ঘুঘুর মুখে জলপাই পাতা – বাসার তাসাউফ
এই বইয়ে চৌদ্দটি গল্প আছে। চৌদ্দটি গল্পে চৌদ্দ রকমের কাহিনি আছে- একটির সঙ্গে অন্যটির কোনও মিল নেই। প্লট, চরিত্র ও বর্ণনায় আছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। সব গল্পই উত্তম পুরুষে লেখা হয়েছে, একটি বাদে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে মনোলগ। এটিই বাসার তাসাউফের লেখালিখির স্বতন্ত্র ধাঁচ। জীবনের গভীরে তার অনুসন্ধিৎসু অভিগমন আছে। তাই গল্প সাজাতে গিয়ে কাল্পনিক পথে খুব বেশি হাঁটতে হয় না। তাঁর গল্পের কাহিনিতে অভিনবত্ব, সুচারু ভাষাশৈলী, কাব্যিক বর্ণনা- ক্লান্তিকর পাঠের অস্বস্তিতে পড়তে হয় না পাঠককে। ঘটনা বর্ণনায় মেদ কিংবা অসংযত আবেগের প্রকাশ নেই। একই সঙ্গে কালাকাল, উত্তরণ-সন্তরণ অতিক্রম করে বাস্তবের গাছতলায় আশ্রয় নেয়। এখানেই বাসার তাসাউফের গদ্যভাষা ব্যতিক্রমী।
গল্পের বইয়ে একসঙ্গে কয়েকটা গল্প পড়া যায়। এতে সুবিধা যেমন আছে অসুবিধাও আছে। সুবিধা হলো- একটি দীর্ঘ স্কেপের মধ্যে বা দৃশ্যের পর দৃশ্য চিহ্নিত করতে করতে পাঠ চালিয়ে যাওয়া যায়। আর অসুবিধা, মনোটনি। তবে এই বইয়ের গল্পগুলোর বিষয়-বৈচিত্রের কারণে সেটা অতিক্রম হয়ে গেছে। এছাড়াও প্রতিটি গল্পের ভাষা সহজ ও প্রাঞ্জল। ছোট-ছোট শব্দ, বাক্য গঠন, উপমা, কাঠামো, কাহিনিতে বৈচিত্র ও অনুপম কাব্যিক গদ্য পাঠককে বুঁদ করে রাখে মন্ত্রমুগ্ধের মতো। প্রথম গল্প ‘এলেন পোর বিড়াল হয়ে এসেছিল’ থেকে ‘ইউ টার্ন’, ‘কখনও মাস্টার হতে চাইনি’, ‘একই আকাশের নিচে’, ‘তৃতীয় প্রজন্ম’, ‘দিব্যনারী’, ‘চোখের মধ্য দিয়ে মনের ভেতরে’, কিংবা ‘বিষণ্ন স্মৃতির প্রসন্নতায়’ গল্পগুলোতে গদ্যের সরু সাঁকোতে স্বচ্ছন্দ হেঁটে বেরিয়েছেন লেখক, সঙ্গে পাঠকও হেঁটে যেতে পারে তরতর করে। এটাই বোধহয় সার্থক শিল্পের আয়না। যেখানে নিজের প্রতিবিম্ব দেখার পাশাপাশি পাঠককেও দেখার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
আদিমকালের গুহাচিত্রের সাংকেতিক রেখা নয়, আধুনিককাল বা উত্তরাধুনিককালের রিয়েলিজম বিমূর্ত ক্যানভাসে শিল্পের মৌলিকতা ও অভিনবত্ব প্রকাশিত হয়েছে এই বইয়ের গল্পগুলোতে।
Ghughur Mukhe Jolpai Pata - Basar Tasauf
নিকুন্তিলা – নাসরীন জাহান
আমাদের দেশের মেয়েরা নানা রকম প্রতিবন্ধকতা নিয়ে ছোটো থেকে বড়ো হয়। আমাদের সমাজ এমন, যেখানে বাবা-মা তাদের সেসব প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে ছোটো বয়স থেকে সচেতন করে না। ‘নিকুন্তিলা’ উপন্যাসে নিকুন্তিলা এমন এক চরিত্র যে ছোটো বয়স থেকে অনেক সচেতন। এই সচেতনার জন্ম দিয়েছে তার মা। খুব অল্প বয়সে সে পিরিয়ডের মতো বিষয় সম্পের্কে জানতে পারে। নিকুন্তিলাও তার মাকে নানা রকম প্রশ্ন করে অনেক বিষয় জেনে নেয়। ছোটো বয়সে অনেক বিষয় জেনে গেলেও নিকুন্তিলা নিজেকে সংযত রাখতে পেরেছে। এখানেও তার মা তাকে সাহায্য করেছে। এমনকি মেয়েকে সচেতন করতে মা তার জীবনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা একে একে বলতে থাকে। একটা সময় সে জানতে পারে বাবা ছাড়াও তার মায়ের জীবনে অন্য কোনো পুরুষ এসেছিল। সেই পুরুষ চরিত্র নিয়ে নিকুন্তিলার মনে জন্ম হয় নানা রকমের প্রশ্ন।
নিকুন্তিলা বিয়ের উপযুক্ত হয় এবং বিয়ে হয়। মূলত নিকুর বিয়ে মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক পাঠকের চিন্তাকে অন্য দিকে নিতে চেয়েছেন। যেখানে আমরা সমাজের মধ্যবিত্ত পরিবারের নানা রকম জটিলতা দেখতে পাই। যেখানে স্বামী-স্ত্রীর একে অন্যের প্রতি নির্ভরশীলতার বিষয়টি ফুটে উঠেছে। আরও নানা রকমের ঘটনা, টানাপোড়ের থাকলেও উপন্যাসে মূলত আমাদের সমাজ-বাস্তবতায় একজন নারীর ছোট থেকে বেড়ে ওঠা এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে যেসব জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, সেসব বিষয়ই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
Nikuntila by Nasreen Jahan
শেষ অধ্যায় – পিয়ারা বেগম
