Additional information
| Weight | 0.437 kg |
|---|---|
| Published Year |
$ 2.94
সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা- সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা (চতুর্থ পর্ব)
সর্বশেষ প্রকাশিত চতুর্থ পর্বে অবশিষ্ট ২৫ জন কবিকে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে মোট ৪টি পর্বে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিকের ১০০ কবির (যাদের জন্ম-সময়সীমা : ১৯৬৬-১৯৮৫) জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার, উল্লেখযোগ্য কবিতা ও কবি রচিত কবিতাসমূহের উপর সামগ্রিক আলোচনা সংকলিত করার আয়োজন সম্পন্ন হলো। সাম্প্রতিকের ১০০ কবিকে নিয়ে লেখা এসব প্রবন্ধ পাঠ করলে বাংলাদেশের সাহিত্যের বিশেষ করে কবিতার পাঠকরা আধুনিক, উত্তরাধুনিক ও নতুন ধারা- এই তিন ধারার কবি ও কবিতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। পাঠকরা অনুধাবন করবেন, বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের কবিদের কবিতা এবং সাম্প্রতিকের অর্থাৎ গত তিন দশকের কবিদের কবিতার মধ্যে সুস্পষ্ট একটি বাঁক বদল ঘটেছে। অত্যন্ত মেধাসম্পন্ন এই কবিদের অনেকেই তাদের শক্তিশালী উদ্ভাবনী শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছেন এবং তাদের এসব সাফল্য যথাযথ স্বীকৃতি লাভ করেছে। কবিতার পরিধি, গঠনশৈলী ও আবৃত্তির কারণে দশকের পর দশকে বিকশিত কবিতা অভিনব ধারায় পৌঁছেছে এবং শাখা উপশাখা ধরে বিচিত্র বিস্তার ঘটছে। ষাট, সত্তর ও আশি’র দশক বা এর পরবর্তী কবিরা কবিতায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন এবং ক্রমান্বয়ে কবিতায় এনেছেন নতুনত্ব। যেখানে কবির সৃষ্টিশীল রচনা সময়ের দাবিতে মানবিক চেতনা গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রেও অভিনব সাড়া জাগিয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিকের কবিদের অধিকাংশ কবিতায় আমরা দেখতে পাই সাবলীল ভাষা ব্যবহার করে সুচারুভাবে রচিত নান্দনিক চিত্রকল্প। পার্থিব অথবা অপার্থিব রূপক মিশ্রিত রিয়েলিজম, ম্যাজিক-রিয়েলিজম, সুররিয়েলিজম। আমরা দেখি, শহর কিংবা গ্রামীণ প্রান্তরের পটভূমিতে পাঠকের চেতনাকে জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত কিংবা বিচ্ছিন্ন করে দেখার একটি অভিনব প্রবণতা। সাম্প্রতিকের অধিকাংশ কবিতা গদ্য ছন্দে লেখা হলেও অনেকেই অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা ছাড়াও অন্ত্যমিলের কবিতা, পদ্য ও ছড়া লিখেছেন। অন্ত্যমিলের কবিতা, পদ্য ও ছড়ায় সামাজিক বিষয়বস্তু প্রাধান্য পেয়েছে যেখানে বেশ কিছু কবিতায় রম্য ঢঙের ব্যবহার পাঠকদের আকৃষ্ট করেছে।
একটি বিষয় লক্ষণীয়, রোমান্টিকতা পেরিয়ে বস্তুবাদের প্রভাব সত্ত্বেও বাংলাদেশের কবিতার ভুবন থেকে রোমান্টিকতার পরিপূর্ণ নির্বাসন কখনো ঘটেনি। যে বিষয়টি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য, মূলধারার সঙ্ঘবদ্ধ কবি ও কবিতার গোষ্ঠীবদ্ধতা থেকে বের হয়ে বাংলাদেশের কবিতা এখন প্রধানত ব্যক্তিবৃত্তে আবদ্ধ হচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কতিপয় বিচ্ছিন্ন কাব্যব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটেছে। তত্ত্ব এখন আর প্রভাবশালী কাব্য-প্রকল্প নয়। বর্তমান বাংলাদেশের কবিতাভুবনের বাস্তবতায় রাজনৈতিক মতাদর্শ কিছু সংখ্যক ব্যতিক্রম বাদে প্রভাব-বিস্তারকারী শক্তি নয়। একই কথা খাটে শিল্পসর্বস্বতার ক্ষেত্রে। এখানেও হয়তো দু-চারজন ব্যতিক্রমীকে দেখা যাবে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কবিতা বিচ্ছিন্ন যেসব ছোট ছোট ব্যক্তিক বৃত্তে বাঁধা সেখানে সৃজনশীলতার বিচারে সবাই নিজ নিজ ধারায় সর্বাধুনিক যেন তার কোনো পূর্বসূরি নেই।
বাংলার আধুনিক কবিতা সাহিত্যে সূচনা থেকেই পাশ্চাত্য, আফ্রিকা এমনকি ল্যাটিন আমেরিকার শক্তিশালী কবিদের কবিতার প্রভাব লক্ষ করা গেছে। সাম্প্রতিককালে বিদেশি প্রভাব মুক্ততার প্রবণতা গ্রহণ করে যে নতুন ধারার কবিতা লেখার প্রচেষ্টার প্রচলন ঘটেছে সেখানে প্রধানত গ্রামীণ সমাজ, পরিবেশ-প্রকৃতি, পারিবারিক গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের পাশাপাশি সমাজ ও রাজনীতির বিভিন্ন সংকটের প্রতিফলন দেখা যায়। এসব কবিতায় প্রমিত বাংলা শব্দের পাশাপাশি কিছু সংখ্যায় আঞ্চলিক বাংলা শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। আঞ্চলিক উচ্চারণের সঙ্গে মিল রেখে সেভাবে শব্দের বানান নিরূপণ করা হচ্ছে। বাংলা ভাষার বানান নির্ধারণ করার চার তত্ত্ব ও অন্যান্য প্রচলিত সূত্রের যৌক্তিকতা সম্পর্কে নতুন ধারার কবিরা প্রশ্ন তুলেছেন। একটি ভাষায় একই অর্থযুক্ত শব্দের বিভিন্ন বানান থাকতে পারে কিনা এটা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে। আলোচনা হওয়াও প্রয়োজন। কেননা বি-উপনিবেশবাদের যে দর্শনের উপর ভিত্তি করে নতুন ধারার কবিতা রচনা করার অনুপ্রেরণা গ্রহণ করা হয়েছে সেখানে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ প্রবেশের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর সেটা যদি ঘটে তাহলে কবিতার বিশ্বজনীন আবেদন হারিয়ে বাংলা কবিতা বাংলা সাহিত্যের সর্বোৎকৃষ্ট স্থান হারিয়ে ফেলতে পারে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের কবিতা সাহিত্যের যে মজবুত ভিত্তি আজ গড়ে উঠেছে তার উপরে দাঁড়িয়ে বাংলা কবিতাকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাহিত্যামোদীর কাছে পৌঁছানোর জন্য একদিকে যেমন অনুবাদ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন অন্যদিকে খেয়াল রাখা দরকার কবিতাও সৃজনশীল বিষয়, বোধ ও অভিব্যক্তিতে যেন সর্বজনীন রূপ গ্রহণ করার মাধ্যমে বিশ্বজনীন হতে পারে।
নভেম্বর ২০১২ সূচনা সংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর যাত্রা শুরু হয়। যাদের হাত ধরে ম্যাগাজিনটির জন্ম তাদের অনেকেই আমাদের মাঝে আজ নেই। ২৮ আগস্ট ২০১৯ সালে আমরা হারিয়েছি সম্পাদনা পরিষদের অন্যতম সদস্য কবি কুহক মাহমুদকে; যিনি সূচনা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে সার্বক্ষণিক পত্রিকাটির জন্য কাজ করেছেন। সম্প্রতি, গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ আমাদের ছেড়ে গেছেন শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদের আরেকজন সদস্য কবি ও গল্পকার সুলতানা শাহ্রিয়া পিউকে। আগস্ট ২০১৩ সাল থেকে তিনি অনুপ্রাণন-এর সঙ্গে যুক্ত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি অনুপ্রাণন-এর সঙ্গে থেকেছেন একজন গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে। কবি ও গল্পকার সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের এই অকাল চলে যাওয়া অনুপ্রাণন-এর সকল কর্মী, লেখক ও শুভানুধ্যায়ীকে গভীরভাবে শোকবিদ্ধ করেছে। শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর এই সংখ্যা আমরা আমাদের সহকর্মী সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের স্মৃতিতে উৎসর্গ করছি। পাশাপাশি ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর আগামী সংখ্যা সুলতানা শাহরিয়া পিউ স্মৃতি সংখ্যা হিসেবে প্রকাশ করার ঘোষণা প্রদান করছি।
| Weight | 0.437 kg |
|---|---|
| Published Year |
সম্পাদকীয়-
শিল্পী গোষ্ঠীর সমাজ-সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন
শিল্পী ও সাহিত্যিকদের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধভাবে একমাত্র নান্দনিক সৃজনের ঘেরাটোপে বন্দী না থেকে সমাজে বসবাসের শর্তাবলী ও পরিবেশ একজন শিল্পী ও সাহিত্যিক’কে অন্য যে কোন সচেতন নাগরিকের মতোই একান্তভাবে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে উৎসারিত ও গৃহীত সকল মতামত প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে তাঁর কাজে প্রকাশ করতে দেখা যেতে পারে। বিশেষতঃ একজন শিল্পী ও সাহিত্যিক পরিবেশ ও সমাজের ক্ষেত্রে গভীরভাবে সংবেদনশীল হওয়ার কারনে তাদের সৃজনশীল কাজে ও রচনায় সমাজের রীতি-নীতি, অর্থনীতি ও রাজনীতির ভাল-মন্দ এবং দোষ-গুণের প্রতিফলন থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না বরঞ্চ এই থাকাটাই যেন স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্র মত প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা রকম সীমা বেঁধে দেয়। এসব সীমার মধ্য থেকেই শিল্প চর্চার বিভিন্ন মাধ্যম ও অবলম্বনের সাহায্য নিয়ে একজন শিল্পী অথবা সাহিত্যিকের যেমন প্রচ্ছন্নভাবে নিজের মতটি প্রকাশ করার প্রচেষ্টা থাকে তেমনই আবার শিল্পী-সাহিত্যিকবৃন্দ দ্রোহী হয়ে মত প্রকাশের ফলে রাষ্ট্রের অথবা কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর কোপানলে পড়ে নির্যাতিত হওয়া এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হাতে তাদের সহিংস আক্রমণের শিকার হতেও আমরা দেখেছি।
তাই, এখানে প্রশ্ন এটা নয় যে, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের সৃজনশীল কাজে ও রচনায় সমাজের রীতি-নীতি, পরিবেশ, অর্থনীতি ও রাজনীতির ভাল-মন্দ এবং দোষ-গুণ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ অথবা প্রচ্ছন্নভাবে তাদের ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন থাকবে কি-না? বাস্তবে প্রশ্নটা হচ্ছে সামাজিক-রাজনৈতিক এবং পরিবেশগত সমস্যা সম্পর্কে রাষ্ট্র ও জনগণকে সচেতন করা এবং সেসব সমস্যা দূর করার জন্য সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিল্পী ও সাহিত্যিকদের ভূমিকা কীভাবে নির্ধারিত হবে? বরঞ্চ, প্রশ্নটা দুটো হচ্ছে-
ক. শিল্পী ও সাহিত্যিকবৃন্দ নিজেরাই কোন সামাজিক সংগঠন করবে কি-না অথবা পেশাজীবীদের অন্য কোন বৃহত্তর সামাজিক সংগঠনে সম্পৃক্ত হবে কি-না? এবং
খ. স্রেফ শিল্পীদের নিজস্ব অথবা অন্য কোন বৃহত্তর সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে সমাজের কোন ন্যায্য দাবী অথবা সমাজের কোন বাস্তব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পরিচালিত রাজপথের আন্দোলনে ফেস্টুন-ব্যানার নিয়ে নিজেরা সম্পৃক্ত হবে কি-না? এবং
গ. যদি শিল্পী ও সাহিত্যিকবৃন্দ নিয়মিতভাবে কোন সামাজিক সংগঠনমূলক কার্যক্রমে সক্রিয় হয়ে যায় এবং সামাজিক ইস্যুতে রাজপথের আন্দোলনে নেমে পড়ে অথবা সরাসরি কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হয়ে যায় তাহলে সময় ও মনোসংযোগ দ্বিধান্বিত হয়ে বাধা পড়ে শিল্প ও সাহিত্য চর্চার মান ও গুণাগুণের ক্ষেত্রে শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা কোন ক্ষতি বা সমস্যার সম্মুখীন হবে কি-না?
