Additional information
| Weight | 0.650 kg |
|---|---|
| Published Year |
$ 2.94
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার দ্বিতীয় পর্ব—সম্পাদকীয়
প্রকাশিত হয়েছে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা—সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার দ্বিতীয় পর্ব। অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিকের ১০০ গল্প ও গল্পকার আয়োজনের এটা দ্বিতীয় পর্বের প্রকাশনা। ইতিপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকারে প্রথম পর্বে আমরা নির্বাচিত ১০০ জন গল্পকারের মধ্যে বয়স অনুক্রমে জ্যেষ্ঠ থেকে কনিষ্ঠ এবং লেখা প্রাপ্যতার ভিত্তিতে ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি তাদের একটি করে উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা প্রকাশ করেছি। একইভাবে এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে নির্বাচিত ১০০ জন সাম্প্রতিকের গল্পকার থেকে বয়স অনুক্রমে জ্যেষ্ঠ থেকে কনিষ্ঠ এবং লেখা প্রাপ্যতার ভিত্তিতে আরও ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি তাদের একটি করে উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা।
সাম্প্রতিকের গল্পের বিষয় ও বৈশিষ্ট্যে বাঁকবদল এবং বিশেষ করে গল্পে উত্তর-আধুনিক প্রবণতা নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হয়েছে, লেখালেখি হচ্ছে। উত্তর আধুনিক সাহিত্য, বিশেষ করে উত্তর-আধুনিক ছোটগল্পের বিষয় ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে স্বতন্ত্র এবং অধিকাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য বয়ান, সুনিশ্চিত বর্ণনা পাওয়া কঠিন। তাছাড়া উত্তর-আধুনিক প্রবণতা বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত। কোনো কোনো সময় এই প্রবণতার মধ্যে ভূতের মতো পেছনে হাঁটার অর্থাৎ পশ্চাদপদতার ভূত সওয়ার হতেও দেখা যায়।
উত্তর-আধুনিক গল্পে প্রায়শই ক্ষমতা, আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এটি রাষ্ট্রীয়, সামাজিক বা পারিবারিক হতে পারে। ব্যক্তি কীভাবে একটি নির্দিষ্ট সিস্টেম বা কাঠামোর মধ্যে শৃঙ্খলিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়, গল্পগুলোতে তা দেখানো হয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক বন্দোবস্তের চাপ কীভাবে মানুষের মনন ও আচরণকে প্রভাবিত করে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে গল্পগুলোতে প্রস্ফুটিত হয়েছে। প্রচলিত বাস্তবতার বাইরে গিয়ে মানুষের মানসিক ও অস্তিত্বের গভীর জটিলতা, দ্বিধা ও সংঘাতকে তুলে ধরা হয়েছে। আধুনিক সমাজে ব্যক্তি কীভাবে বিচ্ছিন্ন ও অসহায় বোধ করে, বা কীভাবে ব্যক্তি তার চারপাশের সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে লড়াই করে, তা উত্তর-আধুনিক গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দেখা যায়। তাছাড়া গল্পে ঘটনার ক্রম প্রায়শই অ-রৈখিক অর্থাৎ ধারাবাহিক না হয়ে খণ্ডিত ও বিক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। রূপ ও আঙ্গিকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে যেখানে গল্প বলার ধরন ও ভঙ্গিতে নতুনত্ব আনা হয়েছে। প্রচলিত ধারা বা কাঠামোর বাইরে গিয়ে পরীক্ষামূলক আঙ্গিক ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো কোনো গল্পে একটি একক ও সম্পূর্ণ আখ্যানের পরিবর্তে, খণ্ডিত আখ্যান কাঠামোতে গল্পগুলো অনেক সময় খণ্ড খণ্ড অংশ নিয়ে গঠিত হতে দেখা গেছে যা পাঠককে নিজস্বভাবে একটি অর্থ সৃষ্টি করতে উৎসাহিত করতে পারে। তাছাড়া উত্তর-আধুনিক গল্পে ঐতিহ্যগত কাঠামোর ভাঙন ঘটতে দেখা যায় যেমন কোন একটি নির্দিষ্ট প্লটের অনুপস্থিতি। উত্তর-আধুনিক গল্পগুলোতে বাস্তবতার নতুন ব্যাখ্যা অর্থাৎ প্রচলিত বা বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতার বাইরে গিয়ে এক নতুন ও ভিন্ন বাস্তবতাকে উপস্থাপন করতে দেখা গেছে, যেখানে মনস্তাত্ত্বিক বা প্রতীকী দিকগুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। একে অপরকে ছাড়া এগুলোর অস্তিত্ব থাকতে পারে না। শিল্প-সাহিত্য যেমন মানুষের আবেগ, চিন্তাভাবনা ও অভিজ্ঞতার সৃজনশীল প্রকাশ, অন্যদিকে সংস্কৃতি হলো একদল মানুষের ভাগ করা জীবনযাত্রার মধ্যে রয়েছে তাদের ঐতিহ্য, বিশ্বাস, সভ্যতা, জীবনযাত্রা, মূল্যবোধ ও রীতিনীতি। শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত হয় এবং সংস্কৃতি শিল্পকে অর্থ ও দিকনির্দেশনা দেয়। শিল্প ও সংস্কৃতির মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক দেখায় যে মানুষ কীভাবে তাদের পরিচয় প্রকাশ করে এবং কীভাবে তারা জীবনযাপন করে। সংস্কৃতি থেকেই শিল্প-সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। প্রতিটি সমাজ নিজস্ব শিল্প-সাহিত্যের রূপ সৃষ্টি করে—চিত্রকলা, সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য, স্থাপত্য ও কারুশিল্প- যা তার ইতিহাস ও পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করে। উদাহরণস্বরূপ, ধ্রুপদি নৃত্য ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে লোকগান গ্রামীণ জীবনের আনন্দ ও দুঃখকে প্রতিফলিত করে। একইভাবে, বিভিন্ন দেশের শিল্প-সাহিত্য তাদের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য দেখায়। শিল্প ও সাহিত্যের মাধ্যমেই মানুষ তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেয়।
সংস্কৃতি আমাদের শিল্প ও সাহিত্যকে বোঝার এবং মূল্য দেওয়ার ধরনকেও প্রভাবিত করে। একটি সমাজ যাকে সুন্দর বা অর্থবহ বলে মনে করে তা অন্য সংস্কৃতিতে ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, উপজাতীয় শিল্প সম্প্রদায়ের জীবন প্রকৃতির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, অন্যদিকে আধুনিক শিল্প প্রায়শই ব্যক্তিগত আবেগ ও সংগ্রাম প্রকাশ করে। এটি দেখায় যে শিল্প ও সাহিত্য কেবল একটি ব্যক্তিগত সৃষ্টি নয় বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পণ্যও। একই সঙ্গে, শিল্প সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতাকে প্রভাবিত করে। এটি মানুষের ধারণা পরিবর্তন করতে পারে, সামাজিক আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং ঐক্য তৈরি করতে পারে। শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা তাদের কাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা, শান্তি প্রচার করতে এবং মানবিক মর্যাদা উদযাপন করতে ব্যবহার করেন। এইভাবে, শিল্প ও সাহিত্য সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং রূপান্তরের জন্য একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। যখন মানুষ গল্প, সংগীত বা চিত্রের মাধ্যমে শিল্প অনুভব করে তখন তারা আবেগ এবং ধারণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় যা তাদের সংস্কৃতিকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে। তাই শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক— প্রতিফলিত ও গতিশীল উভয়ই। শিল্প ও সাহিত্য যে সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত সেখানে তার প্রতিফলন ঘটায় এবং একইসঙ্গে সংস্কৃতি শৈল্পিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিকশিত হয়। পারস্পরিকভাবে তারা মানবতাকে তার অতীত সংরক্ষণ করতে, তার বর্তমান বুঝতে এবং তার ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে সহায়তা করে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের যোগসূত্রের সেতু ভাঙার যারা আয়োজন করতে চায় তারা জাতির শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির কোনো না কোনো অঙ্গ পঙ্গু করার অপকর্মটাই করতে চায়।
| Weight | 0.650 kg |
|---|---|
| Published Year |
সম্পাদকীয়-
অনুপ্রাণন: বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের পথ-পরিক্রমা
অনুপ্রাণনের পক্ষ থেকে ছোটগল্পের এই বিশেষ আয়োজন বা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশকে কেন্দ্র করে প্রথমেই যে প্রশ্নটা উঠতে পারে যে, কোনটাকে আমরা ছোটগল্প বলবো? বিশ্বসাহিত্যে কথাসাহিত্যের বিশেষ ধারা ছোটগল্পের সংজ্ঞা ও ধারণার মাঝে যেভাবে বদল হয়েছে বাংলা সাহিত্যে ঠিক সেভাবে হয়নি।
বাংলা সাহিত্যে কথাসাহিত্যের বিশেষ ধারা ছোটগল্পের আবির্ভাব ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। বহুল স্বীকৃত ধারণা এটাই যে, ছোটগল্প বলতে সাধারণত তাকেই বোঝায় যে কথা বা কাহিনী যা আধঘণ্টা থেকে এক বা দু’ঘণ্টার মধ্যে এক নাগাড়ে পড়ে শেষ করা যায়। কিন্তু গল্প বা উপন্যাস আকারে ছোট হলেই কী তাকে ছোটগল্প বলা যাবে? না, কারণ আমরা এটা বোঝার চেষ্টা করেছি যে, ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এতে বিন্দুতে সিন্ধুর বিশালতা থাকতে হবে, অর্থাৎ অল্প কথায় অধিক ভাব ব্যক্ত করতে হবে। উপন্যাসের সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য এখানেই। ছোটগল্পে উপন্যাসের বিস্তার থাকে না, কিন্তু থাকে ভাবের গভীরতা ও ব্যাপকতা। উপন্যাস পড়ে পাঠক পরিতৃপ্তি লাভ করে, কিন্তু ছোটগল্প থেকে পায় কোনো চিন্তা অথবা কোনো ভাবের শক্তিশালী ইঙ্গিতমাত্র। কাহিনীর কোনো বিশেষ রূপ বা কোনো বিশেষ অংশকে অবলম্বন করে ক্ষুদ্র কলেবরে নিগূঢ় ভাব অথবা চিন্তা যেখানে নিগূঢ় সত্যের ব্যঞ্জনার সার্থক অবস্থান থাকে তবে এর মাঝেই ‘ছোটগল্প’ সার্থকভাবে হয়ে উঠতে পারে।
ছোটগল্পের প্রকৃতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) তাঁর ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায় যা বলেছেন, সেই সংজ্ঞার মাঝে ছোটগল্প আর আবদ্ধ নেই। কেননা ছোটগল্প ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা ছোট ছোট দুঃখকথা, নিতান্তই সহজ সরলের মাঝে আর আবদ্ধ নেই। তবে ঐ যে ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’ কথাটা হয়তো থাকবে বহুকাল যতদিন ছোটগল্প দ্রুপদী সত্যেকে লতিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টায় নিয়োজিত থাকবে।
বিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত রচিত ছোটগল্পগুলোকে বিষয়বস্তুর দিক থেকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যেমন:
১) প্রেমের গল্প, ২) সামাজিক গল্প, ৩) ঐতিহাসিক গল্প, ৪) প্রকৃতি ও মানুষ সম্পর্কিত গল্প, ৫) রূপক বা সাঙ্কেতিক গল্প, ৬) অতিপ্রাকৃত, ৭) ব্যঙ্গ বা হাস্যরসাত্মক, ৮) মনস্তাত্ত্বিক গল্প, ৯) গার্হস্থ্যবিষয়ক গল্প, ১০) বিজ্ঞানবিষয়ক গল্প, ১১) উদ্ভট গল্প, ১২) মনুষ্যত্বের প্রাণিবিষয়ক গল্প, ১৩) বস্তুনিষ্ঠ গল্প, এবং ১৪) বিদেশি পটভূমিকায় রচিত গল্প।
যদিও বাংলা ছোটগল্পের প্রথম আভাস পাওয়া যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪)—যুগলাঙ্গুরীয় (১৮৭৪) ও রাধারাণী (১৮৭৫) গল্পে এবং পরে যোগ দেন পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৪-১৮৮৯), ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৪৭-১৯১৯), স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫-১৯৩২) ও নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত; কিন্তু প্রকৃত অর্থে বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক ছোটগল্পকার হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ‘দেনা-পাওনা’ (১৮৯০) গল্পটিই প্রথম সার্থক ছোটগল্প হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক ছোটগল্পকারদের মধ্যে প্রথমেই উল্লেখযোগ্য কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৬৩-১৯৪৯) নাম। এর পরের ছোটগল্পকার হলেন প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬), প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (১৮৭৩-১৯৩২), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৭৬-১৯৩৮), চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯৩৮), মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৮৮-১৯২৯), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০০-১৯৭৬), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৫-১৯৫৬), প্রবোধকুমার সান্যালের (১৯০৫-১৯৮৩) ইত্যাদি কথাসাহিত্যিকদের নাম উল্লেখযোগ্য।
বিভাগ-পূর্বকালে ছোটগল্প রচনায় খ্যাতি লাভ করেছিলেন এমন আরো কয়েকজন লেখক হলেন—দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার, রাজশেখর বসু, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, মনোজ বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সৈয়দ মুজতবা আলী প্রমুখ।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের সাহিত্যে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, অল্পকালের মধ্যেই এ-দেশীয় লেখকদের সৃষ্টিশীল রচনায় তা পূর্ণ হয়ে ওঠে। সাহিত্যের অপরাপর শাখার মতো ছোটগল্পের শাখাটিও ক্রমাগত ঋদ্ধতর হয়।
বাংলাদেশে ছোটগল্প রচনার ধারা বেগবান হয় চল্লিশের দশকে। এ সময় গল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে গৃহীত হয় গ্রাম ও নগর জীবনের কাহিনী। অনেক গল্পে স্থান পায় দেশবিভাগের মর্মান্তিক পরিণতি। আবার দেশ বিভাগের আগেকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও তেতাল্লিশের মন্বন্তরও কোনো কোনো গল্পের উপজীব্য হয়। আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯), আবু রুশদ (১৯১৯-) এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১) ছোটগল্পের প্রথম পর্বের তিন খ্যাতিমান লেখক। আবুল মনসুর প্রধানত হাস্যব্যঙ্গাত্মক অথচ গভীর সমাজমনস্ক ছোটগল্পের রচয়িতা। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ভ-ামি তাঁর তীক্ষè সমালোচনার লক্ষ্য। প্রায়শ সমাজবিরোধী ব্যক্তিরা তাঁর গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়েছে। আবু রুশদ ছোটগল্পে নগরজীবনের প্রথম সার্থক ভাষ্যকার। নাগরিক জীবনের জটিলতা এবং দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তিনি বহু গল্প রচনা করেছেন। বাংলাদেশের গ্রাম, এর পশ্চাৎপদতা, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ইত্যাদি বিষয় বাঙময় হয়ে উঠেছে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গল্পে। এ সময়ের আরও দুজন গল্পকার ফজলুল হক (১৯১৬-১৯৪৯) ও সোমেন চন্দ (১৯২০-১৯৪২) গল্প রচনায় অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।
পঞ্চাশের দশকে পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সাহিত্যজগতে লক্ষ করা যায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি। পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে বাঙালির আত্মচেতনার বিকাশ ঘটে ১৯৫২-এর ভাষা-আন্দোলনে। এর ফলে তখন সমাজ ও সাহিত্য উভয়ই প্রবলভাবে আলোড়িত হয়। ভাষা-আন্দোলনের পরের বছরই এর গৌরবময় স্মৃতিকে ধারণ করে কবি হাসান হাফিজুর রহমানের (১৯৩২-১৯৮৩) সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় একুশের সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারি। এতে সমকালীন সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অবদান উপস্থাপিত হয়। এর অনুসরণে পরবর্তীকালে বহুসংখ্যক পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। সমকাল, কণ্ঠস্বর, পূর্বমেঘ, উত্তরণ, ছোটগল্প, পূর্বপত্র, সাম্প্রতিক, গণসাহিত্য, বিপ্রতীপ প্রভৃতি একুশে ফেব্রুয়ারিই সার্থক উত্তরাধিকারী। এ চেতনায় ছোটগল্পও সমৃদ্ধ হতে থাকে প্রচুর গল্পকারের লেখনী-প্রভাবে।
এ সময় ছোটগল্পে নবীন-প্রবীণ লেখকদের হাতে বিচিত্র বিষয়ের রূপায়ণ ঘটে। ইব্রাহীম খাঁ (১৮৯৪-১৯৭৮), মাহবুব-উল আলম (১৮৯৮-১৯৮১), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩), আবু জাফর শামসুদ্দীন (১৯১১-১৯৮৮), শওকত ওসমান (১৯১৭-১৯৯৮), সরদার জয়েনউদ্দীন (১৯১৮-১৯৮৬), আবদুল হক (১৯১৮-১৯৯৭), শামসুদ্দিন আবুল কালাম (১৯২৬-১৯৯৮), আবু ইসহাক (১৯২৬-২০০৩), আশরাফ সিদ্দিকী (১৯২৭-), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯), জহির রায়হান (১৯৩৩-১৯৭২) প্রমুখ এ সময়কার উল্লেখযোগ্য গল্পকার। এঁদের মধ্যে বিষয়বৈচিত্র্যে, শিল্পচেতনার অনন্যতায় এবং প্রকাশভঙ্গির প্রাতিস্বিকতায় উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠেন শওকত ওসমান ও আলাউদ্দিন আল আজাদ। এ দুজনের মাধ্যমেই পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের ছোটগল্প অর্জন করে সামাজিক বাস্তবতার এক নতুন মাত্রা। গ্রামীণ ও শহুরে জীবন চিত্রণে এবং বিচিত্র চরিত্র নির্মাণে শওকত ওসমানের কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। আলাউদ্দীন আল আজাদের মধ্যে দুই বিপরীতধর্মী শিল্পচেতনার সমন্বয় লক্ষণীয়। নরনারীর মনোজাগতিক বিশ্লেষণে, যৌনতা চিত্রণে এবং সামাজিক চরিত্র উন্মোচনে আজাদ সমান দক্ষতার পরিচয় দেন।
