Additional information
| Weight | 0.378 kg |
|---|---|
| Published Year |
$ 2.35
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা – সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা- তৃতীয় পর্ব – সম্পাদকীয়-
সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হওয়ার পর সাম্প্রতিকের আরো ২৫ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কবিতা ও কবিতা নিয়ে সামষ্টিক আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হলো শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা তৃতীয় পর্ব। তৃতীয় পর্বের এই ২৫ জন কবির নাম ইতোপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের ন্যায় অনুপ্রাণনের ১০০ নির্বাচিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের কবি তালিকা থেকে নেয়া হয়েছে যাদের জন্মসাল ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রয়েছে। তালিকার অবশিষ্ট ২৫ জন নির্বাচিত কবি নিয়ে লেখা প্রকাশিত হবে আগামীতে প্রকাশিতব্য শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা অর্থাৎ সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা চতুর্থ পর্বে।
সাম্প্রতিককালের কবিদের কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যসমুহ নিয়ে গত সংখ্যার সম্পাদকীয়তে কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে। সেই আলোচনার সাথে আরো কিছু কথা এখানে যুক্ত করা যেতে পারে বলে মনে করি। যেমন কবিতার বিষয়বস্তুর উত্তরাধিকার হিসেবে সাম্প্রতিকের প্রত্যেক কবি কোন না কোন সময়, কোন না কোন কবিতায় রূপসী বাঙলার প্রাকৃতিক সুন্দরতায় ডুব দিয়ে সুন্দর ও সত্যের খোঁজ করে দুই একটা মুক্তা তুলে আনার প্রয়াস করেছেন। বাঙলার প্রকৃতির নিটোল সৌন্দর্যের কাছে থেকে কবিতাকে জীবন দিয়ে যাপন প্রচেষ্টার কারণে সাম্প্রতিকের কবিতায় বাঙলার স্বাদ আস্বাদন থেকে আমরা বঞ্চিত হই না। মা-মাটি, ষড়ঋতু, সৃষ্টির উল্লাস, আদিমতার সাথে কোন কোন সময় পৌরাণিক মিথের সংমিশ্রণ কবিতায় প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। উপমার জানালাতে উড়ে চলা বলাকার গতিতে অঙ্কিত হতে দেখি বঙ্গ জনপথ, ব-দ্বীপ ভূমি, বৃষ্টি বিধৌত বৃক্ষরাজি, বনভূমি, সোনালু অথবা অসীম অশ্বত্থ।
মানুষের বোধের নিগুড়ে বাস করে শৈশব। সাম্প্রতিকের কবিদের শৈশব ও নস্টালজিয়ার অনুষঙ্গ অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চকিত ও উত্তুঙ্গবাদী। উপমা, রূপক, ব্যঞ্জনা ও ভিন্নতার রহস্য-মাখা জাদু-বাস্তবতা অথবা অধিবাস্তবের রঙে রঞ্জিত হয় নস্টালজিয়া। যৌবনের প্রবলে দৃশ্যমান যতনা আদিরসের নিঃসরণ তারচেয়ে বেশি মাত্রায় পরিলক্ষিত সংরক্ষণ ও সংস্কারবাদী মননের উপমাশ্রিত কারুকার্যের কৃত্রিম স্রোত। কবিতায় মরমিবাদ, বাউলতত্ত্ব ও লোকজধারা দৃশ্যমান হলেও সেটির সাধনা-অভিজ্ঞানের ধারাক্রমে চর্চা খুব একটা পরিদৃষ্ট বা পরিপুষ্ট নয় বলেই কবিতায় মনে হয়। সাম্প্রতিককালে দ্রুত গতিতে নগরায়ণের পরিবেশে নাগরিকবোধের শৃঙ্খলা ও পাশাপাশি জৈবিক স্খলন ও সংকটের আবর্তে জীবনের রহস্যময়তার মূর্ত ও বিমূর্ত ভাবকল্প কবিদের কবিতায় লক্ষণীয় মাত্রায় যুক্ত হতে দেখা যায়। জাদু-বাস্তবতা, অধিবাস্তববাদ, উত্তরাধুনিকতা, কাঠামোবাদ, বিনির্মাণবাদ ও ডিসকোর্সের অনুষঙ্গ-তাড়িত প্রকরণশৈলী বাংলাদেশের কবিতায় ব্যাপক দেখা না গেলেও কারো কারো ব্যবহার প্রবণতার মাঝে গুটিকয়েক সফল হয়েছে বলেই প্রতীয়মান। সাম্প্রতিকের কবিতায় গদ্য-ছন্দের ব্যবহারে এখন অনেকেই সাবলীল। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধীতা, গণতন্ত্র ও স্বদেশপ্রেম ইত্যাদি সাম্প্রতিকের কবিতায় খুবই সীমিতভাবে প্রতিভাত হতে দেখা গেছে। তার অর্থ এই নয় যে সাম্প্রতিকের কবিতায় সমাজ অথবা রাজনীতি সচেতনতা নেই। আছে, আর কোন কোন ক্ষেত্রে সেটা এসেছে ডায়াস্টোপিয়ার রূপ ও বর্ণ পরিগ্রহ করে। যার মধ্যে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা ও প্রতিজ্ঞা না থেকে হতাশা, বিষণ্নতা ও পরাজয়বাদিতার প্রবণতাই যেন বেশী। সাম্প্রতিকের কারো কারো কবিতার বইয়ের নাম প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, যদিও এটি একটি উপলক্ষ, প্রধান অনুষঙ্গ নয়, তবুও নামের ব্যঞ্জনা ও অর্থের গূঢ়ার্থ এবং রহস্যময়তা কবির স্বকীয় পরিচয় সৃষ্টিতে কিঞ্চিত ভূমিকা রাখতে দেখা যায়।
সাম্প্রতিক কবিদের ব্যক্তিক বিকাশ ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন অনুষঙ্গ ও প্রবণতা পরিলক্ষিত হতে দেখা যায়। কারো কবিতা গদ্যে যেমন বিকশিত পদ্যের বিনুনিতেও তেমন অনুধ্যানযোগ্য। কারো কারো কবিতা অতীতবোধ, রাজনীতি, সংকট ও প্রধানত লোকজ ঐতিহ্য সমৃদ্ধ আবার একইভাবে কখনো কখনো নগরজীবনের বাস্তবতাকেই বিকশিত করতে বেশি মাত্রায় পারঙ্গম। কারো কবিতায় যেমন বাহুল্য আছে প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার কম্বুরেখা, তেমনই আছে রসবোধ ও লোকজ-বাস্তবতায় জীবনকে কাব্যময় করার সদিচ্ছা। ঐতিহ্য আর সরলতা উপজীব্য করে নাগরিক-জটিলতাসিক্ত জীবনকে কবিতায় তুলে আনার মতো কঠিন কাজও কেউ কেউ করেছেন। কারো কবিতা মূলত গদ্যধর্মী হলেও মুক্তক অক্ষরবৃত্তের ছোঁয়াচ কবিতার পদ্য-স্বকীয়তাকে নান্দনিক করতে সাহায্য করেছে। সাম্প্রতিকের প্রায় সকল কবির কবিতায় রয়েছে মানবিকতাবোধ, বৈশ্বিকবোধ, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মিথের শক্তির উপলব্ধি অথবা অন্তর্লীন শূন্যতা বোধের কাব্যকলা। একদিকে যেমন ছন্দোবোধ অন্যদিকে ভাঙনের গদ্য-কল্পে বিম্বিত কাব্যময়তা। লোক-ঐতিহ্যতাড়িত সরল পদ্যের কথক হয়ে জীবনকে গ্রামীণ-চেতনাবোধ, লোকযান ও পুঁথিকারদের ঢঙে কাব্যময় করার একটা প্রয়াস কারো কারো কবিতায় লক্ষণীয়। শেকড়বোধকে বর্ণনে, কথনে, সারল্যে, গদ্যভাব ও ভাষায় বিম্বিত করে পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার প্রচেষ্টায় বিষয়ের অভিনবত্ব ও জটিলতার চাইতেও সারল্য, বিমূর্ত-অভিকল্পই বেশি বেশি প্রকটিত অনেকের কাব্যে। কারো কবিতায় গতি ও প্রগতির সম্মিলন রয়েছে, দেখার বোধ ও বিশ্বাসকে প্রশ্নসত্যে চিত্র আর সংকটের প্রেক্ষিতে উপলব্ধিজাত করে তোলা হয়েছে। কবিতার রহস্যময়তার অন্তরালে মানুষের বিবেকে প্রশ্ন সৃষ্টি ও ব্যঞ্জনাভাবের বিকাশের সপক্ষেই কাব্যধারার প্রবর্তক হিসেবে কেউ আবির্ভূত।
বাংলা কবিতার স্বভাবের অনেকটাই দৃশ্যধর্মী। ‘বিষয়’ ‘বর্ণনা’, ‘বন্দনা’ ও ‘বিবরণ’-এর বৃত্তে বন্দী। একুশ শতকের দোরগোড়ায় এসে কারো কারো পক্ষ থেকে বিষয়’কে জলাঞ্জলি দেবার প্রয়াস শুরু হয়। অর্থাৎ কবিতা কিছু বলবে না, কোনো ভারী কথা নয়, কোনো বক্তব্য নয়, দর্শন নয়। সমাজ-রাজনীতির ক্ষেত্র হোক; কবিতা ধ্বনি, শব্দ, ভাষা, অক্ষরের নেশায় নিজের আয়নায় যেন নার্সিসাস। কেবল ছবি, ছবির সারি। পরীক্ষা নিরীক্ষাকে নিরুৎসাহিত করার কিছু নাই। একবিংশ শতাব্দীর দুই যুগ আমরা অতিক্রম করে এসেছি। কিন্তু এখনো বাংলাদেশ পলিমাটির দেশ। যেটুকু কঠিন প্রস্তর আছে তা-ও চলমান ঝর্ণার জল পেয়ে পেয়ে সিক্ত হয়েই থাকে। সার্বিক বিচারে সমকালীন কবিতা হৃদয়গ্রাহী কিন্তু যতটা না হৃদয়গ্রাহী, ভাব-ভাষা-চিন্তা-চিত্রকল্প ও অনুভবের পরম্পরার সুনিয়ন্ত্রিত বিন্যাসে তার থেকেও বেশী বৈদগ্ধ্যপূর্ণ।
| Weight | 0.378 kg |
|---|---|
| Published Year |
অষ্টম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা
তৃতীয় বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
সম্পাদকীয়
শিল্প-চেতনার ঐক্য
দেশে-বিদেশে সাধারণভাবে এটাই ধরে নেয়া হয় যে কবি-সাহিত্যিক ও শিল্পীরা সাধারণ মানুষদের তুলনায় সমাজ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন, সক্রিয় এবং অগ্রসর ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি গোষ্ঠী। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এই গোষ্ঠীর সকলেই সমমনা এবং তারা একক কোন সংগঠনে মিলিত অবস্থায় রয়েছেন। এর কারণসমুহ সময়ের সাথে সম্পর্কিত সমাজের আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতির বাস্তব ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যেতে পারে।
ভাষা, শব্দ, কণ্ঠ, বাদ্যযন্ত্র, রঙ, তুলি অথবা যে কোন উপকরণ ব্যবহার করে সুর ও সুন্দরের চর্চা, অভিব্যক্তি ও নির্মান যা মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে, হৃদয়ে আবেগ-অনুভূতি আন্দোলিত করে, মন মুগ্ধ করে অথবা মেধা ও মননে গভীর ছাপ ফেলে যায়- কবি-সাহিত্যিক ও শিল্পীরা সেই কাজেই নিজের প্রতিভা বিকাশের সাধনায় নিয়োজিত থেকে সমাজে সুর ও সুন্দরের সৃষ্টি করে যেতে থাকেন। সুতরাং তাঁদের স্বাভাবিক অবস্থান কুৎসিত, অন্যায়, অন্যায্য ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে এবং এটাই একান্তভাবে প্রত্যাশিত। সেখানে বিভেদের কী কোন অবকাশ থাকে? সত্য ও সুন্দরের আরাধনা করতে চাইলে একজন শিল্পীকে বুদ্ধিবৃত্তির পরিচর্যায় নিমগ্ন হতে হবে এবং অনস্বীকার্যভাবে কুসংস্কার, ভীরুতা, জরাজীর্ণতা ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। কিন্তু, বাস্তবে আমরা কী দেখতে পাই? শুদ্ধ শিল্পসিদ্ধি এবং বাস্তবজীবন বীক্ষণ বোধ ব্যক্তি ও ক্ষেত্র বিশেষে যেন সম্পর্কবিহীন দুটো সেতুবিহীন রাজ্যের মতো বিভক্ত রয়ে যায়। কিন্তু, এটা কেন?
