Additional information
| Weight | 0.650 kg |
|---|---|
| Published Year |
$ 2.94
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার দ্বিতীয় পর্ব—সম্পাদকীয়
প্রকাশিত হয়েছে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা—সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার দ্বিতীয় পর্ব। অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিকের ১০০ গল্প ও গল্পকার আয়োজনের এটা দ্বিতীয় পর্বের প্রকাশনা। ইতিপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকারে প্রথম পর্বে আমরা নির্বাচিত ১০০ জন গল্পকারের মধ্যে বয়স অনুক্রমে জ্যেষ্ঠ থেকে কনিষ্ঠ এবং লেখা প্রাপ্যতার ভিত্তিতে ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি তাদের একটি করে উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা প্রকাশ করেছি। একইভাবে এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে নির্বাচিত ১০০ জন সাম্প্রতিকের গল্পকার থেকে বয়স অনুক্রমে জ্যেষ্ঠ থেকে কনিষ্ঠ এবং লেখা প্রাপ্যতার ভিত্তিতে আরও ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি তাদের একটি করে উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা।
সাম্প্রতিকের গল্পের বিষয় ও বৈশিষ্ট্যে বাঁকবদল এবং বিশেষ করে গল্পে উত্তর-আধুনিক প্রবণতা নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হয়েছে, লেখালেখি হচ্ছে। উত্তর আধুনিক সাহিত্য, বিশেষ করে উত্তর-আধুনিক ছোটগল্পের বিষয় ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে স্বতন্ত্র এবং অধিকাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য বয়ান, সুনিশ্চিত বর্ণনা পাওয়া কঠিন। তাছাড়া উত্তর-আধুনিক প্রবণতা বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত। কোনো কোনো সময় এই প্রবণতার মধ্যে ভূতের মতো পেছনে হাঁটার অর্থাৎ পশ্চাদপদতার ভূত সওয়ার হতেও দেখা যায়।
উত্তর-আধুনিক গল্পে প্রায়শই ক্ষমতা, আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এটি রাষ্ট্রীয়, সামাজিক বা পারিবারিক হতে পারে। ব্যক্তি কীভাবে একটি নির্দিষ্ট সিস্টেম বা কাঠামোর মধ্যে শৃঙ্খলিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়, গল্পগুলোতে তা দেখানো হয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক বন্দোবস্তের চাপ কীভাবে মানুষের মনন ও আচরণকে প্রভাবিত করে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে গল্পগুলোতে প্রস্ফুটিত হয়েছে। প্রচলিত বাস্তবতার বাইরে গিয়ে মানুষের মানসিক ও অস্তিত্বের গভীর জটিলতা, দ্বিধা ও সংঘাতকে তুলে ধরা হয়েছে। আধুনিক সমাজে ব্যক্তি কীভাবে বিচ্ছিন্ন ও অসহায় বোধ করে, বা কীভাবে ব্যক্তি তার চারপাশের সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে লড়াই করে, তা উত্তর-আধুনিক গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দেখা যায়। তাছাড়া গল্পে ঘটনার ক্রম প্রায়শই অ-রৈখিক অর্থাৎ ধারাবাহিক না হয়ে খণ্ডিত ও বিক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। রূপ ও আঙ্গিকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে যেখানে গল্প বলার ধরন ও ভঙ্গিতে নতুনত্ব আনা হয়েছে। প্রচলিত ধারা বা কাঠামোর বাইরে গিয়ে পরীক্ষামূলক আঙ্গিক ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো কোনো গল্পে একটি একক ও সম্পূর্ণ আখ্যানের পরিবর্তে, খণ্ডিত আখ্যান কাঠামোতে গল্পগুলো অনেক সময় খণ্ড খণ্ড অংশ নিয়ে গঠিত হতে দেখা গেছে যা পাঠককে নিজস্বভাবে একটি অর্থ সৃষ্টি করতে উৎসাহিত করতে পারে। তাছাড়া উত্তর-আধুনিক গল্পে ঐতিহ্যগত কাঠামোর ভাঙন ঘটতে দেখা যায় যেমন কোন একটি নির্দিষ্ট প্লটের অনুপস্থিতি। উত্তর-আধুনিক গল্পগুলোতে বাস্তবতার নতুন ব্যাখ্যা অর্থাৎ প্রচলিত বা বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতার বাইরে গিয়ে এক নতুন ও ভিন্ন বাস্তবতাকে উপস্থাপন করতে দেখা গেছে, যেখানে মনস্তাত্ত্বিক বা প্রতীকী দিকগুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। একে অপরকে ছাড়া এগুলোর অস্তিত্ব থাকতে পারে না। শিল্প-সাহিত্য যেমন মানুষের আবেগ, চিন্তাভাবনা ও অভিজ্ঞতার সৃজনশীল প্রকাশ, অন্যদিকে সংস্কৃতি হলো একদল মানুষের ভাগ করা জীবনযাত্রার মধ্যে রয়েছে তাদের ঐতিহ্য, বিশ্বাস, সভ্যতা, জীবনযাত্রা, মূল্যবোধ ও রীতিনীতি। শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত হয় এবং সংস্কৃতি শিল্পকে অর্থ ও দিকনির্দেশনা দেয়। শিল্প ও সংস্কৃতির মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক দেখায় যে মানুষ কীভাবে তাদের পরিচয় প্রকাশ করে এবং কীভাবে তারা জীবনযাপন করে। সংস্কৃতি থেকেই শিল্প-সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। প্রতিটি সমাজ নিজস্ব শিল্প-সাহিত্যের রূপ সৃষ্টি করে—চিত্রকলা, সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য, স্থাপত্য ও কারুশিল্প- যা তার ইতিহাস ও পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করে। উদাহরণস্বরূপ, ধ্রুপদি নৃত্য ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে লোকগান গ্রামীণ জীবনের আনন্দ ও দুঃখকে প্রতিফলিত করে। একইভাবে, বিভিন্ন দেশের শিল্প-সাহিত্য তাদের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য দেখায়। শিল্প ও সাহিত্যের মাধ্যমেই মানুষ তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেয়।
সংস্কৃতি আমাদের শিল্প ও সাহিত্যকে বোঝার এবং মূল্য দেওয়ার ধরনকেও প্রভাবিত করে। একটি সমাজ যাকে সুন্দর বা অর্থবহ বলে মনে করে তা অন্য সংস্কৃতিতে ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, উপজাতীয় শিল্প সম্প্রদায়ের জীবন প্রকৃতির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, অন্যদিকে আধুনিক শিল্প প্রায়শই ব্যক্তিগত আবেগ ও সংগ্রাম প্রকাশ করে। এটি দেখায় যে শিল্প ও সাহিত্য কেবল একটি ব্যক্তিগত সৃষ্টি নয় বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পণ্যও। একই সঙ্গে, শিল্প সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতাকে প্রভাবিত করে। এটি মানুষের ধারণা পরিবর্তন করতে পারে, সামাজিক আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং ঐক্য তৈরি করতে পারে। শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা তাদের কাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা, শান্তি প্রচার করতে এবং মানবিক মর্যাদা উদযাপন করতে ব্যবহার করেন। এইভাবে, শিল্প ও সাহিত্য সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং রূপান্তরের জন্য একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। যখন মানুষ গল্প, সংগীত বা চিত্রের মাধ্যমে শিল্প অনুভব করে তখন তারা আবেগ এবং ধারণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় যা তাদের সংস্কৃতিকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে। তাই শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক— প্রতিফলিত ও গতিশীল উভয়ই। শিল্প ও সাহিত্য যে সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত সেখানে তার প্রতিফলন ঘটায় এবং একইসঙ্গে সংস্কৃতি শৈল্পিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিকশিত হয়। পারস্পরিকভাবে তারা মানবতাকে তার অতীত সংরক্ষণ করতে, তার বর্তমান বুঝতে এবং তার ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে সহায়তা করে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের যোগসূত্রের সেতু ভাঙার যারা আয়োজন করতে চায় তারা জাতির শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির কোনো না কোনো অঙ্গ পঙ্গু করার অপকর্মটাই করতে চায়।
| Weight | 0.650 kg |
|---|---|
| Published Year |
সম্পাদকীয়-
মহান একুশে- আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও এক দুঃখিনী বর্ণমালার ইতিহাস
বাংলা ভাষা ও বাংলা বর্ণমালার উদ্ভব ও বিবর্তনের একটি স্বতন্ত্র ও মৌলিক ইতিহাস রয়েছে। আমরা জানি যে, প্রাচীন কাল থেকে পাঁচটি স্তর পার হয়ে আধুনিক বর্ণমালা এসেছে। প্রাচীনকালে কোনো বর্ণমালা ছিলো না। গাছপালা-মানুষ-প্রাণী’র ছবি এঁকে মনের ভাব প্রকাশ করা হতো। এটা হচ্ছে বর্ণমালার প্রথম স্তর- “গ্রন্থিলিপি”। আনুমানিক দশ-বারো হাজার বছর আগে মানুষ গ্রন্থিলিপি দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করতো। এরপর এলো “ভাবলিপি”- সম্পূর্ণ ছবি না এঁকে সংকেত বা চিহ্ন বা প্রতীকের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম। ভাবলিপি ছিলো অনেকটা এমন- দিন বোঝাতে পূর্ণ বৃত্ত, অর্থাৎ সূর্য আঁকা হতো, আর রাত বোঝাতে অর্ধ বৃত্তের সাথে তারকা আঁকা হতো। এরপর এলো তৃতীয় স্তর- “শব্দলিপি”, এই স্তরে ব্যাপক হারে ছবির বদলে চিহ্নের ব্যবহার হতে লাগলো। শব্দলিপি আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে এলো চতুর্থ স্তর- “অক্ষরলিপি”। অক্ষরলিপি আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে পঞ্চম স্তর হিসেবে এলো “ধ্বনিলিপি”। এই ধ্বনিলিপি থেকেই আধুনিক বর্ণমালার উৎপত্তি। সেই সময় বিভিন্ন বর্ণে বা রঙে বিভিন্ন অক্ষর লিখা হতো, সেখান থেকেই অক্ষরের নাম হয়েছে বর্ণ, বর্ণমালা।