রূদ্ধদ্বার কক্ষে আমরা দুজন! বাস্তবে কেউ কারও নই। তবুও কেন জানি দুজনই যেন দুজনার। মৃদুল একই প্লেটে আমাদের খাবারটা নিয়েছে। আমার হাতটুকু ধরে ও আমাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিলো। আমিও যেন ওর হাতের খাবারটুকু সসম্মানে খেলাম। মনে মনে আজ যেন ওকে গোটা হৃদয়টাই দিয়ে দিলাম।
কতটা ভালোবাসার প্রস্রবণ ভেতরে থাকলে এমনটি করতে পারছি। এই যে এতটা বছর ওকে নিয়ে দিবারাত্রির স্বপ্ন- অনুভূতির ভেতরে ঘুরুপাক খেতাম, রাতের ঘুম কখনও নির্বিঘ্ন ছিল না, এতটা হৃদয়যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছি। অথচ আজ? ওকে কাছে পেয়ে মনে হচ্ছে প্রেম জীবনের উজ্জ্বলতম মুহূর্ত! মানব অস্তিত্বের সর্বোচ্চ সুখের আস্বাদ দেয় প্রেম। এর পরে কী হবে সে ভাবনাটুকু ভাবার এতটুকু অবকাশ থাকে না। হয়তো একটু পরেই উভয়ই বিমর্ষ মলিন অশ্রুবিধুর মুখখানা নিয়ে বিদায় নেব। চিরদিনের জন্য কেউ আর কারোরই থাকব না। কি কঠিন আর নির্মম বাস্তবতা! তবুও মন কি বোঝে? এই যে এতটা কাছে আছি, এই কাছে থাকা মানে কিন্তু পাওয়া নয়। এই কাছে থাকার মধ্যেও আছে যোজন যোজন ব্যবধান। প্রেম কাছে পাওয়া কিংবা না পাওয়ার পার্থক্য বুঝে না। ও বর্তমানে বিশ্বাসী।
Shesh Adhyay - Piara Begum
ঘোড়ামুখী – জিল্লুর রহমান শুভ্র
জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিকী, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক ও নানা নামের ছোট কাগজগুলোতে বেশুমার গল্প ছাপা হচ্ছে। দু’চারটে গল্প ছাড়া অধিকাংশ গল্পই বায়বীয় পদার্থের মতো হাওয়া হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু কেন? কেন গল্পগুলো অমরত্বের পথে হাঁটছে না? কারণ, সরল বয়ান এবং একই প্রেক্ষাপটের চর্বিত চয়ন। কিন্তু এই গল্পগ্রন্থে জিল্লুর রহমান শুভ্র প্রিজমের মতো নানাবিধ আলো ফেলে গল্পগুলোকে নানা ঢংয়ে বিন্যাস করেছেন। বাস্তবতার সঙ্গে পরাবাস্তবতা ও শ্বাশত আবেগের মিশেল ঘটানো গল্পগুলো পাঠকদের মনস্তত্বের ভূগোলে জেগে ওঠে কুয়াশাবৃত হিমশৈলের মতো; যা একদিকে চিত্তাকর্ষক অন্যদিকে প্রপঞ্চময়। তিনি সোডিয়াম ও ফ্লুরেসেন্সের আলোর নিচে বসবাস করলেও নিভৃতচারী পল্লিকথকের লেপ মুড়ি দিয়ে কুপির আলোয় পুঁথিপাঠ ও হেমন্তের ফসল কাটার গান শুনতে পান; ফলে তার গল্পে নাগরিক জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসিকান্না, রিরংসা ও কদর্য অন্ধকার যেমন ধরা পড়ে, তেমনি গ্রামীন চরিত্রগুলোও সেলুলয়েডের মতো জীবন্ত। তাছাড়া, রাজনীতি সচেতন মানুষ হিসেবে ৪৭-এর দেশভাগ ও ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বয়ান তার অনেক গল্পে উঠে এসেছে নির্মোহ ও নির্মম সংবেদনশীলতায়। পাঠক, বাড়িয়ে বলছি না। নতুন স্ট্যাইলে তার গল্পের বুনন ও ভাষার চমৎকারিত্ব সমানভাবে আপনাদের মুগ্ধ করবে।
Ghoramukhi By Zillur Rahman Shuvro
একদিন ফেরার পথ জেগে উঠবে – আবু মকসুদ
সময়ের কঙ্কালগুহা পেরিয়ে যে পথ ধুলো জমে নিথর হয়ে আছে, সেই পথে একদিন শব্দ জাগবে, নীরবতা কেঁপে উঠবে, ফিরবে মানুষ—ফিরে আসবে তারা, যাদের চোখে হারিয়ে যাওয়ার অতল রেখা আঁকা ছিল। ‘একদিন ফেরার পথ জেগে উঠবে’—এই পাণ্ডুলিপি কেবল কবিতার সংকলন নয়, এটি প্রতিটি অনুচ্ছেদে হারিয়ে যাওয়া শৈশব, ঝরে পড়া প্রেম, ভাঙা স্বপ্ন আর তীব্র আশার এক অস্পষ্ট মানচিত্র।
এখানে প্রতিটি শব্দ যেন কুয়াশায় লেখা চিঠি, পাঠকের হৃদয়ে এসে খুলে যায়। একাকিত্ব, যুদ্ধ, প্রতিবাদ, অপেক্ষা আর অদৃশ্য ফেরার টান—সব মিলিয়ে কবি বুনেছেন এক গভীর মানবিক আবেগের জাল, যা ছিঁড়ে ফেলাও যায় না, ফেলে রাখাও যায় না।
এই কবিতাগুলো শুধু পড়ার জন্য নয়, থমকে দাঁড়াবার জন্য। মনে রাখার জন্য। এবং শেষে একবার হলেও বলার জন্য—হ্যাঁ, আমিও সেই ফেরার পথের যাত্রী। ‘একদিন ফেরার পথ জেগে উঠবে’— জেগে উঠবে আমাদের ভেতরের নিভে যাওয়া আলো, যেখানে অপেক্ষা করে আছে ফেরা, পরিশুদ্ধ হয়ে।
Ekdin Ferer Path Jage Uthbey - Abu Maksud
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা- সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতি সংখ্যা
সম্পাদকীয়-