আমাদের নন্দনবোধের সাগরে প্রকৃতি যেমন একটা বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে, ঠিক তেমনই জীবন যাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশ চেতনা কী বাস্তব পর্যবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়? এই দুটি বিষয়কে কল্পনা বা বাস্তবে কী কোন প্রভাবেই বিচ্ছিন্ন করা যায়? অসীমের অন্বেষণ ও স্বপ্নচারিতা একজন শিল্পীর থাকতে পারে। সৌন্দর্যের সন্ধানে অসীম ও অনন্তের দিকে যাত্রা করাও দোষের নয়। পরম সত্যের সৃষ্টির রহস্যকে ঘিরে অনুসন্ধান অনুসন্ধিৎসা আলো-অন্ধকারের উজ্জীবনে না হয় ক্লান্তিতে হয়ত হাবুডুবু খাবে। কখনো কখনো অন্ধকারের স্তব্ধতা নৈঃশব্দের দ্যোতকরূপে চেতনায় সংগুপ্ত থাকবে কিন্তু চিন্তায় সংকীর্ণতা, স্বার্থবাদী ও ক্ষমতাশালী উপনিবাশবাদী শক্তি পরিচালিত ভেদ ভাবনা অথবা মৌলবাদ কখনো মানবমুক্তির স্বপ্নের উজ্জ্বল আলোকে স্পর্শ করতে সাহায্য করতে পারবে না।
কালোত্তীর্ণ শিল্প কী জীবন বিচ্ছিন্ন ছিল? মানুষের দেহ ও তার অবয়বকে, তার যাপিত জীবনের সংগ্রাম অথবা উৎসবের বাইরে মানুষকে ছুঁড়ে দিয়ে মৌলবাদী কোন বিশ্বাসে শৃঙ্খলিত করার কোন অপচেষ্টায় সেসব শিল্প কর্ম কী লিপ্ত ছিল? এমন কোন অভিযোগ অথবা এমন কোন বিশেষণে সেসব শিল্প কর্মকে কী বিশেষায়িত করা সম্ভব? মানবসভ্যতার ইতিহাসে কালোত্তীর্ণ শিল্পের আধারে আত্মার মুক্তি কখনোই অধিক যথার্থ প্রশ্ন ছিল না- যতনা ছিল প্রেম, মানবতা ও মানব মুক্তির বিষয়াবলী। আর এ-কারণেই বুঝে নেয়া দরকার যে ক্ষমতার বর্বরতা ও নৃশংসতার সঙ্গী-সমর্থক হয়ে কখনোই প্রেম, মানবতা ও সুন্দরের পূজা সার্থক সিদ্ধি লাভ করতে পারে না। কেননা যখন ঘৃণা অথবা প্রেম থেকে শিল্পকে যে কোন একটাকে বেঁছে নেয়ার প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় তখন মানবতাই শিল্পের ধর্ম হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। কেননা- প্রেমই সুন্দর এবং প্রেমই মানবতার বৈশিষ্ট।
যদিও প্রতিটি মানুষের মধ্যেই সংবেদনশীলতা বিরাজমান কিন্তু এর মাত্রা ও স্বাতন্ত্র্য সবার অস্তিত্বে সমভাবে লালিত হয় না। যারা একটু অধিক মাত্রায় সংবেদনশীল তাদের ইন্দ্রিয় সদা জাগ্রত থাকে, তাঁরা প্রকৃতি থেকে সৃষ্টির চিরন্তনতার নির্যাস পায়, অসীমের অস্তিত্ব এবং সৃষ্টিতত্ত্বের মহিমা হৃদয়াঙ্গম করতে পারে। শিল্পী সমাজের সদস্যগণ জীবন প্রবাহের সব উপকরণের মধ্যে সত্য, সুন্দর, সততা ও সরলতাকে অবিচ্ছেদ্যতার সাথে তাঁর অস্তিত্ব দিয়ে আকাঙ্খা করেন। মানুষ ও মানবজাতির কল্যাণ চিন্তায় হন সবচেয়ে অগ্রগামী এবং এ-কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বৈষয়িক জীবনে বঞ্চিত রয়ে যান। বৈষয়িকভাবে তাঁর বঞ্চিত হওয়া অবাঞ্ছিত নয়, কারণ লেখক ভোগবাদের উপাসক নন, তিনি উপাসক প্রেম ও সত্যের- যে প্রেম, যে সহমর্মিতা, যে ভালোবাসা, মানবজাতির চিন্তা-চেতনা ও জীবন যাপনের সেই সত্য ও সুন্দরতা- যে সত্য থেকে, যে সৌন্দর্য থেকে জীবন সত্য- সদা প্রসারিত ও স্পন্দিত।
জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি যাই থাকুক না কেন, ন্যূনতম ক্ষুধা ও তৃষ্ণার দাবি মিটিয়ে শিল্পী তাঁর মনে কল্পনার একটি সুন্দর জগৎ সৃষ্টি করেন, যে জগতে অপ্রাপ্তির ইতিহাসও প্রমূর্ত হয়ে ওঠে। কল্পনাকে সত্য বলে উপলব্ধি করে লেখক বিশ্বের স্বর্ণযুগ কল্পনা করেন। যদিও স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যে অন্তহীন শূন্যতা থাকে তবুও শিল্পী যেমন নিজে স্বপ্ন দেখেন তেমনই অন্যকেও স্বপ্ন দেখাতে ভালোবাসেন। এসব সুন্দর স্বপ্ন দেখতে দেখতে একসময় অন্যদের মনোজগৎও স্বাপ্নিক ও সুন্দর হয়ে ওঠে। অনেকের ধারণা- শিল্পী শুধু কল্পনারাজ্যে বিরাজ করেন কিন্তু হৃদয়রাজ্যেও যে তাঁর অপ্রতিহত অবস্থান সে বিষয়টি ভেবে দেখেন না। একজন শিল্পী যুক্তিকে স্বীকার করেন, গ্রহণ করেন, ব্যবহার করেন হৃদয় দিয়ে এবং সেভাবেই সৌন্দর্য ও সত্যের অভিন্নতাকে প্রত্যক্ষ করেন। শিল্পী তাঁর চারপাশের সমাজ সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণ করে অভিজ্ঞতা সঞ্জাত অন্তরের নির্যাসটুকু শিল্পিতরূপে ছেনী-হাতুরী, রং-তুলি অথবা কলমের ডগা থেকে শূন্যতার সময়পটে চিহ্নিত করেন। নৃশংসতা, বর্বরতা, দমন-নিপীড়নের সাথে যেমন সত্য ও সুন্দরের ঐক্য হতে পারে না তেমনই একজন শিল্পী সমকালীন সমাজের শক্তির বিভাজনে অবশ্যই নির্যাতিতের পক্ষেই তার অবিচ্ছেদ্য অবস্থান নিশ্চিত করেন। এটাই শিল্পী সমাজের ঐক্যের মূল সূত্র। অনুপ্রাণন, শিল্প-চেতনার ঐক্যের এই মূল সূত্রের দিকেই সবাইকে ধাবিত করার প্রচেষ্টা করে যেতে চায়।
সপ্তম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ১০ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা
সম্পাদকীয়, নবম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা-
কবি ও কবিতার অনুপ্রাণন—
সূচনা লগ্ন থেকেই শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন, সাহিত্যের এই বিশেষ শাখা অর্থাৎ কবিতা বিভাগটির উপর বিশেষ যত্ন দিয়ে এসেছে। কেননা সাহিত্য রচনায় কবিতাই একমাত্র শাখা যেখানে কবির অন্তরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা অনুভূতিটি উপচে বের হয় কবিতায়। যেখানে কোনো প্লট-পরিকল্পনা বা পূর্বপ্রস্তুতির চিহ্ন খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। হতে পারে কবির সেই কথাগুলো নির্গত হয়েছিল কোনো অস্থির অথবা কোনো বেদনার অথবা কোন শান্ত-সমাহিত ধ্যানের মুহূর্তে। হৃদয় মথিত কোনো নান্দনিক অথবা কোনো মানবতবাদী ভাব সৃষ্টি ও রচনার গভীর অনুপ্রেরণায়। কিন্তু স্বতস্ফুর্তভাবে নির্গত শক্তিশালী কোনো অনুভূতি যে কোনো আকারে প্রকাশিত হলেই কী সেটা কবিতা হয়ে উঠতে পারে? কবিতা—সাহিত্য রচনাশৈলীর এমনই একটি বিশেষ ধারা যেখানে শব্দ ও ছন্দ পার¯পরিকভাবে ক্রিয়াশীল থাকতে দেখা যায়। কবিতায় শব্দগুলো একসাথে জুড়ে থেকে কোনো প্রকার উচ্চারণ, ধ্বনি, চিত্র অথবা চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে থাকে যা কি-না সরাসরি বর্ণনা করতে গেলে হতে পারে অনেক জটিল অথবা বিমূর্ত। কবিতা রচনায় প্রচ্ছন্ন থাকে ছন্দ ও মাত্রা অর্থাৎ অক্ষর অথবা শব্দাংশের সংখ্যার সম্মিলন অথবা বিন্যাস। কিন্তু, কবিতার এসব গঠন প্রক্রিয়া সবসময় সচেতনভাবে কতটুকু কবির মনে ঘটে থাকে, সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুমান করা কঠিন।
বাংলা ভাষার হাজার বছরের ইতিহাসে সাহিত্যের আরম্ভ অনেকটাই গীতিকবিতা দিয়েই। যেখানে উচ্চারণ ও ছন্দের মিলের সাথে যুক্ত ছিল সুর। বিষয়বস্তুতে গভীর ব্যক্তি অনুভূতির থেকে অগ্রাধিকার পেল সামাজিক-রাজনৈতিক কাহিনী। কেননা, তখন সমাজই ছিল সব, ব্যক্তির অস্তিত্ব একপ্রকার ছিল না বললেই চলে। তাই সেসব কাহিনীতে ছিল সমাজ ও রাজনীতি, ক্ষেত্রবিশেষে শাসকের গুনকীর্তন আবার ক্ষেত্রবিশেষে প্রথা-প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা, রোমান্টিক প্রেমের জনপ্রিয় আখ্যান, যৌনতা, অথবা বীরের শৌর্য-বীর্য, জন্ম-মৃত্যু, প্রেম অথবা বিবাহ।
চর্যাপদ দিয়েই বাংলা কবিতার গোড়াপত্তন। চর্যাপদ কতগুলো আশ্চর্য বিপরীতধর্মী কবিতার সমাহার। তাই চর্যাপদের আরেক নাম—চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয়। চর্যাপদে বর্ণিত সাধন তত্ত্ব, তৎকালীন বাংলার সমাজ জীবনের চিত্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশের অপরূপ বর্ণনা, সকলই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে প্রমাণিত ও গৃহীত। কিন্তু, চর্যাপদের ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধীতা, অভিজাতদের ধর্মদর্শন ও ধর্মানুষ্ঠানের প্রতি বিদ্রুপ উচ্চারণ ইত্যাদী’তে লোকায়তিক বৌদ্ধ ও জৈনরা যে সেই খ্রিস্টপূর্ব থেকেই ব্রাহ্মণ্য-বিধানকে অমান্য করে এসেছে, তারই কতক প্রতিচ্ছবি মেলে চর্যাপদের কোনো কোনো পদ্যে। বাঙালি জাতিসত্ত্বার মূলে রয়েছে—হিন্দু লৌকিক, বৌদ্ধ লৌকিক, ইসলাম লৌকিক; এরকম সকল লৌকিকগণ। এই লৌকিক অনভিজাত বা প্রাকৃত বাঙালিই হচ্ছে প্রকৃত বাঙালি। আঠারো শতক পর্যন্ত রচিত সাহিত্য এই প্রাকৃত বাঙালির উপভোগ্য ছিল। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য, বাংলায় রূপান্তরিত রামায়ণ-মহাভারত-ভগবত, বৈষ্ণব পদাবলি, চৈতন্যের জীবনী, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, ইত্যাদী সকল সাহিত্যের ক্ষেত্রেই একথা প্রযোজ্য। সে সময়ের লোকসাধারণের কবিরা এই ‘লৌকিক করিয়া’ ‘লৌকিকের মতে’, মূলধারায় কবিতা তথা সাহিত্য রচনা করতেন।