আমাদের বাঙলা বর্ণমালা এসেছে প্রাচীন ভারতীয় “ব্রাহ্মীলিপি” থেকে। পৌরাণিক উপ-কথামতে হিন্দু দেবতা ব্রহ্মা ভারতবর্ষের প্রাচীন লিপি আবিষ্কার করেছিলেন এবং ধ্বনির সাথে মানুষকে এই লিপি দান করেছিলেন, তার নামানুসারে ঐ লিপির নাম হয় ব্রাহ্মীলিপি। কেউ কেউ বলেন, বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণরা ছিলেন শ্রেষ্ঠ পুরোহিত। ব্রাহ্মণদের দ্বারা এই লিপি আবিষ্কৃত হয়েছিল বলেই এর নাম ব্রাহ্মীলিপি। যে যাই বলুক, ভারতবাসী নিজেরাই সৃষ্টি করেছিলেন ব্রাহ্মীলিপি। ব্রাহ্মীলিপির পেছনে ফিনিশীয় লিপির প্রভাব আছে বলে দাবী করা হয়। তবে প্রাচীন ভারতীয়রা সম্ভবত স্বাধীনভাবেই নিজেদের লিপি উদ্ভাবন করেছিল- কারণ ফিনিশীয় লিপির চেয়ে ব্রাহ্মীলিপির পার্থক্য অনেক। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতক থেকে ৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে ব্রাহ্মীলিপি প্রচলিত ছিল। এরপর “অশোক লিপি” বা “মৌর্য লিপি”তে এর বিবর্তন শুরু হয়। এর পরের ধাপে আসে “কুষাণ লিপি”, এগুলি কুষাণ রাজাদের আমলে প্রচলিত ছিল। এরপর ব্রাহ্মীলিপিটি উত্তরী ও দক্ষিণী- এই দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়। উত্তরী লিপিগুলির মধ্যে পূর্বদেশীয় গুপ্তলিপি প্রধান, এটি ৪র্থ ও ৫ম শতাব্দীতে প্রচলিত ছিল। গুপ্তলিপি থেকে আবির্ভাব হয় “কুটিল লিপির”, এটি ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শতক পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। কুটিল লিপি থেকে উদ্ভব হয় নাগরী লিপির। প্রাচীন নাগরী লিপির পূর্ব শাখা থেকে ১০ম শতকের শেষভাগে এসে উৎপত্তি হয়েছে বাঙলা লিপির। অর্থাৎ ব্রাহ্মীলিপি > অশোক লিপি বা মৌর্য লিপি > কুষাণ লিপি > উত্তরী গুপ্তলিপি (পূর্বদেশীয়) > কুটিল লিপি > নাগরী লিপি > বাঙলা লিপি।
ব্রাহ্মীলিপি থেকে সৃষ্ট বাঙলা বর্ণমালা দেখতে কিন্তু এখনকার বর্ণমালার মতো ছিলো না, সময়ের পরিবর্তনে বর্ণ’র চেহারারও পরিবর্তন হয়েছে। তখন যেহেতু ছাপাখানা ছিলো না, শুদ্ধতা বজায় থাকবে কী করে? তখন মানুষ হাতে কাব্য লিখতো, পুঁথি লিখতো। একেকজনের হাতের লেখা একেকরকম, দশজন দশরকম করে “ক” “খ” লিখেছে। এভাবেই পরিবর্তিত হতে হতে পাল্টে গেছে বাঙলা বর্ণমালা। কম্বোজের রাজা নয়পালদেবের ইর্দার দানপত্রে এবং প্রথম মহীপালের বাণগড়ের দানপত্রে সর্বপ্রথম আদি বাংলা বর্ণমালা দেখতে পাওয়া যায়। ব্রাহ্মীলিপি’র প্রথম পাঠোদ্ধার করেন প্রাচ্যবিদ্যা-বিশারদ প্রিন্সসেপ। আমাদের দেশের সিলেটের উপভাষারও কিছু বর্ণমালা ছিলো, আধুনিক বাঙলা বর্ণমালা থেকে একটু আলাদা, প্রায় অবিকৃত ‘নাগরী লিপি’র মতো।
এখন পর্যন্ত তিন ধরনের ব্রাহ্মীলিপির নমুনা আবিষ্কৃত হয়েছে, যাতে ৪৪টি বর্ণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে স্বরবর্ণ ৯টি, ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৫টি। বাঙলা বর্ণমালার “ঔ” ও “ঋ” ব্রাহ্মীলিপির স্বরবর্ণে না পাওয়া গেলেও ব্যঞ্জনবর্ণে এ দুটি বর্ণের নমুনা পাওয়া গেছে। আমরা এখন যে কয়টি স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ দেখি, আগে এর চেয়ে কয়েকটি বেশি ছিলো। এই তো কিছুদিন আগেও স্বরবর্ণতে ৯ ছিলো, এখন আর ৯-এর অস্তিত্ব নেই। এর সাথে ছিলো ঋৃ। ব্যঞ্জনবর্ণতে ছিলো ল (মূর্ধন্য ল), ছিলো হ্ল (মহাপ্রাণ ল), ছিলো ব (অন্তঃস্থ ব)। যুগে যুগে বাঙলা বর্ণমালার আকার-আকৃতি বদলাতে বদলাতে মুদ্রণযন্ত্রের ঢালাই ধাতুতে তৈরি বর্ণের কল্যাণে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা বর্ণমালার স্বরূপ মোটামুটি স্থির রূপ পায়।
বাংলা বর্ণমালা একসময় ব্রাহ্মীলিপি থেকে উদ্ভূত হলেও মধ্যযুগে এসে বাংলা বর্ণমালা বাংলার স্বাধীন শাসন ব্যবস্থার মতোই স্বতন্ত্র পথ ধরে বিবর্তিত হয়ে নিজস্ব একটি মৌলিক রূপ পরিগ্রহ করে। বাংলা বর্ণমালার এসব বিবর্তনের ইতিহাসের মধ্যেও বাংলার স্বাধীন পরিচয় নির্মাণ ও পরিগ্রহণের আকাক্সক্ষা সম্পৃক্ত রয়েছে।
অথচ ১৯৪৭-এর পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের অপরাপর প্রাদেশিক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ সিন্ধি, বেলুচি, পাঞ্জাবি ও পশতু ভাষার বর্ণলিপির মতোই বাংলা বর্ণমালা পরিবর্তন করে ফারসি-আরবি অথবা ল্যাটিন বর্ণমালা ব্যবহার করে লেখার পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। বাংলা ভাষা ও বাংলা বর্ণমালা তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর ভাষা ও ভাষায় ব্যবহৃত বর্ণমালা হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যালঘু ভারতীয় মুসলমান অভিজাত শ্রেণির ভাষা ও বর্ণমালা অর্থাৎ উর্দুকেই এবং ফারসি-আরবি লিপিকেই পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ও বর্ণমালা হিসেবে চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। পাকিস্তানের সিন্ধ, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও উঃ পঃ সীমান্ত প্রদেশে এখনও শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাদেশিক ভাষা স্থান করে নিতে পারেনি। পাকিস্তানের এরকম অসভ্য, আধিপত্যবাদী, অমানবিক এবং অন্যায় পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বাঙলায় গর্জে ওঠে প্রতিবাদ কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে বাঙালির এই দাবি এবং প্রতিবাদের যুক্তি অনুধাবন করার চেষ্টা গ্রহণ না করে তৎকালীন পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বুলেটের মাধ্যমে জবাব দেওয়ার পথ গ্রহণ করে। বুকের রক্ত দিয়ে সেদিন বাঙালি তাদের মাতৃভাষা ও বর্ণমালার অধিকার আদায় করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং এই বাঙলায় বাঙলা ভাষা ও বর্ণমালা ব্যবহারের দাবি মেনে নিতে পাকিস্তানি শাসকদের বাধ্য করেছিল। এটাই ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস।
সভ্যতা, মানবতা ও ন্যায়ের পক্ষে ১৯৫২ সনে বাঙালির এই ভাষা সংগ্রাম প্রতিষ্ঠিত মানবিকতার ন্যায্য যুক্তির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে পরিচালিত ছিল বলেই এই আন্দোলন সারা বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে আজ পৃথিবীতে প্রত্যেক মাতৃভাষার মর্যাদাবোধ জাগ্রত হয়েছে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালনের জন্য জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভ করেছে।
সপ্তম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
সম্পাদকীয়-
শিল্পী গোষ্ঠীর সমাজ-সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন
শিল্পী ও সাহিত্যিকদের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধভাবে একমাত্র নান্দনিক সৃজনের ঘেরাটোপে বন্দী না থেকে সমাজে বসবাসের শর্তাবলী ও পরিবেশ একজন শিল্পী ও সাহিত্যিক’কে অন্য যে কোন সচেতন নাগরিকের মতোই একান্তভাবে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে উৎসারিত ও গৃহীত সকল মতামত প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে তাঁর কাজে প্রকাশ করতে দেখা যেতে পারে। বিশেষতঃ একজন শিল্পী ও সাহিত্যিক পরিবেশ ও সমাজের ক্ষেত্রে গভীরভাবে সংবেদনশীল হওয়ার কারনে তাদের সৃজনশীল কাজে ও রচনায় সমাজের রীতি-নীতি, অর্থনীতি ও রাজনীতির ভাল-মন্দ এবং দোষ-গুণের প্রতিফলন থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না বরঞ্চ এই থাকাটাই যেন স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্র মত প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা রকম সীমা বেঁধে দেয়। এসব সীমার মধ্য থেকেই শিল্প চর্চার বিভিন্ন মাধ্যম ও অবলম্বনের সাহায্য নিয়ে একজন শিল্পী অথবা সাহিত্যিকের যেমন প্রচ্ছন্নভাবে নিজের মতটি প্রকাশ করার প্রচেষ্টা থাকে তেমনই আবার শিল্পী-সাহিত্যিকবৃন্দ দ্রোহী হয়ে মত প্রকাশের ফলে রাষ্ট্রের অথবা কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর কোপানলে পড়ে নির্যাতিত হওয়া এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হাতে তাদের সহিংস আক্রমণের শিকার হতেও আমরা দেখেছি।
তাই, এখানে প্রশ্ন এটা নয় যে, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের সৃজনশীল কাজে ও রচনায় সমাজের রীতি-নীতি, পরিবেশ, অর্থনীতি ও রাজনীতির ভাল-মন্দ এবং দোষ-গুণ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ অথবা প্রচ্ছন্নভাবে তাদের ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন থাকবে কি-না? বাস্তবে প্রশ্নটা হচ্ছে সামাজিক-রাজনৈতিক এবং পরিবেশগত সমস্যা সম্পর্কে রাষ্ট্র ও জনগণকে সচেতন করা এবং সেসব সমস্যা দূর করার জন্য সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিল্পী ও সাহিত্যিকদের ভূমিকা কীভাবে নির্ধারিত হবে? বরঞ্চ, প্রশ্নটা দুটো হচ্ছে-
ক. শিল্পী ও সাহিত্যিকবৃন্দ নিজেরাই কোন সামাজিক সংগঠন করবে কি-না অথবা পেশাজীবীদের অন্য কোন বৃহত্তর সামাজিক সংগঠনে সম্পৃক্ত হবে কি-না? এবং
খ. স্রেফ শিল্পীদের নিজস্ব অথবা অন্য কোন বৃহত্তর সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে সমাজের কোন ন্যায্য দাবী অথবা সমাজের কোন বাস্তব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পরিচালিত রাজপথের আন্দোলনে ফেস্টুন-ব্যানার নিয়ে নিজেরা সম্পৃক্ত হবে কি-না? এবং
গ. যদি শিল্পী ও সাহিত্যিকবৃন্দ নিয়মিতভাবে কোন সামাজিক সংগঠনমূলক কার্যক্রমে সক্রিয় হয়ে যায় এবং সামাজিক ইস্যুতে রাজপথের আন্দোলনে নেমে পড়ে অথবা সরাসরি কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হয়ে যায় তাহলে সময় ও মনোসংযোগ দ্বিধান্বিত হয়ে বাধা পড়ে শিল্প ও সাহিত্য চর্চার মান ও গুণাগুণের ক্ষেত্রে শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা কোন ক্ষতি বা সমস্যার সম্মুখীন হবে কি-না?