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা- সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতি সংখ্যা
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যাটি সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতিসংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হলো। সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ ২০১৩ সালে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বিতীয় বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশের সময় অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদে যুক্ত হন। গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি অনুপ্রাণনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তাঁর অকাল মৃত্যু আমাদের শোকগ্রস্ত করেছে। তাঁর স্মৃতি বারবার ফিরে এসে আমাদের মন ভারাক্রান্ত করে তুলছে। স্বামী-পুত্র-কন্যা-পরিবার-পরিজন নিয়ে সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের একটা সংসার ছিল। নারী হিসেবে সংসার ও পরিবারের প্রতি কতগুলো স্বাভাবিক দায়িত্ব ছিল। কিন্তু পাশাপাশি সাহিত্য, সংগীত, সংস্কৃতি, ফ্যাশন ও পরিবেশ নিয়ে তাঁর ভাবনা ছিল, কর্মকাণ্ড ছিল। কবিতা লিখতেন, অনুবাদ করতেন, গল্প লিখেছেন। সম্পাদনা পরিষদে অংশ নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ও অনুপ্রাণন প্রকাশনের কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তরুণদের সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী করে তোলার লক্ষে প্রথম দুই বছর (২০১২-২০১৪) কনকর্ডের চত্বরে একটি দেয়াল পত্রিকার সম্পাদনাও করেছেন। ত্রৈমাসিক পত্রিকা ছাড়াও শিল্প-সাহিত্য জগতে অনুপ্রাণনের কর্মকাণ্ড প্রসারের জন্য বিভিন্ন সময় নেওয়া কর্মসূচি সফল করে তোলার জন্য সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ তাঁর অন্য সকল কাজের ভিড়ে অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদে পর্যাপ্ত সময় ও স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়নভিত্তিক প্রবন্ধগুলোতে শুধু যে তাঁর বহুমাত্রিক কাজের পরিচয় আমরা পাই তা নয়, পাশাপাশি আমরা খুঁজে পাই তাঁর মন-মানস। সেই সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ’কে যিনি ছিলেন একজন রুচিশীল, স্নেহশীল, মানবিক মানুষ। যিনি সুন্দরকে ভালোবাসতেন। সমাজে ঘৃণা, কদর্যতা, সংকীর্ণতা, বিভেদ, বৈষম্য ও নীচতা তাঁকে পীড়িত করেছে। প্রকৃতির মাঝে তিনি বিচিত্র সুন্দরের সন্ধান করতেন। প্রকৃতির মাঝে থেকেই তিনি দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের জীবন থেকে মুক্তি পেতে ভালোবাসা ও সহনশীলতার পাঠ নিয়েছেন। জীবনে ও পরিবেশে তিনি প্রতিনিয়ত সবুজ, সরলতা ও শান্তির সরোবর সন্ধান করেছেন, আহরণ করেছেন। তাঁর চারপাশটা সুন্দর করে সাজিয়ে তোলার জন্য সাজিয়ে রাখার জন্য সবসময় ব্যাকুল থেকেছেন।
সুলতানা শাহ্রিয়া পিউ বিশ্বাস করতেন একটি দেশের দার্শনিক ও আদর্শিক স্থান চিহ্নিত হয় সে দেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে। ক্রমাগত চর্চা ও সাধনার মধ্য দিয়ে একটি জাতির শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভিত মজবুত করা যায়। শিল্প-সাহিত্য ও সংগীত সাধনা ছাড়া শান্তির ও সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তোলা যায় না। শিল্প ও সাহিত্য সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একটি দেশের শিল্প-সাহিত্যে সে দেশের সমাজ প্রতিফলিত হয়। আবার শিল্প-সাহিত্যের চর্চার মধ্য দিয়েই সমাজের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, সামাজিক রীতিনীতি ও ঐতিহাসিক আখ্যানের নির্মাণ ও রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলমান থাকে। শিল্প-সাহিত্য মানব অবস্থার উপর অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আবেগ অন্বেষণ করতে, সামাজিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং আরও ন্যায়সঙ্গত ও সহানুভূতিশীল বিশ্ব গঠনে অবদান রাখতে সাহায্য করে। কেবল