এখানে উল্লেখ্য যে, অন্য সামাজিক সংগঠনের আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা অথবা সংহতি প্রকাশ, ঘড়ে বসে শিল্পী-সাহিত্যিকদের নিজস্ব সংগঠন করা অথবা ফেস্টুন ব্যানার নিয়ে রাজপথে নেমে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া ইত্যাদী নানা উপায়ে একজন শিল্পী অথবা সাহিত্যিকের পক্ষে সামাজিক আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। একজন শিল্পী অথবা সাহিত্যিক সামাজিক আন্দোলনের সাথে কীভাবে যুক্ত হবেন সেটা একান্তভাবেই তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এবং এটাও বাস্তব সত্য যে একজন সংবেদনশীল ও সচেতন শিল্পী অথবা সাহিত্যিক ন্যায্য দাবী ও বক্তব্য নিয়ে পরিচালিত চলমান সামাজিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আত্মকেন্দ্রিক চিন্তায় আবদ্ধ হয়ে কোনভাবেই নিষ্ক্রিয় এবং নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না।
১৯৬৯ এর গণভ্যুত্থান অথবা ১৯৭১ এর মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলিতে শিল্পী সমাজের সদস্যবৃন্দকে সংগঠিতভাবে ফেস্টুন-ব্যানার নিয়ে আন্দোলনে-সংগ্রামে-মিছিলে যুক্ত হতে আমরা দেখেছি। ৭১’এর স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে এমনকি প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে নিয়ে শিল্পী ও সাহিত্যিকদের মুক্তিযুদ্ধে সংযুক্ত হতে আমরা দেখেছি। এর পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা বিভিন্নভাবে সংগঠিত হয়েছেন। এসব আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র।
স্বাধীনতার পর শিল্পী ও সাহিত্যিকদের যেসব সংগঠন গঠিত হয়েছে সংগঠনভেদে সেগুলোর মূল লক্ষ্যই ছিল জোটবদ্ধভাবে শিল্প চর্চা, আলোচনা-সমালোচনা, শিল্পের প্রচার-প্রসার, পরোক্ষভাবে ব্যক্তির প্রচার ও প্রসারলাভের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা থেকে বিপণন কৌশল অবলম্বন করা পর্যন্ত। তাছাড়া, রাষ্ট্রীয়, সরকারী অথবা বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, সংবাদ-মাধ্যম, কর্পোরেট অথবা নন-কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পদক-পুরস্কার অথবা আনুকূল্য লাভের জন্য এসব কোন কোন ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংগঠন ও জোটের তৎপরতার সুযোগ গ্রহণ করতেও আমরা দেখেছি। শিল্প ও সাহিত্যকেন্দ্রিক নানা তৎপরতা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও এসব সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে সৃজনশীল অথবা মননশীল শিল্পগুণের মান ও রুচির উৎকর্ষতা লাভের ক্ষেত্রে এসব সংগঠন বিশেষ কোন অবদান রাখতে বিশেষ কোন সাহায্য করেছে বলে এরকম উদাহরণ পাওয়া যায় না। দলীয় অথবা ব্যক্তিগত লাভালাভের বিষয়গুলো সেখানে খুবই নগ্নভাবে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে এবং যার ফলে দেশে মাঝারী মানের শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতাই হয়েছে অত্যন্ত অধিকহারে। অন্যদিকে প্রচার, প্রসার ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে মৌলিক, মননশীল ও উচ্চতর মানসম্পন্ন শিল্প ও সাহিত্যকর্ম পাঠকদের কাছে ব্যপকভাবে পৌঁছানোর সুযোগ লাভ করতে পারেনি। এবং যার ফলে সত্যিকার প্রতিভাবান শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা হতাশা থেকে প্রচারবিমুখতা ও আত্মকন্দ্রিকতার ক্ষুদ্র গ-ির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছেন।
এছাড়া, রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্য চর্চা ও গবেষণা এবং তাঁদের সাহিত্যকর্মকে আধুনিক শিশু-কিশোর ও তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য দেশে কয়েকটি সরকারী-বেসরকারী সংগঠন কাজ করছেন। কিন্তু, রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্যকর্মের আক্ষরিক পঠন ও মুখস্থ করার উপরই এসব সংগঠনকে বেশী জোর দিতে দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের মাঝে যে মানবিক চেতনা ও যে দার্শনিক নির্যাস রয়েছে তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের সাথে অধিকহারে দেশের শিশু-কিশোর ও তরুণদের পরিচয় করিয়ে দেয়া খুব জরুরী। কেননা এতে করে দেশের নতুন প্রজন্মের মনের মাঝে মানবিক চেতনা ও সুন্দর রুচিবোধ স্থান করে নিতে পারে। এসব বিবেচনা করে রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্য চর্চা ও গবেষণার জন্য যেসকল সংস্থা ও সংগঠন কাজ করছেন সেসকল সংগঠন দক্ষতার সাথে তাঁদের কাজের পরিধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে চলুক- এটাই প্রত্যাশা করি।
প্রথম থেকেই শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, ব্যক্তি, দলীয়, গোষ্ঠী অথবা কর্পোরেট তৎপরতার বাইরে নিজের স্বাধীন অবস্থান রক্ষা করে দেশের নবীন ও তরুণ প্রতিভাবান শিল্পী ও সাহিত্যকদের পরিচ্ছন্ন ও মানসম্পন্ন শিল্প-চর্চার জন্য অনুপ্রেরনা যুগিয়ে এসেছে। সপ্তম বর্ষে পদার্পন করে ‘অনুপ্রাণন’ অবিচলভাবেই ঐ ঘোষিত পথেই তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে চায়। অনুপ্রাণন-এর মূল পৃষ্ঠপোষক অনুপ্রাণন-এর পাঠকেরাই। তাই, বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সপ্তম বর্ষে পদার্পণ করতে পেরে অনুপ্রাণন-এর লেখক এবং পাঠকেরা অবশ্যই বিশেষ অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য।
সপ্তম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা
সম্পাদকীয়, অনুপ্রাণন–১০ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা
শিল্প-সাহিত্যে নারীর ভাষা, ভাষ্য ও দৃষ্টিকোণ নির্মাণে শিল্পী ও সাহিত্যিকদের ভূমিকা
ভাষা সমভাষীদের মধ্যে ভাব বিনিময়ের সহজ ও বোধগম্য উপায়। কিন্তু যখনই বৈষম্যমূলক সমাজ জাতি, বর্ণ, ধর্ম, শ্রেণি, অঞ্চল ও লিঙ্গভেদ সৃষ্টি করে, তখন সমভাষীদের মধ্যে নানারকম উপভাষা, আঞ্চলিক ভাষা এবং একইসাথে উপ-সংস্কৃতিতে জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ে। ভাষা ও ভাষ্যের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে তর্ক ও ক্ষেত্রবিশেষে বিবাদ দেখা দিতে পারে। শব্দ ও বাক্যের ব্যবহার ভেদের সাথে সাথে উচ্চারণেরও নানা ভেদ ও ব্যতিক্রম সৃষ্টি হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, বাক্যগঠন, শব্দ ব্যবহার এবং উচ্চারণে বিভেদ ঘোচালেই মানুষে মানুষে বাস্তব ভেদাভেদসমূহ দূর হয়ে যায়। সমাজে যে সকল বর্ণ, শ্রেণি, লিঙ্গ ও অন্যান্য প্রকার ভেদাভেদ রয়েছে, সেসব ভেদাভেদের শেকড় সমাজের গভীরে নিহিত। এ সকল ভেদাভেদের পেছনে কলকাঠি নাড়ে ইতিহাস, পরম্পরা, প্রথা, প্রচলন, শাস্ত্র, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক-সামাজিক তত্ত্ব ও দর্শন। এসব ইতিহাস, পরম্পরা, প্রথা, প্রচলন, শাস্ত্র এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক-সামাজিক তত্ত্ব ও দর্শন নির্মাণ ও বর্ণনার ভাষা, ভাষ্য, শব্দ, বাক্য ও বাগধারার একটি নির্দিষ্ট ছক থাকে। প্রতিষ্ঠাতার নিজের অবস্থান সুরক্ষিত করার জন্য সংগঠিত, অন্যদিকে বৈষম্য দূর করার জন্য পরিবর্তন ও মানবিক বিকল্পের প্রয়াসে যারা ভাষা, ভাষ্য, শব্দ, বাক্য, বাগধারা অথবা প্রবাদের আলোচনা-সমালোচনা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করায় ব্রত রয়েছেন, তারা যেন এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অথবা যদি তাদের কোনো সংগঠন থেকে থাকে, তবে সেটাও নিতান্ত দুর্বল।
সরল ও স্বাভাবিকভাবে দেখলে শিল্প-সাহিত্য দেশ, সমাজ, রাষ্ট্রের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং চলমান ঘটনারই প্রতিফলন। তাই সমাজে বিরাজমান ভেদাভেদ ও বৈষম্যের প্রতিফলন শিল্প-সাহিত্যে এসেছে। কিন্তু সবক্ষেত্রে সেসব প্রতিফলন যে, সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত ছিল তা নয়। ক্ষমতাশালী শ্রেণি-গোষ্ঠী, তাদের মত ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রচার ও প্রসারে যেমন ব্রতী হয়েছে, তেমন একইভাবে নানারকম লিখিত-অলিখিত সেন্সরশিপ আইনের প্রকাশ্য অথবা আড়ালে প্রয়োগ করার মাধ্যমে ক্ষমতার বাইরের শ্রেণি-গোষ্ঠীর প্রতিবাদী মানবিক ও নান্দনিক শিল্প-সাহিত্যকে দমন করেছে, নিশ্চিহ্ন করেছে অথবা নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছে নিষ্ঠুরভাবে। কোনো ভালো অথবা ন্যায্য কাজেও সমাজের ক্ষমতাধরদের রাগ-বিরাগ দেখা দিলে সেসব কাজ নিরুৎসাহিত করার উপায় নানাভাবেই উদ্ভাবিত হয়েছে, সুকৌশলে এসবের প্রয়োগ হয়েছে এবং হচ্ছে।
