজ্জ্বল স্বাক্ষর যা বাংলা সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের জানা প্রয়োজন । এই অভিসন্দর্ভ অনুসন্ধিৎসু শিক্ষার্থীদের সহায়তা করবে বলে আমি মনে করি।
শামসুদ্দীন আবুল কালামের কথাসাহিত্য : জীবনবোধ ও শিল্পরূপ - Shamsuddin Abul Kalamer Kothasahityo : Jibonbodh O Shilporup
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা – সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা- তৃতীয় পর্ব – সম্পাদকীয়-
সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হওয়ার পর সাম্প্রতিকের আরো ২৫ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কবিতা ও কবিতা নিয়ে সামষ্টিক আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হলো শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা তৃতীয় পর্ব। তৃতীয় পর্বের এই ২৫ জন কবির নাম ইতোপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের ন্যায় অনুপ্রাণনের ১০০ নির্বাচিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের কবি তালিকা থেকে নেয়া হয়েছে যাদের জন্মসাল ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রয়েছে। তালিকার অবশিষ্ট ২৫ জন নির্বাচিত কবি নিয়ে লেখা প্রকাশিত হবে আগামীতে প্রকাশিতব্য শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা অর্থাৎ সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা চতুর্থ পর্বে।
সাম্প্রতিককালের কবিদের কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যসমুহ নিয়ে গত সংখ্যার সম্পাদকীয়তে কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে। সেই আলোচনার সাথে আরো কিছু কথা এখানে যুক্ত করা যেতে পারে বলে মনে করি। যেমন কবিতার বিষয়বস্তুর উত্তরাধিকার হিসেবে সাম্প্রতিকের প্রত্যেক কবি কোন না কোন সময়, কোন না কোন কবিতায় রূপসী বাঙলার প্রাকৃতিক সুন্দরতায় ডুব দিয়ে সুন্দর ও সত্যের খোঁজ করে দুই একটা মুক্তা তুলে আনার প্রয়াস করেছেন। বাঙলার প্রকৃতির নিটোল সৌন্দর্যের কাছে থেকে কবিতাকে জীবন দিয়ে যাপন প্রচেষ্টার কারণে সাম্প্রতিকের কবিতায় বাঙলার স্বাদ আস্বাদন থেকে আমরা বঞ্চিত হই না। মা-মাটি, ষড়ঋতু, সৃষ্টির উল্লাস, আদিমতার সাথে কোন কোন সময় পৌরাণিক মিথের সংমিশ্রণ কবিতায় প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। উপমার জানালাতে উড়ে চলা বলাকার গতিতে অঙ্কিত হতে দেখি বঙ্গ জনপথ, ব-দ্বীপ ভূমি, বৃষ্টি বিধৌত বৃক্ষরাজি, বনভূমি, সোনালু অথবা অসীম অশ্বত্থ।
মানুষের বোধের নিগুড়ে বাস করে শৈশব। সাম্প্রতিকের কবিদের শৈশব ও নস্টালজিয়ার অনুষঙ্গ অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চকিত ও উত্তুঙ্গবাদী। উপমা, রূপক, ব্যঞ্জনা ও ভিন্নতার রহস্য-মাখা জাদু-বাস্তবতা অথবা অধিবাস্তবের রঙে রঞ্জিত হয় নস্টালজিয়া। যৌবনের প্রবলে দৃশ্যমান যতনা আদিরসের নিঃসরণ তারচেয়ে বেশি মাত্রায় পরিলক্ষিত সংরক্ষণ ও সংস্কারবাদী মননের উপমাশ্রিত কারুকার্যের কৃত্রিম স্রোত। কবিতায় মরমিবাদ, বাউলতত্ত্ব ও লোকজধারা দৃশ্যমান হলেও সেটির সাধনা-অভিজ্ঞানের ধারাক্রমে চর্চা খুব একটা পরিদৃষ্ট বা পরিপুষ্ট নয় বলেই কবিতায় মনে হয়। সাম্প্রতিককালে দ্রুত গতিতে নগরায়ণের পরিবেশে নাগরিকবোধের শৃঙ্খলা ও পাশাপাশি জৈবিক স্খলন ও সংকটের আবর্তে জীবনের রহস্যময়তার মূর্ত ও বিমূর্ত ভাবকল্প কবিদের কবিতায় লক্ষণীয় মাত্রায় যুক্ত হতে দেখা যায়। জাদু-বাস্তবতা, অধিবাস্তববাদ, উত্তরাধুনিকতা, কাঠামোবাদ, বিনির্মাণবাদ ও ডিসকোর্সের অনুষঙ্গ-তাড়িত প্রকরণশৈলী বাংলাদেশের কবিতায় ব্যাপক দেখা না গেলেও কারো কারো ব্যবহার প্রবণতার মাঝে গুটিকয়েক সফল হয়েছে বলেই প্রতীয়মান। সাম্প্রতিকের কবিতায় গদ্য-ছন্দের ব্যবহারে এখন অনেকেই সাবলীল। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধীতা, গণতন্ত্র ও স্বদেশপ্রেম ইত্যাদি সাম্প্রতিকের কবিতায় খুবই সীমিতভাবে প্রতিভাত হতে দেখা গেছে। তার অর্থ এই নয় যে সাম্প্রতিকের কবিতায় সমাজ অথবা রাজনীতি সচেতনতা নেই। আছে, আর কোন কোন ক্ষেত্রে সেটা এসেছে ডায়াস্টোপিয়ার রূপ ও বর্ণ পরিগ্রহ করে। যার মধ্যে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা ও প্রতিজ্ঞা না থেকে হতাশা, বিষণ্নতা ও পরাজয়বাদিতার প্রবণতাই যেন বেশী। সাম্প্রতিকের কারো কারো কবিতার বইয়ের নাম প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, যদিও এটি একটি উপলক্ষ, প্রধান অনুষঙ্গ নয়, তবুও নামের ব্যঞ্জনা ও অর্থের গূঢ়ার্থ এবং রহস্যময়তা কবির স্বকীয় পরিচয় সৃষ্টিতে কিঞ্চিত ভূমিকা রাখতে দেখা যায়।
সাম্প্রতিক কবিদের ব্যক্তিক বিকাশ ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন অনুষঙ্গ ও প্রবণতা পরিলক্ষিত হতে দেখা যায়। কারো কবিতা গদ্যে যেমন বিকশিত পদ্যের বিনুনিতেও তেমন অনুধ্যানযোগ্য। কারো কারো কবিতা অতীতবোধ, রাজনীতি, সংকট ও প্রধানত লোকজ ঐতিহ্য সমৃদ্ধ আবার একইভাবে কখনো কখনো নগরজীবনের বাস্তবতাকেই বিকশিত করতে বেশি মাত্রায় পারঙ্গম। কারো কবিতায় যেমন বাহুল্য আছে প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার কম্বুরেখা, তেমনই আছে রসবোধ ও লোকজ-বাস্তবতায় জীবনকে কাব্যময় করার সদিচ্ছা। ঐতিহ্য আর সরলতা উপজীব্য করে নাগরিক-জটিলতাসিক্ত জীবনকে কবিতায় তুলে আনার মতো কঠিন কাজও কেউ কেউ করেছেন। কারো কবিতা মূলত গদ্যধর্মী হলেও মুক্তক অক্ষরবৃত্তের ছোঁয়াচ কবিতার পদ্য-স্বকীয়তাকে নান্দনিক করতে সাহায্য করেছে। সাম্প্রতিকের প্রায় সকল কবির কবিতায় রয়েছে মানবিকতাবোধ, বৈশ্বিকবোধ, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মিথের শক্তির উপলব্ধি অথবা অন্তর্লীন শূন্যতা বোধের কাব্যকলা। একদিকে যেমন ছন্দোবোধ অন্যদিকে ভাঙনের গদ্য-কল্পে বিম্বিত কাব্যময়তা। লোক-ঐতিহ্যতাড়িত সরল পদ্যের কথক হয়ে জীবনকে গ্রামীণ-চেতনাবোধ, লোকযান ও পুঁথিকারদের ঢঙে কাব্যময় করার একটা প্রয়াস কারো কারো কবিতায় লক্ষণীয়। শেকড়বোধকে বর্ণনে, কথনে, সারল্যে, গদ্যভাব ও ভাষায় বিম্বিত করে পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার প্রচেষ্টায় বিষয়ের অভিনবত্ব ও জটিলতার চাইতেও সারল্য, বিমূর্ত-অভিকল্পই বেশি বেশি প্রকটিত অনেকের কাব্যে। কারো কবিতায় গতি ও প্রগতির সম্মিলন রয়েছে, দেখার বোধ ও বিশ্বাসকে প্রশ্নসত্যে চিত্র আর সংকটের প্রেক্ষিতে উপলব্ধিজাত করে তোলা হয়েছে। কবিতার রহস্যময়তার অন্তরালে মানুষের বিবেকে প্রশ্ন সৃষ্টি ও ব্যঞ্জনাভাবের বিকাশের সপক্ষেই কাব্যধারার প্রবর্তক হিসেবে কেউ আবির্ভূত।
বাংলা কবিতার স্বভাবের অনেকটাই দৃশ্যধর্মী। ‘বিষয়’ ‘বর্ণনা’, ‘বন্দনা’ ও ‘বিবরণ’-এর বৃত্তে বন্দী। একুশ শতকের দোরগোড়ায় এসে কারো কারো পক্ষ থেকে বিষয়’কে জলাঞ্জলি দেবার প্রয়াস শুরু হয়। অর্থাৎ কবিতা কিছু বলবে না, কোনো ভারী কথা নয়, কোনো বক্তব্য নয়, দর্শন নয়। সমাজ-রাজনীতির ক্ষেত্র হোক; কবিতা ধ্বনি, শব্দ, ভাষা, অক্ষরের নেশায় নিজের আয়নায় যেন নার্সিসাস। কেবল ছবি, ছবির সারি। পরীক্ষা নিরীক্ষাকে নিরুৎসাহিত করার কিছু নাই। একবিংশ শতাব্দীর দুই যুগ আমরা অতিক্রম করে এসেছি। কিন্তু এখনো বাংলাদেশ পলিমাটির দেশ। যেটুকু কঠিন প্রস্তর আছে তা-ও চলমান ঝর্ণার জল পেয়ে পেয়ে সিক্ত হয়েই থাকে। সার্বিক বিচারে সমকালীন কবিতা হৃদয়গ্রাহী কিন্তু যতটা না হৃদয়গ্রাহী, ভাব-ভাষা-চিন্তা-চিত্রকল্প ও অনুভবের পরম্পরার সুনিয়ন্ত্রিত বিন্যাসে তার থেকেও বেশী বৈদগ্ধ্যপূর্ণ।
Quarterly Anupranan 13th Year 3rd Issue, Samprotiker Kabi O Kobita- 3rd Part
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.















There are no reviews yet.