সমাজের সাজসজ্জার উপাদান হিসেবে নয় বরং সমাজকে বোঝার এবং রূপান্তরের জন্য শিল্প ও সাহিত্যচর্চা অপরিহার্য। শিল্প-সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমে সৃজনশীল ও নান্দনিক প্রকাশের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রক্রিয়া ব্যক্তির মানবিক অভিজ্ঞতার গভীরতর উপলব্ধি অর্জন করে তুলতে সক্ষম করে, চিন্তার বিকাশ সাধন প্রক্রিয়ায় জারিত হয়ে অমানবিক সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে, চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায়সঙ্গত বিশ্ব নির্মাণে অবদান রাখতে পারে। এই বোধ ও অনুভূতিগুলোই সুলতানা শাহ্রিয়া পিউকে ক্রমাগত অনুপ্রাণিত করেছে এবং চালিকাশক্তি হিসেবে শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার সকল পরিসরে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে।
বস্তুত পৃথিবীর সব কিছুই সুন্দর বা নান্দনিক হয় না। আমাদের চারপাশের দৃশ্য ও ঘটনাবলি থেকে উৎসারিত সকল অনুভূতি নান্দনিক বা শিল্পিত হয় না। এর মাঝে যে-সকল অনুভূতি ও প্রকাশভঙ্গি আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি আনে, মনে চঞ্চলতা আনে, আনন্দ দেয়, মনের আধ্যাত্মিক স্তরটিকে বিকশিত করে, সেগুলোকেই আমরা বলি, সুন্দর। এ যেন এক যাদু। এই যাদুর কাঠির পরশ যে শিল্পে, যে সাহিত্যে থাকে না সেই শিল্প সেই সাহিত্য মানুষের হৃদয়ের উষ্ণ ছোঁয়া থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়। বাংলা ভাষায় ‘নন্দনতত্ত্ব’ শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মূলত নান্দনিকতা আঠারো ও উনিশ শতকের একটি সাহিত্যিক ও শৈল্পিক আন্দোলন, যা সৌন্দর্যের গুরুত্বের উপর আলোচনার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল। এই ধারণা দিতে সচেষ্ট হয়েছিল যে সৌন্দর্য ছিল শিল্প ও সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সৌন্দর্য কী, তা বর্ণনা দিয়ে অপরকে বোঝানো যায় না, এটি অসংজ্ঞায়িত। সৌন্দর্য উপলব্ধির বিষয়, তাই এটি বুঝে নিতে হয়। ভাবের পরিপূর্ণতা এবং প্রকাশের তীব্র আকুতি নিয়ে সৌন্দর্যের নিজস্ব মূল্য সৃজন-চেষ্টার কৌশল অনুসরণ করা প্রতিটি শিল্পী ও সাহিত্যিকের জন্য মূল্যবান। সামষ্টিক সংস্কৃতি বিশুদ্ধ বুদ্ধির বিষয়, যা কিনা শিল্পের মাধ্যমে উদ্ভাসিত সৌন্দর্যের বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং সর্বদা একটি প্রতি-পরিবেশ হিসেবে কাজ করে যেখানে মানবিকতার ভূমিকাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের মাঝে ছিল গভীর সৌন্দর্যবোধ। তাঁর প্রতিটি কর্ম তাই হয়ে ওঠে এমন একটি ব্যতিক্রম যেখানে সম্পৃক্ত থেকেছে নান্দনিকতার বিশেষ ছোঁয়া। তাঁর কবিতা অথবা গল্প রচনায়, বাচিক শিল্প অথবা সংগীতচর্চায়, ফ্যাশন ডিজাইনে অথবা তাঁর ছাদবাগানে, কিংবা বৃক্ষ রোপণ ও বৃক্ষ উপহার কার্যক্রমে সদা প্রকাশ পেয়েছে গভীর নান্দনিকবোধ ও মানবিকতাবোধ। যার ছাপ তিনি রেখে গেছেন আমাদের সবার হৃদয়ে। তাই, সশরীরে না থাকলেও আগামীতে অনুপ্রাণনের সৃজন-নন্দনের পরিসরে পরিচালিত সকল কর্মকাণ্ডে নান্দনিকতা, শুভবোধ ও মানবিকতার উদাহরণ হয়ে পিউ আমাদের সঙ্গে থাকবেন।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 1; Sultana Shahria Pieu Memorial Issue
হ্যালোইনের রাত (দ্বিতীয় সংস্করণ) – নাঈম হাসান
যারা হরর গল্পের ভক্ত, তাদের জন্যে বইটি নিঃসন্দেহে দুর্দান্ত এবং অবশ্যপাঠ্য। এটি একটি হরর কাহিনির সংকলন। বইটিতে মোট এগারোটি গল্প স্থান পেয়েছে। ভূত-প্রেত, পিশাচ-ডাইনি, তান্ত্রিক, সর্পমানবী ও ভ্যাম্পায়ারসহ গা ছমছম করে এমন সকল উপাদানই রয়েছে বইটিতে।
এখানে বড়ো গল্প ‘দ্বিতীয় জীবন’ থেকে সামান্য অংশ তুলে দেয়া হলো : সকালে ঘুম থেকে উঠেই সাবের খবর পেল, অঞ্জলিকে কে বা কারা যেন বীভৎসভাবে খুন করেছে। সারা দেহে আঁচড় আর কামড়ের চিহ্ন। স্কুলের কিছু বন্ধু মিলে দেখতে গিয়েছিল কিন্তু পুলিশের কারণে আর সরাসরি দেখা হলো না। প্রচÐ কান্না পেল সাবেরের, কালকেই ফোনে কথা হলো আর আজ ওর মৃত্যু!