কিন্তু তারপর পরে একটি দীর্ঘ ছেদ। বাংলা সাহিত্যে কথিত অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে বড়ু চণ্ডীদাস নিয়ে আসেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। এ কাব্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়লীলাচ্ছলে জীবাত্মা-পরমাত্মা লীলা লীলায়িত হলেও মধ্যযুগের শুরুতে একাব্য অনবদ্য ভূমিকা রাখে। তবে মধ্যযুগ বিশেষভাবেই বিখ্যাত মঙ্গলকাব্যের জন্য। প্রায় পাঁচশ বছর ধরে বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন শ্রেণির মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছে। যদিও মঙ্গলকাব্যগুলোর রূপ প্রায় একই রকম। কতিপয় মঙ্গলকাব্যে কবিতার ভারী যাদু থাকলেও সবচেয়ে বেশি ছিল সমকালীন সামাজিক জীবনের বোধ ও পরিচয়। বাংলাদেশের মধ্যযুগের ইতিহাস জানতে হলে মঙ্গলকাব্য অবশ্যপাঠ্য। বৈষ্ণব পদাবলি আমাদের স্বপ্নে বিভোর করে। বৈষ্ণব পদাবলির পাত্র-পাত্রী কৃষ্ণ-রাধাকে কেন্দ্র করে যে কবিতাগুলো রচিত হয়েছিলো সেগুলো বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
রাজসভায় রচিত হলেও মধ্যযুগের সাহিত্য কেবল অভিজাতদের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেনি। মধ্যযুগে সামাজিক বৈষম্য প্রকট থাকলেও, পুরোহিত-মোল্লাদের দাপট থাকলেও, অভিজাত কর্তৃক উৎপীড়ন থাকলেও, সে যুগের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বাংলার প্রাকৃতজনেরই প্রাধান্য ছিল। যারা আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসবিদ, তাদের অনেকের মতে, মধ্যযুগের সর্বশেষ কবি হলেন ভারতচন্দ্র আর আধুনিক যুগের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন। মাঝখানে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত হলো ‘যুগসন্ধির কবি’।
মধ্যযুগের বিদায়ী দামামা বেজে ওঠে, যখন ১৭৫৭-তে আমরা স্বাধীনতা হারাই। বণিক শাসক হয়। অনেক পরিবর্তনের সাথে সাথে সাহিত্যের পরিবর্তন বা পতন ঘটে। ভারতচন্দ্রের রচনায় দেখা যায় পতনের ছাপ। বলা হয়ে থাকে ১৭৬০ থেকে ১৮৩০ এই সত্তর বছর বাংলা সাহিত্যের পতন ঘটেছিল। সে সময় কবিয়াল ও শায়েরদের উদ্ভবে এক নিম্নরুচি সম্পন্ন সাহিত্য রচিত হয়। অর্থাৎ, কবিগান। কবিগানকে গর্ব করার মতো সাহিত্য বলতে অনেকে নারাজ। কবিয়াল ও শায়েররা বিকিয়ে গেলেও কোনো কোনো কবিগান বা শায়েরি আজো বাংলার প্রাকৃতজনের মনে শেকড় গেড়ে আছে সেসবের অনবদ্য ছন্দ ও সুরের নান্দনিকতার কারণে।
বাংলা কবিতায় আধুনিকতা আনেন মাইকেল মধুসূদন। মহাকাব্য রচনা করে বাংলা কবিতার রূপ বদলে দেন। শুধু তাই নয় তিনি বাংলা পয়ারকে এক নতুন রূপে উপস্থাপন করেন। ব্যবহার ক্লান্ত ছন্দরীতিকে মধুসূদন করে তোলেন প্রবাহমান (অমিত্রাক্ষর)। এর আগে অবশ্য ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতায় আধুনিকতার হাল্কা আলোকচ্ছটা দেখা যায়। তবে মধুসূদন একাই এক ধাক্কায় বাংলা সাহিত্যকে অনেক এগিয়ে দিয়ে গেছেন। মধুসূদনের দেখাদেখি অনেকে (হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, কায়কোবাদ) মহাকাব্য রচনার চেষ্টা করেন। কিন্তু, শেষপর্যন্ত ওগুলো মহাকাব্য না হয়ে আখ্যানকাব্য হয়ে ওঠে।
বাংলা কবিতায় মহাকাব্যের ধুমধাম চলাকালে রোমান্টিকতা নিয়ে উঁকি দেন বিহারীলাল। বাংলা কবিতার তিনি-ই প্রথম রোমান্টিক ও খাঁটি আধুনিক কবি। রবীন্দ্রনাথ যাকে ‘ভোরের পাখি’ বলেছেন। আত্মভাবপ্রধান কবিতার জন্ম বিহারীলালের হাতে হলেও বিকাশ ঘটে রবীন্দ্রনাথের হাতে। অগ্নিকুণ্ডে পতঙ্গ পতনের মত বিহারীলাল চলে গেলেও তার কবিতার পথ ধরে আসে—সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, দেবেন্দ্রনাথ সেন, গোবিন্দচন্দ্র দাস, অক্ষয়কুমার বড়াল, ডিএল রায় ও রবীন্দ্রনাথ। প্রথম মহাযুদ্ধের মাধ্যমে বদলে যাওয়া ইউরোপীয় চেতনার প্রভাব পড়ে আমাদের জীবন ও সাহিত্যে। দু’দণ্ড দেরিতে হলেও সেই প্রভাব আমাদের কবিতায় এসে ভালভাবেই পড়ে। আধুনিক কবিতাগুলো বিশশতকের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হয়ে ওঠে।
বিশশতকের গোড়ার দিকে বাংলা কবিতায় রবীন্দ্র-যুগ চলাকালে রবীন্দ্রাগুনে পুড়েছেন অনেকেই। তবে রবীন্দ্র-বলয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টাও করেছেন অনেকে। তাদের মধ্যে মোহিতলাল, যতীন্দ্রনাথ বিশেষ করে কাজী নজরুল ইসলাম। যিনি একইসাথে প্রেম ও দ্রোহের কবি। তার কবিতায় যেমন বিদ্রোহ আছে তেমনি আছে কৈশোরিক প্রেমের কাতরতা। বিশ শতকের তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি সময়ে আধুনিক কবিতার রমরমা হাট বসে বাংলা সাহিত্যে। বাংলা কবিতায় বাঙালির প্রথাগত বিশ্বাস, সুন্দর, কল্যাণ, আবেগ, স্বপ্ন, সুখ-দুঃখ ও কাতরতা বিসর্জন দিয়ে আধুনিক কবিগণ নগরের কথা ও ক্লান্তি, অবিশ্বাস, নিরাশার কথা ফুটিয়ে তোলেন কবিতায়। কবিতায় পাল্টে যায় বাঙালির চেতনা। বুদ্ধদেব, জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু ও অমিয়, এই পাঁচজন কবিকে রবীন্দ্রনাথের পর আধুনিক কবিতা সৃষ্টিকারী বাংলা ভাষার প্রধান কবি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কিন্তু তারপর অচিরেই এই পঞ্চকবিকে অনুসরণ করে আসলেন সমর ও সুকান্ত।
সাহিত্যে রক্ষণশীলতা ও প্রগতিশীলতা মুখোমুখী দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় প্রায়শই। বিশ শতকের গোড়াতেই আধুনিক সাহিত্যকে অশালীন বলে গালিগালাজ করে প্রবন্ধ ও বই ছাপেন ঊনিশ শতকের বিভিন্ন রক্ষণশীলেরা। আসলে সাহিত্য কখনো অশালীন বা অশ্লীল হয় না। বিশেষ করে কবিতা। কবিতায় সব বলা যায় সব রকম ভাবে। এছাড়া অশ্লীল কথাটি আপেক্ষিক। শ্লীল-অশ্লীল নিয়ে বাগ-বিতণ্ডা না করে বরং সাহিত্যকে নিরপেক্ষ মন ও মননেই দেখা উচিত। ইতিহাস থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, যখনই রাষ্ট্রযন্ত্র বা শাসকশ্রেণি সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর শাসন-শোষণ, অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে তখনই যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখচ্ছবি, অর্থাৎ কবি-সাহিত্যিকরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন কবিতা অথবা নানা ধরনের গদ্য রচনার মাধ্যমে। যে সাহিত্যগুলো নানাভাবে বিভিন্ন আন্দোলনেও প্রেরণা জুগিয়েছে। ঊনবিংশ শতককে কখনো বলা যায় বাংলা গণসংগীতের স্ফুরণকাল। সেভাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও দেশ ভাগের পর পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন আন্দোলনের হাত ধরে রচিত হয়েছে বহু প্রতিবাদী সাহিত্য, কবিতা ও গণসংগীত। পাকিস্তানিরা প্রথম যখন আমাদের ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানলো, শুরু হলো আন্দোলন। মাহবুব উল আলম চৌধুরী লিখলেন একুশের প্রথম এবং অমর এক কবিতা—‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসীর দাবী নিয়ে এসেছি’। তবে একুশের প্রথম কবিতাটি ইতিহাস থেকে প্রায় হারিয়েই গেছে। অর্থাৎ, হানাদারদের বহু হয়রানি ও তল্লাশির দাপটে কবিতাটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারিসহ কবির বাসা কয়েকবার সার্চ করে লুকানো দু’একটি কপি পর্যন্ত নিয়ে যায় পুলিশ। পরবর্তীতে কবিতাটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে শহীদ আসাদের শার্ট নিয়ে লিখলেন শামসুর রাহমান, যা আন্দোলনকে বেগবান ও সফল করে তুললো। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রচিত হয়েছে বহু প্রতিবাদী ও প্রেরণাদীপ্ত কবিতা, সাহিত্য এবং গণসংগীত। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর নির্মলেন্দু গুণ সামরিক শাসনের কড়া পাহারার মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে (১৯৭৭) বীরদর্পে পড়ে শোনালেন তার অগ্নিঝরা কবিতা—
“সমবেত সকলের মত আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি
রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেই সব গোলাপের একটি গোলাপ
গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায়
শেখ মুজিবের কথা বলি।”
নির্মলেন্দু গুণ-ই প্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কবিতার বিষয় করে তুললেন। তারপর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখলেন জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামালসহ আরো অনেকে। অর্জুনের মত বীর সময় দোষে নপুংসক সাঁজলেও কবি কখনো তেমনটি হয় না বা হওয়া উচিত না। কবি হবে মজলুম, প্রয়োজনে নির্বাসিত। বলবে মানুষের (সংখ্যাগরিষ্ঠ) কথা, মানবতার কথা। রুদ্র পেলেন বাতাসে লাশের গন্ধ আর তসলিমা সব বয়স্কা বালিকাদের গোল্লা হতে ছুটে বেরুনোর আহ্বান জানালেন কবিতায়। তারপর ’৯০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত হয় কিছু প্রতিবাদী কবিতা ও গণসংগীত।
