Additional information
| Weight | 0.516 kg |
|---|---|
| Published Year |
$ 2.94
সম্পাদকীয় – অনুপ্রাণন – দ্বাদশ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা, গল্পকার ও গল্পসংখ্যা (চতুর্থ পর্ব)
প্রকাশিত হলো ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা, গল্পকার ও গল্প সংখ্যা- চতুর্থ পর্ব। গল্পকার ও গল্পসংখ্যা চতুর্থ পর্ব প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশের ১০০ জন নির্বাচিত গল্পকার, তাদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা, গল্পকার রচিত গল্পসাহিত্য নিয়ে আলোচনা এবং একটি উল্লেখযোগ্য গল্প সংকলিত করার কাজ শেষ হলো। এই সংখ্যায় পূর্বের তিনটি সংখ্যার মতোই ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
দ্বাদশ বর্ষে এসে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন থেকে বাংলাদেশের ১০০ জন গল্পকার নিয়ে প্রবন্ধ একত্রিত করে সংকলন প্রকাশ করার কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। প্রথম কাজটি ছিল বাংলা সাহিত্যের গল্পকারদের মধ্য থেকে কারা বাংলাদেশের গল্পকার সেটা নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা, দ্বিতীয়তে এসে বাংলাদেশের গল্পকারদের মধ্য থেকে ১০০ জন গল্পকার বাছাই করা, তৃতীয়তে এসে গল্পকারদের গল্পসাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা বা প্রবন্ধ লেখার জন্য লেখক নির্ধারণ করা। এই কয়টা ধাপের কাজ যতটুকু না কঠিন ছিল তার থেকে বেশি কঠিন ছিল যেসকল গল্পকারের প্রকাশিত গল্পগ্রন্থগুলো সহজলভ্য ছিল না সেগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে জোগাড় করা। এই কাজ করতে আমাদের চেষ্টার সফলতার পেছনে যারা কাজ করেছেন, সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। আমরা তাদের কাছেও বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ যারা বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকারকে নিয়ে এক একটি প্রবন্ধ লিখে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কাজে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন একাদশ বর্ষে এসেও একইভাবে বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ কবি তাদের কবিতা নিয়ে চারটি সংকলন প্রকাশ করেছে। তারপর দ্বাদশ বর্ষে এসে বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকারকে নিয়ে আরও চারটি সংকলন অনুপ্রাণন থেকে প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং বাস্তবায়ন করার উদ্দেশ্য একটাই। সেটা হচ্ছে- যারা আমাদের কবিতা ও গল্প সাহিত্যের ভিত্তি গড়েছেন তাদের সাথে এবং তাদের কাজের সাথে প্রজন্মকে পরিচিত করে তোলা। আমাদের নির্বাচিত গল্পকারদের মধ্য যিনি সর্বজ্যেষ্ঠ তিনি হচ্ছেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন। তার জন্ম ১৮৯৭ সালে আর মৃত্যু ১৯৭৮ সালে। আর নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হচ্ছেন ইমতিয়ার শামীম। তিনি ১৯৬৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা পূর্ব সময় এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তাদের অধিকাংশই সাহিত্যচর্চা করেছেন। ফলে তাদের সাহিত্য এমন একটা বিশেষ সময়কে ধারণ করেছে যেখানে দুটি দেশভাগের অভিজ্ঞতা হয়েছে। দুটি দেশভাগের কার্যকারণের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে তাদের লেখায় যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ন্যায্যতা ভিত্তি পেয়েছে ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের স্বত্ব, সত্তা ও মৌলিকত্ব নির্মাণে গল্পকারগণ উদ্যোগী হয়েছেন। আমরা অনুপ্রাণন, বিশ্বের বাংলা সাহিত্যে বাংলাদেশের স্বকীয় অবস্থানের বাস্তবতাটিকে প্রবলভাবে অনুভব করি এবং গর্বিত হই।
বাংলাদেশের গল্প-সাহিত্যের চরিত্রদের জীবনের শেকড় অধিকাংশেই প্রাকৃত জীবনে প্রোথিত। মাটি ও সবুজের সাথে সম্পর্কিত। মাত্রই এক অথবা খুব বেশি হলে দুই প্রজন্ম যারা গ্রামের শ্যামলিমা থেকে নগরের কঠিনতায় অভিবাসিত হয়েছে। নগরে থেকেও তারা যেন শহরতলীতে বসবাস করছে। যাদের কারও কারও শরীর থেকে এখনও মাটির গন্ধ মিলিয়ে যায়নি। তাই অধিকাংশ গল্পের দৃশ্যপট হয় শহর না-হলে শহরতলী। গল্পের মানুষগুলো কৃষক না-হয় কৃষকের শিক্ষিত সন্তান। দৃশ্যপটের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়গুলোর বিন্যাসে তাই কখনও গ্রাম সম্পূর্ণভাবে তিরোহিত হয়ে যায়নি।
গ্রামের রূপান্তর কাহিনী হোক অথবা শহর থেকে নগরায়ণের দিকে উত্তরণের কাহিনী হোক প্রায় সকল ক্ষেত্রেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও পরিবার; তাই কাহিনী যতটা না ব্যক্তিকে নিয়ে তার থেকে বেশি হচ্ছে পারিবারিক অথবা সামাজিক। কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্তই বাংলাদেশের গল্পের প্রধান চরিত্র। ধনী পরিবারের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, কলহ, প্রেম-ভালোবাসার গল্প হাতে গোনা। বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পের প্লটে সংঘাত ও সংঘর্ষের নিরসনই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু এমন কিছু প্লট সৃষ্টি করতেও দেখা গেছে যেখানে সংকট নিরসন হয়নি। অর্থাৎ বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্প অধিকাংশই একটি ইতিবাচক সমাধান অথবা ইঙ্গিত পাওয়া যায় এবং নেতিবাচক চরিত্র খুব কমই গল্পের সম্পূর্ণতার ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের গল্প রোমান্টিক ভাব ও আবেগে ভারাক্রান্ত হতেই দেখা যায় বেশি এবং পাঠকেরা সেগুলো পছন্দও করছেন। কিন্তু গল্পকাররা তাদের গল্পে ভাব ও আবেগের ভারসাম্য রক্ষা করেছেন, বাস্তব বিচারে সেই গল্পগুলো বোদ্ধা ও পরিপক্ব পাঠক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
বাংলাদেশের গল্পের আখ্যানবস্তুতে রোমান্টিকতার প্রভাব বেশি থাকলেও এক ঝাঁক গল্প আছে যেখানে জীবনজিজ্ঞাসার দর্শন চিন্তায় জাগরিত হতে দেখা যাচ্ছে। গল্পের গদ্যনির্মাণ যথেষ্ট পরিপক্ব। বানান, ব্যাকরণ, বাক্য গঠন, রূপকের নান্দনিক ব্যবহারে সমৃদ্ধ। গল্পের শুরুর চমক নিয়ে গল্পকারদের মধ্যে একটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যায়। এই ব্যাপারে ভিন্নমত আছে, যদিও পারিবারিক পটভূমিতে নির্মিত গল্পগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চমক দিয়ে শুরু করার একটা প্রবণতা রয়েছে। অপ্রাসঙ্গিক সংলাপ কোনো কোনো গল্পকে অহেতুক ভারাক্রান্ত করেছে। কিন্তু বলা যেতে পারে অধিকাংশ গল্পই দৃশ্যপট বর্ণনায় এবং সংলাপের ওপর গল্পকাঠামো নির্মাণ করার কাজটি করেছেন মেদহীন গদ্যে। গল্পগুলো একরৈখিক হয়নি আবার পার্শ্বচরিত্রের উপ-গল্পগুলো গল্পের প্রধান আখ্যানকে ভারাক্রান্ত করেনি। সময়, কালের প্রতি গল্পগুলো সুবিচার করেছে যেখানে সত্য ইতিহাসের সাথে অহেতুক বিতর্কে অবতীর্ণ হয়নি। গল্পের পক্ষ ও প্রতিপক্ষের অস্তিত্ব ও তাদের আচার-আচরণ অবাস্তব করে তোলা হয়নি। গল্পের চরিত্রগুলোকে দেবতাতুল্য অথবা উল্টোদিকে শয়তানতুল্য করে অবাস্তব কাল্পনিক চরিত্র করে গড়ে তোলা হয়নি। বাংলাদেশের গল্পে রূপকের ব্যবহারে ফ্যান্টাসির তুলনায় বাস্তবের বস্তুগুলোকেই নান্দনিক করে তোলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের গল্পগুলো সামগ্রিকভাবেই এমন একটি উচ্চতর স্তরে উত্তীর্ণ হয়েছে, যখন বাংলাদেশের গল্পসাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের গল্পের ভাণ্ডারে শামিল হওয়ার যোগ্যতাকে আর অস্বীকার করা যায় না।
| Weight | 0.516 kg |
|---|---|
| Published Year |
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ১১ম বর্ষ ২য় সংখ্যা
অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা— গল্পকার ও গল্প সংখ্যা— তৃতীয় পর্ব— সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার ও তাদের উল্লেখযোগ্য গল্প নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষের যাত্রার তৃতীয় পর্বে প্রকাশিত হলো আরও ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা; তাদের রচিত গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা এবং একটি করে নির্বাচিত গল্প (আলোচকের পছন্দে)। সংখ্যাটিতে গল্পকারদের নিয়ে রচনাগুলোর অনুক্রম নির্ধারিত আলোচকদের থেকে লেখা প্রাপ্তির ভিত্তিতে বয়সানুক্রমে প্রস্তুত করা হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার ও তাদের লেখা গল্প নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন বিশেষ সংখ্যাগুলো প্রকাশের এই উদ্যোগের পদ্ধতিগত ন্যায্যতার প্রশ্ন নিয়ে গল্পকার ও গল্পসংখ্যার পূর্ববর্তী পর্ব দুটোয় সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। তবে সংখ্যাটি ১০০ কেন? ৯৯ বা ১০১ অথবা অন্য কোনো সংখ্যা কেন নয়? এটা নিয়ে দু’একজন প্রশ্ন রেখেছেন। গণনা অথবা পরিমাপ করার জন্য যে গাণিতিক বস্তু ব্যবহার করা হয়ে থাকে; সেটাকেই আমরা সংখ্যা বলি। সংখ্যা একটি বিমূর্ত ধারণা। কিন্তু সময় ও বস্তুর সাথে যুক্ত হয়ে এটি একেকটি বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করে থাকে। ইতিহাসযাত্রার মাইলফলক হিসেবে দুই বছর আগে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বর্ষপূর্তি অর্থাৎ সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছি। স্বাধীনতার এই পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপাদানগুলোতে যে বিবর্তন হয়েছে সেই বিবর্তনের ধারণা নেওয়ার জন্য একটি কোয়ান্টাম সময় অথবা বিবর্তনের সাথে জড়িত প্রতিনিধিদের একটা কোয়ান্টাম সংখ্যা নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের গল্প-সাহিত্যে চলমান বিবর্তনের ব্যাপ্তি, গভীরতা ও শ্রেণিভুক্ত সকল প্রকাশের অঙ্গ, ধারা ও উপাদান তুলে ধরার প্রয়োজন মেটানোর জন্য বহুল ব্যবহৃত একটা উপযুক্ত সংখ্যা বেছে নেওয়া যুক্তিযুক্ত ছিল বলেই আমাদের মনে হয়েছে। বিজ্ঞানসম্মত মেট্রিক ধারণায় ০.০১, ০.