মন খারাপ করেই সন্ধ্যাবেলা দেখা করল ঋতুপর্ণার সাথে। তাকে দেখে বেশ উৎফুল্ল মনে হলো। আজ আরও বেশি সুন্দর লাগছে, যেন রূপ ঠিকরে বেরোচ্ছে ওর।
‘বান্ধবী মারা গেছে দেখে মন খারাপ? আমার পাশে বসেও?’ সাবেরের গালে হাত বুলাতে বুলাতে বলল ঋতুপর্ণা।
‘হ্যাঁ, ছোটোবেলার বান্ধবী এভাবে মারা গেল!’ কোনোমতে বলল সাবের।
Halloweener Rat (Second Edition) by Naim Hasan
শ্রেষ্ঠ কবিতা – কামরুল ইসলাম
বলে রাখা ভালো, শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি নিতান্তই আপেক্ষিক এবং কোনো ব্যক্তি তার নিজস্ব বৃত্তপরিধির আলোয় যাকে শ্রেষ্ঠ বলছেন, অন্য ব্যক্তির কাছে তা হয়তো খুবই সাধারণ। এমনকি যিনি বাছাই করেছেন, তিনিও পরে তার বাছাইকৃত শ্রেষ্ঠ কবিতা নিয়ে সংশয়ে থাকেন। তাহলে কেন এই ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র সংকলন? তিরিশের দশক থেকে ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র সংকলন প্রকাশ করা একটি ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের বাংলা ভাষাভাষী কবিদের কাছে। বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ দাশ এবং পরে আরো অনেকেই এবং আমার দশকের ( নব্বইয়ের ) অনেক কবিই এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন, ভবিষ্যতের কবিরাও তা করবেন বলে আমার বিশ্বাস।
অনেকের মতো আমিও মনে করি, Time is the best critic. কবিতার বাঁচা-মরা নিয়ে কোনো কবিরই উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই। কবিতা লেখা একটি পবিত্র সাধনা এবং একইসাথে রক্তাক্ত সংগ্রামও বটে। সেই সাধনা ও সংগ্রামের পথে, নিরন্তর এই যাত্রায়, ক্লান্ত রক্তাক্ত আমি সিসিফাসের মতোই লেগে আছি অসীম ধৈর্যে। কতটুকু কী করতে পেরেছি, আমি নিজেও জানি না। ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে গিয়ে দেখলাম- এ বড়ো দুরূহ কাজ। কাকে বাদ দিয়ে কাকে রাখি, যাকে আমি কম গুরুত্বের কবিতা ভাবছি, পরক্ষণে সেই কবিতাটিই অন্যরকম গুরুত্ব নিয়ে সমুখে এসে দাঁড়াচ্ছে। তবুও কিছুটা নির্মম হয়েই বাদ দিতে হয়েছে অনেক কবিতা। এই নির্বাচন যেহেতু লেখকের নিজের, তাই কবুল করতে হচ্ছে যে, আমি এখানে অনেকটাই দ্বিধান্বিত থেকেছি এবং এ-ও সত্যি যে, যে-সব কবিতা বাদ পড়ে গেছে সে-গুলোর শিল্পমূল্য হয়তো অনেক নির্বাচিতের চেয়ে কম ছিল না। তবু এই সত্যকে মেনে নিতে হচ্ছে। এই নির্বাচনই মৌলিক।
কবিতা মূলত একাকিত্বের সংসার। এই সংসারে কবিই একমাত্র সদস্য যে তার আনন্দ-বেদনার উপান্তে দাঁড়িয়ে জীবন ও জগৎকে যে ভাবে দেখেন, পাঠক হয়তো সেভাবে দেখবেন না। পাঠক তাঁর নিজের মতো করে কবির এই সংসারের আলো-অন্ধকারে ঢুকে পড়েন, তাঁর নিজের মতো করে দ্যাখেন এর রূপ-লাবণ্য, ভাবেন এ জগতের বিস্ময় ও ব্যাপকতা। কবিতা নামের এইসব শব্দ-সংসারের অদূরে দাঁড়িয়ে আমার প্রায়শ মনে হয়- একি কোনো অর্থহীন নীরবতার সরব তৃষ্ণা, নাকি শব্দের বিবিধ লীলা!