ইতিহাসের একটি বিশ্লেষণে প্রতিভাত হয় যে, ’৯০-এর দশকের পর থেকে কবিতার পাঠক সংখ্যায় যেন ভাটা পড়েছে। ইদানীং কবি দেখলেই বলাবলি শুরু হয়—কবিতার এখন আর দিন নেই, কবিতা এখন পাঠক খায় না, কবিতার বই বাজারে কাটে না ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে এখানেই ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে যে তথাপি কবির সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে বৈ কমছে না। বিশেষতঃ কবিতা প্রকাশ করতে এখন আর প্রকাশকের পেছনে লাইন দিতে হয় না। চাইলেই ফেসবুক ওয়ালে কবিতা ছুড়ে দেয়া যায়। হাইকোর্টের সামনে থেকে মূর্তি সরানো ও অন্যত্র স্থাপন নিয়ে এখনি সহস্র কবিতা ছুড়ে দেয়া যায়। এখন মিনিটে মিনিটে রচিত হচ্ছে কবিদের ভ্রুণের চেয়েও বেশি সংখ্যক কবিতা। প্রযুক্তির কল্যাণে কবি ও কবিতার পাঠক এখন একবারে মুখোমুখী দণ্ডায়মান। এটা ভাল। কিছুদিন পূর্বেও যেটা সম্ভব ছিল না খুব বেশি। শাসন-শোষণ, অত্যাচার-নির্যাতন বা আগ্রাসন কি এখন হচ্ছে না? তবে আমরা সে রকম কোনো কবিতা পাচ্ছি না—কিন্তু কেন?
আজকাল কবিতার বিষয় কী কী, সেটা কিন্তু আমরা হাতের মুঠোয়-ই দেখতে পাচ্ছি। আমরা আজ যা হাতের মুঠোয় দেখতে পাচ্ছি তা যদি নজরুল আগেই বলে যেতে পারেন তার কবিতায়, তাহলে কী আমাদের এখনকার কবিগণ আগামী বিশ্ব সম্পর্কে ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাদের কবিতায়, অথবা এর চেয়েও পরবর্তী কিছু। আজকাল কবিতায় নারীকে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, বিদ্যমান প্রাকৃতিক পরিবেশের চিত্র কবিতায় কতোটা স্থান পাচ্ছে নিশ্চয়ই চর্যাপদে বর্ণিত বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর এখনকার সৌন্দর্য এক হবে না। মঙ্গলকাব্য পড়ে যদি বাংলাদেশের মধ্যযুগের সামাজিক অবস্থা (ইতিহাস) জানা যায়, তবে আমাদের আজকের কবিদের কবিতা বা সাহিত্যে সমকালীন পঁচনশীল পুঁজিবাদের ভোগসর্বস্ব কায়েমী স্বার্থবাদী ও পাশাপাশি আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তি মানসিকতার যে সমকালীন সমাজ বাস্তবতা, সেই সমাজ বাস্তবতার ঠাঁই পাওয়াটাই স্বাভাবিক।
বাঙালির জমিতে কলের লাঙল পড়েছে, ছনের চাল হয়েছে টিনের এবং সেই চালে বসেছে কাক, শাদা কাক। মোড় নিচ্ছে আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা। নেওয়াটাই হয়তো স্বাভাবিক। সময়কে তো আর অস্বীকার করা যায় না। কালে কালে মহাকাল অবধি কবিগণই মানুষের সমস্ত অনুভূতি কে বাঁচিয়ে রাখে। কবিদের গর্ভেই বাঁচে মানুষ। আমাদের এই কবিসকল কি পারবেন মানুষের মানবিক অনুভূতিগুলোকে কবিতায় বন্দি করে মহাকাল অবধি দীর্ঘজীবন দিতে নাকি ফেসবুক বা প্রযুক্তি নামক কালের গর্ভে হারিয়ে যাবেন কাক ও কাল যত কিছুকেই আমরা আপন করে নিই না কেন? তাতে কোনো দোষ নেই, তবে লৌকিক বাংলার গভীর মানবিক চেতনার স্বকীয়তা কতটুকু বজায় থাকছে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যে বাংলা সাহিত্যের দেবী চিরকাল কাব্যজীবি, কবিতার স্বাদ ছাড়া সে বাঁচবে কী করে। আমরা কি কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি?
নবম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা
সম্পাদকীয়, অনুপ্রাণন—১০ম বর্ষ ২য় সংখ্যা
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, চীনের উহান প্রদেশ থেকে গতবছর অর্থাৎ ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম করোনা সংক্রমণের সংবাদ মিলে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নভেল করোনা ভাইরাসটি ২০১৯-এর ডিসেম্বরেই চীনে শনাক্ত হয়েছিল, ফলে ভাইরাসটির নামের সাথে ১৯ সংখ্যাটি জুড়ে গিয়ে এর পুরো নাম হয় কোভিড-১৯। চীন থেকে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুতই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গিয়ে অতিমারীর আকার ধারণ করে।
এই ভাইরাসটি কৃত্রিম না প্রাকৃতিক এই নিয়ে কূটনৈতিক বিতর্ক আছে। বিজ্ঞান এটাকে প্রাকৃতিক বলেই রায় দিয়েছে। কৃত্রিম হলে চীনের দায় আছে না হলে নয়, এটা ঠিক নিশ্চিত বলে দেয়া যায় না। প্রকৃতিতে পশুপাখির শরীরে, বিশেষ করে লোমে ও লালায় নানারকম ভাইরাস আছে। গৃহপালিত জীবজন্তুর শরীরে যে সকল ভাইরাস আছে, সেসব ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে ক্ষতির মাত্রা খুব কম, কিন্তু বন্যপ্রাণির শরীরে মানুষের জন্য ক্ষতিকর ও প্রাণঘাতী যেসব ভাইরাসের উপস্থিতি রয়েছে সেসব ভাইরাসের মধ্য থেকে অনেকগুলো সম্পর্কে প্রাণিবিজ্ঞানে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। নভেল করোনা ভাইরাস উহানের একটি বন্যপ্রাণির বাজার থেকেই ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রকৃতির জীববৈচিত্র্য ও ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে বন্যপ্রাণি আহরণ ও নিধন বিশ্বজুড়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই বাজারে বন্যপ্রাণি এবং গৃহপালিত জীবজন্তু ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য আনয়ন করা এবং তার ফলে জনস্বাস্থ্য হানিকর ভাইরাস পশুর দেহ থকে মানবসমাজে প্রবেশের পথ করে দেয়া কোনোভাবেই বিচক্ষণ ও নীতিসম্মত কাজ বলে মেনে নেয়া যায় না।
আমরা যদি অতিমারীর বিশ্ব-ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, ৫৪১ থেকে ৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিউবোনিক প্লেগের সংক্রমণের ফলে ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ, তৎকালীন বাইজেন্টাইন ও কনস্ট্যান্টিনোপল সাম্রাজ্যভুক্ত সকল এলাকা, মিশর এবং আরব উপদ্বীপে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জনগোষ্ঠীর প্রাণহানি ঘটে। মধ্যযুগে ১৩৩১ সালে চীন থেকে একই বিউবোনিক প্লেগের বিশ্বমহামারী দ্বিতীয়বার শুরু হয়। প্লেগের এই মহামারী এবং পাশাপাশি চলমান গৃহযুদ্ধে তখন চীনের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মৃত্যু ঘটে। ক্রমে চীন থেকে তখনকার বিশ্ববাণিজ্যের গমনপথ ধরে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় এই প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে। ১৩৪৭ সাল থেকে ১৩৫১ সাল, এই চার বছরে ইউরোপের ন্যূনতম এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীর মৃত্যু হয়। শুধুমাত্র সিয়েনা এবং ইতালিতে বিউবোনিক প্লেগে মৃত্যুর হার ছিল প্রায় অর্ধেক। তারপর পুনরায় ১৮৫৫ সনে চীনে বিউবোনিক প্লেগ দ্বারা সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। উল্লেখ করা যায় যে, বিউবনিক প্লেগ একধরনের বাদামি ইঁদুরের শরীর থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়েছিল যা কি-না চীনের বাজারে তখন বিক্রয় হতে দেখা গিয়েছিল। চীন থকে বিউবোনিক প্লেগের তৃতীয় ঢেউ ক্রমেই পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। আর তখন শুধুমাত্র ইন্ডিয়াতেই এই প্লেগের সংক্রমণের ফলে প্রায় এক কোটি কুড়ি লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। মোম্বাইয়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এই প্লেগের সংক্রমণ রোধকল্পে সংক্রমিত অধিবাসী সহকারে একেকটি পাড়া-মহল্লা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ফ্র্যাঙ্ক স্নোডেন উল্লেখ করেছেন যে, এতে করে যে সত্যি কোনো উপকার হয়েছে কেউ তার প্রমাণ দিতে পারেনি। এগনোলো ডি টুরা নামে চতুর্দশ শতাব্দীর একজন কাহিনিকারের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, এই ভয়ানক ঘটনার সত্য বিবরণ মানুষের জিহ্বা দিয়ে উচ্চারণ করাই অসম্ভব। বলা যেতে পারে যে, এই ভয়াবহ ঘটনা যে দেখেনি, সে বিশেষভাবে আশীর্বাদপ্রাপ্ত। সংক্রমিত ব্যক্তির বাহুমূল এবং কুঁচকি অস্বাভাবিক ফুলে যায় এবং কথা বলতে বলতেই ধপ করে পড়ে মৃত্যু লাভ করতে থাকে। মৃতের সংখ্যাধিক্যের কারণে তাদেরকে গণকবরে দাফন করা হয়। ফ্লোরেন্স নগরীর জিয়োভানি বোকাচ্চিওর বর্ণনায়, মৃতদেহ সৎকারের জন্য ন্যূনতম শ্রদ্ধাটুকু দেখানো হয়নি যেটা কি-না একটি মৃত ছাগলের জন্যও প্রাপ্য হতে পারতো। কেউ কেউ মৃতদেহ বাড়িতে লুকিয়ে রাখতো। অনেকেই সংক্রমণের ভয়কে মানসিকভাবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু তারপরও ভুগতে ভুগতে মানুষ এক পর্যায়ে বেপরোয়া হয়ে যায়। বোকাচ্চিওর ভাষায়, পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানুষ অতিরিক্ত মদ্যপান করতে থাকে, নাচে-গানে মত্ত হয়ে থাকে এবং পৃথিবীর যাবতীয় সুখ এবং আনন্দ উপভোগ করাতেই নিজেদের নিয়োজিত করতে থাকে। সংক্রমণ ও মহামারীর বিষয়টি তারা ঘাড় থেকে এমনভাবে ঝেড়ে ফেলতে চাইতো যেন সেটা একটা বিশাল কৌতুক ছাড়া আর কিছু না। আমরা সেই একই ধরনের পরিণতির দিকে এগোচ্ছি কি-না?