১, ১, ১০, ১০০ বহুল ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ সকল সংখ্যা। বিজ্ঞানের ধারাতেই শতকরা হিসাবে, বছর হিসাবে, জমির মাপে অথবা প্রতিনিধি নির্বাচনের সংখ্যায়— শতক সংখ্যাটি চলেই আসে। ১ সর্বদাই অবিভাজ্য ঐক্যের প্রতীক, সাথে মেট্রিক ধারণায় শূন্য সংখ্যাটি ১-এর সামনে অথবা পেছনে অবস্থান নিয়ে একের গুণিতককে নির্দেশিত করেছে। একের গুণিতক সংখ্যাই বাস্তবতাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। তবে বলে রাখা ভালো, সংখ্যাতত্ত্বের উপর ভর করে কোনো কুসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাসের সাথে এই সব ভাব বা বস্তুনিরপেক্ষ জ্যামিতিক মেট্রিক সংখ্যাগুলোর কার্যত কোনো সম্পর্ক নাই। অনুপ্রাণন কর্তৃক নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে নারীর সংখ্যা মাত্র উনিশজন। নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে গল্পকার নির্বাচনের একটি শর্ত ছিল জন্মসাল। নির্বাচিত গল্পকারের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম হচ্ছেন শামসুদ্দীন আবুল কালাম, যিনি ১৮৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কনিষ্ঠতম হচ্ছেন তারা যাদের জন্মসাল ১৯৬৫। সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য একবিংশ শতাব্দীতে এসে নিম্নগামী হয়েছে কিন্তু হ্রাসের গতির পেছনে বিংশ শতাব্দীতে নারী সাহিত্যচর্চাকারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। অনুপ্রাণনের গল্পকার ও গল্প সংখ্যাগুলোতে নির্বাচিত নারী গল্পকারদের গল্পসমূহ নিয়ে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে এই ধারণা স্পষ্ট হয়। স্মর্তব্য যে, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে সংখ্যাগত পার্থক্য শুধু বাংলার নয়— কম-বেশি সারা বিশ্বের। অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পে প্রবণতা হিসেবে রোমান্টিকতা ও নান্দনিকতার দিকে দৃষ্টি দেওয়ার তুলনায় সামাজিক বাস্তবতা অর্থাৎ পারিবারিক-সামাজিক, রাজনীতি-অর্থনীতির স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব ও সংকটের বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। গ্রাম ও শহর পৃথক পৃথকভাবে অথবা মিশ্রভাবেও এসেছে। গ্রাম-শহরের বিবর্তন ও রূপান্তরের ফলে সৃষ্ট ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, উৎপাদন অথবা কর্মস্থলের সমস্যা ও সংকটসমূহ চিত্রিত হয়েছে। পরিবর্তন কীভাবে যাপিত জীবনে মানসিক ও পারিপার্শ্বিক প্রতিক্রিয়া ঘটিয়েছে এসব মনস্তাত্ত্বিক বিষয় বিশ্লেষণ বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পে এসেছে নিখুঁতভাবে। মানুষের চিন্তাধারা কখনো এক জায়গায় থেমে থাকে না। একজন সাহিত্যিকও তার চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন নিয়ে আসেন কখনো সচেতনভাবে অথবা কখনো অবচেতনভাবেই। বাংলাদেশের সাহিত্যে নারী-পুরুষের প্রেম, পরকীয়া, বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের মনস্তত্ত্ব যেন এখনো অনেকটা গ্রামীণ। চরিত্রের বাইরের চরিত্র অর্থাৎ পরিবার ও সমাজের সাথে যুক্ততা থেকে মুক্ত হতে পারছে না। তাই দেখা যায় প্রেম, পরকীয়া ও বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে কেউ না কেউ নাক গলিয়েই যাচ্ছেন। আমরা এখন চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে ডিজিটাল বিষয়গুলোর উত্তরণ ঘটছে, ঘটছে জীবন-যাপনের চালচিত্র। মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে যেমন মানুষ সোচ্চার হচ্ছে তার পাশাপাশি ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রগুলোতে মানুষের অবস্থান দৃঢ়তর হতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু, বিশেষ করে ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পে সমাজই গুরুত্ব পেয়েছে বেশি।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা - গল্পকার ও গল্প সংখ্যাঃ তৃতীয় পর্ব
সম্পাদকীয়- অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক, পঞ্চদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা : সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা (চতুর্থ পর্ব)
অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিক কালের ১০০ গল্পকারকে নিয়ে চতুর্দশ/পঞ্চদশ বর্ষের বিশেষ আয়োজনের পারম্পরিক ধারাবাহিকতার চতুর্থ পর্বে এসে আরও ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে প্রকাশিত হলো সাম্প্রতিকের (জন্ম : ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫) গল্প ও গল্পকার সংখ্যা, চতুর্থ পর্ব। সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার ১ম, ২য় ও ৩য় পর্বের মতো এই পর্ব অর্থাৎ চতুর্থ পর্বে ২৫ জন গল্পকারের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা প্রকাশের মাধ্যমে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন নির্বাচিত ১০০ গল্পকারকে নিয়ে তথ্য ও আলোচনাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ প্রকাশের কাজ সম্পন্ন হলো।
সাম্প্রতিকের ১০০ নির্বাচিত গল্পকারদের রচিত গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখা গেছে যে একবিংশ শতাব্দীতে এসে সাম্প্রতিকের গল্পকারদের অনেকেই বেশ কিছু নিরীক্ষাধর্মী গল্প লিখছেন। নিরীক্ষাধর্মী অথবা পরীক্ষামূলক গল্প বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমেই বলা যেতে পারে, পরীক্ষামূলক ছোটগল্প হলো একটি অনন্য সাহিত্যিক রূপ যা ঐতিহ্যবাহী গল্প বলার কাঠামো থেকে আলাদা, প্রায়শই অরৈখিক প্লট এবং অপ্রচলিত আখ্যান কৌশল গ্রহণ করেছে। প্রচলিত ছোটগল্প নির্মাণ কৌশলকে ফ্রিট্যাগ পিরামিডের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। ফ্রিট্যাগ পিরামিড (Freytag Pyramid) হলো নাটক বা গল্পের কাহিনীবিন্যাসের একটি কাঠামোগত মডেল, যা ঊনবিংশ শতাব্দীতে জার্মান নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক গুস্তাভ ফ্রিট্যাগ (Gustav Freytag) তৈরি করেছিলেন। এটি মূলত ট্র্যাজেডি বা নাটকের কাহিনীকে পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করে একটি পিরামিড আকৃতিতে উপস্থাপন করে, যা ‘ড্রামাটিক আর্ট’ বা নাট্যরীতি নামেও পরিচিত। প্রচলিত ছোটগল্পসমূহের কাঠামো উপাদানগুলোর ক্রম বিন্যাস প্রক্রিয়ার দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা পাই- ১. সূচনা অর্থাৎ কাহিনীর শুরুতে চরিত্র, পরিবেশ এবং প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়; ২. উত্থান ক্রিয়া অর্থাৎ যেখানে গল্পের মূল সংঘাত বা দ্বন্দ্বের সূচনা হয় এবং একই সাথে ঔৎসুক্য ও উত্তেজনা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে; ৩. চূড়ান্ত পরিণতি অর্থাৎ এটি গল্পের সবচেয়ে উত্তেজনাকর এবং মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া বিন্দু; ৪. পতন ক্রিয়া অর্থাৎ চূড়ান্ত পরিণতি বা ক্লাইম্যাক্সের পর দ্বন্দ্ব প্রক্রিয়া যা ক্রমে সমস্যা সমাধানের দিকে এগোতে থাকে; এবং ৫. সমাধান অর্থাৎ গল্পের সমাপ্তি, যেখানে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় এবং দ্বন্দ্ব চূড়ান্তভাবে মিটে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিকের নিরীক্ষাধর্মী গল্পগুলোতে প্রচলিত উপাদানগুলোর সবগুলোর উপস্থিতি নাও থাকতে পারে বা প্রচলিত ক্রমবিন্যাস পদ্ধতি অনুসরণ নাও করে থাকতে পারে। অর্থাৎ প্রচলিত রৈখিক গল্পের বদলে খণ্ডিত বা বৃত্তাকার বর্ণনারীতি ব্যবহার করা হতে পারে। বাংলা নিরীক্ষাধর্মী গল্প কেবল কাহিনী বলা নয়, বরং অভিজ্ঞতার নতুনতর প্রকাশ। এই ধারার গল্পসমূহ পাঠককে সক্রিয়ভাবে অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজে নিতে বাধ্য করে এবং নানাভাবে সাহিত্যকে নতুন ভাষিক ও শৈল্পিক উচ্চতা প্রদানে সফল করে তুলেছে। উপভাষার ব্যবহার, কাব্যিক ভাষা বা ভাঙা গদ্যের প্রয়োগ; চরিত্রের অবচেতন মনের জগতকে কাব্যিকভাবে খণ্ড খণ্ড তুলে ধরা; বাস্তব ঘটনার সাথে অলৌকিক বা অদ্ভুত উপাদান মিশিয়ে গল্প বলা; বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, পরাবাস্তববাদ এবং মেটা-ফিকশন ব্যবহার করে সাম্প্রতিকের গল্পকারেরা গল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন। এছাড়াও সমকালীন নিরীক্ষাধর্মী গল্পে রূপক ও অদ্ভুত সব চরিত্রের মাধ্যমে সামাজিক সহিংসতা ও বিচ্ছিন্নতা, সমকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, দাম্পত্য ও নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নিয়ে নতুন নিরীক্ষা পাওয়া যায়।
সাহিত্যে যুদ্ধ ও সংঘাত মানব অভিজ্ঞতার এক অবিচ্ছেদ্য প্রতিফলন। যেখানে আমরা যুদ্ধের ভয়াবহতা, বীরত্ব, মানবিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক জটিলতা, নানামুখী আবেগ ও মানুষের অস্তিত্বের সংগ্রামকে দেখতে পাই। যুদ্ধ-সাহিত্য একদিকে যেমন ধ্বংসের চিত্র আঁকে, অন্যদিকে শান্তির আকাঙ্ক্ষা ও মানবিক দৃঢ়তা ফুটিয়ে তোলে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এমন একটি ঘটনা যে ঘটনার চিহ্ন বাংলাদেশের সমসাময়িক সাহিত্যিকদের কাজেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত অগণিত কবিতা, গল্প ও উপন্যাসে পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার, মানবিক বিপর্যয় ও সামাজিক সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে। একবিংশ শতাব্দীর বাংলা গল্পে যুদ্ধ ও সংঘাত সরাসরি ময়দানের চেয়ে ব্যক্তিমানস, মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত, উদ্বাস্তু জীবন, এবং নব্য-বাস্তববাদের আলোকে চিত্রিত হয়েছে। ১৯৭১-এর যুদ্ধস্মৃতি, সমকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশ্বায়নজনিত সংঘাত, এবং ধর্মীয় বা সামাজিক বিভেদ এই সময়ের গল্পগুলোতে গুরুত্ব পেয়েছে। তবে পোস্টমডার্ন বিদ্রূপের বদলে মানবিক দায়বদ্ধতা এখানে মুখ্য হতে দেখা গেছে।
বাংলাদেশের সমকালীন গল্পে পরিবেশ সচেতনতা কেবল নিসর্গ বর্ণনা নয়, বরং বাস্তুসংস্থান ও মানুষের অস্তিত্বের সংকটের এক গভীর আখ্যান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সমসাময়িক লেখকদের কলমে জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল, এবং নগরায়ণের কুফল স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন সংগ্রাম, লোনা পানির আগ্রাসন এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগের শিকার মানুষের গল্প এখন ছোটগল্পের অন্যতম প্রধান উপজীব্য হয়ে উঠতে দেখা গেছে। তাদের গল্পে নদী দখল, বালু উত্তোলন ও জলাভূমি ভরাট করে আবাসন নির্মাণের মাধ্যমে যে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে, তার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা রয়েছে। শহরের বদ্ধ জীবন, ইট-পাথরের দেয়াল আর দূষিত বায়ুর বিপরীতে সবুজের আকাক্সক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ভয়াবহতা বারবার ফিরে এসেছে। মানুষের সীমাহীন লোভের কারণে প্রকৃতি কীভাবে রূঢ় হয়ে উঠছে এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবন কীভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে, তা ছোটগল্পের ভাষায় মূর্ত হয়ে উঠতে দেখা গেছে। মূলত বাংলাদেশের সমকালীন গল্পকাররা তাদের লেখায় পরিবেশবাদী সাহিত্যপাঠ বা ইকোক্রিটিসিজম (Echocriticism) চর্চার মাধ্যমে পাঠকদের মনে পরিবেশ রক্ষার তাগিদ সৃষ্টি করার প্রয়াস গ্রহণ করেছেন।