এ প্রসঙ্গে আরও দুজন গল্পকারের দুটি গল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—শাহেদ আলীর ‘জিবরাইলের ডানা’ (জিবরাইলের ডানা, ১৯৫৩) এবং মাহবুব-উল আলমের ‘মফিজন’ (মফিজন, ১৯৫৪)। গল্প দুটিতে মানুষের অভাবক্লিষ্ট জীবন, ধর্মের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক শোষণ, সামাজিক নিষ্ঠুরতার প্রেক্ষাপটে নারীর হৃদয়বৃত্তির প্রকাশ এবং গ্রামবাংলার অবহেলিত নারীসমাজকে সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিক মর্যাদাদানের বিষয় চমৎকারভাবে চিত্রিত হয়েছে। এভাবে ভাষা-আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়ে ছোটগল্পে সমাজ ও জীবনের স্বরূপ নানাভাবে প্রতিফলিত হতে থাকে; বিভিন্ন গল্পে প্রচারিত হতে থাকে মানবতাবাদ, সমাজসচেতনতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা।
ষাটের দশক থেকে ছোটগল্পের দুটি বিশেষ দিক লক্ষণীয় হয়ে ওঠে: সমকালীন ঘটনার ব্যাপক প্রতিফলন এবং ব্যক্তিসত্তার বিভিন্নমুখী বিশ্লেষণ। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্র ও সমাজ তরঙ্গবিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৯৫৮-এর সামরিক শাসন, ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের ছোটগল্প। লায়লা সামাদ (১৯২৮-১৯৮৯), সুচরিত চৌধুরী (১৯২৯-১৯৯৪), আবদুল গাফফার চৌধুরী (১৯৩১-), হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-১৯৮৩), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-), শওকত আলী (১৯৩৬-), জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত (১৯৩৯-), হাসান আজিজুল হক (১৯৩৯-), হাসনাত আবদুল হাই (১৯৩৯-), রাহাত খান (১৯৪০-), আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-), আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭), সেলিনা হোসেন (১৯৪৭-) প্রমুখ গল্পকারের আত্মপ্রকাশ ঘটে ষাটের দশকের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে। এঁদের মধ্যে বিষয়বস্তু, প্রকরণ ও ভাষাশৈলীর ক্ষেত্রে নতুনত্ব আনয়নের জন্য সৈয়দ শামসুল হক, শওকত আলী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, হাসান আজিজুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বিশেষভাবে স্মরণীয়। এঁরা গল্প রচনায় প্রয়োগ করেন বিশ্লেষণধর্মিতা, অন্তর্মুখী ব্যঞ্জনা, আঞ্চলিক জীবন ও উপভাষা।
শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের সঙ্কট ও গ্রামীণ জীবনকে আধুনিক শিল্পচেতনায় উপস্থাপনে সৈয়দ শামসুল হক বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। নরনারীর সম্পর্ক, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা প্রভৃতি প্রাধান্য পেলেও শওকত আলী শেষ পর্যন্ত সমষ্টি মানুষের জীবনকেই রূপায়িত করার প্রতি অধিকতর মনোযোগী হন। তিনি নিম্নজীবী-হতদরিদ্র মানুষের কাহিনী বর্ণনায় বিশেষ সিদ্ধি অর্জন করেন।
বাকসংযম কাব্যময়তা ও প্রতীকতা সৃষ্টিতে এবং সমাজজীবনের গভীর প্রদেশ উন্মোচনে হাসান আজিজুল হকের সাফল্য অসাধারণ। গল্পকার হিসেবে ব্যাপক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সম্মানও অর্জন করেন তিনি। বাস্তব ও পরাবাস্তবের আলোছায়া, মানবচরিত্রের রহস্যময়তা এবং সংক্ষুব্ধ সমকাল—জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ও আবদুল মান্নান সৈয়দের গল্পের মৌল উপাদান। ছোটগল্পের স্বল্প পরিসরেও অস্তিত্বের সঙ্কট, জীবনের ক্লিন্নতা ইত্যাদি বিষয়কে প্রকাশ করতে গিয়ে জ্যোতিপ্রকাশ গল্পের আঙ্গিক ও ভাষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। দুর্বিনীত প্রধান (১৯৬৫), বহে না সুবাতাস (১৯৬৭), সীতাংশু তোর সমস্ত কথা (১৯৬৯) প্রভৃতি তাঁর প্রধান গল্পগ্রন্থ। জটিল বর্ণনারীতি, ব্যতিক্রমধর্মী শব্দব্যবহার, কাব্যিক পরিচর্যা ইত্যাদি বাংলাদেশের ছোটগল্পে এসেছে আবদুল মান্নান সৈয়দের মাধ্যমে। প্রতীকতা, পরাবাস্তবতা ও আধুনিক অস্তিত্ববাদের নিরিখে ব্যক্তি-সমাজের যোগসূত্র অনুসন্ধান তাঁর গল্পকে দিয়েছে বিশিষ্টতা।
ষাটের দশকে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে এরকম গল্পকারদের মধ্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সর্ব অর্থেই ব্যতিক্রমধর্মী। গ্রাম-নগর উভয় প্রেক্ষাপটেই তিনি ছিলেন সাবলীল। পুরান ঢাকা তাঁর গল্পে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর গল্পের চরিত্রসমূহ লোভ-লালসা, ভালোবাসা-ঘৃণা, হিংস্রতা-ক্রুরতায় অর্জন করে সর্বজনীনতা। বাংলাদেশের ছোটগল্পে একটি নতুন গল্পভাষা নির্মিত হয় তাঁর হাতে। তাঁর গদ্যের ইতিবাচক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল তাঁর সার্থক ছোটগল্পগুলো। একেবারে চলিত কথ্যভঙ্গিকে মার্জিত চলিত গদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে তিনি এক বেগবান ভাষা সৃষ্টি করেন, যা উভয় বাংলার প্রচলিত আদর্শ গদ্যরীতি থেকে আলাদা এবং যা একান্তই তাঁর। আলোচ্য গল্পকারবৃন্দ ছাড়াও যাঁরা স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় রেখেছেন তাঁরা হলেন সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, বশীর আল হেলাল, রাহাত খান, হাসনাত আবদুল হাই, সেলিনা হোসেন প্রমুখ।
ষাটের দশক বাংলাদেশের ছোটগল্পে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে এ দশক অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক পত্র-পত্রিকাও এ সময় থেকেই প্রচুর পরিমাণে প্রকাশিত হতে থাকে। দেশে আসতে শুরু করে বিদেশি প্রগতিশীল সাহিত্যের অনূদিত গ্রন্থাদি। গল্পকারের সংখ্যাপ্রাচুর্যেও এ দশক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে ষাটের দশকের ধারাই আরো গতিশীল হয় এবং মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত নতুন নতুন গল্পকারের আবির্ভাবে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে ছোটগল্পের জগৎ। হেলেনা খান (১৯২৯-), শহীদ আখন্দ (১৯৩৫-), আবুবকর সিদ্দিক (১৯৩৬-), মাহমুদুল হক (১৯৪০-), বুলবন ওসমান (১৯৪০-), বিপ্রদাশ বড়–য়া (১৯৪২-) হাজেরা নজরুল (১৯৪২-), আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১), ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ (১৯৪৫-), ফরিদা হোসেন (১৯৪৫-), কায়েস আহমেদ (১৯৪৮-১৯৯২), হুমায়ুন আহমেদ (১৯৪৮-) প্রমুখ গল্পকারের আত্মপ্রকাশ মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তীকালে হলেও মুক্তিযুদ্ধের পরেই তাঁরা খ্যাতি অর্জন করেন। অন্তিম ষাটের এ প্রজন্মকে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী ও স্বাধীনতা-পরবর্তী দুই প্রজন্মের সেতুবন্ধ বলে অভিহিত করা যায়। এঁদের মধ্যে আবুবকর সিদ্দিক (ভূমিহীন দেশ, ১৯৮৫; চরবিনাশকাল, ১৯৮৭; মরে বাঁচার স্বাধীনতা, ১৯৮৭), মাহমুদুল হক (প্রতিদিন একটি রুমাল, ১৯৯৪), আহমদ ছফা (নিহত নক্ষত্র, ১৯৬৯), কায়েস আহমেদ (অন্ধ তীরন্দাজ, ১৯৭৮; লাশকাটা ঘর, ১৯৮৭) প্রভৃতি গল্পকার বিষয় ও ভঙ্গির ক্ষেত্রে মৌলিক পরিচয় দিয়েছেন।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা লাভের পরে ছোটগল্পে অনিবার্যভাবে যুক্ত হয় মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি। যুদ্ধ এবং যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতার আলোকে রচিত হয় বিপুলসংখ্যক ছোটগল্প। তবে ষাটের দশকের ছোটগল্পে আঙ্গিক ও ভাষার ক্ষেত্রে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছিল, সত্তরের দশকে তা লক্ষিত হয় না। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে ছোটগল্পে সর্বাধিক লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এর বিষয়বৈচিত্র্য। মহসিন শস্ত্রপাণি (১৯৪৫-), সাযযাদ কাদির (১৯৪৭-), শান্তনু কায়সার (১৯৫০-), হরিপদ দত্ত, মুস্তাফা পান্না (১৯৫২-), ভাস্কর চৌধুরী (১৯৫২-), মঞ্জু সরকার (১৯৫৩-), সুশান্ত মজুমদার (১৯৫৪-), ইমদাদুল হক মিলন (১৯৫৫-), আহমদ বশীর (১৯৫৫-), ইসহাক খান (১৯৫৫-), আহমদ মুসা (১৯৫৭-), মঈনুল আহসান সাবের (জ. ১৯৫৮) প্রমুখ স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম দশকের গল্পকার। মহসিন শস্ত্রপাণি (জনশ্রুতি, ১৯৭৯), মুস্তাফা পান্না (লোকসকল, ১৯৮৪), মঞ্জু সরকার (অবিনাশী আয়োজন, ১৯৮২) প্রমুখ যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের অভাব-বঞ্চনা-শোষণের চিত্র তুলে ধরেন। সুশান্ত মজুমদার (ছেঁড়াখোঁড়া জমি, ১৯৮৫; রাজা আসেনি বাদ্য বাজাও, ১৯৯৪; শরীরে শীত ও টেবিল গু-াপা-া, ১৯৯৮), আহমদ বশীর (অন্য পটভূমি, ১৯৮১), মঈনুল আহসান সাবের (পরাস্ত সহিস, ১৯৮২; অরক্ষিত জনপদ, ১৯৮৩; আগমন সংবাদ, ১৯৮৪) স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের বিশিষ্ট রূপকার।
সত্তরের দশকে মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, সামরিক শাসনের দুঃসহ বাস্তবতা, দারিদ্র্য, বেকার সমস্যা, নারীনির্যাতন, সন্ত্রাস প্রভৃতির প্রভাব পড়ে ছোটগল্পে। স্বাধীনতার পর থেকে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যগ্রন্থগুলো দেশে অবাধে আসতে শুরু করে। অন্যদিকে মিডিয়া-টেকনোলজির অভাবিত উন্নতির ফলে তথ্য ও অন্যান্য বিষয়ে লেখক-পাঠক উভয়ের অভিজ্ঞতার পরিধি বৃদ্ধি পায়। সাহিত্যের ক্ষেত্রে এ নতুন অভিজ্ঞতাও যুক্ত হতে থাকে। তাই অন্তিমসত্তর থেকে আশির দশকের এবং সাম্প্রতিক বাংলা গল্পে বিষয়বস্তু, প্রকাশভঙ্গি ও ভাষার ক্ষেত্রে বেশ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এমনকি কোনো কোনো গল্পকারের গল্পকে ছোটগল্পের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিকও বলা চলে। আবু হাসান শাহরিয়ার, অনামিকা হক লিলি, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, বিশ্বজিত চৌধুরী, মহীবুল আজিজ, ওয়াহিদ রেজা, আনিসুল হক, মনির জামান, মামুন হুসাইন, সেলিম মোরশেদ, হুমায়ুন মালিক, সেলিম মোজাহার, শাহনাজ মুন্নী, রাজীব নূর, ফাহমিদুল হক, অদিতি ফাল্গুনি, আহসান ইকবাল, প্রশান্ত মৃধা প্রমুখ সত্তরের শেষ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ধারা পর্যন্ত সৃষ্টিশীল গল্পকার হিসেবে খ্যাত।
এঁদের মধ্যে মামুন হুসাইনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আশির দশকের এ গল্পকার প্রচলিত বাংলা গল্পে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারার সূচনা করেন। বিষয়ভাবনা ও প্রকাশভঙ্গিতে বাংলা ছোটগল্পে তাঁর পূর্বে এমন আর কাউকে দেখা যায়নি। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত তাঁর গল্পগ্রন্থ শান্ত সন্ত্রাসের চাঁদমারি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। তাঁর গল্পে বাস্তব ও কল্পজগতের সঙ্গে নিজস্ব দার্শনিক বোধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তাঁর গল্পগুলো কেবল প্রচলিত ধারার ব্যতিক্রমই নয়, সেগুলোতে বাংলাদেশের জীবন আশ্চর্য রকমভাবে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।
অষ্টম বর্ষ প্রথম সংখ্যা
অষ্টম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা
সম্পাদকীয়, অনুপ্রাণন—১০ম বর্ষ ২য় সংখ্যা
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, চীনের উহান প্রদেশ থেকে গতবছর অর্থাৎ ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম করোনা সংক্রমণের সংবাদ মিলে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নভেল করোনা ভাইরাসটি ২০১৯-এর ডিসেম্বরেই চীনে শনাক্ত হয়েছিল, ফলে ভাইরাসটির নামের সাথে ১৯ সংখ্যাটি জুড়ে গিয়ে এর পুরো নাম হয় কোভিড-১৯। চীন থেকে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুতই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গিয়ে অতিমারীর আকার ধারণ করে।
এই ভাইরাসটি কৃত্রিম না প্রাকৃতিক এই নিয়ে কূটনৈতিক বিতর্ক আছে। বিজ্ঞান এটাকে প্রাকৃতিক বলেই রায় দিয়েছে। কৃত্রিম হলে চীনের দায় আছে না হলে নয়, এটা ঠিক নিশ্চিত বলে দেয়া যায় না। প্রকৃতিতে পশুপাখির শরীরে, বিশেষ করে লোমে ও লালায় নানারকম ভাইরাস আছে। গৃহপালিত জীবজন্তুর শরীরে যে সকল ভাইরাস আছে, সেসব ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে ক্ষতির মাত্রা খুব কম, কিন্তু বন্যপ্রাণির শরীরে মানুষের জন্য ক্ষতিকর ও প্রাণঘাতী যেসব ভাইরাসের উপস্থিতি রয়েছে সেসব ভাইরাসের মধ্য থেকে অনেকগুলো সম্পর্কে প্রাণিবিজ্ঞানে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। নভেল করোনা ভাইরাস উহানের একটি বন্যপ্রাণির বাজার থেকেই ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রকৃতির জীববৈচিত্র্য ও ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে বন্যপ্রাণি আহরণ ও নিধন বিশ্বজুড়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই বাজারে বন্যপ্রাণি এবং গৃহপালিত জীবজন্তু ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য আনয়ন করা এবং তার ফলে জনস্বাস্থ্য হানিকর ভাইরাস পশুর দেহ থকে মানবসমাজে প্রবেশের পথ করে দেয়া কোনোভাবেই বিচক্ষণ ও নীতিসম্মত কাজ বলে মেনে নেয়া যায় না।
আমরা যদি অতিমারীর বিশ্ব-ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, ৫৪১ থেকে ৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিউবোনিক প্লেগের সংক্রমণের ফলে ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ, তৎকালীন বাইজেন্টাইন ও কনস্ট্যান্টিনোপল সাম্রাজ্যভুক্ত সকল এলাকা, মিশর এবং আরব উপদ্বীপে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জনগোষ্ঠীর প্রাণহানি ঘটে। মধ্যযুগে ১৩৩১ সালে চীন থেকে একই বিউবোনিক প্লেগের বিশ্বমহামারী দ্বিতীয়বার শুরু হয়। প্লেগের এই মহামারী এবং পাশাপাশি চলমান গৃহযুদ্ধে তখন চীনের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মৃত্যু ঘটে। ক্রমে চীন থেকে তখনকার বিশ্ববাণিজ্যের গমনপথ ধরে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় এই প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে। ১৩৪৭ সাল থেকে ১৩৫১ সাল, এই চার বছরে ইউরোপের ন্যূনতম এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীর মৃত্যু হয়। শুধুমাত্র সিয়েনা এবং ইতালিতে বিউবোনিক প্লেগে মৃত্যুর হার ছিল প্রায় অর্ধেক। তারপর পুনরায় ১৮৫৫ সনে চীনে বিউবোনিক প্লেগ দ্বারা সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। উল্লেখ করা যায় যে, বিউবনিক প্লেগ একধরনের বাদামি ইঁদুরের শরীর থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়েছিল যা কি-না চীনের বাজারে তখন বিক্রয় হতে দেখা গিয়েছিল। চীন থকে বিউবোনিক প্লেগের তৃতীয় ঢেউ ক্রমেই পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। আর তখন শুধুমাত্র ইন্ডিয়াতেই এই প্লেগের সংক্রমণের ফলে প্রায় এক কোটি কুড়ি লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। মোম্বাইয়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এই প্লেগের সংক্রমণ রোধকল্পে সংক্রমিত অধিবাসী সহকারে একেকটি পাড়া-মহল্লা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ফ্র্যাঙ্ক স্নোডেন উল্লেখ করেছেন যে, এতে করে যে সত্যি কোনো উপকার হয়েছে কেউ তার প্রমাণ দিতে পারেনি। এগনোলো ডি টুরা নামে চতুর্দশ শতাব্দীর একজন কাহিনিকারের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, এই ভয়ানক ঘটনার সত্য বিবরণ মানুষের জিহ্বা দিয়ে উচ্চারণ করাই অসম্ভব। বলা যেতে পারে যে, এই ভয়াবহ ঘটনা যে দেখেনি, সে বিশেষভাবে আশীর্বাদপ্রাপ্ত। সংক্রমিত ব্যক্তির বাহুমূল এবং কুঁচকি অস্বাভাবিক ফুলে যায় এবং কথা বলতে বলতেই ধপ করে পড়ে মৃত্যু লাভ করতে থাকে। মৃতের সংখ্যাধিক্যের কারণে তাদেরকে গণকবরে দাফন করা হয়। ফ্লোরেন্স নগরীর জিয়োভানি বোকাচ্চিওর বর্ণনায়, মৃতদেহ সৎকারের জন্য ন্যূনতম শ্রদ্ধাটুকু দেখানো হয়নি যেটা কি-না একটি মৃত ছাগলের জন্যও প্রাপ্য হতে পারতো। কেউ কেউ মৃতদেহ বাড়িতে লুকিয়ে রাখতো। অনেকেই সংক্রমণের ভয়কে মানসিকভাবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু তারপরও ভুগতে ভুগতে মানুষ এক পর্যায়ে বেপরোয়া হয়ে যায়। বোকাচ্চিওর ভাষায়, পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানুষ অতিরিক্ত মদ্যপান করতে থাকে, নাচে-গানে মত্ত হয়ে থাকে এবং পৃথিবীর যাবতীয় সুখ এবং আনন্দ উপভোগ করাতেই নিজেদের নিয়োজিত করতে থাকে। সংক্রমণ ও মহামারীর বিষয়টি তারা ঘাড় থেকে এমনভাবে ঝেড়ে ফেলতে চাইতো যেন সেটা একটা বিশাল কৌতুক ছাড়া আর কিছু না। আমরা সেই একই ধরনের পরিণতির দিকে এগোচ্ছি কি-না?
