Additional information
| Weight | 0.516 kg |
|---|---|
| Published Year |
$ 2.94
সম্পাদকীয় – অনুপ্রাণন – দ্বাদশ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা, গল্পকার ও গল্পসংখ্যা (চতুর্থ পর্ব)
প্রকাশিত হলো ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা, গল্পকার ও গল্প সংখ্যা- চতুর্থ পর্ব। গল্পকার ও গল্পসংখ্যা চতুর্থ পর্ব প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশের ১০০ জন নির্বাচিত গল্পকার, তাদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা, গল্পকার রচিত গল্পসাহিত্য নিয়ে আলোচনা এবং একটি উল্লেখযোগ্য গল্প সংকলিত করার কাজ শেষ হলো। এই সংখ্যায় পূর্বের তিনটি সংখ্যার মতোই ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
দ্বাদশ বর্ষে এসে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন থেকে বাংলাদেশের ১০০ জন গল্পকার নিয়ে প্রবন্ধ একত্রিত করে সংকলন প্রকাশ করার কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। প্রথম কাজটি ছিল বাংলা সাহিত্যের গল্পকারদের মধ্য থেকে কারা বাংলাদেশের গল্পকার সেটা নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা, দ্বিতীয়তে এসে বাংলাদেশের গল্পকারদের মধ্য থেকে ১০০ জন গল্পকার বাছাই করা, তৃতীয়তে এসে গল্পকারদের গল্পসাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা বা প্রবন্ধ লেখার জন্য লেখক নির্ধারণ করা। এই কয়টা ধাপের কাজ যতটুকু না কঠিন ছিল তার থেকে বেশি কঠিন ছিল যেসকল গল্পকারের প্রকাশিত গল্পগ্রন্থগুলো সহজলভ্য ছিল না সেগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে জোগাড় করা। এই কাজ করতে আমাদের চেষ্টার সফলতার পেছনে যারা কাজ করেছেন, সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। আমরা তাদের কাছেও বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ যারা বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকারকে নিয়ে এক একটি প্রবন্ধ লিখে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কাজে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন একাদশ বর্ষে এসেও একইভাবে বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ কবি তাদের কবিতা নিয়ে চারটি সংকলন প্রকাশ করেছে। তারপর দ্বাদশ বর্ষে এসে বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকারকে নিয়ে আরও চারটি সংকলন অনুপ্রাণন থেকে প্রকাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং বাস্তবায়ন করার উদ্দেশ্য একটাই। সেটা হচ্ছে- যারা আমাদের কবিতা ও গল্প সাহিত্যের ভিত্তি গড়েছেন তাদের সাথে এবং তাদের কাজের সাথে প্রজন্মকে পরিচিত করে তোলা। আমাদের নির্বাচিত গল্পকারদের মধ্য যিনি সর্বজ্যেষ্ঠ তিনি হচ্ছেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন। তার জন্ম ১৮৯৭ সালে আর মৃত্যু ১৯৭৮ সালে। আর নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হচ্ছেন ইমতিয়ার শামীম। তিনি ১৯৬৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা পূর্ব সময় এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তাদের অধিকাংশই সাহিত্যচর্চা করেছেন। ফলে তাদের সাহিত্য এমন একটা বিশেষ সময়কে ধারণ করেছে যেখানে দুটি দেশভাগের অভিজ্ঞতা হয়েছে। দুটি দেশভাগের কার্যকারণের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে তাদের লেখায় যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ন্যায্যতা ভিত্তি পেয়েছে ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের স্বত্ব, সত্তা ও মৌলিকত্ব নির্মাণে গল্পকারগণ উদ্যোগী হয়েছেন। আমরা অনুপ্রাণন, বিশ্বের বাংলা সাহিত্যে বাংলাদেশের স্বকীয় অবস্থানের বাস্তবতাটিকে প্রবলভাবে অনুভব করি এবং গর্বিত হই।
বাংলাদেশের গল্প-সাহিত্যের চরিত্রদের জীবনের শেকড় অধিকাংশেই প্রাকৃত জীবনে প্রোথিত। মাটি ও সবুজের সাথে সম্পর্কিত। মাত্রই এক অথবা খুব বেশি হলে দুই প্রজন্ম যারা গ্রামের শ্যামলিমা থেকে নগরের কঠিনতায় অভিবাসিত হয়েছে। নগরে থেকেও তারা যেন শহরতলীতে বসবাস করছে। যাদের কারও কারও শরীর থেকে এখনও মাটির গন্ধ মিলিয়ে যায়নি। তাই অধিকাংশ গল্পের দৃশ্যপট হয় শহর না-হলে শহরতলী। গল্পের মানুষগুলো কৃষক না-হয় কৃষকের শিক্ষিত সন্তান। দৃশ্যপটের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়গুলোর বিন্যাসে তাই কখনও গ্রাম সম্পূর্ণভাবে তিরোহিত হয়ে যায়নি।
গ্রামের রূপান্তর কাহিনী হোক অথবা শহর থেকে নগরায়ণের দিকে উত্তরণের কাহিনী হোক প্রায় সকল ক্ষেত্রেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও পরিবার; তাই কাহিনী যতটা না ব্যক্তিকে নিয়ে তার থেকে বেশি হচ্ছে পারিবারিক অথবা সামাজিক। কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্তই বাংলাদেশের গল্পের প্রধান চরিত্র। ধনী পরিবারের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, কলহ, প্রেম-ভালোবাসার গল্প হাতে গোনা। বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পের প্লটে সংঘাত ও সংঘর্ষের নিরসনই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু এমন কিছু প্লট সৃষ্টি করতেও দেখা গেছে যেখানে সংকট নিরসন হয়নি। অর্থাৎ বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্প অধিকাংশই একটি ইতিবাচক সমাধান অথবা ইঙ্গিত পাওয়া যায় এবং নেতিবাচক চরিত্র খুব কমই গল্পের সম্পূর্ণতার ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের গল্প রোমান্টিক ভাব ও আবেগে ভারাক্রান্ত হতেই দেখা যায় বেশি এবং পাঠকেরা সেগুলো পছন্দও করছেন। কিন্তু গল্পকাররা তাদের গল্পে ভাব ও আবেগের ভারসাম্য রক্ষা করেছেন, বাস্তব বিচারে সেই গল্পগুলো বোদ্ধা ও পরিপক্ব পাঠক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
বাংলাদেশের গল্পের আখ্যানবস্তুতে রোমান্টিকতার প্রভাব বেশি থাকলেও এক ঝাঁক গল্প আছে যেখানে জীবনজিজ্ঞাসার দর্শন চিন্তায় জাগরিত হতে দেখা যাচ্ছে। গল্পের গদ্যনির্মাণ যথেষ্ট পরিপক্ব। বানান, ব্যাকরণ, বাক্য গঠন, রূপকের নান্দনিক ব্যবহারে সমৃদ্ধ। গল্পের শুরুর চমক নিয়ে গল্পকারদের মধ্যে একটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যায়। এই ব্যাপারে ভিন্নমত আছে, যদিও পারিবারিক পটভূমিতে নির্মিত গল্পগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চমক দিয়ে শুরু করার একটা প্রবণতা রয়েছে। অপ্রাসঙ্গিক সংলাপ কোনো কোনো গল্পকে অহেতুক ভারাক্রান্ত করেছে। কিন্তু বলা যেতে পারে অধিকাংশ গল্পই দৃশ্যপট বর্ণনায় এবং সংলাপের ওপর গল্পকাঠামো নির্মাণ করার কাজটি করেছেন মেদহীন গদ্যে। গল্পগুলো একরৈখিক হয়নি আবার পার্শ্বচরিত্রের উপ-গল্পগুলো গল্পের প্রধান আখ্যানকে ভারাক্রান্ত করেনি। সময়, কালের প্রতি গল্পগুলো সুবিচার করেছে যেখানে সত্য ইতিহাসের সাথে অহেতুক বিতর্কে অবতীর্ণ হয়নি। গল্পের পক্ষ ও প্রতিপক্ষের অস্তিত্ব ও তাদের আচার-আচরণ অবাস্তব করে তোলা হয়নি। গল্পের চরিত্রগুলোকে দেবতাতুল্য অথবা উল্টোদিকে শয়তানতুল্য করে অবাস্তব কাল্পনিক চরিত্র করে গড়ে তোলা হয়নি। বাংলাদেশের গল্পে রূপকের ব্যবহারে ফ্যান্টাসির তুলনায় বাস্তবের বস্তুগুলোকেই নান্দনিক করে তোলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের গল্পগুলো সামগ্রিকভাবেই এমন একটি উচ্চতর স্তরে উত্তীর্ণ হয়েছে, যখন বাংলাদেশের গল্পসাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের গল্পের ভাণ্ডারে শামিল হওয়ার যোগ্যতাকে আর অস্বীকার করা যায় না।
| Weight | 0.516 kg |
|---|---|
| Published Year |
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণনের একাদশ বর্ষের ৪টি সংখ্যায় বাংলাদেশের ১০০জন নির্বাচিত কবি ও তাদের কবিতা নিয়ে আলোচনার তৃতীয় পর্বে এসে এই সংখ্যায় ২৩জন কবি ও তাদের কবিতা নিয়ে আলোচনা সমুহ সংকলিত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিকের একাদশ বর্ষ অর্থাৎ এ-বছরের প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যায় বাংলাদেশের ১০০জন নির্বাচিত কবি তালিকা থেকে প্রতিটি সংখ্যায় ২৭জন করে মোট ৫৪জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, প্রাপ্ত সম্মাননা ও পুরষ্কার, উল্লেখযোগ্য কবিতা এবং কবিতা নিয়ে বিশেষ আলোচনা ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় এই সংখ্যায় অর্থাৎ ৩য় পর্বে ২৩ জন এবং পরবর্তী ৪র্থ পর্বে আরো ২৩ জন কবি ও কবিতা নিয়ে মোট ১০০ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরষ্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য কবিতা এবং কবিতা নিয়ে আলোচনা সংকলন সম্পন্ন হবে বলে আশা রাখছি।
বাংলাদেশের কবি ও তাদের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা দেখি যে, বাংলা সাহিত্যে বাংলাদেশের কবিদের অপরিসীম ভূমিকা ও অবদান রয়েছে। সাহিত্যমান বিবেচনায় তুলনামূলকভাবে কবিতাগুলো যে অত্যন্ত উচ্চস্থান দখল করে আছে, এটা নিঃসন্দেহেই বলা যায়। একদিকে নান্দনিক বিবেচনায় কবিতাগুলো যেমন উত্তীর্ণ, অন্যদিকে ঠিক তেমনই চলমান সমাজ, রাজনীতি, শোসিত মানুষের সংগ্রাম, জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম ও মানবিক চেতনায় উদ্ভাসিত কবিতামালা গণমানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। বাংলাদেশের কবিদের মূল বিষয় হিসেবে বাঙলার প্রকৃতি, মানবতা, মানব প্রেম, মাতৃস্নেহ, পিতৃস্নেহ, ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক সম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় ও সামাজিক মৌলবাদ বিরোধিতা, নারীবাদ ইত্যাদী বিষয়গুলো যেমন এসেছে ঠিক তেমনই পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে মানব-মানবীর প্রেম, বিরহ অথবা ব্যক্তি পরিচয়, আত্মানুসন্ধান, আত্মজিজ্ঞাসামূলক দার্শনিক বিষয়গুলো। ব্যক্তি, সমাজ ও দেশ কোনটাই অবহেলিত থাকেনি। জয়-পরাজয়, আশা-হতাশা, সংগ্রাম, সংক্ষুব্ধতা অথবা আপসকামিতা ছাড়িয়ে তাদের কবিতা হয়েছে মূলত জীবনধর্মী। তাই বাংলাদেশের কবিদের কবিতায় বহুলাংশে প্রকৃতি, প্রেম ও জীবনের অপার সৌন্দর্য সবসময় উঁচুতে তুলে ধরতে দেখা গেছে।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, একাদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা
সম্পাদকীয়- অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা (প্রথম পর্ব)
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষে পদার্পণ করল। অনুপ্রাণনের লেখক, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী জানেন, একাদশ বর্ষ থেকে বছরের ৪টি সংখ্যাই বিশেষ সংখ্যা হিসেবে প্রকাশ করছে এবং পুরো এক বছরের চারটি সংখ্যা বস্তুত একটি বিশেষ বিষয়কেই সম্পূর্ণ করেছে।