এখানে উল্লেখ্য যে, অন্য সামাজিক সংগঠনের আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা অথবা সংহতি প্রকাশ, ঘড়ে বসে শিল্পী-সাহিত্যিকদের নিজস্ব সংগঠন করা অথবা ফেস্টুন ব্যানার নিয়ে রাজপথে নেমে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া ইত্যাদী নানা উপায়ে একজন শিল্পী অথবা সাহিত্যিকের পক্ষে সামাজিক আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। একজন শিল্পী অথবা সাহিত্যিক সামাজিক আন্দোলনের সাথে কীভাবে যুক্ত হবেন সেটা একান্তভাবেই তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এবং এটাও বাস্তব সত্য যে একজন সংবেদনশীল ও সচেতন শিল্পী অথবা সাহিত্যিক ন্যায্য দাবী ও বক্তব্য নিয়ে পরিচালিত চলমান সামাজিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আত্মকেন্দ্রিক চিন্তায় আবদ্ধ হয়ে কোনভাবেই নিষ্ক্রিয় এবং নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না।
১৯৬৯ এর গণভ্যুত্থান অথবা ১৯৭১ এর মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলিতে শিল্পী সমাজের সদস্যবৃন্দকে সংগঠিতভাবে ফেস্টুন-ব্যানার নিয়ে আন্দোলনে-সংগ্রামে-মিছিলে যুক্ত হতে আমরা দেখেছি। ৭১’এর স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে এমনকি প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে নিয়ে শিল্পী ও সাহিত্যিকদের মুক্তিযুদ্ধে সংযুক্ত হতে আমরা দেখেছি। এর পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা বিভিন্নভাবে সংগঠিত হয়েছেন। এসব আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র।
স্বাধীনতার পর শিল্পী ও সাহিত্যিকদের যেসব সংগঠন গঠিত হয়েছে সংগঠনভেদে সেগুলোর মূল লক্ষ্যই ছিল জোটবদ্ধভাবে শিল্প চর্চা, আলোচনা-সমালোচনা, শিল্পের প্রচার-প্রসার, পরোক্ষভাবে ব্যক্তির প্রচার ও প্রসারলাভের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা থেকে বিপণন কৌশল অবলম্বন করা পর্যন্ত। তাছাড়া, রাষ্ট্রীয়, সরকারী অথবা বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, সংবাদ-মাধ্যম, কর্পোরেট অথবা নন-কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পদক-পুরস্কার অথবা আনুকূল্য লাভের জন্য এসব কোন কোন ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংগঠন ও জোটের তৎপরতার সুযোগ গ্রহণ করতেও আমরা দেখেছি। শিল্প ও সাহিত্যকেন্দ্রিক নানা তৎপরতা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও এসব সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে সৃজনশীল অথবা মননশীল শিল্পগুণের মান ও রুচির উৎকর্ষতা লাভের ক্ষেত্রে এসব সংগঠন বিশেষ কোন অবদান রাখতে বিশেষ কোন সাহায্য করেছে বলে এরকম উদাহরণ পাওয়া যায় না। দলীয় অথবা ব্যক্তিগত লাভালাভের বিষয়গুলো সেখানে খুবই নগ্নভাবে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে এবং যার ফলে দেশে মাঝারী মানের শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতাই হয়েছে অত্যন্ত অধিকহারে। অন্যদিকে প্রচার, প্রসার ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে মৌলিক, মননশীল ও উচ্চতর মানসম্পন্ন শিল্প ও সাহিত্যকর্ম পাঠকদের কাছে ব্যপকভাবে পৌঁছানোর সুযোগ লাভ করতে পারেনি। এবং যার ফলে সত্যিকার প্রতিভাবান শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা হতাশা থেকে প্রচারবিমুখতা ও আত্মকন্দ্রিকতার ক্ষুদ্র গ-ির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছেন।
এছাড়া, রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্য চর্চা ও গবেষণা এবং তাঁদের সাহিত্যকর্মকে আধুনিক শিশু-কিশোর ও তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য দেশে কয়েকটি সরকারী-বেসরকারী সংগঠন কাজ করছেন। কিন্তু, রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্যকর্মের আক্ষরিক পঠন ও মুখস্থ করার উপরই এসব সংগঠনকে বেশী জোর দিতে দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের মাঝে যে মানবিক চেতনা ও যে দার্শনিক নির্যাস রয়েছে তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের সাথে অধিকহারে দেশের শিশু-কিশোর ও তরুণদের পরিচয় করিয়ে দেয়া খুব জরুরী। কেননা এতে করে দেশের নতুন প্রজন্মের মনের মাঝে মানবিক চেতনা ও সুন্দর রুচিবোধ স্থান করে নিতে পারে। এসব বিবেচনা করে রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্য চর্চা ও গবেষণার জন্য যেসকল সংস্থা ও সংগঠন কাজ করছেন সেসকল সংগঠন দক্ষতার সাথে তাঁদের কাজের পরিধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে চলুক- এটাই প্রত্যাশা করি।
প্রথম থেকেই শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, ব্যক্তি, দলীয়, গোষ্ঠী অথবা কর্পোরেট তৎপরতার বাইরে নিজের স্বাধীন অবস্থান রক্ষা করে দেশের নবীন ও তরুণ প্রতিভাবান শিল্পী ও সাহিত্যকদের পরিচ্ছন্ন ও মানসম্পন্ন শিল্প-চর্চার জন্য অনুপ্রেরনা যুগিয়ে এসেছে। সপ্তম বর্ষে পদার্পন করে ‘অনুপ্রাণন’ অবিচলভাবেই ঐ ঘোষিত পথেই তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে চায়। অনুপ্রাণন-এর মূল পৃষ্ঠপোষক অনুপ্রাণন-এর পাঠকেরাই। তাই, বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সপ্তম বর্ষে পদার্পণ করতে পেরে অনুপ্রাণন-এর লেখক এবং পাঠকেরা অবশ্যই বিশেষ অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য।
সপ্তম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা
সম্পাদকীয়, অনুপ্রাণন—নবম বর্ষ প্রথম সংখ্যা
ফেব্রুয়ারি যখন আসে তখনই আমরা আমাদের ভাষা তথা, বাঙলা ভাষা ব্যবহারের পরিধি, মান, চর্চা এবং গবেষণার ক্ষেত্র ঘিরে অপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা সমালোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি; কিন্তু ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনার পর এবং বিশেষ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৮ বছর পর আজও আমরা সারা বছর বাঙলা ভাষার সমৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য কোনো পদ্ধতিগত ও সদা চলমান কোনো কর্মসূচি প্রণয়ন করতে সক্ষম হইনি। এই অক্ষমতার কারণ আমার জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যের মাঝেই বিদ্যমান।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তিনটি ভাগে বিভক্ত–বাংলা মাধ্যম, আরবি/ফারসি মাধ্যম এবং ইংরেজি মাধ্যম। ইংরেজি অথবা আরবি/ফারসি মাধ্যমে যারা পড়াশোনা করে একটি বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে সীমিত কয়েক শ্রেণি পর্যন্ত বাঙলা ভাষা ও বাঙলা ব্যাকরণের সাথে তাদের যৎসামান্য পরিচয় ঘটে। কিন্তু সেটা দৈনন্দিন জীবনে কথ্যভাষা ছাড়া লিখিত কোনো নথি, রচনা, প্রবন্ধ অথবা প্রতিবেদন লেখার জন্য যথেষ্ট হয়ে ওঠে না। যার ফলে, সরকারি কার্যক্রম চালানোর জন্য নথিতে অথবা আইন ও বিচারব্যবস্থার কাজে ব্যবহৃত যাবতীয় আইন, আদেশ ও রায়ের সকল প্রতিবেদনে অথবা চিকিৎসা ও বিজ্ঞানচর্চার উচ্চতর স্তরে বাঙলা ভাষার ব্যবহার সঙ্কুচিত হওয়া অনেকটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। আর সেটাই হতে আমরা দেখে থাকি।
আইন ও বিচারের নথি প্রস্তুতিতে অথবা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শ্রেণি অথবা মেডিকেল শিক্ষা ও চর্চার কাজে সহজে ব্যবহৃত হতে পারে সেজন্য সহজ ও বোধগম্য শব্দ সংবলিত উপযোগী এবং পূর্ণাঙ্গ পরিভাষা কোষ তৈরি করতে আমরা এখনও সফল হইনি। এই কাজটা কঠিন কিন্তু তাই বলে কাজটা শুরুই কি হলো? আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোনো কোনো কাজ যদি হয়ে থাকে, সেটাও অত্যন্ত নগণ্য এবং অস¤পূর্ণ। একটা ক্ষুদ্র এবং অসম্পূর্ণ পরিভাষা কোষ দিয়ে কি কোনো একটি গ্রন্থ সম্পূর্ণ অনুবাদ হতে পারে? তাই আমরা আইন, বিচারব্যবস্থা, বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণার সকল ক্ষেত্রে এখনো বাঙলা ভাষার প্রচলন করতে পারিনি।
আইন, বিচারব্যবস্থা, চিকিৎসা-বিজ্ঞানসহ সকল বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে শুধু নয়, সাহিত্য ক্ষেত্রেও বিদেশি ভাষা থেকে বাঙলায় অনুবাদ এবং বাঙলা ভাষা থেকে বিদেশি ভাষায় অনুবাদের ক্ষেত্রটিও অবহেলিত রয়ে গেছে। ব্যক্তি উদ্যোগে যৎসামান্য যেটুকু হচ্ছে সেটা বাঙলা সাহিত্যকে বিদেশে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য বিন্দুসম প্রচেষ্টাই বলা যেতে পারে। বাঙলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে তোলার জন্যই উভয়বিধ অনুবাদের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি ও প্রসার ঘটানো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অথচ এটা আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা কতটুকু বোঝেন এটা জানা খুব কষ্ট। অথচ বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে তারা আপসহীন সংগ্রামী। কিন্তু জাতিকে সমৃদ্ধ করে তোলার ক্ষেত্রে ভাষার বহুমাত্রিক বিকাশ যে কতটুকু প্রয়োজনীয় সেটা তারা কী আদৌ বোঝেন?
