Additional information
| Weight | 0.200 kg |
|---|---|
| Published Year |
$ 1.41 $ 1.88
ঘরের খোঁজে নিখোঁজ বাড়ি
বারংবার মিনতি করার পরও
ওখানটাতে কেনো ছুঁও
খুব ব্যথা পাই তোমার ¯পর্শ লাগলে
কলিজা সমেত হৃদয়ের আগাগোড়া
টনটন করে, চিলকে চিলকে ওঠে
নাড়ি নক্ষত্র আকাশ বাতাস
পূর্ব প্রতীচী বসতির দেহাত;
আগলে রাখা আকুতির দ্বীপাঞ্চলে
শিউরে ওঠে সমুদ্রের নোনাজল
লেপটে যায় চোখের কাজল
ভাষার ব্যঞ্জনায় সব অর্থ ফুটিয়ে তোলা যায় না
অকাতর অশ্রুজলে যার মন ভিজে না
তার আবার কিসের নদী কিসের সাগর
বাষ্পাচ্ছাদিত শ্রাবণের ঝোড়ো বাতাসে
স্বর্ণাভ ঠোঁট রেখে উষ্ণতা কমানোর নামই কি শান্তি
হেঁটে যাওয়ায় যে আবেগ অনুভূতি কাজ করে
উড়ে যাওয়াতে কি তা করে?
দোহাই তুমি আর ছুঁইয়ো না ঐখানে
আমি এখন ঘরের খুঁজে ঘর বেচে
ঘর খুঁজি তার কাছে, যে দুই কূলেই ঘর রচে।
| Weight | 0.200 kg |
|---|---|
| Published Year |
লেখক পরিচিতি :
নিখিল নওশাদ। জন্মসন: ১৯৮৯ইং। বড়িয়া, ধুনট, বগুড়া, বাংলাদেশ। ‘বিরোধ, ‘নিওর’ ও ‘নীড়’ পত্রিকার সম্পাদনা পরিষদের সাথে যুক্ত। এটি লেখকের প্রথম প্রকাশিত বই। এছাড়া ছোটগল্প বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন।
এটি একটি চিৎকার
সিদ্দিক প্রামানিক। জন্ম: ২১শে আগস্ট ১৯৭৯, কুস্টিয়ার কুমারখালী থানার চরভবানীপুরগ্রামে। বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স শেষ করে বর্তমানে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন এবং বাম প্রগতিশীল সংগঠনের সক্রিয় সংগঠক ও সংস্কৃতকর্মী। প্রথম বই ‘হাঙরের সমুদ্রে মননশীল মাছ’।
উন্মাদের কনসার্ট
অরণ্যক তপু। জন্ম: ১৯৯৪ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর, ঢাকার ঝিগাতলা। পৈত্রিক নিবাস বরিশালের পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলায়। বর্তমানে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত। এটি লেখকের প্রথম প্রকাশিত বই।
ব্যথিত ভায়োলিন
লেখক পরিচিতি :
শঙ্করী দাস। জন্ম: ৮ই মে, ১৯৫৮ সনে নিজ জেলা জামালপুরে। কবি প্রকাশিত অন্যান্য গ্রন্থগুলোÑ গল্প: ‘প্রতিবিম্ব ও অন্যান্য গল্প’ ‘জলমাটির গল্প’ ও ‘রাহুর চন্দ্রগ্রাস’। কবিতাÑ ‘ঘাসবোনা গ্রাম তাঁতবোনা গ্রাম’। স্মৃতিচারণমূলকÑ ‘গণমানুষের স্মৃতিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ’। গল্পের জন্যে পেয়েছেন পাক্ষিক ঐকতান (বর্ধমান) পত্রিকা পদক। শিশু কবি রকি সাহিত্য পুরস্কার ও নক্ষত্র সাহিত্য পুরস্কার।
বিহান বেলার ঈশ্বর
আবু জাঈদ। জন্ম: ২২শে জুলাই ১৯৮৩, ঢাকা। পড়াশুনা অসমাপ্ত রেখে একসময় কবি বাউণ্ডুলে জীবনের এলোমেলো আলপথে নেমে যান বেঁচে থাকার প্রয়োজনে, তাই বলে কাব্যচর্চা থেমে থাকেনি। এক সন্তানের জনক। এটি লেখকের প্রথম প্রকাশিত বই।
মানচিত্রের ফাঁসি চাই