Quarterly Anupranan - Year- 15 Issue- 1; Contemporary Stories & Storytellers (Part-4)
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ১০ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা
তৃতীয় বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
সম্পাদকীয়- দ্বাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, গল্পকার ও গল্প সংখ্যা প্রথম পর্ব।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষে পদার্পণ করেছে। ১১ বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে রয়েছে। যে অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা এখন বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে যৎসামান্য হলেও অবদান রাখার মতো কোন কাজের পরিকল্পনা গ্রহন করতে পারি। যেমন গত বছর আমরা পরিকল্পনা গ্রহন করেছিলাম বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য কবিতা এবং কবির কবিতাকর্ম নিয়ে সামগ্রিক আলোচনা চারটি সংখ্যায় সংকলিত করার। যে পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন নিজেদের সক্ষমতা মূল্যায়ণে আমাদের বিস্তর সাহায্য করেছে। কাজের মধ্য দিয়ে নিজেদের উপর আমাদের আস্থা বৃদ্ধির ফলাফল এ-বছরে বাংলাদেশের ১০০ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরষ্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য গল্প ও গল্পকারের সামগ্রিক গল্পকর্ম নিয়ে আলোচনা দ্বাদশ বর্ষের চারটি সংখ্যায় সংকলিত করার পরিকল্পনা গ্রহন। সেই পরিকল্পনার প্রথম পর্বে প্রকাশিত হলো বাংলাদেশের ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরষ্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য গল্প ও গল্পকারের কাজের উপর সামগ্রিক আলোচনা সংকলন অর্থাৎ গল্পকার ও গল্প সংখ্যা, প্রথম পর্ব।
একটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে আমরা বাংলাদেশের ১০০ জন গল্পকার নির্বাচন করেছি। প্রথমতঃ আমরা বিবেচনা করেছি আধুনিক বাংলা ভাষায় চর্চাকারী গল্পকার যাঁর জন্ম বাংলাদেশে অথবা যিনি তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময়ই বাংলাদেশে বসবাস করেছেন অথবা যাঁর প্রকাশনা ও পাঠকের মূল অংশটি ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। দ্বিতীয়ত আমরা বিবেচনা করেছি যাদের জন্ম ১৮৯৫ থেকে ১৯৬৫ খৃস্টাব্দের মধ্যে। তৃতীয়তঃ আমরা বিবেচনা করেছি যে গল্পকারের গল্পে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বাংলা সাহিত্যের সাধারণ ঐতিহ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালির স্বাধীনতা এবং জনগণের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সমাজ-বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে। চতুর্থতঃ যে গল্পকারের এক বা একাধিক গল্প বাঙালি পাঠক মহলের বড় অংশে উল্লেখিত হয়েছে এবং সমাদৃত হয়েছে। শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো জাতি তথা মানবজাতির সাধারণ এবং উন্মুক্ত অধিকারের বিষয়। কোন সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো বিবেচিত না হওয়াই কাম্য। কিন্তু তারপরও কতগুলো বিষয় থেকে যায় যে বিষয়গুলো নিয়ে আপস করা কঠিন। আর তাছাড়া প্রজন্মকে কিছু বার্তা দেয়া প্রয়োজন, যে বার্তা, বক্তব্য অথবা কর্ম, সমাজে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কারা পক্ষে ছিল আর কারা বিপক্ষে ছিল? এটা মানবতার পক্ষে অথবা বিপক্ষে থাকার মতোই একটি প্রশ্ন। যখন জাতীয় বিদ্বেষ প্রসূত হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা নিয়ে জেনোসাইড চলে তখন পক্ষের বিষয়টা শুধু রাজনৈতিক থাকে না মানবিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই যখন কোন শিল্পী বা সাহিত্যিক এরকম সঙ্কটপূর্ণ সময়ে বা পরবর্তী সময়ে মানবতার পক্ষে না গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী যুদ্ধাপরাধীদের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন তাহলে সেটাকে নিছক ব্যক্তিগত বিষয় বলে গণ্য করা কঠিন হয়ে যায়। আর এই গণ্য করতে না পারার বিষয়টি অনুপ্রাণনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
বাংলা সাহিত্যে ফর্ম হিসেবে আধুনিক ছোট গল্পের ধারণা খুব পুরানো নয়। কলকাতা কেন্দ্রিক লেখক ও বুদ্ধিজীবী আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অনেকটা ইউরোপীয় সাহিত্যের সংস্পর্শে এসেই ছোট গল্প রচনার ফর্মটি নিয়ে সাহিত্য চর্চার সূচনা করেন। তখন শুরুতে রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও প্রচার প্রোপাগান্ডার কাজে গদ্য লেখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেই গদ্য লেখার প্রয়োজনীয় ফর্মটাকে ধরে পাশাপাশি ছোটগল্প লেখার চল শুরু হলে ক্রমেই লেখক ও সাহিত্যিকদের কাছে কবিতা বা পদ্যের পাশাপাশি ছোট গল্পের ফর্মটি প্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু ছোট গল্প রচনার কৌশলটি আয়ত্ত করতে সময় লাগে। কেননা ছোটগল্প সম্পূর্ণভাবে আখ্যানভিত্তিক একটি রচনা না। আখ্যানের খণ্ডাংশকে ধারণ করে অথবা না করে অনুভূতির বিস্তৃত ক্যানভাসে কতগুলো জট সৃষ্টি এবং সেই জটের পাকানো এক একটা সুতা খোলার মধ্য দিয়ে পাঠককে ধরে রাখা, আবিষ্ট রাখার মুন্সিয়ানা না থাকলে ছোট গল্প ঠিক ছোট গল্প হয়ে ওঠে না।
অনুপ্রাণন প্রকাশিত গল্পকার ও গল্প সংখ্যার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে গল্পকারদের ছোট গল্পগুলি নিয়ে সামগ্রিক আলোচনার সাথে প্রত্যেক গল্পকারের একটি করে নির্বাচিত গল্প সংযুক্ত করা হয়েছে। এই গল্পগুলো আলোচকরাই নির্বাচন করেছেন। গল্পগুলো পাঠের এই সুযোগের মাধ্যমে এই সংখ্যাটির পাঠকরা প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত গল্পকারদের লেখার সাথে পরিচিত হতে পারবেন। বাংলাদেশের গল্পগুলো পাঠ করলে দেখা যাবে কতগুলো গল্প প্রেমবিষয়ক অর্থাৎ এসব গল্পে প্রেম ও রোমান্স প্রাধান্য পেয়েছে। কতগুলো গল্পে গ্রামীণ, আর কতগুলো গল্পে সামাজিক প্রতিবেশ এবং গ্রামীণ অথবা শহুরে সমাজের চিত্র মেলে। বাংলাদেশের গল্পে প্রকৃতি ও মানুষ সবসময় প্রাধান্য পেয়েছে, যেসব গল্পে প্রকৃতির পটভূমিতে চরিত্রাঙ্কন করা হয়েছে। কম হলেও আমরা এমন কিছু গল্প পেয়েছি যেখানে অতিপ্রাকৃত-ভাব বা রহস্য-আচ্ছন্নতা লক্ষ করা যায়। কোন কোন গল্পে হাস্যরস ও নিখাঁদ বিনোদন প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলাদেশের গল্পকারদের কতগুলো এমন গল্প আছে যে গল্পগুলোতে অসম্ভব বা অবাস্তব কাহিনী বর্ণিত হতে দেখা যায় যেখানে কতগুলো গল্পের পাত্রপাত্রী বা পরিবেশকে না বুঝিয়ে সাংকেতিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্থান বা চরিত্রকে বোঝানো হয়েছে অথবা বার্তা প্রদান করা হয়েছে। ইতিহাসভিত্তিক গল্পগুলোতে কোনও একটি বিশেষ ঐতিহাসিক কালে সংঘটিত ঘটনা বর্ণিত হতে দেখা গেছে। সেখানে দেশ ভাগ, ভাষা আন্দোলন, গণ-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। খুব কম হলেও কিছু গল্প আছে যেখানে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও তত্ত্বের সাহায্য নিয়ে গল্পটি রচিত হয়েছে। বাংলাদেশের গল্পে এধরণের গল্পের প্রাধান্য দেখতে পাওয়া যায় যেখানে শহুরে অথবা গ্রামীণ পরিবেশের প্রেক্ষাপটে পারিবারিক ও গৃহজীবন প্রাধান্য পেয়েছে। তুলনামূলক কম হলেও এরকম বেশ কয়েকটি গল্প দেখতে পাওয়া যায় যেখানে নর-নারীর মনস্তত্ত্ব ও মানসিক টানাপোড়েন নিয়ে রচিত হয়েছে। বাংলাদেশের গল্পে এরকম গল্প আছে যেখানে মনুষ্য নয় এমন কোন প্রাণী প্রধান চরিত্র হয়েছে। বাস্তবনিষ্ঠ গল্পে যেখানে জীবনের কোনও ঘটনা বা দিক অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ ও অকপট ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। কম হলেও কিছু গল্পে পুলিশি তদন্ত ও সত্যানুসন্ধানের রোমাঞ্চকর বর্ণনা পাওয়া যায়। কিছু গল্প আছে যেগুলো বিদেশি পটভূমিকায় বাংলাদেশী অভিবাসী অথবা বিদেশী নরনারীর চরিত্রাঙ্কন করা হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণভাবে ছোটগল্পের প্রায় সব শাখার গল্পই বাংলাদেশের গল্পকারেরা লিখেছেন।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা - গল্পকার ও গল্প সংখ্যাঃ প্রথম পর্ব
সম্পাদকীয়-
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা- সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতি সংখ্যা