পৃথিবীতে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ রয়েছে যাদের মাতৃভাষা বাঙলা। শুধু এই সংখ্যাটার জোরেই আমরা জাতিসংঘে অন্যান্য প্রচলিত ভাষাসমূহের পাশাপাশি বাঙলা ভাষাকেও ব্যবহারের জন্য অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করতে চাই। কিন্তু শুধু সংখ্যার জোরেই কি জাতিসংঘের কাছে এই দাবি গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব? বস্তুতপক্ষে আমরা যদি বাঙলা ভাষাকে বিশ্বের একটি অন্যতম ভাষা হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, তাহলে বাঙলা ভাষাকে উচ্চতর জ্ঞান-বিজ্ঞান, আইন ও বিচারব্যবস্থা পরিচালনার জন্য উপযোগী করে তুলতে হবে। যদি আন্তর্জাতিকভাবে বাঙলা ভাষা ব্যবহার করতে গিয়ে কোনো কোনো প্রতিশব্দের অভাবে বিকল্প হিসেবে বিদেশি ভাষাই ব্যবহার করতে হয় তাহলে কি করে আমরা বাঙলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক অথবা বহুদেশীয় কোনো ফোরামে ব্যবহারে জন্য অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হতে পারি? এই বক্তব্যের সাথে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয় মিলিয়ে ফেলা যাবে না। কেননা, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ, বাঙালির ভাষার জন্য সংগ্রাম ও আত্মদানের প্রতি সম্মান দেখানোর কারণেই সম্ভব হয়েছে। এর সাথে বহুজাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য প্রচলিত অন্যান্য ভাষাসমূহের পাশাপাশি বাঙলা ভাষাকে ব্যবহারের জন্য গ্রহণ করার সম্পর্ক নেই। এটা সফল করে তুলতে চাইলে বাঙলা ভাষার বিকাশ ও সমৃদ্ধি এবং পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিকাশ ও সমৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে।
বক্তব্যটিকে বাঙলা ভাষার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ এবং সমৃদ্ধির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রেখে বলতে চাই যে, প্রয়োজন ছিল পরিভাষা এবং অনুবাদ সাহিত্যের বিকাশ এবং সমৃদ্ধির জন্য একটি স্বতন্ত্র এবং দক্ষ ও মেধাবী সাহিত্যিক ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় পারদর্শী ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। কিন্তু বেসরকারিভাবে এই কাজটা করা সম্ভব না। এটা করতে হলে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে এবং যার জন্য চাই সরকারের সিদ্ধান্ত। কেন যে সরকার আজ অবধি এডহক-ভিত্তিতে দেশ ও জাতির জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি বাঙলা একাডেমিকেই দিয়ে রাখলো সেটা আমার বোধগম্য না।
এদিকে মাদরাসা ও ইংরেজি শিক্ষা থেকে পাস করে বেরিয়ে আসা ছাত্রদের উচ্চতর শিক্ষা এবং সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে। এ-কথা জানা সত্ত্বেও যে উচ্চতর শিক্ষায় অথবা চাকরি-জীবনে আগত এসব ছাত্ররা বাঙলা ভাষা ব্যবহার না করে অন্য বিদেশি ভাষা ব্যবহার করার প্রবণতা নিয়ে উচ্চশিক্ষা এবং চাকরিতে ঢোকে। যার ফলে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রে অথবা সরকারি প্রশাসন এবং আইন ও বিচারব্যবস্থার উচ্চতর মহলে সার্বিকভাবে বাঙলা ভাষা ব্যবহার প্রচেষ্টায় তাদের আগ্রহী হয়ে উঠতে দেখা যায় না। বরঞ্চ উল্টোটাই ঘটে। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে বিদেশি ভাষা ব্যবহার পরিহার করার প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে অনীহার ফলে একপ্রকার বাধা সৃষ্টি করতেও তাদের দেখা যায়।
ভাষার বহুমাত্রিক বিকাশ যদি না ঘটে, তাহলে বদ্ধজলের মতোই ভাষা ও একপ্রকার বন্ধ্যা অবস্থায় পতিত হয়। বিকাশ না ঘটলে যে কোনো অস্তিত্ব সঙ্কুচিত হতে থাকে এবং সঙ্কুচিত হতে হতে একসময় সেই বস্তুর অস্তিত্বই হুমকির মধ্যে পড়ে। কথ্য অথবা লিখিত ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে অস্তিত্বের এই বিনাশ শুরু হয় নানা বাঙলা শব্দ বা প্রতিশব্দের বদলে বিদেশি শব্দের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে যেটা এখন হরহামেশা ঘটছে। নাগরিক কথাবার্তায় অথবা লেখালেখিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলার বদলে আরবি অথবা ইংরেজি শব্দের ব্যবহার এখন আমরা প্রায়শই হতে দেখছি, কিন্তু তবুও আমাদের সাহিত্যিক অথবা বুদ্ধিজীবী মহলে কিংবা নীতিনির্ধারক মহলের টনক নড়তে দেখা যায় না। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই যে এটা প্রকৃত বাঙলা শব্দের অভাবে হচ্ছে, সেটা যে তা নয়। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে, এদের মন-মানসিকতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদী সচেতনতা ততোটুকু দৃঢ় নয়। এটা কেন হচ্ছে? কেন বহুসংখ্যক নাগরিক বাঙলার বদলে আরবি অথবা ইংরেজি ব্যবহারে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন?
জ্ঞান-বিজ্ঞান অথবা প্রযুক্তির উচ্চতর ক্ষেত্রে যখন বাঙলা প্রতিশব্দের অভাব হয়, তখন সম্পূর্ণভাবেই বাঙলা ভাষার বদলে ইংরেজি ব্যবহার যেন অপরিহার্য হয়ে যায়। সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে এই বাঙলায় একসময় আরবি, ফারসি অথবা উর্দু শব্দ সুকৌশলে ব্যবহার করার একটা প্রবণতা কোনো কোনো কবি-সাহিত্যিকের ক্ষেত্রে ঘটেছে, কিন্তু সেটা ছিল পাকিস্তান আমল এবং পাকিস্তানি শাসক মহলকে তোষণ করার জন্যই এটা সচেতনভাবেই করা হতো। কিন্তু এখন কেন আরবি, ফারসি, উর্দু অথবা ইংরেজি শব্দের ব্যবহার বেড়ে চলেছে। বাঙলা ভাষার বিকাশের ক্ষেত্রে যেহেতু চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে কাজ হচ্ছে না তাই বাঙলা ভাষার অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ছে এবং এর জন্য ত্রিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা শতভাগ দায়ী। তাহলে আমরা কি করতে পারি? এটা কি বলতে পারি যে, ভাষার জন্য আমাদের সংগ্রামের পরিসমাপ্তি ঘটেছে?