সুতরাং শিল্প-সাহিত্যে নারীর অংশগ্রহণ, নারীর ভাষা, ভাষ্য ও দৃষ্টিকোণ নির্মাণের পথে এক দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করা; এমনকি আত্মদানের অতীত ইতিহাস রয়েছে, যা কি-না সমকালীন সমাজেও চলমান রয়েছে। শিল্প-সাহিত্য শরীরী কোনো খেলা নয় যে, সেটার জন্য দুটো পৃথক মাঠ থাকবে, যেমন—পুরুষ ফুটবল-নারী ফুটবল বা পুরুষ হকি-নারী হকি। শিল্প-সাহিত্য বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ। নারী ও পুরুষের মাঝে বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতার বিভেদ রেখা টানার বিধান শাস্ত্রে উল্লেখ করে এই বিভেদ রেখাটাকে স্থায়ী করার চেষ্টা হয়েছে এবং সেই চেষ্টা চলমান রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, নারী ও পুরুষের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো বৈষম্য নেই। তাই যত চেষ্টাই করা হয়ে থাকুক না-কেন, শিল্প ও সাহিত্যচর্চার মাঠটাকে নারী-পুরুষে ভাগ করা যায়নি।
একজন শিল্পী অথবা সাহিত্যিককে প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থার বাস্তবতার সাথে লড়াই করেই নিজের স্থান করে নিতে হয়। আমরা বিষয়টা বুঝে নিতে পারি যে, কেন ইতিহাসে একজন পুরুষ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি পাওয়া যায়, কিন্তু একজন নারী মাইকেলেঞ্জেলো পাওয়া যায় নাই। প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাসে আমরা উল্লেখযোগ্য কোনো নারীশিল্পী অথবা সাহিত্যিকের নাম দেখতে পাই না। যদিও এসবকালে মৌখিক সাহিত্য রচিত হয়েছে, যা কি-না পরবর্তীতে নামহীন সাহিত্য হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এমনকি রেনেসাঁর যুগেও যখন শিল্প ও সাহিত্যের ব্যাপক জাগরণ ঘটেছিল, তখনও আমরা কি সে-রকম উল্লেখযোগ্য নারীশিল্পী অথবা সাহিত্যিকের নাম পাই? বস্তুত আধুনিক যুগে এসেই বহু লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নারীরা রচিত শিল্প-সাহিত্যে যেমন স্বমহিমা ও মর্যাদার স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে সে-রকম নিজের অসীম মানসিক শক্তি অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বল্প সংখ্যায় হলেও শিল্প ও সাহিত্যের জগতে শিল্পী অথবা লেখক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এসব কারণে নারীদের হৃদয়ের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মাত্রাটা অনেক সময়েই সমাজসচেতন ব্যক্তির কাছেও অননুধাবনযোগ্য হয়ে পড়ে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ভয়ার্ত শৈশব, অব্যক্ত কৈশোর, বৈষম্যের যৌবন, অতৃপ্তির দাম্পত্য, সামাজিক নিষ্পেষণ যে বিষয়বৈচিত্র্য, কোনোরকম রাখঢাক না করেই সেসব কাহিনির কতটা বাস্তবে উন্মোচন ও প্রকাশে সমাজ সাহসী হয়ে উঠবে? কিন্তু ইঞ্চি ইঞ্চি করে হলেও কুসংস্কারগুলো ঝেড়ে ফেলে সমাজ একটু একটু করে এগিয়েছে।
কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিল্প-সাহিত্যে নারীর অবয়বকে জন্মদাত্রী মায়ের অথবা যৌন আবেদনময়ী রমণীর বিভিন্ন প্রতীকী উপস্থাপন হয়েছে অনেকটা সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো করে। নারীকে শৃঙ্খলিত করার জন্য যেমন প্রতীক সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি নারীমুক্তির জন্যও প্রতীক রয়েছে। নারী নিজে কখনো প্রতীক হয়েছেন, নারীর পোশাকে প্রতীক ছড়িয়েছে, নারীকে অবমাননার জন্য প্রতীকের ব্যবহার হয়েছে। নারীর প্রতীকী উপস্থাপন শিল্পকলায়, সাহিত্যে, সভ্যতায় যেভাবে এসেছে, বাস্তবের নারী সেখান থেকে বহুদূরেই রয়ে গেছে। অথবা পুরো বিশ্বব্যবস্থা নারীকে প্রতীকী উপস্থাপনের মাধ্যমে বেঁধে ফেলতে চেয়েছে, নারী কেবলই সেই বাঁধন ছিঁড়ে বেরোবার জন্য নিরন্তর যুদ্ধ করে যাচ্ছে। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অজস্র প্রতীকের অচলায়তন ভেঙে এগিয়ে যাওয়াটাই নারী জীবনের প্রতিদিনের সংগ্রাম।
শিল্প-সাহিত্যে নারীর প্রবেশ ও অগ্রগতির পথে সমস্যার ব্যাপ্তি ও গভীরতা অনুধাবন করার জন্য নারীশিল্পী ও সাহিত্যিকদের শিল্প-সাহিত্য জগতে প্রারম্ভিক প্রবেশ করা, এগিয়ে আসা এবং অগ্রগতির বিষয়গুলো উল্লেখ করে, আমরা কিছুটা আলোচনা করতে পারি। সভ্যতার হাজার হাজার বছর পেরিয়ে গেছে যখন শিল্প-সাহিত্যচর্চায় একমাত্র পুরুষদেরই পদচারণা ছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপ যখন ধীরে ধীরে রেনেসাঁর দিকে গুটি গুটি পা বাড়াচ্ছিল, তখনও মাত্র অল্প কয়েকজন নারীশিল্পী অথবা সাহিত্যিক রেনেসাঁর প্রস্তুতি পর্বে ‘মর্ত্যরে ভগবান’ তথা পুরুষদের বাধা অতিক্রম করে নিজেদের প্রকাশ্যে নিয়ে আসার জন্য কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। এই সারিতে যে আটজন নারীর নাম উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা হয়ে থাকে, তারা হচ্ছেনÑ সোফোনিসবা এঙ্গুইসোলা, লেভিনা তিরলিঙ্ক, লাভিনিয়া ফনটানা, ক্যাথারিনা ভন হেমেসিন, এলিজাবেথ সিরানি, ক্লারা পিটার্স, জুডিথ লেইস্টার এবং আর্টমেসিয়া জেনটিলেসিন।
কিন্তু তারও অনেক পূর্বে সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীকালে পারস্য ও মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে সহস্রার্ধ মৌখিক গল্প মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে সম্রাট শাহরিয়ারের স্ত্রী শাহ্রজাদের কথাসাহিত্য হিসেবে। শাহ্রজাদের সৌভাগ্য যে, ইতিহাস তার নামটি মুছে বেনামী নামকরণ করেনি। পৃথিবীর কথাসাহিত্যের জগতে এ-রকম নানা বিষয়ভিত্তিক ১০০১টি গল্পের রচনা বিস্ময়কর, যেখানে প্রতিটি গল্পের শেষে সম্রাটের কাছে তার স্ত্রী শাহ্রজাদের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করার প্রার্থনা গৃহীত হওয়ার কথা যুক্ত রয়েছে। সিন্ধু সভ্যতায় গুহাচিত্র ও পাথরের ভাস্কর্যে নারী জন্মদাত্রী মাতা অথবা যৌন আবেদনময়ী বস্তু হিসেবেই চিত্রিত হয়েছে। বৈদিক পর্বে শাস্ত্রমতে, নারীর অবস্থান জন্মদাত্রী মাতার অবস্থান হিসেবে নারীকে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নির্দিষ্ট করে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, এই মর্যাদা লাভের কারণে নারী-পুরুষতন্ত্রের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত ছিল। বাস্তবে প্রাক-উপনিবেশবাদ আমল পর্যন্ত সিন্ধু ও ভারতীয় সভ্যতায় নারী, বংশ রক্ষাকারী মাতার বাইরে আর অন্য কোনো পরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠতে পারে নাই। চীন সভ্যতায়ও সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীতে তাং রাজত্বকালে নারীদের অবস্থানে স্বকীয়তা অর্জনের কিছু সুযোগ গ্রহণ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো নারীশিল্পী অথবা সাহিত্যিকের নাম পাওয়া যায় না। নারীদের নান্দনিক ক্ষুদ্র অঙ্কন ও সুচি শিল্পের নিদর্শন জাদুঘরে দেখতে পাওয়া যায়। বিশ্বসাহিত্যে প্রথম নারী কবি প্রাচীন গ্রিসের স্যাফো। ষষ্ঠ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে নব কবিদের একজন ছিলেন এই গীতিকবি। চর্যাপদকে বলা হয় বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন। চর্যাপদের পদকর্তাদের মধ্যে একজন নারী পদকর্তা ছিলেন বলে মত প্রকাশ করেছেন ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়। এই নারী পদকর্তার নাম কুক্কুরিপা। রজকিনীকে অনেকে চেনেন চণ্ডীদাসের প্রেমিকা হিসেবে। তাঁর আরেকটি পরিচয় আছে, তিনি একজন কবি। তিনি রামী ও রামমনি—এই দুই নামে কবিতা লিখতেন। তাঁর পদগুলোর নাম ছিল রামীর পদ। ঋগে¦দ-এ কয়েকজন নারী দার্শনিকের নাম পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে একজন লোপামুদ্রা। তিনি কৌষীতকি নামেও পরিচিত ছিলেন। ঋগে¦দে ২৭ জন নারী ঋষির রচিত সূক্তের উল্লেখ রয়েছে। ইতিহাসে এসব উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সংখ্যাবিচারে বলা যেতে পারে যে, বস্তুত আধুনিক যুগে এসেই নারীরা শিল্প-সাহিত্যে ধীর লয়ে প্রবেশ করার সুযোগ গ্রহণ করে, যখন শিল্প-সাহিত্যে নারীর ভাষা, ভাষ্য ও দৃষ্টিকোণ নির্মাণের বিবরণ পাওয়া যায়।
বাংলা ভাষায় প্রথম নারী কবি চন্দ্রাবতী। তাঁর রচিত রামায়ণে তিনি রামের পুরুষালি বাহুবলের পরিবর্তে সীতার বঞ্চনা ও পীড়নের বর্ণনাকে মাহাত্ম্য দিয়েছেন। বলা যায়, নারীকবি চন্দ্রাবতী বাংলা সাহিত্যে নারীর ভাষা, ভাষ্য এবং দৃষ্টিকোণ নির্মাণের সূচনা করেন। নারী লেখক রচিত প্রথম উপন্যাসের নাম মনোত্তমা। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৬৭ সালে নবপ্রবন্ধ পত্রিকায়। তবে এ উপন্যাসের লেখকের কোনো নাম জানা যায়নি। লেখক-নামের স্থলে কেবল লেখা ছিল ‘হিন্দুকুল-কামিনী প্রণীত’। আবার বাঙালি মুসলমান নারীদের মধ্যে প্রথম পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যগ্রন্থ রচনা করেন ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী। ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর বইয়ের নাম ছিল রূপজালাল। ওই বছরই ঠাকুর পরিবারের মেয়ে ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় বোন স্বর্ণকুমারী দেবী লেখেন উপন্যাস, ‘দীপ নির্বাণ’। এ ছাড়া পৃথিবীর প্রথম নারী ঔপন্যাসিক বলা হয়, জাপানি লেখিকা মুরাসাকি শিকিবুকে। তাঁর উপন্যাসের নাম গেঞ্জি, যার ইংরেজি অনুবাদ দ্য টেল অব গেঞ্জি। বাঙালি মুসলমান নারীদের মধ্যে প্রথম গদ্যরচনার কৃতিত্ব হলো তাহেরুন্নেসার। ১৮৬৫ সালে ‘বামাগণের রচনা’ নামে বামাবোধিনী পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল তাঁর গদ্য। বাঙালি মুসলমান নারীদের মধ্যে প্রথম ঔপন্যাসিক হলেন এস এফ খাতুন। ১৯২১ সালে লেখা তাঁর উপন্যাসের নাম জোবেদা।
