Additional information
| Weight | 0.516 kg |
|---|---|
| Published Year |
$ 2.94
সম্পাদকীয় – অনুপ্রাণন – দ্বাদশ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা, গল্পকার ও গল্পসংখ্যা (চতুর্থ পর্ব)
প্রকাশিত হলো ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা, গল্পকার ও গল্প সংখ্যা- চতুর্থ পর্ব। গল্পকার ও গল্পসংখ্যা চতুর্থ পর্ব প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশের ১০০ জন নির্বাচিত গল্পকার, তাদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা, গল্পকার রচিত গল্পসাহিত্য নিয়ে আলোচনা এবং একটি উল্লেখযোগ্য গল্প সংকলিত করার কাজ শেষ হলো। এই সংখ্যায় পূর্বের তিনটি সংখ্যার মতোই ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
দ্বাদশ বর্ষে এসে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন থেকে বাংলাদেশের ১০০ জন গল্পকার নিয়ে প্রবন্ধ একত্রিত করে সংকলন প্রকাশ করার কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। প্রথম কাজটি ছিল বাংলা সাহিত্যের গল্পকারদের মধ্য থেকে কারা বাংলাদেশের গল্পকার সেটা নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা, দ্বিতীয়তে এসে বাংলাদেশের গল্পকারদের মধ্য থেকে ১০০ জন গল্পকার বাছাই করা, তৃতীয়তে এসে গল্পকারদের গল্পসাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা বা প্রবন্ধ লেখার জন্য লেখক নির্ধারণ করা। এই কয়টা ধাপের কাজ যতটুকু না কঠিন ছিল তার থেকে বেশি কঠিন ছিল যেসকল গল্পকারের প্রকাশিত গল্পগ্রন্থগুলো সহজলভ্য ছিল না সেগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে জোগাড় করা। এই কাজ করতে আমাদের চেষ্টার সফলতার পেছনে যারা কাজ করেছেন, সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। আমরা তাদের কাছেও বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ যারা বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকারকে নিয়ে এক একটি প্রবন্ধ লিখে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কাজে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন একাদশ বর্ষে এসেও একইভাবে বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ কবি তাদের কবিতা নিয়ে চারটি সংকলন প্রকাশ করেছে। তারপর দ্বাদশ বর্ষে এসে বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকারকে নিয়ে আরও চারটি সংকলন অনুপ্রাণন থেকে প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং বাস্তবায়ন করার উদ্দেশ্য একটাই। সেটা হচ্ছে- যারা আমাদের কবিতা ও গল্প সাহিত্যের ভিত্তি গড়েছেন তাদের সাথে এবং তাদের কাজের সাথে প্রজন্মকে পরিচিত করে তোলা। আমাদের নির্বাচিত গল্পকারদের মধ্য যিনি সর্বজ্যেষ্ঠ তিনি হচ্ছেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন। তার জন্ম ১৮৯৭ সালে আর মৃত্যু ১৯৭৮ সালে। আর নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হচ্ছেন ইমতিয়ার শামীম। তিনি ১৯৬৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা পূর্ব সময় এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তাদের অধিকাংশই সাহিত্যচর্চা করেছেন। ফলে তাদের সাহিত্য এমন একটা বিশেষ সময়কে ধারণ করেছে যেখানে দুটি দেশভাগের অভিজ্ঞতা হয়েছে। দুটি দেশভাগের কার্যকারণের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে তাদের লেখায় যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ন্যায্যতা ভিত্তি পেয়েছে ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের স্বত্ব, সত্তা ও মৌলিকত্ব নির্মাণে গল্পকারগণ উদ্যোগী হয়েছেন। আমরা অনুপ্রাণন, বিশ্বের বাংলা সাহিত্যে বাংলাদেশের স্বকীয় অবস্থানের বাস্তবতাটিকে প্রবলভাবে অনুভব করি এবং গর্বিত হই।
বাংলাদেশের গল্প-সাহিত্যের চরিত্রদের জীবনের শেকড় অধিকাংশেই প্রাকৃত জীবনে প্রোথিত। মাটি ও সবুজের সাথে সম্পর্কিত। মাত্রই এক অথবা খুব বেশি হলে দুই প্রজন্ম যারা গ্রামের শ্যামলিমা থেকে নগরের কঠিনতায় অভিবাসিত হয়েছে। নগরে থেকেও তারা যেন শহরতলীতে বসবাস করছে। যাদের কারও কারও শরীর থেকে এখনও মাটির গন্ধ মিলিয়ে যায়নি। তাই অধিকাংশ গল্পের দৃশ্যপট হয় শহর না-হলে শহরতলী। গল্পের মানুষগুলো কৃষক না-হয় কৃষকের শিক্ষিত সন্তান। দৃশ্যপটের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়গুলোর বিন্যাসে তাই কখনও গ্রাম সম্পূর্ণভাবে তিরোহিত হয়ে যায়নি।
গ্রামের রূপান্তর কাহিনী হোক অথবা শহর থেকে নগরায়ণের দিকে উত্তরণের কাহিনী হোক প্রায় সকল ক্ষেত্রেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও পরিবার; তাই কাহিনী যতটা না ব্যক্তিকে নিয়ে তার থেকে বেশি হচ্ছে পারিবারিক অথবা সামাজিক। কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্তই বাংলাদেশের গল্পের প্রধান চরিত্র। ধনী পরিবারের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, কলহ, প্রেম-ভালোবাসার গল্প হাতে গোনা। বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পের প্লটে সংঘাত ও সংঘর্ষের নিরসনই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু এমন কিছু প্লট সৃষ্টি করতেও দেখা গেছে যেখানে সংকট নিরসন হয়নি। অর্থাৎ বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্প অধিকাংশই একটি ইতিবাচক সমাধান অথবা ইঙ্গিত পাওয়া যায় এবং নেতিবাচক চরিত্র খুব কমই গল্পের সম্পূর্ণতার ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের গল্প রোমান্টিক ভাব ও আবেগে ভারাক্রান্ত হতেই দেখা যায় বেশি এবং পাঠকেরা সেগুলো পছন্দও করছেন। কিন্তু গল্পকাররা তাদের গল্পে ভাব ও আবেগের ভারসাম্য রক্ষা করেছেন, বাস্তব বিচারে সেই গল্পগুলো বোদ্ধা ও পরিপক্ব পাঠক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
বাংলাদেশের গল্পের আখ্যানবস্তুতে রোমান্টিকতার প্রভাব বেশি থাকলেও এক ঝাঁক গল্প আছে যেখানে জীবনজিজ্ঞাসার দর্শন চিন্তায় জাগরিত হতে দেখা যাচ্ছে। গল্পের গদ্যনির্মাণ যথেষ্ট পরিপক্ব। বানান, ব্যাকরণ, বাক্য গঠন, রূপকের নান্দনিক ব্যবহারে সমৃদ্ধ। গল্পের শুরুর চমক নিয়ে গল্পকারদের মধ্যে একটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যায়। এই ব্যাপারে ভিন্নমত আছে, যদিও পারিবারিক পটভূমিতে নির্মিত গল্পগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চমক দিয়ে শুরু করার একটা প্রবণতা রয়েছে। অপ্রাসঙ্গিক সংলাপ কোনো কোনো গল্পকে অহেতুক ভারাক্রান্ত করেছে। কিন্তু বলা যেতে পারে অধিকাংশ গল্পই দৃশ্যপট বর্ণনায় এবং সংলাপের ওপর গল্পকাঠামো নির্মাণ করার কাজটি করেছেন মেদহীন গদ্যে। গল্পগুলো একরৈখিক হয়নি আবার পার্শ্বচরিত্রের উপ-গল্পগুলো গল্পের প্রধান আখ্যানকে ভারাক্রান্ত করেনি। সময়, কালের প্রতি গল্পগুলো সুবিচার করেছে যেখানে সত্য ইতিহাসের সাথে অহেতুক বিতর্কে অবতীর্ণ হয়নি। গল্পের পক্ষ ও প্রতিপক্ষের অস্তিত্ব ও তাদের আচার-আচরণ অবাস্তব করে তোলা হয়নি। গল্পের চরিত্রগুলোকে দেবতাতুল্য অথবা উল্টোদিকে শয়তানতুল্য করে অবাস্তব কাল্পনিক চরিত্র করে গড়ে তোলা হয়নি। বাংলাদেশের গল্পে রূপকের ব্যবহারে ফ্যান্টাসির তুলনায় বাস্তবের বস্তুগুলোকেই নান্দনিক করে তোলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের গল্পগুলো সামগ্রিকভাবেই এমন একটি উচ্চতর স্তরে উত্তীর্ণ হয়েছে, যখন বাংলাদেশের গল্পসাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের গল্পের ভাণ্ডারে শামিল হওয়ার যোগ্যতাকে আর অস্বীকার করা যায় না।
| Weight | 0.516 kg |
|---|---|
| Published Year |
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা : সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা তৃতীয় পর্ব- সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিক কালের ১০০ গল্পকারকে নিয়ে চতুর্দশ বর্ষের বিশেষ আয়োজনের পারম্পরিক ধারাবাহিকতার তৃতীয় পর্বে এসে আরও ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে প্রকাশিত হলো সাম্প্রতিকের (জন্ম : ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫) গল্প ও গল্পকার সংখ্যা, তৃতীয় পর্ব। সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার ১ম ও ২য় পর্বের মতো এই পর্ব অর্থাৎ ৩য় পর্বে ২৫ জন গল্পকারের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা প্রকাশের মাধ্যমে নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে এ-পর্যন্ত মোট ৭৫ জন গল্পকারকে নিয়ে তথ্য ও আলোচনাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ প্রকাশের কাজ সম্পন্ন হলো। অবশিষ্ট ২৫ জন গল্পকারদের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা আগামী চতুর্থ পর্বে প্রকাশিত হবে বলে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব নির্মাণের মূল উপাদান হচ্ছে, সময় ও মানুষ। মানুষের চেতনাজাত রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম ও ভৌত প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রভাবিত সমাজ ও সংস্কৃতির বিচার ও বয়ান। গত চার বছর ধরে অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক শিল্প-সাহিত্য ম্যাগাজিনে গত শতাব্দীর প্রথম থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিকদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা প্রবন্ধসমূহ সংকলিত করে যে সহায়ক সাহিত্যসম্পদ প্রস্তুত করা হচ্ছে সে-সকল সহায়ক সম্পদ বা উৎস ব্যবহার করে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গবেষণা হতে পারে। সেই গবেষণার একটি হতে পারে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের সমাজতত্ত্বের বস্তুনিষ্ঠ বয়ান।
আমরা এটা অধ্যয়ন করতে পারি- বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য কীভাবে সমাজ থেকে উদ্ভূত হলো, কী কী বৈশিষ্ট্য ধারণ করল, কীভাবে সাহিত্যে সমাজের প্রতিফলন ঘটাল এবং পাশাপাশি সমাজের ওপর সাহিত্য কী প্রভাব ফেলল? সাহিত্যে, ক্ষমতা, প্রতিযোগিতা ও সামাজিক কাঠামো কীভাবে কাজ করেছিল বা করে যাচ্ছে? এসব অধ্যয়ন থেকে হয়তো আমরা পেতে পারি এই তথ্য যে বাংলা দীর্ঘদিন উপনিবেশ থেকেছে। উপনিবেশ থাকাকালে ভিনদেশি শাসকের রাজনীতি, অর্থনীতির প্রভাবে পড়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির যেমন রূপান্তর ঘটেছে তেমনি বিকৃতিও ঘটেছে। ভিনদেশি উপনিবেশবাদী শক্তির প্রভাবের ফলে বাঙালির মননে এক গভীর আত্মপরিচয় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আর যখনই এই উপনিবেশবাদী মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে ভাষা, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে বাংলার মাটি ও পরিবেশজাত নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ধারায় নিয়ে এসে মুক্তচর্চা করার চেষ্টা বাঙালি করেছে তখনই ঔপনিবেশিক ধারার পৃষ্ঠপোষক ও কট্টরপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীর দিক থেকে আঘাত ও আক্রমণ এসেছে।