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যাটি সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতিসংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হলো। সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ ২০১৩ সালে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বিতীয় বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশের সময় অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদে যুক্ত হন। গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি অনুপ্রাণনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তাঁর অকাল মৃত্যু আমাদের শোকগ্রস্ত করেছে। তাঁর স্মৃতি বারবার ফিরে এসে আমাদের মন ভারাক্রান্ত করে তুলছে। স্বামী-পুত্র-কন্যা-পরিবার-পরিজন নিয়ে সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের একটা সংসার ছিল। নারী হিসেবে সংসার ও পরিবারের প্রতি কতগুলো স্বাভাবিক দায়িত্ব ছিল। কিন্তু পাশাপাশি সাহিত্য, সংগীত, সংস্কৃতি, ফ্যাশন ও পরিবেশ নিয়ে তাঁর ভাবনা ছিল, কর্মকাণ্ড ছিল। কবিতা লিখতেন, অনুবাদ করতেন, গল্প লিখেছেন। সম্পাদনা পরিষদে অংশ নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ও অনুপ্রাণন প্রকাশনের কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তরুণদের সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী করে তোলার লক্ষে প্রথম দুই বছর (২০১২-২০১৪) কনকর্ডের চত্বরে একটি দেয়াল পত্রিকার সম্পাদনাও করেছেন। ত্রৈমাসিক পত্রিকা ছাড়াও শিল্প-সাহিত্য জগতে অনুপ্রাণনের কর্মকাণ্ড প্রসারের জন্য বিভিন্ন সময় নেওয়া কর্মসূচি সফল করে তোলার জন্য সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ তাঁর অন্য সকল কাজের ভিড়ে অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদে পর্যাপ্ত সময় ও স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়নভিত্তিক প্রবন্ধগুলোতে শুধু যে তাঁর বহুমাত্রিক কাজের পরিচয় আমরা পাই তা নয়, পাশাপাশি আমরা খুঁজে পাই তাঁর মন-মানস। সেই সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ’কে যিনি ছিলেন একজন রুচিশীল, স্নেহশীল, মানবিক মানুষ। যিনি সুন্দরকে ভালোবাসতেন। সমাজে ঘৃণা, কদর্যতা, সংকীর্ণতা, বিভেদ, বৈষম্য ও নীচতা তাঁকে পীড়িত করেছে। প্রকৃতির মাঝে তিনি বিচিত্র সুন্দরের সন্ধান করতেন। প্রকৃতির মাঝে থেকেই তিনি দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের জীবন থেকে মুক্তি পেতে ভালোবাসা ও সহনশীলতার পাঠ নিয়েছেন। জীবনে ও পরিবেশে তিনি প্রতিনিয়ত সবুজ, সরলতা ও শান্তির সরোবর সন্ধান করেছেন, আহরণ করেছেন। তাঁর চারপাশটা সুন্দর করে সাজিয়ে তোলার জন্য সাজিয়ে রাখার জন্য সবসময় ব্যাকুল থেকেছেন।
সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ বিশ্বাস করতেন একটি দেশের দার্শনিক ও আদর্শিক স্থান চিহ্নিত হয় সে দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে। ক্রমাগত চর্চা ও সাধনার মধ্য দিয়ে একটি জাতির শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভিত মজবুত করা যায়। শিল্প-সাহিত্য ও সংগীত সাধনা ছাড়া শান্তির ও সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তোলা যায় না। শিল্প ও সাহিত্য সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একটি দেশের শিল্প-সাহিত্যে সে দেশের সমাজ প্রতিফলিত হয়। আবার শিল্প-সাহিত্যের চর্চার মধ্য দিয়েই সমাজের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, সামাজিক রীতিনীতি ও ঐতিহাসিক আখ্যানের নির্মাণ ও রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলমান থাকে। শিল্প-সাহিত্য মানব অবস্থার উপর অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আবেগ অন্বেষণ করতে, সামাজিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং আরও ন্যায়সঙ্গত ও সহানুভূতিশীল বিশ্ব গঠনে অবদান রাখতে সাহায্য করে। কেবল সমাজের সাজসজ্জার উপাদান হিসেবে নয় বরং সমাজকে বোঝার এবং রূপান্তরের জন্য শিল্প ও সাহিত্যচর্চা অপরিহার্য। শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমে সৃজনশীল ও নান্দনিক প্রকাশের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রক্রিয়া ব্যক্তির মানবিক অভিজ্ঞতার গভীরতর উপলব্ধি অর্জন করে তুলতে সক্ষম করে, চিন্তার বিকাশ সাধন প্রক্রিয়ায় জারিত হয়ে অমানবিক সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে, চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়সঙ্গত বিশ্ব নির্মাণে অবদান রাখতে পারে। এই বোধ ও অনুভূতিগুলোই সুলতানা শাহ্রিয়া পিউকে ক্রমাগত অনুপ্রাণিত করেছে এবং চালিকাশক্তি হিসেবে শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার সকল পরিসরে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।
বস্তুত পৃথিবীর সব কিছুই সুন্দর বা নান্দনিক হয় না। আমাদের চারপাশের দৃশ্য ও ঘটনাবলি থেকে উৎসারিত সকল অনুভূতি নান্দনিক বা শিল্পিত হয় না। এর মাঝে যে-সকল অনুভূতি ও প্রকাশভঙ্গি আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি আনে, মনে চঞ্চলতা আনে, আনন্দ দেয়, মনের আধ্যাত্মিক স্তরটিকে বিকশিত করে, সেগুলোকেই আমরা বলি, সুন্দর। এ যেন এক যাদু। এই যাদুর কাঠির পরশ যে শিল্পে, যে সাহিত্যে থাকে না সেই শিল্প সেই সাহিত্য মানুষের হৃদয়ের উষ্ণ ছোঁয়া থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়। বাংলা ভাষায় ‘নন্দনতত্ত্ব’ শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মূলত নান্দনিকতা আঠারো ও উনিশ শতকের একটি সাহিত্যিক ও শৈল্পিক আন্দোলন, যা সৌন্দর্যের গুরুত্বের উপর আলোচনার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল। এই ধারণা দিতে সচেষ্ট হয়েছিল যে সৌন্দর্য ছিল শিল্প ও সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সৌন্দর্য কী, তা বর্ণনা দিয়ে অপরকে বোঝানো যায় না, এটি অসংজ্ঞায়িত। সৌন্দর্য উপলব্ধির বিষয়, তাই এটি বুঝে নিতে হয়। ভাবের পরিপূর্ণতা এবং প্রকাশের তীব্র আকুতি নিয়ে সৌন্দর্যের নিজস্ব মূল্য সৃজন-চেষ্টার কৌশল অনুসরণ করা প্রতিটি শিল্পী ও সাহিত্যিকের জন্য মূল্যবান। সামষ্টিক সংস্কৃতি বিশুদ্ধ বুদ্ধির বিষয়, যা কিনা শিল্পের মাধ্যমে উদ্ভাসিত সৌন্দর্যের বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং সর্বদা একটি প্রতি-পরিবেশ হিসেবে কাজ করে যেখানে মানবিকতার ভূমিকাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের মাঝে ছিল গভীর সৌন্দর্যবোধ। তাঁর প্রতিটি কর্ম তাই হয়ে ওঠে এমন একটি ব্যতিক্রম যেখানে সম্পৃক্ত থেকেছে নান্দনিকতার বিশেষ ছোঁয়া। তাঁর কবিতা অথবা গল্প রচনায়, বাচিক শিল্প অথবা সংগীতচর্চায়, ফ্যাশন ডিজাইনে অথবা তাঁর ছাদবাগানে, কিংবা বৃক্ষ রোপণ ও বৃক্ষ উপহার কার্যক্রমে সদা প্রকাশ পেয়েছে গভীর নান্দনিকবোধ ও মানবিকতাবোধ। যার ছাপ তিনি রেখে গেছেন আমাদের সবার হৃদয়ে। তাই, সশরীরে না থাকলেও আগামীতে অনুপ্রাণনের সৃজন-নন্দনের পরিসরে পরিচালিত সকল কর্মকাণ্ডে নান্দনিকতা, শুভবোধ ও মানবিকতার উদাহরণ হয়ে পিউ আমাদের সঙ্গে থাকবেন।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 1; Sultana Shahria Pieu Memorial Issue
অনুপ্রাণন ১১তম বর্ষ ১ম সংখ্যা- সম্পাদকীয়
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণনের সূচনা সংখ্যা প্রকাশিত হয় নভেম্বর, ২০১২। এ-পর্যন্ত ৩২টি সংখ্যা প্রকাশ করে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ১০ টি বছর অতিক্রম করেছে। এ দশটি বছর অনুপ্রাণন’কে নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়েই এগিয়ে যেতে হয়েছে। আজ একাদশ বর্ষের প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশ করার মুহূর্তে পেছনের দশটি বছরের দিকে ফিরে স্মৃতিতে অনেক কিছুই ভেসে আসে। লেখক, পাঠক এবং সম্পাদনা পরিষদের সাথে ভাগ করে নেয়ার মতো অনেক কথাই হয়তো বলার থাকে, বলার ছিল। কেননা ১০ বছর তো কম সময় নয়। তবে, শিল্প-সাহিত্যের পত্রিকা অথবা লিটল ম্যাগ প্রকাশের ইতিহাসে প্রায় একই ধরনের ঘটনা হয়তো হর-হামেশাই ঘটে থাকে।
টেকসই সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি এবং সংগঠনের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক নির্মাণে পেশাদারিত্বের অভাব আমাদের সমাজের সব ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। এখনো সেখানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অহমবোধ প্রতিটি সংগঠনের ভিত কুরে কুরে খাচ্ছে। বাইরের থেকে যেটা দেখা যায় সেটা ঠিক ভেতরের চিত্র না। আর তাছাড়া অর্থনীতির বিষয়টা তো আছেই। আর সেটার গুরুত্ব অনুধাবন করার ঘাটতি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্রই বিদ্যমান। আমাদের দেশের শিল্প-সাহিত্য এবং সংস্কৃতির জগতে সাধারণভাবেই অর্থের সংকট রয়েছে। সাধারণভাবেই বলা যায় যে, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধির গুরুত্ব আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র এখনো যথার্থভাবে বুঝতে ব্যর্থ। ভাবা হচ্ছে ভৌত কাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নের মধ্য দিয়ে উন্নতির চাকা ঘুরলে দেশের উন্নয়ন হবে। কিন্তু আমরা জানি উন্নত সভ্যতা মানেই হচ্ছে উন্নত শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি।
তাই, অনুপ্রাণন যেসব সাংগঠনিক সমস্যা মোকাবেলা করে টিকে আছে সেসবের সাথে অন্যান্য শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য বা ব্যতিক্রম হয়তো নির্মাণ করা যায়নি। কেননা আমরা শেষ পর্যন্ত, এদেশের প্রকৃতি ও মনুষ্যসমাজেরই অঙ্গ। দেশের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি- এসবের সংকট ও সম্ভাবনা থেকে অনুপ্রাণন বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ তো নয়।
এটা ঠিক অনুপ্রাণন পত্রিকাটিকে ঘিরে এই দশ বছরে লেখক-পাঠক ও সুভানুধ্যায়ীদের একটি বৃত্ত তৈরি হয়েছে। এই বৃত্ত কোনো বিশেষ সীমানা রেখা দিয়ে ঘেরা কোনো বৃত্ত না। এই বৃত্ত শিল্প-সাহিত্যের মুক্ত চর্চার মতোই উন্মুক্ত। অনুপ্রাণন মুক্ত চিন্তার চর্চাকেই সবসময় সমর্থন করেছে, অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেছে। আর অনুপ্রাণন চেষ্টা করেছে এদেশের তরুণরা যেন বেশী বেশী করে বই পড়া আর শিল্প-সাহিত্যের চর্চায় আগ্রহী হয়ে উঠে। সারাদেশ জুড়ে অনুপ্রাণনকে ঘিরে আছে একদল তরুণ-তরুণী, যারা নিয়মিত শিল্প-সাহিত্য চর্চার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারাই অনুপ্রাণনের প্রাণশক্তি। যাদের সাথে অনুপ্রাণনের সম্পর্ক হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক সৌহার্দের। একে আরেকের পরিপূরক।
দশ বছর নিয়মিত বিভাগ নিয়ে ছাপার সংস্করণ আকারে অনুপ্রাণন পত্রিকাটি প্রকাশ করার পথে লেখক ও পাঠকদের কাছ থেকে ক্রমেই দুটি দাবী জোরালো হয়ে উঠেছে। প্রথমটি হচ্ছে, অনুপ্রাণনের একটি অন্তর্জাল সংস্করণ প্রকাশ করা। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের মুদ্রিত সংস্করণে সাহিত্য ও শিল্পের বিশেষ ধারা, ধরন অথবা বিষয়ভিত্তিক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করা।