অতীত অতিমারীর বিশ্ব-ইতিহাসে দেখা যায় যে, সংক্রমণের ধাপগুলোর মধ্যে প্রথম ঢেউ থেকে দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় ঢেউ অধিক থেকে অধিকতর প্রাণঘাতী হয়েছে। অন্যদিকে টিকা আবিষ্কারের ইতিহাসে বিজ্ঞানীরা চমক দেখিয়ে করোনা ভাইরাসের বিশ্বব্যাপী প্রাদুর্ভাব ও অতিমারীর এক বছরের কম সময়ের মধ্যে টিকা আবিষ্কার ও প্রয়োগ শুরু করেছেন। যার ফলে আশা করা যায় যে, সংক্রমণের দ্বিতীয় ধাপটি হয়তো অতীতের মতো ততটা মারাত্মক আকার ধারণ করবে না। কিন্তু তারপরও জীবন অথবা জীবিকা এসব প্রশ্নে, বিশেষ করে লকডাউনের মধ্যেও কীভাবে অর্থনীতিকে ন্যূনতম চলমান রাখা যায়, এসব প্রশ্নে বাস্তবে সর্বোত্তম ভারসাম্য রক্ষা করা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দেখা যাচ্ছে যে, সরকারের দেয়া লকডাউন নীতিমালা ও স¦াস্থ্যবিধি যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে না। তার পরিবারের অন্ন জোগাড়ের প্রয়োজনের চাপে উপার্জনক্ষম মানুষ ঘরে বসে থাকতে পারছে না।
কিন্তু, অন্যদিক নভেল করোনা ভাইরাস মানুষের শরীরে পুনঃপৌনিক সংক্রমণের মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে রূপান্তরিত হয়ে আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। যার ফলে, সংক্রমণের প্রথম ঢেউ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও ভাইরাসের রূপান্তরিত রূপ এই বছরের মার্চ থেকে ক্রমেই প্রাথমিক নিয়ন্ত্রণের বাঁধ ভেঙে দিয়ে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের চূড়া যে প্রথম ঢেউয়ের থেকে আরো উঁচু এটা মৃত্যু ও সংক্রমণের হার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই বোঝা যায়। বাংলাদেশে এ-পর্যন্ত কোভিড-১৯ এ সংক্রমিত হয়েছে প্রায় ৮ লাখ এবং একইসময়ে বিশ্বে সংক্রমণের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৬৩ লাখ। মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশে প্রায় ১২ হাজার এবং বিশ্বে প্রায় ৩৪ লাখ। সংক্রমণ ও মৃত্যুর নিছক সংখ্যাগুলোর মধ্যে এক একজনের আপন হারানোর অপার বেদনা লুকিয়ে আছে। আর আমরা আপন হারানোর বেদনার মতোই বেদনা অনুভব করি যখন আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার জগৎ থেকে হারিয়ে যায় তারকা ব্যক্তিরা। এই সংখ্যার শ্রদ্ধাস্মরণ বিভাগে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এপার ও ওপার বাংলার ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের এরকম কয়েকজন ব্যক্তির জীবন ও কর্ম নিয়ে এক বা একাধিক আলোচনা। যারা সকলেই এই করোনাকালে সম্প্রতি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তা ছাড়াও এই সংখ্যাটিতে অতিমারীর অভিঘাতের নানাদিক উঠে এসেছে শিল্প ও সাহিত্যের নানা শাখায়। অন্তর্ভুক্ত গল্প ও কবিতার কোনো কোনোটির মাঝে আমরা দেখতে পাই, অতিমারীর আঘাতের চিহ্ন। মানবতার অসহায়ত্ব ও দুর্ভোগের করুণ বর্ণনা এসব রচনাকে করেছে অশ্রুসিক্ত।
এই অতিমারীর মধ্যে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন পত্রিকাটির নিয়মিত প্রকাশনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন ছিল। অনুপ্রাণন পত্রিকাটির ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা থেকে ৯ম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা নির্ধারিত সময় থেকে কিছুটা দেরিতে হলেও প্রকাশিত হয়েছে। ১০ম বর্ষ ১ম সংখ্যাটি ফেব্রুয়ারি, ২০২১ একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হওয়া নির্ধারিত ছিল, কিন্তু বইমেলা পিছিয়ে যাওয়ায় সেটা প্রকাশিত হয় ২ এপ্রিল ২০২১। এই অতিমারীর মধ্যে অমর একুশে বইমেলা শুরু হয় ১৭ মার্চ এবং লকডাউনের বিধিনিষেধের মধ্যে শেষ হয় ১২ এপ্রিল। অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে ২০২০-২০২১ অতিমারীকালে এ-পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে ৬৮টি গ্রন্থ। গ্রন্থগুলোর কোনো কোনোটাতে উঠে এসেছে অতিমারীর অনুভব চিত্র।
বাঙালি, লেখক-আড্ডার মধ্য দিয়ে সৃজনশীল সাহিত্যের সূত্র খুঁজে পায়। বিভিন্ন লোকালয় ভ্রমণের মাধ্যমে গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলো ধরা দেয় এবং চলমান জীবনের নানামাত্রিক রূপ তাদের গল্প-উপন্যাসে উঠে আসে। অতিমারীর পূর্বে ঢাকা শহরে এবং দেশের জেলা পর্যায়ে লেখক আড্ডার কতগুলো আয়োজনের কর্মসূচি নিয়মিত অথবা অনিয়মিতভাবে বছরজুড়ে চলতে থেকেছে। লেখকরা ব্যক্তি এবং গ্রুপ পর্যায়ে লেখার বিষয়বস্তু তৈরির জন্য, গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য বই সংগ্রহ ও বইপড়ার কাজ চালিয়ে গেছে। কিন্তু এই অতিমারীর সময় আড্ডা বন্ধ হয়ে যায়। লাইব্রেরি বন্ধ থাকায় লেখার জন্য, গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ভ্রমণ অথবা বই সংগ্রহের কাজে বিঘ্ন ঘটেছে। কিন্তু তাতে কি লেখা বন্ধ থেকেছে? অতিমারীকালে লেখকরাও নতুন পরিস্থিতির, নয়া-স্বাভাবিক অবস্থার সাথে লেখার কার্যক্রমের রুটিন ও পদ্ধতি পরিবর্তন করে তাদের লেখা চালিয়ে গেছে। এই প্যান্ডেমিকের লকডাউন বা বিধিনিষেধ অথবা সতর্ক অবস্থান নিয়ে বাসায় থাকার সময় অনেক নতুন লেখকের জন্ম হয়েছে। যারা আগে থেকে লেখালেখি করতো অথবা যারা নতুন লেখক তারা সবাই লেখালেখির মধ্য দিয়েই ঘরবন্দী সময়টাকে নিয়োজিত করেছে।
এসব শিল্প-সাহিত্যকর্মে কি জনবিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতার স্বাক্ষর থেকেছে? আমার হাতে পত্রিকার জন্য যেসব লেখা অথবা পুস্তক প্রকাশের জন্য যেসব পাণ্ডুলিপি এসেছে, আমার পর্যবেক্ষণে মনে হয়েছে যে, এই নয়া-স্বাভাবিক পরিস্থিতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লেখার ধারায় পরিবর্তনের কোনো ছাপ ফেলতে পারেনি। স্বাভাবিক জীবনের তীব্র আকাক্সক্ষা নয়া-স্বাভাবিকতাকে গৌণ বোধেরই একটা অন্তহীন প্রচেষ্টা। আর যেসব লেখায় অতিমারী কবলিত নাগরিক অথবা গ্রাম্য জীবনের বাস্তব চিত্র এসেছে সেসব বাস্তব চিত্রে অতিমারীর ভয়াবহতা অথবা ভয়ঙ্কর রূপটি মুখ্য হয়ে ওঠেনি। যদিও আমরা দেখতে পাই, প্রতিদিনই মানুষের মৃত্যু হচ্ছে কিন্তু এর সংখ্যাটা স্বাভাবিক পরিস্থিতির মোট মৃত্যুহারকে অল্পই প্রভাবিত করেছে। এ-রকম একটা ধারণা থেকেই হয়তো মানুষ লকডাউনের বিধিনিষেধ অথবা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা হালকাভাবেই নিয়েছে।
কিন্তু তাহলেও দেশে গত মার্চ ২০২০ থেকে কোভিড-১৯ এ সংক্রমিত হওয়ার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে কেনাবেচায় পণ্যভেদে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বই কেনাবেচার মোট মূল্যমান স্বাভাবিক সময়েও এমনিতে কম। তারপর এই নয়া-স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সেটা কমে নেমে এসেছে স্বাভাবিক পরিস্থিতিকালে বিক্রয় মূল্যমানের তুলনায় শতকরা ২৫ ভাগে। তবে এটা যদি সাময়িক পরিস্থিতি হয়, তাহলে যে ক্ষতিসাধন হয়েছে সেটা হয়তো স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে এলে অধিকাংশ প্রকাশক ও সংশ্লিষ্ট মুদ্রণশিল্প মিটিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু অতিমারী যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে পুস্তক প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পে যে ক্ষতি হবে, সে ক্ষতির ফলে প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পের একটি বিরাট অংশ এই জগত থেকে চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে। মানুষের জীবিকা রক্ষা করার তাড়নার বাস্তবতায় ব্যাপকহারে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন অথবা লকডাউনের নীতিমালা উপেক্ষা করার যে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে, এসব ঘটনা যাদের জীবিকা প্রকাশনা এবং মুদ্রণশিল্পের ওপর নির্ভরশীল তাদের একটি বিরাট অংশকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না। কারণ, বইপড়া এই নয়া-স্বাভাবিককালের একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা দূর করার মাধ্যম হয়ে উঠতে আবারো ব্যর্থ হচ্ছে। এই অতিমারীকালে অনলাইনে কেনাবেচার পরিমাণ সামগ্রিক বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, সেটা বই ও পত্রিকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়নি।
আমাদের দেশে প্রকাশকদের মধ্যে বই অথবা ম্যাগাজিন প্রকাশের ধরনের ওপর ভিত্তি করে কতগুলো ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম ভাগটি পাঠ্যপুস্তক, নোট অথবা গাইড বইয়ের প্রকাশক। দ্বিতীয় ভাগটি পাঠ্যপুস্তক, নোট অথবা গাইড বই প্রকাশের পাশাপাশি সৃজনশীল সাহিত্য অথবা গবেষণাগ্রন্থও প্রকাশ করে থাকে। আর তৃতীয় ভাগটি শুধুমাত্র সৃজনশীল সাহিত্য অথবা গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করে থাকে।
এই তিনটি ভাগ বা শ্রেণির প্রকাশকরা সকলেই এই অতিমারীকালে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকতো, তবে প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগের প্রকাশকরা ক্ষতিগ্রস্ততার হাত থেকে বেশ ভালোভাবেই রক্ষা পেতো। অন্যদিকে যেসব প্রকাশক শুধুমাত্র সৃজনশীল সাহিত্য ও সামাজিক গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করে তাদের পরিস্থিতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকা-না থাকার সাথে সম্পর্কিত নয়। অতিমারীর কারণে বই ক্রয়-বিক্রয় সামগ্রিক হ্রাস পাওয়ার সাথেই তাদের অর্থনীতি জড়িত এবং যেটা শোচনীয় বললেও কম বলা হবে।
বাস্তবে আমাদের জানা দরকার যে, এই অতিমারীকালে কাদের আয় হ্রাস পেয়েছে এবং কাদের আয় যে পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে সে পরিমাণ হ্রাস তাদের আর্থিক সচ্ছলতার ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলেনি? কারা সৃজনশীল সাহিত্য, বই ও ম্যাগাজিনের মূল ক্রেতা? যাদের আয় সামগ্রিক হ্রাস পেয়েছ, তারাই কি সৃজনশীল সাহিত্য পুস্তক ও ম্যাগাজিনের ক্রেতা? আবার দৃশ্যত. এই অতিমারীকালেও কাপড়-জামার ঈদবাজার সরগরম হলেও সামগ্রিক ঈদের কেনাবেচার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে কি-না? না-কি স্বাভাবিক ছিল? না-কি স্বাভাবিক পরিস্থিতির সময়কাল থেকে কম ছিল? বস্তুত কাপড়-জামার ঈদবাজার এই অতিমারীকালে বেশ চাঙ্গা দেখা গেলেও সামগ্রিক হিসাবে আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ অতীত স্বাভাবিক পরিস্থিতিকালের চেয়ে কম ছিল। বস্তুত এই অতিমারীকালে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের খরচের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে এবং খরচের সিংহভাগ ব্যয়িত হচ্ছে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে এই অতিমারীকালে যাদের আয় তাৎপর্যপূর্ণভাবে হ্রাস পায়নি এবং যারা সৃজনশীল সাহিত্যের বই পড়ে, তারা হয়তো এই অতিমারীকালেও বই কেনা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় অংশটি যারা আয়ের একটি ভাগ কষ্ট করে হলেও সৃজনশীল সাহিত্য অথবা গবেষণাগ্রন্থ ক্রয়ের জন্য ব্যয় করতো, অর্থের অভাবে তারা এই অতিমারীকালে বইয়ের বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না; করলেও ক্রয়ের পরিমাণ খুব বড় আকারেই হ্রাস পেয়েছে।
অর্থাৎ একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা এবং অন্যদিকে বইয়ের ক্রেতাদের আয় হ্রাস, সামগ্রিকভাবেই বই ও ম্যাগাজিন প্রকাশনা এবং মুদ্রণশিল্পে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। অর্থনীতির অন্যান্য খাতে সরকার ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্পসুদে ঋণ দিয়ে এই অতিমারীকালে প্রণোদনা দিয়েছে, কিন্তু পুস্তক প্রকাশনা এবং মুদ্রণশিল্পের মালিকরা ব্যাংকখাত থেকে স্বল্পসুদে ঋণ গ্রহণ করার সুযোগ নানাকারণেই গ্রহণ করতে পারছে না। প্রকৃতপক্ষে প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বার্ষিক এককালীন অনুদানের কর্মসূচি নিয়ে সরকারের এগিয়ে আসা এখন এই অতিমারীকালে সময়ের দাবি। শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকার তালিকা করে বার্ষিক এককালীন এই অনুদান প্রদান করার ব্যবস্থা করতে পারে।
সর্বশেষে, করোনাকালের গদ্য নিয়ে কথা। প্রশ্ন হচ্ছে, করোনাকালের গদ্যের বিষয়বস্তু কী হতে পারে? অবশ্যই অতিমারী ও অতিমারীর অভিঘাত। অতিমারীর অভিঘাত শুধু মানুষের অসুস্থতা, দেহত্যাগ এবং পরিবার ও সমাজে তার বাস্তব ও মানসিক অভিঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। করোনাকালের গদ্যের মধ্যে আসতে পারে বহুমাত্রিক বিষয়। যেমন- চিকিৎসা, প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায় অথবা সামগ্রিকভাবেই এই অতিমারীর বিরুদ্ধে জীবন ও জীবিকা রক্ষার লড়াই। অতিমারীর প্রেক্ষিতে রাষ্ট্র ও সমাজের ভূমিকা সম্বন্ধীয় চিন্তাভাবনা। নয়া-স্বাভাবিক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিকের বর্ণনা, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ এবং সুপারিশ। কবিতা ও গল্পের পাশাপাশি করোনাকালের গদ্য রচনায় কোনো কোনো লেখক মনোনিবেশ করতে পারেন।
১০ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা
অনুপ্রাণনের চড়াই উৎরাই-
তরুণ লেখকদের শিল্প ও সাহিত্য চর্চার একটি মঞ্চ বা জমিন নির্মাণ করার কাজের অঙ্গীকার নিয়েই শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, যাত্রার সূচনা করেছিল। আজ দশ বছর পরে এসে যদি এই প্রশ্ন নিয়ে ফিরে তাকাই যে, এই অঙ্গীকার পূরণে অনুপ্রাণন কতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছে? অথবা, যদি প্রশ্ন রাখা যায় যে নবীন ও তরুণদের শিল্প-সাহিত্যের চর্চার ক্ষেত্রে অনুপ্রাণনের মঞ্চ বা জমিনটাই বা কতটুকু প্রসারিত? প্রশ্নের জবাবে অনুপ্রাণনের সফলতা ও ব্যর্থতার একটা প্রতিবেদন হয়তো দেয়া যাবে কিন্তু সে চিত্রটিকে আমাদের সমাজের সামগ্রিক প্রেক্ষিত ও সেটার সাথে সম্পর্কিত মানবিক বোধের ধারায় শিল্প-সাহিত্যের চর্চার বাস্তব পরিধি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।
ব্যক্তিক প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে গড়ে উঠে সংগঠন এবং সুগঠিত সাংগঠনিক চেষ্টার মধ্য দিয়ে বস্তুগত শর্ত ও পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। যে শর্ত ও পরিবেশের উপর ভিত্তি করে ভৌত উন্নয়নের পাশাপাশি জনগোষ্ঠীর সৃজনশীল মন, মনন, উদ্ভাবন-মনস্কতা, নান্দনিক ও মানবিক বোধ জাগ্রত হতে পারে এবং সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি অর্জন করা যেতে পারে। তাই, এই লক্ষ্য অর্জনের পথে যৎসামান্য অবদান হিসেবে অনুপ্রাণনের উদ্যোগে পরিচালিত সৃজনশীল শিল্প-সাহিত্য চর্চার কাজে আমাদের ব্যক্তিক ও সাংগঠনিক প্রচেষ্টা কতটুকু কার্যকর ছিল সেই মূল্যায়নের ভার অনুপ্রাণনের বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের হাতে। এই বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনার দ্বার সবসময় উন্মুক্ত থেকেছে।