এই বিষয় ছাড়াও আমাদের অধ্যয়ন অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হতে পারে। যেমন, সমসাময়িক ছোটগল্পের আলোচনায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- গল্পকারেরা তাদের গল্পে কীভাবে সীমিত স্থান ব্যবহার করে পরিচয়, বিচ্ছিন্নতা, মনস্তাত্ত্বিক বাস্তববাদ এবং সামাজিক বিষয়গুলো (জাতি, শ্রেণি, ভোগবাদ) গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন। তাছাড়াও এই বিষয়েও আলোকপাত করা যেতে পারে যে কীভাবে প্রাণবন্ত চরিত্র, প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রাঞ্জল বর্ণনায় আধুনিক জটিলতাগুলো প্রতিফলিত করার জন্য বিভিন্ন শৈলী (ব্যঙ্গ, ভৌতিক, জাদুকরী বাস্তববাদ) ব্যবহার করা হয়েছে। আলোচনা ও অধ্যয়নে উঠে আসতে পারে যে কোনো কোনো সমালোচক সাম্প্রতিক রচিত গদ্যভাষায় নীরসতা বা অতি-সরলীকরণের প্রবণতার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দ্রুত পড়ে ফেলার উপযোগী করে রচনা করার বাইরে এসে ফর্ম এবং থিমকে আরও গভীরভাবে জড়িত করার প্রত্যাশা করেছেন। কোনো কোনো আলোচক কেবল গল্পের সারাংশে সীমাবদ্ধ না থেকে তার বাইরে গিয়ে গল্পের অর্থ প্রকাশে প্লট, চরিত্র, থিম এবং সাহিত্য কৌশলের (প্রতীকীকরণ, চিত্রকল্প) মতো উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে গল্পের অর্থ প্রকাশে তাদের কার্যকারিতা যথাযথ মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন।
অধ্যয়নে তুলে ধরা যেতে পারে যে সাহিত্য আলোচনাগুলো প্রস্তুত করতে গিয়ে বিশেষ করে চারটি বিষয়ের দিকে গভীর দৃষ্টি প্রদান করার প্রয়োজন হয়েছে। প্রথমেই এসেছে পরিচয় এবং অন্তর্ভুক্তি বোধের মতো বিষয়গুলো। যেমন সাংস্কৃতিক স্থানচ্যুতি, অভিবাসী মনস্তত্ব ও অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বায়িত বিশ্বে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত অথবা জাতীয় আত্ম-অনুসন্ধান। দ্বিতীয়ত, চরিত্র রূপসমূহের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। যেমন, বাস্তব ঘটনাসমূহের সাক্ষাৎ ব্যাখ্যা অথবা স্বগত ও বহুপাক্ষিক সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রগুলোর মনের অভ্যন্তরের জটিল ও অন্ধকার জগৎ উন্মোচন করা। তৃতীয়ত, গল্পের সামাজিক ভাষ্য অর্থাৎ ভোগবাদ, রাজনীতি, জাতি এবং শ্রেণি বিভাজনের সমালোচনা করার জন্য ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ও অ্যাবসার্ডবাদ ব্যবহার করা। এবং চতুর্থত, রূপ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা অর্থাৎ অনন্য কাঠামো, বিভিন্ন অথবা বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গি (উত্তর-ঔপনিবেশিক, নারীবাদী ইত্যাদী) ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, ফ্যান্টাসি এবং জাদুকরী বাস্তবতার মতো ধারাগুলোর সাথে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে ছোটগল্পের আধুনিক বিভাজন বৈশিষ্ট্য আয়ত্তে নিয়ে আসা। কেউ কেউ এটাও মনে করেছেন যে সমসাময়িক গল্পগুলো সংকীর্ণ জনতাত্ত্বিক বা উপরে ভাসা বিষয়গুলোর উপর খুব বেশি কেন্দ্রীভূত হতে দেখা গেছে। তাছাড়া দ্রুত, সহজে হজমযোগ্য গল্পের বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে গভীর, জটিল অভিজ্ঞতা প্রদানের জন্য প্রস্তুত প্রকৃত শৈল্পিক সম্ভাবনাময় গল্পের চাহিদার ক্ষেত্রে ভাটা সৃষ্টি করে থাকতে পারে। সত্যিকার অর্থে উদ্ভাবন না করে নির্দিষ্ট ‘ধরনের’ (যেমন, অকার্যকর পরিবার, সমাজবিচ্ছিন্ন যুবক) উপর খুব বেশি নির্ভরশীল গল্পগুলো একঘেয়েমির উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শিল্প-সাহিত্য মানুষকে ধ্বংস নয় সৃজনশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। গভীর অনুভূতি, বোধ ও সংযোগের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যা ভাষাগত সীমানা ছাড়িয়ে মানুষে মানুষে, সংস্কৃতিতে সংস্কৃতিতে মেলবন্ধন ঘটায়। ব্যক্তি ও সমাজকে সৌন্দর্য, আনন্দ, দুঃখ, প্রেম, বেদনা ও জীবনের গভীরে নিয়ে যায়, যা তাকে আত্ম-অনুসন্ধান ও বিশ্বকে নতুনভাবে উপলব্ধিতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যচর্চা সকল প্রকার সংরক্ষণবাদ মুক্ত হয়ে মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন চেতনাবোধ অব্যহতভাবে ধারণ করে যাবে। সংরক্ষণবাদ মুক্ত মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন এই চেতনাবোধ থেকে বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্যচর্চা বিচ্ছিন্ন করার সকল অপচেষ্টা বাংলাদেশের কবি, গল্পকার, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকেরা মিলিতভাবে রুখে দেবে এটাই বাস্তব।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 4; Contemporary Stories & Storytellers (Part-3)
অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা— গল্পকার ও গল্প সংখ্যা— তৃতীয় পর্ব— সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার ও তাদের উল্লেখযোগ্য গল্প নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষের যাত্রার তৃতীয় পর্বে প্রকাশিত হলো আরও ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা; তাদের রচিত গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা এবং একটি করে নির্বাচিত গল্প (আলোচকের পছন্দে)। সংখ্যাটিতে গল্পকারদের নিয়ে রচনাগুলোর অনুক্রম নির্ধারিত আলোচকদের থেকে লেখা প্রাপ্তির ভিত্তিতে বয়সানুক্রমে প্রস্তুত করা হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার ও তাদের লেখা গল্প নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন বিশেষ সংখ্যাগুলো প্রকাশের এই উদ্যোগের পদ্ধতিগত ন্যায্যতার প্রশ্ন নিয়ে গল্পকার ও গল্পসংখ্যার পূর্ববর্তী পর্ব দুটোয় সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। তবে সংখ্যাটি ১০০ কেন? ৯৯ বা ১০১ অথবা অন্য কোনো সংখ্যা কেন নয়? এটা নিয়ে দু’একজন প্রশ্ন রেখেছেন। গণনা অথবা পরিমাপ করার জন্য যে গাণিতিক বস্তু ব্যবহার করা হয়ে থাকে; সেটাকেই আমরা সংখ্যা বলি। সংখ্যা একটি বিমূর্ত ধারণা। কিন্তু সময় ও বস্তুর সাথে যুক্ত হয়ে এটি একেকটি বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করে থাকে। ইতিহাসযাত্রার মাইলফলক হিসেবে দুই বছর আগে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বর্ষপূর্তি অর্থাৎ সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছি। স্বাধীনতার এই পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপাদানগুলোতে যে বিবর্তন হয়েছে সেই বিবর্তনের ধারণা নেওয়ার জন্য একটি কোয়ান্টাম সময় অথবা বিবর্তনের সাথে জড়িত প্রতিনিধিদের একটা কোয়ান্টাম সংখ্যা নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের গল্প-সাহিত্যে চলমান বিবর্তনের ব্যাপ্তি, গভীরতা ও শ্রেণিভুক্ত সকল প্রকাশের অঙ্গ, ধারা ও উপাদান তুলে ধরার প্রয়োজন মেটানোর জন্য বহুল ব্যবহৃত একটা উপযুক্ত সংখ্যা বেছে নেওয়া যুক্তিযুক্ত ছিল বলেই আমাদের মনে হয়েছে। বিজ্ঞানসম্মত মেট্রিক ধারণায় ০.০১, ০.১, ১, ১০, ১০০ বহুল ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ সকল সংখ্যা। বিজ্ঞানের ধারাতেই শতকরা হিসাবে, বছর হিসাবে, জমির মাপে অথবা প্রতিনিধি নির্বাচনের সংখ্যায়— শতক সংখ্যাটি চলেই আসে। ১ সর্বদাই অবিভাজ্য ঐক্যের প্রতীক, সাথে মেট্রিক ধারণায় শূন্য সংখ্যাটি ১-এর সামনে অথবা পেছনে অবস্থান নিয়ে একের গুণিতককে নির্দেশিত করেছে। একের গুণিতক সংখ্যাই বাস্তবতাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। তবে বলে রাখা ভালো, সংখ্যাতত্ত্বের উপর ভর করে কোনো কুসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাসের সাথে এই সব ভাব বা বস্তুনিরপেক্ষ জ্যামিতিক মেট্রিক সংখ্যাগুলোর কার্যত কোনো সম্পর্ক নাই। অনুপ্রাণন কর্তৃক নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে নারীর সংখ্যা মাত্র উনিশজন। নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে গল্পকার নির্বাচনের একটি শর্ত ছিল জন্মসাল। নির্বাচিত গল্পকারের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম হচ্ছেন শামসুদ্দীন আবুল কালাম, যিনি ১৮৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কনিষ্ঠতম হচ্ছেন তারা যাদের জন্মসাল ১৯৬৫। সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য একবিংশ শতাব্দীতে এসে নিম্নগামী হয়েছে কিন্তু হ্রাসের গতির পেছনে বিংশ শতাব্দীতে নারী সাহিত্যচর্চাকারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। অনুপ্রাণনের গল্পকার ও গল্প সংখ্যাগুলোতে নির্বাচিত নারী গল্পকারদের গল্পসমূহ নিয়ে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে এই ধারণা স্পষ্ট হয়। স্মর্তব্য যে, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে সংখ্যাগত পার্থক্য শুধু বাংলার নয়— কম-বেশি সারা বিশ্বের। অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পে প্রবণতা হিসেবে রোমান্টিকতা ও নান্দনিকতার দিকে দৃষ্টি দেওয়ার তুলনায় সামাজিক বাস্তবতা অর্থাৎ পারিবারিক-সামাজিক, রাজনীতি-অর্থনীতির স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব ও সংকটের বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। গ্রাম ও শহর পৃথক পৃথকভাবে অথবা মিশ্রভাবেও এসেছে। গ্রাম-শহরের বিবর্তন ও রূপান্তরের ফলে সৃষ্ট ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, উৎপাদন অথবা কর্মস্থলের সমস্যা ও সংকটসমূহ চিত্রিত হয়েছে। পরিবর্তন কীভাবে যাপিত জীবনে মানসিক ও পারিপার্শ্বিক প্রতিক্রিয়া ঘটিয়েছে এসব মনস্তাত্ত্বিক বিষয় বিশ্লেষণ বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পে এসেছে নিখুঁতভাবে। মানুষের চিন্তাধারা কখনো এক জায়গায় থেমে থাকে না। একজন সাহিত্যিকও তার চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন নিয়ে আসেন কখনো সচেতনভাবে অথবা কখনো অবচেতনভাবেই। বাংলাদেশের সাহিত্যে নারী-পুরুষের প্রেম, পরকীয়া, বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের মনস্তত্ত্ব যেন এখনো অনেকটা গ্রামীণ। চরিত্রের বাইরের চরিত্র অর্থাৎ পরিবার ও সমাজের সাথে যুক্ততা থেকে মুক্ত হতে পারছে না। তাই দেখা যায় প্রেম, পরকীয়া ও বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে কেউ না কেউ নাক গলিয়েই যাচ্ছেন। আমরা এখন চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে ডিজিটাল বিষয়গুলোর উত্তরণ ঘটছে, ঘটছে জীবন-যাপনের চালচিত্র। মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে যেমন মানুষ সোচ্চার হচ্ছে তার পাশাপাশি ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রগুলোতে মানুষের অবস্থান দৃঢ়তর হতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু, বিশেষ করে ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পে সমাজই গুরুত্ব পেয়েছে বেশি।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা - গল্পকার ও গল্প সংখ্যাঃ তৃতীয় পর্ব

কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম পাঠক ও বোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য সংগঠন প্রয়োজন। বাংলাদেশের সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও আচার-আচরণের প্রেক্ষাপটে একটি কার্যকরী সংগঠন গড়ে তোলা অনেক শ্রম ও সময়সাপেক্ষ কাজ। বিশেষ করে দেখা যায় যে গণতান্ত্রিক ভাবে পরিচালিত একটি সংগঠনে ভাঙা গড়া লেগেই থাকে যার ফলে কাজের গতি ও পরিধি সবসময়েই ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। অনুপ্রাণন সবসময় নেতিবাচক আলোচনা-সমালোচনাকে এড়িয়ে চলেছে। এর অর্থ এই নয় যে উদ্ভূত সেসব নেতিবাচক বক্তব্যের জবাব আমাদের কাছে নেই কিন্তু আমরা চেয়েছি ইতিবাচক কাজের মাধ্যমেই সেসব নেতিকে নাকচ করার মানসিকতা যেন গড়ে ওঠে। তাই, অনুপ্রাণন সবসময় ইতিবাচক কাজ করে যাওয়ার পক্ষেই শক্তির যোগান দিয়েছে। আমাদের ভালো ভাবে ভেবে দেখা দরকার যে চলমান অস্থির প্রতিযোগিতার পরিবেশে কি-করে শিল্প-সাহিত্য বিশেষ করে কবিতা সাহিত্যের প্রতি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আগ্রহী করে তোলা যায়। একটি বিষয় উল্লেখ করতেই হয় যে, মনে হয় যেন কবিতা পাঠের থেকে কবিতা লেখার আগ্রহই প্রজন্মের বেশী। এই হিসাবটা হয়তো শতভাগ ঠিক না কিন্তু অনুপ্রাণন প্রকাশনে অনেক তরুণ কবিদের দুর্বল কবিতার পা-ুলিপি নিয়ে প্রকাশনার জন্য ভিড় করা দেখে এরকমই মনে হতে পারে। এই বক্তব্যের প্রতি যদিও ভিন্নমত আছে তবুও আমরা মনে করি যে, সর্বক্ষেত্রে না হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কবি, লেখক ও শিল্পীর সৃজনশীল কাজ সত্যিকার অর্থে মূল্যায়িত হতে পারে যদি প্রাতিষ্ঠানিক অথবা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে হলেও তার গড়ে ওঠার পেছনে একটা নির্দিষ্ট ও সুনিবিষ্ট প্রস্তুতি ও চর্চার পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে। ব্যতিক্রম থাকেই কিন্তু সেই ব্যতিক্রমকে উদাহরণ হিসেবে সাধারণের পক্ষে যুক্ত করাটা হয়তো ঠিক না।
তরুণ লেখকদের এই প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করেই অনুপ্রাণন সেরকমই একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কার্যক্রম গ্রহণ করার প্রয়াস পেয়েছে যেখানে তরুণ কবি ও সাহিত্যিকেরা প্রিন্ট পত্রিকা ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন এবং অনুপ্রাণন অন্তর্জালের সাথে যুক্ত হয়ে গ্রন্থ প্রকাশনা পূর্ববর্তী কালের প্রস্ততি গ্রহণের সুযোগ নিতে পারে।
Anupranan Troimasik Year 11 Issue 4, Kabi O Kabita Songkhya- Churtho Porrbo
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা – সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা- তৃতীয় পর্ব – সম্পাদকীয়-
সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হওয়ার পর সাম্প্রতিকের আরো ২৫ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কবিতা ও কবিতা নিয়ে সামষ্টিক আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হলো শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা তৃতীয় পর্ব। তৃতীয় পর্বের এই ২৫ জন কবির নাম ইতোপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের ন্যায় অনুপ্রাণনের ১০০ নির্বাচিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের কবি তালিকা থেকে নেয়া হয়েছে যাদের জন্মসাল ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রয়েছে। তালিকার অবশিষ্ট ২৫ জন নির্বাচিত কবি নিয়ে লেখা প্রকাশিত হবে আগামীতে প্রকাশিতব্য শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা অর্থাৎ সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা চতুর্থ পর্বে।
সাম্প্রতিককালের কবিদের কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যসমুহ নিয়ে গত সংখ্যার সম্পাদকীয়তে কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে। সেই আলোচনার সাথে আরো কিছু কথা এখানে যুক্ত করা যেতে পারে বলে মনে করি। যেমন কবিতার বিষয়বস্তুর উত্তরাধিকার হিসেবে সাম্প্রতিকের প্রত্যেক কবি কোন না কোন সময়, কোন না কোন কবিতায় রূপসী বাঙলার প্রাকৃতিক সুন্দরতায় ডুব দিয়ে সুন্দর ও সত্যের খোঁজ করে দুই একটা মুক্তা তুলে আনার প্রয়াস করেছেন। বাঙলার প্রকৃতির নিটোল সৌন্দর্যের কাছে থেকে কবিতাকে জীবন দিয়ে যাপন প্রচেষ্টার কারণে সাম্প্রতিকের কবিতায় বাঙলার স্বাদ আস্বাদন থেকে আমরা বঞ্চিত হই না। মা-মাটি, ষড়ঋতু, সৃষ্টির উল্লাস, আদিমতার সাথে কোন কোন সময় পৌরাণিক মিথের সংমিশ্রণ কবিতায় প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। উপমার জানালাতে উড়ে চলা বলাকার গতিতে অঙ্কিত হতে দেখি বঙ্গ জনপথ, ব-দ্বীপ ভূমি, বৃষ্টি বিধৌত বৃক্ষরাজি, বনভূমি, সোনালু অথবা অসীম অশ্বত্থ।
মানুষের বোধের নিগুড়ে বাস করে শৈশব। সাম্প্রতিকের কবিদের শৈশব ও নস্টালজিয়ার অনুষঙ্গ অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চকিত ও উত্তুঙ্গবাদী। উপমা, রূপক, ব্যঞ্জনা ও ভিন্নতার রহস্য-মাখা জাদু-বাস্তবতা অথবা অধিবাস্তবের রঙে রঞ্জিত হয় নস্টালজিয়া। যৌবনের প্রবলে দৃশ্যমান যতনা আদিরসের নিঃসরণ তারচেয়ে বেশি মাত্রায় পরিলক্ষিত সংরক্ষণ ও সংস্কারবাদী মননের উপমাশ্রিত কারুকার্যের কৃত্রিম স্রোত। কবিতায় মরমিবাদ, বাউলতত্ত্ব ও লোকজধারা দৃশ্যমান হলেও সেটির সাধনা-অভিজ্ঞানের ধারাক্রমে চর্চা খুব একটা পরিদৃষ্ট বা পরিপুষ্ট নয় বলেই কবিতায় মনে হয়। সাম্প্রতিককালে দ্রুত গতিতে নগরায়ণের পরিবেশে নাগরিকবোধের শৃঙ্খলা ও পাশাপাশি জৈবিক স্খলন ও সংকটের আবর্তে জীবনের রহস্যময়তার মূর্ত ও বিমূর্ত ভাবকল্প কবিদের কবিতায় লক্ষণীয় মাত্রায় যুক্ত হতে দেখা যায়। জাদু-বাস্তবতা, অধিবাস্তববাদ, উত্তরাধুনিকতা, কাঠামোবাদ, বিনির্মাণবাদ ও ডিসকোর্সের অনুষঙ্গ-তাড়িত প্রকরণশৈলী বাংলাদেশের কবিতায় ব্যাপক দেখা না গেলেও কারো কারো ব্যবহার প্রবণতার মাঝে গুটিকয়েক সফল হয়েছে বলেই প্রতীয়মান। সাম্প্রতিকের কবিতায় গদ্য-ছন্দের ব্যবহারে এখন অনেকেই সাবলীল। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধীতা, গণতন্ত্র ও স্বদেশপ্রেম ইত্যাদি সাম্প্রতিকের কবিতায় খুবই সীমিতভাবে প্রতিভাত হতে দেখা গেছে। তার অর্থ এই নয় যে সাম্প্রতিকের কবিতায় সমাজ অথবা রাজনীতি সচেতনতা নেই। আছে, আর কোন কোন ক্ষেত্রে সেটা এসেছে ডায়াস্টোপিয়ার রূপ ও বর্ণ পরিগ্রহ করে। যার মধ্যে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা ও প্রতিজ্ঞা না থেকে হতাশা, বিষণ্নতা ও পরাজয়বাদিতার প্রবণতাই যেন বেশী। সাম্প্রতিকের কারো কারো কবিতার বইয়ের নাম প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, যদিও এটি একটি উপলক্ষ, প্রধান অনুষঙ্গ নয়, তবুও নামের ব্যঞ্জনা ও অর্থের গূঢ়ার্থ এবং রহস্যময়তা কবির স্বকীয় পরিচয় সৃষ্টিতে কিঞ্চিত ভূমিকা রাখতে দেখা যায়।
সাম্প্রতিক কবিদের ব্যক্তিক বিকাশ ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন অনুষঙ্গ ও প্রবণতা পরিলক্ষিত হতে দেখা যায়। কারো কবিতা গদ্যে যেমন বিকশিত পদ্যের বিনুনিতেও তেমন অনুধ্যানযোগ্য। কারো কারো কবিতা অতীতবোধ, রাজনীতি, সংকট ও প্রধানত লোকজ ঐতিহ্য সমৃদ্ধ আবার একইভাবে কখনো কখনো নগরজীবনের বাস্তবতাকেই বিকশিত করতে বেশি মাত্রায় পারঙ্গম। কারো কবিতায় যেমন বাহুল্য আছে প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার কম্বুরেখা, তেমনই আছে রসবোধ ও লোকজ-বাস্তবতায় জীবনকে কাব্যময় করার সদিচ্ছা। ঐতিহ্য আর সরলতা উপজীব্য করে নাগরিক-জটিলতাসিক্ত জীবনকে কবিতায় তুলে আনার মতো কঠিন কাজও কেউ কেউ করেছেন। কারো কবিতা মূলত গদ্যধর্মী হলেও মুক্তক অক্ষরবৃত্তের ছোঁয়াচ কবিতার পদ্য-স্বকীয়তাকে নান্দনিক করতে সাহায্য করেছে। সাম্প্রতিকের প্রায় সকল কবির কবিতায় রয়েছে মানবিকতাবোধ, বৈশ্বিকবোধ, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মিথের শক্তির উপলব্ধি অথবা অন্তর্লীন শূন্যতা বোধের কাব্যকলা। একদিকে যেমন ছন্দোবোধ অন্যদিকে ভাঙনের গদ্য-কল্পে বিম্বিত কাব্যময়তা। লোক-ঐতিহ্যতাড়িত সরল পদ্যের কথক হয়ে জীবনকে গ্রামীণ-চেতনাবোধ, লোকযান ও পুঁথিকারদের ঢঙে কাব্যময় করার একটা প্রয়াস কারো কারো কবিতায় লক্ষণীয়। শেকড়বোধকে বর্ণনে, কথনে, সারল্যে, গদ্যভাব ও ভাষায় বিম্বিত করে পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার প্রচেষ্টায় বিষয়ের অভিনবত্ব ও জটিলতার চাইতেও সারল্য, বিমূর্ত-অভিকল্পই বেশি বেশি প্রকটিত অনেকের কাব্যে। কারো কবিতায় গতি ও প্রগতির সম্মিলন রয়েছে, দেখার বোধ ও বিশ্বাসকে প্রশ্নসত্যে চিত্র আর সংকটের প্রেক্ষিতে উপলব্ধিজাত করে তোলা হয়েছে। কবিতার রহস্যময়তার অন্তরালে মানুষের বিবেকে প্রশ্ন সৃষ্টি ও ব্যঞ্জনাভাবের বিকাশের সপক্ষেই কাব্যধারার প্রবর্তক হিসেবে কেউ আবির্ভূত।
বাংলা কবিতার স্বভাবের অনেকটাই দৃশ্যধর্মী। ‘বিষয়’ ‘বর্ণনা’, ‘বন্দনা’ ও ‘বিবরণ’-এর বৃত্তে বন্দী। একুশ শতকের দোরগোড়ায় এসে কারো কারো পক্ষ থেকে বিষয়’কে জলাঞ্জলি দেবার প্রয়াস শুরু হয়। অর্থাৎ কবিতা কিছু বলবে না, কোনো ভারী কথা নয়, কোনো বক্তব্য নয়, দর্শন নয়। সমাজ-রাজনীতির ক্ষেত্র হোক; কবিতা ধ্বনি, শব্দ, ভাষা, অক্ষরের নেশায় নিজের আয়নায় যেন নার্সিসাস। কেবল ছবি, ছবির সারি। পরীক্ষা নিরীক্ষাকে নিরুৎসাহিত করার কিছু নাই। একবিংশ শতাব্দীর দুই যুগ আমরা অতিক্রম করে এসেছি। কিন্তু এখনো বাংলাদেশ পলিমাটির দেশ। যেটুকু কঠিন প্রস্তর আছে তা-ও চলমান ঝর্ণার জল পেয়ে পেয়ে সিক্ত হয়েই থাকে। সার্বিক বিচারে সমকালীন কবিতা হৃদয়গ্রাহী কিন্তু যতটা না হৃদয়গ্রাহী, ভাব-ভাষা-চিন্তা-চিত্রকল্প ও অনুভবের পরম্পরার সুনিয়ন্ত্রিত বিন্যাসে তার থেকেও বেশী বৈদগ্ধ্যপূর্ণ।
Quarterly Anupranan 13th Year 3rd Issue, Samprotiker Kabi O Kobita- 3rd Part
সম্পাদকীয়, কুহক মাহমুদ স্মৃতি সংখ্যা। অনুপ্রাণন- অষ্টম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা-
অনুপ্রাণন ও কুহকের কথা