অতীত অতিমারীর বিশ্ব-ইতিহাসে দেখা যায় যে, সংক্রমণের ধাপগুলোর মধ্যে প্রথম ঢেউ থেকে দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় ঢেউ অধিক থেকে অধিকতর প্রাণঘাতী হয়েছে। অন্যদিকে টিকা আবিষ্কারের ইতিহাসে বিজ্ঞানীরা চমক দেখিয়ে করোনা ভাইরাসের বিশ্বব্যাপী প্রাদুর্ভাব ও অতিমারীর এক বছরের কম সময়ের মধ্যে টিকা আবিষ্কার ও প্রয়োগ শুরু করেছেন। যার ফলে আশা করা যায় যে, সংক্রমণের দ্বিতীয় ধাপটি হয়তো অতীতের মতো ততটা মারাত্মক আকার ধারণ করবে না। কিন্তু তারপরও জীবন অথবা জীবিকা এসব প্রশ্নে, বিশেষ করে লকডাউনের মধ্যেও কীভাবে অর্থনীতিকে ন্যূনতম চলমান রাখা যায়, এসব প্রশ্নে বাস্তবে সর্বোত্তম ভারসাম্য রক্ষা করা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দেখা যাচ্ছে যে, সরকারের দেয়া লকডাউন নীতিমালা ও স¦াস্থ্যবিধি যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে না। তার পরিবারের অন্ন জোগাড়ের প্রয়োজনের চাপে উপার্জনক্ষম মানুষ ঘরে বসে থাকতে পারছে না।
কিন্তু, অন্যদিক নভেল করোনা ভাইরাস মানুষের শরীরে পুনঃপৌনিক সংক্রমণের মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে রূপান্তরিত হয়ে আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। যার ফলে, সংক্রমণের প্রথম ঢেউ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও ভাইরাসের রূপান্তরিত রূপ এই বছরের মার্চ থেকে ক্রমেই প্রাথমিক নিয়ন্ত্রণের বাঁধ ভেঙে দিয়ে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের চূড়া যে প্রথম ঢেউয়ের থেকে আরো উঁচু এটা মৃত্যু ও সংক্রমণের হার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই বোঝা যায়। বাংলাদেশে এ-পর্যন্ত কোভিড-১৯ এ সংক্রমিত হয়েছে প্রায় ৮ লাখ এবং একইসময়ে বিশ্বে সংক্রমণের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৬৩ লাখ। মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশে প্রায় ১২ হাজার এবং বিশ্বে প্রায় ৩৪ লাখ। সংক্রমণ ও মৃত্যুর নিছক সংখ্যাগুলোর মধ্যে এক একজনের আপন হারানোর অপার বেদনা লুকিয়ে আছে। আর আমরা আপন হারানোর বেদনার মতোই বেদনা অনুভব করি যখন আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার জগৎ থেকে হারিয়ে যায় তারকা ব্যক্তিরা। এই সংখ্যার শ্রদ্ধাস্মরণ বিভাগে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এপার ও ওপার বাংলার ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের এরকম কয়েকজন ব্যক্তির জীবন ও কর্ম নিয়ে এক বা একাধিক আলোচনা। যারা সকলেই এই করোনাকালে সম্প্রতি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তা ছাড়াও এই সংখ্যাটিতে অতিমারীর অভিঘাতের নানাদিক উঠে এসেছে শিল্প ও সাহিত্যের নানা শাখায়। অন্তর্ভুক্ত গল্প ও কবিতার কোনো কোনোটির মাঝে আমরা দেখতে পাই, অতিমারীর আঘাতের চিহ্ন। মানবতার অসহায়ত্ব ও দুর্ভোগের করুণ বর্ণনা এসব রচনাকে করেছে অশ্রুসিক্ত।
এই অতিমারীর মধ্যে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন পত্রিকাটির নিয়মিত প্রকাশনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন ছিল। অনুপ্রাণন পত্রিকাটির ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা থেকে ৯ম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা নির্ধারিত সময় থেকে কিছুটা দেরিতে হলেও প্রকাশিত হয়েছে। ১০ম বর্ষ ১ম সংখ্যাটি ফেব্রুয়ারি, ২০২১ একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হওয়া নির্ধারিত ছিল, কিন্তু বইমেলা পিছিয়ে যাওয়ায় সেটা প্রকাশিত হয় ২ এপ্রিল ২০২১। এই অতিমারীর মধ্যে অমর একুশে বইমেলা শুরু হয় ১৭ মার্চ এবং লকডাউনের বিধিনিষেধের মধ্যে শেষ হয় ১২ এপ্রিল। অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে ২০২০-২০২১ অতিমারীকালে এ-পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে ৬৮টি গ্রন্থ। গ্রন্থগুলোর কোনো কোনোটাতে উঠে এসেছে অতিমারীর অনুভব চিত্র।
বাঙালি, লেখক-আড্ডার মধ্য দিয়ে সৃজনশীল সাহিত্যের সূত্র খুঁজে পায়। বিভিন্ন লোকালয় ভ্রমণের মাধ্যমে গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলো ধরা দেয় এবং চলমান জীবনের নানামাত্রিক রূপ তাদের গল্প-উপন্যাসে উঠে আসে। অতিমারীর পূর্বে ঢাকা শহরে এবং দেশের জেলা পর্যায়ে লেখক আড্ডার কতগুলো আয়োজনের কর্মসূচি নিয়মিত অথবা অনিয়মিতভাবে বছরজুড়ে চলতে থেকেছে। লেখকরা ব্যক্তি এবং গ্রুপ পর্যায়ে লেখার বিষয়বস্তু তৈরির জন্য, গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য বই সংগ্রহ ও বইপড়ার কাজ চালিয়ে গেছে। কিন্তু এই অতিমারীর সময় আড্ডা বন্ধ হয়ে যায়। লাইব্রেরি বন্ধ থাকায় লেখার জন্য, গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ভ্রমণ অথবা বই সংগ্রহের কাজে বিঘ্ন ঘটেছে। কিন্তু তাতে কি লেখা বন্ধ থেকেছে? অতিমারীকালে লেখকরাও নতুন পরিস্থিতির, নয়া-স্বাভাবিক অবস্থার সাথে লেখার কার্যক্রমের রুটিন ও পদ্ধতি পরিবর্তন করে তাদের লেখা চালিয়ে গেছে। এই প্যান্ডেমিকের লকডাউন বা বিধিনিষেধ অথবা সতর্ক অবস্থান নিয়ে বাসায় থাকার সময় অনেক নতুন লেখকের জন্ম হয়েছে। যারা আগে থেকে লেখালেখি করতো অথবা যারা নতুন লেখক তারা সবাই লেখালেখির মধ্য দিয়েই ঘরবন্দী সময়টাকে নিয়োজিত করেছে।
এসব শিল্প-সাহিত্যকর্মে কি জনবিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতার স্বাক্ষর থেকেছে? আমার হাতে পত্রিকার জন্য যেসব লেখা অথবা পুস্তক প্রকাশের জন্য যেসব পাণ্ডুলিপি এসেছে, আমার পর্যবেক্ষণে মনে হয়েছে যে, এই নয়া-স্বাভাবিক পরিস্থিতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লেখার ধারায় পরিবর্তনের কোনো ছাপ ফেলতে পারেনি। স্বাভাবিক জীবনের তীব্র আকাক্সক্ষা নয়া-স্বাভাবিকতাকে গৌণ বোধেরই একটা অন্তহীন প্রচেষ্টা। আর যেসব লেখায় অতিমারী কবলিত নাগরিক অথবা গ্রাম্য জীবনের বাস্তব চিত্র এসেছে সেসব বাস্তব চিত্রে অতিমারীর ভয়াবহতা অথবা ভয়ঙ্কর রূপটি মুখ্য হয়ে ওঠেনি। যদিও আমরা দেখতে পাই, প্রতিদিনই মানুষের মৃত্যু হচ্ছে কিন্তু এর সংখ্যাটা স্বাভাবিক পরিস্থিতির মোট মৃত্যুহারকে অল্পই প্রভাবিত করেছে। এ-রকম একটা ধারণা থেকেই হয়তো মানুষ লকডাউনের বিধিনিষেধ অথবা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা হালকাভাবেই নিয়েছে।
কিন্তু তাহলেও দেশে গত মার্চ ২০২০ থেকে কোভিড-১৯ এ সংক্রমিত হওয়ার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে কেনাবেচায় পণ্যভেদে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বই কেনাবেচার মোট মূল্যমান স্বাভাবিক সময়েও এমনিতে কম। তারপর এই নয়া-স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সেটা কমে নেমে এসেছে স্বাভাবিক পরিস্থিতিকালে বিক্রয় মূল্যমানের তুলনায় শতকরা ২৫ ভাগে। তবে এটা যদি সাময়িক পরিস্থিতি হয়, তাহলে যে ক্ষতিসাধন হয়েছে সেটা হয়তো স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে এলে অধিকাংশ প্রকাশক ও সংশ্লিষ্ট মুদ্রণশিল্প মিটিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু অতিমারী যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে পুস্তক প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পে যে ক্ষতি হবে, সে ক্ষতির ফলে প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পের একটি বিরাট অংশ এই জগত থেকে চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে। মানুষের জীবিকা রক্ষা করার তাড়নার বাস্তবতায় ব্যাপকহারে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন অথবা লকডাউনের নীতিমালা উপেক্ষা করার যে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে, এসব ঘটনা যাদের জীবিকা প্রকাশনা এবং মুদ্রণশিল্পের ওপর নির্ভরশীল তাদের একটি বিরাট অংশকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না। কারণ, বইপড়া এই নয়া-স্বাভাবিককালের একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা দূর করার মাধ্যম হয়ে উঠতে আবারো ব্যর্থ হচ্ছে। এই অতিমারীকালে অনলাইনে কেনাবেচার পরিমাণ সামগ্রিক বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, সেটা বই ও পত্রিকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়নি।
আমাদের দেশে প্রকাশকদের মধ্যে বই অথবা ম্যাগাজিন প্রকাশের ধরনের ওপর ভিত্তি করে কতগুলো ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম ভাগটি পাঠ্যপুস্তক, নোট অথবা গাইড বইয়ের প্রকাশক। দ্বিতীয় ভাগটি পাঠ্যপুস্তক, নোট অথবা গাইড বই প্রকাশের পাশাপাশি সৃজনশীল সাহিত্য অথবা গবেষণাগ্রন্থও প্রকাশ করে থাকে। আর তৃতীয় ভাগটি শুধুমাত্র সৃজনশীল সাহিত্য অথবা গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করে থাকে।