আমাদের একথা বুঝে নিতে হবে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাঙলা ভাষার অস্তিত্ব সুরক্ষা করা, এর বিকাশ ঘটানো এবং চলমান রাখা এবং সকল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাঙলা ভাষার সমৃদ্ধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করা চলার আন্দোলন ও সংগ্রাম, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের চাইতেও জটিল ও কঠিন। যার জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য চাই নিয়মানুবর্তিতা ও অধ্যবসায়।
খুব নীরবে হলেও বিশ্বজুড়ে ভাষার ব্যবহার এবং প্রসার নিয়ে চলছে এক তীব্র প্রতিযোগিতা। আর এই প্রতিযোগিতার পেছনে রয়েছে উন্নত রাজনীতি এবং অর্থনীতির অধিকারী দেশ ও জাতিসমূহের উৎপাদিত পণ্যসমূহের বাজার সম্প্রসারণ করার সম্প্রসারণবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা। যেসব পরিকল্পনাকে তারা কোনো কোনো সময় তাদের নিজ জাতি ও দেশের সুরক্ষা নীতির অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে বলে প্রচার করে থাকে। এসব পরিকল্পনার বিষয় আমাদের বুঝতে হবে। ভাষা, যা কিনা শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, চিত্র ও চলচ্চিত্রের বাহক সেগুলো তারা ছড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্বব্যাপী এবং স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তাদের তৈরি সাহিত্য, সংগীত ও চলচ্চিত্রের বাজার ক্রমেই সম্প্রসারিত করে চলেছে। আমাদের দেশেই বিদেশিদের বিদেশি ভাষার বই এবং চলচ্চিত্রের যে বাজার রয়েছে, সে তুলনায় আমাদের বাঙলা সাহিত্য অথবা চলচ্চিত্রের বিদেশি বাজার নিতান্তই ক্ষুদ্র। এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আমরা যদি আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও চলচ্চিত্রের বিদেশি বাজার সৃষ্টি না করতে পারি এবং সেসব বাজার সম্প্রসারিত না করতে পারি, এই প্রতিযোগিতার কোনো ভবিষ্যৎকালে একদিন আমাদের প্রাণপ্রিয় বাঙলা ভাষাই বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে।
সারা বিশ্বে নানা দেশে ছড়িয়ে প্রায় সোয়া কোটি বাঙালি রয়েছে। যাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম ক্রমেই বাঙলা ভাষা ব্যবহারের সীমিত সুযোগ পাওয়াতে বাঙলা ভাষা, সংগীত অথবা চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এইভাবে চলতে থাকলে প্রবাসী বাঙালি সমাজে বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিলোপ ঘটবে এবং তারা মানসিকভাবে স¤পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। প্রবাসী বাঙালিদের ব্যক্তি উদ্যোগে গুটিকয়েক বাঙলা ভাষা শিক্ষা স্কুল এবং সংগীত বিদ্যালয় আছে, যা কি-না প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আমাদের বিদেশি দূতাবাসগুলো এই ব্যাপারটাই নজর দেয়ার একটা বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে এবং বিদেশে বিশেষ করে যে সকল শহরে অধিক সংখ্যায় প্রবাসী পরিবার রয়েছে সেখানে বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র এবং পাশাপাশি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। যেসব লাইব্রেরিতে বাঙলা ভাষায় রচিত অথবা বাঙলা ভাষায় অনূদিত সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প ও কলাবিভাগের গ্রন্থসমূহ এবং বাঙলা চলচ্চিত্রের একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার থাকতে পারে। পাশাপাশি বাঙলা ভাষা ও সংগীত শিক্ষার জন্য স্কুল থাকতে পারে।
আমাদের দেশে যদি ব্রিটিশ কাউন্সিল, ইউএস, রুশ অথবা ফ্রেঞ্চ কালচারাল সেন্টার থাকতে পারে, তবে প্রবাসে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে আমরা কেন ‘বাঙলা শিল্প-সাহিত্য কেন্দ্র’ নাম দিয়ে বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে তাদের পরিচিতি অক্ষুণ্ন রাখার জন্য পদক্ষেপ নিতে পারি না? এবং এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আমাদের জাতীয় বাজেটে এই কর্মসূচি গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখার কথা ভাবি না?
নবম বর্ষ প্রথম সংখ্যা
সম্পাদকীয়- দ্বাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, গল্পকার ও গল্প সংখ্যা প্রথম পর্ব।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষে পদার্পণ করেছে। ১১ বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে রয়েছে। যে অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা এখন বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে যৎসামান্য হলেও অবদান রাখার মতো কোন কাজের পরিকল্পনা গ্রহন করতে পারি। যেমন গত বছর আমরা পরিকল্পনা গ্রহন করেছিলাম বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য কবিতা এবং কবির কবিতাকর্ম নিয়ে সামগ্রিক আলোচনা চারটি সংখ্যায় সংকলিত করার। যে পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন নিজেদের সক্ষমতা মূল্যায়ণে আমাদের বিস্তর সাহায্য করেছে। কাজের মধ্য দিয়ে নিজেদের উপর আমাদের আস্থা বৃদ্ধির ফলাফল এ-বছরে বাংলাদেশের ১০০ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরষ্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য গল্প ও গল্পকারের সামগ্রিক গল্পকর্ম নিয়ে আলোচনা দ্বাদশ বর্ষের চারটি সংখ্যায় সংকলিত করার পরিকল্পনা গ্রহন। সেই পরিকল্পনার প্রথম পর্বে প্রকাশিত হলো বাংলাদেশের ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরষ্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য গল্প ও গল্পকারের কাজের উপর সামগ্রিক আলোচনা সংকলন অর্থাৎ গল্পকার ও গল্প সংখ্যা, প্রথম পর্ব।
একটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে আমরা বাংলাদেশের ১০০ জন গল্পকার নির্বাচন করেছি। প্রথমতঃ আমরা বিবেচনা করেছি আধুনিক বাংলা ভাষায় চর্চাকারী গল্পকার যাঁর জন্ম বাংলাদেশে অথবা যিনি তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময়ই বাংলাদেশে বসবাস করেছেন অথবা যাঁর প্রকাশনা ও পাঠকের মূল অংশটি ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। দ্বিতীয়ত আমরা বিবেচনা করেছি যাদের জন্ম ১৮৯৫ থেকে ১৯৬৫ খৃস্টাব্দের মধ্যে। তৃতীয়তঃ আমরা বিবেচনা করেছি যে গল্পকারের গল্পে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বাংলা সাহিত্যের সাধারণ ঐতিহ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালির স্বাধীনতা এবং জনগণের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সমাজ-বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে। চতুর্থতঃ যে গল্পকারের এক বা একাধিক গল্প বাঙালি পাঠক মহলের বড় অংশে উল্লেখিত হয়েছে এবং সমাদৃত হয়েছে। শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো জাতি তথা মানবজাতির সাধারণ এবং উন্মুক্ত অধিকারের বিষয়। কোন সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো বিবেচিত না হওয়াই কাম্য। কিন্তু তারপরও কতগুলো বিষয় থেকে যায় যে বিষয়গুলো নিয়ে আপস করা কঠিন। আর তাছাড়া প্রজন্মকে কিছু বার্তা দেয়া প্রয়োজন, যে বার্তা, বক্তব্য অথবা কর্ম, সমাজে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কারা পক্ষে ছিল আর কারা বিপক্ষে ছিল? এটা মানবতার পক্ষে অথবা বিপক্ষে থাকার মতোই একটি প্রশ্ন। যখন জাতীয় বিদ্বেষ প্রসূত হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা নিয়ে জেনোসাইড চলে তখন পক্ষের বিষয়টা শুধু রাজনৈতিক থাকে না মানবিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই যখন কোন শিল্পী বা সাহিত্যিক এরকম সঙ্কটপূর্ণ সময়ে বা পরবর্তী সময়ে মানবতার পক্ষে না গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী যুদ্ধাপরাধীদের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন তাহলে সেটাকে নিছক ব্যক্তিগত বিষয় বলে গণ্য করা কঠিন হয়ে যায়। আর এই গণ্য করতে না পারার বিষয়টি অনুপ্রাণনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
বাংলা সাহিত্যে ফর্ম হিসেবে আধুনিক ছোট গল্পের ধারণা খুব পুরানো নয়। কলকাতা কেন্দ্রিক লেখক ও বুদ্ধিজীবী আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অনেকটা ইউরোপীয় সাহিত্যের সংস্পর্শে এসেই ছোট গল্প রচনার ফর্মটি নিয়ে সাহিত্য চর্চার সূচনা করেন। তখন শুরুতে রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও প্রচার প্রোপাগান্ডার কাজে গদ্য লেখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেই গদ্য লেখার প্রয়োজনীয় ফর্মটাকে ধরে পাশাপাশি ছোটগল্প লেখার চল শুরু হলে ক্রমেই লেখক ও সাহিত্যিকদের কাছে কবিতা বা পদ্যের পাশাপাশি ছোট গল্পের ফর্মটি প্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু ছোট গল্প রচনার কৌশলটি আয়ত্ত করতে সময় লাগে। কেননা ছোটগল্প সম্পূর্ণভাবে আখ্যানভিত্তিক একটি রচনা না। আখ্যানের খণ্ডাংশকে ধারণ করে অথবা না করে অনুভূতির বিস্তৃত ক্যানভাসে কতগুলো জট সৃষ্টি এবং সেই জটের পাকানো এক একটা সুতা খোলার মধ্য দিয়ে পাঠককে ধরে রাখা, আবিষ্ট রাখার মুন্সিয়ানা না থাকলে ছোট গল্প ঠিক ছোট গল্প হয়ে ওঠে না।