কুহকের কথা বলতে গেলে অনুপ্রাণনের কথা আসবেই। কেননা, কুহক অর্থাৎ কুহক মাহমুদ, শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর সাথে ২০১২ সালে জন্মলগ্ন থেকেই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন ৫টি বছর। কুহকের সাথে আমার পরিচয় সরসিজ আলীমের মাধ্যমে। কবি সরসিজ আলীম তখন ‘ভনে যাহা ভনে’ শিরোনামে একটা ট্যাবলয়েড সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করতেন। ফেসবুকের মাধ্যমেই কবি সরসিজ আলীমের সাথে আমার পরিচয়।
এই পরিচয়ের কিছুদিন পূর্বে হোসনে আরা বেগম নামে একজন মধ্যবয়সী মহিলা ফেসবুকে আমাকে নক করেন। তিনি তখন ফেসবুকে ‘ফেসবুক বইমেলা ২০১২’ নামে একটা গ্রুপের এডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে বই প্রকাশ এবং সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। এক বিকেলে আমরা ছবির হাটে মিলিত হই, যেখানে উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন তরুণ কবি-সাহিত্যিক। তারা হলেনÑ রেজওয়ান তানিম, স্থপতি রাজীব চৌধুরী, কবি সুমি সিকানদার, ফেসবুকের মানবিক গ্রুপের অঞ্জন, ইহতিশাম আহমাদ টিংকু এবং আরো দুই-একজন হবে যাদের নাম এই মুহূর্তে আমার ঠিক মনে পড়ছে না। পরে এই বৈঠকগুলো পাবলিক লাইব্রেরির ক্যান্টিনের সামনের বাঁধানো উঠোনে অথবা কখনো কখনো হোসনে আরা বেগমের শ্যামলীর বাসায়ও অনুষ্ঠিত হতো। এই আলোচনা বৈঠকগুলোর মধ্য দিয়েই প্রথমে আমরা পাবলিক লাইব্রেরির সেমিনার-কক্ষে একটি ‘নবীন লেখক সমাবেশ অনুষ্ঠান’ করার সিদ্ধান্তে উপনীত হই। এই পর্যায়ে কবি সরসিজ আলীমও এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হয়। সমাবেশ অনুষ্ঠানের পর প্রথম বৈঠকে যখন একটি ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত হয় এবং যখন পত্রিকার জন্য একটি নাম ও একটি সম্পাদনা পরিষদ গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়, তখন কবি সুমি সিকানদার পত্রিকাটির নাম ‘অনুপ্রাণন’ করার প্রস্তাব আনেন, যে প্রস্তাবটি সংখ্যাগরিষ্ঠ উদ্যোক্তাদের সমর্থন লাভ করায় গৃহীত হয়। ওই বৈঠকগুলোতে পত্রিকার সম্পাদনা পরিষদ গঠন নিয়ে আলোচনা হলে সর্বসম্মতিতে আমার নাম প্রকাশক, হোসনে আরা বেগম সম্পাদক, কবি সরসিজ আলীম নির্বাহী সম্পাদক এবং সহ-সম্পাদক হিসেবে রেজওয়ান তানিম, রাজীব চৌধুরী, সুমি সিকান্দার, ইহতিশাম আহমাদ টিংকুসহ আরো দুই-একজনের নাম প্রস্তাব হয়। এই প্রস্তাব গৃহীত হলে ঠিক করা হয় যে, সম্পাদক ও সম্পাদনা পরিষদের সদস্যরা পত্রিকার কাজে অভিজ্ঞ আরো দুই-একজন ব্যক্তি যুক্ত করে সম্পাদনা পরিষদ সম্প্রসারিত করতে পারবেন।
এর কিছুদিন পর যখন হোসনে আরা বেগমের বাসায় সম্পাদনা পরিষদের প্রথম সভা হয়, তখন সেই সভায় কবি কুহক মাহমুদ ‘অগ্রদূত’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার মনি মোহাম্মদ এবং তাহমিদের নাম যুক্ত হয়। ওই সভায় কবি কুহক মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। ওই সভাতেই কবি কুহক মাহমুদের সাথে আমার পরিচয়। সেই সভায় লেখা সংগ্রহসহ পত্রিকা বের করার যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তসমূহ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই সূচনা সংখ্যার লেখা বাছাই এবং অনুপ্রাণনে অন্যান্য বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপের সদস্যদের যুক্ত করা নিয়ে কবি সরসিজ আলীম এবং হোসনে আরা বেগমের মধ্যে তুমুল বিতর্ক হয় এবং সেই বিতর্ক এমন তিক্ততার পর্যায়ে উপনীত হয় যে, সূচনা সংখ্যাটির কাজ যখন প্রেসে চলছিল, ঠিক তখন হোসনে আরা বেগম পত্রিকার সম্পাদক পদ থেকে এবং রাজীব চৌধুরী, সুমি সিকানদারসহ আরো দুই-একজন অনুপ্রাণন ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পরিস্থিতিতে পত্রিকাটিতে আমার নাম প্রকাশক ও সম্পাদক, সরসিজ আলীমের নাম নির্বাহী সম্পাদক এবং সহ-সম্পাদক হিসেবে শুধুমাত্র রেজওয়ান তানিম, কুহক মাহমুদ, মনি মোহাম্মদ ও তামজিদের নাম যুক্ত করে শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন পত্রিকার সূচনা সংখ্যা নভেম্বর ২০১২-এ প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে কুহক মাহমুদ অনুপ্রাণন পত্রিকাটির সাথে পাঁচ বছর যুক্ত ছিলেন। এই পাঁচটি বছরে কুহকের সাথে অনুপ্রাণনের মিথস্ক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ এই সম্পাদকীয়’র পরিসরে দেয়া সম্ভব না।
শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন একটি অবাণিজ্যিক পত্রিকা। এই অবাণিজ্যিক কথাটির অর্থ বারবার ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন দেখা যায়। যেহেতু মনে করা হয়, পত্রিকাটি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি সচেতন থেকে স্বাধীন ও মুক্ত মতামতের চর্চা ও প্রকাশ করবে, অর্থাৎ পত্রিকাটি আর্থিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দল অথবা কোনো সামাজিক সংগঠন অথবা দেশের সরকার অথবা করপোরেট মহলের পৃষ্ঠপোষকতার প্রত্যাশা করবে না। অতএব পত্রিকার পাঠকের কাছে সামান্য যে বিনিময়-মূল্য পত্রিকাটি গ্রহণ করবে, তা দিয়েই পত্রিকাটির যাবতীয় প্রকাশনা খরচ চালানো হবে।
যে কারণে অনুপ্রাণনের সাথে যুক্ত সবাইকে মোটামুটি স্বেচ্ছাশ্রম অথবা সামান্য কিছু সম্মানীর টাকায় চলতে হতো। ২৮ আগস্ট ২০১৯ তারিখে তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে অর্থাৎ ৬ আগট ফেসবুকে তাঁর সর্বশেষ পোস্টে অনুপ্রাণনের প্রাথমিক পর্যায়ের অর্থসংকটকালে কবি কুহকের সেই কৃচ্ছ্রসাধন ও কষ্টের কথাই বর্ণনা করেছিলেনÑ
“বাজেট ১০০ টাকা। বাসা থেকে বাসে গুলিস্তান ১০ টাকা। সেখান থেকে বাসে কাঁটাবন। শাহবাগ আসলেই জ্যাম। কোনোদিন হেঁটে বা প্রচণ্ড খিদায় নেমে পড়তাম বাস থেকে। হোটেলে প্রবেশ করে করুণ চোখে দু’টি পরোটা আর ডাল দিয়ে নাশতা করে হাঁটতাম। তারপর অফিস। কাজ। দুইটা না বাজতেই খিদা! সস্তাদরের হোটেলে ২৫ টাকার ভাত-ডিম বা মাছ, ডাল নেই। চলে যেত খাবার। কতদিন ১০ টাকা বেশি দিয়ে সবজি বা অন্য তরকারি নিতে পারিনি! আবার অফিস। কাজ। এই করেই সন্ধ্যা।
পুরি-চা ১০ টাকা। আবার কাজ। ৬০ টাকা শেষ। অফিস শেষ করে হাঁটতাম। ভার্সিটির মাঝ দিয়ে গুলিস্তান। বাসের লাইনের অপেক্ষা। কোনোদিন ৫ টাকার বাদাম। তারপর বাসা। ফিরতে ফিরতে রাত ১০টা। মেয়ে অপেক্ষা করত খাবার নিয়ে। ছেলে-মা অন্য বাড়ি থাকত। মেন্যু বেশিরভাগ ডিম ভাজা, ডাল। পেট পুরে খেতাম। আহ! কি সব দিন গিয়েছে। আনন্দ বেদনার। স্মৃতি কাঁদায়। (৬ আগস্ট, ২০১৯)”
সে সময়ে পত্রিকার কাজ করার পাশাপাশি কবি কুহক মাহমুদ অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে “গোধূলির প্রস্থানে জ্বালাও পূর্ণিমা (ফেব্রুয়ারি ২০১৪)” এবং “না-মানুষ (নভেম্বর ২০১৪)” শিরোনামে দু’টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই বই দুইটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এই সংখ্যার স্মৃতিচারণ বিভাগে প্রকাশিত হয়েছে। বলতে গেলে কবি কুহক মাহমুদ অনুপ্রাণনের সাথে যুক্ত হওয়ার পূর্ব থেকেই যকৃতের সংক্রমণজনিত রোগে আক্রান্ত ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও রোগের চিকিৎসা করা দূরে থাক, শরীরের প্রতি যতœ নেয়া দূরে থাক, তাঁর চলমান জীবন যাপন পদ্ধতি তাঁর শরীরের ক্ষতিই বৃদ্ধি করেছে। এসব ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার জন্য বারবার বলা সত্ত্বেও কবি কুহক মাহমুদ কারো কথারই কর্ণপাত করেনি। যার ফলে যথাযথ চিকিৎসা ও সেবার অভাবে তাঁর শরীরের অবস্থা দিনে দিনে অবনতি হতে থাকে। অসুস্থতার জন্য গত প্রায় দু’বছর কুহক আর সময় দিতে পারেনি অনুপ্রাণনকে। বলেছিলাম, না-মানুষের ২য় খ- লিখে দেন প্রকাশ করি। বলল, পারবো না। এই শরীরে কুলায় না।
কুহক মাহমুদের অকাল মৃত্যুতে আমরা শোকগ্রস্ত। অনুপ্রাণন-এর সাথে যুক্ত সকলের পক্ষ থেকে কুহকের বিদেহি আত্মার শান্তি কামনা করি। তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে “কুহক মাহমুদ স্মৃতি সংখ্যা” হিসেবে নিবেদন করি শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ৮ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যাটি।
অষ্টম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণনের একাদশ বর্ষের ৪টি সংখ্যায় বাংলাদেশের ১০০জন নির্বাচিত কবি ও তাদের কবিতা নিয়ে আলোচনার তৃতীয় পর্বে এসে এই সংখ্যায় ২৩জন কবি ও তাদের কবিতা নিয়ে আলোচনা সমুহ সংকলিত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিকের একাদশ বর্ষ অর্থাৎ এ-বছরের প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যায় বাংলাদেশের ১০০জন নির্বাচিত কবি তালিকা থেকে প্রতিটি সংখ্যায় ২৭জন করে মোট ৫৪জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, প্রাপ্ত সম্মাননা ও পুরষ্কার, উল্লেখযোগ্য কবিতা এবং কবিতা নিয়ে বিশেষ আলোচনা ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় এই সংখ্যায় অর্থাৎ ৩য় পর্বে ২৩ জন এবং পরবর্তী ৪র্থ পর্বে আরো ২৩ জন কবি ও কবিতা নিয়ে মোট ১০০ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরষ্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য কবিতা এবং কবিতা নিয়ে আলোচনা সংকলন সম্পন্ন হবে বলে আশা রাখছি।
বাংলাদেশের কবি ও তাদের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা দেখি যে, বাংলা সাহিত্যে বাংলাদেশের কবিদের অপরিসীম ভূমিকা ও অবদান রয়েছে। সাহিত্যমান বিবেচনায় তুলনামূলকভাবে কবিতাগুলো যে অত্যন্ত উচ্চস্থান দখল করে আছে, এটা নিঃসন্দেহেই বলা যায়। একদিকে নান্দনিক বিবেচনায় কবিতাগুলো যেমন উত্তীর্ণ, অন্যদিকে ঠিক তেমনই চলমান সমাজ, রাজনীতি, শোসিত মানুষের সংগ্রাম, জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম ও মানবিক চেতনায় উদ্ভাসিত কবিতামালা গণমানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। বাংলাদেশের কবিদের মূল বিষয় হিসেবে বাঙলার প্রকৃতি, মানবতা, মানব প্রেম, মাতৃস্নেহ, পিতৃস্নেহ, ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক সম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় ও সামাজিক মৌলবাদ বিরোধিতা, নারীবাদ ইত্যাদী বিষয়গুলো যেমন এসেছে ঠিক তেমনই পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে মানব-মানবীর প্রেম, বিরহ অথবা ব্যক্তি পরিচয়, আত্মানুসন্ধান, আত্মজিজ্ঞাসামূলক দার্শনিক বিষয়গুলো। ব্যক্তি, সমাজ ও দেশ কোনটাই অবহেলিত থাকেনি। জয়-পরাজয়, আশা-হতাশা, সংগ্রাম, সংক্ষুব্ধতা অথবা আপসকামিতা ছাড়িয়ে তাদের কবিতা হয়েছে মূলত জীবনধর্মী। তাই বাংলাদেশের কবিদের কবিতায় বহুলাংশে প্রকৃতি, প্রেম ও জীবনের অপার সৌন্দর্য সবসময় উঁচুতে তুলে ধরতে দেখা গেছে।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, একাদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা
সম্পাদকীয়-
অনুপ্রাণন: বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের পথ-পরিক্রমা
অনুপ্রাণনের পক্ষ থেকে ছোটগল্পের এই বিশেষ আয়োজন বা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশকে কেন্দ্র করে প্রথমেই যে প্রশ্নটা উঠতে পারে যে, কোনটাকে আমরা ছোটগল্প বলবো? বিশ্বসাহিত্যে কথাসাহিত্যের বিশেষ ধারা ছোটগল্পের সংজ্ঞা ও ধারণার মাঝে যেভাবে বদল হয়েছে বাংলা সাহিত্যে ঠিক সেভাবে হয়নি।
বাংলা সাহিত্যে কথাসাহিত্যের বিশেষ ধারা ছোটগল্পের আবির্ভাব ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। বহুল স্বীকৃত ধারণা এটাই যে, ছোটগল্প বলতে সাধারণত তাকেই বোঝায় যে কথা বা কাহিনী যা আধঘণ্টা থেকে এক বা দু’ঘণ্টার মধ্যে এক নাগাড়ে পড়ে শেষ করা যায়। কিন্তু গল্প বা উপন্যাস আকারে ছোট হলেই কী তাকে ছোটগল্প বলা যাবে? না, কারণ আমরা এটা বোঝার চেষ্টা করেছি যে, ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এতে বিন্দুতে সিন্ধুর বিশালতা থাকতে হবে, অর্থাৎ অল্প কথায় অধিক ভাব ব্যক্ত করতে হবে। উপন্যাসের সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য এখানেই। ছোটগল্পে উপন্যাসের বিস্তার থাকে না, কিন্তু থাকে ভাবের গভীরতা ও ব্যাপকতা। উপন্যাস পড়ে পাঠক পরিতৃপ্তি লাভ করে, কিন্তু ছোটগল্প থেকে পায় কোনো চিন্তা অথবা কোনো ভাবের শক্তিশালী ইঙ্গিতমাত্র। কাহিনীর কোনো বিশেষ রূপ বা কোনো বিশেষ অংশকে অবলম্বন করে ক্ষুদ্র কলেবরে নিগূঢ় ভাব অথবা চিন্তা যেখানে নিগূঢ় সত্যের ব্যঞ্জনার সার্থক অবস্থান থাকে তবে এর মাঝেই ‘ছোটগল্প’ সার্থকভাবে হয়ে উঠতে পারে।
ছোটগল্পের প্রকৃতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) তাঁর ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায় যা বলেছেন, সেই সংজ্ঞার মাঝে ছোটগল্প আর আবদ্ধ নেই। কেননা ছোটগল্প ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা ছোট ছোট দুঃখকথা, নিতান্তই সহজ সরলের মাঝে আর আবদ্ধ নেই। তবে ঐ যে ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’ কথাটা হয়তো থাকবে বহুকাল যতদিন ছোটগল্প দ্রুপদী সত্যেকে লতিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টায় নিয়োজিত থাকবে।
বিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত রচিত ছোটগল্পগুলোকে বিষয়বস্তুর দিক থেকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যেমন:
১) প্রেমের গল্প, ২) সামাজিক গল্প, ৩) ঐতিহাসিক গল্প, ৪) প্রকৃতি ও মানুষ সম্পর্কিত গল্প, ৫) রূপক বা সাঙ্কেতিক গল্প, ৬) অতিপ্রাকৃত, ৭) ব্যঙ্গ বা হাস্যরসাত্মক, ৮) মনস্তাত্ত্বিক গল্প, ৯) গার্হস্থ্যবিষয়ক গল্প, ১০) বিজ্ঞানবিষয়ক গল্প, ১১) উদ্ভট গল্প, ১২) মনুষ্যত্বের প্রাণিবিষয়ক গল্প, ১৩) বস্তুনিষ্ঠ গল্প, এবং ১৪) বিদেশি পটভূমিকায় রচিত গল্প।
যদিও বাংলা ছোটগল্পের প্রথম আভাস পাওয়া যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪)—যুগলাঙ্গুরীয় (১৮৭৪) ও রাধারাণী (১৮৭৫) গল্পে এবং পরে যোগ দেন পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৪-১৮৮৯), ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৪৭-১৯১৯), স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫-১৯৩২) ও নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত; কিন্তু প্রকৃত অর্থে বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক ছোটগল্পকার হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ‘দেনা-পাওনা’ (১৮৯০) গল্পটিই প্রথম সার্থক ছোটগল্প হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক ছোটগল্পকারদের মধ্যে প্রথমেই উল্লেখযোগ্য কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৬৩-১৯৪৯) নাম। এর পরের ছোটগল্পকার হলেন প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬), প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (১৮৭৩-১৯৩২), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৭৬-১৯৩৮), চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯৩৮), মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৮৮-১৯২৯), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০০-১৯৭৬), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৫-১৯৫৬), প্রবোধকুমার সান্যালের (১৯০৫-১৯৮৩) ইত্যাদি কথাসাহিত্যিকদের নাম উল্লেখযোগ্য।
বিভাগ-পূর্বকালে ছোটগল্প রচনায় খ্যাতি লাভ করেছিলেন এমন আরো কয়েকজন লেখক হলেন—দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার, রাজশেখর বসু, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, মনোজ বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সৈয়দ মুজতবা আলী প্রমুখ।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের সাহিত্যে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, অল্পকালের মধ্যেই এ-দেশীয় লেখকদের সৃষ্টিশীল রচনায় তা পূর্ণ হয়ে ওঠে। সাহিত্যের অপরাপর শাখার মতো ছোটগল্পের শাখাটিও ক্রমাগত ঋদ্ধতর হয়।
বাংলাদেশে ছোটগল্প রচনার ধারা বেগবান হয় চল্লিশের দশকে। এ সময় গল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে গৃহীত হয় গ্রাম ও নগর জীবনের কাহিনী। অনেক গল্পে স্থান পায় দেশবিভাগের মর্মান্তিক পরিণতি। আবার দেশ বিভাগের আগেকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও তেতাল্লিশের মন্বন্তরও কোনো কোনো গল্পের উপজীব্য হয়। আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯), আবু রুশদ (১৯১৯-) এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১) ছোটগল্পের প্রথম পর্বের তিন খ্যাতিমান লেখক। আবুল মনসুর প্রধানত হাস্যব্যঙ্গাত্মক অথচ গভীর সমাজমনস্ক ছোটগল্পের রচয়িতা। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ভ-ামি তাঁর তীক্ষè সমালোচনার লক্ষ্য। প্রায়শ সমাজবিরোধী ব্যক্তিরা তাঁর গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়েছে। আবু রুশদ ছোটগল্পে নগরজীবনের প্রথম সার্থক ভাষ্যকার। নাগরিক জীবনের জটিলতা এবং দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তিনি বহু গল্প রচনা করেছেন। বাংলাদেশের গ্রাম, এর পশ্চাৎপদতা, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ইত্যাদি বিষয় বাঙময় হয়ে উঠেছে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গল্পে। এ সময়ের আরও দুজন গল্পকার ফজলুল হক (১৯১৬-১৯৪৯) ও সোমেন চন্দ (১৯২০-১৯৪২) গল্প রচনায় অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।
পঞ্চাশের দশকে পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সাহিত্যজগতে লক্ষ করা যায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি। পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে বাঙালির আত্মচেতনার বিকাশ ঘটে ১৯৫২-এর ভাষা-আন্দোলনে। এর ফলে তখন সমাজ ও সাহিত্য উভয়ই প্রবলভাবে আলোড়িত হয়। ভাষা-আন্দোলনের পরের বছরই এর গৌরবময় স্মৃতিকে ধারণ করে কবি হাসান হাফিজুর রহমানের (১৯৩২-১৯৮৩) সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় একুশের সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারি। এতে সমকালীন সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অবদান উপস্থাপিত হয়। এর অনুসরণে পরবর্তীকালে বহুসংখ্যক পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। সমকাল, কণ্ঠস্বর, পূর্বমেঘ, উত্তরণ, ছোটগল্প, পূর্বপত্র, সাম্প্রতিক, গণসাহিত্য, বিপ্রতীপ প্রভৃতি একুশে ফেব্রুয়ারিই সার্থক উত্তরাধিকারী। এ চেতনায় ছোটগল্পও সমৃদ্ধ হতে থাকে প্রচুর গল্পকারের লেখনী-প্রভাবে।
এ সময় ছোটগল্পে নবীন-প্রবীণ লেখকদের হাতে বিচিত্র বিষয়ের রূপায়ণ ঘটে। ইব্রাহীম খাঁ (১৮৯৪-১৯৭৮), মাহবুব-উল আলম (১৮৯৮-১৯৮১), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩), আবু জাফর শামসুদ্দীন (১৯১১-১৯৮৮), শওকত ওসমান (১৯১৭-১৯৯৮), সরদার জয়েনউদ্দীন (১৯১৮-১৯৮৬), আবদুল হক (১৯১৮-১৯৯৭), শামসুদ্দিন আবুল কালাম (১৯২৬-১৯৯৮), আবু ইসহাক (১৯২৬-২০০৩), আশরাফ সিদ্দিকী (১৯২৭-), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯), জহির রায়হান (১৯৩৩-১৯৭২) প্রমুখ এ সময়কার উল্লেখযোগ্য গল্পকার। এঁদের মধ্যে বিষয়বৈচিত্র্যে, শিল্পচেতনার অনন্যতায় এবং প্রকাশভঙ্গির প্রাতিস্বিকতায় উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠেন শওকত ওসমান ও আলাউদ্দিন আল আজাদ। এ দুজনের মাধ্যমেই পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের ছোটগল্প অর্জন করে সামাজিক বাস্তবতার এক নতুন মাত্রা। গ্রামীণ ও শহুরে জীবন চিত্রণে এবং বিচিত্র চরিত্র নির্মাণে শওকত ওসমানের কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। আলাউদ্দীন আল আজাদের মধ্যে দুই বিপরীতধর্মী শিল্পচেতনার সমন্বয় লক্ষণীয়। নরনারীর মনোজাগতিক বিশ্লেষণে, যৌনতা চিত্রণে এবং সামাজিক চরিত্র উন্মোচনে আজাদ সমান দক্ষতার পরিচয় দেন।
এ প্রসঙ্গে আরও দুজন গল্পকারের দুটি গল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—শাহেদ আলীর ‘জিবরাইলের ডানা’ (জিবরাইলের ডানা, ১৯৫৩) এবং মাহবুব-উল আলমের ‘মফিজন’ (মফিজন, ১৯৫৪)। গল্প দুটিতে মানুষের অভাবক্লিষ্ট জীবন, ধর্মের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক শোষণ, সামাজিক নিষ্ঠুরতার প্রেক্ষাপটে নারীর হৃদয়বৃত্তির প্রকাশ এবং গ্রামবাংলার অবহেলিত নারীসমাজকে সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিক মর্যাদাদানের বিষয় চমৎকারভাবে চিত্রিত হয়েছে। এভাবে ভাষা-আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়ে ছোটগল্পে সমাজ ও জীবনের স্বরূপ নানাভাবে প্রতিফলিত হতে থাকে; বিভিন্ন গল্পে প্রচারিত হতে থাকে মানবতাবাদ, সমাজসচেতনতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা।