নাহিয়ান ফাহিম। জন্ম: ২৩শে মার্চ, ১৯৮৪। ময়মনসিংহ জেলা। ঢাকাতে বেড়ে ওঠা। মূলতঃ পাঠক, ফলতঃ লেখক। সাহিত্য পত্রিকা ‘জলমাঝি’র সম্পাদক। মার্কেংটিং বিভাগে স্নাতকোত্তর। পেশাগত জীবনে একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ভিনদুপুরের নোটবই’।
মধ্যবিত্ত কবিতা
আত্মমুগ্ধ শিকল
হাসানআল আব্দুল্লাহ। জন্ম: ১৪ই এপ্রিল, ১৯৬৭। গোপালগঞ্জ জেলার গোপিনাথপুর গ্রামে। তিনি প্রবর্তন করেছেন নুতনধারার সনেট। তার মৌলিক কাব্যগ্রন্থর সংখ্যা দশ। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার কবিতার অনুবাদে প্রকাশ করেছেন বিশ্ব কবিতার কয়েকছত্র। অন্যান্য প্রকাশিত গ্রন্থ- সনেটগুচ্ছ ও অন্যান্য কবিতা, আঁধারের সমান বয়স, এক পশলা সময় প্রভৃতি। ২০০৭ ও ২০১৫ সালে নিউইয়র্কের কুইন্স শহরের পোয়েট লরিয়েট ফাইনালিস্টের সন্মান পেয়েছেন।
বৃত্তের কেন্দ্রেও কবিতার মুখ
ডালিয়া চৌধুরী। তোলারাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স মাস্টার্স শেষ করেছেন। কবিতার প্রতি ভালোবাসা থেকে কবিতা লেখার সূত্রপাত। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ, ‘অনুভবে সুখ’ ‘মেঘময় নিকুঞ্জে রধুন‘ ও ‘জলজ কামনা’।
নীল গোধূলি
ফারহানা খানম। জন্ম: ১৯শে এপ্রিল ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকায়। গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দীপে। ‘ভুগোল ও পরিবেশ’ বিষয়ে স্নাততোত্তর ডিগ্রী অর্জন করে ব্যাংকে চাকুরি শুরু করলেও বর্তমানে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। নয় ভাই-বোনের মাঝে সবার ছোট বলেই আদরও পেয়েছেন বেশি। প্রথম প্রকাশিত বই, ‘ইছামতি’ (কলকাতা থেকে প্রকাশিত)।
তৃষ্ণার্ত বালুতট
লেখক পরিচিতি :
হান্নান হামিদ, লেখক নাম কালের লিখন। জন্ম: আগস্ট, ১৯৮৪। জামালপুর। ‘বিশ্বাস শুধুই নিঃশ্বাস’ লেখকের প্রথম বই।
বিশ্বাস শুধুই নিঃশ্বাস
রনক জামান। জন্ম:১৬ই ডেসেম্বর ১৯৯১, মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলায়। লেখালেখির হাতেখড়ি ছোটবেলাতেই কবিতার প্রতি মুগ্ধতা থেকেই তার প্রতি ভালোবাসা। এটাই কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে, যৌথ কবিতাগুচ্ছ ‘মায়ানগরীর বৃষ্টিকথন’, কবিতার ই-বুক ‘শরীর ছোঁয়া আঙুলগুলো’ এবং অনুবাদ উপন্যাস ‘ললিতা’।
ঘামগুলো সব শিশিরফোঁটা
বাংলা ছোটগল্প নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে সম্প্রতি, গল্পে বাস্তববোধকে রূপায়িত সম্ভব, নাকি গল্প ছাড়া ছোটগল্প এগিয়ে যাবে এবং তা নতুন রীতির গল্প বলে আখ্যা পাবে, বাস্তব কথা মেনে চলা বড়ই কঠিন, হয়তো তা সম্ভব নাও হতে পারে, রূঢ় সত্য হলো সময়ই সঠিক মূল্যায়ন করবে।
