অনুপ্রাণন পঞ্চদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা – বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রে যুদ্ধ ও সংঘাত (দ্বিতীয় পর্ব)

Quarterly Anupranan Year- 15 Issue- 3 : War and Conflict in Art, Leterature and Movies of Bangladesh (2nd part)


Cover By: লুৎফি রুনা
ISBN:
Publish Date: অক্টোবর ২০২৬

$ 2.94

In Stock
Highlights:

অনুপ্রাণন পঞ্চদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রে যুদ্ধ ও সংঘাত (দ্বিতীয় পর্ব) – সম্পাদকীয়-

মধ্যযুগের বাংলা গীতিকবিতা, পদ্য, সুর ও সঙ্গীত সাধারণ বাঙালিকে তার ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছিল। বস্তুত বিকশিত এই সাংস্কৃতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল। যদিও আধুনিক অর্থে ‘জাতীয়তাবাদ’ ধারণার জন্ম তখনো হয়নি, তবে সঙ্গীতই প্রথম বাঙালিকে একটি অভিন্ন ভাষিক, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিক পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে শিখিয়েছিল। মধ্যযুগের ঠিক প্রাক্কালে রচিত চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধন সঙ্গীত। এটিই প্রথম প্রমাণ করে যে, বাংলা ভাষা উচ্চমার্গের আধ্যাত্মিক ও শৈল্পিক ভাব প্রকাশের উপযুক্ত। চর্যাপদের গীতিগুলোতে তৎকালীন বাংলার নদী, নৌকা, শবর-শবরীদের জীবনযাত্রা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ফুটে উঠেছে, যা বাঙালির নিজস্ব ভৌগোলিক সত্তাকে প্রথম আকার দেয়। চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি ও জ্ঞানদাসের বৈষ্ণব পদাবলী জাত-পাত এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠার গান গেয়েছে। চণ্ডীদাসের অমর বাণী—”সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”—বাঙালিকে প্রথম চরম মানবতাবাদের পাঠ দেয়। শ্রী চৈতন্যদেবের সংকীর্তন আন্দোলন সঙ্গীতকে প্রাসাদের চার দেয়াল থেকে বের করে সাধারণ মানুষের মাঝে নিয়ে আসে। এই সাম্যবাদী চেতনা পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান ভিত্তি (ধর্মনিরপেক্ষতা) হয়ে দাঁড়ায়। মনসামঙ্গল বা চণ্ডীমঙ্গলের গানগুলোতে আর্য দেবতাদের পরিবর্তে বাংলার নিজস্ব লৌকিক দেব-দেবীর আরাধনা করা হতো। এই সঙ্গীতগুলোতে কোনো স্বর্গীয় দেবরাজ্যের কথা ছিল না, বরং ছিল বাংলার সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য, ঝড়-ঝঞ্ঝা এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প। এটি বাঙালির নিজস্ব স্বাজাত্যবোধ ও আত্মপরিচয়কে তীব্র করে তোলে। নাথ গীতি, ময়নামতীর গান এবং পরবর্তী সময়ে লালন শাহ ও অন্যান্য বাউলদের গান ছিল সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মবিরোধী। এই সঙ্গীতধারা হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছিল। বাঙালি যে ধর্মের চেয়েও বড় একটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, এই বোধ বাউল ও সুফি সঙ্গীতের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি সুসংহত হয়। নদীমাতৃক বাংলার মাঝিদের ভাটিয়ালি গান বা উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া গান ছিল একান্তই মাটির গান। এই সুরগুলো কোনো কৃত্রিম রাজকীয় প্রভাবে তৈরি হয়নি। এগুলো বাঙালির অবচেতন মনে একটি অভিন্ন “সাংস্কৃতিক স্বদেশ” গড়ে তুলেছিল। মধ্যযুগের সঙ্গীত বাঙালিকে তার ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছিল। এই সাংস্কৃতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল।
মধ্য ও আধুনিক যূগে বাঙ্গালীর জাতীয়তাবাদী সংগ্রামী চেতনা গঠনে গীত-কবিতা চর্চা ও সঙ্গীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মধ্যযুগের সাহিত্য মূলত ছিল দেব-দেবী বা ধর্মকেন্দ্রিক (যেমন: মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী)। তবে এই যুগেই প্রথম বাঙালি নিজের ভাষা ও ভূখণ্ডের প্রতি মমত্ববোধ প্রকাশ করতে শুরু করে, যা ছিল জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক ভিত্তি। সপ্তদশ শতকে যখন বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করা হতো, তখন কবি আব্দুল হাকিম তাঁর ‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় তীব্র ক্ষোভের সাথে লিখেছিলেন: “যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী / সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”
নিজের ভাষা ও দেশের প্রতি এই চরম আনুগত্যই পরবর্তীকালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান স্তম্ভ (ভাষাকেন্দ্রীক জাতীয়তাবাদ) হয়ে ওঠে। ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভাঙার প্রয়াসে আধুনিক যুগে তীব্র স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী কবিতার জন্ম হয়। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’-এ পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রথম জোরালো সুর তোলেন: “স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, / কে বাঁচিতে চায়? / দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, / কে পরিবে পায়?” মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর সনেট এবং মেঘনাদবধ কাব্যের মাধ্যমে বাঙালির ভেতর আত্মমর্যাদাবোধ ও বীরত্বের চেতনা জাগিয়ে তোলেন। তাঁর ‘কপোতাক্ষ নদ’ সনেটে বিদেশের মাটিতে বসেও স্বদেশের প্রতি যে আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা বাঙালিকে নিজের মাটির প্রতি টান অনুভব করতে শিখিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অসংখ্য কবিতা ও গীতিকবিতার (গান) মাধ্যমে বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলেন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তাঁর রচিত গীতকবিতাগুলো রাস্তায় রাস্তায় গেয়ে বাঙালিরা বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তাঁর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি বাঙালির জাতীয় ঐক্য ও আবেগের চিরন্তন প্রতীক হয়ে ওঠে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বিদ্রোহী’, ‘ভাঙার গান’ ও ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এর মতো কবিতা ও গানের মাধ্যমে বাঙালিকে সরাসরি সশস্ত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুপ্রেরণা দেন। তিনি ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন।ষাটের দশকে পাকিস্তানি নিপীড়নের বিরুদ্ধে শামসুর রাহমান তাঁর ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ বা ‘আসাদের শার্ট’ কবিতার মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেন। আল মাহমুদ, সুকান্ত ভট্টাচার্য (রবীন্দ্রোত্তর পর্বে), এবং নির্মলেন্দু গুণ-এর কবিতা বাঙালিকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গোবিন্দ হালদারের ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ বা ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’—এই গীতকবিতাগুলো রণক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের ও অবরুদ্ধ দেশবাসীকে মানসিকভাবে বাঁচিয়ে রেখেছিল এবং চূড়ান্ত বিজয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মধ্যযুগের কবিতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে সুপ্ত আত্মপরিচয় শুরু হয়েছিল, আধুনিক যুগে এসে তা তীব্র ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী এবং পরবর্তীতে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র (বাংলাদেশ) গঠনের প্রধান সাংস্কৃতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়।

Additional information

Additional information

Weight0.452 kg
Reviews (0)
0 ★
0 Ratings
5 ★
0
4 ★
0
3 ★
0
2 ★
0
1 ★
0

There are no reviews yet.

Be the first to review “অনুপ্রাণন পঞ্চদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা – বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রে যুদ্ধ ও সংঘাত (দ্বিতীয় পর্ব)”

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Recently Viewed

Scroll To Top
Close
Close
Close

My Cart