বিগত প্রায় দশ বছরের ইতিহাসে অনুপ্রাণনের সম্পাদনা পরিষদ নানা ভাঙ্গা গড়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, যার ফলে প্রচেষ্টার প্রত্যাশিত গমনপথ ও গতিতে পরিবর্তন হয়েছে। অর্থাৎ অনুপ্রাণনের চলার পথ মসৃণ ছিল না। চড়াই, উৎরাই, অথবা কখনো বন্ধুর পথ অতিক্রম করেই অনুপ্রাণনকে অগ্রসর হতে হয়েছে।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন এ-৪ সাইজের ১৬০টি পৃষ্ঠা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। ছাপার পূর্ববর্তী কাজ, কাগজ ও প্রেসের খরচ প্রতিটির বিনিময় মূল্য ৳ ১৫০/- দিয়ে হিসাব করলে পুরোটা খরচ উঠে আসে না। কর্পোরেট হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকার জন্য অনুপ্রাণন, বিজ্ঞাপন সংগ্রহ ও তা প্রকাশ করে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় নি। প্রথম থেকেই অনুপ্রাণনের সম্পাদকেরা কোন সম্মানী ছাড়াই একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। লেখকেরাও কোন সম্মানী ছাড়াই লেখা দিচ্ছেন। ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনুপ্রাণনের বিনিময় মূল্য বৃদ্ধি করার প্রস্তাব জোরালো যুক্তি নিয়ে সামনে চলে আসছে। কিন্তু, অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক পত্রিকার বিনিময় মূল্য বাড়ালে পাঠকের উপর যে বাড়তি চাপ পরবে এই বিষয়েও অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদ সচেতন রয়েছে।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন ১০ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা
সম্পাদকীয়, নবম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা-
কবি ও কবিতার অনুপ্রাণন—
সূচনা লগ্ন থেকেই শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন, সাহিত্যের এই বিশেষ শাখা অর্থাৎ কবিতা বিভাগটির উপর বিশেষ যত্ন দিয়ে এসেছে। কেননা সাহিত্য রচনায় কবিতাই একমাত্র শাখা যেখানে কবির অন্তরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা অনুভূতিটি উপচে বের হয় কবিতায়। যেখানে কোনো প্লট-পরিকল্পনা বা পূর্বপ্রস্তুতির চিহ্ন খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। হতে পারে কবির সেই কথাগুলো নির্গত হয়েছিল কোনো অস্থির অথবা কোনো বেদনার অথবা কোন শান্ত-সমাহিত ধ্যানের মুহূর্তে। হৃদয় মথিত কোনো নান্দনিক অথবা কোনো মানবতবাদী ভাব সৃষ্টি ও রচনার গভীর অনুপ্রেরণায়। কিন্তু স্বতস্ফুর্তভাবে নির্গত শক্তিশালী কোনো অনুভূতি যে কোনো আকারে প্রকাশিত হলেই কী সেটা কবিতা হয়ে উঠতে পারে? কবিতা—সাহিত্য রচনাশৈলীর এমনই একটি বিশেষ ধারা যেখানে শব্দ ও ছন্দ পার¯পরিকভাবে ক্রিয়াশীল থাকতে দেখা যায়। কবিতায় শব্দগুলো একসাথে জুড়ে থেকে কোনো প্রকার উচ্চারণ, ধ্বনি, চিত্র অথবা চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে থাকে যা কি-না সরাসরি বর্ণনা করতে গেলে হতে পারে অনেক জটিল অথবা বিমূর্ত। কবিতা রচনায় প্রচ্ছন্ন থাকে ছন্দ ও মাত্রা অর্থাৎ অক্ষর অথবা শব্দাংশের সংখ্যার সম্মিলন অথবা বিন্যাস। কিন্তু, কবিতার এসব গঠন প্রক্রিয়া সবসময় সচেতনভাবে কতটুকু কবির মনে ঘটে থাকে, সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুমান করা কঠিন।
বাংলা ভাষার হাজার বছরের ইতিহাসে সাহিত্যের আরম্ভ অনেকটাই গীতিকবিতা দিয়েই। যেখানে উচ্চারণ ও ছন্দের মিলের সাথে যুক্ত ছিল সুর। বিষয়বস্তুতে গভীর ব্যক্তি অনুভূতির থেকে অগ্রাধিকার পেল সামাজিক-রাজনৈতিক কাহিনী। কেননা, তখন সমাজই ছিল সব, ব্যক্তির অস্তিত্ব একপ্রকার ছিল না বললেই চলে। তাই সেসব কাহিনীতে ছিল সমাজ ও রাজনীতি, ক্ষেত্রবিশেষে শাসকের গুনকীর্তন আবার ক্ষেত্রবিশেষে প্রথা-প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা, রোমান্টিক প্রেমের জনপ্রিয় আখ্যান, যৌনতা, অথবা বীরের শৌর্য-বীর্য, জন্ম-মৃত্যু, প্রেম অথবা বিবাহ।
চর্যাপদ দিয়েই বাংলা কবিতার গোড়াপত্তন। চর্যাপদ কতগুলো আশ্চর্য বিপরীতধর্মী কবিতার সমাহার। তাই চর্যাপদের আরেক নাম—চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয়। চর্যাপদে বর্ণিত সাধন তত্ত্ব, তৎকালীন বাংলার সমাজ জীবনের চিত্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশের অপরূপ বর্ণনা, সকলই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে প্রমাণিত ও গৃহীত। কিন্তু, চর্যাপদের ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধীতা, অভিজাতদের ধর্মদর্শন ও ধর্মানুষ্ঠানের প্রতি বিদ্রুপ উচ্চারণ ইত্যাদী’তে লোকায়তিক বৌদ্ধ ও জৈনরা যে সেই খ্রিস্টপূর্ব থেকেই ব্রাহ্মণ্য-বিধানকে অমান্য করে এসেছে, তারই কতক প্রতিচ্ছবি মেলে চর্যাপদের কোনো কোনো পদ্যে। বাঙালি জাতিসত্ত্বার মূলে রয়েছে—হিন্দু লৌকিক, বৌদ্ধ লৌকিক, ইসলাম লৌকিক; এরকম সকল লৌকিকগণ। এই লৌকিক অনভিজাত বা প্রাকৃত বাঙালিই হচ্ছে প্রকৃত বাঙালি। আঠারো শতক পর্যন্ত রচিত সাহিত্য এই প্রাকৃত বাঙালির উপভোগ্য ছিল। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য, বাংলায় রূপান্তরিত রামায়ণ-মহাভারত-ভগবত, বৈষ্ণব পদাবলি, চৈতন্যের জীবনী, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, ইত্যাদী সকল সাহিত্যের ক্ষেত্রেই একথা প্রযোজ্য। সে সময়ের লোকসাধারণের কবিরা এই ‘লৌকিক করিয়া’ ‘লৌকিকের মতে’, মূলধারায় কবিতা তথা সাহিত্য রচনা করতেন।
কিন্তু তারপর পরে একটি দীর্ঘ ছেদ। বাংলা সাহিত্যে কথিত অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে বড়ু চণ্ডীদাস নিয়ে আসেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। এ কাব্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়লীলাচ্ছলে জীবাত্মা-পরমাত্মা লীলা লীলায়িত হলেও মধ্যযুগের শুরুতে একাব্য অনবদ্য ভূমিকা রাখে। তবে মধ্যযুগ বিশেষভাবেই বিখ্যাত মঙ্গলকাব্যের জন্য। প্রায় পাঁচশ বছর ধরে বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন শ্রেণির মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছে। যদিও মঙ্গলকাব্যগুলোর রূপ প্রায় একই রকম। কতিপয় মঙ্গলকাব্যে কবিতার ভারী যাদু থাকলেও সবচেয়ে বেশি ছিল সমকালীন সামাজিক জীবনের বোধ ও পরিচয়। বাংলাদেশের মধ্যযুগের ইতিহাস জানতে হলে মঙ্গলকাব্য অবশ্যপাঠ্য। বৈষ্ণব পদাবলি আমাদের স্বপ্নে বিভোর করে। বৈষ্ণব পদাবলির পাত্র-পাত্রী কৃষ্ণ-রাধাকে কেন্দ্র করে যে কবিতাগুলো রচিত হয়েছিলো সেগুলো বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
রাজসভায় রচিত হলেও মধ্যযুগের সাহিত্য কেবল অভিজাতদের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেনি। মধ্যযুগে সামাজিক বৈষম্য প্রকট থাকলেও, পুরোহিত-মোল্লাদের দাপট থাকলেও, অভিজাত কর্তৃক উৎপীড়ন থাকলেও, সে যুগের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বাংলার প্রাকৃতজনেরই প্রাধান্য ছিল। যারা আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসবিদ, তাদের অনেকের মতে, মধ্যযুগের সর্বশেষ কবি হলেন ভারতচন্দ্র আর আধুনিক যুগের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন। মাঝখানে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত হলো ‘যুগসন্ধির কবি’।
মধ্যযুগের বিদায়ী দামামা বেজে ওঠে, যখন ১৭৫৭-তে আমরা স্বাধীনতা হারাই। বণিক শাসক হয়। অনেক পরিবর্তনের সাথে সাথে সাহিত্যের পরিবর্তন বা পতন ঘটে। ভারতচন্দ্রের রচনায় দেখা যায় পতনের ছাপ। বলা হয়ে থাকে ১৭৬০ থেকে ১৮৩০ এই সত্তর বছর বাংলা সাহিত্যের পতন ঘটেছিল। সে সময় কবিয়াল ও শায়েরদের উদ্ভবে এক নিম্নরুচি সম্পন্ন সাহিত্য রচিত হয়। অর্থাৎ, কবিগান। কবিগানকে গর্ব করার মতো সাহিত্য বলতে অনেকে নারাজ। কবিয়াল ও শায়েররা বিকিয়ে গেলেও কোনো কোনো কবিগান বা শায়েরি আজো বাংলার প্রাকৃতজনের মনে শেকড় গেড়ে আছে সেসবের অনবদ্য ছন্দ ও সুরের নান্দনিকতার কারণে।
বাংলা কবিতায় আধুনিকতা আনেন মাইকেল মধুসূদন। মহাকাব্য রচনা করে বাংলা কবিতার রূপ বদলে দেন। শুধু তাই নয় তিনি বাংলা পয়ারকে এক নতুন রূপে উপস্থাপন করেন। ব্যবহার ক্লান্ত ছন্দরীতিকে মধুসূদন করে তোলেন প্রবাহমান (অমিত্রাক্ষর)। এর আগে অবশ্য ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতায় আধুনিকতার হাল্কা আলোকচ্ছটা দেখা যায়। তবে মধুসূদন একাই এক ধাক্কায় বাংলা সাহিত্যকে অনেক এগিয়ে দিয়ে গেছেন। মধুসূদনের দেখাদেখি অনেকে (হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, কায়কোবাদ) মহাকাব্য রচনার চেষ্টা করেন। কিন্তু, শেষপর্যন্ত ওগুলো মহাকাব্য না হয়ে আখ্যানকাব্য হয়ে ওঠে।
বাংলা কবিতায় মহাকাব্যের ধুমধাম চলাকালে রোমান্টিকতা নিয়ে উঁকি দেন বিহারীলাল। বাংলা কবিতার তিনি-ই প্রথম রোমান্টিক ও খাঁটি আধুনিক কবি। রবীন্দ্রনাথ যাকে ‘ভোরের পাখি’ বলেছেন। আত্মভাবপ্রধান কবিতার জন্ম বিহারীলালের হাতে হলেও বিকাশ ঘটে রবীন্দ্রনাথের হাতে। অগ্নিকুণ্ডে পতঙ্গ পতনের মত বিহারীলাল চলে গেলেও তার কবিতার পথ ধরে আসে—সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, দেবেন্দ্রনাথ সেন, গোবিন্দচন্দ্র দাস, অক্ষয়কুমার বড়াল, ডিএল রায় ও রবীন্দ্রনাথ। প্রথম মহাযুদ্ধের মাধ্যমে বদলে যাওয়া ইউরোপীয় চেতনার প্রভাব পড়ে আমাদের জীবন ও সাহিত্যে। দু’দণ্ড দেরিতে হলেও সেই প্রভাব আমাদের কবিতায় এসে ভালভাবেই পড়ে। আধুনিক কবিতাগুলো বিশশতকের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হয়ে ওঠে।
বিশশতকের গোড়ার দিকে বাংলা কবিতায় রবীন্দ্র-যুগ চলাকালে রবীন্দ্রাগুনে পুড়েছেন অনেকেই। তবে রবীন্দ্র-বলয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টাও করেছেন অনেকে। তাদের মধ্যে মোহিতলাল, যতীন্দ্রনাথ বিশেষ করে কাজী নজরুল ইসলাম। যিনি একইসাথে প্রেম ও দ্রোহের কবি। তার কবিতায় যেমন বিদ্রোহ আছে তেমনি আছে কৈশোরিক প্রেমের কাতরতা। বিশ শতকের তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি সময়ে আধুনিক কবিতার রমরমা হাট বসে বাংলা সাহিত্যে। বাংলা কবিতায় বাঙালির প্রথাগত বিশ্বাস, সুন্দর, কল্যাণ, আবেগ, স্বপ্ন, সুখ-দুঃখ ও কাতরতা বিসর্জন দিয়ে আধুনিক কবিগণ নগরের কথা ও ক্লান্তি, অবিশ্বাস, নিরাশার কথা ফুটিয়ে তোলেন কবিতায়। কবিতায় পাল্টে যায় বাঙালির চেতনা। বুদ্ধদেব, জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু ও অমিয়, এই পাঁচজন কবিকে রবীন্দ্রনাথের পর আধুনিক কবিতা সৃষ্টিকারী বাংলা ভাষার প্রধান কবি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কিন্তু তারপর অচিরেই এই পঞ্চকবিকে অনুসরণ করে আসলেন সমর ও সুকান্ত।
সাহিত্যে রক্ষণশীলতা ও প্রগতিশীলতা মুখোমুখী দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় প্রায়শই। বিশ শতকের গোড়াতেই আধুনিক সাহিত্যকে অশালীন বলে গালিগালাজ করে প্রবন্ধ ও বই ছাপেন ঊনিশ শতকের বিভিন্ন রক্ষণশীলেরা। আসলে সাহিত্য কখনো অশালীন বা অশ্লীল হয় না। বিশেষ করে কবিতা। কবিতায় সব বলা যায় সব রকম ভাবে। এছাড়া অশ্লীল কথাটি আপেক্ষিক। শ্লীল-অশ্লীল নিয়ে বাগ-বিতণ্ডা না করে বরং সাহিত্যকে নিরপেক্ষ মন ও মননেই দেখা উচিত। ইতিহাস থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, যখনই রাষ্ট্রযন্ত্র বা শাসকশ্রেণি সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর শাসন-শোষণ, অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে তখনই যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখচ্ছবি, অর্থাৎ কবি-সাহিত্যিকরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন কবিতা অথবা নানা ধরনের গদ্য রচনার মাধ্যমে। যে সাহিত্যগুলো নানাভাবে বিভিন্ন আন্দোলনেও প্রেরণা জুগিয়েছে। ঊনবিংশ শতককে কখনো বলা যায় বাংলা গণসংগীতের স্ফুরণকাল। সেভাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও দেশ ভাগের পর পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন আন্দোলনের হাত ধরে রচিত হয়েছে বহু প্রতিবাদী সাহিত্য, কবিতা ও গণসংগীত। পাকিস্তানিরা প্রথম যখন আমাদের ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানলো, শুরু হলো আন্দোলন। মাহবুব উল আলম চৌধুরী লিখলেন একুশের প্রথম এবং অমর এক কবিতা—‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসীর দাবী নিয়ে এসেছি’। তবে একুশের প্রথম কবিতাটি ইতিহাস থেকে প্রায় হারিয়েই গেছে। অর্থাৎ, হানাদারদের বহু হয়রানি ও তল্লাশির দাপটে কবিতাটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারিসহ কবির বাসা কয়েকবার সার্চ করে লুকানো দু’একটি কপি পর্যন্ত নিয়ে যায় পুলিশ। পরবর্তীতে কবিতাটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে শহীদ আসাদের শার্ট নিয়ে লিখলেন শামসুর রাহমান, যা আন্দোলনকে বেগবান ও সফল করে তুললো। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রচিত হয়েছে বহু প্রতিবাদী ও প্রেরণাদীপ্ত কবিতা, সাহিত্য এবং গণসংগীত। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর নির্মলেন্দু গুণ সামরিক শাসনের কড়া পাহারার মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে (১৯৭৭) বীরদর্পে পড়ে শোনালেন তার অগ্নিঝরা কবিতা—
“সমবেত সকলের মত আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি
রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেই সব গোলাপের একটি গোলাপ
গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায়
শেখ মুজিবের কথা বলি।”
নির্মলেন্দু গুণ-ই প্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কবিতার বিষয় করে তুললেন। তারপর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখলেন জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামালসহ আরো অনেকে। অর্জুনের মত বীর সময় দোষে নপুংসক সাঁজলেও কবি কখনো তেমনটি হয় না বা হওয়া উচিত না। কবি হবে মজলুম, প্রয়োজনে নির্বাসিত। বলবে মানুষের (সংখ্যাগরিষ্ঠ) কথা, মানবতার কথা। রুদ্র পেলেন বাতাসে লাশের গন্ধ আর তসলিমা সব বয়স্কা বালিকাদের গোল্লা হতে ছুটে বেরুনোর আহ্বান জানালেন কবিতায়। তারপর ’৯০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত হয় কিছু প্রতিবাদী কবিতা ও গণসংগীত।
ইতিহাসের একটি বিশ্লেষণে প্রতিভাত হয় যে, ’৯০-এর দশকের পর থেকে কবিতার পাঠক সংখ্যায় যেন ভাটা পড়েছে। ইদানীং কবি দেখলেই বলাবলি শুরু হয়—কবিতার এখন আর দিন নেই, কবিতা এখন পাঠক খায় না, কবিতার বই বাজারে কাটে না ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে এখানেই ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে যে তথাপি কবির সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে বৈ কমছে না। বিশেষতঃ কবিতা প্রকাশ করতে এখন আর প্রকাশকের পেছনে লাইন দিতে হয় না। চাইলেই ফেসবুক ওয়ালে কবিতা ছুড়ে দেয়া যায়। হাইকোর্টের সামনে থেকে মূর্তি সরানো ও অন্যত্র স্থাপন নিয়ে এখনি সহস্র কবিতা ছুড়ে দেয়া যায়। এখন মিনিটে মিনিটে রচিত হচ্ছে কবিদের ভ্রুণের চেয়েও বেশি সংখ্যক কবিতা। প্রযুক্তির কল্যাণে কবি ও কবিতার পাঠক এখন একবারে মুখোমুখী দণ্ডায়মান। এটা ভাল। কিছুদিন পূর্বেও যেটা সম্ভব ছিল না খুব বেশি। শাসন-শোষণ, অত্যাচার-নির্যাতন বা আগ্রাসন কি এখন হচ্ছে না? তবে আমরা সে রকম কোনো কবিতা পাচ্ছি না—কিন্তু কেন?