ইতোমধ্যেই গত ৯ ফেব্রুয়ারি অনুপ্রাণনের পক্ষ থেকে, শিল্প-সাহিত্যের অন্তর্জাল, অনুপ্রাণনের সূচনা সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। অন্তর্জালভিত্তিক এই সংখ্যাটিতে থাকছে ২০ টি বিভাগ। যথাক্রমে- শ্রদ্ধাস্মরণ, স্মৃতিচারণ, প্রবন্ধ, অনুবাদ প্রবন্ধ, গুচ্ছ কবিতা, যুগল কবিতা, একক কবিতা, অনুবাদ কবিতা, বড়ো গল্প, ছোট গল্প, অণুগল্প, অনুবাদ গল্প, মুক্তগদ্য, ভ্রমণকাহিনী, বই আলোচনা, ম্যাগ আলোচনা, পাঠ প্রতিক্রিয়া, চলচ্চিত্রকথা, ধারাবাহিক উপন্যাস, নাট্যকথা এবং শিল্প-সাহিত্য সংবাদ।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন ইতিমধ্যে অনিয়মিতভাবে ৬ টি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। সেগুলো হচ্ছে, (১) তৃতীয় বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা- প্রিয় উপন্যাস সংখ্যা; (২) অষ্টম বর্ষ প্রথম সংখ্যা- গল্প সংখ্যা; (৩) অষ্টম বর্ষ তৃতীয় সংখা- অণুগল্প সংখ্যা; (৪) অষ্টম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা- কুহক মাহমুদ স্মৃতি সংখ্যা; (৫) নবম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা- কবি ও কবিতা সংখ্যা; এবং (৬) দশম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- বাংলাদেশের ১৫টি সেরা গল্প- পাঠ ও আলোচনা সংখ্যা।
একাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যার মধ্য দিয়ে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, সকল মুদ্রিত সংস্করণে নিয়মিতভাবেই শুধুমাত্র দেশের শিল্প, সাহিত্য, ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে আরো নিবিড়ভাবে তুলে ধরার জন্য বিশেষ ধরন, বিশেষ বিভাগ, বিশেষ ধারা অথবা বিশেষ বিষয় নিয়ে লেখা প্রকাশ করার সূচনা করতে চায়।
লেখক, পাঠক এবং অনুপ্রাণনের সম্পাদনা পরিষদের সেই চাওয়া থেকেই ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের একাদশ বর্ষের প্রথম সংখ্যাটি নির্বাচিত কবি ও কবিতা সংখ্যা- প্রথম পর্ব হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এই সংখ্যাটিতে বাংলাদেশের ২৭ জন নির্বাচিত কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য কবিতা এবং আলোচনা প্রকাশিত হয়ছে। বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রবীণ ও তরুণ কবিদের নিয়ে এই ধরনের লেখা ও আলোচনা নিয়ে আরো কয়েকটি পর্ব প্রকাশিত হবে বলে আমরা আশা করি।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবিদের জীবনী ও সাহিত্য কর্ম নিয়ে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিকের কয়েকটি পর্বের এই আয়োজনগুলোর মধ্য দিয়ে আশা করি আমাদের দেশের তরুণ সমাজ বাংলাদেশের কবিদের কবিতার সাথে সুপরিচিত হবেন এবং আমাদের দেশের সম্মানিত এই কবিদের কবিতা নিয়ে আলাপ, আলোচনা এবং আড্ডার অনুষ্ঠানের আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের শিল্প ও সাহিত্য চর্চার বৃত্তটিকে প্রসারিত করতে পারবেন।
অনুপ্রাণন ১১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা
অষ্টম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা
সম্পাদকীয়- অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা (প্রথম পর্ব)
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষে পদার্পণ করল। অনুপ্রাণনের লেখক, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী জানেন, একাদশ বর্ষ থেকে বছরের ৪টি সংখ্যাই বিশেষ সংখ্যা হিসেবে প্রকাশ করছে এবং পুরো এক বছরের চারটি সংখ্যা বস্তুত একটি বিশেষ বিষয়কেই সম্পূর্ণ করেছে।
যেমন- একাদশ বর্ষের (২০২২) চারটি সংখ্যায় চারটি ভাগে ভাগ করে বাংলাদেশের ১০০ জন নির্বাচিত কবিকে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। যে কবিদের জন্ম হয়েছে ১৯০০ সাল থেকে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। দ্বাদশ বর্ষে (২০২৩) চারটি ভাগে ভাগ করে বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকারদের নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। যে গল্পকারদের জন্ম হয়েছে ১৮৯৭ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে। উল্লেখ করা যেতে পারে, এই বিশেষ কবি ও কবিতা সংখ্যা এবং গল্পকার ও গল্পসংখ্যার প্রতিটি প্রবন্ধের বিন্যাসে কবি অথবা গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য কবিতা অথবা গল্প এবং তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে এটা স্পষ্ট হয়, গত দুই বছরে আমরা যে ১০০ জন বাংলাদেশের কবি ও যে ১০০ জন বাংলাদেশের গল্পকার নির্বাচিত করেছি তাদের হাত ধরেই বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি রচিত হয়েছে।
বিগত একাদশ ও দ্বাদশ বর্ষে অনুপ্রাণনের হাতে নেওয়া উল্লিখিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতার পথ ধরে এসে ত্রয়োদশ বর্ষে (২০২৪) সাম্প্রতিকের ১০০ জন কবিকে নির্বাচিত করেছে যাদের জন্ম ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের দুটি দশকে। একইভাবে চারটি ভাগে ভাগ করে নির্বাচিত এই ১০০ জন কবিকে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশের প্রথম পর্ব হিসেবে ২৫ জন কবিকে নিয়ে অনুপ্রাণনের চলতি সংখ্যা; অর্থাৎ সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো।
গত দুই বছর প্রকাশিত ত্রৈমাসিকের সম্পাদকীয়তে আমরা বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেছি কারা বাংলাদেশের কবি ও গল্পকার এবং কীভাবে আমরা সেই ১০০ জন কবি অথবা ১০০ জন গল্পকার নির্বাচন করেছি। ভুল বোঝার কোনো অবকাশ নেই, বাংলাদেশের সাহিত্য সারাবিশ্বে বসবাসকারী বাঙালি রচিত বাংলা সাহিত্যেরই অংশ যেখানে জাতীয় ও বৈশ্বিক চেতনার মেলবন্ধন হয়েছে। বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য- বাংলা সাহিত্যের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানুষের মুক্তি সংগ্রামের বৈশিষ্ট্য ধারণ করেই বিকশিত। তথাপি ধ্রুপদি সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য ভাষার সাহিত্য থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি। আধুনিক বৈশ্বিক ধারা ও রীতির ধ্রুপদি কবিতা রচনার বিষয়টি সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কবিদের কবিতায় আরও বেশি করে বিকশিত হতে আমরা দেখি।
পাকিস্তানি শাসকদের কুচক্রের কারণে বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে ছিল। স্বাধীন হওয়ার এক দশক পর অর্থাৎ ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যাপক বৃদ্ধি পেতে থাকে। পশ্চিমে বাংলাদেশের শক্তিশালী ডায়াসপোরা গড়ে ওঠার ফলে সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কবিরা বিদেশি সাহিত্যিক ও সাহিত্যের সঙ্গে আরও অধিক পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এর প্রভাব বাংলা কবিতায় দৃশ্যমান।
বাংলাদেশ একদিনে সৃষ্টি হয়নি। বহু বিস্ফোরণোন্মুখ রাজনৈতিক ঘটনা ও দেশের সাধারণ মানুষের জীবনদানের ভেতর দিয়ে তা ধীরে ধীরে একটা রূপ পেয়েছে। সেই জন্যই হয়তো বাংলাদেশের বেশির ভাগ কবির কবিতায় মেধার তুলনায় আবেগ ও উচ্ছ্বাস বেশি লক্ষ করা যায়। যে দেশকে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে বারবার যেতে হয়েছে সেই দেশের কবিতায় সেসব ঘটনা থেকে উৎসারিত আবেগ ও উচ্ছ্বাসের ছাপ থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আটের দশকের পর থেকে বাংলাদেশের কবিতা বাঁক নিতে শুরু করে। ক্রমে ক্রমে কবিতা সমষ্টির জায়গা থেকে ব্যক্তির জায়গায় সরে আসতে দেখা যায়। ব্যক্তির নিজস্ব আলো ও অন্ধকার, বিচ্ছিন্নতা, কেন্দ্রহীনতা ও নৈঃশব্দ্য প্রকাশিত হতে থাকে।
সাম্প্রতিকের কবিরা মুক্তিযুদ্ধের সময় শিশু ছিলেন। তাদের সেভাবে দেখতে হয়নি বাঙালি জাতিসত্তার উন্মেষ, ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য জাতির লড়াই, গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ভিন্নমতের অস্থিরতার ভেতর দিয়ে গেছে। স্বৈরাচারী শাসককে মেনে নিতে হয়েছে প্রায় দুই দশক। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, পরবর্তীকালে আধা-গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থার উন্মেষ, পুঁজি গঠনের প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের রাজনৈতিক-অর্থনীতির প্রভাব পড়েছে সাম্প্রতিক কবিতায়।
একদিকে নগর ও নগরায়ন, অন্যদিকে দেশের ভৌত কাঠামোর উন্নয়ন যা শহর ও গ্রামের দূরত্ব কমিয়েছে। এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে ডিজিটালাইজেশন যুক্ত হয়ে সাম্প্রতিক কবিদের কবিতাকে প্রভাবিত করেছে যা বেশ লক্ষণীয়। ফলে, যে আবেগ ও উচ্ছ্বাস পঞ্চাশ, ষাট, সত্তরে এমনকি আশি ও নব্বইয়ের দশকেও দেখা যাচ্ছিল তা অনেকটাই স্তিমিত হতে দেখা গেছে সাম্প্রতিক কবিদের কবিতায়। সাম্প্রতিক কবিদের একটা বড় অংশের মধ্যেই আমরা পাই অনুচ্চকিত, শান্ত ও সংহত আবেগের পাশাপাশি নির্মেদ মেধার ব্যবহার। তবে উচ্ছ্বাসময় কবিতা যে সাম্প্রতিক লেখা হয়নি, তা নয়। কারও কারও কবিতাতেই আবেগের আতিশয্য রয়েছে, রয়েছে কথার ফেনা, কিন্তু একটা বড় অংশের মধ্যে যা নেই তা হলো তারল্য, উচ্ছ্বাস অথবা প্রক্ষোভ।
সাম্প্রতিক সময়ের কবিদের অনেকেই ছন্দে লিখতে পছন্দ করেন, লেখেনও। প্রচলিত ছন্দের বাইরে আগেও লেখা হয়েছে, সাম্প্রতিক কবিরাও লিখেছেন। তবে, সাম্প্রতিকের কবিদের একটা বড় অংশ ছন্দের বাইরে দাঁড়িয়ে কবিতা লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন বলে প্রতিভাত হয়। সাম্প্রতিক এসব বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ নিয়েই থাকছে অনুপ্রাণনের সাম্প্রতিক কবি ও কবিতা সংখ্যার চারটি পর্ব।
Quarterly Anupranan 13th Year 1st Issue, Samprotiker Kabi O Kobita- 1st Part
সম্পাদকীয়, কুহক মাহমুদ স্মৃতি সংখ্যা। অনুপ্রাণন- অষ্টম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা-
অনুপ্রাণন ও কুহকের কথা
কুহকের কথা বলতে গেলে অনুপ্রাণনের কথা আসবেই। কেননা, কুহক অর্থাৎ কুহক মাহমুদ, শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর সাথে ২০১২ সালে জন্মলগ্ন থেকেই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন ৫টি বছর। কুহকের সাথে আমার পরিচয় সরসিজ আলীমের মাধ্যমে। কবি সরসিজ আলীম তখন ‘ভনে যাহা ভনে’ শিরোনামে একটা ট্যাবলয়েড সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করতেন। ফেসবুকের মাধ্যমেই কবি সরসিজ আলীমের সাথে আমার পরিচয়।