অনুপ্রাণন প্রকাশিত গল্পকার ও গল্প সংখ্যার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে গল্পকারদের ছোট গল্পগুলি নিয়ে সামগ্রিক আলোচনার সাথে প্রত্যেক গল্পকারের একটি করে নির্বাচিত গল্প সংযুক্ত করা হয়েছে। এই গল্পগুলো আলোচকরাই নির্বাচন করেছেন। গল্পগুলো পাঠের এই সুযোগের মাধ্যমে এই সংখ্যাটির পাঠকরা প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত গল্পকারদের লেখার সাথে পরিচিত হতে পারবেন। বাংলাদেশের গল্পগুলো পাঠ করলে দেখা যাবে কতগুলো গল্প প্রেমবিষয়ক অর্থাৎ এসব গল্পে প্রেম ও রোমান্স প্রাধান্য পেয়েছে। কতগুলো গল্পে গ্রামীণ, আর কতগুলো গল্পে সামাজিক প্রতিবেশ এবং গ্রামীণ অথবা শহুরে সমাজের চিত্র মেলে। বাংলাদেশের গল্পে প্রকৃতি ও মানুষ সবসময় প্রাধান্য পেয়েছে, যেসব গল্পে প্রকৃতির পটভূমিতে চরিত্রাঙ্কন করা হয়েছে। কম হলেও আমরা এমন কিছু গল্প পেয়েছি যেখানে অতিপ্রাকৃত-ভাব বা রহস্য-আচ্ছন্নতা লক্ষ করা যায়। কোন কোন গল্পে হাস্যরস ও নিখাঁদ বিনোদন প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলাদেশের গল্পকারদের কতগুলো এমন গল্প আছে যে গল্পগুলোতে অসম্ভব বা অবাস্তব কাহিনী বর্ণিত হতে দেখা যায় যেখানে কতগুলো গল্পের পাত্রপাত্রী বা পরিবেশকে না বুঝিয়ে সাংকেতিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্থান বা চরিত্রকে বোঝানো হয়েছে অথবা বার্তা প্রদান করা হয়েছে। ইতিহাসভিত্তিক গল্পগুলোতে কোনও একটি বিশেষ ঐতিহাসিক কালে সংঘটিত ঘটনা বর্ণিত হতে দেখা গেছে। সেখানে দেশ ভাগ, ভাষা আন্দোলন, গণ-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। খুব কম হলেও কিছু গল্প আছে যেখানে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও তত্ত্বের সাহায্য নিয়ে গল্পটি রচিত হয়েছে। বাংলাদেশের গল্পে এধরণের গল্পের প্রাধান্য দেখতে পাওয়া যায় যেখানে শহুরে অথবা গ্রামীণ পরিবেশের প্রেক্ষাপটে পারিবারিক ও গৃহজীবন প্রাধান্য পেয়েছে। তুলনামূলক কম হলেও এরকম বেশ কয়েকটি গল্প দেখতে পাওয়া যায় যেখানে নর-নারীর মনস্তত্ত্ব ও মানসিক টানাপোড়েন নিয়ে রচিত হয়েছে। বাংলাদেশের গল্পে এরকম গল্প আছে যেখানে মনুষ্য নয় এমন কোন প্রাণী প্রধান চরিত্র হয়েছে। বাস্তবনিষ্ঠ গল্পে যেখানে জীবনের কোনও ঘটনা বা দিক অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ ও অকপট ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। কম হলেও কিছু গল্পে পুলিশি তদন্ত ও সত্যানুসন্ধানের রোমাঞ্চকর বর্ণনা পাওয়া যায়। কিছু গল্প আছে যেগুলো বিদেশি পটভূমিকায় বাংলাদেশী অভিবাসী অথবা বিদেশী নরনারীর চরিত্রাঙ্কন করা হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণভাবে ছোটগল্পের প্রায় সব শাখার গল্পই বাংলাদেশের গল্পকারেরা লিখেছেন।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা - গল্পকার ও গল্প সংখ্যাঃ প্রথম পর্ব
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার দ্বিতীয় পর্ব—সম্পাদকীয়
প্রকাশিত হয়েছে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা—সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার দ্বিতীয় পর্ব। অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিকের ১০০ গল্প ও গল্পকার আয়োজনের এটা দ্বিতীয় পর্বের প্রকাশনা। ইতিপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকারে প্রথম পর্বে আমরা নির্বাচিত ১০০ জন গল্পকারের মধ্যে বয়স অনুক্রমে জ্যেষ্ঠ থেকে কনিষ্ঠ এবং লেখা প্রাপ্যতার ভিত্তিতে ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি তাদের একটি করে উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা প্রকাশ করেছি। একইভাবে এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে নির্বাচিত ১০০ জন সাম্প্রতিকের গল্পকার থেকে বয়স অনুক্রমে জ্যেষ্ঠ থেকে কনিষ্ঠ এবং লেখা প্রাপ্যতার ভিত্তিতে আরও ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি তাদের একটি করে উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা।
সাম্প্রতিকের গল্পের বিষয় ও বৈশিষ্ট্যে বাঁকবদল এবং বিশেষ করে গল্পে উত্তর-আধুনিক প্রবণতা নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হয়েছে, লেখালেখি হচ্ছে। উত্তর আধুনিক সাহিত্য, বিশেষ করে উত্তর-আধুনিক ছোটগল্পের বিষয় ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে স্বতন্ত্র এবং অধিকাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য বয়ান, সুনিশ্চিত বর্ণনা পাওয়া কঠিন। তাছাড়া উত্তর-আধুনিক প্রবণতা বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত। কোনো কোনো সময় এই প্রবণতার মধ্যে ভূতের মতো পেছনে হাঁটার অর্থাৎ পশ্চাদপদতার ভূত সওয়ার হতেও দেখা যায়।
উত্তর-আধুনিক গল্পে প্রায়শই ক্ষমতা, আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এটি রাষ্ট্রীয়, সামাজিক বা পারিবারিক হতে পারে। ব্যক্তি কীভাবে একটি নির্দিষ্ট সিস্টেম বা কাঠামোর মধ্যে শৃঙ্খলিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়, গল্পগুলোতে তা দেখানো হয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক বন্দোবস্তের চাপ কীভাবে মানুষের মনন ও আচরণকে প্রভাবিত করে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে গল্পগুলোতে প্রস্ফুটিত হয়েছে। প্রচলিত বাস্তবতার বাইরে গিয়ে মানুষের মানসিক ও অস্তিত্বের গভীর জটিলতা, দ্বিধা ও সংঘাতকে তুলে ধরা হয়েছে। আধুনিক সমাজে ব্যক্তি কীভাবে বিচ্ছিন্ন ও অসহায় বোধ করে, বা কীভাবে ব্যক্তি তার চারপাশের সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে লড়াই করে, তা উত্তর-আধুনিক গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দেখা যায়। তাছাড়া গল্পে ঘটনার ক্রম প্রায়শই অ-রৈখিক অর্থাৎ ধারাবাহিক না হয়ে খণ্ডিত ও বিক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। রূপ ও আঙ্গিকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে যেখানে গল্প বলার ধরন ও ভঙ্গিতে নতুনত্ব আনা হয়েছে। প্রচলিত ধারা বা কাঠামোর বাইরে গিয়ে পরীক্ষামূলক আঙ্গিক ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো কোনো গল্পে একটি একক ও সম্পূর্ণ আখ্যানের পরিবর্তে, খণ্ডিত আখ্যান কাঠামোতে গল্পগুলো অনেক সময় খণ্ড খণ্ড অংশ নিয়ে গঠিত হতে দেখা গেছে যা পাঠককে নিজস্বভাবে একটি অর্থ সৃষ্টি করতে উৎসাহিত করতে পারে। তাছাড়া উত্তর-আধুনিক গল্পে ঐতিহ্যগত কাঠামোর ভাঙন ঘটতে দেখা যায় যেমন কোন একটি নির্দিষ্ট প্লটের অনুপস্থিতি। উত্তর-আধুনিক গল্পগুলোতে বাস্তবতার নতুন ব্যাখ্যা অর্থাৎ প্রচলিত বা বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতার বাইরে গিয়ে এক নতুন ও ভিন্ন বাস্তবতাকে উপস্থাপন করতে দেখা গেছে, যেখানে মনস্তাত্ত্বিক বা প্রতীকী দিকগুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। একে অপরকে ছাড়া এগুলোর অস্তিত্ব থাকতে পারে না। শিল্প-সাহিত্য যেমন মানুষের আবেগ, চিন্তাভাবনা ও অভিজ্ঞতার সৃজনশীল প্রকাশ, অন্যদিকে সংস্কৃতি হলো একদল মানুষের ভাগ করা জীবনযাত্রার মধ্যে রয়েছে তাদের ঐতিহ্য, বিশ্বাস, সভ্যতা, জীবনযাত্রা, মূল্যবোধ ও রীতিনীতি। শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত হয় এবং সংস্কৃতি শিল্পকে অর্থ ও দিকনির্দেশনা দেয়। শিল্প ও সংস্কৃতির মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক দেখায় যে মানুষ কীভাবে তাদের পরিচয় প্রকাশ করে এবং কীভাবে তারা জীবনযাপন করে। সংস্কৃতি থেকেই শিল্প-সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। প্রতিটি সমাজ নিজস্ব শিল্প-সাহিত্যের রূপ সৃষ্টি করে—চিত্রকলা, সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য, স্থাপত্য ও কারুশিল্প- যা তার ইতিহাস ও পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করে। উদাহরণস্বরূপ, ধ্রুপদি নৃত্য ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে লোকগান গ্রামীণ জীবনের আনন্দ ও দুঃখকে প্রতিফলিত করে। একইভাবে, বিভিন্ন দেশের শিল্প-সাহিত্য তাদের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য দেখায়। শিল্প ও সাহিত্যের মাধ্যমেই মানুষ তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেয়।