আজকাল কবিতার বিষয় কী কী, সেটা কিন্তু আমরা হাতের মুঠোয়-ই দেখতে পাচ্ছি। আমরা আজ যা হাতের মুঠোয় দেখতে পাচ্ছি তা যদি নজরুল আগেই বলে যেতে পারেন তার কবিতায়, তাহলে কী আমাদের এখনকার কবিগণ আগামী বিশ্ব সম্পর্কে ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাদের কবিতায়, অথবা এর চেয়েও পরবর্তী কিছু। আজকাল কবিতায় নারীকে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, বিদ্যমান প্রাকৃতিক পরিবেশের চিত্র কবিতায় কতোটা স্থান পাচ্ছে নিশ্চয়ই চর্যাপদে বর্ণিত বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর এখনকার সৌন্দর্য এক হবে না। মঙ্গলকাব্য পড়ে যদি বাংলাদেশের মধ্যযুগের সামাজিক অবস্থা (ইতিহাস) জানা যায়, তবে আমাদের আজকের কবিদের কবিতা বা সাহিত্যে সমকালীন পঁচনশীল পুঁজিবাদের ভোগসর্বস্ব কায়েমী স্বার্থবাদী ও পাশাপাশি আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তি মানসিকতার যে সমকালীন সমাজ বাস্তবতা, সেই সমাজ বাস্তবতার ঠাঁই পাওয়াটাই স্বাভাবিক।
বাঙালির জমিতে কলের লাঙল পড়েছে, ছনের চাল হয়েছে টিনের এবং সেই চালে বসেছে কাক, শাদা কাক। মোড় নিচ্ছে আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা। নেওয়াটাই হয়তো স্বাভাবিক। সময়কে তো আর অস্বীকার করা যায় না। কালে কালে মহাকাল অবধি কবিগণই মানুষের সমস্ত অনুভূতি কে বাঁচিয়ে রাখে। কবিদের গর্ভেই বাঁচে মানুষ। আমাদের এই কবিসকল কি পারবেন মানুষের মানবিক অনুভূতিগুলোকে কবিতায় বন্দি করে মহাকাল অবধি দীর্ঘজীবন দিতে নাকি ফেসবুক বা প্রযুক্তি নামক কালের গর্ভে হারিয়ে যাবেন কাক ও কাল যত কিছুকেই আমরা আপন করে নিই না কেন? তাতে কোনো দোষ নেই, তবে লৌকিক বাংলার গভীর মানবিক চেতনার স্বকীয়তা কতটুকু বজায় থাকছে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যে বাংলা সাহিত্যের দেবী চিরকাল কাব্যজীবি, কবিতার স্বাদ ছাড়া সে বাঁচবে কী করে। আমরা কি কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি?
নবম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা
সম্পাদকীয়, অনুপ্রাণন–১০ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা
শিল্প-সাহিত্যে নারীর ভাষা, ভাষ্য ও দৃষ্টিকোণ নির্মাণে শিল্পী ও সাহিত্যিকদের ভূমিকা
ভাষা সমভাষীদের মধ্যে ভাব বিনিময়ের সহজ ও বোধগম্য উপায়। কিন্তু যখনই বৈষম্যমূলক সমাজ জাতি, বর্ণ, ধর্ম, শ্রেণি, অঞ্চল ও লিঙ্গভেদ সৃষ্টি করে, তখন সমভাষীদের মধ্যে নানারকম উপভাষা, আঞ্চলিক ভাষা এবং একইসাথে উপ-সংস্কৃতিতে জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ে। ভাষা ও ভাষ্যের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে তর্ক ও ক্ষেত্রবিশেষে বিবাদ দেখা দিতে পারে। শব্দ ও বাক্যের ব্যবহার ভেদের সাথে সাথে উচ্চারণেরও নানা ভেদ ও ব্যতিক্রম সৃষ্টি হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, বাক্যগঠন, শব্দ ব্যবহার এবং উচ্চারণে বিভেদ ঘোচালেই মানুষে মানুষে বাস্তব ভেদাভেদসমূহ দূর হয়ে যায়। সমাজে যে সকল বর্ণ, শ্রেণি, লিঙ্গ ও অন্যান্য প্রকার ভেদাভেদ রয়েছে, সেসব ভেদাভেদের শেকড় সমাজের গভীরে নিহিত। এ সকল ভেদাভেদের পেছনে কলকাঠি নাড়ে ইতিহাস, পরম্পরা, প্রথা, প্রচলন, শাস্ত্র, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক-সামাজিক তত্ত্ব ও দর্শন। এসব ইতিহাস, পরম্পরা, প্রথা, প্রচলন, শাস্ত্র এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক-সামাজিক তত্ত্ব ও দর্শন নির্মাণ ও বর্ণনার ভাষা, ভাষ্য, শব্দ, বাক্য ও বাগধারার একটি নির্দিষ্ট ছক থাকে। প্রতিষ্ঠাতার নিজের অবস্থান সুরক্ষিত করার জন্য সংগঠিত, অন্যদিকে বৈষম্য দূর করার জন্য পরিবর্তন ও মানবিক বিকল্পের প্রয়াসে যারা ভাষা, ভাষ্য, শব্দ, বাক্য, বাগধারা অথবা প্রবাদের আলোচনা-সমালোচনা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করায় ব্রত রয়েছেন, তারা যেন এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অথবা যদি তাদের কোনো সংগঠন থেকে থাকে, তবে সেটাও নিতান্ত দুর্বল।
সরল ও স্বাভাবিকভাবে দেখলে শিল্প-সাহিত্য দেশ, সমাজ, রাষ্ট্রের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং চলমান ঘটনারই প্রতিফলন। তাই সমাজে বিরাজমান ভেদাভেদ ও বৈষম্যের প্রতিফলন শিল্প-সাহিত্যে এসেছে। কিন্তু সবক্ষেত্রে সেসব প্রতিফলন যে, সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত ছিল তা নয়। ক্ষমতাশালী শ্রেণি-গোষ্ঠী, তাদের মত ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রচার ও প্রসারে যেমন ব্রতী হয়েছে, তেমন একইভাবে নানারকম লিখিত-অলিখিত সেন্সরশিপ আইনের প্রকাশ্য অথবা আড়ালে প্রয়োগ করার মাধ্যমে ক্ষমতার বাইরের শ্রেণি-গোষ্ঠীর প্রতিবাদী মানবিক ও নান্দনিক শিল্প-সাহিত্যকে দমন করেছে, নিশ্চিহ্ন করেছে অথবা নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছে নিষ্ঠুরভাবে। কোনো ভালো অথবা ন্যায্য কাজেও সমাজের ক্ষমতাধরদের রাগ-বিরাগ দেখা দিলে সেসব কাজ নিরুৎসাহিত করার উপায় নানাভাবেই উদ্ভাবিত হয়েছে, সুকৌশলে এসবের প্রয়োগ হয়েছে এবং হচ্ছে।
সুতরাং শিল্প-সাহিত্যে নারীর অংশগ্রহণ, নারীর ভাষা, ভাষ্য ও দৃষ্টিকোণ নির্মাণের পথে এক দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করা; এমনকি আত্মদানের অতীত ইতিহাস রয়েছে, যা কি-না সমকালীন সমাজেও চলমান রয়েছে। শিল্প-সাহিত্য শরীরী কোনো খেলা নয় যে, সেটার জন্য দুটো পৃথক মাঠ থাকবে, যেমন—পুরুষ ফুটবল-নারী ফুটবল বা পুরুষ হকি-নারী হকি। শিল্প-সাহিত্য বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ। নারী ও পুরুষের মাঝে বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতার বিভেদ রেখা টানার বিধান শাস্ত্রে উল্লেখ করে এই বিভেদ রেখাটাকে স্থায়ী করার চেষ্টা হয়েছে এবং সেই চেষ্টা চলমান রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, নারী ও পুরুষের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো বৈষম্য নেই। তাই যত চেষ্টাই করা হয়ে থাকুক না-কেন, শিল্প ও সাহিত্যচর্চার মাঠটাকে নারী-পুরুষে ভাগ করা যায়নি।
একজন শিল্পী অথবা সাহিত্যিককে প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থার বাস্তবতার সাথে লড়াই করেই নিজের স্থান করে নিতে হয়। আমরা বিষয়টা বুঝে নিতে পারি যে, কেন ইতিহাসে একজন পুরুষ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি পাওয়া যায়, কিন্তু একজন নারী মাইকেলেঞ্জেলো পাওয়া যায় নাই। প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাসে আমরা উল্লেখযোগ্য কোনো নারীশিল্পী অথবা সাহিত্যিকের নাম দেখতে পাই না। যদিও এসবকালে মৌখিক সাহিত্য রচিত হয়েছে, যা কি-না পরবর্তীতে নামহীন সাহিত্য হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এমনকি রেনেসাঁর যুগেও যখন শিল্প ও সাহিত্যের ব্যাপক জাগরণ ঘটেছিল, তখনও আমরা কি সে-রকম উল্লেখযোগ্য নারীশিল্পী অথবা সাহিত্যিকের নাম পাই? বস্তুত আধুনিক যুগে এসেই বহু লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নারীরা রচিত শিল্প-সাহিত্যে যেমন স্বমহিমা ও মর্যাদার স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে সে-রকম নিজের অসীম মানসিক শক্তি অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বল্প সংখ্যায় হলেও শিল্প ও সাহিত্যের জগতে শিল্পী অথবা লেখক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এসব কারণে নারীদের হৃদয়ের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মাত্রাটা অনেক সময়েই সমাজসচেতন ব্যক্তির কাছেও অননুধাবনযোগ্য হয়ে পড়ে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ভয়ার্ত শৈশব, অব্যক্ত কৈশোর, বৈষম্যের যৌবন, অতৃপ্তির দাম্পত্য, সামাজিক নিষ্পেষণ যে বিষয়বৈচিত্র্য, কোনোরকম রাখঢাক না করেই সেসব কাহিনির কতটা বাস্তবে উন্মোচন ও প্রকাশে সমাজ সাহসী হয়ে উঠবে? কিন্তু ইঞ্চি ইঞ্চি করে হলেও কুসংস্কারগুলো ঝেড়ে ফেলে সমাজ একটু একটু করে এগিয়েছে।
কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিল্প-সাহিত্যে নারীর অবয়বকে জন্মদাত্রী মায়ের অথবা যৌন আবেদনময়ী রমণীর বিভিন্ন প্রতীকী উপস্থাপন হয়েছে অনেকটা সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো করে। নারীকে শৃঙ্খলিত করার জন্য যেমন প্রতীক সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি নারীমুক্তির জন্যও প্রতীক রয়েছে। নারী নিজে কখনো প্রতীক হয়েছেন, নারীর পোশাকে প্রতীক ছড়িয়েছে, নারীকে অবমাননার জন্য প্রতীকের ব্যবহার হয়েছে। নারীর প্রতীকী উপস্থাপন শিল্পকলায়, সাহিত্যে, সভ্যতায় যেভাবে এসেছে, বাস্তবের নারী সেখান থেকে বহুদূরেই রয়ে গেছে। অথবা পুরো বিশ্বব্যবস্থা নারীকে প্রতীকী উপস্থাপনের মাধ্যমে বেঁধে ফেলতে চেয়েছে, নারী কেবলই সেই বাঁধন ছিঁড়ে বেরোবার জন্য নিরন্তর যুদ্ধ করে যাচ্ছে। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অজস্র প্রতীকের অচলায়তন ভেঙে এগিয়ে যাওয়াটাই নারী জীবনের প্রতিদিনের সংগ্রাম।
শিল্প-সাহিত্যে নারীর প্রবেশ ও অগ্রগতির পথে সমস্যার ব্যাপ্তি ও গভীরতা অনুধাবন করার জন্য নারীশিল্পী ও সাহিত্যিকদের শিল্প-সাহিত্য জগতে প্রারম্ভিক প্রবেশ করা, এগিয়ে আসা এবং অগ্রগতির বিষয়গুলো উল্লেখ করে, আমরা কিছুটা আলোচনা করতে পারি। সভ্যতার হাজার হাজার বছর পেরিয়ে গেছে যখন শিল্প-সাহিত্যচর্চায় একমাত্র পুরুষদেরই পদচারণা ছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপ যখন ধীরে ধীরে রেনেসাঁর দিকে গুটি গুটি পা বাড়াচ্ছিল, তখনও মাত্র অল্প কয়েকজন নারীশিল্পী অথবা সাহিত্যিক রেনেসাঁর প্রস্তুতি পর্বে ‘মর্ত্যরে ভগবান’ তথা পুরুষদের বাধা অতিক্রম করে নিজেদের প্রকাশ্যে নিয়ে আসার জন্য কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। এই সারিতে যে আটজন নারীর নাম উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা হয়ে থাকে, তারা হচ্ছেনÑ সোফোনিসবা এঙ্গুইসোলা, লেভিনা তিরলিঙ্ক, লাভিনিয়া ফনটানা, ক্যাথারিনা ভন হেমেসিন, এলিজাবেথ সিরানি, ক্লারা পিটার্স, জুডিথ লেইস্টার এবং আর্টমেসিয়া জেনটিলেসিন।
কিন্তু তারও অনেক পূর্বে সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীকালে পারস্য ও মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে সহস্রার্ধ মৌখিক গল্প মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে সম্রাট শাহরিয়ারের স্ত্রী শাহ্রজাদের কথাসাহিত্য হিসেবে। শাহ্রজাদের সৌভাগ্য যে, ইতিহাস তার নামটি মুছে বেনামী নামকরণ করেনি। পৃথিবীর কথাসাহিত্যের জগতে এ-রকম নানা বিষয়ভিত্তিক ১০০১টি গল্পের রচনা বিস্ময়কর, যেখানে প্রতিটি গল্পের শেষে সম্রাটের কাছে তার স্ত্রী শাহ্রজাদের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করার প্রার্থনা গৃহীত হওয়ার কথা যুক্ত রয়েছে। সিন্ধু সভ্যতায় গুহাচিত্র ও পাথরের ভাস্কর্যে নারী জন্মদাত্রী মাতা অথবা যৌন আবেদনময়ী বস্তু হিসেবেই চিত্রিত হয়েছে। বৈদিক পর্বে শাস্ত্রমতে, নারীর অবস্থান জন্মদাত্রী মাতার অবস্থান হিসেবে নারীকে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নির্দিষ্ট করে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, এই মর্যাদা লাভের কারণে নারী-পুরুষতন্ত্রের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত ছিল। বাস্তবে প্রাক-উপনিবেশবাদ আমল পর্যন্ত সিন্ধু ও ভারতীয় সভ্যতায় নারী, বংশ রক্ষাকারী মাতার বাইরে আর অন্য কোনো পরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠতে পারে নাই। চীন সভ্যতায়ও সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীতে তাং রাজত্বকালে নারীদের অবস্থানে স্বকীয়তা অর্জনের কিছু সুযোগ গ্রহণ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো নারীশিল্পী অথবা সাহিত্যিকের নাম পাওয়া যায় না। নারীদের নান্দনিক ক্ষুদ্র অঙ্কন ও সুচি শিল্পের নিদর্শন জাদুঘরে দেখতে পাওয়া যায়। বিশ্বসাহিত্যে প্রথম নারী কবি প্রাচীন গ্রিসের স্যাফো। ষষ্ঠ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে নব কবিদের একজন ছিলেন এই গীতিকবি। চর্যাপদকে বলা হয় বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন। চর্যাপদের পদকর্তাদের মধ্যে একজন নারী পদকর্তা ছিলেন বলে মত প্রকাশ করেছেন ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়। এই নারী পদকর্তার নাম কুক্কুরিপা। রজকিনীকে অনেকে চেনেন চণ্ডীদাসের প্রেমিকা হিসেবে। তাঁর আরেকটি পরিচয় আছে, তিনি একজন কবি। তিনি রামী ও রামমনি—এই দুই নামে কবিতা লিখতেন। তাঁর পদগুলোর নাম ছিল রামীর পদ। ঋগে¦দ-এ কয়েকজন নারী দার্শনিকের নাম পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে একজন লোপামুদ্রা। তিনি কৌষীতকি নামেও পরিচিত ছিলেন। ঋগে¦দে ২৭ জন নারী ঋষির রচিত সূক্তের উল্লেখ রয়েছে। ইতিহাসে এসব উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সংখ্যাবিচারে বলা যেতে পারে যে, বস্তুত আধুনিক যুগে এসেই নারীরা শিল্প-সাহিত্যে ধীর লয়ে প্রবেশ করার সুযোগ গ্রহণ করে, যখন শিল্প-সাহিত্যে নারীর ভাষা, ভাষ্য ও দৃষ্টিকোণ নির্মাণের বিবরণ পাওয়া যায়।
বাংলা ভাষায় প্রথম নারী কবি চন্দ্রাবতী। তাঁর রচিত রামায়ণে তিনি রামের পুরুষালি বাহুবলের পরিবর্তে সীতার বঞ্চনা ও পীড়নের বর্ণনাকে মাহাত্ম্য দিয়েছেন। বলা যায়, নারীকবি চন্দ্রাবতী বাংলা সাহিত্যে নারীর ভাষা, ভাষ্য এবং দৃষ্টিকোণ নির্মাণের সূচনা করেন। নারী লেখক রচিত প্রথম উপন্যাসের নাম মনোত্তমা। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৬৭ সালে নবপ্রবন্ধ পত্রিকায়। তবে এ উপন্যাসের লেখকের কোনো নাম জানা যায়নি। লেখক-নামের স্থলে কেবল লেখা ছিল ‘হিন্দুকুল-কামিনী প্রণীত’। আবার বাঙালি মুসলমান নারীদের মধ্যে প্রথম পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যগ্রন্থ রচনা করেন ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী। ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর বইয়ের নাম ছিল রূপজালাল। ওই বছরই ঠাকুর পরিবারের মেয়ে ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় বোন স্বর্ণকুমারী দেবী লেখেন উপন্যাস, ‘দীপ নির্বাণ’। এ ছাড়া পৃথিবীর প্রথম নারী ঔপন্যাসিক বলা হয়, জাপানি লেখিকা মুরাসাকি শিকিবুকে। তাঁর উপন্যাসের নাম গেঞ্জি, যার ইংরেজি অনুবাদ দ্য টেল অব গেঞ্জি। বাঙালি মুসলমান নারীদের মধ্যে প্রথম গদ্যরচনার কৃতিত্ব হলো তাহেরুন্নেসার। ১৮৬৫ সালে ‘বামাগণের রচনা’ নামে বামাবোধিনী পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল তাঁর গদ্য। বাঙালি মুসলমান নারীদের মধ্যে প্রথম ঔপন্যাসিক হলেন এস এফ খাতুন। ১৯২১ সালে লেখা তাঁর উপন্যাসের নাম জোবেদা।