এই পরিচয়ের কিছুদিন পূর্বে হোসনে আরা বেগম নামে একজন মধ্যবয়সী মহিলা ফেসবুকে আমাকে নক করেন। তিনি তখন ফেসবুকে ‘ফেসবুক বইমেলা ২০১২’ নামে একটা গ্রুপের এডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে বই প্রকাশ এবং সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। এক বিকেলে আমরা ছবির হাটে মিলিত হই, যেখানে উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন তরুণ কবি-সাহিত্যিক। তারা হলেনÑ রেজওয়ান তানিম, স্থপতি রাজীব চৌধুরী, কবি সুমি সিকানদার, ফেসবুকের মানবিক গ্রুপের অঞ্জন, ইহতিশাম আহমাদ টিংকু এবং আরো দুই-একজন হবে যাদের নাম এই মুহূর্তে আমার ঠিক মনে পড়ছে না। পরে এই বৈঠকগুলো পাবলিক লাইব্রেরির ক্যান্টিনের সামনের বাঁধানো উঠোনে অথবা কখনো কখনো হোসনে আরা বেগমের শ্যামলীর বাসায়ও অনুষ্ঠিত হতো। এই আলোচনা বৈঠকগুলোর মধ্য দিয়েই প্রথমে আমরা পাবলিক লাইব্রেরির সেমিনার-কক্ষে একটি ‘নবীন লেখক সমাবেশ অনুষ্ঠান’ করার সিদ্ধান্তে উপনীত হই। এই পর্যায়ে কবি সরসিজ আলীমও এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হয়। সমাবেশ অনুষ্ঠানের পর প্রথম বৈঠকে যখন একটি ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত হয় এবং যখন পত্রিকার জন্য একটি নাম ও একটি সম্পাদনা পরিষদ গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়, তখন কবি সুমি সিকানদার পত্রিকাটির নাম ‘অনুপ্রাণন’ করার প্রস্তাব আনেন, যে প্রস্তাবটি সংখ্যাগরিষ্ঠ উদ্যোক্তাদের সমর্থন লাভ করায় গৃহীত হয়। ওই বৈঠকগুলোতে পত্রিকার সম্পাদনা পরিষদ গঠন নিয়ে আলোচনা হলে সর্বসম্মতিতে আমার নাম প্রকাশক, হোসনে আরা বেগম সম্পাদক, কবি সরসিজ আলীম নির্বাহী সম্পাদক এবং সহ-সম্পাদক হিসেবে রেজওয়ান তানিম, রাজীব চৌধুরী, সুমি সিকান্দার, ইহতিশাম আহমাদ টিংকুসহ আরো দুই-একজনের নাম প্রস্তাব হয়। এই প্রস্তাব গৃহীত হলে ঠিক করা হয় যে, সম্পাদক ও সম্পাদনা পরিষদের সদস্যরা পত্রিকার কাজে অভিজ্ঞ আরো দুই-একজন ব্যক্তি যুক্ত করে সম্পাদনা পরিষদ সম্প্রসারিত করতে পারবেন।
এর কিছুদিন পর যখন হোসনে আরা বেগমের বাসায় সম্পাদনা পরিষদের প্রথম সভা হয়, তখন সেই সভায় কবি কুহক মাহমুদ ‘অগ্রদূত’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার মনি মোহাম্মদ এবং তাহমিদের নাম যুক্ত হয়। ওই সভায় কবি কুহক মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। ওই সভাতেই কবি কুহক মাহমুদের সাথে আমার পরিচয়। সেই সভায় লেখা সংগ্রহসহ পত্রিকা বের করার যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তসমূহ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই সূচনা সংখ্যার লেখা বাছাই এবং অনুপ্রাণনে অন্যান্য বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপের সদস্যদের যুক্ত করা নিয়ে কবি সরসিজ আলীম এবং হোসনে আরা বেগমের মধ্যে তুমুল বিতর্ক হয় এবং সেই বিতর্ক এমন তিক্ততার পর্যায়ে উপনীত হয় যে, সূচনা সংখ্যাটির কাজ যখন প্রেসে চলছিল, ঠিক তখন হোসনে আরা বেগম পত্রিকার সম্পাদক পদ থেকে এবং রাজীব চৌধুরী, সুমি সিকানদারসহ আরো দুই-একজন অনুপ্রাণন ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পরিস্থিতিতে পত্রিকাটিতে আমার নাম প্রকাশক ও সম্পাদক, সরসিজ আলীমের নাম নির্বাহী সম্পাদক এবং সহ-সম্পাদক হিসেবে শুধুমাত্র রেজওয়ান তানিম, কুহক মাহমুদ, মনি মোহাম্মদ ও তামজিদের নাম যুক্ত করে শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন পত্রিকার সূচনা সংখ্যা নভেম্বর ২০১২-এ প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে কুহক মাহমুদ অনুপ্রাণন পত্রিকাটির সাথে পাঁচ বছর যুক্ত ছিলেন। এই পাঁচটি বছরে কুহকের সাথে অনুপ্রাণনের মিথস্ক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ এই সম্পাদকীয়’র পরিসরে দেয়া সম্ভব না।
শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন একটি অবাণিজ্যিক পত্রিকা। এই অবাণিজ্যিক কথাটির অর্থ বারবার ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন দেখা যায়। যেহেতু মনে করা হয়, পত্রিকাটি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি সচেতন থেকে স্বাধীন ও মুক্ত মতামতের চর্চা ও প্রকাশ করবে, অর্থাৎ পত্রিকাটি আর্থিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দল অথবা কোনো সামাজিক সংগঠন অথবা দেশের সরকার অথবা করপোরেট মহলের পৃষ্ঠপোষকতার প্রত্যাশা করবে না। অতএব পত্রিকার পাঠকের কাছে সামান্য যে বিনিময়-মূল্য পত্রিকাটি গ্রহণ করবে, তা দিয়েই পত্রিকাটির যাবতীয় প্রকাশনা খরচ চালানো হবে।
যে কারণে অনুপ্রাণনের সাথে যুক্ত সবাইকে মোটামুটি স্বেচ্ছাশ্রম অথবা সামান্য কিছু সম্মানীর টাকায় চলতে হতো। ২৮ আগস্ট ২০১৯ তারিখে তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে অর্থাৎ ৬ আগট ফেসবুকে তাঁর সর্বশেষ পোস্টে অনুপ্রাণনের প্রাথমিক পর্যায়ের অর্থসংকটকালে কবি কুহকের সেই কৃচ্ছ্রসাধন ও কষ্টের কথাই বর্ণনা করেছিলেনÑ
“বাজেট ১০০ টাকা। বাসা থেকে বাসে গুলিস্তান ১০ টাকা। সেখান থেকে বাসে কাঁটাবন। শাহবাগ আসলেই জ্যাম। কোনোদিন হেঁটে বা প্রচণ্ড খিদায় নেমে পড়তাম বাস থেকে। হোটেলে প্রবেশ করে করুণ চোখে দু’টি পরোটা আর ডাল দিয়ে নাশতা করে হাঁটতাম। তারপর অফিস। কাজ। দুইটা না বাজতেই খিদা! সস্তাদরের হোটেলে ২৫ টাকার ভাত-ডিম বা মাছ, ডাল নেই। চলে যেত খাবার। কতদিন ১০ টাকা বেশি দিয়ে সবজি বা অন্য তরকারি নিতে পারিনি! আবার অফিস। কাজ। এই করেই সন্ধ্যা।
পুরি-চা ১০ টাকা। আবার কাজ। ৬০ টাকা শেষ। অফিস শেষ করে হাঁটতাম। ভার্সিটির মাঝ দিয়ে গুলিস্তান। বাসের লাইনের অপেক্ষা। কোনোদিন ৫ টাকার বাদাম। তারপর বাসা। ফিরতে ফিরতে রাত ১০টা। মেয়ে অপেক্ষা করত খাবার নিয়ে। ছেলে-মা অন্য বাড়ি থাকত। মেন্যু বেশিরভাগ ডিম ভাজা, ডাল। পেট পুরে খেতাম। আহ! কি সব দিন গিয়েছে। আনন্দ বেদনার। স্মৃতি কাঁদায়। (৬ আগস্ট, ২০১৯)”
সে সময়ে পত্রিকার কাজ করার পাশাপাশি কবি কুহক মাহমুদ অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে “গোধূলির প্রস্থানে জ্বালাও পূর্ণিমা (ফেব্রুয়ারি ২০১৪)” এবং “না-মানুষ (নভেম্বর ২০১৪)” শিরোনামে দু’টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই বই দুইটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এই সংখ্যার স্মৃতিচারণ বিভাগে প্রকাশিত হয়েছে। বলতে গেলে কবি কুহক মাহমুদ অনুপ্রাণনের সাথে যুক্ত হওয়ার পূর্ব থেকেই যকৃতের সংক্রমণজনিত রোগে আক্রান্ত ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও রোগের চিকিৎসা করা দূরে থাক, শরীরের প্রতি যতœ নেয়া দূরে থাক, তাঁর চলমান জীবন যাপন পদ্ধতি তাঁর শরীরের ক্ষতিই বৃদ্ধি করেছে। এসব ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার জন্য বারবার বলা সত্ত্বেও কবি কুহক মাহমুদ কারো কথারই কর্ণপাত করেনি। যার ফলে যথাযথ চিকিৎসা ও সেবার অভাবে তাঁর শরীরের অবস্থা দিনে দিনে অবনতি হতে থাকে। অসুস্থতার জন্য গত প্রায় দু’বছর কুহক আর সময় দিতে পারেনি অনুপ্রাণনকে। বলেছিলাম, না-মানুষের ২য় খ- লিখে দেন প্রকাশ করি। বলল, পারবো না। এই শরীরে কুলায় না।
কুহক মাহমুদের অকাল মৃত্যুতে আমরা শোকগ্রস্ত। অনুপ্রাণন-এর সাথে যুক্ত সকলের পক্ষ থেকে কুহকের বিদেহি আত্মার শান্তি কামনা করি। তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে “কুহক মাহমুদ স্মৃতি সংখ্যা” হিসেবে নিবেদন করি শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ৮ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যাটি।
অষ্টম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা – সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা- তৃতীয় পর্ব – সম্পাদকীয়-
সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হওয়ার পর সাম্প্রতিকের আরো ২৫ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কবিতা ও কবিতা নিয়ে সামষ্টিক আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হলো শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা তৃতীয় পর্ব। তৃতীয় পর্বের এই ২৫ জন কবির নাম ইতোপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের ন্যায় অনুপ্রাণনের ১০০ নির্বাচিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের কবি তালিকা থেকে নেয়া হয়েছে যাদের জন্মসাল ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রয়েছে। তালিকার অবশিষ্ট ২৫ জন নির্বাচিত কবি নিয়ে লেখা প্রকাশিত হবে আগামীতে প্রকাশিতব্য শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা অর্থাৎ সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা চতুর্থ পর্বে।
সাম্প্রতিককালের কবিদের কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যসমুহ নিয়ে গত সংখ্যার সম্পাদকীয়তে কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে। সেই আলোচনার সাথে আরো কিছু কথা এখানে যুক্ত করা যেতে পারে বলে মনে করি। যেমন কবিতার বিষয়বস্তুর উত্তরাধিকার হিসেবে সাম্প্রতিকের প্রত্যেক কবি কোন না কোন সময়, কোন না কোন কবিতায় রূপসী বাঙলার প্রাকৃতিক সুন্দরতায় ডুব দিয়ে সুন্দর ও সত্যের খোঁজ করে দুই একটা মুক্তা তুলে আনার প্রয়াস করেছেন। বাঙলার প্রকৃতির নিটোল সৌন্দর্যের কাছে থেকে কবিতাকে জীবন দিয়ে যাপন প্রচেষ্টার কারণে সাম্প্রতিকের কবিতায় বাঙলার স্বাদ আস্বাদন থেকে আমরা বঞ্চিত হই না। মা-মাটি, ষড়ঋতু, সৃষ্টির উল্লাস, আদিমতার সাথে কোন কোন সময় পৌরাণিক মিথের সংমিশ্রণ কবিতায় প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। উপমার জানালাতে উড়ে চলা বলাকার গতিতে অঙ্কিত হতে দেখি বঙ্গ জনপথ, ব-দ্বীপ ভূমি, বৃষ্টি বিধৌত বৃক্ষরাজি, বনভূমি, সোনালু অথবা অসীম অশ্বত্থ।
মানুষের বোধের নিগুড়ে বাস করে শৈশব। সাম্প্রতিকের কবিদের শৈশব ও নস্টালজিয়ার অনুষঙ্গ অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চকিত ও উত্তুঙ্গবাদী। উপমা, রূপক, ব্যঞ্জনা ও ভিন্নতার রহস্য-মাখা জাদু-বাস্তবতা অথবা অধিবাস্তবের রঙে রঞ্জিত হয় নস্টালজিয়া। যৌবনের প্রবলে দৃশ্যমান যতনা আদিরসের নিঃসরণ তারচেয়ে বেশি মাত্রায় পরিলক্ষিত সংরক্ষণ ও সংস্কারবাদী মননের উপমাশ্রিত কারুকার্যের কৃত্রিম স্রোত। কবিতায় মরমিবাদ, বাউলতত্ত্ব ও লোকজধারা দৃশ্যমান হলেও সেটির সাধনা-অভিজ্ঞানের ধারাক্রমে চর্চা খুব একটা পরিদৃষ্ট বা পরিপুষ্ট নয় বলেই কবিতায় মনে হয়। সাম্প্রতিককালে দ্রুত গতিতে নগরায়ণের পরিবেশে নাগরিকবোধের শৃঙ্খলা ও পাশাপাশি জৈবিক স্খলন ও সংকটের আবর্তে জীবনের রহস্যময়তার মূর্ত ও বিমূর্ত ভাবকল্প কবিদের কবিতায় লক্ষণীয় মাত্রায় যুক্ত হতে দেখা যায়। জাদু-বাস্তবতা, অধিবাস্তববাদ, উত্তরাধুনিকতা, কাঠামোবাদ, বিনির্মাণবাদ ও ডিসকোর্সের অনুষঙ্গ-তাড়িত প্রকরণশৈলী বাংলাদেশের কবিতায় ব্যাপক দেখা না গেলেও কারো কারো ব্যবহার প্রবণতার মাঝে গুটিকয়েক সফল হয়েছে বলেই প্রতীয়মান। সাম্প্রতিকের কবিতায় গদ্য-ছন্দের ব্যবহারে এখন অনেকেই সাবলীল। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধীতা, গণতন্ত্র ও স্বদেশপ্রেম ইত্যাদি সাম্প্রতিকের কবিতায় খুবই সীমিতভাবে প্রতিভাত হতে দেখা গেছে। তার অর্থ এই নয় যে সাম্প্রতিকের কবিতায় সমাজ অথবা রাজনীতি সচেতনতা নেই। আছে, আর কোন কোন ক্ষেত্রে সেটা এসেছে ডায়াস্টোপিয়ার রূপ ও বর্ণ পরিগ্রহ করে। যার মধ্যে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা ও প্রতিজ্ঞা না থেকে হতাশা, বিষণ্নতা ও পরাজয়বাদিতার প্রবণতাই যেন বেশী। সাম্প্রতিকের কারো কারো কবিতার বইয়ের নাম প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে যে, যদিও এটি একটি উপলক্ষ, প্রধান অনুষঙ্গ নয়, তবুও নামের ব্যঞ্জনা ও অর্থের গূঢ়ার্থ এবং রহস্যময়তা কবির স্বকীয় পরিচয় সৃষ্টিতে কিঞ্চিত ভূমিকা রাখতে দেখা যায়।