সংস্কৃতি আমাদের শিল্প ও সাহিত্যকে বোঝার এবং মূল্য দেওয়ার ধরনকেও প্রভাবিত করে। একটি সমাজ যাকে সুন্দর বা অর্থবহ বলে মনে করে তা অন্য সংস্কৃতিতে ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, উপজাতীয় শিল্প সম্প্রদায়ের জীবন প্রকৃতির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, অন্যদিকে আধুনিক শিল্প প্রায়শই ব্যক্তিগত আবেগ ও সংগ্রাম প্রকাশ করে। এটি দেখায় যে শিল্প ও সাহিত্য কেবল একটি ব্যক্তিগত সৃষ্টি নয় বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পণ্যও। একই সঙ্গে, শিল্প সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতাকে প্রভাবিত করে। এটি মানুষের ধারণা পরিবর্তন করতে পারে, সামাজিক আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং ঐক্য তৈরি করতে পারে। শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা তাদের কাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা, শান্তি প্রচার করতে এবং মানবিক মর্যাদা উদযাপন করতে ব্যবহার করেন। এইভাবে, শিল্প ও সাহিত্য সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং রূপান্তরের জন্য একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। যখন মানুষ গল্প, সংগীত বা চিত্রের মাধ্যমে শিল্প অনুভব করে তখন তারা আবেগ এবং ধারণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় যা তাদের সংস্কৃতিকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে। তাই শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক— প্রতিফলিত ও গতিশীল উভয়ই। শিল্প ও সাহিত্য যে সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত সেখানে তার প্রতিফলন ঘটায় এবং একইসঙ্গে সংস্কৃতি শৈল্পিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিকশিত হয়। পারস্পরিকভাবে তারা মানবতাকে তার অতীত সংরক্ষণ করতে, তার বর্তমান বুঝতে এবং তার ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে সহায়তা করে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের যোগসূত্রের সেতু ভাঙার যারা আয়োজন করতে চায় তারা জাতির শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির কোনো না কোনো অঙ্গ পঙ্গু করার অপকর্মটাই করতে চায়।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 3; Contemporary Stories & Storytellers (Part-2)
অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব- সম্পাদকীয়
সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম পর্ব প্রকাশিত হওয়ার পর সাম্প্রতিকের আরো ২৫ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কবিতা ও কবিতা নিয়ে সামষ্টিক আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হলো শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব। দ্বিতীয় পর্বের এই ২৫ জন কবির নাম ইতোপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম পর্বের ন্যায় অনুপ্রাণনের ১০০ নির্বাচিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের কবি তালিকা থেকে নেয়া যাদের জন্ম ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হয়েছে। তালিকার অবশিষ্ট ৫০ জন নির্বাচিত কবি নিয়ে লেখা প্রকাশিত হবে আগামীতে প্রকাশিতব্য শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় ও চতুর্থ সংখ্যায়।
সংখ্যাটিতে অন্তর্ভুক্ত সাম্প্রতিকের কবিদের কবিতা নিয়ে আলোচনায় কয়েকটি বিষয় এসেছে যেমন- প্রতিকবিতা, উত্তর-আধুনিকতা, নৈরাজ্যবাদ ইত্যাদি। শুধু কবিতা নয় সামগ্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে নানা পর্যায়ে পরিবর্তনের সূত্র হিসেবে এই দর্শনগুলো নিয়ে আলোচনা আছে। দর্শন হিসাবে উত্তরাধুনিকতাবাদ- যুক্তিবাদীতার বিরুদ্ধে, বস্তুনিষ্ঠতার বিরুদ্ধে এবং সর্বজনীন সত্যের ধারণাগুলিকে প্রত্যাখ্যান করে। যার পরিবর্তে, এটি মানুষের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির বিচিত্রতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির বহুবিধ আপেক্ষিকতার উপর জোর দেয়। উত্তর-আধুনিক কবিতা প্রায়ই অর্থহীনতা অথবা বাস্তবতার অনুপস্থিতি প্রসঙ্গ নিয়ে কাজ করে এবং একটি অস্তিত্বগত দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করে। উত্তর-আধুনিক প্রতিকবিতায় প্রায়ই অস্থিরতার বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করে সাধারণত মুক্ত বিন্যাসে লেখা হতে পারে। কবিতায় অপ্রত্যাশিত লাইন বিরতি, বিশৃঙ্খল কাঠামো- এসব আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন হতে পারে। উত্তর-আধুনিক কবিতা প্রায়শই অস্তিত্ববাদী বা নিহিলিস্টিক প্রসঙ্গ নিয়ে কাজ করতে পারে। যদিও অস্তিত্ববাদ এবং উত্তর-আধুনিকতা সমার্থক নয়, তারা প্রায়শই সম্প্রর্কিত হতে দেখা যেতে পারে।
উত্তর-আধুনিক কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো কী- এই প্রশ্নটির উত্তরে একটা ধারনা দাড় করানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। আপাতত যে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে সেগুলো যেমন, প্রথমত, এলোমেলো ভাব- কেননা উত্তরআধুনিক রচনাগুলি শব্দের পরম অর্থের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। দ্বিতীয়ত, কৌতুকপূর্ণতা- কোন কোন ক্ষেত্রে কালো হাস্যরস, শব্দ নিয়ে খেলা, বিরোধালঙ্কার, বিড়ম্বনা এবং কৌতুকপূর্ণতার অপরাপর কৌশলগুলি যা কিনা প্রায়শই অর্থগুলোকে ঘোলাটে করার জন্য নিযুক্ত করা হয় যেন পাঠক দুর্বোধ্যতার ঘোরে একটি ভিন্নধরনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। তৃতীয়ত, বিবরণে- এমন কতগুলো অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিভাজন নিয়ে আসা যে টুকরোগুলি যুক্ত করে যে কোলাজ হতে পারে সেটা যেনো প্রায়শই অস্থায়ী বিকৃতরূপ ধারণ করে। চতুর্থত, মেটাফিকশন হতে পারে- অর্থাৎ কল্পকাহিনীর এমন বিশেষ একটি রূপ হতে পারে যা প্রকাশের জন্য রচনার বর্ণনামূলক কাঠামোকে এমনভাবে সাজানো হয় যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যই যেন পাঠক/দর্শকদের মনে করিয়ে দেয়া যে তারা একটি কাল্পনিক কাজ পড়ছে বা দেখছে। এবং পঞ্চমত ইন্টারটেক্সচুয়ালটি বা আন্তঃপাঠ্যতা- অর্থাৎ একটি পাঠ্যের অর্থ অন্য এক/একাধিক পাঠ্য দ্বারা প্রকাশ করা- যেটা হতে পারে একটি ইচ্ছাকৃত সৃজনশীল রচনাকৌশল যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে উদ্ধৃতি, ইঙ্গিত, অনুহরণ, কুম্ভিলকবৃত্তি, অনুবাদ, অনুকরণ অথবা প্যারোডি। তবে খেয়াল রাখতে হয় যে প্রতিকবিতা তখনই সফল হয় যখন ছন্দঃপ্রকরণ, ব্যাকরণ এবং অন্ত্যমিলে ইচ্ছাকৃতভাবে করা ভুলগুলোর বিশৃঙ্খলার মাঝে নান্দনিক প্রকাশভঙ্গী নিহিত থাকে।
মধ্যযুগের সাহিত্যে প্রবণতা ছিল সত্য ও মিথ্যার দ্বিমাত্রিক বয়ানের যেখানে পারলৌকিক শক্তি ও পরলৌকিকতা প্রকাশ্যে অথবা আড়ালে ঢুকে পড়েছে সর্বভারত উৎসারিত নিজস্ব নানা কথন বা বয়ান। এর অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও উপলব্ধি নিতান্তই ব্যক্তিক। যখন থেকে নির্ভেজাল ইহজাগতিক সত্যের উপর ভিত্তি করে সাহিত্য নির্মিত হতে থাকল তখন থেকে শুরু হলো আধুনিক সাহিত্য। কবিতায় যেমন উপন্যাসেও তেমন আধুনিক লেখক বস্তুবাদী, নৈর্ব্যক্তিক এবং নির্মোহ। বাঙলার আধুনিক সাহিত্য গঠনে ইউরোপের রেনেসাঁ পরবর্তী কালে রচিত সাহিত্যের প্রভাব রয়েছে। একইভাবে উত্তর-আধুনিক প্রবণতা আমাদের দেশজ দর্শন থেকে উৎসারিত না। কিন্তু, ব্যাপ্তি ও গভীরতায় আধুনিকতার তুলনায় উত্তর-আধুনিকতার বিষয় এবং মিথস্ক্রিয়া বহুবিস্তৃত। বৃহৎ নয়, ক্ষুদ্র; সমগ্র নয়, অংশ; গোছানো কিন্তু শৃঙ্খলাবদ্ধ নয়, এলোমেলো অথবা উদ্ভট; প্রথাগত নয়, নিরীক্ষামূলক; বিভিন্ন ক্ষেত্রের মিশ্রণ এবং মিথস্ক্রিয়া; ন্যারেটিভের অস্পষ্টতা; কোনো সাংস্কৃতিক প্রকল্পে একটি নয় বহু স্বরের সমাহার ইত্যাদিকে মনে করা যেতে পারে উত্তর-আধুনিকতার গুণ বা বৈশিষ্ট্য হিসেবে।
প্রাক-বাংলাদেশ পর্বে কোন কবি নয় বরঞ্চ সাঈদ আহমদ-ই বলা যায় উত্তর-আধুনিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে প্রথম অ্যাবসার্ড ঘরানার নাটক লিখেন। তিনি-ই প্রথম রূপকথা নিয়ে ফ্যান্টাসি ঘরানার নাটক লিখেন যা একই সঙ্গে ছিল এলেগরিকাল। অন্যদিকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অস্তিত্ববাদের ওপর ভিত্তি করে উপন্যাস লিখেন। এঁরা দুজনই বিদেশে প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন এবং পশ্চিম ইউরোপীয় সাহিত্য এবং দর্শনের সঙ্গে বেশ পরিচিত ছিলেন।
রেফারেন্স, প্রতীক, উৎপ্রেক্ষা ব্যবহার করে কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কবিতা এক জটিল সমীকরণে সম্পর্কিত হয়ে একইসাথে আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক স্বভাব ধারণ করেছিলো। উত্তর-আধুনিকতার উল্লিখিত এই প্রধান বৈশিষ্ট্যসমুহ রপ্ত করার পর বাকি যা থাকে সেসব কবিকে তাঁর নিজস্ব শৈলী উদ্ভাবনের মাধ্যমেই স্বাক্ষর রাখার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। উত্তর আধুনিকতার বিশাল ক্যানভাসে বাংলাদেশের কবিতা ক্রমেই মৌলিক, সৃজনশীল ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে।
Quarterly Anupranan 13th Year 2nd Issue, Samprotiker Kabi O Kobita- 2nd Part
‘চিন্তকের খসড়া খাতা’ একজন চিন্তাশীল লেখকের সৃজনশীল চর্চার একটি দলিল। আর এই দলিলটির মুসাবিদা করেছেন কবি, কথসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক স্বপঞ্জয় চৌধুরী। সাহিত্যের বহু বিচিত্র পথের বহুবর্ণিল প্রকৃতিকে তিনি যূথবদ্ধ করেছেন তেইশটি প্রবন্ধে। বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য তিনি এমনভাবে বিন্যন্ত করেছেন যাতে একজন জ্ঞানপিপাসু সাহিত্যামোদী যেমন জ্ঞানের এক বিস্তৃত ক্যানভাস পাবেন নিজেকে সমৃদ্ধ করতে তেমনি একজন গবেষক পেয়ে যাবেন অনেক তথ্য উপাত্ত।