নারী শিল্পী ও লেখকদের শিল্প ও সাহিত্য রচনার কাজে নিয়োজিত হওয়ার পথ কখনো মসৃণ ছিল না—এখনো নেই। অন্যদিকে নারী অথবা পুরুষ শিল্পী ও সাহিত্যিকদের দ্বারা নারীর সামাজিক সমস্যাগুলো চিত্রিত করার কাজেও বিস্তর বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এ সকল পরিস্থিতিতে নারীদের মধ্যে শিল্প-সাহিত্যে আধুনিক নারীর সংগ্রামের ভাষ্য ও রূপরেখা নিয়ে নানা মতভেদও দেখা যায়। প্রশ্ন উঠেছে, এসব মতভেদ শিল্প-সাহিত্যে নারীর অবস্থান সৃষ্টিতে নারী আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কি-না? তবে আমরা মনে করি, মতভেদ থাকবেই এবং এসব মতভেদ দ্বান্দ্বিক নিয়মেই দূরীভূত হয়ে একটি নতুন স্তরে উন্নীত হতে পারে।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, শিল্প ও সাহিত্যে নারীর সরব উপস্থিতি কামনা করে। অনুপ্রাণন আশা করে, শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যম দিয়ে নারীর ভাষা, ভাষ্য এবং দৃষ্টিকোণ ক্রমেই সমাজে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করার কাজে যেন অগ্রসর হতে পারে।
১০ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা
সম্পাদকীয়, নবম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা-
কবি ও কবিতার অনুপ্রাণন—
সূচনা লগ্ন থেকেই শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন, সাহিত্যের এই বিশেষ শাখা অর্থাৎ কবিতা বিভাগটির উপর বিশেষ যত্ন দিয়ে এসেছে। কেননা সাহিত্য রচনায় কবিতাই একমাত্র শাখা যেখানে কবির অন্তরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা অনুভূতিটি উপচে বের হয় কবিতায়। যেখানে কোনো প্লট-পরিকল্পনা বা পূর্বপ্রস্তুতির চিহ্ন খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। হতে পারে কবির সেই কথাগুলো নির্গত হয়েছিল কোনো অস্থির অথবা কোনো বেদনার অথবা কোন শান্ত-সমাহিত ধ্যানের মুহূর্তে। হৃদয় মথিত কোনো নান্দনিক অথবা কোনো মানবতবাদী ভাব সৃষ্টি ও রচনার গভীর অনুপ্রেরণায়। কিন্তু স্বতস্ফুর্তভাবে নির্গত শক্তিশালী কোনো অনুভূতি যে কোনো আকারে প্রকাশিত হলেই কী সেটা কবিতা হয়ে উঠতে পারে? কবিতা—সাহিত্য রচনাশৈলীর এমনই একটি বিশেষ ধারা যেখানে শব্দ ও ছন্দ পার¯পরিকভাবে ক্রিয়াশীল থাকতে দেখা যায়। কবিতায় শব্দগুলো একসাথে জুড়ে থেকে কোনো প্রকার উচ্চারণ, ধ্বনি, চিত্র অথবা চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে থাকে যা কি-না সরাসরি বর্ণনা করতে গেলে হতে পারে অনেক জটিল অথবা বিমূর্ত। কবিতা রচনায় প্রচ্ছন্ন থাকে ছন্দ ও মাত্রা অর্থাৎ অক্ষর অথবা শব্দাংশের সংখ্যার সম্মিলন অথবা বিন্যাস। কিন্তু, কবিতার এসব গঠন প্রক্রিয়া সবসময় সচেতনভাবে কতটুকু কবির মনে ঘটে থাকে, সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুমান করা কঠিন।
বাংলা ভাষার হাজার বছরের ইতিহাসে সাহিত্যের আরম্ভ অনেকটাই গীতিকবিতা দিয়েই। যেখানে উচ্চারণ ও ছন্দের মিলের সাথে যুক্ত ছিল সুর। বিষয়বস্তুতে গভীর ব্যক্তি অনুভূতির থেকে অগ্রাধিকার পেল সামাজিক-রাজনৈতিক কাহিনী। কেননা, তখন সমাজই ছিল সব, ব্যক্তির অস্তিত্ব একপ্রকার ছিল না বললেই চলে। তাই সেসব কাহিনীতে ছিল সমাজ ও রাজনীতি, ক্ষেত্রবিশেষে শাসকের গুনকীর্তন আবার ক্ষেত্রবিশেষে প্রথা-প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা, রোমান্টিক প্রেমের জনপ্রিয় আখ্যান, যৌনতা, অথবা বীরের শৌর্য-বীর্য, জন্ম-মৃত্যু, প্রেম অথবা বিবাহ।
চর্যাপদ দিয়েই বাংলা কবিতার গোড়াপত্তন। চর্যাপদ কতগুলো আশ্চর্য বিপরীতধর্মী কবিতার সমাহার। তাই চর্যাপদের আরেক নাম—চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয়। চর্যাপদে বর্ণিত সাধন তত্ত্ব, তৎকালীন বাংলার সমাজ জীবনের চিত্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশের অপরূপ বর্ণনা, সকলই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে প্রমাণিত ও গৃহীত। কিন্তু, চর্যাপদের ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধীতা, অভিজাতদের ধর্মদর্শন ও ধর্মানুষ্ঠানের প্রতি বিদ্রুপ উচ্চারণ ইত্যাদী’তে লোকায়তিক বৌদ্ধ ও জৈনরা যে সেই খ্রিস্টপূর্ব থেকেই ব্রাহ্মণ্য-বিধানকে অমান্য করে এসেছে, তারই কতক প্রতিচ্ছবি মেলে চর্যাপদের কোনো কোনো পদ্যে। বাঙালি জাতিসত্ত্বার মূলে রয়েছে—হিন্দু লৌকিক, বৌদ্ধ লৌকিক, ইসলাম লৌকিক; এরকম সকল লৌকিকগণ। এই লৌকিক অনভিজাত বা প্রাকৃত বাঙালিই হচ্ছে প্রকৃত বাঙালি। আঠারো শতক পর্যন্ত রচিত সাহিত্য এই প্রাকৃত বাঙালির উপভোগ্য ছিল। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য, বাংলায় রূপান্তরিত রামায়ণ-মহাভারত-ভগবত, বৈষ্ণব পদাবলি, চৈতন্যের জীবনী, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, ইত্যাদী সকল সাহিত্যের ক্ষেত্রেই একথা প্রযোজ্য। সে সময়ের লোকসাধারণের কবিরা এই ‘লৌকিক করিয়া’ ‘লৌকিকের মতে’, মূলধারায় কবিতা তথা সাহিত্য রচনা করতেন।
কিন্তু তারপর পরে একটি দীর্ঘ ছেদ। বাংলা সাহিত্যে কথিত অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে বড়ু চণ্ডীদাস নিয়ে আসেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। এ কাব্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়লীলাচ্ছলে জীবাত্মা-পরমাত্মা লীলা লীলায়িত হলেও মধ্যযুগের শুরুতে একাব্য অনবদ্য ভূমিকা রাখে। তবে মধ্যযুগ বিশেষভাবেই বিখ্যাত মঙ্গলকাব্যের জন্য। প্রায় পাঁচশ বছর ধরে বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন শ্রেণির মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছে। যদিও মঙ্গলকাব্যগুলোর রূপ প্রায় একই রকম। কতিপয় মঙ্গলকাব্যে কবিতার ভারী যাদু থাকলেও সবচেয়ে বেশি ছিল সমকালীন সামাজিক জীবনের বোধ ও পরিচয়। বাংলাদেশের মধ্যযুগের ইতিহাস জানতে হলে মঙ্গলকাব্য অবশ্যপাঠ্য। বৈষ্ণব পদাবলি আমাদের স্বপ্নে বিভোর করে। বৈষ্ণব পদাবলির পাত্র-পাত্রী কৃষ্ণ-রাধাকে কেন্দ্র করে যে কবিতাগুলো রচিত হয়েছিলো সেগুলো বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
রাজসভায় রচিত হলেও মধ্যযুগের সাহিত্য কেবল অভিজাতদের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেনি। মধ্যযুগে সামাজিক বৈষম্য প্রকট থাকলেও, পুরোহিত-মোল্লাদের দাপট থাকলেও, অভিজাত কর্তৃক উৎপীড়ন থাকলেও, সে যুগের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বাংলার প্রাকৃতজনেরই প্রাধান্য ছিল। যারা আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসবিদ, তাদের অনেকের মতে, মধ্যযুগের সর্বশেষ কবি হলেন ভারতচন্দ্র আর আধুনিক যুগের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন। মাঝখানে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত হলো ‘যুগসন্ধির কবি’।
মধ্যযুগের বিদায়ী দামামা বেজে ওঠে, যখন ১৭৫৭-তে আমরা স্বাধীনতা হারাই। বণিক শাসক হয়। অনেক পরিবর্তনের সাথে সাথে সাহিত্যের পরিবর্তন বা পতন ঘটে। ভারতচন্দ্রের রচনায় দেখা যায় পতনের ছাপ। বলা হয়ে থাকে ১৭৬০ থেকে ১৮৩০ এই সত্তর বছর বাংলা সাহিত্যের পতন ঘটেছিল। সে সময় কবিয়াল ও শায়েরদের উদ্ভবে এক নিম্নরুচি সম্পন্ন সাহিত্য রচিত হয়। অর্থাৎ, কবিগান। কবিগানকে গর্ব করার মতো সাহিত্য বলতে অনেকে নারাজ। কবিয়াল ও শায়েররা বিকিয়ে গেলেও কোনো কোনো কবিগান বা শায়েরি আজো বাংলার প্রাকৃতজনের মনে শেকড় গেড়ে আছে সেসবের অনবদ্য ছন্দ ও সুরের নান্দনিকতার কারণে।
বাংলা কবিতায় আধুনিকতা আনেন মাইকেল মধুসূদন। মহাকাব্য রচনা করে বাংলা কবিতার রূপ বদলে দেন। শুধু তাই নয় তিনি বাংলা পয়ারকে এক নতুন রূপে উপস্থাপন করেন। ব্যবহার ক্লান্ত ছন্দরীতিকে মধুসূদন করে তোলেন প্রবাহমান (অমিত্রাক্ষর)। এর আগে অবশ্য ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতায় আধুনিকতার হাল্কা আলোকচ্ছটা দেখা যায়। তবে মধুসূদন একাই এক ধাক্কায় বাংলা সাহিত্যকে অনেক এগিয়ে দিয়ে গেছেন। মধুসূদনের দেখাদেখি অনেকে (হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, কায়কোবাদ) মহাকাব্য রচনার চেষ্টা করেন। কিন্তু, শেষপর্যন্ত ওগুলো মহাকাব্য না হয়ে আখ্যানকাব্য হয়ে ওঠে।