Nature abhors superlative- এ কথা মনে রেখে, আমার এই হিমসন্ধ্যার গানগুলো দুহাত দিয়ে উড়িয়ে দিলাম প্রকৃতির গোপন অরণ্যে- এগুলো আর আমার রইল না। প্রকৃতির এই সামান্য উপহার প্রকৃতির কাছেই ফিরিয়ে দিলাম। প্রকৃতিই শ্রেষ্ঠ; জগতে শ্রেষ্ঠ বলে আর কোনোকিছু নেই। এখন আমি নির্ভার। এখন ঘুমিয়ে পড়ার আগে নিঃশঙ্ক চিত্তে গিয়ে দাঁড়াবো সেই পাকুড়গাছ তলে, যেখানে কৃষ্ণপক্ষের ক্ষয়িষ্ণু চাঁদের আলোয় একদা ঈশ্বর আমার অনাথ মস্তকে হাত রেখেছিলেন।
আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি নিয়ে, শুধু কবিতার প্রতি ভালোবাসা থেকে, অনুপ্রাণন প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু ম. ইউসুফ ভাই গ্রন্থটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন। তাঁকে জানাই অনেক অনেক ধন্যবাদ।
কামরুল ইসলাম
৪/১ ফ্রেন্ডস ক্যাসেল, পশ্চিম তেরখাদিয়া
রাজশাহী
Shreshtho Kabita by Kamrul Islam
রুল টানা খাতা (দ্বিতীয় পর্ব) – শেখ রানা
নুডুল বারে নির্ধারিত টেবিলে বসে আমার এইসব স্মৃতিকাতরতা মনে পড়ে। মিশুর সাথে খেতে খেতে গল্প করি। শৈশব-কৈশোর এক আকাশসমান আনন্দের পসরা নিয়ে আমার হাত ধরেছিল। বলা শুরু করলে তা-ই সহজে ফুরায় না।
কত কিছু মনে পড়ে! সেই হাইকোর্ট, রাজশাহী পেরিয়ে সিঙ্গাপুর, লন্ডন। এখন বসে আছি মিশুর সাথে ইপসুইচ। জীবন আমাকে সাইলেন্ট স্ট্রিটের নীরবতা যেমন শিখিয়েছে, হোপ স্ট্রিটের আশাবরী ফুলের গন্ধসুবাসে তেমনই হাসিমুখে পথ থেকে প্রান্তরে নিয়ে গেছে আলস্যে।
জীবন কত-না রহস্য নিয়ে আসে সময়ে সময়ে। তার কতটুকুই-বা ‘রুল টানা খাতা’য় ধরা যায়।
Roll Tana Khata by Sheik Rana
অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা- সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা চতুর্থ পর্ব
সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা- সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা (চতুর্থ পর্ব)
সর্বশেষ প্রকাশিত চতুর্থ পর্বে অবশিষ্ট ২৫ জন কবিকে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে মোট ৪টি পর্বে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিকের ১০০ কবির (যাদের জন্ম-সময়সীমা : ১৯৬৬-১৯৮৫) জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার, উল্লেখযোগ্য কবিতা ও কবি রচিত কবিতাসমূহের উপর সামগ্রিক আলোচনা সংকলিত করার আয়োজন সম্পন্ন হলো। সাম্প্রতিকের ১০০ কবিকে নিয়ে লেখা এসব প্রবন্ধ পাঠ করলে বাংলাদেশের সাহিত্যের বিশেষ করে কবিতার পাঠকরা আধুনিক, উত্তরাধুনিক ও নতুন ধারা- এই তিন ধারার কবি ও কবিতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। পাঠকরা অনুধাবন করবেন, বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের কবিদের কবিতা এবং সাম্প্রতিকের অর্থাৎ গত তিন দশকের কবিদের কবিতার মধ্যে সুস্পষ্ট একটি বাঁক বদল ঘটেছে। অত্যন্ত মেধাসম্পন্ন এই কবিদের অনেকেই তাদের শক্তিশালী উদ্ভাবনী শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছেন এবং তাদের এসব সাফল্য যথাযথ স্বীকৃতি লাভ করেছে। কবিতার পরিধি, গঠনশৈলী ও আবৃত্তির কারণে দশকের পর দশকে বিকশিত কবিতা অভিনব ধারায় পৌঁছেছে এবং শাখা উপশাখা ধরে বিচিত্র বিস্তার ঘটছে। ষাট, সত্তর ও আশি’র দশক বা এর পরবর্তী কবিরা কবিতায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন এবং ক্রমান্বয়ে কবিতায় এনেছেন নতুনত্ব। যেখানে কবির সৃষ্টিশীল রচনা সময়ের দাবিতে মানবিক চেতনা গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রেও অভিনব সাড়া জাগিয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিকের কবিদের অধিকাংশ কবিতায় আমরা দেখতে পাই সাবলীল ভাষা ব্যবহার করে সুচারুভাবে রচিত নান্দনিক চিত্রকল্প। পার্থিব অথবা অপার্থিব রূপক