নারী শিল্পী ও লেখকদের শিল্প ও সাহিত্য রচনার কাজে নিয়োজিত হওয়ার পথ কখনো মসৃণ ছিল না—এখনো নেই। অন্যদিকে নারী অথবা পুরুষ শিল্পী ও সাহিত্যিকদের দ্বারা নারীর সামাজিক সমস্যাগুলো চিত্রিত করার কাজেও বিস্তর বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এ সকল পরিস্থিতিতে নারীদের মধ্যে শিল্প-সাহিত্যে আধুনিক নারীর সংগ্রামের ভাষ্য ও রূপরেখা নিয়ে নানা মতভেদও দেখা যায়। প্রশ্ন উঠেছে, এসব মতভেদ শিল্প-সাহিত্যে নারীর অবস্থান সৃষ্টিতে নারী আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কি-না? তবে আমরা মনে করি, মতভেদ থাকবেই এবং এসব মতভেদ দ্বান্দ্বিক নিয়মেই দূরীভূত হয়ে একটি নতুন স্তরে উন্নীত হতে পারে।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, শিল্প ও সাহিত্যে নারীর সরব উপস্থিতি কামনা করে। অনুপ্রাণন আশা করে, শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যম দিয়ে নারীর ভাষা, ভাষ্য এবং দৃষ্টিকোণ ক্রমেই সমাজে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করার কাজে যেন অগ্রসর হতে পারে।
১০ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার দ্বিতীয় পর্ব—সম্পাদকীয়
প্রকাশিত হয়েছে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা—সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার দ্বিতীয় পর্ব। অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিকের ১০০ গল্প ও গল্পকার আয়োজনের এটা দ্বিতীয় পর্বের প্রকাশনা। ইতিপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকারে প্রথম পর্বে আমরা নির্বাচিত ১০০ জন গল্পকারের মধ্যে বয়স অনুক্রমে জ্যেষ্ঠ থেকে কনিষ্ঠ এবং লেখা প্রাপ্যতার ভিত্তিতে ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি তাদের একটি করে উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা প্রকাশ করেছি। একইভাবে এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে নির্বাচিত ১০০ জন সাম্প্রতিকের গল্পকার থেকে বয়স অনুক্রমে জ্যেষ্ঠ থেকে কনিষ্ঠ এবং লেখা প্রাপ্যতার ভিত্তিতে আরও ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি তাদের একটি করে উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা।
সাম্প্রতিকের গল্পের বিষয় ও বৈশিষ্ট্যে বাঁকবদল এবং বিশেষ করে গল্পে উত্তর-আধুনিক প্রবণতা নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হয়েছে, লেখালেখি হচ্ছে। উত্তর আধুনিক সাহিত্য, বিশেষ করে উত্তর-আধুনিক ছোটগল্পের বিষয় ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে স্বতন্ত্র এবং অধিকাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য বয়ান, সুনিশ্চিত বর্ণনা পাওয়া কঠিন। তাছাড়া উত্তর-আধুনিক প্রবণতা বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত। কোনো কোনো সময় এই প্রবণতার মধ্যে ভূতের মতো পেছনে হাঁটার অর্থাৎ পশ্চাদপদতার ভূত সওয়ার হতেও দেখা যায়।
উত্তর-আধুনিক গল্পে প্রায়শই ক্ষমতা, আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এটি রাষ্ট্রীয়, সামাজিক বা পারিবারিক হতে পারে। ব্যক্তি কীভাবে একটি নির্দিষ্ট সিস্টেম বা কাঠামোর মধ্যে শৃঙ্খলিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়, গল্পগুলোতে তা দেখানো হয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক বন্দোবস্তের চাপ কীভাবে মানুষের মনন ও আচরণকে প্রভাবিত করে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে গল্পগুলোতে প্রস্ফুটিত হয়েছে। প্রচলিত বাস্তবতার বাইরে গিয়ে মানুষের মানসিক ও অস্তিত্বের গভীর জটিলতা, দ্বিধা ও সংঘাতকে তুলে ধরা হয়েছে। আধুনিক সমাজে ব্যক্তি কীভাবে বিচ্ছিন্ন ও অসহায় বোধ করে, বা কীভাবে ব্যক্তি তার চারপাশের সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে লড়াই করে, তা উত্তর-আধুনিক গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দেখা যায়। তাছাড়া গল্পে ঘটনার ক্রম প্রায়শই অ-রৈখিক অর্থাৎ ধারাবাহিক না হয়ে খণ্ডিত ও বিক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। রূপ ও আঙ্গিকের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে যেখানে গল্প বলার ধরন ও ভঙ্গিতে নতুনত্ব আনা হয়েছে। প্রচলিত ধারা বা কাঠামোর বাইরে গিয়ে পরীক্ষামূলক আঙ্গিক ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো কোনো গল্পে একটি একক ও সম্পূর্ণ আখ্যানের পরিবর্তে, খণ্ডিত আখ্যান কাঠামোতে গল্পগুলো অনেক সময় খণ্ড খণ্ড অংশ নিয়ে গঠিত হতে দেখা গেছে যা পাঠককে নিজস্বভাবে একটি অর্থ সৃষ্টি করতে উৎসাহিত করতে পারে। তাছাড়া উত্তর-আধুনিক গল্পে ঐতিহ্যগত কাঠামোর ভাঙন ঘটতে দেখা যায় যেমন কোন একটি নির্দিষ্ট প্লটের অনুপস্থিতি। উত্তর-আধুনিক গল্পগুলোতে বাস্তবতার নতুন ব্যাখ্যা অর্থাৎ প্রচলিত বা বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতার বাইরে গিয়ে এক নতুন ও ভিন্ন বাস্তবতাকে উপস্থাপন করতে দেখা গেছে, যেখানে মনস্তাত্ত্বিক বা প্রতীকী দিকগুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। একে অপরকে ছাড়া এগুলোর অস্তিত্ব থাকতে পারে না। শিল্প-সাহিত্য যেমন মানুষের আবেগ, চিন্তাভাবনা ও অভিজ্ঞতার সৃজনশীল প্রকাশ, অন্যদিকে সংস্কৃতি হলো একদল মানুষের ভাগ করা জীবনযাত্রার মধ্যে রয়েছে তাদের ঐতিহ্য, বিশ্বাস, সভ্যতা, জীবনযাত্রা, মূল্যবোধ ও রীতিনীতি। শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত হয় এবং সংস্কৃতি শিল্পকে অর্থ ও দিকনির্দেশনা দেয়। শিল্প ও সংস্কৃতির মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক দেখায় যে মানুষ কীভাবে তাদের পরিচয় প্রকাশ করে এবং কীভাবে তারা জীবনযাপন করে। সংস্কৃতি থেকেই শিল্প-সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। প্রতিটি সমাজ নিজস্ব শিল্প-সাহিত্যের রূপ সৃষ্টি করে—চিত্রকলা, সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য, স্থাপত্য ও কারুশিল্প- যা তার ইতিহাস ও পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করে। উদাহরণস্বরূপ, ধ্রুপদি নৃত্য ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে লোকগান গ্রামীণ জীবনের আনন্দ ও দুঃখকে প্রতিফলিত করে। একইভাবে, বিভিন্ন দেশের শিল্প-সাহিত্য তাদের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য দেখায়। শিল্প ও সাহিত্যের মাধ্যমেই মানুষ তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেয়।
সংস্কৃতি আমাদের শিল্প ও সাহিত্যকে বোঝার এবং মূল্য দেওয়ার ধরনকেও প্রভাবিত করে। একটি সমাজ যাকে সুন্দর বা অর্থবহ বলে মনে করে তা অন্য সংস্কৃতিতে ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, উপজাতীয় শিল্প সম্প্রদায়ের জীবন প্রকৃতির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, অন্যদিকে আধুনিক শিল্প প্রায়শই ব্যক্তিগত আবেগ ও সংগ্রাম প্রকাশ করে। এটি দেখায় যে শিল্প ও সাহিত্য কেবল একটি ব্যক্তিগত সৃষ্টি নয় বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পণ্যও। একই সঙ্গে, শিল্প সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতাকে প্রভাবিত করে। এটি মানুষের ধারণা পরিবর্তন করতে পারে, সামাজিক আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং ঐক্য তৈরি করতে পারে। শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা তাদের কাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা, শান্তি প্রচার করতে এবং মানবিক মর্যাদা উদযাপন করতে ব্যবহার করেন। এইভাবে, শিল্প ও সাহিত্য সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং রূপান্তরের জন্য একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। যখন মানুষ গল্প, সংগীত বা চিত্রের মাধ্যমে শিল্প অনুভব করে তখন তারা আবেগ এবং ধারণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় যা তাদের সংস্কৃতিকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে। তাই শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক— প্রতিফলিত ও গতিশীল উভয়ই। শিল্প ও সাহিত্য যে সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত সেখানে তার প্রতিফলন ঘটায় এবং একইসঙ্গে সংস্কৃতি শৈল্পিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিকশিত হয়। পারস্পরিকভাবে তারা মানবতাকে তার অতীত সংরক্ষণ করতে, তার বর্তমান বুঝতে এবং তার ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে সহায়তা করে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের যোগসূত্রের সেতু ভাঙার যারা আয়োজন করতে চায় তারা জাতির শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির কোনো না কোনো অঙ্গ পঙ্গু করার অপকর্মটাই করতে চায়।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 3; Contemporary Stories & Storytellers (Part-2)
‘চিন্তকের খসড়া খাতা’ একজন চিন্তাশীল লেখকের সৃজনশীল চর্চার একটি দলিল। আর এই দলিলটির মুসাবিদা করেছেন কবি, কথসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক স্বপঞ্জয় চৌধুরী। সাহিত্যের বহু বিচিত্র পথের বহুবর্ণিল প্রকৃতিকে তিনি যূথবদ্ধ করেছেন তেইশটি প্রবন্ধে। বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য তিনি এমনভাবে বিন্যন্ত করেছেন যাতে একজন জ্ঞানপিপাসু সাহিত্যামোদী যেমন জ্ঞানের এক বিস্তৃত ক্যানভাস পাবেন নিজেকে সমৃদ্ধ করতে তেমনি একজন গবেষক পেয়ে যাবেন অনেক তথ্য উপাত্ত।
যদি তাঁর খসড়া খাতাকে আমরা বিন্যাস করি তাহলে তাতে বহুমুখী প্রবণতা আমরা চিহ্নিত করতে পারি। কবিতায় তিনি নিয়ে এসেছেন নন্দনতত্ত্ব ও শিল্পের কারুকাজ, কবিতার শত্রু-মিত্র, কবিতায় ব্যবহৃত উপমা, অলঙ্করণ ও প্রতীক ইত্যাদি। আলোচনায় তুলে এনেছেন কবি মোহাম্মদ রফিকের কবিতার জীবনবোধ ও প্রকৃতি ভাবনা, অধুনাবাদের কবি ওবায়েদ আকাশ, মাহফুজ আল হোসেনের প্রেম ও বিপ্লবের কবিতা, কবিতার নিভৃত অন্তঃপ্রাণ কবি মোহাম্মদ হোসাইন এবং নির্জনতার কবি পরিতোষ হালদার। তাঁর খসড়া খাতায় স্বপঞ্জয় চৌধুরী তীক্ষ্ণ আলো ফেলেছেন গদ্য সাহিত্যের বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গনে। তিনি বিশ্লেষণ করেছেন পঞ্চাশ বছরের ছোটগল্পের, সাদ কামালীর প্রান্তিক জীবন ভাবনা, শরৎচন্দ্রের প্রেম বিরহ পরিণয় ও পরকীয়া এবং উপন্যাস দিকু’র নিঃসঙ্গ জীবনোপাখ্যানে। বিশেষভাবে আলোকপাত করেছেন হাংরি জেনারেশন মুভমেন্ট, হুমায়ুন আজাদের বহুমাত্রিকতা ও প্রথাবিরোধিতা। পাশাপাশি মিথলজির অঙ্গনেও এঁকেছেন নিজের পদচিহ্ন। তুলে এনেছেন গ্রিক মিথলজির সৃষ্টিতত্ত্ব, নানান দেশের লোকাচার ও মিথ, বাংলা সাহিত্যে গান ও ঈদোৎসব। তিনি তাঁর খসড়ার সম্ভার আরো সমৃদ্ধ করেছেন সিরিয়ান প্রথাবিরোধী কবি নিজার কাব্বানির জীবন ও কবিতার উপর আলোকপাত করে।
বইটির বহুমুখীনতায় সাহিত্যের পাঠকের তৃষ্ণা নিবারণে সক্ষম হবে এই প্রত্যাশা অবশ্যই করতে পারি।
আলী সিদ্দিকী
কবি ও কথাসাহিত্যিক
সম্পাদকঃ মনমানচিত্র
Cintoker Khsra Khata by Swaponjoy Chowdhury
অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব- সম্পাদকীয়
সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম পর্ব প্রকাশিত হওয়ার পর সাম্প্রতিকের আরো ২৫ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কবিতা ও কবিতা নিয়ে সামষ্টিক আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হলো শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব। দ্বিতীয় পর্বের এই ২৫ জন কবির নাম ইতোপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম পর্বের ন্যায় অনুপ্রাণনের ১০০ নির্বাচিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের কবি তালিকা থেকে নেয়া যাদের জন্ম ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হয়েছে। তালিকার অবশিষ্ট ৫০ জন নির্বাচিত কবি নিয়ে লেখা প্রকাশিত হবে আগামীতে প্রকাশিতব্য শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় ও চতুর্থ সংখ্যায়।
সংখ্যাটিতে অন্তর্ভুক্ত সাম্প্রতিকের কবিদের কবিতা নিয়ে আলোচনায় কয়েকটি বিষয় এসেছে যেমন- প্রতিকবিতা, উত্তর-আধুনিকতা, নৈরাজ্যবাদ ইত্যাদি। শুধু কবিতা নয় সামগ্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে নানা পর্যায়ে পরিবর্তনের সূত্র হিসেবে এই দর্শনগুলো নিয়ে আলোচনা আছে। দর্শন হিসাবে উত্তরাধুনিকতাবাদ- যুক্তিবাদীতার বিরুদ্ধে, বস্তুনিষ্ঠতার বিরুদ্ধে এবং সর্বজনীন সত্যের ধারণাগুলিকে প্রত্যাখ্যান করে। যার পরিবর্তে, এটি মানুষের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির বিচিত্রতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির বহুবিধ আপেক্ষিকতার উপর জোর দেয়। উত্তর-আধুনিক কবিতা প্রায়ই অর্থহীনতা অথবা বাস্তবতার অনুপস্থিতি প্রসঙ্গ নিয়ে কাজ করে এবং একটি অস্তিত্বগত দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করে। উত্তর-আধুনিক প্রতিকবিতায় প্রায়ই অস্থিরতার বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করে সাধারণত মুক্ত বিন্যাসে লেখা হতে পারে। কবিতায় অপ্রত্যাশিত লাইন বিরতি, বিশৃঙ্খল কাঠামো- এসব আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন হতে পারে। উত্তর-আধুনিক কবিতা প্রায়শই অস্তিত্ববাদী বা নিহিলিস্টিক প্রসঙ্গ নিয়ে কাজ করতে পারে। যদিও অস্তিত্ববাদ এবং উত্তর-আধুনিকতা সমার্থক নয়, তারা প্রায়শই সম্প্রর্কিত হতে দেখা যেতে পারে।