বাংলা কবিতায় মহাকাব্যের ধুমধাম চলাকালে রোমান্টিকতা নিয়ে উঁকি দেন বিহারীলাল। বাংলা কবিতার তিনি-ই প্রথম রোমান্টিক ও খাঁটি আধুনিক কবি। রবীন্দ্রনাথ যাকে ‘ভোরের পাখি’ বলেছেন। আত্মভাবপ্রধান কবিতার জন্ম বিহারীলালের হাতে হলেও বিকাশ ঘটে রবীন্দ্রনাথের হাতে। অগ্নিকুণ্ডে পতঙ্গ পতনের মত বিহারীলাল চলে গেলেও তার কবিতার পথ ধরে আসে—সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, দেবেন্দ্রনাথ সেন, গোবিন্দচন্দ্র দাস, অক্ষয়কুমার বড়াল, ডিএল রায় ও রবীন্দ্রনাথ। প্রথম মহাযুদ্ধের মাধ্যমে বদলে যাওয়া ইউরোপীয় চেতনার প্রভাব পড়ে আমাদের জীবন ও সাহিত্যে। দু’দণ্ড দেরিতে হলেও সেই প্রভাব আমাদের কবিতায় এসে ভালভাবেই পড়ে। আধুনিক কবিতাগুলো বিশশতকের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হয়ে ওঠে।
বিশশতকের গোড়ার দিকে বাংলা কবিতায় রবীন্দ্র-যুগ চলাকালে রবীন্দ্রাগুনে পুড়েছেন অনেকেই। তবে রবীন্দ্র-বলয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টাও করেছেন অনেকে। তাদের মধ্যে মোহিতলাল, যতীন্দ্রনাথ বিশেষ করে কাজী নজরুল ইসলাম। যিনি একইসাথে প্রেম ও দ্রোহের কবি। তার কবিতায় যেমন বিদ্রোহ আছে তেমনি আছে কৈশোরিক প্রেমের কাতরতা। বিশ শতকের তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি সময়ে আধুনিক কবিতার রমরমা হাট বসে বাংলা সাহিত্যে। বাংলা কবিতায় বাঙালির প্রথাগত বিশ্বাস, সুন্দর, কল্যাণ, আবেগ, স্বপ্ন, সুখ-দুঃখ ও কাতরতা বিসর্জন দিয়ে আধুনিক কবিগণ নগরের কথা ও ক্লান্তি, অবিশ্বাস, নিরাশার কথা ফুটিয়ে তোলেন কবিতায়। কবিতায় পাল্টে যায় বাঙালির চেতনা। বুদ্ধদেব, জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু ও অমিয়, এই পাঁচজন কবিকে রবীন্দ্রনাথের পর আধুনিক কবিতা সৃষ্টিকারী বাংলা ভাষার প্রধান কবি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কিন্তু তারপর অচিরেই এই পঞ্চকবিকে অনুসরণ করে আসলেন সমর ও সুকান্ত।
সাহিত্যে রক্ষণশীলতা ও প্রগতিশীলতা মুখোমুখী দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় প্রায়শই। বিশ শতকের গোড়াতেই আধুনিক সাহিত্যকে অশালীন বলে গালিগালাজ করে প্রবন্ধ ও বই ছাপেন ঊনিশ শতকের বিভিন্ন রক্ষণশীলেরা। আসলে সাহিত্য কখনো অশালীন বা অশ্লীল হয় না। বিশেষ করে কবিতা। কবিতায় সব বলা যায় সব রকম ভাবে। এছাড়া অশ্লীল কথাটি আপেক্ষিক। শ্লীল-অশ্লীল নিয়ে বাগ-বিতণ্ডা না করে বরং সাহিত্যকে নিরপেক্ষ মন ও মননেই দেখা উচিত। ইতিহাস থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, যখনই রাষ্ট্রযন্ত্র বা শাসকশ্রেণি সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর শাসন-শোষণ, অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে তখনই যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখচ্ছবি, অর্থাৎ কবি-সাহিত্যিকরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন কবিতা অথবা নানা ধরনের গদ্য রচনার মাধ্যমে। যে সাহিত্যগুলো নানাভাবে বিভিন্ন আন্দোলনেও প্রেরণা জুগিয়েছে। ঊনবিংশ শতককে কখনো বলা যায় বাংলা গণসংগীতের স্ফুরণকাল। সেভাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও দেশ ভাগের পর পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন আন্দোলনের হাত ধরে রচিত হয়েছে বহু প্রতিবাদী সাহিত্য, কবিতা ও গণসংগীত। পাকিস্তানিরা প্রথম যখন আমাদের ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানলো, শুরু হলো আন্দোলন। মাহবুব উল আলম চৌধুরী লিখলেন একুশের প্রথম এবং অমর এক কবিতা—‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসীর দাবী নিয়ে এসেছি’। তবে একুশের প্রথম কবিতাটি ইতিহাস থেকে প্রায় হারিয়েই গেছে। অর্থাৎ, হানাদারদের বহু হয়রানি ও তল্লাশির দাপটে কবিতাটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারিসহ কবির বাসা কয়েকবার সার্চ করে লুকানো দু’একটি কপি পর্যন্ত নিয়ে যায় পুলিশ। পরবর্তীতে কবিতাটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে শহীদ আসাদের শার্ট নিয়ে লিখলেন শামসুর রাহমান, যা আন্দোলনকে বেগবান ও সফল করে তুললো। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রচিত হয়েছে বহু প্রতিবাদী ও প্রেরণাদীপ্ত কবিতা, সাহিত্য এবং গণসংগীত। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর নির্মলেন্দু গুণ সামরিক শাসনের কড়া পাহারার মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে (১৯৭৭) বীরদর্পে পড়ে শোনালেন তার অগ্নিঝরা কবিতা—
“সমবেত সকলের মত আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি
রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেই সব গোলাপের একটি গোলাপ
গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায়
শেখ মুজিবের কথা বলি।”
নির্মলেন্দু গুণ-ই প্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কবিতার বিষয় করে তুললেন। তারপর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখলেন জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামালসহ আরো অনেকে। অর্জুনের মত বীর সময় দোষে নপুংসক সাঁজলেও কবি কখনো তেমনটি হয় না বা হওয়া উচিত না। কবি হবে মজলুম, প্রয়োজনে নির্বাসিত। বলবে মানুষের (সংখ্যাগরিষ্ঠ) কথা, মানবতার কথা। রুদ্র পেলেন বাতাসে লাশের গন্ধ আর তসলিমা সব বয়স্কা বালিকাদের গোল্লা হতে ছুটে বেরুনোর আহ্বান জানালেন কবিতায়। তারপর ’৯০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত হয় কিছু প্রতিবাদী কবিতা ও গণসংগীত।
ইতিহাসের একটি বিশ্লেষণে প্রতিভাত হয় যে, ’৯০-এর দশকের পর থেকে কবিতার পাঠক সংখ্যায় যেন ভাটা পড়েছে। ইদানীং কবি দেখলেই বলাবলি শুরু হয়—কবিতার এখন আর দিন নেই, কবিতা এখন পাঠক খায় না, কবিতার বই বাজারে কাটে না ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে এখানেই ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে যে তথাপি কবির সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে বৈ কমছে না। বিশেষতঃ কবিতা প্রকাশ করতে এখন আর প্রকাশকের পেছনে লাইন দিতে হয় না। চাইলেই ফেসবুক ওয়ালে কবিতা ছুড়ে দেয়া যায়। হাইকোর্টের সামনে থেকে মূর্তি সরানো ও অন্যত্র স্থাপন নিয়ে এখনি সহস্র কবিতা ছুড়ে দেয়া যায়। এখন মিনিটে মিনিটে রচিত হচ্ছে কবিদের ভ্রুণের চেয়েও বেশি সংখ্যক কবিতা। প্রযুক্তির কল্যাণে কবি ও কবিতার পাঠক এখন একবারে মুখোমুখী দণ্ডায়মান। এটা ভাল। কিছুদিন পূর্বেও যেটা সম্ভব ছিল না খুব বেশি। শাসন-শোষণ, অত্যাচার-নির্যাতন বা আগ্রাসন কি এখন হচ্ছে না? তবে আমরা সে রকম কোনো কবিতা পাচ্ছি না—কিন্তু কেন?
আজকাল কবিতার বিষয় কী কী, সেটা কিন্তু আমরা হাতের মুঠোয়-ই দেখতে পাচ্ছি। আমরা আজ যা হাতের মুঠোয় দেখতে পাচ্ছি তা যদি নজরুল আগেই বলে যেতে পারেন তার কবিতায়, তাহলে কী আমাদের এখনকার কবিগণ আগামী বিশ্ব সম্পর্কে ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাদের কবিতায়, অথবা এর চেয়েও পরবর্তী কিছু। আজকাল কবিতায় নারীকে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, বিদ্যমান প্রাকৃতিক পরিবেশের চিত্র কবিতায় কতোটা স্থান পাচ্ছে নিশ্চয়ই চর্যাপদে বর্ণিত বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর এখনকার সৌন্দর্য এক হবে না। মঙ্গলকাব্য পড়ে যদি বাংলাদেশের মধ্যযুগের সামাজিক অবস্থা (ইতিহাস) জানা যায়, তবে আমাদের আজকের কবিদের কবিতা বা সাহিত্যে সমকালীন পঁচনশীল পুঁজিবাদের ভোগসর্বস্ব কায়েমী স্বার্থবাদী ও পাশাপাশি আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তি মানসিকতার যে সমকালীন সমাজ বাস্তবতা, সেই সমাজ বাস্তবতার ঠাঁই পাওয়াটাই স্বাভাবিক।
বাঙালির জমিতে কলের লাঙল পড়েছে, ছনের চাল হয়েছে টিনের এবং সেই চালে বসেছে কাক, শাদা কাক। মোড় নিচ্ছে আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা। নেওয়াটাই হয়তো স্বাভাবিক। সময়কে তো আর অস্বীকার করা যায় না। কালে কালে মহাকাল অবধি কবিগণই মানুষের সমস্ত অনুভূতি কে বাঁচিয়ে রাখে। কবিদের গর্ভেই বাঁচে মানুষ। আমাদের এই কবিসকল কি পারবেন মানুষের মানবিক অনুভূতিগুলোকে কবিতায় বন্দি করে মহাকাল অবধি দীর্ঘজীবন দিতে নাকি ফেসবুক বা প্রযুক্তি নামক কালের গর্ভে হারিয়ে যাবেন কাক ও কাল যত কিছুকেই আমরা আপন করে নিই না কেন? তাতে কোনো দোষ নেই, তবে লৌকিক বাংলার গভীর মানবিক চেতনার স্বকীয়তা কতটুকু বজায় থাকছে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যে বাংলা সাহিত্যের দেবী চিরকাল কাব্যজীবি, কবিতার স্বাদ ছাড়া সে বাঁচবে কী করে। আমরা কি কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি?