ষাটের দশক থেকে ছোটগল্পের দুটি বিশেষ দিক লক্ষণীয় হয়ে ওঠে: সমকালীন ঘটনার ব্যাপক প্রতিফলন এবং ব্যক্তিসত্তার বিভিন্নমুখী বিশ্লেষণ। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্র ও সমাজ তরঙ্গবিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৯৫৮-এর সামরিক শাসন, ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের ছোটগল্প। লায়লা সামাদ (১৯২৮-১৯৮৯), সুচরিত চৌধুরী (১৯২৯-১৯৯৪), আবদুল গাফফার চৌধুরী (১৯৩১-), হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-১৯৮৩), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-), শওকত আলী (১৯৩৬-), জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত (১৯৩৯-), হাসান আজিজুল হক (১৯৩৯-), হাসনাত আবদুল হাই (১৯৩৯-), রাহাত খান (১৯৪০-), আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-), আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭), সেলিনা হোসেন (১৯৪৭-) প্রমুখ গল্পকারের আত্মপ্রকাশ ঘটে ষাটের দশকের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে। এঁদের মধ্যে বিষয়বস্তু, প্রকরণ ও ভাষাশৈলীর ক্ষেত্রে নতুনত্ব আনয়নের জন্য সৈয়দ শামসুল হক, শওকত আলী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, হাসান আজিজুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বিশেষভাবে স্মরণীয়। এঁরা গল্প রচনায় প্রয়োগ করেন বিশ্লেষণধর্মিতা, অন্তর্মুখী ব্যঞ্জনা, আঞ্চলিক জীবন ও উপভাষা।
শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের সঙ্কট ও গ্রামীণ জীবনকে আধুনিক শিল্পচেতনায় উপস্থাপনে সৈয়দ শামসুল হক বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। নরনারীর সম্পর্ক, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা প্রভৃতি প্রাধান্য পেলেও শওকত আলী শেষ পর্যন্ত সমষ্টি মানুষের জীবনকেই রূপায়িত করার প্রতি অধিকতর মনোযোগী হন। তিনি নিম্নজীবী-হতদরিদ্র মানুষের কাহিনী বর্ণনায় বিশেষ সিদ্ধি অর্জন করেন।
বাকসংযম কাব্যময়তা ও প্রতীকতা সৃষ্টিতে এবং সমাজজীবনের গভীর প্রদেশ উন্মোচনে হাসান আজিজুল হকের সাফল্য অসাধারণ। গল্পকার হিসেবে ব্যাপক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সম্মানও অর্জন করেন তিনি। বাস্তব ও পরাবাস্তবের আলোছায়া, মানবচরিত্রের রহস্যময়তা এবং সংক্ষুব্ধ সমকাল—জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ও আবদুল মান্নান সৈয়দের গল্পের মৌল উপাদান। ছোটগল্পের স্বল্প পরিসরেও অস্তিত্বের সঙ্কট, জীবনের ক্লিন্নতা ইত্যাদি বিষয়কে প্রকাশ করতে গিয়ে জ্যোতিপ্রকাশ গল্পের আঙ্গিক ও ভাষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। দুর্বিনীত প্রধান (১৯৬৫), বহে না সুবাতাস (১৯৬৭), সীতাংশু তোর সমস্ত কথা (১৯৬৯) প্রভৃতি তাঁর প্রধান গল্পগ্রন্থ। জটিল বর্ণনারীতি, ব্যতিক্রমধর্মী শব্দব্যবহার, কাব্যিক পরিচর্যা ইত্যাদি বাংলাদেশের ছোটগল্পে এসেছে আবদুল মান্নান সৈয়দের মাধ্যমে। প্রতীকতা, পরাবাস্তবতা ও আধুনিক অস্তিত্ববাদের নিরিখে ব্যক্তি-সমাজের যোগসূত্র অনুসন্ধান তাঁর গল্পকে দিয়েছে বিশিষ্টতা।
ষাটের দশকে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে এরকম গল্পকারদের মধ্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সর্ব অর্থেই ব্যতিক্রমধর্মী। গ্রাম-নগর উভয় প্রেক্ষাপটেই তিনি ছিলেন সাবলীল। পুরান ঢাকা তাঁর গল্পে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর গল্পের চরিত্রসমূহ লোভ-লালসা, ভালোবাসা-ঘৃণা, হিংস্রতা-ক্রুরতায় অর্জন করে সর্বজনীনতা। বাংলাদেশের ছোটগল্পে একটি নতুন গল্পভাষা নির্মিত হয় তাঁর হাতে। তাঁর গদ্যের ইতিবাচক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল তাঁর সার্থক ছোটগল্পগুলো। একেবারে চলিত কথ্যভঙ্গিকে মার্জিত চলিত গদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে তিনি এক বেগবান ভাষা সৃষ্টি করেন, যা উভয় বাংলার প্রচলিত আদর্শ গদ্যরীতি থেকে আলাদা এবং যা একান্তই তাঁর। আলোচ্য গল্পকারবৃন্দ ছাড়াও যাঁরা স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় রেখেছেন তাঁরা হলেন সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, বশীর আল হেলাল, রাহাত খান, হাসনাত আবদুল হাই, সেলিনা হোসেন প্রমুখ।
ষাটের দশক বাংলাদেশের ছোটগল্পে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে এ দশক অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক পত্র-পত্রিকাও এ সময় থেকেই প্রচুর পরিমাণে প্রকাশিত হতে থাকে। দেশে আসতে শুরু করে বিদেশি প্রগতিশীল সাহিত্যের অনূদিত গ্রন্থাদি। গল্পকারের সংখ্যাপ্রাচুর্যেও এ দশক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে ষাটের দশকের ধারাই আরো গতিশীল হয় এবং মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত নতুন নতুন গল্পকারের আবির্ভাবে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে ছোটগল্পের জগৎ। হেলেনা খান (১৯২৯-), শহীদ আখন্দ (১৯৩৫-), আবুবকর সিদ্দিক (১৯৩৬-), মাহমুদুল হক (১৯৪০-), বুলবন ওসমান (১৯৪০-), বিপ্রদাশ বড়–য়া (১৯৪২-) হাজেরা নজরুল (১৯৪২-), আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১), ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ (১৯৪৫-), ফরিদা হোসেন (১৯৪৫-), কায়েস আহমেদ (১৯৪৮-১৯৯২), হুমায়ুন আহমেদ (১৯৪৮-) প্রমুখ গল্পকারের আত্মপ্রকাশ মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তীকালে হলেও মুক্তিযুদ্ধের পরেই তাঁরা খ্যাতি অর্জন করেন। অন্তিম ষাটের এ প্রজন্মকে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী ও স্বাধীনতা-পরবর্তী দুই প্রজন্মের সেতুবন্ধ বলে অভিহিত করা যায়। এঁদের মধ্যে আবুবকর সিদ্দিক (ভূমিহীন দেশ, ১৯৮৫; চরবিনাশকাল, ১৯৮৭; মরে বাঁচার স্বাধীনতা, ১৯৮৭), মাহমুদুল হক (প্রতিদিন একটি রুমাল, ১৯৯৪), আহমদ ছফা (নিহত নক্ষত্র, ১৯৬৯), কায়েস আহমেদ (অন্ধ তীরন্দাজ, ১৯৭৮; লাশকাটা ঘর, ১৯৮৭) প্রভৃতি গল্পকার বিষয় ও ভঙ্গির ক্ষেত্রে মৌলিক পরিচয় দিয়েছেন।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা লাভের পরে ছোটগল্পে অনিবার্যভাবে যুক্ত হয় মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি। যুদ্ধ এবং যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতার আলোকে রচিত হয় বিপুলসংখ্যক ছোটগল্প। তবে ষাটের দশকের ছোটগল্পে আঙ্গিক ও ভাষার ক্ষেত্রে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছিল, সত্তরের দশকে তা লক্ষিত হয় না। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে ছোটগল্পে সর্বাধিক লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এর বিষয়বৈচিত্র্য। মহসিন শস্ত্রপাণি (১৯৪৫-), সাযযাদ কাদির (১৯৪৭-), শান্তনু কায়সার (১৯৫০-), হরিপদ দত্ত, মুস্তাফা পান্না (১৯৫২-), ভাস্কর চৌধুরী (১৯৫২-), মঞ্জু সরকার (১৯৫৩-), সুশান্ত মজুমদার (১৯৫৪-), ইমদাদুল হক মিলন (১৯৫৫-), আহমদ বশীর (১৯৫৫-), ইসহাক খান (১৯৫৫-), আহমদ মুসা (১৯৫৭-), মঈনুল আহসান সাবের (জ. ১৯৫৮) প্রমুখ স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম দশকের গল্পকার। মহসিন শস্ত্রপাণি (জনশ্রুতি, ১৯৭৯), মুস্তাফা পান্না (লোকসকল, ১৯৮৪), মঞ্জু সরকার (অবিনাশী আয়োজন, ১৯৮২) প্রমুখ যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের অভাব-বঞ্চনা-শোষণের চিত্র তুলে ধরেন। সুশান্ত মজুমদার (ছেঁড়াখোঁড়া জমি, ১৯৮৫; রাজা আসেনি বাদ্য বাজাও, ১৯৯৪; শরীরে শীত ও টেবিল গু-াপা-া, ১৯৯৮), আহমদ বশীর (অন্য পটভূমি, ১৯৮১), মঈনুল আহসান সাবের (পরাস্ত সহিস, ১৯৮২; অরক্ষিত জনপদ, ১৯৮৩; আগমন সংবাদ, ১৯৮৪) স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের বিশিষ্ট রূপকার।
সত্তরের দশকে মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, সামরিক শাসনের দুঃসহ বাস্তবতা, দারিদ্র্য, বেকার সমস্যা, নারীনির্যাতন, সন্ত্রাস প্রভৃতির প্রভাব পড়ে ছোটগল্পে। স্বাধীনতার পর থেকে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যগ্রন্থগুলো দেশে অবাধে আসতে শুরু করে। অন্যদিকে মিডিয়া-টেকনোলজির অভাবিত উন্নতির ফলে তথ্য ও অন্যান্য বিষয়ে লেখক-পাঠক উভয়ের অভিজ্ঞতার পরিধি বৃদ্ধি পায়। সাহিত্যের ক্ষেত্রে এ নতুন অভিজ্ঞতাও যুক্ত হতে থাকে। তাই অন্তিমসত্তর থেকে আশির দশকের এবং সাম্প্রতিক বাংলা গল্পে বিষয়বস্তু, প্রকাশভঙ্গি ও ভাষার ক্ষেত্রে বেশ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এমনকি কোনো কোনো গল্পকারের গল্পকে ছোটগল্পের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিকও বলা চলে। আবু হাসান শাহরিয়ার, অনামিকা হক লিলি, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, বিশ্বজিত চৌধুরী, মহীবুল আজিজ, ওয়াহিদ রেজা, আনিসুল হক, মনির জামান, মামুন হুসাইন, সেলিম মোরশেদ, হুমায়ুন মালিক, সেলিম মোজাহার, শাহনাজ মুন্নী, রাজীব নূর, ফাহমিদুল হক, অদিতি ফাল্গুনি, আহসান ইকবাল, প্রশান্ত মৃধা প্রমুখ সত্তরের শেষ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ধারা পর্যন্ত সৃষ্টিশীল গল্পকার হিসেবে খ্যাত।
এঁদের মধ্যে মামুন হুসাইনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আশির দশকের এ গল্পকার প্রচলিত বাংলা গল্পে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারার সূচনা করেন। বিষয়ভাবনা ও প্রকাশভঙ্গিতে বাংলা ছোটগল্পে তাঁর পূর্বে এমন আর কাউকে দেখা যায়নি। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত তাঁর গল্পগ্রন্থ শান্ত সন্ত্রাসের চাঁদমারি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। তাঁর গল্পে বাস্তব ও কল্পজগতের সঙ্গে নিজস্ব দার্শনিক বোধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তাঁর গল্পগুলো কেবল প্রচলিত ধারার ব্যতিক্রমই নয়, সেগুলোতে বাংলাদেশের জীবন আশ্চর্য রকমভাবে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।
অষ্টম বর্ষ প্রথম সংখ্যা
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ১০ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা
সম্পাদকীয়-
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা- সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতি সংখ্যা