যেমন- একাদশ বর্ষের (২০২২) চারটি সংখ্যায় চারটি ভাগে ভাগ করে বাংলাদেশের ১০০ জন নির্বাচিত কবিকে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। যে কবিদের জন্ম হয়েছে ১৯০০ সাল থেকে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। দ্বাদশ বর্ষে (২০২৩) চারটি ভাগে ভাগ করে বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকারদের নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। যে গল্পকারদের জন্ম হয়েছে ১৮৯৭ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে। উল্লেখ করা যেতে পারে, এই বিশেষ কবি ও কবিতা সংখ্যা এবং গল্পকার ও গল্পসংখ্যার প্রতিটি প্রবন্ধের বিন্যাসে কবি অথবা গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য কবিতা অথবা গল্প এবং তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে এটা স্পষ্ট হয়, গত দুই বছরে আমরা যে ১০০ জন বাংলাদেশের কবি ও যে ১০০ জন বাংলাদেশের গল্পকার নির্বাচিত করেছি তাদের হাত ধরেই বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত্তি রচিত হয়েছে।
বিগত একাদশ ও দ্বাদশ বর্ষে অনুপ্রাণনের হাতে নেওয়া উল্লিখিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতার পথ ধরে এসে ত্রয়োদশ বর্ষে (২০২৪) সাম্প্রতিকের ১০০ জন কবিকে নির্বাচিত করেছে যাদের জন্ম ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের দুটি দশকে। একইভাবে চারটি ভাগে ভাগ করে নির্বাচিত এই ১০০ জন কবিকে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশের প্রথম পর্ব হিসেবে ২৫ জন কবিকে নিয়ে অনুপ্রাণনের চলতি সংখ্যা; অর্থাৎ সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো।
গত দুই বছর প্রকাশিত ত্রৈমাসিকের সম্পাদকীয়তে আমরা বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেছি কারা বাংলাদেশের কবি ও গল্পকার এবং কীভাবে আমরা সেই ১০০ জন কবি অথবা ১০০ জন গল্পকার নির্বাচন করেছি। ভুল বোঝার কোনো অবকাশ নেই, বাংলাদেশের সাহিত্য সারাবিশ্বে বসবাসকারী বাঙালি রচিত বাংলা সাহিত্যেরই অংশ যেখানে জাতীয় ও বৈশ্বিক চেতনার মেলবন্ধন হয়েছে। বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য- বাংলা সাহিত্যের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানুষের মুক্তি সংগ্রামের বৈশিষ্ট্য ধারণ করেই বিকশিত। তথাপি ধ্রুপদি সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য ভাষার সাহিত্য থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি। আধুনিক বৈশ্বিক ধারা ও রীতির ধ্রুপদি কবিতা রচনার বিষয়টি সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কবিদের কবিতায় আরও বেশি করে বিকশিত হতে আমরা দেখি।
পাকিস্তানি শাসকদের কুচক্রের কারণে বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে ছিল। স্বাধীন হওয়ার এক দশক পর অর্থাৎ ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যাপক বৃদ্ধি পেতে থাকে। পশ্চিমে বাংলাদেশের শক্তিশালী ডায়াসপোরা গড়ে ওঠার ফলে সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কবিরা বিদেশি সাহিত্যিক ও সাহিত্যের সঙ্গে আরও অধিক পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এর প্রভাব বাংলা কবিতায় দৃশ্যমান।
বাংলাদেশ একদিনে সৃষ্টি হয়নি। বহু বিস্ফোরণোন্মুখ রাজনৈতিক ঘটনা ও দেশের সাধারণ মানুষের জীবনদানের ভেতর দিয়ে তা ধীরে ধীরে একটা রূপ পেয়েছে। সেই জন্যই হয়তো বাংলাদেশের বেশির ভাগ কবির কবিতায় মেধার তুলনায় আবেগ ও উচ্ছ্বাস বেশি লক্ষ করা যায়। যে দেশকে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে বারবার যেতে হয়েছে সেই দেশের কবিতায় সেসব ঘটনা থেকে উৎসারিত আবেগ ও উচ্ছ্বাসের ছাপ থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আটের দশকের পর থেকে বাংলাদেশের কবিতা বাঁক নিতে শুরু করে। ক্রমে ক্রমে কবিতা সমষ্টির জায়গা থেকে ব্যক্তির জায়গায় সরে আসতে দেখা যায়। ব্যক্তির নিজস্ব আলো ও অন্ধকার, বিচ্ছিন্নতা, কেন্দ্রহীনতা ও নৈঃশব্দ্য প্রকাশিত হতে থাকে।
সাম্প্রতিকের কবিরা মুক্তিযুদ্ধের সময় শিশু ছিলেন। তাদের সেভাবে দেখতে হয়নি বাঙালি জাতিসত্তার উন্মেষ, ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য জাতির লড়াই, গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ভিন্নমতের অস্থিরতার ভেতর দিয়ে গেছে। স্বৈরাচারী শাসককে মেনে নিতে হয়েছে প্রায় দুই দশক। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, পরবর্তীকালে আধা-গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থার উন্মেষ, পুঁজি গঠনের প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের রাজনৈতিক-অর্থনীতির প্রভাব পড়েছে সাম্প্রতিক কবিতায়।
একদিকে নগর ও নগরায়ন, অন্যদিকে দেশের ভৌত কাঠামোর উন্নয়ন যা শহর ও গ্রামের দূরত্ব কমিয়েছে। এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে ডিজিটালাইজেশন যুক্ত হয়ে সাম্প্রতিক কবিদের কবিতাকে প্রভাবিত করেছে যা বেশ লক্ষণীয়। ফলে, যে আবেগ ও উচ্ছ্বাস পঞ্চাশ, ষাট, সত্তরে এমনকি আশি ও নব্বইয়ের দশকেও দেখা যাচ্ছিল তা অনেকটাই স্তিমিত হতে দেখা গেছে সাম্প্রতিক কবিদের কবিতায়। সাম্প্রতিক কবিদের একটা বড় অংশের মধ্যেই আমরা পাই অনুচ্চকিত, শান্ত ও সংহত আবেগের পাশাপাশি নির্মেদ মেধার ব্যবহার। তবে উচ্ছ্বাসময় কবিতা যে সাম্প্রতিক লেখা হয়নি, তা নয়। কারও কারও কবিতাতেই আবেগের আতিশয্য রয়েছে, রয়েছে কথার ফেনা, কিন্তু একটা বড় অংশের মধ্যে যা নেই তা হলো তারল্য, উচ্ছ্বাস অথবা প্রক্ষোভ।
সাম্প্রতিক সময়ের কবিদের অনেকেই ছন্দে লিখতে পছন্দ করেন, লেখেনও। প্রচলিত ছন্দের বাইরে আগেও লেখা হয়েছে, সাম্প্রতিক কবিরাও লিখেছেন। তবে, সাম্প্রতিকের কবিদের একটা বড় অংশ ছন্দের বাইরে দাঁড়িয়ে কবিতা লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন বলে প্রতিভাত হয়। সাম্প্রতিক এসব বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ নিয়েই থাকছে অনুপ্রাণনের সাম্প্রতিক কবি ও কবিতা সংখ্যার চারটি পর্ব।
Quarterly Anupranan 13th Year 1st Issue, Samprotiker Kabi O Kobita- 1st Part
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা – সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা, প্রথম পর্ব- সম্পাদকীয়-
গত কয়েকবছর ধরে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিক এবং তাদের রচিত কবিতা ও গল্প নিয়ে আলোচনার চর্চা বিস্তৃত করে চলেছে। ২০২২ এ বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ কবি (যাদের জন্ম : ১৯১১ – ১৯৬৫), ২০২৩ এ বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার (যাদের জন্ম : ১৮৯৫ – ১৯৬৫) এবং ২০২৪ এ বাংলাদেশের নির্বাচিত সাম্প্রতিকের ১০০ কবি (যাদের জন্ম : ১৯৬৫ – ১৯৮৫); এসকল কবি ও গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা বিষয়ে তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলার পাশাপাশি তাদের উল্লেখযোগ্য কবিতা অথবা গল্প এবং তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা সংকলিত করে প্রকাশ করার মাধ্যমে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কবি ও গল্পকারদের পরিচিতি এবং তাদের রচিত সাহিত্য সম্পর্কে সামষ্টিক আলোচনা সমূহ দেশের সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করে যাচ্ছে। আমরা মনে করি এভাবে বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিকদের মূল্যায়ণ করার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করার মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশের সাহিত্যের পরিচিতির ক্ষেত্রটি বিস্তার লাভ করতে পারে।
এই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ এ এসে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন বাংলাদেশের সাম্প্রতিকের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার যাদের জন্ম ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫ এর মধ্যে হয়েছে, তাদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা বিষয়ে তথ্যের পাশাপাশি তাদের উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের রচিত গল্পসাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা সংকলিত করার কাজ হাতে নিয়েছে।
এই সংখ্যায় প্রকাশিত হলো আলোচকদের থেকে লেখা প্রাপ্তির ভিত্তিতে গল্পকারদের বয়সানুক্রমে নির্বাচিত ১০০ জন সাম্প্রতিকের গল্পকারের মধ্যে থেকে ২৫ জন গল্পকারের জীবিনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য গল্প ও রচিত গল্পসাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা।
বিগত তিন বছর অর্থাৎ ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ এ যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আমরা বাংলাদেশের ১০০ কবি ও গল্পকার নির্বাচিত করেছি বাংলাদেশের নির্বাচিত সাম্প্রতিকের গল্পকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা মোটামুটি একই নির্ণায়ক মানদণ্ড অনুসরণ করেছি।
প্রথমত আমরা বিবেচনা করেছি আধুনিক বাংলা ভাষায় চর্চাকারী সাম্প্রতিকের গল্পকার যারা ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জন্ম লাভ করেছেন অথবা যিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময়ই বাংলাদেশে বসবাস করেছেন অথবা যার প্রকাশনা ও পাঠকের মূল অংশটি ভৌগলিক ভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। দ্বিতীয়ত আমরা বিবেচনা করেছি যে গল্পকারের গল্পে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অবিভক্ত বাংলা সাহিত্যের সাধারণ ঐতিহ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জনগণের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সমাজ-বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে। তৃতীয়ত যে গল্পকারের এক বা একাধিক গল্প বাঙালি পাঠক মহলের বড় অংশে উল্লেখিত ও সমাদৃত হয়েছে। চতুর্থত আমরা মনে করি শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো জাতি তথা মানবজাতির সাধারণ ও উন্মুক্ত অধিকারের বিষয়। কোনো সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো বিবেচিত না হওয়াই কাম্য। কিন্তু তারপরও কতগুলো বিষয় থেকে যায় যেগুলো নিয়ে আপস করা কঠিন। আর তাছাড়া প্রজন্মকে কিছু বার্তা দেওয়া প্রয়োজন, যে বার্তা, বক্তব্য অথবা কর্ম, সমাজে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কারা বাঙালীর স্বাধীনতার পক্ষে ছিল আর কারা বিপক্ষে ছিল? যুদ্ধকালীন পক্ষ-বিপক্ষের প্রশ্নটি মানবতার পক্ষে অথবা বিপক্ষে থাকার মতোই একটি প্রশ্ন। যখন জাতীয় বিদ্বেষপ্রসূত হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা নিয়ে জেনোসাইড চলে তখন পক্ষের বিষয়টা শুধু রাজনৈতিক থাকে না, মানবিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই যখন কোনো শিল্পী বা সাহিত্যিক এরকম সঙ্কটপূর্ণ সময়ে বা পরবর্তী সময়ে মানবতার পক্ষে না গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী যুদ্ধাপরাধীদের সাথে যুক্ত হয়ে থাকেন তাহলে সেটাকে নিছক ব্যক্তিগত বিষয় বলে গণ্য করা কঠিন হয়ে যায়। আর এই গণ্য করতে না পারার বিষয়টি অনুপ্রাণনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