নবম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা
সম্পাদকীয়, কুহক মাহমুদ স্মৃতি সংখ্যা। অনুপ্রাণন- অষ্টম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা-
অনুপ্রাণন ও কুহকের কথা
কুহকের কথা বলতে গেলে অনুপ্রাণনের কথা আসবেই। কেননা, কুহক অর্থাৎ কুহক মাহমুদ, শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর সাথে ২০১২ সালে জন্মলগ্ন থেকেই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন ৫টি বছর। কুহকের সাথে আমার পরিচয় সরসিজ আলীমের মাধ্যমে। কবি সরসিজ আলীম তখন ‘ভনে যাহা ভনে’ শিরোনামে একটা ট্যাবলয়েড সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করতেন। ফেসবুকের মাধ্যমেই কবি সরসিজ আলীমের সাথে আমার পরিচয়।
এই পরিচয়ের কিছুদিন পূর্বে হোসনে আরা বেগম নামে একজন মধ্যবয়সী মহিলা ফেসবুকে আমাকে নক করেন। তিনি তখন ফেসবুকে ‘ফেসবুক বইমেলা ২০১২’ নামে একটা গ্রুপের এডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে বই প্রকাশ এবং সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। এক বিকেলে আমরা ছবির হাটে মিলিত হই, যেখানে উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন তরুণ কবি-সাহিত্যিক। তারা হলেনÑ রেজওয়ান তানিম, স্থপতি রাজীব চৌধুরী, কবি সুমি সিকানদার, ফেসবুকের মানবিক গ্রুপের অঞ্জন, ইহতিশাম আহমাদ টিংকু এবং আরো দুই-একজন হবে যাদের নাম এই মুহূর্তে আমার ঠিক মনে পড়ছে না। পরে এই বৈঠকগুলো পাবলিক লাইব্রেরির ক্যান্টিনের সামনের বাঁধানো উঠোনে অথবা কখনো কখনো হোসনে আরা বেগমের শ্যামলীর বাসায়ও অনুষ্ঠিত হতো। এই আলোচনা বৈঠকগুলোর মধ্য দিয়েই প্রথমে আমরা পাবলিক লাইব্রেরির সেমিনার-কক্ষে একটি ‘নবীন লেখক সমাবেশ অনুষ্ঠান’ করার সিদ্ধান্তে উপনীত হই। এই পর্যায়ে কবি সরসিজ আলীমও এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হয়। সমাবেশ অনুষ্ঠানের পর প্রথম বৈঠকে যখন একটি ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত হয় এবং যখন পত্রিকার জন্য একটি নাম ও একটি সম্পাদনা পরিষদ গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়, তখন কবি সুমি সিকানদার পত্রিকাটির নাম ‘অনুপ্রাণন’ করার প্রস্তাব আনেন, যে প্রস্তাবটি সংখ্যাগরিষ্ঠ উদ্যোক্তাদের সমর্থন লাভ করায় গৃহীত হয়। ওই বৈঠকগুলোতে পত্রিকার সম্পাদনা পরিষদ গঠন নিয়ে আলোচনা হলে সর্বসম্মতিতে আমার নাম প্রকাশক, হোসনে আরা বেগম সম্পাদক, কবি সরসিজ আলীম নির্বাহী সম্পাদক এবং সহ-সম্পাদক হিসেবে রেজওয়ান তানিম, রাজীব চৌধুরী, সুমি সিকান্দার, ইহতিশাম আহমাদ টিংকুসহ আরো দুই-একজনের নাম প্রস্তাব হয়। এই প্রস্তাব গৃহীত হলে ঠিক করা হয় যে, সম্পাদক ও সম্পাদনা পরিষদের সদস্যরা পত্রিকার কাজে অভিজ্ঞ আরো দুই-একজন ব্যক্তি যুক্ত করে সম্পাদনা পরিষদ সম্প্রসারিত করতে পারবেন।
এর কিছুদিন পর যখন হোসনে আরা বেগমের বাসায় সম্পাদনা পরিষদের প্রথম সভা হয়, তখন সেই সভায় কবি কুহক মাহমুদ ‘অগ্রদূত’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার মনি মোহাম্মদ এবং তাহমিদের নাম যুক্ত হয়। ওই সভায় কবি কুহক মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। ওই সভাতেই কবি কুহক মাহমুদের সাথে আমার পরিচয়। সেই সভায় লেখা সংগ্রহসহ পত্রিকা বের করার যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তসমূহ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই সূচনা সংখ্যার লেখা বাছাই এবং অনুপ্রাণনে অন্যান্য বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপের সদস্যদের যুক্ত করা নিয়ে কবি সরসিজ আলীম এবং হোসনে আরা বেগমের মধ্যে তুমুল বিতর্ক হয় এবং সেই বিতর্ক এমন তিক্ততার পর্যায়ে উপনীত হয় যে, সূচনা সংখ্যাটির কাজ যখন প্রেসে চলছিল, ঠিক তখন হোসনে আরা বেগম পত্রিকার সম্পাদক পদ থেকে এবং রাজীব চৌধুরী, সুমি সিকানদারসহ আরো দুই-একজন অনুপ্রাণন ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পরিস্থিতিতে পত্রিকাটিতে আমার নাম প্রকাশক ও সম্পাদক, সরসিজ আলীমের নাম নির্বাহী সম্পাদক এবং সহ-সম্পাদক হিসেবে শুধুমাত্র রেজওয়ান তানিম, কুহক মাহমুদ, মনি মোহাম্মদ ও তামজিদের নাম যুক্ত করে শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন পত্রিকার সূচনা সংখ্যা নভেম্বর ২০১২-এ প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে কুহক মাহমুদ অনুপ্রাণন পত্রিকাটির সাথে পাঁচ বছর যুক্ত ছিলেন। এই পাঁচটি বছরে কুহকের সাথে অনুপ্রাণনের মিথস্ক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ এই সম্পাদকীয়’র পরিসরে দেয়া সম্ভব না।
শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন একটি অবাণিজ্যিক পত্রিকা। এই অবাণিজ্যিক কথাটির অর্থ বারবার ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন দেখা যায়। যেহেতু মনে করা হয়, পত্রিকাটি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি সচেতন থেকে স্বাধীন ও মুক্ত মতামতের চর্চা ও প্রকাশ করবে, অর্থাৎ পত্রিকাটি আর্থিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দল অথবা কোনো সামাজিক সংগঠন অথবা দেশের সরকার অথবা করপোরেট মহলের পৃষ্ঠপোষকতার প্রত্যাশা করবে না। অতএব পত্রিকার পাঠকের কাছে সামান্য যে বিনিময়-মূল্য পত্রিকাটি গ্রহণ করবে, তা দিয়েই পত্রিকাটির যাবতীয় প্রকাশনা খরচ চালানো হবে।
যে কারণে অনুপ্রাণনের সাথে যুক্ত সবাইকে মোটামুটি স্বেচ্ছাশ্রম অথবা সামান্য কিছু সম্মানীর টাকায় চলতে হতো। ২৮ আগস্ট ২০১৯ তারিখে তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে অর্থাৎ ৬ আগট ফেসবুকে তাঁর সর্বশেষ পোস্টে অনুপ্রাণনের প্রাথমিক পর্যায়ের অর্থসংকটকালে কবি কুহকের সেই কৃচ্ছ্রসাধন ও কষ্টের কথাই বর্ণনা করেছিলেনÑ
“বাজেট ১০০ টাকা। বাসা থেকে বাসে গুলিস্তান ১০ টাকা। সেখান থেকে বাসে কাঁটাবন। শাহবাগ আসলেই জ্যাম। কোনোদিন হেঁটে বা প্রচণ্ড খিদায় নেমে পড়তাম বাস থেকে। হোটেলে প্রবেশ করে করুণ চোখে দু’টি পরোটা আর ডাল দিয়ে নাশতা করে হাঁটতাম। তারপর অফিস। কাজ। দুইটা না বাজতেই খিদা! সস্তাদরের হোটেলে ২৫ টাকার ভাত-ডিম বা মাছ, ডাল নেই। চলে যেত খাবার। কতদিন ১০ টাকা বেশি দিয়ে সবজি বা অন্য তরকারি নিতে পারিনি! আবার অফিস। কাজ। এই করেই সন্ধ্যা।
পুরি-চা ১০ টাকা। আবার কাজ। ৬০ টাকা শেষ। অফিস শেষ করে হাঁটতাম। ভার্সিটির মাঝ দিয়ে গুলিস্তান। বাসের লাইনের অপেক্ষা। কোনোদিন ৫ টাকার বাদাম। তারপর বাসা। ফিরতে ফিরতে রাত ১০টা। মেয়ে অপেক্ষা করত খাবার নিয়ে। ছেলে-মা অন্য বাড়ি থাকত। মেন্যু বেশিরভাগ ডিম ভাজা, ডাল। পেট পুরে খেতাম। আহ! কি সব দিন গিয়েছে। আনন্দ বেদনার। স্মৃতি কাঁদায়। (৬ আগস্ট, ২০১৯)”
সে সময়ে পত্রিকার কাজ করার পাশাপাশি কবি কুহক মাহমুদ অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে “গোধূলির প্রস্থানে জ্বালাও পূর্ণিমা (ফেব্রুয়ারি ২০১৪)” এবং “না-মানুষ (নভেম্বর ২০১৪)” শিরোনামে দু’টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই বই দুইটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এই সংখ্যার স্মৃতিচারণ বিভাগে প্রকাশিত হয়েছে। বলতে গেলে কবি কুহক মাহমুদ অনুপ্রাণনের সাথে যুক্ত হওয়ার পূর্ব থেকেই যকৃতের সংক্রমণজনিত রোগে আক্রান্ত ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও রোগের চিকিৎসা করা দূরে থাক, শরীরের প্রতি যতœ নেয়া দূরে থাক, তাঁর চলমান জীবন যাপন পদ্ধতি তাঁর শরীরের ক্ষতিই বৃদ্ধি করেছে। এসব ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার জন্য বারবার বলা সত্ত্বেও কবি কুহক মাহমুদ কারো কথারই কর্ণপাত করেনি। যার ফলে যথাযথ চিকিৎসা ও সেবার অভাবে তাঁর শরীরের অবস্থা দিনে দিনে অবনতি হতে থাকে। অসুস্থতার জন্য গত প্রায় দু’বছর কুহক আর সময় দিতে পারেনি অনুপ্রাণনকে। বলেছিলাম, না-মানুষের ২য় খ- লিখে দেন প্রকাশ করি। বলল, পারবো না। এই শরীরে কুলায় না।
কুহক মাহমুদের অকাল মৃত্যুতে আমরা শোকগ্রস্ত। অনুপ্রাণন-এর সাথে যুক্ত সকলের পক্ষ থেকে কুহকের বিদেহি আত্মার শান্তি কামনা করি। তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে “কুহক মাহমুদ স্মৃতি সংখ্যা” হিসেবে নিবেদন করি শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ৮ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যাটি।
অষ্টম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা – সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা, প্রথম পর্ব- সম্পাদকীয়-
গত কয়েকবছর ধরে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিক এবং তাদের রচিত কবিতা ও গল্প নিয়ে আলোচনার চর্চা বিস্তৃত করে চলেছে। ২০২২ এ বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ কবি (যাদের জন্ম : ১৯১১ – ১৯৬৫), ২০২৩ এ বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার (যাদের জন্ম : ১৮৯৫ – ১৯৬৫) এবং ২০২৪ এ বাংলাদেশের নির্বাচিত সাম্প্রতিকের ১০০ কবি (যাদের জন্ম : ১৯৬৫ – ১৯৮৫); এসকল কবি ও গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা বিষয়ে তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলার পাশাপাশি তাদের উল্লেখযোগ্য কবিতা অথবা গল্প এবং তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা সংকলিত করে প্রকাশ করার মাধ্যমে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কবি ও গল্পকারদের পরিচিতি এবং তাদের রচিত সাহিত্য সম্পর্কে সামষ্টিক আলোচনা সমূহ দেশের সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করে যাচ্ছে। আমরা মনে করি এভাবে বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিকদের মূল্যায়ণ করার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করার মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশের সাহিত্যের পরিচিতির ক্ষেত্রটি বিস্তার লাভ করতে পারে।
এই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ এ এসে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন বাংলাদেশের সাম্প্রতিকের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার যাদের জন্ম ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫ এর মধ্যে হয়েছে, তাদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা বিষয়ে তথ্যের পাশাপাশি তাদের উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের রচিত গল্পসাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা সংকলিত করার কাজ হাতে নিয়েছে।
এই সংখ্যায় প্রকাশিত হলো আলোচকদের থেকে লেখা প্রাপ্তির ভিত্তিতে গল্পকারদের বয়সানুক্রমে নির্বাচিত ১০০ জন সাম্প্রতিকের গল্পকারের মধ্যে থেকে ২৫ জন গল্পকারের জীবিনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য গল্প ও রচিত গল্পসাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা।