তাহলে ছোটগল্পের সংজ্ঞা কি? কাকে ছোটগল্প বলবো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘ছোট কথা ছোট ব্যথা, ছোট-ছোট… অবশেষে শেষ হয়েও হইলো না শেষ’, কেউ বা বলেন, রবীন্দ্রনাথ তো ছোটগল্পকে মাটি আর মানুষের কাছাকাছি নিয়ে এসে দফারফা করেছেন, আসলে ছোটগল্প মানে জগদীশ গুপ্ত-অমিয়ভূষণ মজুমদার-কমলকুমার মজুমদার-জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী-দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কথাশিল্পীদের গল্পকেই বোঝায়। তাহলে তো পথ রুদ্ধ, কেননা এই চিন্তায় বসে থাকো, নতুন গল্প আর লেখো না, কি দরকার তাই না! এই বয়ান খয়রাত করেন বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক অধ্যাপক-বুদ্ধিজীবী বা সমালোচকগণ। আমার এক বন্ধুবর প্রায়শ বলে, “গল্প কাকে বলে, কীভাবে গল্প লিখতে হয়, এ-গল্পটি গল্পই হয়নি, হয়তো হতে পারতো শেষ ফিনিশিং মাঠে মারা গেছে, রমাপদ চৌধুরী-বিমল কর বা সমরেশ বসুর গল্পই আসলে গল্প আর সব ফালতু জঙ্গল”। লেখকেরা তাদের পেছনে হন্যে হয়ে ধরনা দেয়, অধ্যাপক নামধারী বুদ্ধিজীবী-সমালোচক তাকে নিয়ে একটু লেখেন, তাতেই ধন্য, কৃতার্থ হয়ে বিগলিত হাসি, “আহা কি ফতোয়া দিলেন গুরু, শনির দশা কেটে গেলো” অর্থাৎ প-িতদের শেখানো-দেখানো ছকে শেষঅবধি গল্প নির্মিত হচ্ছে, সমালোচকরা সাহিত্যের ইতিহাসে জায়গা দিলেই তো লেখক, নয়তো জীবনটাই বরবাদ! সময়-স্থান-পাত্র ভেদে যুগের সাথে চিন্তা এবং প্রকৃতি-পরিবেশের সঙ্গেই তো আমাদের পথচলা, এই পথচলা নিরন্তর, এখানে কতো নতুন ঘটনা কতো নতুন চিন্তা প্রতিনিয়ত উপস্থিত হচ্ছে, মানুষ কি সামনে যাবে না, পুরোনোর ভেতর দিয়ে নতুনকে চিনবো না, সমস্ত নতুনই তো পুরোনোকে অবলম্বন করে, কথাটা ভুলে গেলেও চলবে না। যুগ-যুগান্তর ধরে সমস্ত পুরোনোর ভেতরেই তো নতুনের জন্ম দেখি, সেই নতুনই আগামীর চলার গন্তব্য।
সেদিক বিচার করলে, মোটা দাগে বলতেই হয়, ছোটগল্পের বিষয়বস্তু খুব একটা পালটায় না, পালটায় শুধুমাত্র লেখকের দৃষ্টিকোণ বা ভঙ্গি-কাঠামো বা আঙ্গিক এবং স্বরভঙ্গি, ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করা যাক, একই বিষয় নিয়ে এক শতাব্দী ব্যবধানেও গল্প লেখা যেতে পারে, মানুষ সামাজিক জীব, সমাজের মধ্যে জীবনযাপন, সে সর্বপ্রথম জীবন-জগতের শিক্ষা নেয়, একজন লেখকও পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের ভেতরের তাবৎ অসামঞ্জস্য তাবৎ অনিয়ম এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে যাবতীয় ক্ষত-দুঃখ-কষ্ট-ক্ষোভ আনন্দ-ভালোবাসা নিয়ে আপন ভুবন বা বলয়, সে বলয় নিয়ে জীবন, সেখান থেকে শুরু-শেষ, অনেকে জীবনকে ভিন্নভাবে দেখে, কেউ বা সে বলয় থেকে খুব একটা বেরিয়ে আসতেও পারে না, মনে রাখা আবশ্যক যে, ছোটগল্প যুগযন্ত্রণার ফসল, বহু প্রচলিত বক্তব্য মেনে বলতেই হয়, এ-শিল্পটি শুধুমাত্র যুগযন্ত্রণারই নয়, সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক প্রয়োজনও ছোটগল্পের জন্মকে ত্বরান্বিত করেছে, শিল্পবিপ্লবের ফলে ধনতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশ, সামন্ততান্ত্রিক মন্থর জীবনযাত্রার অবসান