একজন সাহিত্যিকও তার চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন নিয়ে আসেন কখনো সচেতনভাবে অথবা কখনো অবচেতনভাবেই। বাংলাদেশের সাম্প্রতিকের গল্পকারদের গল্পে পূর্বসুরীদের গল্পে নারী-পুরুষের প্রেম, পরকীয়া, বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের মনস্তত্ত্ব যেমন অনেকটা গ্রামীণ ছিলো, সেটা আর থাকেনি। চরিত্রের বাইরের চরিত্র অর্থাৎ পরিবার ও সমাজের সাথে যুক্ততা থেকে মুক্ত হতে কোন কোন সাম্প্রতিকের গল্পকার সফল হয়েছেন। তাই দেখা যায় প্রেম, পরকীয়া ও বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে কেউ না কেউ নাক গলানোর বিষয়টা পূর্বের মতো আর শক্তিশালী থাকেনি। আমরা এখন চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে ডিজিটাল বিষয়গুলোর উত্তরণ ঘটছে, ঘটছে জীবন-যাপনের চালচিত্র। মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে যেমন মানুষ সোচ্চার হচ্ছে তার পাশাপাশি ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রগুলোতে মানুষের অবস্থান দৃঢ়তর হতে দেখা যাচ্ছে। গ্রামের রূপান্তর কাহিনী হোক অথবা শহর থেকে নগরায়ণের দিকে উত্তরণের কাহিনী হোক প্রায় সকল ক্ষেত্রেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও পরিবার থাকলেও সাম্প্রতিকের গল্পকারদের মধ্যে ক্রমেই কাহিনী যতটা না পারিবারিক অথবা সামাজিক তার থেকে ব্যক্তিকে নিয়েই চর্চা বেশি হয়ে ওঠার প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে। গল্পের চরিত্রগুলোকে দেবতাতুল্য অথবা উল্টোদিকে শয়তানতুল্য করে অবাস্তব কাল্পনিক চরিত্র করে গড়ে তোলার ধারা থেকে বেরিয়ে এসে সাম্প্রতিকের গল্পকাররেরা কখনও বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বহুমাত্রিক ও বহুরৈখিক অথবা স্বপ্ন, অবাস্তব মানসিক চিত্র বা কাল্পনিকভাবে সৃষ্ট যা কিনা কোনো বাস্তবতার একটি রূপ হতে পারে অথবা সম্পূর্ণ কাল্পনিক ফ্যন্টাসি চরিত্র নির্মানে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিকের গল্পকারদের গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আলোচকরা এসব বিষয়কে আরো বিস্তৃতভাবে মূল্যায়ণ করেছেন।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 2; Contemporary Stories & Storytellers (Part-1)
সম্পাদকীয় – অনুপ্রাণন পঞ্চদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা- বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে যুদ্ধ ও সংঘাত
মানবসমাজে যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রধান আটটি কারণ হলো অর্থনৈতিক লাভ, ভূখণ্ডগত লাভ, ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, প্রতিশোধ, গৃহযুদ্ধ, বিপ্লবী যুদ্ধ ও আত্মরক্ষামূলক বা প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ। অষ্টম শতাব্দীতে ইংরেজরা পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক লাভ বৃদ্ধির লোভে বাংলার ভূখণ্ড করায়ত্ত করে। ২০০ বছরের অবৈধ ও অনৈতিক ব্রিটিশ শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার জনগণ দীর্ঘ সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে। এসব সংঘাতের পেছনে কারণ ছিল আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধ। মধ্য ও আধুনিক যুগের বাংলা শিল্প-সাহিত্যে পলাশীর যুদ্ধ ও পরবর্তী প্রতিরোধের কাহিনী পাওয়া যায়। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের হাত থেকে বাংলার মুক্তির পথ ছিল কণ্টকপূর্ণ ও রক্তাক্ত। কায়েমি স্বার্থবাদীরা সাম্প্রদায়িকতার বিষ ঢেলে বাংলার আকাশ ধোঁয়া আর অন্ধকারে ঢেকে দেয়। মানুষের দৃষ্টির স্বচ্ছতা হারিয়ে যায়। বাংলার হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক ভ্রাতৃত্ব, শান্তি ও সম্প্রীতির ভিত্তিমূল ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ফলে ভয়াবহ রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মধ্য দিয়ে কয়েকজন ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারপ্রসূত সীমানা নির্ধারণ পদ্ধতিতে বাংলা ভাগ হয়ে যায়। ’৪৭-এর দেশভাগের ফলে বর্তমান বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়ে রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, ঔপনিবেশিক কায়দায় অর্থনৈতিক শোষণ ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের কবলে পড়ে। বাংলার মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির উপর আঘাত আসে। মুক্তবুদ্ধির চর্চার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন শুধু মাতৃভাষা তথা বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় অধিকারের লড়াই ছিল না। এই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের ভৌগোলিক কাঠামোতে বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির ভিত্তি ও আত্মপরিচয় গঠনের শুদ্ধ চেতনার উন্মেষ ঘটে। যার মূল সুর ছিল সাম্প্রদায়িকতা পরিহার করে মানবিকতা-সমৃদ্ধ জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ও বিকাশ। বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। বাংলার মানুষের মাতৃভাষার জন্য লড়াই ও আত্মদানের ন্যায্যতা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে ২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয় এখন। অথচ তৎকালীন সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের শাসক ব্যক্তিদের নির্দেশে মাতৃভাষার অধিকার চেয়ে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চালানো হয়। শহীদের রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়। তৎকালীন সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের শাসক গোষ্ঠী ভাষার অধিকার মেনে নিলেও নানা অজুহাতে বাঙালির সাংস্কৃতিক বিকাশ ও রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের অধিকারের পথে বাধা সৃষ্টি করে চলে।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উপর রাষ্ট্রের ধারাবাহিক নিপীড়ন-নির্যাতনের প্রতিবাদে এদেশের ছাত্র-জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঊনসত্তরে ছাত্র-জনতার মিছিলে যখন গুলি চলে ও কয়েকজন ছাত্রনেতা শহীদ হন তখন তীব্র গণআন্দোলনের মুখে তৎকালীন সামরিক স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়। পরবর্তীকালে দেশে নির্বাচন হয়ে বাঙালি রাজনৈতিক নেতারা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে। কিন্তু রাষ্ট্রের শাসনভার বাঙালি নেতাদের হাতে ছেড়ে দিতে গড়িমসি করলে একাত্তরের মার্চে বাংলার জনগণ ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তোলে। সেই অসহযোগ আন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী নিরস্ত্র জনগণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে লুট, ধ্বংস, অগ্নিসংযোগ ও গণহত্যা শুরু করে। বাঙালি মহান প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনে দেয়। বাঙালির সামনে বাংলা ভাষা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, দেশ ও জনগণের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের বিরাট সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায়। কিন্তু স্বাধীন দেশে সাম্প্রদায়িক ও পুঁজিবাদী শক্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় দেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবার সামরিক বাহিনীর একটি দলের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন। পরবর্তী সময়ে দেশে ১৫ বছর সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের দ্বারা স্বৈরাচারী শাসনের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক ও পুঁজিবাদী গোষ্ঠী স্থায়ী শক্তি অর্জন করে। নব্বইয়ের তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে সামরিক আমলার শাসনের হাত থেকে দেশ মুক্তি পায় এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকার দেশের শাসনভার গ্রহণ করে। কিন্তু নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহের মাঝে অনৈক্যের কারণে দেশে সংঘাত পরিস্থিতি বিরাজ করতে থাকে।
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের সাথে জোট করে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী কয়েকজন মন্ত্রিসভায় স্থান পায়। এক/এগারোর সামরিক হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে দেশে নির্বাচন হয় কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে একাংশের ধারাবাহিক প্রতিবাদ রাজনৈতিক অঙ্গনে শান্তি বিঘ্নিত হতে থাকে। ২০১৩ সালে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে তীব্র গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চ ও সেই মঞ্চের বিপরীতে যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বিশাল সহিংস সমাবেশ গড়ে তোলে। ফলে দেশে রাজনৈতিক বিভক্তি রেখা আরও গভীর হয়। এই বিভক্তি রেখা ধরে ২০২৪-এ ছাত্র-তরুণদের আন্দোলন ও সামরিক বাহিনীর বিশেষ ভূমিকা গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশে সরকার পরিবর্তন হয়। যার মধ্য দিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক ও পুঁজিবাদী শক্তি আরও একদফা শক্তি বৃদ্ধি করার সুযোগ গ্রহণ করে।
বাংলাদেশের মানুষ দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য যুগের পর যুগ ধারাবাহিক সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে। এসব যুদ্ধ ও সংঘাতের ঘটনায় অবিরাম রক্ত ঝরেছে। মানুষের জীবন তছনছ হয়েছে। কিন্তু বাঙালি কখনো পিছপা হয়নি। বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্র মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, যুদ্ধ, সংগ্রাম ও আত্মদানের প্রকৃত সাক্ষী। ইতিহাসের সত্য বয়ান।
Quarterly Anupranan Year- 15 Issue- 2 : War and Conflict in Art, Leterature and Movies of Bangladesh.
অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব- সম্পাদকীয়
সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম পর্ব প্রকাশিত হওয়ার পর সাম্প্রতিকের আরো ২৫ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কবিতা ও কবিতা নিয়ে সামষ্টিক আলোচনায় সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হলো শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা দ্বিতীয় পর্ব। দ্বিতীয় পর্বের এই ২৫ জন কবির নাম ইতোপূর্বে প্রকাশিত সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা প্রথম পর্বের ন্যায় অনুপ্রাণনের ১০০ নির্বাচিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের কবি তালিকা থেকে নেয়া যাদের জন্ম ১৯৬৬ থেকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হয়েছে। তালিকার অবশিষ্ট ৫০ জন নির্বাচিত কবি নিয়ে লেখা প্রকাশিত হবে আগামীতে প্রকাশিতব্য শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ত্রয়োদশ বর্ষ তৃতীয় ও চতুর্থ সংখ্যায়।
সংখ্যাটিতে অন্তর্ভুক্ত সাম্প্রতিকের কবিদের কবিতা নিয়ে আলোচনায় কয়েকটি বিষয় এসেছে যেমন- প্রতিকবিতা, উত্তর-আধুনিকতা, নৈরাজ্যবাদ ইত্যাদি। শুধু কবিতা নয় সামগ্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে নানা পর্যায়ে পরিবর্তনের সূত্র হিসেবে এই দর্শনগুলো নিয়ে আলোচনা আছে। দর্শন হিসাবে উত্তরাধুনিকতাবাদ- যুক্তিবাদীতার বিরুদ্ধে, বস্তুনিষ্ঠতার বিরুদ্ধে এবং সর্বজনীন সত্যের ধারণাগুলিকে প্রত্যাখ্যান করে। যার পরিবর্তে, এটি মানুষের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির বিচিত্রতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির বহুবিধ আপেক্ষিকতার উপর জোর দেয়। উত্তর-আধুনিক কবিতা প্রায়ই অর্থহীনতা অথবা বাস্তবতার অনুপস্থিতি প্রসঙ্গ নিয়ে কাজ করে এবং একটি অস্তিত্বগত দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করে। উত্তর-আধুনিক প্রতিকবিতায় প্রায়ই অস্থিরতার বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করে সাধারণত মুক্ত বিন্যাসে লেখা হতে পারে। কবিতায় অপ্রত্যাশিত লাইন বিরতি, বিশৃঙ্খল কাঠামো- এসব আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন হতে পারে। উত্তর-আধুনিক কবিতা প্রায়শই অস্তিত্ববাদী বা নিহিলিস্টিক প্রসঙ্গ নিয়ে কাজ করতে পারে। যদিও অস্তিত্ববাদ এবং উত্তর-আধুনিকতা সমার্থক নয়, তারা প্রায়শই সম্প্রর্কিত হতে দেখা যেতে পারে।
উত্তর-আধুনিক কবিতার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো কী- এই প্রশ্নটির উত্তরে একটা ধারনা দাড় করানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। আপাতত যে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে সেগুলো যেমন, প্রথমত, এলোমেলো ভাব- কেননা উত্তরআধুনিক রচনাগুলি শব্দের পরম অর্থের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। দ্বিতীয়ত, কৌতুকপূর্ণতা- কোন কোন ক্ষেত্রে কালো হাস্যরস, শব্দ নিয়ে খেলা, বিরোধালঙ্কার, বিড়ম্বনা এবং কৌতুকপূর্ণতার অপরাপর কৌশলগুলি যা কিনা প্রায়শই অর্থগুলোকে ঘোলাটে করার জন্য নিযুক্ত করা হয় যেন পাঠক দুর্বোধ্যতার ঘোরে একটি ভিন্নধরনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। তৃতীয়ত, বিবরণে- এমন কতগুলো অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিভাজন নিয়ে আসা যে টুকরোগুলি যুক্ত করে যে কোলাজ হতে পারে সেটা যেনো প্রায়শই অস্থায়ী বিকৃতরূপ ধারণ করে। চতুর্থত, মেটাফিকশন হতে পারে- অর্থাৎ কল্পকাহিনীর এমন বিশেষ একটি রূপ হতে পারে যা প্রকাশের জন্য রচনার বর্ণনামূলক কাঠামোকে এমনভাবে সাজানো হয় যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যই যেন পাঠক/দর্শকদের মনে করিয়ে দেয়া যে তারা একটি কাল্পনিক কাজ পড়ছে বা দেখছে। এবং পঞ্চমত ইন্টারটেক্সচুয়ালটি বা আন্তঃপাঠ্যতা- অর্থাৎ একটি পাঠ্যের অর্থ অন্য এক/একাধিক পাঠ্য দ্বারা প্রকাশ করা- যেটা হতে পারে একটি ইচ্ছাকৃত সৃজনশীল রচনাকৌশল যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে উদ্ধৃতি, ইঙ্গিত, অনুহরণ, কুম্ভিলকবৃত্তি, অনুবাদ, অনুকরণ অথবা প্যারোডি। তবে খেয়াল রাখতে হয় যে প্রতিকবিতা তখনই সফল হয় যখন ছন্দঃপ্রকরণ, ব্যাকরণ এবং অন্ত্যমিলে ইচ্ছাকৃতভাবে করা ভুলগুলোর বিশৃঙ্খলার মাঝে নান্দনিক প্রকাশভঙ্গী নিহিত থাকে।
মধ্যযুগের সাহিত্যে প্রবণতা ছিল সত্য ও মিথ্যার দ্বিমাত্রিক বয়ানের যেখানে পারলৌকিক শক্তি ও পরলৌকিকতা প্রকাশ্যে অথবা আড়ালে ঢুকে পড়েছে সর্বভারত উৎসারিত নিজস্ব নানা কথন বা বয়ান। এর অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও উপলব্ধি নিতান্তই ব্যক্তিক। যখন থেকে নির্ভেজাল ইহজাগতিক সত্যের উপর ভিত্তি করে সাহিত্য নির্মিত হতে থাকল তখন থেকে শুরু হলো আধুনিক সাহিত্য। কবিতায় যেমন উপন্যাসেও তেমন আধুনিক লেখক বস্তুবাদী, নৈর্ব্যক্তিক এবং নির্মোহ। বাঙলার আধুনিক সাহিত্য গঠনে ইউরোপের রেনেসাঁ পরবর্তী কালে রচিত সাহিত্যের প্রভাব রয়েছে। একইভাবে উত্তর-আধুনিক প্রবণতা আমাদের দেশজ দর্শন থেকে উৎসারিত না। কিন্তু, ব্যাপ্তি ও গভীরতায় আধুনিকতার তুলনায় উত্তর-আধুনিকতার বিষয় এবং মিথস্ক্রিয়া বহুবিস্তৃত। বৃহৎ নয়, ক্ষুদ্র; সমগ্র নয়, অংশ; গোছানো কিন্তু শৃঙ্খলাবদ্ধ নয়, এলোমেলো অথবা উদ্ভট; প্রথাগত নয়, নিরীক্ষামূলক; বিভিন্ন ক্ষেত্রের মিশ্রণ এবং মিথস্ক্রিয়া; ন্যারেটিভের অস্পষ্টতা; কোনো সাংস্কৃতিক প্রকল্পে একটি নয় বহু স্বরের সমাহার ইত্যাদিকে মনে করা যেতে পারে উত্তর-আধুনিকতার গুণ বা বৈশিষ্ট্য হিসেবে।
প্রাক-বাংলাদেশ পর্বে কোন কবি নয় বরঞ্চ সাঈদ আহমদ-ই বলা যায় উত্তর-আধুনিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে প্রথম অ্যাবসার্ড ঘরানার নাটক লিখেন। তিনি-ই প্রথম রূপকথা নিয়ে ফ্যান্টাসি ঘরানার নাটক লিখেন যা একই সঙ্গে ছিল এলেগরিকাল। অন্যদিকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অস্তিত্ববাদের ওপর ভিত্তি করে উপন্যাস লিখেন। এঁরা দুজনই বিদেশে প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন এবং পশ্চিম ইউরোপীয় সাহিত্য এবং দর্শনের সঙ্গে বেশ পরিচিত ছিলেন।
রেফারেন্স, প্রতীক, উৎপ্রেক্ষা ব্যবহার করে কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কবিতা এক জটিল সমীকরণে সম্পর্কিত হয়ে একইসাথে আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক স্বভাব ধারণ করেছিলো। উত্তর-আধুনিকতার উল্লিখিত এই প্রধান বৈশিষ্ট্যসমুহ রপ্ত করার পর বাকি যা থাকে সেসব কবিকে তাঁর নিজস্ব শৈলী উদ্ভাবনের মাধ্যমেই স্বাক্ষর রাখার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। উত্তর আধুনিকতার বিশাল ক্যানভাসে বাংলাদেশের কবিতা ক্রমেই মৌলিক, সৃজনশীল ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে।
Quarterly Anupranan 13th Year 2nd Issue, Samprotiker Kabi O Kobita- 2nd Part
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ১০ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা
সম্পাদকীয়- দ্বাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা, গল্পকার ও গল্প সংখ্যা প্রথম পর্ব।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষে পদার্পণ করেছে। ১১ বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে রয়েছে। যে অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা এখন বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে যৎসামান্য হলেও অবদান রাখার মতো কোন কাজের পরিকল্পনা গ্রহন করতে পারি। যেমন গত বছর আমরা পরিকল্পনা গ্রহন করেছিলাম বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য কবিতা এবং কবির কবিতাকর্ম নিয়ে সামগ্রিক আলোচনা চারটি সংখ্যায় সংকলিত করার। যে পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন নিজেদের সক্ষমতা মূল্যায়ণে আমাদের বিস্তর সাহায্য করেছে। কাজের মধ্য দিয়ে নিজেদের উপর আমাদের আস্থা বৃদ্ধির ফলাফল এ-বছরে বাংলাদেশের ১০০ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরষ্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য গল্প ও গল্পকারের সামগ্রিক গল্পকর্ম নিয়ে আলোচনা দ্বাদশ বর্ষের চারটি সংখ্যায় সংকলিত করার পরিকল্পনা গ্রহন। সেই পরিকল্পনার প্রথম পর্বে প্রকাশিত হলো বাংলাদেশের ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরষ্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য গল্প ও গল্পকারের কাজের উপর সামগ্রিক আলোচনা সংকলন অর্থাৎ গল্পকার ও গল্প সংখ্যা, প্রথম পর্ব।
একটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে আমরা বাংলাদেশের ১০০ জন গল্পকার নির্বাচন করেছি। প্রথমতঃ আমরা বিবেচনা করেছি আধুনিক বাংলা ভাষায় চর্চাকারী গল্পকার যাঁর জন্ম বাংলাদেশে অথবা যিনি তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময়ই বাংলাদেশে বসবাস করেছেন অথবা যাঁর প্রকাশনা ও পাঠকের মূল অংশটি ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। দ্বিতীয়ত আমরা বিবেচনা করেছি যাদের জন্ম ১৮৯৫ থেকে ১৯৬৫ খৃস্টাব্দের মধ্যে। তৃতীয়তঃ আমরা বিবেচনা করেছি যে গল্পকারের গল্পে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বাংলা সাহিত্যের সাধারণ ঐতিহ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালির স্বাধীনতা এবং জনগণের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সমাজ-বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে। চতুর্থতঃ যে গল্পকারের এক বা একাধিক গল্প বাঙালি পাঠক মহলের বড় অংশে উল্লেখিত হয়েছে এবং সমাদৃত হয়েছে। শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো জাতি তথা মানবজাতির সাধারণ এবং উন্মুক্ত অধিকারের বিষয়। কোন সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো বিবেচিত না হওয়াই কাম্য। কিন্তু তারপরও কতগুলো বিষয় থেকে যায় যে বিষয়গুলো নিয়ে আপস করা কঠিন। আর তাছাড়া প্রজন্মকে কিছু বার্তা দেয়া প্রয়োজন, যে বার্তা, বক্তব্য অথবা কর্ম, সমাজে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কারা পক্ষে ছিল আর কারা বিপক্ষে ছিল? এটা মানবতার পক্ষে অথবা বিপক্ষে থাকার মতোই একটি প্রশ্ন। যখন জাতীয় বিদ্বেষ প্রসূত হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা নিয়ে জেনোসাইড চলে তখন পক্ষের বিষয়টা শুধু রাজনৈতিক থাকে না মানবিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই যখন কোন শিল্পী বা সাহিত্যিক এরকম সঙ্কটপূর্ণ সময়ে বা পরবর্তী সময়ে মানবতার পক্ষে না গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী যুদ্ধাপরাধীদের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন তাহলে সেটাকে নিছক ব্যক্তিগত বিষয় বলে গণ্য করা কঠিন হয়ে যায়। আর এই গণ্য করতে না পারার বিষয়টি অনুপ্রাণনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
বাংলা সাহিত্যে ফর্ম হিসেবে আধুনিক ছোট গল্পের ধারণা খুব পুরানো নয়। কলকাতা কেন্দ্রিক লেখক ও বুদ্ধিজীবী আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অনেকটা ইউরোপীয় সাহিত্যের সংস্পর্শে এসেই ছোট গল্প রচনার ফর্মটি নিয়ে সাহিত্য চর্চার সূচনা করেন। তখন শুরুতে রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও প্রচার প্রোপাগান্ডার কাজে গদ্য লেখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সেই গদ্য লেখার প্রয়োজনীয় ফর্মটাকে ধরে পাশাপাশি ছোটগল্প লেখার চল শুরু হলে ক্রমেই লেখক ও সাহিত্যিকদের কাছে কবিতা বা পদ্যের পাশাপাশি ছোট গল্পের ফর্মটি প্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু ছোট গল্প রচনার কৌশলটি আয়ত্ত করতে সময় লাগে। কেননা ছোটগল্প সম্পূর্ণভাবে আখ্যানভিত্তিক একটি রচনা না। আখ্যানের খণ্ডাংশকে ধারণ করে অথবা না করে অনুভূতির বিস্তৃত ক্যানভাসে কতগুলো জট সৃষ্টি এবং সেই জটের পাকানো এক একটা সুতা খোলার মধ্য দিয়ে পাঠককে ধরে রাখা, আবিষ্ট রাখার মুন্সিয়ানা না থাকলে ছোট গল্প ঠিক ছোট গল্প হয়ে ওঠে না।
অনুপ্রাণন প্রকাশিত গল্পকার ও গল্প সংখ্যার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে গল্পকারদের ছোট গল্পগুলি নিয়ে সামগ্রিক আলোচনার সাথে প্রত্যেক গল্পকারের একটি করে নির্বাচিত গল্প সংযুক্ত করা হয়েছে। এই গল্পগুলো আলোচকরাই নির্বাচন করেছেন। গল্পগুলো পাঠের এই সুযোগের মাধ্যমে এই সংখ্যাটির পাঠকরা প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত গল্পকারদের লেখার সাথে পরিচিত হতে পারবেন। বাংলাদেশের গল্পগুলো পাঠ করলে দেখা যাবে কতগুলো গল্প প্রেমবিষয়ক অর্থাৎ এসব গল্পে প্রেম ও রোমান্স প্রাধান্য পেয়েছে। কতগুলো গল্পে গ্রামীণ, আর কতগুলো গল্পে সামাজিক প্রতিবেশ এবং গ্রামীণ অথবা শহুরে সমাজের চিত্র মেলে। বাংলাদেশের গল্পে প্রকৃতি ও মানুষ সবসময় প্রাধান্য পেয়েছে, যেসব গল্পে প্রকৃতির পটভূমিতে চরিত্রাঙ্কন করা হয়েছে। কম হলেও আমরা এমন কিছু গল্প পেয়েছি যেখানে অতিপ্রাকৃত-ভাব বা রহস্য-আচ্ছন্নতা লক্ষ করা যায়। কোন কোন গল্পে হাস্যরস ও নিখাঁদ বিনোদন প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলাদেশের গল্পকারদের কতগুলো এমন গল্প আছে যে গল্পগুলোতে অসম্ভব বা অবাস্তব কাহিনী বর্ণিত হতে দেখা যায় যেখানে কতগুলো গল্পের পাত্রপাত্রী বা পরিবেশকে না বুঝিয়ে সাংকেতিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্থান বা চরিত্রকে বোঝানো হয়েছে অথবা বার্তা প্রদান করা হয়েছে। ইতিহাসভিত্তিক গল্পগুলোতে কোনও একটি বিশেষ ঐতিহাসিক কালে সংঘটিত ঘটনা বর্ণিত হতে দেখা গেছে। সেখানে দেশ ভাগ, ভাষা আন্দোলন, গণ-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। খুব কম হলেও কিছু গল্প আছে যেখানে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও তত্ত্বের সাহায্য নিয়ে গল্পটি রচিত হয়েছে। বাংলাদেশের গল্পে এধরণের গল্পের প্রাধান্য দেখতে পাওয়া যায় যেখানে শহুরে অথবা গ্রামীণ পরিবেশের প্রেক্ষাপটে পারিবারিক ও গৃহজীবন প্রাধান্য পেয়েছে। তুলনামূলক কম হলেও এরকম বেশ কয়েকটি গল্প দেখতে পাওয়া যায় যেখানে নর-নারীর মনস্তত্ত্ব ও মানসিক টানাপোড়েন নিয়ে রচিত হয়েছে। বাংলাদেশের গল্পে এরকম গল্প আছে যেখানে মনুষ্য নয় এমন কোন প্রাণী প্রধান চরিত্র হয়েছে। বাস্তবনিষ্ঠ গল্পে যেখানে জীবনের কোনও ঘটনা বা দিক অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ ও অকপট ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। কম হলেও কিছু গল্পে পুলিশি তদন্ত ও সত্যানুসন্ধানের রোমাঞ্চকর বর্ণনা পাওয়া যায়। কিছু গল্প আছে যেগুলো বিদেশি পটভূমিকায় বাংলাদেশী অভিবাসী অথবা বিদেশী নরনারীর চরিত্রাঙ্কন করা হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণভাবে ছোটগল্পের প্রায় সব শাখার গল্পই বাংলাদেশের গল্পকারেরা লিখেছেন।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা - গল্পকার ও গল্প সংখ্যাঃ প্রথম পর্ব
অষ্টম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা
সম্পাদকীয়-
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা- সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতি সংখ্যা
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যাটি সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতিসংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হলো। সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ ২০১৩ সালে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বিতীয় বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশের সময় অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদে যুক্ত হন। গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি অনুপ্রাণনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তাঁর অকাল মৃত্যু আমাদের শোকগ্রস্ত করেছে। তাঁর স্মৃতি বারবার ফিরে এসে আমাদের মন ভারাক্রান্ত করে তুলছে। স্বামী-পুত্র-কন্যা-পরিবার-পরিজন নিয়ে সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের একটা সংসার ছিল। নারী হিসেবে সংসার ও পরিবারের প্রতি কতগুলো স্বাভাবিক দায়িত্ব ছিল। কিন্তু পাশাপাশি সাহিত্য, সংগীত, সংস্কৃতি, ফ্যাশন ও পরিবেশ নিয়ে তাঁর ভাবনা ছিল, কর্মকাণ্ড ছিল। কবিতা লিখতেন, অনুবাদ করতেন, গল্প লিখেছেন। সম্পাদনা পরিষদে অংশ নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ও অনুপ্রাণন প্রকাশনের কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তরুণদের সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী করে তোলার লক্ষে প্রথম দুই বছর (২০১২-২০১৪) কনকর্ডের চত্বরে একটি দেয়াল পত্রিকার সম্পাদনাও করেছেন। ত্রৈমাসিক পত্রিকা ছাড়াও শিল্প-সাহিত্য জগতে অনুপ্রাণনের কর্মকাণ্ড প্রসারের জন্য বিভিন্ন সময় নেওয়া কর্মসূচি সফল করে তোলার জন্য সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ তাঁর অন্য সকল কাজের ভিড়ে অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদে পর্যাপ্ত সময় ও স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়নভিত্তিক প্রবন্ধগুলোতে শুধু যে তাঁর বহুমাত্রিক কাজের পরিচয় আমরা পাই তা নয়, পাশাপাশি আমরা খুঁজে পাই তাঁর মন-মানস। সেই সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ’কে যিনি ছিলেন একজন রুচিশীল, স্নেহশীল, মানবিক মানুষ। যিনি সুন্দরকে ভালোবাসতেন। সমাজে ঘৃণা, কদর্যতা, সংকীর্ণতা, বিভেদ, বৈষম্য ও নীচতা তাঁকে পীড়িত করেছে। প্রকৃতির মাঝে তিনি বিচিত্র সুন্দরের সন্ধান করতেন। প্রকৃতির মাঝে থেকেই তিনি দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের জীবন থেকে মুক্তি পেতে ভালোবাসা ও সহনশীলতার পাঠ নিয়েছেন। জীবনে ও পরিবেশে তিনি প্রতিনিয়ত সবুজ, সরলতা ও শান্তির সরোবর সন্ধান করেছেন, আহরণ করেছেন। তাঁর চারপাশটা সুন্দর করে সাজিয়ে তোলার জন্য সাজিয়ে রাখার জন্য সবসময় ব্যাকুল থেকেছেন।
সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ বিশ্বাস করতেন একটি দেশের দার্শনিক ও আদর্শিক স্থান চিহ্নিত হয় সে দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে। ক্রমাগত চর্চা ও সাধনার মধ্য দিয়ে একটি জাতির শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভিত মজবুত করা যায়। শিল্প-সাহিত্য ও সংগীত সাধনা ছাড়া শান্তির ও সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তোলা যায় না। শিল্প ও সাহিত্য সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একটি দেশের শিল্প-সাহিত্যে সে দেশের সমাজ প্রতিফলিত হয়। আবার শিল্প-সাহিত্যের চর্চার মধ্য দিয়েই সমাজের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, সামাজিক রীতিনীতি ও ঐতিহাসিক আখ্যানের নির্মাণ ও রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলমান থাকে। শিল্প-সাহিত্য মানব অবস্থার উপর অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আবেগ অন্বেষণ করতে, সামাজিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং আরও ন্যায়সঙ্গত ও সহানুভূতিশীল বিশ্ব গঠনে অবদান রাখতে সাহায্য করে। কেবল সমাজের সাজসজ্জার উপাদান হিসেবে নয় বরং সমাজকে বোঝার এবং রূপান্তরের জন্য শিল্প ও সাহিত্যচর্চা অপরিহার্য। শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমে সৃজনশীল ও নান্দনিক প্রকাশের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রক্রিয়া ব্যক্তির মানবিক অভিজ্ঞতার গভীরতর উপলব্ধি অর্জন করে তুলতে সক্ষম করে, চিন্তার বিকাশ সাধন প্রক্রিয়ায় জারিত হয়ে অমানবিক সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে, চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়সঙ্গত বিশ্ব নির্মাণে অবদান রাখতে পারে। এই বোধ ও অনুভূতিগুলোই সুলতানা শাহ্রিয়া পিউকে ক্রমাগত অনুপ্রাণিত করেছে এবং চালিকাশক্তি হিসেবে শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার সকল পরিসরে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।
বস্তুত পৃথিবীর সব কিছুই সুন্দর বা নান্দনিক হয় না। আমাদের চারপাশের দৃশ্য ও ঘটনাবলি থেকে উৎসারিত সকল অনুভূতি নান্দনিক বা শিল্পিত হয় না। এর মাঝে যে-সকল অনুভূতি ও প্রকাশভঙ্গি আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি আনে, মনে চঞ্চলতা আনে, আনন্দ দেয়, মনের আধ্যাত্মিক স্তরটিকে বিকশিত করে, সেগুলোকেই আমরা বলি, সুন্দর। এ যেন এক যাদু। এই যাদুর কাঠির পরশ যে শিল্পে, যে সাহিত্যে থাকে না সেই শিল্প সেই সাহিত্য মানুষের হৃদয়ের উষ্ণ ছোঁয়া থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়। বাংলা ভাষায় ‘নন্দনতত্ত্ব’ শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মূলত নান্দনিকতা আঠারো ও উনিশ শতকের একটি সাহিত্যিক ও শৈল্পিক আন্দোলন, যা সৌন্দর্যের গুরুত্বের উপর আলোচনার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল। এই ধারণা দিতে সচেষ্ট হয়েছিল যে সৌন্দর্য ছিল শিল্প ও সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সৌন্দর্য কী, তা বর্ণনা দিয়ে অপরকে বোঝানো যায় না, এটি অসংজ্ঞায়িত। সৌন্দর্য উপলব্ধির বিষয়, তাই এটি বুঝে নিতে হয়। ভাবের পরিপূর্ণতা এবং প্রকাশের তীব্র আকুতি নিয়ে সৌন্দর্যের নিজস্ব মূল্য সৃজন-চেষ্টার কৌশল অনুসরণ করা প্রতিটি শিল্পী ও সাহিত্যিকের জন্য মূল্যবান। সামষ্টিক সংস্কৃতি বিশুদ্ধ বুদ্ধির বিষয়, যা কিনা শিল্পের মাধ্যমে উদ্ভাসিত সৌন্দর্যের বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং সর্বদা একটি প্রতি-পরিবেশ হিসেবে কাজ করে যেখানে মানবিকতার ভূমিকাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের মাঝে ছিল গভীর সৌন্দর্যবোধ। তাঁর প্রতিটি কর্ম তাই হয়ে ওঠে এমন একটি ব্যতিক্রম যেখানে সম্পৃক্ত থেকেছে নান্দনিকতার বিশেষ ছোঁয়া। তাঁর কবিতা অথবা গল্প রচনায়, বাচিক শিল্প অথবা সংগীতচর্চায়, ফ্যাশন ডিজাইনে অথবা তাঁর ছাদবাগানে, কিংবা বৃক্ষ রোপণ ও বৃক্ষ উপহার কার্যক্রমে সদা প্রকাশ পেয়েছে গভীর নান্দনিকবোধ ও মানবিকতাবোধ। যার ছাপ তিনি রেখে গেছেন আমাদের সবার হৃদয়ে। তাই, সশরীরে না থাকলেও আগামীতে অনুপ্রাণনের সৃজন-নন্দনের পরিসরে পরিচালিত সকল কর্মকাণ্ডে নান্দনিকতা, শুভবোধ ও মানবিকতার উদাহরণ হয়ে পিউ আমাদের সঙ্গে থাকবেন।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 1; Sultana Shahria Pieu Memorial Issue
সম্পাদকীয়, কুহক মাহমুদ স্মৃতি সংখ্যা। অনুপ্রাণন- অষ্টম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা-
অনুপ্রাণন ও কুহকের কথা
কুহকের কথা বলতে গেলে অনুপ্রাণনের কথা আসবেই। কেননা, কুহক অর্থাৎ কুহক মাহমুদ, শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর সাথে ২০১২ সালে জন্মলগ্ন থেকেই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন ৫টি বছর। কুহকের সাথে আমার পরিচয় সরসিজ আলীমের মাধ্যমে। কবি সরসিজ আলীম তখন ‘ভনে যাহা ভনে’ শিরোনামে একটা ট্যাবলয়েড সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করতেন। ফেসবুকের মাধ্যমেই কবি সরসিজ আলীমের সাথে আমার পরিচয়।
এই পরিচয়ের কিছুদিন পূর্বে হোসনে আরা বেগম নামে একজন মধ্যবয়সী মহিলা ফেসবুকে আমাকে নক করেন। তিনি তখন ফেসবুকে ‘ফেসবুক বইমেলা ২০১২’ নামে একটা গ্রুপের এডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে বই প্রকাশ এবং সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। এক বিকেলে আমরা ছবির হাটে মিলিত হই, যেখানে উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন তরুণ কবি-সাহিত্যিক। তারা হলেনÑ রেজওয়ান তানিম, স্থপতি রাজীব চৌধুরী, কবি সুমি সিকানদার, ফেসবুকের মানবিক গ্রুপের অঞ্জন, ইহতিশাম আহমাদ টিংকু এবং আরো দুই-একজন হবে যাদের নাম এই মুহূর্তে আমার ঠিক মনে পড়ছে না। পরে এই বৈঠকগুলো পাবলিক লাইব্রেরির ক্যান্টিনের সামনের বাঁধানো উঠোনে অথবা কখনো কখনো হোসনে আরা বেগমের শ্যামলীর বাসায়ও অনুষ্ঠিত হতো। এই আলোচনা বৈঠকগুলোর মধ্য দিয়েই প্রথমে আমরা পাবলিক লাইব্রেরির সেমিনার-কক্ষে একটি ‘নবীন লেখক সমাবেশ অনুষ্ঠান’ করার সিদ্ধান্তে উপনীত হই। এই পর্যায়ে কবি সরসিজ আলীমও এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হয়। সমাবেশ অনুষ্ঠানের পর প্রথম বৈঠকে যখন একটি ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত হয় এবং যখন পত্রিকার জন্য একটি নাম ও একটি সম্পাদনা পরিষদ গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়, তখন কবি সুমি সিকানদার পত্রিকাটির নাম ‘অনুপ্রাণন’ করার প্রস্তাব আনেন, যে প্রস্তাবটি সংখ্যাগরিষ্ঠ উদ্যোক্তাদের সমর্থন লাভ করায় গৃহীত হয়। ওই বৈঠকগুলোতে পত্রিকার সম্পাদনা পরিষদ গঠন নিয়ে আলোচনা হলে সর্বসম্মতিতে আমার নাম প্রকাশক, হোসনে আরা বেগম সম্পাদক, কবি সরসিজ আলীম নির্বাহী সম্পাদক এবং সহ-সম্পাদক হিসেবে রেজওয়ান তানিম, রাজীব চৌধুরী, সুমি সিকান্দার, ইহতিশাম আহমাদ টিংকুসহ আরো দুই-একজনের নাম প্রস্তাব হয়। এই প্রস্তাব গৃহীত হলে ঠিক করা হয় যে, সম্পাদক ও সম্পাদনা পরিষদের সদস্যরা পত্রিকার কাজে অভিজ্ঞ আরো দুই-একজন ব্যক্তি যুক্ত করে সম্পাদনা পরিষদ সম্প্রসারিত করতে পারবেন।
এর কিছুদিন পর যখন হোসনে আরা বেগমের বাসায় সম্পাদনা পরিষদের প্রথম সভা হয়, তখন সেই সভায় কবি কুহক মাহমুদ ‘অগ্রদূত’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার মনি মোহাম্মদ এবং তাহমিদের নাম যুক্ত হয়। ওই সভায় কবি কুহক মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। ওই সভাতেই কবি কুহক মাহমুদের সাথে আমার পরিচয়। সেই সভায় লেখা সংগ্রহসহ পত্রিকা বের করার যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তসমূহ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই সূচনা সংখ্যার লেখা বাছাই এবং অনুপ্রাণনে অন্যান্য বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপের সদস্যদের যুক্ত করা নিয়ে কবি সরসিজ আলীম এবং হোসনে আরা বেগমের মধ্যে তুমুল বিতর্ক হয় এবং সেই বিতর্ক এমন তিক্ততার পর্যায়ে উপনীত হয় যে, সূচনা সংখ্যাটির কাজ যখন প্রেসে চলছিল, ঠিক তখন হোসনে আরা বেগম পত্রিকার সম্পাদক পদ থেকে এবং রাজীব চৌধুরী, সুমি সিকানদারসহ আরো দুই-একজন অনুপ্রাণন ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পরিস্থিতিতে পত্রিকাটিতে আমার নাম প্রকাশক ও সম্পাদক, সরসিজ আলীমের নাম নির্বাহী সম্পাদক এবং সহ-সম্পাদক হিসেবে শুধুমাত্র রেজওয়ান তানিম, কুহক মাহমুদ, মনি মোহাম্মদ ও তামজিদের নাম যুক্ত করে শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন পত্রিকার সূচনা সংখ্যা নভেম্বর ২০১২-এ প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে কুহক মাহমুদ অনুপ্রাণন পত্রিকাটির সাথে পাঁচ বছর যুক্ত ছিলেন। এই পাঁচটি বছরে কুহকের সাথে অনুপ্রাণনের মিথস্ক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ এই সম্পাদকীয়’র পরিসরে দেয়া সম্ভব না।
শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন একটি অবাণিজ্যিক পত্রিকা। এই অবাণিজ্যিক কথাটির অর্থ বারবার ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন দেখা যায়। যেহেতু মনে করা হয়, পত্রিকাটি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি সচেতন থেকে স্বাধীন ও মুক্ত মতামতের চর্চা ও প্রকাশ করবে, অর্থাৎ পত্রিকাটি আর্থিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দল অথবা কোনো সামাজিক সংগঠন অথবা দেশের সরকার অথবা করপোরেট মহলের পৃষ্ঠপোষকতার প্রত্যাশা করবে না। অতএব পত্রিকার পাঠকের কাছে সামান্য যে বিনিময়-মূল্য পত্রিকাটি গ্রহণ করবে, তা দিয়েই পত্রিকাটির যাবতীয় প্রকাশনা খরচ চালানো হবে।
যে কারণে অনুপ্রাণনের সাথে যুক্ত সবাইকে মোটামুটি স্বেচ্ছাশ্রম অথবা সামান্য কিছু সম্মানীর টাকায় চলতে হতো। ২৮ আগস্ট ২০১৯ তারিখে তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে অর্থাৎ ৬ আগট ফেসবুকে তাঁর সর্বশেষ পোস্টে অনুপ্রাণনের প্রাথমিক পর্যায়ের অর্থসংকটকালে কবি কুহকের সেই কৃচ্ছ্রসাধন ও কষ্টের কথাই বর্ণনা করেছিলেনÑ
“বাজেট ১০০ টাকা। বাসা থেকে বাসে গুলিস্তান ১০ টাকা। সেখান থেকে বাসে কাঁটাবন। শাহবাগ আসলেই জ্যাম। কোনোদিন হেঁটে বা প্রচণ্ড খিদায় নেমে পড়তাম বাস থেকে। হোটেলে প্রবেশ করে করুণ চোখে দু’টি পরোটা আর ডাল দিয়ে নাশতা করে হাঁটতাম। তারপর অফিস। কাজ। দুইটা না বাজতেই খিদা! সস্তাদরের হোটেলে ২৫ টাকার ভাত-ডিম বা মাছ, ডাল নেই। চলে যেত খাবার। কতদিন ১০ টাকা বেশি দিয়ে সবজি বা অন্য তরকারি নিতে পারিনি! আবার অফিস। কাজ। এই করেই সন্ধ্যা।
পুরি-চা ১০ টাকা। আবার কাজ। ৬০ টাকা শেষ। অফিস শেষ করে হাঁটতাম। ভার্সিটির মাঝ দিয়ে গুলিস্তান। বাসের লাইনের অপেক্ষা। কোনোদিন ৫ টাকার বাদাম। তারপর বাসা। ফিরতে ফিরতে রাত ১০টা। মেয়ে অপেক্ষা করত খাবার নিয়ে। ছেলে-মা অন্য বাড়ি থাকত। মেন্যু বেশিরভাগ ডিম ভাজা, ডাল। পেট পুরে খেতাম। আহ! কি সব দিন গিয়েছে। আনন্দ বেদনার। স্মৃতি কাঁদায়। (৬ আগস্ট, ২০১৯)”
সে সময়ে পত্রিকার কাজ করার পাশাপাশি কবি কুহক মাহমুদ অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে “গোধূলির প্রস্থানে জ্বালাও পূর্ণিমা (ফেব্রুয়ারি ২০১৪)” এবং “না-মানুষ (নভেম্বর ২০১৪)” শিরোনামে দু’টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই বই দুইটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এই সংখ্যার স্মৃতিচারণ বিভাগে প্রকাশিত হয়েছে। বলতে গেলে কবি কুহক মাহমুদ অনুপ্রাণনের সাথে যুক্ত হওয়ার পূর্ব থেকেই যকৃতের সংক্রমণজনিত রোগে আক্রান্ত ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও রোগের চিকিৎসা করা দূরে থাক, শরীরের প্রতি যতœ নেয়া দূরে থাক, তাঁর চলমান জীবন যাপন পদ্ধতি তাঁর শরীরের ক্ষতিই বৃদ্ধি করেছে। এসব ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার জন্য বারবার বলা সত্ত্বেও কবি কুহক মাহমুদ কারো কথারই কর্ণপাত করেনি। যার ফলে যথাযথ চিকিৎসা ও সেবার অভাবে তাঁর শরীরের অবস্থা দিনে দিনে অবনতি হতে থাকে। অসুস্থতার জন্য গত প্রায় দু’বছর কুহক আর সময় দিতে পারেনি অনুপ্রাণনকে। বলেছিলাম, না-মানুষের ২য় খ- লিখে দেন প্রকাশ করি। বলল, পারবো না। এই শরীরে কুলায় না।
কুহক মাহমুদের অকাল মৃত্যুতে আমরা শোকগ্রস্ত। অনুপ্রাণন-এর সাথে যুক্ত সকলের পক্ষ থেকে কুহকের বিদেহি আত্মার শান্তি কামনা করি। তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে “কুহক মাহমুদ স্মৃতি সংখ্যা” হিসেবে নিবেদন করি শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ৮ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যাটি।
অষ্টম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা— গল্পকার ও গল্প সংখ্যা— তৃতীয় পর্ব— সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার ও তাদের উল্লেখযোগ্য গল্প নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষের যাত্রার তৃতীয় পর্বে প্রকাশিত হলো আরও ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা; তাদের রচিত গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা এবং একটি করে নির্বাচিত গল্প (আলোচকের পছন্দে)। সংখ্যাটিতে গল্পকারদের নিয়ে রচনাগুলোর অনুক্রম নির্ধারিত আলোচকদের থেকে লেখা প্রাপ্তির ভিত্তিতে বয়সানুক্রমে প্রস্তুত করা হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার ও তাদের লেখা গল্প নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন বিশেষ সংখ্যাগুলো প্রকাশের এই উদ্যোগের পদ্ধতিগত ন্যায্যতার প্রশ্ন নিয়ে গল্পকার ও গল্পসংখ্যার পূর্ববর্তী পর্ব দুটোয় সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। তবে সংখ্যাটি ১০০ কেন? ৯৯ বা ১০১ অথবা অন্য কোনো সংখ্যা কেন নয়? এটা নিয়ে দু’একজন প্রশ্ন রেখেছেন। গণনা অথবা পরিমাপ করার জন্য যে গাণিতিক বস্তু ব্যবহার করা হয়ে থাকে; সেটাকেই আমরা সংখ্যা বলি। সংখ্যা একটি বিমূর্ত ধারণা। কিন্তু সময় ও বস্তুর সাথে যুক্ত হয়ে এটি একেকটি বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করে থাকে। ইতিহাসযাত্রার মাইলফলক হিসেবে দুই বছর আগে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বর্ষপূর্তি অর্থাৎ সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছি। স্বাধীনতার এই পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপাদানগুলোতে যে বিবর্তন হয়েছে সেই বিবর্তনের ধারণা নেওয়ার জন্য একটি কোয়ান্টাম সময় অথবা বিবর্তনের সাথে জড়িত প্রতিনিধিদের একটা কোয়ান্টাম সংখ্যা নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের গল্প-সাহিত্যে চলমান বিবর্তনের ব্যাপ্তি, গভীরতা ও শ্রেণিভুক্ত সকল প্রকাশের অঙ্গ, ধারা ও উপাদান তুলে ধরার প্রয়োজন মেটানোর জন্য বহুল ব্যবহৃত একটা উপযুক্ত সংখ্যা বেছে নেওয়া যুক্তিযুক্ত ছিল বলেই আমাদের মনে হয়েছে। বিজ্ঞানসম্মত মেট্রিক ধারণায় ০.০১, ০.১, ১, ১০, ১০০ বহুল ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ সকল সংখ্যা। বিজ্ঞানের ধারাতেই শতকরা হিসাবে, বছর হিসাবে, জমির মাপে অথবা প্রতিনিধি নির্বাচনের সংখ্যায়— শতক সংখ্যাটি চলেই আসে। ১ সর্বদাই অবিভাজ্য ঐক্যের প্রতীক, সাথে মেট্রিক ধারণায় শূন্য সংখ্যাটি ১-এর সামনে অথবা পেছনে অবস্থান নিয়ে একের গুণিতককে নির্দেশিত করেছে। একের গুণিতক সংখ্যাই বাস্তবতাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। তবে বলে রাখা ভালো, সংখ্যাতত্ত্বের উপর ভর করে কোনো কুসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাসের সাথে এই সব ভাব বা বস্তুনিরপেক্ষ জ্যামিতিক মেট্রিক সংখ্যাগুলোর কার্যত কোনো সম্পর্ক নাই। অনুপ্রাণন কর্তৃক নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে নারীর সংখ্যা মাত্র উনিশজন। নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে গল্পকার নির্বাচনের একটি শর্ত ছিল জন্মসাল। নির্বাচিত গল্পকারের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম হচ্ছেন শামসুদ্দীন আবুল কালাম, যিনি ১৮৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কনিষ্ঠতম হচ্ছেন তারা যাদের জন্মসাল ১৯৬৫। সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য একবিংশ শতাব্দীতে এসে নিম্নগামী হয়েছে কিন্তু হ্রাসের গতির পেছনে বিংশ শতাব্দীতে নারী সাহিত্যচর্চাকারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। অনুপ্রাণনের গল্পকার ও গল্প সংখ্যাগুলোতে নির্বাচিত নারী গল্পকারদের গল্পসমূহ নিয়ে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে এই ধারণা স্পষ্ট হয়। স্মর্তব্য যে, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে সংখ্যাগত পার্থক্য শুধু বাংলার নয়— কম-বেশি সারা বিশ্বের। অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পে প্রবণতা হিসেবে রোমান্টিকতা ও নান্দনিকতার দিকে দৃষ্টি দেওয়ার তুলনায় সামাজিক বাস্তবতা অর্থাৎ পারিবারিক-সামাজিক, রাজনীতি-অর্থনীতির স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব ও সংকটের বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। গ্রাম ও শহর পৃথক পৃথকভাবে অথবা মিশ্রভাবেও এসেছে। গ্রাম-শহরের বিবর্তন ও রূপান্তরের ফলে সৃষ্ট ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, উৎপাদন অথবা কর্মস্থলের সমস্যা ও সংকটসমূহ চিত্রিত হয়েছে। পরিবর্তন কীভাবে যাপিত জীবনে মানসিক ও পারিপার্শ্বিক