উত্তর-আধুনিক কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো কী- এই প্রশ্নটির উত্তরে একটা ধারনা দাড় করানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। আপাতত যে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে সেগুলো যেমন, প্রথমত, এলোমেলো ভাব- কেননা উত্তরআধুনিক রচনাগুলি শব্দের পরম অর্থের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। দ্বিতীয়ত, কৌতুকপূর্ণতা- কোন কোন ক্ষেত্রে কালো হাস্যরস, শব্দ নিয়ে খেলা, বিরোধালঙ্কার, বিড়ম্বনা এবং কৌতুকপূর্ণতার অপরাপর কৌশলগুলি যা কিনা প্রায়শই অর্থগুলোকে ঘোলাটে করার জন্য নিযুক্ত করা হয় যেন পাঠক দুর্বোধ্যতার ঘোরে একটি ভিন্নধরনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। তৃতীয়ত, বিবরণে- এমন কতগুলো অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিভাজন নিয়ে আসা যে টুকরোগুলি যুক্ত করে যে কোলাজ হতে পারে সেটা যেনো প্রায়শই অস্থায়ী বিকৃতরূপ ধারণ করে। চতুর্থত, মেটাফিকশন হতে পারে- অর্থাৎ কল্পকাহিনীর এমন বিশেষ একটি রূপ হতে পারে যা প্রকাশের জন্য রচনার বর্ণনামূলক কাঠামোকে এমনভাবে সাজানো হয় যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যই যেন পাঠক/দর্শকদের মনে করিয়ে দেয়া যে তারা একটি কাল্পনিক কাজ পড়ছে বা দেখছে। এবং পঞ্চমত ইন্টারটেক্সচুয়ালটি বা আন্তঃপাঠ্যতা- অর্থাৎ একটি পাঠ্যের অর্থ অন্য এক/একাধিক পাঠ্য দ্বারা প্রকাশ করা- যেটা হতে পারে একটি ইচ্ছাকৃত সৃজনশীল রচনাকৌশল যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে উদ্ধৃতি, ইঙ্গিত, অনুহরণ, কুম্ভিলকবৃত্তি, অনুবাদ, অনুকরণ অথবা প্যারোডি। তবে খেয়াল রাখতে হয় যে প্রতিকবিতা তখনই সফল হয় যখন ছন্দঃপ্রকরণ, ব্যাকরণ এবং অন্ত্যমিলে ইচ্ছাকৃতভাবে করা ভুলগুলোর বিশৃঙ্খলার মাঝে নান্দনিক প্রকাশভঙ্গী নিহিত থাকে।
মধ্যযুগের সাহিত্যে প্রবণতা ছিল সত্য ও মিথ্যার দ্বিমাত্রিক বয়ানের যেখানে পারলৌকিক শক্তি ও পরলৌকিকতা প্রকাশ্যে অথবা আড়ালে ঢুকে পড়েছে সর্বভারত উৎসারিত নিজস্ব নানা কথন বা বয়ান। এর অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও উপলব্ধি নিতান্তই ব্যক্তিক। যখন থেকে নির্ভেজাল ইহজাগতিক সত্যের উপর ভিত্তি করে সাহিত্য নির্মিত হতে থাকল তখন থেকে শুরু হলো আধুনিক সাহিত্য। কবিতায় যেমন উপন্যাসেও তেমন আধুনিক লেখক বস্তুবাদী, নৈর্ব্যক্তিক এবং নির্মোহ। বাঙলার আধুনিক সাহিত্য গঠনে ইউরোপের রেনেসাঁ পরবর্তী কালে রচিত সাহিত্যের প্রভাব রয়েছে। একইভাবে উত্তর-আধুনিক প্রবণতা আমাদের দেশজ দর্শন থেকে উৎসারিত না। কিন্তু, ব্যাপ্তি ও গভীরতায় আধুনিকতার তুলনায় উত্তর-আধুনিকতার বিষয় এবং মিথস্ক্রিয়া বহুবিস্তৃত। বৃহৎ নয়, ক্ষুদ্র; সমগ্র নয়, অংশ; গোছানো কিন্তু শৃঙ্খলাবদ্ধ নয়, এলোমেলো অথবা উদ্ভট; প্রথাগত নয়, নিরীক্ষামূলক; বিভিন্ন ক্ষেত্রের মিশ্রণ এবং মিথস্ক্রিয়া; ন্যারেটিভের অস্পষ্টতা; কোনো সাংস্কৃতিক প্রকল্পে একটি নয় বহু স্বরের সমাহার ইত্যাদিকে মনে করা যেতে পারে উত্তর-আধুনিকতার গুণ বা বৈশিষ্ট্য হিসেবে।
প্রাক-বাংলাদেশ পর্বে কোন কবি নয় বরঞ্চ সাঈদ আহমদ-ই বলা যায় উত্তর-আধুনিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে প্রথম অ্যাবসার্ড ঘরানার নাটক লিখেন। তিনি-ই প্রথম রূপকথা নিয়ে ফ্যান্টাসি ঘরানার নাটক লিখেন যা একই সঙ্গে ছিল এলেগরিকাল। অন্যদিকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অস্তিত্ববাদের ওপর ভিত্তি করে উপন্যাস লিখেন। এঁরা দুজনই বিদেশে প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন এবং পশ্চিম ইউরোপীয় সাহিত্য এবং দর্শনের সঙ্গে বেশ পরিচিত ছিলেন।
রেফারেন্স, প্রতীক, উৎপ্রেক্ষা ব্যবহার করে কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কবিতা এক জটিল সমীকরণে সম্পর্কিত হয়ে একইসাথে আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক স্বভাব ধারণ করেছিলো। উত্তর-আধুনিকতার উল্লিখিত এই প্রধান বৈশিষ্ট্যসমুহ রপ্ত করার পর বাকি যা থাকে সেসব কবিকে তাঁর নিজস্ব শৈলী উদ্ভাবনের মাধ্যমেই স্বাক্ষর রাখার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। উত্তর আধুনিকতার বিশাল ক্যানভাসে বাংলাদেশের কবিতা ক্রমেই মৌলিক, সৃজনশীল ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে।
Quarterly Anupranan 13th Year 2nd Issue, Samprotiker Kabi O Kobita- 2nd Part
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা : সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা তৃতীয় পর্ব- সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিক কালের ১০০ গল্পকারকে নিয়ে চতুর্দশ বর্ষের বিশেষ আয়োজনের পারম্পরিক ধারাবাহিকতার তৃতীয় পর্বে এসে আরও ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে প্রকাশিত হলো সাম্প্রতিকের (জন্ম : ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫) গল্প ও গল্পকার সংখ্যা, তৃতীয় পর্ব। সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার ১ম ও ২য় পর্বের মতো এই পর্ব অর্থাৎ ৩য় পর্বে ২৫ জন গল্পকারের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা প্রকাশের মাধ্যমে নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে এ-পর্যন্ত মোট ৭৫ জন গল্পকারকে নিয়ে তথ্য ও আলোচনাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ প্রকাশের কাজ সম্পন্ন হলো। অবশিষ্ট ২৫ জন গল্পকারদের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা আগামী চতুর্থ পর্বে প্রকাশিত হবে বলে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব নির্মাণের মূল উপাদান হচ্ছে, সময় ও মানুষ। মানুষের চেতনাজাত রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম ও ভৌত প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রভাবিত সমাজ ও সংস্কৃতির বিচার ও বয়ান। গত চার বছর ধরে অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক শিল্প-সাহিত্য ম্যাগাজিনে গত শতাব্দীর প্রথম থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিকদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা প্রবন্ধসমূহ সংকলিত করে যে সহায়ক সাহিত্যসম্পদ প্রস্তুত করা হচ্ছে সে-সকল সহায়ক সম্পদ বা উৎস ব্যবহার করে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গবেষণা হতে পারে। সেই গবেষণার একটি হতে পারে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের সমাজতত্ত্বের বস্তুনিষ্ঠ বয়ান।
আমরা এটা অধ্যয়ন করতে পারি- বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য কীভাবে সমাজ থেকে উদ্ভূত হলো, কী কী বৈশিষ্ট্য ধারণ করল, কীভাবে সাহিত্যে সমাজের প্রতিফলন ঘটাল এবং পাশাপাশি সমাজের ওপর সাহিত্য কী প্রভাব ফেলল? সাহিত্যে, ক্ষমতা, প্রতিযোগিতা ও সামাজিক কাঠামো কীভাবে কাজ করেছিল বা করে যাচ্ছে? এসব অধ্যয়ন থেকে হয়তো আমরা পেতে পারি এই তথ্য যে বাংলা দীর্ঘদিন উপনিবেশ থেকেছে। উপনিবেশ থাকাকালে ভিনদেশি শাসকের রাজনীতি, অর্থনীতির প্রভাবে পড়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির যেমন রূপান্তর ঘটেছে তেমনি বিকৃতিও ঘটেছে। ভিনদেশি উপনিবেশবাদী শক্তির প্রভাবের ফলে বাঙালির মননে এক গভীর আত্মপরিচয় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আর যখনই এই উপনিবেশবাদী মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে ভাষা, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে বাংলার মাটি ও পরিবেশজাত নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ধারায় নিয়ে এসে মুক্তচর্চা করার চেষ্টা বাঙালি করেছে তখনই ঔপনিবেশিক ধারার পৃষ্ঠপোষক ও কট্টরপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীর দিক থেকে আঘাত ও আক্রমণ এসেছে।
এই বিষয় ছাড়াও আমাদের অধ্যয়ন অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হতে পারে। যেমন, সমসাময়িক ছোটগল্পের আলোচনায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- গল্পকারেরা তাদের গল্পে কীভাবে সীমিত স্থান ব্যবহার করে পরিচয়, বিচ্ছিন্নতা, মনস্তাত্ত্বিক বাস্তববাদ এবং সামাজিক বিষয়গুলো (জাতি, শ্রেণি, ভোগবাদ) গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন। তাছাড়াও এই বিষয়েও আলোকপাত করা যেতে পারে যে কীভাবে প্রাণবন্ত চরিত্র, প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রাঞ্জল বর্ণনায় আধুনিক জটিলতাগুলো প্রতিফলিত করার জন্য বিভিন্ন শৈলী (ব্যঙ্গ, ভৌতিক, জাদুকরী বাস্তববাদ) ব্যবহার করা হয়েছে। আলোচনা ও অধ্যয়নে উঠে আসতে পারে যে কোনো কোনো সমালোচক সাম্প্রতিক রচিত গদ্যভাষায় নীরসতা বা অতি-সরলীকরণের প্রবণতার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দ্রুত পড়ে ফেলার উপযোগী করে রচনা করার বাইরে এসে ফর্ম এবং থিমকে আরও গভীরভাবে জড়িত করার প্রত্যাশা করেছেন। কোনো কোনো আলোচক কেবল গল্পের সারাংশে সীমাবদ্ধ না থেকে তার বাইরে গিয়ে গল্পের অর্থ প্রকাশে প্লট, চরিত্র, থিম এবং সাহিত্য কৌশলের (প্রতীকীকরণ, চিত্রকল্প) মতো উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে গল্পের অর্থ প্রকাশে তাদের কার্যকারিতা যথাযথ মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন।
অধ্যয়নে তুলে ধরা যেতে পারে যে সাহিত্য আলোচনাগুলো প্রস্তুত করতে গিয়ে বিশেষ করে চারটি বিষয়ের দিকে গভীর দৃষ্টি প্রদান করার প্রয়োজন হয়েছে। প্রথমেই এসেছে পরিচয় এবং অন্তর্ভুক্তি বোধের মতো বিষয়গুলো। যেমন সাংস্কৃতিক স্থানচ্যুতি, অভিবাসী মনস্তত্ব ও অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বায়িত বিশ্বে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত অথবা জাতীয় আত্ম-অনুসন্ধান। দ্বিতীয়ত, চরিত্র রূপসমূহের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। যেমন, বাস্তব ঘটনাসমূহের সাক্ষাৎ ব্যাখ্যা অথবা স্বগত ও বহুপাক্ষিক সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রগুলোর মনের অভ্যন্তরের জটিল ও অন্ধকার জগৎ উন্মোচন করা। তৃতীয়ত, গল্পের সামাজিক ভাষ্য অর্থাৎ ভোগবাদ, রাজনীতি, জাতি এবং শ্রেণি বিভাজনের সমালোচনা করার জন্য ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ও অ্যাবসার্ডবাদ ব্যবহার করা। এবং চতুর্থত, রূপ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা অর্থাৎ অনন্য কাঠামো, বিভিন্ন অথবা বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গি (উত্তর-ঔপনিবেশিক, নারীবাদী ইত্যাদী) ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, ফ্যান্টাসি এবং জাদুকরী বাস্তবতার মতো ধারাগুলোর সাথে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে ছোটগল্পের আধুনিক বিভাজন বৈশিষ্ট্য আয়ত্তে নিয়ে আসা। কেউ কেউ এটাও মনে করেছেন যে সমসাময়িক গল্পগুলো সংকীর্ণ জনতাত্ত্বিক বা উপরে ভাসা বিষয়গুলোর উপর খুব বেশি কেন্দ্রীভূত হতে দেখা গেছে। তাছাড়া দ্রুত, সহজে হজমযোগ্য গল্পের বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে গভীর, জটিল অভিজ্ঞতা প্রদানের জন্য প্রস্তুত প্রকৃত শৈল্পিক সম্ভাবনাময় গল্পের চাহিদার ক্ষেত্রে ভাটা সৃষ্টি করে থাকতে পারে। সত্যিকার অর্থে উদ্ভাবন না করে নির্দিষ্ট ‘ধরনের’ (যেমন, অকার্যকর পরিবার, সমাজবিচ্ছিন্ন যুবক) উপর খুব বেশি নির্ভরশীল গল্পগুলো একঘেয়েমির উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শিল্প-সাহিত্য মানুষকে ধ্বংস নয় সৃজনশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। গভীর অনুভূতি, বোধ ও সংযোগের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যা ভাষাগত সীমানা ছাড়িয়ে মানুষে মানুষে, সংস্কৃতিতে সংস্কৃতিতে মেলবন্ধন ঘটায়। ব্যক্তি ও সমাজকে সৌন্দর্য, আনন্দ, দুঃখ, প্রেম, বেদনা ও জীবনের গভীরে নিয়ে যায়, যা তাকে আত্ম-অনুসন্ধান ও বিশ্বকে নতুনভাবে উপলব্ধিতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যচর্চা সকল প্রকার সংরক্ষণবাদ মুক্ত হয়ে মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন চেতনাবোধ অব্যহতভাবে ধারণ করে যাবে। সংরক্ষণবাদ মুক্ত মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন এই চেতনাবোধ থেকে বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্যচর্চা বিচ্ছিন্ন করার সকল অপচেষ্টা বাংলাদেশের কবি, গল্পকার, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকেরা মিলিতভাবে রুখে দেবে এটাই বাস্তব।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 4; Contemporary Stories & Storytellers (Part-3)

কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম পাঠক ও বোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য সংগঠন প্রয়োজন। বাংলাদেশের সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও আচার-আচরণের প্রেক্ষাপটে একটি কার্যকরী সংগঠন গড়ে তোলা অনেক শ্রম ও সময়সাপেক্ষ কাজ। বিশেষ করে দেখা যায় যে গণতান্ত্রিক ভাবে পরিচালিত একটি সংগঠনে ভাঙা গড়া লেগেই থাকে যার ফলে কাজের গতি ও পরিধি সবসময়েই ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। অনুপ্রাণন সবসময় নেতিবাচক আলোচনা-সমালোচনাকে এড়িয়ে চলেছে। এর অর্থ এই নয় যে উদ্ভূত সেসব নেতিবাচক বক্তব্যের জবাব আমাদের কাছে নেই কিন্তু আমরা চেয়েছি ইতিবাচক কাজের মাধ্যমেই সেসব নেতিকে নাকচ করার মানসিকতা যেন গড়ে ওঠে। তাই, অনুপ্রাণন সবসময় ইতিবাচক কাজ করে যাওয়ার পক্ষেই শক্তির যোগান দিয়েছে। আমাদের ভালো ভাবে ভেবে দেখা দরকার যে চলমান অস্থির প্রতিযোগিতার পরিবেশে কি-করে শিল্প-সাহিত্য বিশেষ করে কবিতা সাহিত্যের প্রতি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আগ্রহী করে তোলা যায়। একটি বিষয় উল্লেখ করতেই হয় যে, মনে হয় যেন কবিতা পাঠের থেকে কবিতা লেখার আগ্রহই প্রজন্মের বেশী। এই হিসাবটা হয়তো শতভাগ ঠিক না কিন্তু অনুপ্রাণন প্রকাশনে অনেক তরুণ কবিদের দুর্বল কবিতার পা-ুলিপি নিয়ে প্রকাশনার জন্য ভিড় করা দেখে এরকমই মনে হতে পারে। এই বক্তব্যের প্রতি যদিও ভিন্নমত আছে তবুও আমরা মনে করি যে, সর্বক্ষেত্রে না হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কবি, লেখক ও শিল্পীর সৃজনশীল কাজ সত্যিকার অর্থে মূল্যায়িত হতে পারে যদি প্রাতিষ্ঠানিক অথবা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে হলেও তার গড়ে ওঠার পেছনে একটা নির্দিষ্ট ও সুনিবিষ্ট প্রস্তুতি ও চর্চার পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে। ব্যতিক্রম থাকেই কিন্তু সেই ব্যতিক্রমকে উদাহরণ হিসেবে সাধারণের পক্ষে যুক্ত করাটা হয়তো ঠিক না।
তরুণ লেখকদের এই প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করেই অনুপ্রাণন সেরকমই একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কার্যক্রম গ্রহণ করার প্রয়াস পেয়েছে যেখানে তরুণ কবি ও সাহিত্যিকেরা প্রিন্ট পত্রিকা ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন এবং অনুপ্রাণন অন্তর্জালের সাথে যুক্ত হয়ে গ্রন্থ প্রকাশনা পূর্ববর্তী কালের প্রস্ততি গ্রহণের সুযোগ নিতে পারে।
Anupranan Troimasik Year 11 Issue 4, Kabi O Kabita Songkhya- Churtho Porrbo
লেখকের কথা-