সাম্প্রতিক কবিদের ব্যক্তিক বিকাশ ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন অনুষঙ্গ ও প্রবণতা পরিলক্ষিত হতে দেখা যায়। কারো কবিতা গদ্যে যেমন বিকশিত পদ্যের বিনুনিতেও তেমন অনুধ্যানযোগ্য। কারো কারো কবিতা অতীতবোধ, রাজনীতি, সংকট ও প্রধানত লোকজ ঐতিহ্য সমৃদ্ধ আবার একইভাবে কখনো কখনো নগরজীবনের বাস্তবতাকেই বিকশিত করতে বেশি মাত্রায় পারঙ্গম। কারো কবিতায় যেমন বাহুল্য আছে প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার কম্বুরেখা, তেমনই আছে রসবোধ ও লোকজ-বাস্তবতায় জীবনকে কাব্যময় করার সদিচ্ছা। ঐতিহ্য আর সরলতা উপজীব্য করে নাগরিক-জটিলতাসিক্ত জীবনকে কবিতায় তুলে আনার মতো কঠিন কাজও কেউ কেউ করেছেন। কারো কবিতা মূলত গদ্যধর্মী হলেও মুক্তক অক্ষরবৃত্তের ছোঁয়াচ কবিতার পদ্য-স্বকীয়তাকে নান্দনিক করতে সাহায্য করেছে। সাম্প্রতিকের প্রায় সকল কবির কবিতায় রয়েছে মানবিকতাবোধ, বৈশ্বিকবোধ, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মিথের শক্তির উপলব্ধি অথবা অন্তর্লীন শূন্যতা বোধের কাব্যকলা। একদিকে যেমন ছন্দোবোধ অন্যদিকে ভাঙনের গদ্য-কল্পে বিম্বিত কাব্যময়তা। লোক-ঐতিহ্যতাড়িত সরল পদ্যের কথক হয়ে জীবনকে গ্রামীণ-চেতনাবোধ, লোকযান ও পুঁথিকারদের ঢঙে কাব্যময় করার একটা প্রয়াস কারো কারো কবিতায় লক্ষণীয়। শেকড়বোধকে বর্ণনে, কথনে, সারল্যে, গদ্যভাব ও ভাষায় বিম্বিত করে পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার প্রচেষ্টায় বিষয়ের অভিনবত্ব ও জটিলতার চাইতেও সারল্য, বিমূর্ত-অভিকল্পই বেশি বেশি প্রকটিত অনেকের কাব্যে। কারো কবিতায় গতি ও প্রগতির সম্মিলন রয়েছে, দেখার বোধ ও বিশ্বাসকে প্রশ্নসত্যে চিত্র আর সংকটের প্রেক্ষিতে উপলব্ধিজাত করে তোলা হয়েছে। কবিতার রহস্যময়তার অন্তরালে মানুষের বিবেকে প্রশ্ন সৃষ্টি ও ব্যঞ্জনাভাবের বিকাশের সপক্ষেই কাব্যধারার প্রবর্তক হিসেবে কেউ আবির্ভূত।
বাংলা কবিতার স্বভাবের অনেকটাই দৃশ্যধর্মী। ‘বিষয়’ ‘বর্ণনা’, ‘বন্দনা’ ও ‘বিবরণ’-এর বৃত্তে বন্দী। একুশ শতকের দোরগোড়ায় এসে কারো কারো পক্ষ থেকে বিষয়’কে জলাঞ্জলি দেবার প্রয়াস শুরু হয়। অর্থাৎ কবিতা কিছু বলবে না, কোনো ভারী কথা নয়, কোনো বক্তব্য নয়, দর্শন নয়। সমাজ-রাজনীতির ক্ষেত্র হোক; কবিতা ধ্বনি, শব্দ, ভাষা, অক্ষরের নেশায় নিজের আয়নায় যেন নার্সিসাস। কেবল ছবি, ছবির সারি। পরীক্ষা নিরীক্ষাকে নিরুৎসাহিত করার কিছু নাই। একবিংশ শতাব্দীর দুই যুগ আমরা অতিক্রম করে এসেছি। কিন্তু এখনো বাংলাদেশ পলিমাটির দেশ। যেটুকু কঠিন প্রস্তর আছে তা-ও চলমান ঝর্ণার জল পেয়ে পেয়ে সিক্ত হয়েই থাকে। সার্বিক বিচারে সমকালীন কবিতা হৃদয়গ্রাহী কিন্তু যতটা না হৃদয়গ্রাহী, ভাব-ভাষা-চিন্তা-চিত্রকল্প ও অনুভবের পরম্পরার সুনিয়ন্ত্রিত বিন্যাসে তার থেকেও বেশী বৈদগ্ধ্যপূর্ণ।
Quarterly Anupranan 13th Year 3rd Issue, Samprotiker Kabi O Kobita- 3rd Part
সম্পাদকীয়-
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা- সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতি সংখ্যা
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যাটি সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতিসংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হলো। সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ ২০১৩ সালে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বিতীয় বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশের সময় অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদে যুক্ত হন। গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি অনুপ্রাণনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তাঁর অকাল মৃত্যু আমাদের শোকগ্রস্ত করেছে। তাঁর স্মৃতি বারবার ফিরে এসে আমাদের মন ভারাক্রান্ত করে তুলছে। স্বামী-পুত্র-কন্যা-পরিবার-পরিজন নিয়ে সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের একটা সংসার ছিল। নারী হিসেবে সংসার ও পরিবারের প্রতি কতগুলো স্বাভাবিক দায়িত্ব ছিল। কিন্তু পাশাপাশি সাহিত্য, সংগীত, সংস্কৃতি, ফ্যাশন ও পরিবেশ নিয়ে তাঁর ভাবনা ছিল, কর্মকাণ্ড ছিল। কবিতা লিখতেন, অনুবাদ করতেন, গল্প লিখেছেন। সম্পাদনা পরিষদে অংশ নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ও অনুপ্রাণন প্রকাশনের কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তরুণদের সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী করে তোলার লক্ষে প্রথম দুই বছর (২০১২-২০১৪) কনকর্ডের চত্বরে একটি দেয়াল পত্রিকার সম্পাদনাও করেছেন। ত্রৈমাসিক পত্রিকা ছাড়াও শিল্প-সাহিত্য জগতে অনুপ্রাণনের কর্মকাণ্ড প্রসারের জন্য বিভিন্ন সময় নেওয়া কর্মসূচি সফল করে তোলার জন্য সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ তাঁর অন্য সকল কাজের ভিড়ে অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদে পর্যাপ্ত সময় ও স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়নভিত্তিক প্রবন্ধগুলোতে শুধু যে তাঁর বহুমাত্রিক কাজের পরিচয় আমরা পাই তা নয়, পাশাপাশি আমরা খুঁজে পাই তাঁর মন-মানস। সেই সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ’কে যিনি ছিলেন একজন রুচিশীল, স্নেহশীল, মানবিক মানুষ। যিনি সুন্দরকে ভালোবাসতেন। সমাজে ঘৃণা, কদর্যতা, সংকীর্ণতা, বিভেদ, বৈষম্য ও নীচতা তাঁকে পীড়িত করেছে। প্রকৃতির মাঝে তিনি বিচিত্র সুন্দরের সন্ধান করতেন। প্রকৃতির মাঝে থেকেই তিনি দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের জীবন থেকে মুক্তি পেতে ভালোবাসা ও সহনশীলতার পাঠ নিয়েছেন। জীবনে ও পরিবেশে তিনি প্রতিনিয়ত সবুজ, সরলতা ও শান্তির সরোবর সন্ধান করেছেন, আহরণ করেছেন। তাঁর চারপাশটা সুন্দর করে সাজিয়ে তোলার জন্য সাজিয়ে রাখার জন্য সবসময় ব্যাকুল থেকেছেন।
সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ বিশ্বাস করতেন একটি দেশের দার্শনিক ও আদর্শিক স্থান চিহ্নিত হয় সে দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে। ক্রমাগত চর্চা ও সাধনার মধ্য দিয়ে একটি জাতির শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভিত মজবুত করা যায়। শিল্প-সাহিত্য ও সংগীত সাধনা ছাড়া শান্তির ও সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তোলা যায় না। শিল্প ও সাহিত্য সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একটি দেশের শিল্প-সাহিত্যে সে দেশের সমাজ প্রতিফলিত হয়। আবার শিল্প-সাহিত্যের চর্চার মধ্য দিয়েই সমাজের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, সামাজিক রীতিনীতি ও ঐতিহাসিক আখ্যানের নির্মাণ ও রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলমান থাকে। শিল্প-সাহিত্য মানব অবস্থার উপর অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আবেগ অন্বেষণ করতে, সামাজিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং আরও ন্যায়সঙ্গত ও সহানুভূতিশীল বিশ্ব গঠনে অবদান রাখতে সাহায্য করে। কেবল সমাজের সাজসজ্জার উপাদান হিসেবে নয় বরং সমাজকে বোঝার এবং রূপান্তরের জন্য শিল্প ও সাহিত্যচর্চা অপরিহার্য। শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমে সৃজনশীল ও নান্দনিক প্রকাশের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রক্রিয়া ব্যক্তির মানবিক অভিজ্ঞতার গভীরতর উপলব্ধি অর্জন করে তুলতে সক্ষম করে, চিন্তার বিকাশ সাধন প্রক্রিয়ায় জারিত হয়ে অমানবিক সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে, চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়সঙ্গত বিশ্ব নির্মাণে অবদান রাখতে পারে। এই বোধ ও অনুভূতিগুলোই সুলতানা শাহ্রিয়া পিউকে ক্রমাগত অনুপ্রাণিত করেছে এবং চালিকাশক্তি হিসেবে শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার সকল পরিসরে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।
বস্তুত পৃথিবীর সব কিছুই সুন্দর বা নান্দনিক হয় না। আমাদের চারপাশের দৃশ্য ও ঘটনাবলি থেকে উৎসারিত সকল অনুভূতি নান্দনিক বা শিল্পিত হয় না। এর মাঝে যে-সকল অনুভূতি ও প্রকাশভঙ্গি আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি আনে, মনে চঞ্চলতা আনে, আনন্দ দেয়, মনের আধ্যাত্মিক স্তরটিকে বিকশিত করে, সেগুলোকেই আমরা বলি, সুন্দর। এ যেন এক যাদু। এই যাদুর কাঠির পরশ যে শিল্পে, যে সাহিত্যে থাকে না সেই শিল্প সেই সাহিত্য মানুষের হৃদয়ের উষ্ণ ছোঁয়া থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়। বাংলা ভাষায় ‘নন্দনতত্ত্ব’ শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মূলত নান্দনিকতা আঠারো ও উনিশ শতকের একটি সাহিত্যিক ও শৈল্পিক আন্দোলন, যা সৌন্দর্যের গুরুত্বের উপর আলোচনার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল। এই ধারণা দিতে সচেষ্ট হয়েছিল যে সৌন্দর্য ছিল শিল্প ও সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সৌন্দর্য কী, তা বর্ণনা দিয়ে অপরকে বোঝানো যায় না, এটি অসংজ্ঞায়িত। সৌন্দর্য উপলব্ধির বিষয়, তাই এটি বুঝে নিতে হয়। ভাবের পরিপূর্ণতা এবং প্রকাশের তীব্র আকুতি নিয়ে সৌন্দর্যের নিজস্ব মূল্য সৃজন-চেষ্টার কৌশল অনুসরণ করা প্রতিটি শিল্পী ও সাহিত্যিকের জন্য মূল্যবান। সামষ্টিক সংস্কৃতি বিশুদ্ধ বুদ্ধির বিষয়, যা কিনা শিল্পের মাধ্যমে উদ্ভাসিত সৌন্দর্যের বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং সর্বদা একটি প্রতি-পরিবেশ হিসেবে কাজ করে যেখানে মানবিকতার ভূমিকাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের মাঝে ছিল গভীর সৌন্দর্যবোধ। তাঁর প্রতিটি কর্ম তাই হয়ে ওঠে এমন একটি ব্যতিক্রম যেখানে সম্পৃক্ত থেকেছে নান্দনিকতার বিশেষ ছোঁয়া। তাঁর কবিতা অথবা গল্প রচনায়, বাচিক শিল্প অথবা সংগীতচর্চায়, ফ্যাশন ডিজাইনে অথবা তাঁর ছাদবাগানে, কিংবা বৃক্ষ রোপণ ও বৃক্ষ উপহার কার্যক্রমে সদা প্রকাশ পেয়েছে গভীর নান্দনিকবোধ ও মানবিকতাবোধ। যার ছাপ তিনি রেখে গেছেন আমাদের সবার হৃদয়ে। তাই, সশরীরে না থাকলেও আগামীতে অনুপ্রাণনের সৃজন-নন্দনের পরিসরে পরিচালিত সকল কর্মকাণ্ডে নান্দনিকতা, শুভবোধ ও মানবিকতার উদাহরণ হয়ে পিউ আমাদের সঙ্গে থাকবেন।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 1; Sultana Shahria Pieu Memorial Issue