এই তিনটি ভাগ বা শ্রেণির প্রকাশকরা সকলেই এই অতিমারীকালে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকতো, তবে প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগের প্রকাশকরা ক্ষতিগ্রস্ততার হাত থেকে বেশ ভালোভাবেই রক্ষা পেতো। অন্যদিকে যেসব প্রকাশক শুধুমাত্র সৃজনশীল সাহিত্য ও সামাজিক গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করে তাদের পরিস্থিতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকা-না থাকার সাথে সম্পর্কিত নয়। অতিমারীর কারণে বই ক্রয়-বিক্রয় সামগ্রিক হ্রাস পাওয়ার সাথেই তাদের অর্থনীতি জড়িত এবং যেটা শোচনীয় বললেও কম বলা হবে।
বাস্তবে আমাদের জানা দরকার যে, এই অতিমারীকালে কাদের আয় হ্রাস পেয়েছে এবং কাদের আয় যে পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে সে পরিমাণ হ্রাস তাদের আর্থিক সচ্ছলতার ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলেনি? কারা সৃজনশীল সাহিত্য, বই ও ম্যাগাজিনের মূল ক্রেতা? যাদের আয় সামগ্রিক হ্রাস পেয়েছ, তারাই কি সৃজনশীল সাহিত্য পুস্তক ও ম্যাগাজিনের ক্রেতা? আবার দৃশ্যত. এই অতিমারীকালেও কাপড়-জামার ঈদবাজার সরগরম হলেও সামগ্রিক ঈদের কেনাবেচার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে কি-না? না-কি স্বাভাবিক ছিল? না-কি স্বাভাবিক পরিস্থিতির সময়কাল থেকে কম ছিল? বস্তুত কাপড়-জামার ঈদবাজার এই অতিমারীকালে বেশ চাঙ্গা দেখা গেলেও সামগ্রিক হিসাবে আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ অতীত স্বাভাবিক পরিস্থিতিকালের চেয়ে কম ছিল। বস্তুত এই অতিমারীকালে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের খরচের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে এবং খরচের সিংহভাগ ব্যয়িত হচ্ছে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে এই অতিমারীকালে যাদের আয় তাৎপর্যপূর্ণভাবে হ্রাস পায়নি এবং যারা সৃজনশীল সাহিত্যের বই পড়ে, তারা হয়তো এই অতিমারীকালেও বই কেনা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় অংশটি যারা আয়ের একটি ভাগ কষ্ট করে হলেও সৃজনশীল সাহিত্য অথবা গবেষণাগ্রন্থ ক্রয়ের জন্য ব্যয় করতো, অর্থের অভাবে তারা এই অতিমারীকালে বইয়ের বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না; করলেও ক্রয়ের পরিমাণ খুব বড় আকারেই হ্রাস পেয়েছে।
অর্থাৎ একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা এবং অন্যদিকে বইয়ের ক্রেতাদের আয় হ্রাস, সামগ্রিকভাবেই বই ও ম্যাগাজিন প্রকাশনা এবং মুদ্রণশিল্পে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। অর্থনীতির অন্যান্য খাতে সরকার ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্পসুদে ঋণ দিয়ে এই অতিমারীকালে প্রণোদনা দিয়েছে, কিন্তু পুস্তক প্রকাশনা এবং মুদ্রণশিল্পের মালিকরা ব্যাংকখাত থেকে স্বল্পসুদে ঋণ গ্রহণ করার সুযোগ নানাকারণেই গ্রহণ করতে পারছে না। প্রকৃতপক্ষে প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বার্ষিক এককালীন অনুদানের কর্মসূচি নিয়ে সরকারের এগিয়ে আসা এখন এই অতিমারীকালে সময়ের দাবি। শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকার তালিকা করে বার্ষিক এককালীন এই অনুদান প্রদান করার ব্যবস্থা করতে পারে।
সর্বশেষে, করোনাকালের গদ্য নিয়ে কথা। প্রশ্ন হচ্ছে, করোনাকালের গদ্যের বিষয়বস্তু কী হতে পারে? অবশ্যই অতিমারী ও অতিমারীর অভিঘাত। অতিমারীর অভিঘাত শুধু মানুষের অসুস্থতা, দেহত্যাগ এবং পরিবার ও সমাজে তার বাস্তব ও মানসিক অভিঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। করোনাকালের গদ্যের মধ্যে আসতে পারে বহুমাত্রিক বিষয়। যেমন- চিকিৎসা, প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায় অথবা সামগ্রিকভাবেই এই অতিমারীর বিরুদ্ধে জীবন ও জীবিকা রক্ষার লড়াই। অতিমারীর প্রেক্ষিতে রাষ্ট্র ও সমাজের ভূমিকা সম্বন্ধীয় চিন্তাভাবনা। নয়া-স্বাভাবিক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিকের বর্ণনা, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ এবং সুপারিশ। কবিতা ও গল্পের পাশাপাশি করোনাকালের গদ্য রচনায় কোনো কোনো লেখক মনোনিবেশ করতে পারেন।
১০ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা – সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা- তৃতীয় পর্ব – সম্পাদকীয়-
সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হওয়ার পর সাম্প্রতিকের আরো ২৫ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কবিতা ও কবিতা নিয়ে সামষ্টিক আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হলো শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা তৃতীয় পর্ব। তৃতীয় পর্বের এই ২৫ জন কবির নাম ইতোপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের ন্যায় অনুপ্রাণনের ১০০ নির্বাচিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের কবি তালিকা থেকে নেয়া হয়েছে যাদের জন্মসাল ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রয়েছে। তালিকার অবশিষ্ট ২৫ জন নির্বাচিত কবি নিয়ে লেখা প্রকাশিত হবে আগামীতে প্রকাশিতব্য শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা অর্থাৎ সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা চতুর্থ পর্বে।
সাম্প্রতিককালের কবিদের কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যসমুহ নিয়ে গত সংখ্যার সম্পাদকীয়তে কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে। সেই আলোচনার সাথে আরো কিছু কথা এখানে যুক্ত করা যেতে পারে বলে মনে করি। যেমন কবিতার বিষয়বস্তুর উত্তরাধিকার হিসেবে সাম্প্রতিকের প্রত্যেক কবি কোন না কোন সময়, কোন না কোন কবিতায় রূপসী বাঙলার প্রাকৃতিক সুন্দরতায় ডুব দিয়ে সুন্দর ও সত্যের খোঁজ করে দুই একটা মুক্তা তুলে আনার প্রয়াস করেছেন। বাঙলার প্রকৃতির নিটোল সৌন্দর্যের কাছে থেকে কবিতাকে জীবন দিয়ে যাপন প্রচেষ্টার কারণে সাম্প্রতিকের কবিতায় বাঙলার স্বাদ আস্বাদন থেকে আমরা বঞ্চিত হই না। মা-মাটি, ষড়ঋতু, সৃষ্টির উল্লাস, আদিমতার সাথে কোন কোন সময় পৌরাণিক মিথের সংমিশ্রণ কবিতায় প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। উপমার জানালাতে উড়ে চলা বলাকার গতিতে অঙ্কিত হতে দেখি বঙ্গ জনপথ, ব-দ্বীপ ভূমি, বৃষ্টি বিধৌত বৃক্ষরাজি, বনভূমি, সোনালু অথবা অসীম অশ্বত্থ।
মানুষের বোধের নিগুড়ে বাস করে শৈশব। সাম্প্রতিকের কবিদের শৈশব ও নস্টালজিয়ার অনুষঙ্গ অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চকিত ও উত্তুঙ্গবাদী। উপমা, রূপক, ব্যঞ্জনা ও ভিন্নতার রহস্য-মাখা জাদু-বাস্তবতা অথবা অধিবাস্তবের রঙে রঞ্জিত হয় নস্টালজিয়া। যৌবনের প্রবলে দৃশ্যমান যতনা আদিরসের নিঃসরণ তারচেয়ে বেশি মাত্রায় পরিলক্ষিত সংরক্ষণ ও সংস্কারবাদী মননের উপমাশ্রিত কারুকার্যের কৃত্রিম স্রোত। কবিতায় মরমিবাদ, বাউলতত্ত্ব ও লোকজধারা দৃশ্যমান হলেও সেটির সাধনা-অভিজ্ঞানের ধারাক্রমে চর্চা খুব একটা পরিদৃষ্ট বা পরিপুষ্ট নয় বলেই কবিতায় মনে হয়। সাম্প্রতিককালে দ্রুত গতিতে নগরায়ণের পরিবেশে নাগরিকবোধের শৃঙ্খলা ও পাশাপাশি জৈবিক স্খলন ও সংকটের আবর্তে জীবনের রহস্যময়তার মূর্ত ও বিমূর্ত ভাবকল্প কবিদের কবিতায় লক্ষণীয় মাত্রায় যুক্ত হতে দেখা যায়। জাদু-বাস্তবতা, অধিবাস্তববাদ, উত্তরাধুনিকতা, কাঠামোবাদ, বিনির্মাণবাদ ও ডিসকোর্সের অনুষঙ্গ-তাড়িত প্রকরণশৈলী বাংলাদেশের কবিতায় ব্যাপক দেখা না গেলেও কারো কারো ব্যবহার প্রবণতার মাঝে গুটিকয়েক সফল হয়েছে বলেই প্রতীয়মান। সাম্প্রতিকের কবিতায় গদ্য-ছন্দের ব্যবহারে এখন অনেকেই সাবলীল। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধীতা, গণতন্ত্র ও স্বদেশপ্রেম ইত্যাদি সাম্প্রতিকের কবিতায় খুবই সীমিতভাবে প্রতিভাত হতে দেখা গেছে। তার অর্থ এই নয় যে সাম্প্রতিকের কবিতায় সমাজ অথবা রাজনীতি সচেতনতা নেই। আছে, আর কোন কোন ক্ষেত্রে সেটা এসেছে ডায়াস্টোপিয়ার রূপ ও বর্ণ পরিগ্রহ করে। যার মধ্যে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা ও প্রতিজ্ঞা না থেকে হতাশা, বিষণ্নতা ও পরাজয়বাদিতার প্রবণতাই যেন বেশী। সাম্প্রতিকের কারো কারো কবিতার বইয়ের নাম প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, যদিও এটি একটি উপলক্ষ, প্রধান অনুষঙ্গ নয়, তবুও নামের ব্যঞ্জনা ও অর্থের গূঢ়ার্থ এবং রহস্যময়তা কবির স্বকীয় পরিচয় সৃষ্টিতে কিঞ্চিত ভূমিকা রাখতে দেখা যায়।