বিগত তিন বছর অর্থাৎ ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ এ যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আমরা বাংলাদেশের ১০০ কবি ও গল্পকার নির্বাচিত করেছি বাংলাদেশের নির্বাচিত সাম্প্রতিকের গল্পকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা মোটামুটি একই নির্ণায়ক মানদণ্ড অনুসরণ করেছি।
প্রথমত আমরা বিবেচনা করেছি আধুনিক বাংলা ভাষায় চর্চাকারী সাম্প্রতিকের গল্পকার যারা ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জন্ম লাভ করেছেন অথবা যিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময়ই বাংলাদেশে বসবাস করেছেন অথবা যার প্রকাশনা ও পাঠকের মূল অংশটি ভৌগলিক ভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। দ্বিতীয়ত আমরা বিবেচনা করেছি যে গল্পকারের গল্পে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অবিভক্ত বাংলা সাহিত্যের সাধারণ ঐতিহ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জনগণের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সমাজ-বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে। তৃতীয়ত যে গল্পকারের এক বা একাধিক গল্প বাঙালি পাঠক মহলের বড় অংশে উল্লেখিত ও সমাদৃত হয়েছে। চতুর্থত আমরা মনে করি শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো জাতি তথা মানবজাতির সাধারণ ও উন্মুক্ত অধিকারের বিষয়। কোনো সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো বিবেচিত না হওয়াই কাম্য। কিন্তু তারপরও কতগুলো বিষয় থেকে যায় যেগুলো নিয়ে আপস করা কঠিন। আর তাছাড়া প্রজন্মকে কিছু বার্তা দেওয়া প্রয়োজন, যে বার্তা, বক্তব্য অথবা কর্ম, সমাজে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কারা বাঙালীর স্বাধীনতার পক্ষে ছিল আর কারা বিপক্ষে ছিল? যুদ্ধকালীন পক্ষ-বিপক্ষের প্রশ্নটি মানবতার পক্ষে অথবা বিপক্ষে থাকার মতোই একটি প্রশ্ন। যখন জাতীয় বিদ্বেষপ্রসূত হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা নিয়ে জেনোসাইড চলে তখন পক্ষের বিষয়টা শুধু রাজনৈতিক থাকে না, মানবিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই যখন কোনো শিল্পী বা সাহিত্যিক এরকম সঙ্কটপূর্ণ সময়ে বা পরবর্তী সময়ে মানবতার পক্ষে না গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী যুদ্ধাপরাধীদের সাথে যুক্ত হয়ে থাকেন তাহলে সেটাকে নিছক ব্যক্তিগত বিষয় বলে গণ্য করা কঠিন হয়ে যায়। আর এই গণ্য করতে না পারার বিষয়টি অনুপ্রাণনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
একজন সাহিত্যিকও তার চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন নিয়ে আসেন কখনো সচেতনভাবে অথবা কখনো অবচেতনভাবেই। বাংলাদেশের সাম্প্রতিকের গল্পকারদের গল্পে পূর্বসুরীদের গল্পে নারী-পুরুষের প্রেম, পরকীয়া, বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের মনস্তত্ত্ব যেমন অনেকটা গ্রামীণ ছিলো, সেটা আর থাকেনি। চরিত্রের বাইরের চরিত্র অর্থাৎ পরিবার ও সমাজের সাথে যুক্ততা থেকে মুক্ত হতে কোন কোন সাম্প্রতিকের গল্পকার সফল হয়েছেন। তাই দেখা যায় প্রেম, পরকীয়া ও বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে কেউ না কেউ নাক গলানোর বিষয়টা পূর্বের মতো আর শক্তিশালী থাকেনি। আমরা এখন চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে ডিজিটাল বিষয়গুলোর উত্তরণ ঘটছে, ঘটছে জীবন-যাপনের চালচিত্র। মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে যেমন মানুষ সোচ্চার হচ্ছে তার পাশাপাশি ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রগুলোতে মানুষের অবস্থান দৃঢ়তর হতে দেখা যাচ্ছে। গ্রামের রূপান্তর কাহিনী হোক অথবা শহর থেকে নগরায়ণের দিকে উত্তরণের কাহিনী হোক প্রায় সকল ক্ষেত্রেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও পরিবার থাকলেও সাম্প্রতিকের গল্পকারদের মধ্যে ক্রমেই কাহিনী যতটা না পারিবারিক অথবা সামাজিক তার থেকে ব্যক্তিকে নিয়েই চর্চা বেশি হয়ে ওঠার প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে। গল্পের চরিত্রগুলোকে দেবতাতুল্য অথবা উল্টোদিকে শয়তানতুল্য করে অবাস্তব কাল্পনিক চরিত্র করে গড়ে তোলার ধারা থেকে বেরিয়ে এসে সাম্প্রতিকের গল্পকাররেরা কখনও বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বহুমাত্রিক ও বহুরৈখিক অথবা স্বপ্ন, অবাস্তব মানসিক চিত্র বা কাল্পনিকভাবে সৃষ্ট যা কিনা কোনো বাস্তবতার একটি রূপ হতে পারে অথবা সম্পূর্ণ কাল্পনিক ফ্যন্টাসি চরিত্র নির্মানে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিকের গল্পকারদের গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আলোচকরা এসব বিষয়কে আরো বিস্তৃতভাবে মূল্যায়ণ করেছেন।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 2; Contemporary Stories & Storytellers (Part-1)
অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা— গল্পকার ও গল্প সংখ্যা— তৃতীয় পর্ব— সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার ও তাদের উল্লেখযোগ্য গল্প নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষের যাত্রার তৃতীয় পর্বে প্রকাশিত হলো আরও ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা; তাদের রচিত গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা এবং একটি করে নির্বাচিত গল্প (আলোচকের পছন্দে)। সংখ্যাটিতে গল্পকারদের নিয়ে রচনাগুলোর অনুক্রম নির্ধারিত আলোচকদের থেকে লেখা প্রাপ্তির ভিত্তিতে বয়সানুক্রমে প্রস্তুত করা হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার ও তাদের লেখা গল্প নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন বিশেষ সংখ্যাগুলো প্রকাশের এই উদ্যোগের পদ্ধতিগত ন্যায্যতার প্রশ্ন নিয়ে গল্পকার ও গল্পসংখ্যার পূর্ববর্তী পর্ব দুটোয় সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। তবে সংখ্যাটি ১০০ কেন? ৯৯ বা ১০১ অথবা অন্য কোনো সংখ্যা কেন নয়? এটা নিয়ে দু’একজন প্রশ্ন রেখেছেন। গণনা অথবা পরিমাপ করার জন্য যে গাণিতিক বস্তু ব্যবহার করা হয়ে থাকে; সেটাকেই আমরা সংখ্যা বলি। সংখ্যা একটি বিমূর্ত ধারণা। কিন্তু সময় ও বস্তুর সাথে যুক্ত হয়ে এটি একেকটি বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করে থাকে। ইতিহাসযাত্রার মাইলফলক হিসেবে দুই বছর আগে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বর্ষপূর্তি অর্থাৎ সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছি। স্বাধীনতার এই পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপাদানগুলোতে যে বিবর্তন হয়েছে সেই বিবর্তনের ধারণা নেওয়ার জন্য একটি কোয়ান্টাম সময় অথবা বিবর্তনের সাথে জড়িত প্রতিনিধিদের একটা কোয়ান্টাম সংখ্যা নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের গল্প-সাহিত্যে চলমান বিবর্তনের ব্যাপ্তি, গভীরতা ও শ্রেণিভুক্ত সকল প্রকাশের অঙ্গ, ধারা ও উপাদান তুলে ধরার প্রয়োজন মেটানোর জন্য বহুল ব্যবহৃত একটা উপযুক্ত সংখ্যা বেছে নেওয়া যুক্তিযুক্ত ছিল বলেই আমাদের মনে হয়েছে। বিজ্ঞানসম্মত মেট্রিক ধারণায় ০.০১, ০.১, ১, ১০, ১০০ বহুল ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ সকল সংখ্যা। বিজ্ঞানের ধারাতেই শতকরা হিসাবে, বছর হিসাবে, জমির মাপে অথবা প্রতিনিধি নির্বাচনের সংখ্যায়— শতক সংখ্যাটি চলেই আসে। ১ সর্বদাই অবিভাজ্য ঐক্যের প্রতীক, সাথে মেট্রিক ধারণায় শূন্য সংখ্যাটি ১-এর সামনে অথবা পেছনে অবস্থান নিয়ে একের গুণিতককে নির্দেশিত করেছে। একের গুণিতক সংখ্যাই বাস্তবতাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। তবে বলে রাখা ভালো, সংখ্যাতত্ত্বের উপর ভর করে কোনো কুসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাসের সাথে এই সব ভাব বা বস্তুনিরপেক্ষ জ্যামিতিক মেট্রিক সংখ্যাগুলোর কার্যত কোনো সম্পর্ক নাই। অনুপ্রাণন কর্তৃক নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে নারীর সংখ্যা মাত্র উনিশজন। নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে গল্পকার নির্বাচনের একটি শর্ত ছিল জন্মসাল। নির্বাচিত গল্পকারের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম হচ্ছেন শামসুদ্দীন আবুল কালাম, যিনি ১৮৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কনিষ্ঠতম হচ্ছেন তারা যাদের জন্মসাল ১৯৬৫। সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য একবিংশ শতাব্দীতে এসে নিম্নগামী হয়েছে কিন্তু হ্রাসের গতির পেছনে বিংশ শতাব্দীতে নারী সাহিত্যচর্চাকারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। অনুপ্রাণনের গল্পকার ও গল্প সংখ্যাগুলোতে নির্বাচিত নারী গল্পকারদের গল্পসমূহ নিয়ে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে এই ধারণা স্পষ্ট হয়। স্মর্তব্য যে, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে সংখ্যাগত পার্থক্য শুধু বাংলার নয়— কম-বেশি সারা বিশ্বের। অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পে প্রবণতা হিসেবে রোমান্টিকতা ও নান্দনিকতার দিকে দৃষ্টি দেওয়ার তুলনায় সামাজিক বাস্তবতা অর্থাৎ পারিবারিক-সামাজিক, রাজনীতি-অর্থনীতির স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব ও সংকটের বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। গ্রাম ও শহর পৃথক পৃথকভাবে অথবা মিশ্রভাবেও এসেছে। গ্রাম-শহরের বিবর্তন ও রূপান্তরের ফলে সৃষ্ট ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, উৎপাদন অথবা কর্মস্থলের সমস্যা ও সংকটসমূহ চিত্রিত হয়েছে। পরিবর্তন কীভাবে যাপিত জীবনে মানসিক ও পারিপার্শ্বিক প্রতিক্রিয়া ঘটিয়েছে এসব মনস্তাত্ত্বিক বিষয় বিশ্লেষণ বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পে এসেছে নিখুঁতভাবে। মানুষের চিন্তাধারা কখনো এক জায়গায় থেমে থাকে না। একজন সাহিত্যিকও তার চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন নিয়ে আসেন কখনো সচেতনভাবে অথবা কখনো অবচেতনভাবেই। বাংলাদেশের সাহিত্যে নারী-পুরুষের প্রেম, পরকীয়া, বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের মনস্তত্ত্ব যেন এখনো অনেকটা গ্রামীণ। চরিত্রের বাইরের চরিত্র অর্থাৎ পরিবার ও সমাজের সাথে যুক্ততা থেকে মুক্ত হতে পারছে না। তাই দেখা যায় প্রেম, পরকীয়া ও বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে কেউ না কেউ নাক গলিয়েই যাচ্ছেন। আমরা এখন চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে ডিজিটাল বিষয়গুলোর উত্তরণ ঘটছে, ঘটছে জীবন-যাপনের চালচিত্র। মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে যেমন মানুষ সোচ্চার হচ্ছে তার পাশাপাশি ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রগুলোতে মানুষের অবস্থান দৃঢ়তর হতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু, বিশেষ করে ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পে সমাজই গুরুত্ব পেয়েছে বেশি।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা - গল্পকার ও গল্প সংখ্যাঃ তৃতীয় পর্ব