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যাটি সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতিসংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হলো। সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ ২০১৩ সালে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বিতীয় বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশের সময় অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদে যুক্ত হন। গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি অনুপ্রাণনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তাঁর অকাল মৃত্যু আমাদের শোকগ্রস্ত করেছে। তাঁর স্মৃতি বারবার ফিরে এসে আমাদের মন ভারাক্রান্ত করে তুলছে। স্বামী-পুত্র-কন্যা-পরিবার-পরিজন নিয়ে সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের একটা সংসার ছিল। নারী হিসেবে সংসার ও পরিবারের প্রতি কতগুলো স্বাভাবিক দায়িত্ব ছিল। কিন্তু পাশাপাশি সাহিত্য, সংগীত, সংস্কৃতি, ফ্যাশন ও পরিবেশ নিয়ে তাঁর ভাবনা ছিল, কর্মকাণ্ড ছিল। কবিতা লিখতেন, অনুবাদ করতেন, গল্প লিখেছেন। সম্পাদনা পরিষদে অংশ নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ও অনুপ্রাণন প্রকাশনের কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তরুণদের সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী করে তোলার লক্ষে প্রথম দুই বছর (২০১২-২০১৪) কনকর্ডের চত্বরে একটি দেয়াল পত্রিকার সম্পাদনাও করেছেন। ত্রৈমাসিক পত্রিকা ছাড়াও শিল্প-সাহিত্য জগতে অনুপ্রাণনের কর্মকাণ্ড প্রসারের জন্য বিভিন্ন সময় নেওয়া কর্মসূচি সফল করে তোলার জন্য সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ তাঁর অন্য সকল কাজের ভিড়ে অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদে পর্যাপ্ত সময় ও স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়নভিত্তিক প্রবন্ধগুলোতে শুধু যে তাঁর বহুমাত্রিক কাজের পরিচয় আমরা পাই তা নয়, পাশাপাশি আমরা খুঁজে পাই তাঁর মন-মানস। সেই সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ’কে যিনি ছিলেন একজন রুচিশীল, স্নেহশীল, মানবিক মানুষ। যিনি সুন্দরকে ভালোবাসতেন। সমাজে ঘৃণা, কদর্যতা, সংকীর্ণতা, বিভেদ, বৈষম্য ও নীচতা তাঁকে পীড়িত করেছে। প্রকৃতির মাঝে তিনি বিচিত্র সুন্দরের সন্ধান করতেন। প্রকৃতির মাঝে থেকেই তিনি দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের জীবন থেকে মুক্তি পেতে ভালোবাসা ও সহনশীলতার পাঠ নিয়েছেন। জীবনে ও পরিবেশে তিনি প্রতিনিয়ত সবুজ, সরলতা ও শান্তির সরোবর সন্ধান করেছেন, আহরণ করেছেন। তাঁর চারপাশটা সুন্দর করে সাজিয়ে তোলার জন্য সাজিয়ে রাখার জন্য সবসময় ব্যাকুল থেকেছেন।
সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ বিশ্বাস করতেন একটি দেশের দার্শনিক ও আদর্শিক স্থান চিহ্নিত হয় সে দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে। ক্রমাগত চর্চা ও সাধনার মধ্য দিয়ে একটি জাতির শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভিত মজবুত করা যায়। শিল্প-সাহিত্য ও সংগীত সাধনা ছাড়া শান্তির ও সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তোলা যায় না। শিল্প ও সাহিত্য সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একটি দেশের শিল্প-সাহিত্যে সে দেশের সমাজ প্রতিফলিত হয়। আবার শিল্প-সাহিত্যের চর্চার মধ্য দিয়েই সমাজের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, সামাজিক রীতিনীতি ও ঐতিহাসিক আখ্যানের নির্মাণ ও রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলমান থাকে। শিল্প-সাহিত্য মানব অবস্থার উপর অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আবেগ অন্বেষণ করতে, সামাজিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং আরও ন্যায়সঙ্গত ও সহানুভূতিশীল বিশ্ব গঠনে অবদান রাখতে সাহায্য করে। কেবল সমাজের সাজসজ্জার উপাদান হিসেবে নয় বরং সমাজকে বোঝার এবং রূপান্তরের জন্য শিল্প ও সাহিত্যচর্চা অপরিহার্য। শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমে সৃজনশীল ও নান্দনিক প্রকাশের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রক্রিয়া ব্যক্তির মানবিক অভিজ্ঞতার গভীরতর উপলব্ধি অর্জন করে তুলতে সক্ষম করে, চিন্তার বিকাশ সাধন প্রক্রিয়ায় জারিত হয়ে অমানবিক সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে, চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়সঙ্গত বিশ্ব নির্মাণে অবদান রাখতে পারে। এই বোধ ও অনুভূতিগুলোই সুলতানা শাহ্রিয়া পিউকে ক্রমাগত অনুপ্রাণিত করেছে এবং চালিকাশক্তি হিসেবে শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার সকল পরিসরে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।
বস্তুত পৃথিবীর সব কিছুই সুন্দর বা নান্দনিক হয় না। আমাদের চারপাশের দৃশ্য ও ঘটনাবলি থেকে উৎসারিত সকল অনুভূতি নান্দনিক বা শিল্পিত হয় না। এর মাঝে যে-সকল অনুভূতি ও প্রকাশভঙ্গি আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি আনে, মনে চঞ্চলতা আনে, আনন্দ দেয়, মনের আধ্যাত্মিক স্তরটিকে বিকশিত করে, সেগুলোকেই আমরা বলি, সুন্দর। এ যেন এক যাদু। এই যাদুর কাঠির পরশ যে শিল্পে, যে সাহিত্যে থাকে না সেই শিল্প সেই সাহিত্য মানুষের হৃদয়ের উষ্ণ ছোঁয়া থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়। বাংলা ভাষায় ‘নন্দনতত্ত্ব’ শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মূলত নান্দনিকতা আঠারো ও উনিশ শতকের একটি সাহিত্যিক ও শৈল্পিক আন্দোলন, যা সৌন্দর্যের গুরুত্বের উপর আলোচনার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল। এই ধারণা দিতে সচেষ্ট হয়েছিল যে সৌন্দর্য ছিল শিল্প ও সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সৌন্দর্য কী, তা বর্ণনা দিয়ে অপরকে বোঝানো যায় না, এটি অসংজ্ঞায়িত। সৌন্দর্য উপলব্ধির বিষয়, তাই এটি বুঝে নিতে হয়। ভাবের পরিপূর্ণতা এবং প্রকাশের তীব্র আকুতি নিয়ে সৌন্দর্যের নিজস্ব মূল্য সৃজন-চেষ্টার কৌশল অনুসরণ করা প্রতিটি শিল্পী ও সাহিত্যিকের জন্য মূল্যবান। সামষ্টিক সংস্কৃতি বিশুদ্ধ বুদ্ধির বিষয়, যা কিনা শিল্পের মাধ্যমে উদ্ভাসিত সৌন্দর্যের বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং সর্বদা একটি প্রতি-পরিবেশ হিসেবে কাজ করে যেখানে মানবিকতার ভূমিকাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের মাঝে ছিল গভীর সৌন্দর্যবোধ। তাঁর প্রতিটি কর্ম তাই হয়ে ওঠে এমন একটি ব্যতিক্রম যেখানে সম্পৃক্ত থেকেছে নান্দনিকতার বিশেষ ছোঁয়া। তাঁর কবিতা অথবা গল্প রচনায়, বাচিক শিল্প অথবা সংগীতচর্চায়, ফ্যাশন ডিজাইনে অথবা তাঁর ছাদবাগানে, কিংবা বৃক্ষ রোপণ ও বৃক্ষ উপহার কার্যক্রমে সদা প্রকাশ পেয়েছে গভীর নান্দনিকবোধ ও মানবিকতাবোধ। যার ছাপ তিনি রেখে গেছেন আমাদের সবার হৃদয়ে। তাই, সশরীরে না থাকলেও আগামীতে অনুপ্রাণনের সৃজন-নন্দনের পরিসরে পরিচালিত সকল কর্মকাণ্ডে নান্দনিকতা, শুভবোধ ও মানবিকতার উদাহরণ হয়ে পিউ আমাদের সঙ্গে থাকবেন।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 1; Sultana Shahria Pieu Memorial Issue
অনুপ্রাণন ১১তম বর্ষ ১ম সংখ্যা- সম্পাদকীয়
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণনের সূচনা সংখ্যা প্রকাশিত হয় নভেম্বর, ২০১২। এ-পর্যন্ত ৩২টি সংখ্যা প্রকাশ করে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ১০ টি বছর অতিক্রম করেছে। এ দশটি বছর অনুপ্রাণন’কে নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়েই এগিয়ে যেতে হয়েছে। আজ একাদশ বর্ষের প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশ করার মুহূর্তে পেছনের দশটি বছরের দিকে ফিরে স্মৃতিতে অনেক কিছুই ভেসে আসে। লেখক, পাঠক এবং সম্পাদনা পরিষদের সাথে ভাগ করে নেয়ার মতো অনেক কথাই হয়তো বলার থাকে, বলার ছিল। কেননা ১০ বছর তো কম সময় নয়। তবে, শিল্প-সাহিত্যের পত্রিকা অথবা লিটল ম্যাগ প্রকাশের ইতিহাসে প্রায় একই ধরনের ঘটনা হয়তো হর-হামেশাই ঘটে থাকে।
টেকসই সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি এবং সংগঠনের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক নির্মাণে পেশাদারিত্বের অভাব আমাদের সমাজের সব ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। এখনো সেখানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অহমবোধ প্রতিটি সংগঠনের ভিত কুরে কুরে খাচ্ছে। বাইরের থেকে যেটা দেখা যায় সেটা ঠিক ভেতরের চিত্র না। আর তাছাড়া অর্থনীতির বিষয়টা তো আছেই। আর সেটার গুরুত্ব অনুধাবন করার ঘাটতি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্রই বিদ্যমান। আমাদের দেশের শিল্প-সাহিত্য এবং সংস্কৃতির জগতে সাধারণভাবেই অর্থের সংকট রয়েছে। সাধারণভাবেই বলা যায় যে, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধির গুরুত্ব আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র এখনো যথার্থভাবে বুঝতে ব্যর্থ। ভাবা হচ্ছে ভৌত কাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নের মধ্য দিয়ে উন্নতির চাকা ঘুরলে দেশের উন্নয়ন হবে। কিন্তু আমরা জানি উন্নত সভ্যতা মানেই হচ্ছে উন্নত শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি।
তাই, অনুপ্রাণন যেসব সাংগঠনিক সমস্যা মোকাবেলা করে টিকে আছে সেসবের সাথে অন্যান্য শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য বা ব্যতিক্রম হয়তো নির্মাণ করা যায়নি। কেননা আমরা শেষ পর্যন্ত, এদেশের প্রকৃতি ও মনুষ্যসমাজেরই অঙ্গ। দেশের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি- এসবের সংকট ও সম্ভাবনা থেকে অনুপ্রাণন বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ তো নয়।
এটা ঠিক অনুপ্রাণন পত্রিকাটিকে ঘিরে এই দশ বছরে লেখক-পাঠক ও সুভানুধ্যায়ীদের একটি বৃত্ত তৈরি হয়েছে। এই বৃত্ত কোনো বিশেষ সীমানা রেখা দিয়ে ঘেরা কোনো বৃত্ত না। এই বৃত্ত শিল্প-সাহিত্যের মুক্ত চর্চার মতোই উন্মুক্ত। অনুপ্রাণন মুক্ত চিন্তার চর্চাকেই সবসময় সমর্থন করেছে, অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেছে। আর অনুপ্রাণন চেষ্টা করেছে এদেশের তরুণরা যেন বেশী বেশী করে বই পড়া আর শিল্প-সাহিত্যের চর্চায় আগ্রহী হয়ে উঠে। সারাদেশ জুড়ে অনুপ্রাণনকে ঘিরে আছে একদল তরুণ-তরুণী, যারা নিয়মিত শিল্প-সাহিত্য চর্চার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারাই অনুপ্রাণনের প্রাণশক্তি। যাদের সাথে অনুপ্রাণনের সম্পর্ক হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক সৌহার্দের। একে আরেকের পরিপূরক।
দশ বছর নিয়মিত বিভাগ নিয়ে ছাপার সংস্করণ আকারে অনুপ্রাণন পত্রিকাটি প্রকাশ করার পথে লেখক ও পাঠকদের কাছ থেকে ক্রমেই দুটি দাবী জোরালো হয়ে উঠেছে। প্রথমটি হচ্ছে, অনুপ্রাণনের একটি অন্তর্জাল সংস্করণ প্রকাশ করা। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের মুদ্রিত সংস্করণে সাহিত্য ও শিল্পের বিশেষ ধারা, ধরন অথবা বিষয়ভিত্তিক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করা।