সাম্প্রতিক কবিদের ব্যক্তিক বিকাশ ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন অনুষঙ্গ ও প্রবণতা পরিলক্ষিত হতে দেখা যায়। কারো কবিতা গদ্যে যেমন বিকশিত পদ্যের বিনুনিতেও তেমন অনুধ্যানযোগ্য। কারো কারো কবিতা অতীতবোধ, রাজনীতি, সংকট ও প্রধানত লোকজ ঐতিহ্য সমৃদ্ধ আবার একইভাবে কখনো কখনো নগরজীবনের বাস্তবতাকেই বিকশিত করতে বেশি মাত্রায় পারঙ্গম। কারো কবিতায় যেমন বাহুল্য আছে প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার কম্বুরেখা, তেমনই আছে রসবোধ ও লোকজ-বাস্তবতায় জীবনকে কাব্যময় করার সদিচ্ছা। ঐতিহ্য আর সরলতা উপজীব্য করে নাগরিক-জটিলতাসিক্ত জীবনকে কবিতায় তুলে আনার মতো কঠিন কাজও কেউ কেউ করেছেন। কারো কবিতা মূলত গদ্যধর্মী হলেও মুক্তক অক্ষরবৃত্তের ছোঁয়াচ কবিতার পদ্য-স্বকীয়তাকে নান্দনিক করতে সাহায্য করেছে। সাম্প্রতিকের প্রায় সকল কবির কবিতায় রয়েছে মানবিকতাবোধ, বৈশ্বিকবোধ, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মিথের শক্তির উপলব্ধি অথবা অন্তর্লীন শূন্যতা বোধের কাব্যকলা। একদিকে যেমন ছন্দোবোধ অন্যদিকে ভাঙনের গদ্য-কল্পে বিম্বিত কাব্যময়তা। লোক-ঐতিহ্যতাড়িত সরল পদ্যের কথক হয়ে জীবনকে গ্রামীণ-চেতনাবোধ, লোকযান ও পুঁথিকারদের ঢঙে কাব্যময় করার একটা প্রয়াস কারো কারো কবিতায় লক্ষণীয়। শেকড়বোধকে বর্ণনে, কথনে, সারল্যে, গদ্যভাব ও ভাষায় বিম্বিত করে পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার প্রচেষ্টায় বিষয়ের অভিনবত্ব ও জটিলতার চাইতেও সারল্য, বিমূর্ত-অভিকল্পই বেশি বেশি প্রকটিত অনেকের কাব্যে। কারো কবিতায় গতি ও প্রগতির সম্মিলন রয়েছে, দেখার বোধ ও বিশ্বাসকে প্রশ্নসত্যে চিত্র আর সংকটের প্রেক্ষিতে উপলব্ধিজাত করে তোলা হয়েছে। কবিতার রহস্যময়তার অন্তরালে মানুষের বিবেকে প্রশ্ন সৃষ্টি ও ব্যঞ্জনাভাবের বিকাশের সপক্ষেই কাব্যধারার প্রবর্তক হিসেবে কেউ আবির্ভূত।
বাংলা কবিতার স্বভাবের অনেকটাই দৃশ্যধর্মী। ‘বিষয়’ ‘বর্ণনা’, ‘বন্দনা’ ও ‘বিবরণ’-এর বৃত্তে বন্দী। একুশ শতকের দোরগোড়ায় এসে কারো কারো পক্ষ থেকে বিষয়’কে জলাঞ্জলি দেবার প্রয়াস শুরু হয়। অর্থাৎ কবিতা কিছু বলবে না, কোনো ভারী কথা নয়, কোনো বক্তব্য নয়, দর্শন নয়। সমাজ-রাজনীতির ক্ষেত্র হোক; কবিতা ধ্বনি, শব্দ, ভাষা, অক্ষরের নেশায় নিজের আয়নায় যেন নার্সিসাস। কেবল ছবি, ছবির সারি। পরীক্ষা নিরীক্ষাকে নিরুৎসাহিত করার কিছু নাই। একবিংশ শতাব্দীর দুই যুগ আমরা অতিক্রম করে এসেছি। কিন্তু এখনো বাংলাদেশ পলিমাটির দেশ। যেটুকু কঠিন প্রস্তর আছে তা-ও চলমান ঝর্ণার জল পেয়ে পেয়ে সিক্ত হয়েই থাকে। সার্বিক বিচারে সমকালীন কবিতা হৃদয়গ্রাহী কিন্তু যতটা না হৃদয়গ্রাহী, ভাব-ভাষা-চিন্তা-চিত্রকল্প ও অনুভবের পরম্পরার সুনিয়ন্ত্রিত বিন্যাসে তার থেকেও বেশী বৈদগ্ধ্যপূর্ণ।
Quarterly Anupranan 13th Year 3rd Issue, Samprotiker Kabi O Kobita- 3rd Part
লেখকের কথা-
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির কথাসাহিত্যিক হিসেবে ড. শামসুদ্দীন আবুল কালাম একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। তিনি আমার একমাত্র মামা, বিষয়টি আমার অহংকার, গর্ব এবং উত্তরাধিকারের। জন্ম থেকেই দেখেছি তার সাহিত্যকর্ম এবং ব্যক্তিজীবনের চরম বেদনাদায়ক অধ্যায় বাংলা সাহিত্যের অনুসন্ধিৎসু পাঠকের কাছে আগ্রহের বিষয় ছিল। মামা মারা যাবার পরে আমার মায়ের ইচ্ছায় আমি পিএইচ.ডি করার চিন্তা করি।আমার মা তার ভাইয়ের অত্যন্ত আদরের ছোটবোন ছিলেন। মামার সাহিত্যকর্ম এদেশের মানুষের কাছে উল্লেখযোগ্যভাবে আলোচিত না হলে মা খুব কষ্ট পেতেন এবং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন। এ দেশের বড় বড় পত্রিকার সাহিত্যপাতায় প্রকাশিত বাংলা সাহিত্যের বড় বড় সমালোচক এবং গবেষকদের সমালোচনামূলক নিবন্ধ এবং গবেষণাগ্রন্থ তিনি পড়ে দেখতেন। কেউ কেউ মামার নাম উল্লেখ না করলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঘরে, চায়ের আসরে অথবা নিজ বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে এটা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন। আমি মায়ের সেই কষ্টটা বুঝতাম। একদিন তিনি আমাকে মামার কথাসাহিত্যের বিষয়ে গবেষণা করতে বললেন, যা আমার কাছে মা আদেশ করেছেন বলে মনে হয়েছে।
শামসুদদীন আবুল কালামের বিষয়ে সে সময় গবেষণা করা ছিল অসম্ভব প্রায়। কারণ লাইব্রেরীতে তার লেখা বই, বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত লেখা সংগ্রহ করা বেশ দুরূহ বিষয় ছিল। কেউ তার বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য দিতে পারতেন না যেহেতু তিনি (শামসুদদীন আবুল কালাম) প্রায় ৪০ বছর ধরে ইটালীর রোমে প্রবাসজীবন যাপন করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি এবং গবেষণা করার শর্তসমূহ আমার কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে তুলনামূলকভাবে সহজ মনে হওয়াতে সেখানেই ভর্তি হয়ে কাজ শুরু করি। ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশনের ৫০০০ টাকা হিসেবে মাসিক বৃত্তি বা অনুদান এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পর্যায়ক্রমে তিন বছরের ছুটির অনুমোদন লাভ করি । প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাঙলা কলেজের বাংলা বিভাগ থেকে ২০০৬ এর মাঝামাঝি সময়ে বিমুক্ত হয়ে তখন থেকে কাজ শুরু করি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার মা ২০০৮ এর জানুয়ারি মাসের ২৫ তারিখে হঠাৎ মারা যান। এতে আমার সমস্ত উৎসাহ উদ্দীপনা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এর মধ্যে ২০০৮ এ আমি প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে ইডেন কলেজে পদায়ণ লাভ করি, জয়েন করে ইউনিভার্সিটি ফেলোশিপের বৃত্তিসহ ছুটি ত্যাগ করে সেপ্টেম্বর মাসে জয়েন করে কর্মরত অবস্থায় পিএই্চ.ডির কাজটি সুসম্পন্ন করার চেষ্টায় নিয়োজিত থাকি। ইতোমধ্যে ২৮ আগস্ট মাস ২০১১সালে আমার ছোট ভাই যাত্রাবাড়ী থেকে হারিয়ে যায়, যাকে আজও ফিরে পাইনি। ২০১৩র জানুয়ারি মাসের ১৫তারিখে ঢাকার উত্তরায় আমার সর্বকনিষ্ঠ ভাই আততায়ীদের উপর্যুপরি ছুরির আঘাতে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়। এই সমস্ত দেখেশুনে আমার আর একটি ভাই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পারিবারিক এই বিষয়গুলি পিএইচ.ডির এই অভিসন্দর্ভ প্রকাশে আমাকে নিঃস্পৃহ করে তোলে। ১২ বছর পরে পারিবারিক রাহুগ্রস্ত অবস্থার সমাপ্তি হলে এবার আমার কর্মজীবনের সমাপ্তিকালে এই অভিসন্দর্ভটিকে আলোর মুখে আনার ইচ্ছে প্রকাশ করলে অনুপ্রাণনের কর্ণধার আবু মোহাম্মদ ইউসুফ ভাই সানন্দে গ্রন্থটি প্রকাশের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
শামসুদদীন আবুল কালামের কন্যা ক্যামেলিয়ার কাছে অসংখ্য অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি আছে যা এখনও প্রকাশিত হয়নি। শামসুদদীন আবুল কালামের একমাত্র জামাতা জনাব এ বি মঞ্জুর রহিম ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র সচিব এবং তৎকালীন সময়ের একজন রাষ্ট্রদূত। ২০০৫ এ তিনি জার্মানির রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এখন তিনি কানাডার ক্যালগারিতে অবস্থান করছেন।
শামসুদদীনের কথাসাহিত্য: জীবনবোধ ও শিল্পরূপ শিরোনামের অভিসন্দর্ভের জন্য ২০১১ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে ডক্টর অব ফিলজফি উপাধি প্রদান করে আমাকে সম্মানিত করেছে। আমার গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের আমার শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক ড. সৌদা আখতার। পরীক্ষা পরিষদের সভাপতি এবং পরীক্ষক ছিলেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. সৈয়দ আকরাম হোসেন। এ ছাড়াও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শিপ্রা দস্তিদার ছিলেন আমার পরীক্ষক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দানীয়ুল হক স্যারের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, তিনি এ বিভাগে ভর্তি থেকে শুরু করে সব সময় গবেষণার অগ্রগতি বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে কাজটি সুসম্পন্ন করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের সকল কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের সার্বিক সহযোগিতা বিশেষভাবে স্মরণ করার মত।