যদি তাঁর খসড়া খাতাকে আমরা বিন্যাস করি তাহলে তাতে বহুমুখী প্রবণতা আমরা চিহ্নিত করতে পারি। কবিতায় তিনি নিয়ে এসেছেন নন্দনতত্ত্ব ও শিল্পের কারুকাজ, কবিতার শত্রু-মিত্র, কবিতায় ব্যবহৃত উপমা, অলঙ্করণ ও প্রতীক ইত্যাদি। আলোচনায় তুলে এনেছেন কবি মোহাম্মদ রফিকের কবিতার জীবনবোধ ও প্রকৃতি ভাবনা, অধুনাবাদের কবি ওবায়েদ আকাশ, মাহফুজ আল হোসেনের প্রেম ও বিপ্লবের কবিতা, কবিতার নিভৃত অন্তঃপ্রাণ কবি মোহাম্মদ হোসাইন এবং নির্জনতার কবি পরিতোষ হালদার। তাঁর খসড়া খাতায় স্বপঞ্জয় চৌধুরী তীক্ষ্ণ আলো ফেলেছেন গদ্য সাহিত্যের বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গনে। তিনি বিশ্লেষণ করেছেন পঞ্চাশ বছরের ছোটগল্পের, সাদ কামালীর প্রান্তিক জীবন ভাবনা, শরৎচন্দ্রের প্রেম বিরহ পরিণয় ও পরকীয়া এবং উপন্যাস দিকু’র নিঃসঙ্গ জীবনোপাখ্যানে। বিশেষভাবে আলোকপাত করেছেন হাংরি জেনারেশন মুভমেন্ট, হুমায়ুন আজাদের বহুমাত্রিকতা ও প্রথাবিরোধিতা। পাশাপাশি মিথলজির অঙ্গনেও এঁকেছেন নিজের পদচিহ্ন। তুলে এনেছেন গ্রিক মিথলজির সৃষ্টিতত্ত্ব, নানান দেশের লোকাচার ও মিথ, বাংলা সাহিত্যে গান ও ঈদোৎসব। তিনি তাঁর খসড়ার সম্ভার আরো সমৃদ্ধ করেছেন সিরিয়ান প্রথাবিরোধী কবি নিজার কাব্বানির জীবন ও কবিতার উপর আলোকপাত করে।
বইটির বহুমুখীনতায় সাহিত্যের পাঠকের তৃষ্ণা নিবারণে সক্ষম হবে এই প্রত্যাশা অবশ্যই করতে পারি।
আলী সিদ্দিকী
কবি ও কথাসাহিত্যিক
সম্পাদকঃ মনমানচিত্র
Cintoker Khsra Khata by Swaponjoy Chowdhury
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা : সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা তৃতীয় পর্ব- সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিক কালের ১০০ গল্পকারকে নিয়ে চতুর্দশ বর্ষের বিশেষ আয়োজনের পারম্পরিক ধারাবাহিকতার তৃতীয় পর্বে এসে আরও ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে প্রকাশিত হলো সাম্প্রতিকের (জন্ম : ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫) গল্প ও গল্পকার সংখ্যা, তৃতীয় পর্ব। সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার ১ম ও ২য় পর্বের মতো এই পর্ব অর্থাৎ ৩য় পর্বে ২৫ জন গল্পকারের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা প্রকাশের মাধ্যমে নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে এ-পর্যন্ত মোট ৭৫ জন গল্পকারকে নিয়ে তথ্য ও আলোচনাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ প্রকাশের কাজ সম্পন্ন হলো। অবশিষ্ট ২৫ জন গল্পকারদের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা আগামী চতুর্থ পর্বে প্রকাশিত হবে বলে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব নির্মাণের মূল উপাদান হচ্ছে, সময় ও মানুষ। মানুষের চেতনাজাত রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম ও ভৌত প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রভাবিত সমাজ ও সংস্কৃতির বিচার ও বয়ান। গত চার বছর ধরে অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক শিল্প-সাহিত্য ম্যাগাজিনে গত শতাব্দীর প্রথম থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিকদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা প্রবন্ধসমূহ সংকলিত করে যে সহায়ক সাহিত্যসম্পদ প্রস্তুত করা হচ্ছে সে-সকল সহায়ক সম্পদ বা উৎস ব্যবহার করে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গবেষণা হতে পারে। সেই গবেষণার একটি হতে পারে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের সমাজতত্ত্বের বস্তুনিষ্ঠ বয়ান।
আমরা এটা অধ্যয়ন করতে পারি- বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য কীভাবে সমাজ থেকে উদ্ভূত হলো, কী কী বৈশিষ্ট্য ধারণ করল, কীভাবে সাহিত্যে সমাজের প্রতিফলন ঘটাল এবং পাশাপাশি সমাজের ওপর সাহিত্য কী প্রভাব ফেলল? সাহিত্যে, ক্ষমতা, প্রতিযোগিতা ও সামাজিক কাঠামো কীভাবে কাজ করেছিল বা করে যাচ্ছে? এসব অধ্যয়ন থেকে হয়তো আমরা পেতে পারি এই তথ্য যে বাংলা দীর্ঘদিন উপনিবেশ থেকেছে। উপনিবেশ থাকাকালে ভিনদেশি শাসকের রাজনীতি, অর্থনীতির প্রভাবে পড়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির যেমন রূপান্তর ঘটেছে তেমনি বিকৃতিও ঘটেছে। ভিনদেশি উপনিবেশবাদী শক্তির প্রভাবের ফলে বাঙালির মননে এক গভীর আত্মপরিচয় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আর যখনই এই উপনিবেশবাদী মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে ভাষা, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে বাংলার মাটি ও পরিবেশজাত নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ধারায় নিয়ে এসে মুক্তচর্চা করার চেষ্টা বাঙালি করেছে তখনই ঔপনিবেশিক ধারার পৃষ্ঠপোষক ও কট্টরপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীর দিক থেকে আঘাত ও আক্রমণ এসেছে।
এই বিষয় ছাড়াও আমাদের অধ্যয়ন অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হতে পারে। যেমন, সমসাময়িক ছোটগল্পের আলোচনায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- গল্পকারেরা তাদের গল্পে কীভাবে সীমিত স্থান ব্যবহার করে পরিচয়, বিচ্ছিন্নতা, মনস্তাত্ত্বিক বাস্তববাদ এবং সামাজিক বিষয়গুলো (জাতি, শ্রেণি, ভোগবাদ) গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন। তাছাড়াও এই বিষয়েও আলোকপাত করা যেতে পারে যে কীভাবে প্রাণবন্ত চরিত্র, প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রাঞ্জল বর্ণনায় আধুনিক জটিলতাগুলো প্রতিফলিত করার জন্য বিভিন্ন শৈলী (ব্যঙ্গ, ভৌতিক, জাদুকরী বাস্তববাদ) ব্যবহার করা হয়েছে। আলোচনা ও অধ্যয়নে উঠে আসতে পারে যে কোনো কোনো সমালোচক সাম্প্রতিক রচিত গদ্যভাষায় নীরসতা বা অতি-সরলীকরণের প্রবণতার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দ্রুত পড়ে ফেলার উপযোগী করে রচনা করার বাইরে এসে ফর্ম এবং থিমকে আরও গভীরভাবে জড়িত করার প্রত্যাশা করেছেন। কোনো কোনো আলোচক কেবল গল্পের সারাংশে সীমাবদ্ধ না থেকে তার বাইরে গিয়ে গল্পের অর্থ প্রকাশে প্লট, চরিত্র, থিম এবং সাহিত্য কৌশলের (প্রতীকীকরণ, চিত্রকল্প) মতো উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে গল্পের অর্থ প্রকাশে তাদের কার্যকারিতা যথাযথ মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন।
অধ্যয়নে তুলে ধরা যেতে পারে যে সাহিত্য আলোচনাগুলো প্রস্তুত করতে গিয়ে বিশেষ করে চারটি বিষয়ের দিকে গভীর দৃষ্টি প্রদান করার প্রয়োজন হয়েছে। প্রথমেই এসেছে পরিচয় এবং অন্তর্ভুক্তি বোধের মতো বিষয়গুলো। যেমন সাংস্কৃতিক স্থানচ্যুতি, অভিবাসী মনস্তত্ব ও অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বায়িত বিশ্বে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত অথবা জাতীয় আত্ম-অনুসন্ধান। দ্বিতীয়ত, চরিত্র রূপসমূহের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। যেমন, বাস্তব ঘটনাসমূহের সাক্ষাৎ ব্যাখ্যা অথবা স্বগত ও বহুপাক্ষিক সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রগুলোর মনের অভ্যন্তরের জটিল ও অন্ধকার জগৎ উন্মোচন করা। তৃতীয়ত, গল্পের সামাজিক ভাষ্য অর্থাৎ ভোগবাদ, রাজনীতি, জাতি এবং শ্রেণি বিভাজনের সমালোচনা করার জন্য ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ও অ্যাবসার্ডবাদ ব্যবহার করা। এবং চতুর্থত, রূপ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা অর্থাৎ অনন্য কাঠামো, বিভিন্ন অথবা বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গি (উত্তর-ঔপনিবেশিক, নারীবাদী ইত্যাদী) ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, ফ্যান্টাসি এবং জাদুকরী বাস্তবতার মতো ধারাগুলোর সাথে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে ছোটগল্পের আধুনিক বিভাজন বৈশিষ্ট্য আয়ত্তে নিয়ে আসা। কেউ কেউ এটাও মনে করেছেন যে সমসাময়িক গল্পগুলো সংকীর্ণ জনতাত্ত্বিক বা উপরে ভাসা বিষয়গুলোর উপর খুব বেশি কেন্দ্রীভূত হতে দেখা গেছে। তাছাড়া দ্রুত, সহজে হজমযোগ্য গল্পের বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে গভীর, জটিল অভিজ্ঞতা প্রদানের জন্য প্রস্তুত প্রকৃত শৈল্পিক সম্ভাবনাময় গল্পের চাহিদার ক্ষেত্রে ভাটা সৃষ্টি করে থাকতে পারে। সত্যিকার অর্থে উদ্ভাবন না করে নির্দিষ্ট ‘ধরনের’ (যেমন, অকার্যকর পরিবার, সমাজবিচ্ছিন্ন যুবক) উপর খুব বেশি নির্ভরশীল গল্পগুলো একঘেয়েমির উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শিল্প-সাহিত্য মানুষকে ধ্বংস নয় সৃজনশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। গভীর অনুভূতি, বোধ ও সংযোগের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যা ভাষাগত সীমানা ছাড়িয়ে মানুষে মানুষে, সংস্কৃতিতে সংস্কৃতিতে মেলবন্ধন ঘটায়। ব্যক্তি ও সমাজকে সৌন্দর্য, আনন্দ, দুঃখ, প্রেম, বেদনা ও জীবনের গভীরে নিয়ে যায়, যা তাকে আত্ম-অনুসন্ধান ও বিশ্বকে নতুনভাবে উপলব্ধিতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যচর্চা সকল প্রকার সংরক্ষণবাদ মুক্ত হয়ে মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন চেতনাবোধ অব্যহতভাবে ধারণ করে যাবে। সংরক্ষণবাদ মুক্ত মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন এই চেতনাবোধ থেকে বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্যচর্চা বিচ্ছিন্ন করার সকল অপচেষ্টা বাংলাদেশের কবি, গল্পকার, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকেরা মিলিতভাবে রুখে দেবে এটাই বাস্তব।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 4; Contemporary Stories & Storytellers (Part-3)
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.














There are no reviews yet.