ইতোমধ্যেই গত ৯ ফেব্রুয়ারি অনুপ্রাণনের পক্ষ থেকে, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণনের সূচনা সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। অন্তর্জালভিত্তিক এই সংখ্যাটিতে থাকছে ২০ টি বিভাগ। যথাক্রমে- শ্রদ্ধাস্মরণ, স্মৃতিচারণ, প্রবন্ধ, অনুবাদ প্রবন্ধ, গুচ্ছ কবিতা, যুগল কবিতা, একক কবিতা, অনুবাদ কবিতা, বড়ো গল্প, ছোট গল্প, অণুগল্প, অনুবাদ গল্প, মুক্তগদ্য, ভ্রমণকাহিনী, বই আলোচনা, ম্যাগ আলোচনা, পাঠ প্রতিক্রিয়া, চলচ্চিত্রকথা, ধারাবাহিক উপন্যাস, নাট্যকথা এবং শিল্প-সাহিত্য সংবাদ।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন ইতিমধ্যে অনিয়মিতভাবে ৬ টি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। সেগুলো হচ্ছে, (১) তৃতীয় বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা- প্রিয় উপন্যাস সংখ্যা; (২) অষ্টম বর্ষ প্রথম সংখ্যা- গল্প সংখ্যা; (৩) অষ্টম বর্ষ তৃতীয় সংখা- অণুগল্প সংখ্যা; (৪) অষ্টম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা- কুহক মাহমুদ স্মৃতি সংখ্যা; (৫) নবম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা- কবি ও কবিতা সংখ্যা; এবং (৬) দশম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- বাংলাদেশের ১৫টি সেরা গল্প- পাঠ ও আলোচনা সংখ্যা।
একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যার মধ্য দিয়ে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, সকল মুদ্রিত সংস্করণে নিয়মিতভাবেই শুধুমাত্র দেশের শিল্প, সাহিত্য, ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে আরো নিবিড়ভাবে তুলে ধরার জন্য বিশেষ ধরন, বিশেষ বিভাগ, বিশেষ ধারা অথবা বিশেষ বিষয় নিয়ে লেখা প্রকাশ করার সূচনা করতে চায়।
লেখক, পাঠক এবং অনুপ্রাণনের সম্পাদনা পরিষদের সেই চাওয়া থেকেই ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের একাদশ বর্ষের প্রথম সংখ্যাটি নির্বাচিত কবি ও কবিতা সংখ্যা- প্রথম পর্ব হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এই সংখ্যাটিতে বাংলাদেশের ২৭ জন নির্বাচিত কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য কবিতা এবং আলোচনা প্রকাশিত হয়ছে। বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রবীণ ও তরুণ কবিদের নিয়ে এই ধরনের লেখা ও আলোচনা নিয়ে আরো কয়েকটি পর্ব প্রকাশিত হবে বলে আমরা আশা করি।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবিদের জীবনী ও সাহিত্য কর্ম নিয়ে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিকের কয়েকটি পর্বের এই আয়োজনগুলোর মধ্য দিয়ে আশা করি আমাদের দেশের তরুণ সমাজ বাংলাদেশের কবিদের কবিতার সাথে সুপরিচিত হবেন এবং আমাদের দেশের সম্মানিত এই কবিদের কবিতা নিয়ে আলাপ, আলোচনা এবং আড্ডার অনুষ্ঠানের আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের শিল্প ও সাহিত্য চর্চার বৃত্তটিকে প্রসারিত করতে পারবেন।
অনুপ্রাণন ১১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা
সম্পাদকীয়, অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, গল্পকার ও গল্প সংখ্যা (দ্বিতীয় পর্ব)
বালাদেশের ১০০ গল্পকার ও তাদের উল্লেখযোগ্য গল্প নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন যাত্রার দ্বিতীয় পর্বে প্রকাশিত হলো আরও ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা, তাদের রচিত গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা এবং একটি করে তাদের উল্লেখযোগ্য গল্পের অনুলিপি। সংখ্যাটিতে গল্পকারদের নিয়ে রচনাগুলোর অনুক্রম লেখা প্রাপ্তির ভিত্তিতে বয়সানুক্রমে প্রস্তুত করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের চৌহদ্দিতে পৃথকভাবে বাংলাদেশের সাহিত্য প্রসঙ্গে আলোচনায় বাংলা সাহিত্যে পাকিস্তানি ভাবধারা অর্থাৎ রক্ষণশীলতা ও সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব প্রসঙ্গে পূর্বে আলোচনা হয়েছে। দেশভাগের আগের সাহিত্য অখণ্ড বঙ্গসাহিত্যের সাথে পরোপুরি অন্বিত হলেও পূর্ববাংলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রচিত সাহিত্যপ্রবণতা কতিপয় বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে একটু স্বতন্ত্র ছিল। বিশেষত তার আঞ্চলিক ও ভৌগোলিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্য এর সাহিত্যকে নতুন কাঠামো দিয়েছিল। পাকিস্তান আমলে বা দেশভাগ পরবর্তী পর্যায়ে আরবি-ফার্সি ও ইসলামিকরণের প্রচেষ্টা পুরোপুরি সফল না হলেও সেই প্রচেষ্টার কারণে মূলধারার সাহিত্য সৃজনপ্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু, সকল প্রতিক‚লতা সত্তে¡ও দেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের একনিষ্ঠ কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে বাঙালি মুসলিমকে মুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক রাখার চেষ্টা কার্যকরীভাবে সক্রিয় ছিল। তাই পাকিস্তানপন্থি সাহিত্যগোষ্ঠী সফলতা পায়নি এবং তাদের রচিত সাহিত্য স্থায়ী কোনো রূপ পায়নি এবং একসময় মানুষের স্মৃতি থেকে তা হারিয়ে যায়।
ইতোপূর্বে অনুপ্রাণন সম্পাদকীয়তে এটাও আলোচনা হয়েছে, স্বাধীনতা পরবর্তী সাহিত্যের ভিত্তি সৃষ্টি হয়েছে স্বাধীনতার আগের কয়েক দশকে। পাকিস্তান আমলে বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকেই পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের সময় উদ্দীপ্ত মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ সমাজের মানস আবিষ্কার করেছিলেন লেখকেরা। পরবর্তীকালে স্বাধীনতার শক্তি, সংহতি, মর্যাদাবোধ ও গৌরব বাংলাদেশের আপামর জনগণের মনে যে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল এর প্রকাশ ঘটে সাহিত্যে। এর সাথে অনিবার্যভাবে যুক্ত হয়েছে এই বাংলার নিজস্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অফুরান লীলা, নদীমাতৃক সজল মনন, আঞ্চলিক জীবন ও ভাষার বৈচিত্র্য, ছোট ছোট সম্প্রদায় ও পেশাজীবী মানুষের অন্তর্লীন জীবনধারা ও বোধ।
যে বিষয়টি এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমসাময়িকতা সাহিত্যকে রসদ জোগায় ঠিকই তবে তা সাহিত্যের জন্য ক্ষতিকরও বটে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যদ্ধের কারণে যে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটেছিল তা লেখকদের মনে স্থায়ী এক প্রভাব ফেলে ঠিকই; যুদ্ধের নানা ধরনের তাৎপর্যগত অধীরতা নিয়ে সাহিত্যকর্ম তৈরি হয়েছে ঠিকই কিন্তু সব লেখক এর জন্য প্রস্তুত ছিলেন কিনা বা এর গভীর তাৎপর্যকে ধারণ করার মতো শক্তি সবার ছিল কিনা- প্রসঙ্গটির যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন।
আর একটি বিষয়, সাময়িক ঘটনার তাৎক্ষণিক উত্তেজনা গভীর বা শাশ্বত কোনো জীবনবোধ সৃষ্টি করতে পারে না। ক্লাসিক বা ধ্রুপদি সাহিত্য সমসাময়িকতাকে ছাড়িয়ে যেতে চায়। সেকারণে বড় আকারের কোনো ঘটনা নিয়ে মহাআখ্যান বা ধ্রুপদি রচনা লিখতে লেখককে অপেক্ষা করতে হয় অনেকটা সময়। অপেক্ষা করতে হয় ততদিন, যতদিন না যুদ্ধ বা মারির সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব বা মানবসমাজে তার প্রভাব আবিষ্কার করার পূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয়, বাংলাদেশের মহান মক্তিযুদ্ধ নিয়ে গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ আখ্যান বা অনন্য সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি হয়ে গেছে এরকমটা ভাবা হয়তো সঠিক নয়। বরং, হয়তো আরও দীর্ঘ সময় আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে। তবে এই পঞ্চাশ বছরে যা রচিত হয়েছে তার মান নিয়ে কথার পাশাপাশি তার চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে এবং এই আলোচনার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।
সদ্য স্বাধীন ও যুদ্ধে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ যেভাবে মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় তার গভীর ও নির্মোহ বয়ান আমরা পেয়েছি সত্তর, আশি ও নব্বই দশকের লেখকদের রচনায়। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর প্রো-পাকিস্তানি শক্তিবলয় যে রাজনৈতিক অপতৎপরতা শুরু করে তার ভয়াবহ পরিণাম এদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু, এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বাংলাদেশের সাহিত্যে ঘটেনি। তখন মুক্তবুদ্ধির সত্যিকারের লেখকদের জীবনে অমোঘ অন্ধকার নেমে এলেও, অবাধ সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা বাধাপ্রাপ্ত হলেও, সামরিক সরকার বা ছদ্মবেশী সামরিক সরকার নতুন জাতীয়তাবাদী তত্ত্ব নিয়ে জোরেশোরে দল বেঁধে মাঠে নামলেও, তাদের বশংবদ লেখকেরা তেমন কোনো মানসম্পন্ন সাহিত্য রচনা করতে পারেননি। যার ফলে ৯০ দশকের পর থেকে মূলধারার সাহিত্য দ্রুতই স্বস্থান ফিরে পেতে শুরু করেছিল।
কিন্তু ইদানীং রাজনীতির আপসকামিতার চোরাগলি দিয়ে রক্ষণশীলতা ও মৌলবাদ উদার ও মুক্ত শিল্প-সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে একপ্রকার বাধা হয়ে দাঁড়াতে সচেষ্ট রয়েছে। যার ফলে স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের ছায়া যেন কবি ও কথাসাহিত্যিকদের শিল্প-সাহিত্য চর্চায় ঈষৎ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। বিষয়টি নিয়ে যদিও কোনো গভীর সংকট এখনো সৃষ্টি হয়নি তবুও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সাইবার নিরাপত্তার মতো আইন প্রণয়ন সম্পর্কে শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের সচেতন প্রতিবাদ আরও জোরদার হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, শিল্প ও সাহিত্য যে কোনো সেন্সরশিপ বা নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও বিচ্ছিন্নতা প্রকাশের কার্যকরী ক্ষেত্র প্রস্তুত করার হাতিয়ার। শিল্প-সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে সামাজিক অসঙ্গতি ও সংহতি গড়ার এবং উপায়গুলো আবিষ্কার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। অধিকাংশ পাঠক শিল্প প্রকরণের মধ্যে বিপ্লবী সম্ভাবনা সন্ধান করার সুযোগ খোজেন। এই মিথস্ক্রিয়ায় রুচি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে চলমান ও প্রগতিশীল একটি প্রভাব আছে। কিন্তু, কেউ কেউ এসব বিষয়ে মত প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকেন বা একাত্মতা প্রকাশ না-ও করতে পারেন।
সাহিত্য কেবল অন্ধকারাচ্ছন্নতা থেকে জাতিকে উত্তরণের জন্য কাজ করে না, সুন্দরের নানা পথও উন্মোচন করে দেয়। শিল্প-সাহিত্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সন্নিহিত একটি বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠতে আমরা দেখেছি এবং হয়তো চলমান সময়ে ভাঙা-গড়ার প্রক্রিয়ায় কোনো নতুন পথের সন্ধান আমরা পেতে পারি। কিন্তু কোনো কিছুই স্বতঃস্ফূর্ত ঘটেনি, ঘটবেও না। সেক্ষেত্রে সময়টাকে বদলে দেওয়ার কৌশল শিল্পী ও সাহিত্যিকদের অনুধাবন করাটা জরুরি।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা - গল্পকার ও গল্প সংখ্যাঃ দ্বিতীয় পর্ব
অষ্টম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.






There are no reviews yet.