গবেষণার সময়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, ( বিশেষ অনুমতিক্রমে)। বাংলা একাডেমী, গুলশানের ইন্ডিয়ান লাইব্রেরী, ব্রিটিশ কাউন্সিল, আজিমপুর লাইব্রেরী এবং ইডেন কলেজের সমৃদ্ধ লাইব্রেরী ব্যবহার করেছি। অভিসন্দর্ভের সার্বিক মুদ্রণের দায়িত্ব পালন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম।
আমার স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম মজনুর সহযোগিতা, সহনশীলতা এ কাজটি শেষ করতে বিশেষভাবে সহায়তা করেছে। আমার দুইজন সন্তান তাদের শিক্ষা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমার মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সেজন্য আমি আসলেই অনুতাপ করছি।
ব্যক্তিগত জীবনের নানা সমস্যা এবং সীমাবদ্ধতার পরেও ড. শামসুদ্দীন আবুল কালামের কথাসাহিত্যের উপর এই গবেষণাকর্মকে আমার শ্রদ্ধেয় পরমগুরু অধ্যাপক ড. সৈয়দ আকরাম হোসেন স্যার মৌলিক এবং আঁকর গ্রন্থ হিসেবে মূল্যায়ণ করেছেন।এটা আমার পরিশ্রমের একটা পরিপূর্ণ স্বীকৃতি এবং সম্মান বলে আমি মনে করি।
বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্পের ইতিহাসে শামসুদ্দীন আবুল কালামের গল্প একটি অসাধারণ উচ্চতায় অবস্থান করে আছে, বিশেষ করে তার পথ জানা নাই গল্পটি যুগে যুগে এই দেশের সমাজবাস্তবতা এবং রাজনৈতিক চেতনার একটি উজ্জ্বল স্বাক্ষর যা বাংলা সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের জানা প্রয়োজন । এই অভিসন্দর্ভ অনুসন্ধিৎসু শিক্ষার্থীদের সহায়তা করবে বলে আমি মনে করি।
শামসুদ্দীন আবুল কালামের কথাসাহিত্য : জীবনবোধ ও শিল্পরূপ - Shamsuddin Abul Kalamer Kothasahityo : Jibonbodh O Shilporup
সম্পাদকীয়- অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা (প্রথম পর্ব)
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষে পদার্পণ করল। অনুপ্রাণনের লেখক, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী জানেন, একাদশ বর্ষ থেকে বছরের ৪টি সংখ্যাই বিশেষ সংখ্যা হিসেবে প্রকাশ করছে এবং পুরো এক বছরের চারটি সংখ্যা বস্তুত একটি বিশেষ বিষয়কেই সম্পূর্ণ করেছে।
যেমন- একাদশ বর্ষের (২০২২) চারটি সংখ্যায় চারটি ভাগে ভাগ করে বাংলাদেশের ১০০ জন নির্বাচিত কবিকে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। যে কবিদের জন্ম হয়েছে ১৯০০ সাল থেকে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। দ্বাদশ বর্ষে (২০২৩) চারটি ভাগে ভাগ করে বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকারদের নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। যে গল্পকারদের জন্ম হয়েছে ১৮৯৭ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে। উল্লেখ করা যেতে পারে, এই বিশেষ কবি ও কবিতা সংখ্যা এবং গল্পকার ও গল্পসংখ্যার প্রতিটি প্রবন্ধের বিন্যাসে কবি অথবা গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য কবিতা অথবা গল্প এবং তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে এটা স্পষ্ট হয়, গত দুই বছরে আমরা যে ১০০ জন বাংলাদেশের কবি ও যে ১০০ জন বাংলাদেশের গল্পকার নির্বাচিত করেছি তাদের হাত ধরেই বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি রচিত হয়েছে।
বিগত একাদশ ও দ্বাদশ বর্ষে অনুপ্রাণনের হাতে নেওয়া উল্লিখিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতার পথ ধরে এসে ত্রয়োদশ বর্ষে (২০২৪) সাম্প্রতিকের ১০০ জন কবিকে নির্বাচিত করেছে যাদের জন্ম ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের দুটি দশকে। একইভাবে চারটি ভাগে ভাগ করে নির্বাচিত এই ১০০ জন কবিকে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশের প্রথম পর্ব হিসেবে ২৫ জন কবিকে নিয়ে অনুপ্রাণনের চলতি সংখ্যা; অর্থাৎ সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো।
গত দুই বছর প্রকাশিত ত্রৈমাসিকের সম্পাদকীয়তে আমরা বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেছি কারা বাংলাদেশের কবি ও গল্পকার এবং কীভাবে আমরা সেই ১০০ জন কবি অথবা ১০০ জন গল্পকার নির্বাচন করেছি। ভুল বোঝার কোনো অবকাশ নেই, বাংলাদেশের সাহিত্য সারাবিশ্বে বসবাসকারী বাঙালি রচিত বাংলা সাহিত্যেরই অংশ যেখানে জাতীয় ও বৈশ্বিক চেতনার মেলবন্ধন হয়েছে। বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য- বাংলা সাহিত্যের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানুষের মুক্তি সংগ্রামের বৈশিষ্ট্য ধারণ করেই বিকশিত। তথাপি ধ্রুপদি সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য ভাষার সাহিত্য থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি। আধুনিক বৈশ্বিক ধারা ও রীতির ধ্রুপদি কবিতা রচনার বিষয়টি সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কবিদের কবিতায় আরও বেশি করে বিকশিত হতে আমরা দেখি।
পাকিস্তানি শাসকদের কুচক্রের কারণে বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে ছিল। স্বাধীন হওয়ার এক দশক পর অর্থাৎ ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যাপক বৃদ্ধি পেতে থাকে। পশ্চিমে বাংলাদেশের শক্তিশালী ডায়াসপোরা গড়ে ওঠার ফলে সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কবিরা বিদেশি সাহিত্যিক ও সাহিত্যের সঙ্গে আরও অধিক পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এর প্রভাব বাংলা কবিতায় দৃশ্যমান।
বাংলাদেশ একদিনে সৃষ্টি হয়নি। বহু বিস্ফোরণোন্মুখ রাজনৈতিক ঘটনা ও দেশের সাধারণ মানুষের জীবনদানের ভেতর দিয়ে তা ধীরে ধীরে একটা রূপ পেয়েছে। সেই জন্যই হয়তো বাংলাদেশের বেশির ভাগ কবির কবিতায় মেধার তুলনায় আবেগ ও উচ্ছ্বাস বেশি লক্ষ করা যায়। যে দেশকে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে বারবার যেতে হয়েছে সেই দেশের কবিতায় সেসব ঘটনা থেকে উৎসারিত আবেগ ও উচ্ছ্বাসের ছাপ থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আটের দশকের পর থেকে বাংলাদেশের কবিতা বাঁক নিতে শুরু করে। ক্রমে ক্রমে কবিতা সমষ্টির জায়গা থেকে ব্যক্তির জায়গায় সরে আসতে দেখা যায়। ব্যক্তির নিজস্ব আলো ও অন্ধকার, বিচ্ছিন্নতা, কেন্দ্রহীনতা ও নৈঃশব্দ্য প্রকাশিত হতে থাকে।
সাম্প্রতিকের কবিরা মুক্তিযুদ্ধের সময় শিশু ছিলেন। তাদের সেভাবে দেখতে হয়নি বাঙালি জাতিসত্তার উন্মেষ, ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য জাতির লড়াই, গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ভিন্নমতের অস্থিরতার ভেতর দিয়ে গেছে। স্বৈরাচারী শাসককে মেনে নিতে হয়েছে প্রায় দুই দশক। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, পরবর্তীকালে আধা-গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থার উন্মেষ, পুঁজি গঠনের প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের রাজনৈতিক-অর্থনীতির প্রভাব পড়েছে সাম্প্রতিক কবিতায়।
একদিকে নগর ও নগরায়ন, অন্যদিকে দেশের ভৌত কাঠামোর উন্নয়ন যা শহর ও গ্রামের দূরত্ব কমিয়েছে। এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে ডিজিটালাইজেশন যুক্ত হয়ে সাম্প্রতিক কবিদের কবিতাকে প্রভাবিত করেছে যা বেশ লক্ষণীয়। ফলে, যে আবেগ ও উচ্ছ্বাস পঞ্চাশ, ষাট, সত্তরে এমনকি আশি ও নব্বইয়ের দশকেও দেখা যাচ্ছিল তা অনেকটাই স্তিমিত হতে দেখা গেছে সাম্প্রতিক কবিদের কবিতায়। সাম্প্রতিক কবিদের একটা বড় অংশের মধ্যেই আমরা পাই অনুচ্চকিত, শান্ত ও সংহত আবেগের পাশাপাশি নির্মেদ মেধার ব্যবহার। তবে উচ্ছ্বাসময় কবিতা যে সাম্প্রতিক লেখা হয়নি, তা নয়। কারও কারও কবিতাতেই আবেগের আতিশয্য রয়েছে, রয়েছে কথার ফেনা, কিন্তু একটা বড় অংশের মধ্যে যা নেই তা হলো তারল্য, উচ্ছ্বাস অথবা প্রক্ষোভ।
সাম্প্রতিক সময়ের কবিদের অনেকেই ছন্দে লিখতে পছন্দ করেন, লেখেনও। প্রচলিত ছন্দের বাইরে আগেও লেখা হয়েছে, সাম্প্রতিক কবিরাও লিখেছেন। তবে, সাম্প্রতিকের কবিদের একটা বড় অংশ ছন্দের বাইরে দাঁড়িয়ে কবিতা লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন বলে প্রতিভাত হয়। সাম্প্রতিক এসব বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ নিয়েই থাকছে অনুপ্রাণনের সাম্প্রতিক কবি ও কবিতা সংখ্যার চারটি পর্ব।
Quarterly Anupranan 13th Year 1st Issue, Samprotiker Kabi O Kobita- 1st Part
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.












There are no reviews yet.