মিশ্রিত রিয়েলিজম, ম্যাজিক-রিয়েলিজম, সুররিয়েলিজম। আমরা দেখি, শহর কিংবা গ্রামীণ প্রান্তরের পটভূমিতে পাঠকের চেতনাকে জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত কিংবা বিচ্ছিন্ন করে দেখার একটি অভিনব প্রবণতা। সাম্প্রতিকের অধিকাংশ কবিতা গদ্য ছন্দে লেখা হলেও অনেকেই অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা ছাড়াও অন্ত্যমিলের কবিতা, পদ্য ও ছড়া লিখেছেন। অন্ত্যমিলের কবিতা, পদ্য ও ছড়ায় সামাজিক বিষয়বস্তু প্রাধান্য পেয়েছে যেখানে বেশ কিছু কবিতায় রম্য ঢঙের ব্যবহার পাঠকদের আকৃষ্ট করেছে।
একটি বিষয় লক্ষণীয়, রোমান্টিকতা পেরিয়ে বস্তুবাদের প্রভাব সত্ত্বেও বাংলাদেশের কবিতার ভুবন থেকে রোমান্টিকতার পরিপূর্ণ নির্বাসন কখনো ঘটেনি। যে বিষয়টি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য, মূলধারার সঙ্ঘবদ্ধ কবি ও কবিতার গোষ্ঠীবদ্ধতা থেকে বের হয়ে বাংলাদেশের কবিতা এখন প্রধানত ব্যক্তিবৃত্তে আবদ্ধ হচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কতিপয় বিচ্ছিন্ন কাব্যব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটেছে। তত্ত্ব এখন আর প্রভাবশালী কাব্য-প্রকল্প নয়। বর্তমান বাংলাদেশের কবিতাভুবনের বাস্তবতায় রাজনৈতিক মতাদর্শ কিছু সংখ্যক ব্যতিক্রম বাদে প্রভাব-বিস্তারকারী শক্তি নয়। একই কথা খাটে শিল্পসর্বস্বতার ক্ষেত্রে। এখানেও হয়তো দু-চারজন ব্যতিক্রমীকে দেখা যাবে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কবিতা বিচ্ছিন্ন যেসব ছোট ছোট ব্যক্তিক বৃত্তে বাঁধা সেখানে সৃজনশীলতার বিচারে সবাই নিজ নিজ ধারায় সর্বাধুনিক যেন তার কোনো পূর্বসূরি নেই।
বাংলার আধুনিক কবিতা সাহিত্যে সূচনা থেকেই পাশ্চাত্য, আফ্রিকা এমনকি ল্যাটিন আমেরিকার শক্তিশালী কবিদের কবিতার প্রভাব লক্ষ করা গেছে। সাম্প্রতিককালে বিদেশি প্রভাব মুক্ততার প্রবণতা গ্রহণ করে যে নতুন ধারার কবিতা লেখার প্রচেষ্টার প্রচলন ঘটেছে সেখানে প্রধানত গ্রামীণ সমাজ, পরিবেশ-প্রকৃতি, পারিবারিক গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের পাশাপাশি সমাজ ও রাজনীতির বিভিন্ন সংকটের প্রতিফলন দেখা যায়। এসব কবিতায় প্রমিত বাংলা শব্দের পাশাপাশি কিছু সংখ্যায় আঞ্চলিক বাংলা শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। আঞ্চলিক উচ্চারণের সঙ্গে মিল রেখে সেভাবে শব্দের বানান নিরূপণ করা হচ্ছে। বাংলা ভাষার বানান নির্ধারণ করার চার তত্ত্ব ও অন্যান্য প্রচলিত সূত্রের যৌক্তিকতা সম্পর্কে নতুন ধারার কবিরা প্রশ্ন তুলেছেন। একটি ভাষায় একই অর্থযুক্ত শব্দের বিভিন্ন বানান থাকতে পারে কিনা এটা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে। আলোচনা হওয়াও প্রয়োজন। কেননা বি-উপনিবেশবাদের যে দর্শনের উপর ভিত্তি করে নতুন ধারার কবিতা রচনা করার অনুপ্রেরণা গ্রহণ করা হয়েছে সেখানে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ প্রবেশের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর সেটা যদি ঘটে তাহলে কবিতার বিশ্বজনীন আবেদন হারিয়ে বাংলা কবিতা বাংলা সাহিত্যের সর্বোৎকৃষ্ট স্থান হারিয়ে ফেলতে পারে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের কবিতা সাহিত্যের যে মজবুত ভিত্তি আজ গড়ে উঠেছে তার উপরে দাঁড়িয়ে বাংলা কবিতাকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাহিত্যামোদীর কাছে পৌঁছানোর জন্য একদিকে যেমন অনুবাদ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন অন্যদিকে খেয়াল রাখা দরকার কবিতাও সৃজনশীল বিষয়, বোধ ও অভিব্যক্তিতে যেন সর্বজনীন রূপ গ্রহণ করার মাধ্যমে বিশ্বজনীন হতে পারে।