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির কথাসাহিত্যিক হিসেবে ড. শামসুদ্দীন আবুল কালাম একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। তিনি আমার একমাত্র মামা, বিষয়টি আমার অহংকার, গর্ব এবং উত্তরাধিকারের। জন্ম থেকেই দেখেছি তার সাহিত্যকর্ম এবং ব্যক্তিজীবনের চরম বেদনাদায়ক অধ্যায় বাংলা সাহিত্যের অনুসন্ধিৎসু পাঠকের কাছে আগ্রহের বিষয় ছিল। মামা মারা যাবার পরে আমার মায়ের ইচ্ছায় আমি পিএইচ.ডি করার চিন্তা করি।আমার মা তার ভাইয়ের অত্যন্ত আদরের ছোটবোন ছিলেন। মামার সাহিত্যকর্ম এদেশের মানুষের কাছে উল্লেখযোগ্যভাবে আলোচিত না হলে মা খুব কষ্ট পেতেন এবং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন। এ দেশের বড় বড় পত্রিকার সাহিত্যপাতায় প্রকাশিত বাংলা সাহিত্যের বড় বড় সমালোচক এবং গবেষকদের সমালোচনামূলক নিবন্ধ এবং গবেষণাগ্রন্থ তিনি পড়ে দেখতেন। কেউ কেউ মামার নাম উল্লেখ না করলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঘরে, চায়ের আসরে অথবা নিজ বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে এটা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন। আমি মায়ের সেই কষ্টটা বুঝতাম। একদিন তিনি আমাকে মামার কথাসাহিত্যের বিষয়ে গবেষণা করতে বললেন, যা আমার কাছে মা আদেশ করেছেন বলে মনে হয়েছে।
শামসুদদীন আবুল কালামের বিষয়ে সে সময় গবেষণা করা ছিল অসম্ভব প্রায়। কারণ লাইব্রেরীতে তার লেখা বই, বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত লেখা সংগ্রহ করা বেশ দুরূহ বিষয় ছিল। কেউ তার বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য দিতে পারতেন না যেহেতু তিনি (শামসুদদীন আবুল কালাম) প্রায় ৪০ বছর ধরে ইটালীর রোমে প্রবাসজীবন যাপন করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি এবং গবেষণা করার শর্তসমূহ আমার কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে তুলনামূলকভাবে সহজ মনে হওয়াতে সেখানেই ভর্তি হয়ে কাজ শুরু করি। ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশনের ৫০০০ টাকা হিসেবে মাসিক বৃত্তি বা অনুদান এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পর্যায়ক্রমে তিন বছরের ছুটির অনুমোদন লাভ করি । প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাঙলা কলেজের বাংলা বিভাগ থেকে ২০০৬ এর মাঝামাঝি সময়ে বিমুক্ত হয়ে তখন থেকে কাজ শুরু করি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার মা ২০০৮ এর জানুয়ারি মাসের ২৫ তারিখে হঠাৎ মারা যান। এতে আমার সমস্ত উৎসাহ উদ্দীপনা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এর মধ্যে ২০০৮ এ আমি প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে ইডেন কলেজে পদায়ণ লাভ করি, জয়েন করে ইউনিভার্সিটি ফেলোশিপের বৃত্তিসহ ছুটি ত্যাগ করে সেপ্টেম্বর মাসে জয়েন করে কর্মরত অবস্থায় পিএই্চ.ডির কাজটি সুসম্পন্ন করার চেষ্টায় নিয়োজিত থাকি। ইতোমধ্যে ২৮ আগস্ট মাস ২০১১সালে আমার ছোট ভাই যাত্রাবাড়ী থেকে হারিয়ে যায়, যাকে আজও ফিরে পাইনি। ২০১৩র জানুয়ারি মাসের ১৫তারিখে ঢাকার উত্তরায় আমার সর্বকনিষ্ঠ ভাই আততায়ীদের উপর্যুপরি ছুরির আঘাতে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়। এই সমস্ত দেখেশুনে আমার আর একটি ভাই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পারিবারিক এই বিষয়গুলি পিএইচ.ডির এই অভিসন্দর্ভ প্রকাশে আমাকে নিঃস্পৃহ করে তোলে। ১২ বছর পরে পারিবারিক রাহুগ্রস্ত অবস্থার সমাপ্তি হলে এবার আমার কর্মজীবনের সমাপ্তিকালে এই অভিসন্দর্ভটিকে আলোর মুখে আনার ইচ্ছে প্রকাশ করলে অনুপ্রাণনের কর্ণধার আবু মোহাম্মদ ইউসুফ ভাই সানন্দে গ্রন্থটি প্রকাশের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
শামসুদদীন আবুল কালামের কন্যা ক্যামেলিয়ার কাছে অসংখ্য অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি আছে যা এখনও প্রকাশিত হয়নি। শামসুদদীন আবুল কালামের একমাত্র জামাতা জনাব এ বি মঞ্জুর রহিম ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র সচিব এবং তৎকালীন সময়ের একজন রাষ্ট্রদূত। ২০০৫ এ তিনি জার্মানির রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এখন তিনি কানাডার ক্যালগারিতে অবস্থান করছেন।
শামসুদদীনের কথাসাহিত্য: জীবনবোধ ও শিল্পরূপ শিরোনামের অভিসন্দর্ভের জন্য ২০১১ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে ডক্টর অব ফিলজফি উপাধি প্রদান করে আমাকে সম্মানিত করেছে। আমার গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের আমার শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক ড. সৌদা আখতার। পরীক্ষা পরিষদের সভাপতি এবং পরীক্ষক ছিলেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. সৈয়দ আকরাম হোসেন। এ ছাড়াও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শিপ্রা দস্তিদার ছিলেন আমার পরীক্ষক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দানীয়ুল হক স্যারের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, তিনি এ বিভাগে ভর্তি থেকে শুরু করে সব সময় গবেষণার অগ্রগতি বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে কাজটি সুসম্পন্ন করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের সকল কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের সার্বিক সহযোগিতা বিশেষভাবে স্মরণ করার মত।
গবেষণার সময়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, ( বিশেষ অনুমতিক্রমে)। বাংলা একাডেমী, গুলশানের ইন্ডিয়ান লাইব্রেরী, ব্রিটিশ কাউন্সিল, আজিমপুর লাইব্রেরী এবং ইডেন কলেজের সমৃদ্ধ লাইব্রেরী ব্যবহার করেছি। অভিসন্দর্ভের সার্বিক মুদ্রণের দায়িত্ব পালন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম।
আমার স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম মজনুর সহযোগিতা, সহনশীলতা এ কাজটি শেষ করতে বিশেষভাবে সহায়তা করেছে। আমার দুইজন সন্তান তাদের শিক্ষা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমার মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সেজন্য আমি আসলেই অনুতাপ করছি।
ব্যক্তিগত জীবনের নানা সমস্যা এবং সীমাবদ্ধতার পরেও ড. শামসুদ্দীন আবুল কালামের কথাসাহিত্যের উপর এই গবেষণাকর্মকে আমার শ্রদ্ধেয় পরমগুরু অধ্যাপক ড. সৈয়দ আকরাম হোসেন স্যার মৌলিক এবং আঁকর গ্রন্থ হিসেবে মূল্যায়ণ করেছেন।এটা আমার পরিশ্রমের একটা পরিপূর্ণ স্বীকৃতি এবং সম্মান বলে আমি মনে করি।
বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্পের ইতিহাসে শামসুদ্দীন আবুল কালামের গল্প একটি অসাধারণ উচ্চতায় অবস্থান করে আছে, বিশেষ করে তার পথ জানা নাই গল্পটি যুগে যুগে এই দেশের সমাজবাস্তবতা এবং রাজনৈতিক চেতনার একটি উজ্জ্বল স্বাক্ষর যা বাংলা সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের জানা প্রয়োজন । এই অভিসন্দর্ভ অনুসন্ধিৎসু শিক্ষার্থীদের সহায়তা করবে বলে আমি মনে করি।
শামসুদ্দীন আবুল কালামের কথাসাহিত্য : জীবনবোধ ও শিল্পরূপ - Shamsuddin Abul Kalamer Kothasahityo : Jibonbodh O Shilporup
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা – সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা- তৃতীয় পর্ব – সম্পাদকীয়-
সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হওয়ার পর সাম্প্রতিকের আরো ২৫ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কবিতা ও কবিতা নিয়ে সামষ্টিক আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হলো শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা তৃতীয় পর্ব। তৃতীয় পর্বের এই ২৫ জন কবির নাম ইতোপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের ন্যায় অনুপ্রাণনের ১০০ নির্বাচিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের কবি তালিকা থেকে নেয়া হয়েছে যাদের জন্মসাল ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রয়েছে। তালিকার অবশিষ্ট ২৫ জন নির্বাচিত কবি নিয়ে লেখা প্রকাশিত হবে আগামীতে প্রকাশিতব্য শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা অর্থাৎ সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা চতুর্থ পর্বে।
সাম্প্রতিককালের কবিদের কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যসমুহ নিয়ে গত সংখ্যার সম্পাদকীয়তে কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে। সেই আলোচনার সাথে আরো কিছু কথা এখানে যুক্ত করা যেতে পারে বলে মনে করি। যেমন কবিতার বিষয়বস্তুর উত্তরাধিকার হিসেবে সাম্প্রতিকের প্রত্যেক কবি কোন না কোন সময়, কোন না কোন কবিতায় রূপসী বাঙলার প্রাকৃতিক সুন্দরতায় ডুব দিয়ে সুন্দর ও সত্যের খোঁজ করে দুই একটা মুক্তা তুলে আনার প্রয়াস করেছেন। বাঙলার প্রকৃতির নিটোল সৌন্দর্যের কাছে থেকে কবিতাকে জীবন দিয়ে যাপন প্রচেষ্টার কারণে সাম্প্রতিকের কবিতায় বাঙলার স্বাদ আস্বাদন থেকে আমরা বঞ্চিত হই না। মা-মাটি, ষড়ঋতু, সৃষ্টির উল্লাস, আদিমতার সাথে কোন কোন সময় পৌরাণিক মিথের সংমিশ্রণ কবিতায় প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। উপমার জানালাতে উড়ে চলা বলাকার গতিতে অঙ্কিত হতে দেখি বঙ্গ জনপথ, ব-দ্বীপ ভূমি, বৃষ্টি বিধৌত বৃক্ষরাজি, বনভূমি, সোনালু অথবা অসীম অশ্বত্থ।
মানুষের বোধের নিগুড়ে বাস করে শৈশব। সাম্প্রতিকের কবিদের শৈশব ও নস্টালজিয়ার অনুষঙ্গ অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চকিত ও উত্তুঙ্গবাদী। উপমা, রূপক, ব্যঞ্জনা ও ভিন্নতার রহস্য-মাখা জাদু-বাস্তবতা অথবা অধিবাস্তবের রঙে রঞ্জিত হয় নস্টালজিয়া। যৌবনের প্রবলে দৃশ্যমান যতনা আদিরসের নিঃসরণ তারচেয়ে বেশি মাত্রায় পরিলক্ষিত সংরক্ষণ ও সংস্কারবাদী মননের উপমাশ্রিত কারুকার্যের কৃত্রিম স্রোত। কবিতায় মরমিবাদ, বাউলতত্ত্ব ও লোকজধারা দৃশ্যমান হলেও সেটির সাধনা-অভিজ্ঞানের ধারাক্রমে চর্চা খুব একটা পরিদৃষ্ট বা পরিপুষ্ট নয় বলেই কবিতায় মনে হয়। সাম্প্রতিককালে দ্রুত গতিতে নগরায়ণের পরিবেশে নাগরিকবোধের শৃঙ্খলা ও পাশাপাশি জৈবিক স্খলন ও সংকটের আবর্তে জীবনের রহস্যময়তার মূর্ত ও বিমূর্ত ভাবকল্প কবিদের কবিতায় লক্ষণীয় মাত্রায় যুক্ত হতে দেখা যায়। জাদু-বাস্তবতা, অধিবাস্তববাদ, উত্তরাধুনিকতা, কাঠামোবাদ, বিনির্মাণবাদ ও ডিসকোর্সের অনুষঙ্গ-তাড়িত প্রকরণশৈলী বাংলাদেশের কবিতায় ব্যাপক দেখা না গেলেও কারো কারো ব্যবহার প্রবণতার মাঝে গুটিকয়েক সফল হয়েছে বলেই প্রতীয়মান। সাম্প্রতিকের কবিতায় গদ্য-ছন্দের ব্যবহারে এখন অনেকেই সাবলীল। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধীতা, গণতন্ত্র ও স্বদেশপ্রেম ইত্যাদি সাম্প্রতিকের কবিতায় খুবই সীমিতভাবে প্রতিভাত হতে দেখা গেছে। তার অর্থ এই নয় যে সাম্প্রতিকের কবিতায় সমাজ অথবা রাজনীতি সচেতনতা নেই। আছে, আর কোন কোন ক্ষেত্রে সেটা এসেছে ডায়াস্টোপিয়ার রূপ ও বর্ণ পরিগ্রহ করে। যার মধ্যে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা ও প্রতিজ্ঞা না থেকে হতাশা, বিষণ্নতা ও পরাজয়বাদিতার প্রবণতাই যেন বেশী। সাম্প্রতিকের কারো কারো কবিতার বইয়ের নাম প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, যদিও এটি একটি উপলক্ষ, প্রধান অনুষঙ্গ নয়, তবুও নামের ব্যঞ্জনা ও অর্থের গূঢ়ার্থ এবং রহস্যময়তা কবির স্বকীয় পরিচয় সৃষ্টিতে কিঞ্চিত ভূমিকা রাখতে দেখা যায়।
সাম্প্রতিক কবিদের ব্যক্তিক বিকাশ ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন অনুষঙ্গ ও প্রবণতা পরিলক্ষিত হতে দেখা যায়। কারো কবিতা গদ্যে যেমন বিকশিত পদ্যের বিনুনিতেও তেমন অনুধ্যানযোগ্য। কারো কারো কবিতা অতীতবোধ, রাজনীতি, সংকট ও প্রধানত লোকজ ঐতিহ্য সমৃদ্ধ আবার একইভাবে কখনো কখনো নগরজীবনের বাস্তবতাকেই বিকশিত করতে বেশি মাত্রায় পারঙ্গম। কারো কবিতায় যেমন বাহুল্য আছে প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার কম্বুরেখা, তেমনই আছে রসবোধ ও লোকজ-বাস্তবতায় জীবনকে কাব্যময় করার সদিচ্ছা। ঐতিহ্য আর সরলতা উপজীব্য করে নাগরিক-জটিলতাসিক্ত জীবনকে কবিতায় তুলে আনার মতো কঠিন কাজও কেউ কেউ করেছেন। কারো কবিতা মূলত গদ্যধর্মী হলেও মুক্তক অক্ষরবৃত্তের ছোঁয়াচ কবিতার পদ্য-স্বকীয়তাকে নান্দনিক করতে সাহায্য করেছে। সাম্প্রতিকের প্রায় সকল কবির কবিতায় রয়েছে মানবিকতাবোধ, বৈশ্বিকবোধ, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মিথের শক্তির উপলব্ধি অথবা অন্তর্লীন শূন্যতা বোধের কাব্যকলা। একদিকে যেমন ছন্দোবোধ অন্যদিকে ভাঙনের গদ্য-কল্পে বিম্বিত কাব্যময়তা। লোক-ঐতিহ্যতাড়িত সরল পদ্যের কথক হয়ে জীবনকে গ্রামীণ-চেতনাবোধ, লোকযান ও পুঁথিকারদের ঢঙে কাব্যময় করার একটা প্রয়াস কারো কারো কবিতায় লক্ষণীয়। শেকড়বোধকে বর্ণনে, কথনে, সারল্যে, গদ্যভাব ও ভাষায় বিম্বিত করে পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার প্রচেষ্টায় বিষয়ের অভিনবত্ব ও জটিলতার চাইতেও সারল্য, বিমূর্ত-অভিকল্পই বেশি বেশি প্রকটিত অনেকের কাব্যে। কারো কবিতায় গতি ও প্রগতির সম্মিলন রয়েছে, দেখার বোধ ও বিশ্বাসকে প্রশ্নসত্যে চিত্র আর সংকটের প্রেক্ষিতে উপলব্ধিজাত করে তোলা হয়েছে। কবিতার রহস্যময়তার অন্তরালে মানুষের বিবেকে প্রশ্ন সৃষ্টি ও ব্যঞ্জনাভাবের বিকাশের সপক্ষেই কাব্যধারার প্রবর্তক হিসেবে কেউ আবির্ভূত।
বাংলা কবিতার স্বভাবের অনেকটাই দৃশ্যধর্মী। ‘বিষয়’ ‘বর্ণনা’, ‘বন্দনা’ ও ‘বিবরণ’-এর বৃত্তে বন্দী। একুশ শতকের দোরগোড়ায় এসে কারো কারো পক্ষ থেকে বিষয়’কে জলাঞ্জলি দেবার প্রয়াস শুরু হয়। অর্থাৎ কবিতা কিছু বলবে না, কোনো ভারী কথা নয়, কোনো বক্তব্য নয়, দর্শন নয়। সমাজ-রাজনীতির ক্ষেত্র হোক; কবিতা ধ্বনি, শব্দ, ভাষা, অক্ষরের নেশায় নিজের আয়নায় যেন নার্সিসাস। কেবল ছবি, ছবির সারি। পরীক্ষা নিরীক্ষাকে নিরুৎসাহিত করার কিছু নাই। একবিংশ শতাব্দীর দুই যুগ আমরা অতিক্রম করে এসেছি। কিন্তু এখনো বাংলাদেশ পলিমাটির দেশ। যেটুকু কঠিন প্রস্তর আছে তা-ও চলমান ঝর্ণার জল পেয়ে পেয়ে সিক্ত হয়েই থাকে। সার্বিক বিচারে সমকালীন কবিতা হৃদয়গ্রাহী কিন্তু যতটা না হৃদয়গ্রাহী, ভাব-ভাষা-চিন্তা-চিত্রকল্প ও অনুভবের পরম্পরার সুনিয়ন্ত্রিত বিন্যাসে তার থেকেও বেশী বৈদগ্ধ্যপূর্ণ।
Quarterly Anupranan 13th Year 3rd Issue, Samprotiker Kabi O Kobita- 3rd Part
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.


















There are no reviews yet.