প্রতিক্রিয়া ঘটিয়েছে এসব মনস্তাত্ত্বিক বিষয় বিশ্লেষণ বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পে এসেছে নিখুঁতভাবে। মানুষের চিন্তাধারা কখনো এক জায়গায় থেমে থাকে না। একজন সাহিত্যিকও তার চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন নিয়ে আসেন কখনো সচেতনভাবে অথবা কখনো অবচেতনভাবেই। বাংলাদেশের সাহিত্যে নারী-পুরুষের প্রেম, পরকীয়া, বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের মনস্তত্ত্ব যেন এখনো অনেকটা গ্রামীণ। চরিত্রের বাইরের চরিত্র অর্থাৎ পরিবার ও সমাজের সাথে যুক্ততা থেকে মুক্ত হতে পারছে না। তাই দেখা যায় প্রেম, পরকীয়া ও বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে কেউ না কেউ নাক গলিয়েই যাচ্ছেন। আমরা এখন চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে ডিজিটাল বিষয়গুলোর উত্তরণ ঘটছে, ঘটছে জীবন-যাপনের চালচিত্র। মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে যেমন মানুষ সোচ্চার হচ্ছে তার পাশাপাশি ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রগুলোতে মানুষের অবস্থান দৃঢ়তর হতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু, বিশেষ করে ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পে সমাজই গুরুত্ব পেয়েছে বেশি।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা - গল্পকার ও গল্প সংখ্যাঃ তৃতীয় পর্ব
অনুপ্রাণন পঞ্চদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রে যুদ্ধ ও সংঘাত (দ্বিতীয় পর্ব) – সম্পাদকীয়-
মধ্যযুগের বাংলা গীতিকবিতা, পদ্য, সুর ও সঙ্গীত সাধারণ বাঙালিকে তার ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছিল। বস্তুত বিকশিত এই সাংস্কৃতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল। যদিও আধুনিক অর্থে ‘জাতীয়তাবাদ’ ধারণার জন্ম তখনো হয়নি, তবে সঙ্গীতই প্রথম বাঙালিকে একটি অভিন্ন ভাষিক, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিক পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে শিখিয়েছিল। মধ্যযুগের ঠিক প্রাক্কালে রচিত চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধন সঙ্গীত। এটিই প্রথম প্রমাণ করে যে, বাংলা ভাষা উচ্চমার্গের আধ্যাত্মিক ও শৈল্পিক ভাব প্রকাশের উপযুক্ত। চর্যাপদের গীতিগুলোতে তৎকালীন বাংলার নদী, নৌকা, শবর-শবরীদের জীবনযাত্রা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ফুটে উঠেছে, যা বাঙালির নিজস্ব ভৌগোলিক সত্তাকে প্রথম আকার দেয়। চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি ও জ্ঞানদাসের বৈষ্ণব পদাবলী জাত-পাত এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠার গান গেয়েছে। চণ্ডীদাসের অমর বাণী—”সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”—বাঙালিকে প্রথম চরম মানবতাবাদের পাঠ দেয়। শ্রী চৈতন্যদেবের সংকীর্তন আন্দোলন সঙ্গীতকে প্রাসাদের চার দেয়াল থেকে বের করে সাধারণ মানুষের মাঝে নিয়ে আসে। এই সাম্যবাদী চেতনা পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান ভিত্তি (ধর্মনিরপেক্ষতা) হয়ে দাঁড়ায়। মনসামঙ্গল বা চণ্ডীমঙ্গলের গানগুলোতে আর্য দেবতাদের পরিবর্তে বাংলার নিজস্ব লৌকিক দেব-দেবীর আরাধনা করা হতো। এই সঙ্গীতগুলোতে কোনো স্বর্গীয় দেবরাজ্যের কথা ছিল না, বরং ছিল বাংলার সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য, ঝড়-ঝঞ্ঝা এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প। এটি বাঙালির নিজস্ব স্বাজাত্যবোধ ও আত্মপরিচয়কে তীব্র করে তোলে। নাথ গীতি, ময়নামতীর গান এবং পরবর্তী সময়ে লালন শাহ ও অন্যান্য বাউলদের গান ছিল সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মবিরোধী। এই সঙ্গীতধারা হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছিল। বাঙালি যে ধর্মের চেয়েও বড় একটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, এই বোধ বাউল ও সুফি সঙ্গীতের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি সুসংহত হয়। নদীমাতৃক বাংলার মাঝিদের ভাটিয়ালি গান বা উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া গান ছিল একান্তই মাটির গান। এই সুরগুলো কোনো কৃত্রিম রাজকীয় প্রভাবে তৈরি হয়নি। এগুলো বাঙালির অবচেতন মনে একটি অভিন্ন “সাংস্কৃতিক স্বদেশ” গড়ে তুলেছিল। মধ্যযুগের সঙ্গীত বাঙালিকে তার ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছিল। এই সাংস্কৃতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল।
মধ্য ও আধুনিক যূগে বাঙ্গালীর জাতীয়তাবাদী সংগ্রামী চেতনা গঠনে গীত-কবিতা চর্চা ও সঙ্গীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মধ্যযুগের সাহিত্য মূলত ছিল দেব-দেবী বা ধর্মকেন্দ্রিক (যেমন: মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী)। তবে এই যুগেই প্রথম বাঙালি নিজের ভাষা ও ভূখণ্ডের প্রতি মমত্ববোধ প্রকাশ করতে শুরু করে, যা ছিল জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক ভিত্তি। সপ্তদশ শতকে যখন বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করা হতো, তখন কবি আব্দুল হাকিম তাঁর ‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় তীব্র ক্ষোভের সাথে লিখেছিলেন: “যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী / সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”
নিজের ভাষা ও দেশের প্রতি এই চরম আনুগত্যই পরবর্তীকালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান স্তম্ভ (ভাষাকেন্দ্রীক জাতীয়তাবাদ) হয়ে ওঠে। ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভাঙার প্রয়াসে আধুনিক যুগে তীব্র স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী কবিতার জন্ম হয়। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’-এ পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রথম জোরালো সুর তোলেন: “স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, / কে বাঁচিতে চায়? / দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, / কে পরিবে পায়?” মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর সনেট এবং মেঘনাদবধ কাব্যের মাধ্যমে বাঙালির ভেতর আত্মমর্যাদাবোধ ও বীরত্বের চেতনা জাগিয়ে তোলেন। তাঁর ‘কপোতাক্ষ নদ’ সনেটে বিদেশের মাটিতে বসেও স্বদেশের প্রতি যে আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা বাঙালিকে নিজের মাটির প্রতি টান অনুভব করতে শিখিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অসংখ্য কবিতা ও গীতিকবিতার (গান) মাধ্যমে বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলেন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তাঁর রচিত গীতকবিতাগুলো রাস্তায় রাস্তায় গেয়ে বাঙালিরা বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তাঁর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি বাঙালির জাতীয় ঐক্য ও আবেগের চিরন্তন প্রতীক হয়ে ওঠে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বিদ্রোহী’, ‘ভাঙার গান’ ও ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এর মতো কবিতা ও গানের মাধ্যমে বাঙালিকে সরাসরি সশস্ত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুপ্রেরণা দেন। তিনি ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন।ষাটের দশকে পাকিস্তানি নিপীড়নের বিরুদ্ধে শামসুর রাহমান তাঁর ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ বা ‘আসাদের শার্ট’ কবিতার মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেন। আল মাহমুদ, সুকান্ত ভট্টাচার্য (রবীন্দ্রোত্তর পর্বে), এবং নির্মলেন্দু গুণ-এর কবিতা বাঙালিকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গোবিন্দ হালদারের ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ বা ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’—এই গীতকবিতাগুলো রণক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের ও অবরুদ্ধ দেশবাসীকে মানসিকভাবে বাঁচিয়ে রেখেছিল এবং চূড়ান্ত বিজয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মধ্যযুগের কবিতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে সুপ্ত আত্মপরিচয় শুরু হয়েছিল, আধুনিক যুগে এসে তা তীব্র ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী এবং পরবর্তীতে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র (বাংলাদেশ) গঠনের প্রধান সাংস্কৃতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়।
Quarterly Anupranan Year- 15 Issue- 3 : War and Conflict in Art, Leterature and Movies of Bangladesh (2nd part)
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.






There are no reviews yet.