লেখকের কথা-
পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। এর দ্বারা একটি সময়ে সংঘটিত নানান ঘটনার বিশ্লেষণ করা যায়। তাই, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও বহুমুখী দিকগুলো অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করতে সেই সময়ে প্রকাশিত পত্রিকার রিপোর্টগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।
২০১৬’র নভেম্বরে দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক আশফাক ভাই একদিন বললেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষ ১৭ দিনে (ডিসেম্বর ০১ – ডিসেম্বর ১৭) আন্তর্জাতিক পত্রিকায় প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক রিপোর্টগুলোর অনুবাদ নিয়ে একটি ধারাবাহিক সিরিজ করে দেয়ার জন্য। শুনেই আমি রাজি হয়ে যাই। দৈনিক ইত্তেফাকে ২০১৬’এর ০১ ডিসেম্বর হতে ১৫ ডিসেম্বর (১৪ ডিসেম্বর বাদে) পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ১৪টি রিপোর্টের অনুবাদ প্রকাশ হয়েছিল।
এই বইতে সেই ১৪টি রিপোর্টের অনুবাদ সহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মোট ২০টি রিপোর্টের অনুবাদ রয়েছে। ডিসেম্বর ০১-১৭ এর ১৮টি রিপোর্ট ও মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় মার্চের ০২ টি রিপোর্টের অনুবাদ সংযুক্ত হলো।
অনুবাদগুলো ভাবানুবাদ এবং পত্রিকার রিপোর্টগুলো মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টের সংগ্রহশালা হতে সংগ্রহীত।
এই অনুবাদ রিপোর্টগুলো বই আকারে প্রকাশের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন সহযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টের সভাপতি শান্তা আনোয়ার।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের শেষ ১৬ দিন
সম্পাদকীয় – অনুপ্রাণন – দ্বাদশ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা, গল্পকার ও গল্পসংখ্যা (চতুর্থ পর্ব)
প্রকাশিত হলো ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা, গল্পকার ও গল্প সংখ্যা- চতুর্থ পর্ব। গল্পকার ও গল্পসংখ্যা চতুর্থ পর্ব প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশের ১০০ জন নির্বাচিত গল্পকার, তাদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা, গল্পকার রচিত গল্পসাহিত্য নিয়ে আলোচনা এবং একটি উল্লেখযোগ্য গল্প সংকলিত করার কাজ শেষ হলো। এই সংখ্যায় পূর্বের তিনটি সংখ্যার মতোই ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
দ্বাদশ বর্ষে এসে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন থেকে বাংলাদেশের ১০০ জন গল্পকার নিয়ে প্রবন্ধ একত্রিত করে সংকলন প্রকাশ করার কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। প্রথম কাজটি ছিল বাংলা সাহিত্যের গল্পকারদের মধ্য থেকে কারা বাংলাদেশের গল্পকার সেটা নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা, দ্বিতীয়তে এসে বাংলাদেশের গল্পকারদের মধ্য থেকে ১০০ জন গল্পকার বাছাই করা, তৃতীয়তে এসে গল্পকারদের গল্পসাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা বা প্রবন্ধ লেখার জন্য লেখক নির্ধারণ করা। এই কয়টা ধাপের কাজ যতটুকু না কঠিন ছিল তার থেকে বেশি কঠিন ছিল যেসকল গল্পকারের প্রকাশিত গল্পগ্রন্থগুলো সহজলভ্য ছিল না সেগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে জোগাড় করা। এই কাজ করতে আমাদের চেষ্টার সফলতার পেছনে যারা কাজ করেছেন, সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। আমরা তাদের কাছেও বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ যারা বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকারকে নিয়ে এক একটি প্রবন্ধ লিখে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কাজে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন একাদশ বর্ষে এসেও একইভাবে বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ কবি তাদের কবিতা নিয়ে চারটি সংকলন প্রকাশ করেছে। তারপর দ্বাদশ বর্ষে এসে বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকারকে নিয়ে আরও চারটি সংকলন অনুপ্রাণন থেকে প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং বাস্তবায়ন করার উদ্দেশ্য একটাই। সেটা হচ্ছে- যারা আমাদের কবিতা ও গল্প সাহিত্যের ভিত্তি গড়েছেন তাদের সাথে এবং তাদের কাজের সাথে প্রজন্মকে পরিচিত করে তোলা। আমাদের নির্বাচিত গল্পকারদের মধ্য যিনি সর্বজ্যেষ্ঠ তিনি হচ্ছেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন। তার জন্ম ১৮৯৭ সালে আর মৃত্যু ১৯৭৮ সালে। আর নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হচ্ছেন ইমতিয়ার শামীম। তিনি ১৯৬৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা পূর্ব সময় এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তাদের অধিকাংশই সাহিত্যচর্চা করেছেন। ফলে তাদের সাহিত্য এমন একটা বিশেষ সময়কে ধারণ করেছে যেখানে দুটি দেশভাগের অভিজ্ঞতা হয়েছে। দুটি দেশভাগের কার্যকারণের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে তাদের লেখায় যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ন্যায্যতা ভিত্তি পেয়েছে ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের স্বত্ব, সত্তা ও মৌলিকত্ব নির্মাণে গল্পকারগণ উদ্যোগী হয়েছেন। আমরা অনুপ্রাণন, বিশ্বের বাংলা সাহিত্যে বাংলাদেশের স্বকীয় অবস্থানের বাস্তবতাটিকে প্রবলভাবে অনুভব করি এবং গর্বিত হই।
বাংলাদেশের গল্প-সাহিত্যের চরিত্রদের জীবনের শেকড় অধিকাংশেই প্রাকৃত জীবনে প্রোথিত। মাটি ও সবুজের সাথে সম্পর্কিত। মাত্রই এক অথবা খুব বেশি হলে দুই প্রজন্ম যারা গ্রামের শ্যামলিমা থেকে নগরের কঠিনতায় অভিবাসিত হয়েছে। নগরে থেকেও তারা যেন শহরতলীতে বসবাস করছে। যাদের কারও কারও শরীর থেকে এখনও মাটির গন্ধ মিলিয়ে যায়নি। তাই অধিকাংশ গল্পের দৃশ্যপট হয় শহর না-হলে শহরতলী। গল্পের মানুষগুলো কৃষক না-হয় কৃষকের শিক্ষিত সন্তান। দৃশ্যপটের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়গুলোর বিন্যাসে তাই কখনও গ্রাম সম্পূর্ণভাবে তিরোহিত হয়ে যায়নি।
গ্রামের রূপান্তর কাহিনী হোক অথবা শহর থেকে নগরায়ণের দিকে উত্তরণের কাহিনী হোক প্রায় সকল ক্ষেত্রেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও পরিবার; তাই কাহিনী যতটা না ব্যক্তিকে নিয়ে তার থেকে বেশি হচ্ছে পারিবারিক অথবা সামাজিক। কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্তই বাংলাদেশের গল্পের প্রধান চরিত্র। ধনী পরিবারের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, কলহ, প্রেম-ভালোবাসার গল্প হাতে গোনা। বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পের প্লটে সংঘাত ও সংঘর্ষের নিরসনই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু এমন কিছু প্লট সৃষ্টি করতেও দেখা গেছে যেখানে সংকট নিরসন হয়নি। অর্থাৎ বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্প অধিকাংশই একটি ইতিবাচক সমাধান অথবা ইঙ্গিত পাওয়া যায় এবং নেতিবাচক চরিত্র খুব কমই গল্পের সম্পূর্ণতার ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের গল্প রোমান্টিক ভাব ও আবেগে ভারাক্রান্ত হতেই দেখা যায় বেশি এবং পাঠকেরা সেগুলো পছন্দও করছেন। কিন্তু গল্পকাররা তাদের গল্পে ভাব ও আবেগের ভারসাম্য রক্ষা করেছেন, বাস্তব বিচারে সেই গল্পগুলো বোদ্ধা ও পরিপক্ব পাঠক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
বাংলাদেশের গল্পের আখ্যানবস্তুতে রোমান্টিকতার প্রভাব বেশি থাকলেও এক ঝাঁক গল্প আছে যেখানে জীবনজিজ্ঞাসার দর্শন চিন্তায় জাগরিত হতে দেখা যাচ্ছে। গল্পের গদ্যনির্মাণ যথেষ্ট পরিপক্ব। বানান, ব্যাকরণ, বাক্য গঠন, রূপকের নান্দনিক ব্যবহারে সমৃদ্ধ। গল্পের শুরুর চমক নিয়ে গল্পকারদের মধ্যে একটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যায়। এই ব্যাপারে ভিন্নমত আছে, যদিও পারিবারিক পটভূমিতে নির্মিত গল্পগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চমক দিয়ে শুরু করার একটা প্রবণতা রয়েছে। অপ্রাসঙ্গিক সংলাপ কোনো কোনো গল্পকে অহেতুক ভারাক্রান্ত করেছে। কিন্তু বলা যেতে পারে অধিকাংশ গল্পই দৃশ্যপট বর্ণনায় এবং সংলাপের ওপর গল্পকাঠামো নির্মাণ করার কাজটি করেছেন মেদহীন গদ্যে। গল্পগুলো একরৈখিক হয়নি আবার পার্শ্বচরিত্রের উপ-গল্পগুলো গল্পের প্রধান আখ্যানকে ভারাক্রান্ত করেনি। সময়, কালের প্রতি গল্পগুলো সুবিচার করেছে যেখানে সত্য ইতিহাসের সাথে অহেতুক বিতর্কে অবতীর্ণ হয়নি। গল্পের পক্ষ ও প্রতিপক্ষের অস্তিত্ব ও তাদের আচার-আচরণ অবাস্তব করে তোলা হয়নি। গল্পের চরিত্রগুলোকে দেবতাতুল্য অথবা উল্টোদিকে শয়তানতুল্য করে অবাস্তব কাল্পনিক চরিত্র করে গড়ে তোলা হয়নি। বাংলাদেশের গল্পে রূপকের ব্যবহারে ফ্যান্টাসির তুলনায় বাস্তবের বস্তুগুলোকেই নান্দনিক করে তোলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের গল্পগুলো সামগ্রিকভাবেই এমন একটি উচ্চতর স্তরে উত্তীর্ণ হয়েছে, যখন বাংলাদেশের গল্পসাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের গল্পের ভাণ্ডারে শামিল হওয়ার যোগ্যতাকে আর অস্বীকার করা যায় না।
অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- গল্পকার ও গল্প সংখ্যা চতুর্থ পর্ব
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.











There are no reviews yet.