নভেম্বর ২০১২ সূচনা সংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর যাত্রা শুরু হয়। যাদের হাত ধরে ম্যাগাজিনটির জন্ম তাদের অনেকেই আমাদের মাঝে আজ নেই। ২৮ আগস্ট ২০১৯ সালে আমরা হারিয়েছি সম্পাদনা পরিষদের অন্যতম সদস্য কবি কুহক মাহমুদকে; যিনি সূচনা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে সার্বক্ষণিক পত্রিকাটির জন্য কাজ করেছেন। সম্প্রতি, গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ আমাদের ছেড়ে গেছেন শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদের আরেকজন সদস্য কবি ও গল্পকার সুলতানা শাহ্রিয়া পিউকে। আগস্ট ২০১৩ সাল থেকে তিনি অনুপ্রাণন-এর সঙ্গে যুক্ত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি অনুপ্রাণন-এর সঙ্গে থেকেছেন একজন গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে। কবি ও গল্পকার সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের এই অকাল চলে যাওয়া অনুপ্রাণন-এর সকল কর্মী, লেখক ও শুভানুধ্যায়ীকে গভীরভাবে শোকবিদ্ধ করেছে। শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর এই সংখ্যা আমরা আমাদের সহকর্মী সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের স্মৃতিতে উৎসর্গ করছি। পাশাপাশি ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর আগামী সংখ্যা সুলতানা শাহরিয়া পিউ স্মৃতি সংখ্যা হিসেবে প্রকাশ করার ঘোষণা প্রদান করছি।
Quarterly Anupranan - Year- 13 Issue- 4; Samprotiker kobi O kobita Songkhya 4th Part
নিষিদ্ধ সিম্ফনি – শাহানা আকতার মহুয়া
এই পদাবলি একই সাথে বিক্ষত এবং শুশ্রুষা। বেদনা এবং উপশম। নাড়িছেঁড়া আর্তনাদ এবং সান্ত্বনা।
কবিতাগুলি বিদ্রোহ, বিক্ষোভ, রাষ্ট্রবিপ্লবের ডাক দিচ্ছে না, বরং বসতে চাইছে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত মানুষের পাশে। একলা হয়ে পড়া মানুষকে বলতে চাইছে আমি আছি তোমার পাশে। কবিতাগুলো থেকে চুঁইয়ে পড়া অশ্রু-রক্ত একাত্ম হচ্ছে যন্ত্রণামথিত পাঠকহৃদয়ের রক্তক্ষরণের সাথে।
এমন সংবেদনশীল পদাবলি সাম্প্রতিক কবিতার জগতে বিরল হয়ে উঠছে। এই কবিতাগুলি তাই সত্যিকারের কবিতা।
‘ধ্রুপদ সন্ন্য্যাসে’ নিয়ে বাংলা কবিতার জগতে পদার্পণ করা শাহানা আকতার মহুয়া অনুচ্চকিত কিন্তু অবশ্যপাঠ্য কবি হয়ে উঠেছেন আজ।
পাঠককে তার কবিতার ভুবনে স্বাগতম।
– জাকির তালুকদার
Nishiddho Symphony by Shahana Aktar Mahuya
ত্রয়ী নভেলা – মঞ্জু সরকার
গ্রামের স্কুলশিক্ষক মোস্তফা এবং মধ্যবিত্ত কৃষককন্যা মালা। অসমবয়সী শিক্ষক-ছাত্রীর প্রেম প্রশ্রয় পায় না গ্রামসমাজে । তারা পালিয়ে আসে রাজধানী ঢাকায়। স্বামী-স্ত্রীর ছদ্মবেশে হোটেলবাস, অতঃপর নগরীর অভিজাত আবাসিক এলাকা থেকে বস্তিবাসের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দুজন। আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কে হরণ করে তাদের মিলনান্তক পরিণতির সুখস্বপ্ন? সুখপাঠ্য কাহিনির গতিতে পাঠককেও রুদ্ধশ্বাসে খুঁজতে হয় স্বপ্নচোর।
মানবসম্পদের মা-বাপ নামের কাহিনিতে নায়ক হয়ে এসেছে উত্তরবঙ্গের দারিদ্র্যপীড়িত গাঁয়ের ক্ষেৎমজুর আইনুল। গরিবের আরো গরিব হওয়ার প্রক্রিয়ায় বৈষম্যমূলক ভোগবাদি সমাজ ছায়া ফেলে অভাব-অনটন সর্বস্ব পরিবারেও। আইনুল-উপালির দাম্পত্যের ফসল যে শিশুকন্যা, শহুরে ভদ্রলোকদের সেবাভোগের দাবি মেটাতে রাজধানী হয়ে ওঠে তাদের অনিবার্য গন্তব্য। শিকড়চ্যুত আইনুলও সপরিবারে এগিয়ে চলে নতুন ঠিকানার সন্ধানে।
অন্তর্লীন সুরভি নামের প্রণয়োপখ্যানেও ফুটে উঠেছে সময় ও সমাজবাস্তবের নগ্ন চেহারা, একই সঙ্গে সৎ ও অসৎ ব্যক্তির প্রেম এবং পরিবারার রক্ষার প্রাণান্তকর প্রয়াস।
পেশাদার লেখক হবার স্বপ্নে প্রাথমিক পর্যায়ে স্বল্প সময়ে রচিত লেখকের তিনটি পৃথক ক্ষুদ্রায়তন উপন্যাসের পরিমার্জিত ও একত্রিত রূপ ত্রয়ী নভেলা।
Troyee Novella by Monju Sarkar