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণনের একাদশ বর্ষের ৪টি সংখ্যায় বাংলাদেশের ১০০জন নির্বাচিত কবি ও তাদের কবিতা নিয়ে আলোচনার তৃতীয় পর্বে এসে এই সংখ্যায় ২৩জন কবি ও তাদের কবিতা নিয়ে আলোচনা সমুহ সংকলিত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিকের একাদশ বর্ষ অর্থাৎ এ-বছরের প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যায় বাংলাদেশের ১০০জন নির্বাচিত কবি তালিকা থেকে প্রতিটি সংখ্যায় ২৭জন করে মোট ৫৪জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, প্রাপ্ত সম্মাননা ও পুরষ্কার, উল্লেখযোগ্য কবিতা এবং কবিতা নিয়ে বিশেষ আলোচনা ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় এই সংখ্যায় অর্থাৎ ৩য় পর্বে ২৩ জন এবং পরবর্তী ৪র্থ পর্বে আরো ২৩ জন কবি ও কবিতা নিয়ে মোট ১০০ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরষ্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য কবিতা এবং কবিতা নিয়ে আলোচনা সংকলন সম্পন্ন হবে বলে আশা রাখছি।
বাংলাদেশের কবি ও তাদের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা দেখি যে, বাংলা সাহিত্যে বাংলাদেশের কবিদের অপরিসীম ভূমিকা ও অবদান রয়েছে। সাহিত্যমান বিবেচনায় তুলনামূলকভাবে কবিতাগুলো যে অত্যন্ত উচ্চস্থান দখল করে আছে, এটা নিঃসন্দেহেই বলা যায়। একদিকে নান্দনিক বিবেচনায় কবিতাগুলো যেমন উত্তীর্ণ, অন্যদিকে ঠিক তেমনই চলমান সমাজ, রাজনীতি, শোসিত মানুষের সংগ্রাম, জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম ও মানবিক চেতনায় উদ্ভাসিত কবিতামালা গণমানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। বাংলাদেশের কবিদের মূল বিষয় হিসেবে বাঙলার প্রকৃতি, মানবতা, মানব প্রেম, মাতৃস্নেহ, পিতৃস্নেহ, ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক সম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় ও সামাজিক মৌলবাদ বিরোধিতা, নারীবাদ ইত্যাদী বিষয়গুলো যেমন এসেছে ঠিক তেমনই পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে মানব-মানবীর প্রেম, বিরহ অথবা ব্যক্তি পরিচয়, আত্মানুসন্ধান, আত্মজিজ্ঞাসামূলক দার্শনিক বিষয়গুলো। ব্যক্তি, সমাজ ও দেশ কোনটাই অবহেলিত থাকেনি। জয়-পরাজয়, আশা-হতাশা, সংগ্রাম, সংক্ষুব্ধতা অথবা আপসকামিতা ছাড়িয়ে তাদের কবিতা হয়েছে মূলত জীবনধর্মী। তাই বাংলাদেশের কবিদের কবিতায় বহুলাংশে প্রকৃতি, প্রেম ও জীবনের অপার সৌন্দর্য সবসময় উঁচুতে তুলে ধরতে দেখা গেছে।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, একাদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা : সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা তৃতীয় পর্ব- সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিক কালের ১০০ গল্পকারকে নিয়ে চতুর্দশ বর্ষের বিশেষ আয়োজনের পারম্পরিক ধারাবাহিকতার তৃতীয় পর্বে এসে আরও ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে প্রকাশিত হলো সাম্প্রতিকের (জন্ম : ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫) গল্প ও গল্পকার সংখ্যা, তৃতীয় পর্ব। সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার ১ম ও ২য় পর্বের মতো এই পর্ব অর্থাৎ ৩য় পর্বে ২৫ জন গল্পকারের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা প্রকাশের মাধ্যমে নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে এ-পর্যন্ত মোট ৭৫ জন গল্পকারকে নিয়ে তথ্য ও আলোচনাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ প্রকাশের কাজ সম্পন্ন হলো। অবশিষ্ট ২৫ জন গল্পকারদের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা আগামী চতুর্থ পর্বে প্রকাশিত হবে বলে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব নির্মাণের মূল উপাদান হচ্ছে, সময় ও মানুষ। মানুষের চেতনাজাত রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম ও ভৌত প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রভাবিত সমাজ ও সংস্কৃতির বিচার ও বয়ান। গত চার বছর ধরে অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক শিল্প-সাহিত্য ম্যাগাজিনে গত শতাব্দীর প্রথম থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিকদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা প্রবন্ধসমূহ সংকলিত করে যে সহায়ক সাহিত্যসম্পদ প্রস্তুত করা হচ্ছে সে-সকল সহায়ক সম্পদ বা উৎস ব্যবহার করে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গবেষণা হতে পারে। সেই গবেষণার একটি হতে পারে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের সমাজতত্ত্বের বস্তুনিষ্ঠ বয়ান।
আমরা এটা অধ্যয়ন করতে পারি- বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য কীভাবে সমাজ থেকে উদ্ভূত হলো, কী কী বৈশিষ্ট্য ধারণ করল, কীভাবে সাহিত্যে সমাজের প্রতিফলন ঘটাল এবং পাশাপাশি সমাজের ওপর সাহিত্য কী প্রভাব ফেলল? সাহিত্যে, ক্ষমতা, প্রতিযোগিতা ও সামাজিক কাঠামো কীভাবে কাজ করেছিল বা করে যাচ্ছে? এসব অধ্যয়ন থেকে হয়তো আমরা পেতে পারি এই তথ্য যে বাংলা দীর্ঘদিন উপনিবেশ থেকেছে। উপনিবেশ থাকাকালে ভিনদেশি শাসকের রাজনীতি, অর্থনীতির প্রভাবে পড়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির যেমন রূপান্তর ঘটেছে তেমনি বিকৃতিও ঘটেছে। ভিনদেশি উপনিবেশবাদী শক্তির প্রভাবের ফলে বাঙালির মননে এক গভীর আত্মপরিচয় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আর যখনই এই উপনিবেশবাদী মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে ভাষা, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে বাংলার মাটি ও পরিবেশজাত নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ধারায় নিয়ে এসে মুক্তচর্চা করার চেষ্টা বাঙালি করেছে তখনই ঔপনিবেশিক ধারার পৃষ্ঠপোষক ও কট্টরপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীর দিক থেকে আঘাত ও আক্রমণ এসেছে।
এই বিষয় ছাড়াও আমাদের অধ্যয়ন অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হতে পারে। যেমন, সমসাময়িক ছোটগল্পের আলোচনায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- গল্পকারেরা তাদের গল্পে কীভাবে সীমিত স্থান ব্যবহার করে পরিচয়, বিচ্ছিন্নতা, মনস্তাত্ত্বিক বাস্তববাদ এবং সামাজিক বিষয়গুলো (জাতি, শ্রেণি, ভোগবাদ) গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন। তাছাড়াও এই বিষয়েও আলোকপাত করা যেতে পারে যে কীভাবে প্রাণবন্ত চরিত্র, প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রাঞ্জল বর্ণনায় আধুনিক জটিলতাগুলো প্রতিফলিত করার জন্য বিভিন্ন শৈলী (ব্যঙ্গ, ভৌতিক, জাদুকরী বাস্তববাদ) ব্যবহার করা হয়েছে। আলোচনা ও অধ্যয়নে উঠে আসতে পারে যে কোনো কোনো সমালোচক সাম্প্রতিক রচিত গদ্যভাষায় নীরসতা বা অতি-সরলীকরণের প্রবণতার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দ্রুত পড়ে ফেলার উপযোগী করে রচনা করার বাইরে এসে ফর্ম এবং থিমকে আরও গভীরভাবে জড়িত করার প্রত্যাশা করেছেন। কোনো কোনো আলোচক কেবল গল্পের সারাংশে সীমাবদ্ধ না থেকে তার বাইরে গিয়ে গল্পের অর্থ প্রকাশে প্লট, চরিত্র, থিম এবং সাহিত্য কৌশলের (প্রতীকীকরণ, চিত্রকল্প) মতো উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে গল্পের অর্থ প্রকাশে তাদের কার্যকারিতা যথাযথ মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন।
অধ্যয়নে তুলে ধরা যেতে পারে যে সাহিত্য আলোচনাগুলো প্রস্তুত করতে গিয়ে বিশেষ করে চারটি বিষয়ের দিকে গভীর দৃষ্টি প্রদান করার প্রয়োজন হয়েছে। প্রথমেই এসেছে পরিচয় এবং অন্তর্ভুক্তি বোধের মতো বিষয়গুলো। যেমন সাংস্কৃতিক স্থানচ্যুতি, অভিবাসী মনস্তত্ব ও অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বায়িত বিশ্বে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত অথবা জাতীয় আত্ম-অনুসন্ধান। দ্বিতীয়ত, চরিত্র রূপসমূহের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। যেমন, বাস্তব ঘটনাসমূহের সাক্ষাৎ ব্যাখ্যা অথবা স্বগত ও বহুপাক্ষিক সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রগুলোর মনের অভ্যন্তরের জটিল ও অন্ধকার জগৎ উন্মোচন করা। তৃতীয়ত, গল্পের সামাজিক ভাষ্য অর্থাৎ ভোগবাদ, রাজনীতি, জাতি এবং শ্রেণি বিভাজনের সমালোচনা করার জন্য ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ও অ্যাবসার্ডবাদ ব্যবহার করা। এবং চতুর্থত, রূপ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা অর্থাৎ অনন্য কাঠামো, বিভিন্ন অথবা বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গি (উত্তর-ঔপনিবেশিক, নারীবাদী ইত্যাদী) ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, ফ্যান্টাসি এবং জাদুকরী বাস্তবতার মতো ধারাগুলোর সাথে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে ছোটগল্পের আধুনিক বিভাজন বৈশিষ্ট্য আয়ত্তে নিয়ে আসা। কেউ কেউ এটাও মনে করেছেন যে সমসাময়িক গল্পগুলো সংকীর্ণ জনতাত্ত্বিক বা উপরে ভাসা বিষয়গুলোর উপর খুব বেশি কেন্দ্রীভূত হতে দেখা গেছে। তাছাড়া দ্রুত, সহজে হজমযোগ্য গল্পের বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে গভীর, জটিল অভিজ্ঞতা প্রদানের জন্য প্রস্তুত প্রকৃত শৈল্পিক সম্ভাবনাময় গল্পের চাহিদার ক্ষেত্রে ভাটা সৃষ্টি করে থাকতে পারে। সত্যিকার অর্থে উদ্ভাবন না করে নির্দিষ্ট ‘ধরনের’ (যেমন, অকার্যকর পরিবার, সমাজবিচ্ছিন্ন যুবক) উপর খুব বেশি নির্ভরশীল গল্পগুলো একঘেয়েমির উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শিল্প-সাহিত্য মানুষকে ধ্বংস নয় সৃজনশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। গভীর অনুভূতি, বোধ ও সংযোগের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যা ভাষাগত সীমানা ছাড়িয়ে মানুষে মানুষে, সংস্কৃতিতে সংস্কৃতিতে মেলবন্ধন ঘটায়। ব্যক্তি ও সমাজকে সৌন্দর্য, আনন্দ, দুঃখ, প্রেম, বেদনা ও জীবনের গভীরে নিয়ে যায়, যা তাকে আত্ম-অনুসন্ধান ও বিশ্বকে নতুনভাবে উপলব্ধিতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যচর্চা সকল প্রকার সংরক্ষণবাদ মুক্ত হয়ে মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন চেতনাবোধ অব্যহতভাবে ধারণ করে যাবে। সংরক্ষণবাদ মুক্ত মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন এই চেতনাবোধ থেকে বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্যচর্চা বিচ্ছিন্ন করার সকল অপচেষ্টা বাংলাদেশের কবি, গল্পকার, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকেরা মিলিতভাবে রুখে দেবে এটাই বাস্তব।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 4; Contemporary Stories & Storytellers (Part-3)
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.
















There are no reviews yet.