ঊনিশ শতকের শেষপ্রান্তে ছোটগল্প রচনার পরিবেশ সৃষ্টি, ইউরোপ-আমেরিকান বুদ্ধিজীবীরা পারিবারিক গ্লানি বা ব্যক্তিগত সমস্যার দিকে তর্জনী উঁচু করলেন। পাশাপাশি ফ্রান্স ও রাশিয়ার সেই সমস্ত কথাসাহিত্যিকগণ সামাজিক সমস্যা ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তিলাভের জন্য তীব্রভাবে ব্যাকুল হয়েছিলেন, এডগার অ্যালান পো-ফ্লবেয়ার-মোপাসাঁ-তুর্গেনিভ-গোর্কী-গোগোল-পুশকিন-চেখভের গল্পে কঠিন বাস্তবতা ও সামাজিক চিন্তার প্রকাশ লক্ষ করা যায়। দুর্গত মানুষের বেদনা-ক্লেশ, অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনের তীব্র কঠিন বিভীষিকাময় প্রতিচ্ছবি, কখনো বা জীবনের প্রতি অন্যরকম নিবিড় মমতা গল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে আসে, তাদের লেখনী শক্তির মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যে ছোটগল্প মর্যাদার আসন লাভ। যে যৌনতার মধ্যে টি.এস এলিয়ট দেখেছেন দৈহিক বিকৃতি মানসিক অবমাননা ও আত্মিক অবক্ষয়, সেই যৌনতার মধ্যেই হুইটম্যান দেখেছেন মানসিক ও দৈহিক উৎকর্ষতা ও আত্মিক মুক্তি। এর কারণ অবশ্যই সময় এবং দৃষ্টিভঙ্গি, সময়ের সাথে-সাথে মানুষের চিন্তাভাবনার স্বর মানসিকতা ভাষাগত ব্যাপারখানিক পালটে যায়, হুইটম্যানের আমেরিকা তথা পাশ্চাত্য, টি.এস এলিয়টের আমেরিকা তথা পাশ্চাত্যের সত্তর বছর আগের, অন্যদিকে এলিয়টের অভিজ্ঞতা হয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের, এলিয়ট ধরে রেখেছেন সেই সময়কার তছনছ হওয়া মানবিক মূল্যবোধ, পাশাপাশি হুইটম্যান গড়ে তুলেছেন সত্য ও সুন্দরকে। তাই হুইটম্যানের কাছে যৌনতা ও প্রেম মানসিক উৎকর্ষতা ও আত্মিক মুক্তি। আর এলিয়টের কাছে যৌনতা ও প্রেম মানে যান্ত্রিক জীবনের তাৎক্ষনিক উচ্চারণ। কবিতায় হুইটম্যান প্রেমকে অন্যতম শিল্পসৌন্দর্যের ধারক হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন, জীবনের প্রতি তার সমান কৌতূহল, দেহ ও আত্মার প্রতি যেমন আগ্রহ, জড়বাদ ও ভাববাদ উভয়বাদেই তার সমান আস্থা। তার কবিতায় রয়েছে অস্তিত্বের প্রশ্ন, কখনো তা দেহে সীমিত, আবার কখনো দেহকে ছাড়িয়ে তা গগনবিহারী। জীবনকে বিভিন্নভাবে দেখতেই তার চরম কৌতূহল। বোদলেয়ার বলেছেন, ‘নিছক সৌন্দর্য সৃষ্টির আকুতি থেকেই সাহিত্যের উন্মেষ, সৌন্দর্য সৃষ্টি ছাড়া সাহিত্যের আর কোনো উদ্দেশ্যে নেই’। শিল্পসাহিত্যের মাধ্যমে নান্দনিক উপলব্ধির দ্বারা মানুষ আপন আত্মার সত্যে উপনীত হলে যে সামঞ্জস্যের সুষমা প্রতিষ্ঠিত হবে তার ব্যক্তিগত ও সমষ্টি জীবনে, হয়তো তাতেই প্রকৃত মঙ্গল, টলস্টয়ও বিশ্বাস করতেন, ‘শিল্পসাহিত্যের সার্থকতা এখানেই’।
জীবনানন্দের গল্পের মূল উপজীব্য মানুষ, মানুষের জীবনের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, সামাজিক-রাজনৈতিক বিচিত্র অবস্থার পরিবর্তনের ফলে মানুষের উপর প্রতিফলিত প্রতিক্রিয়া প্রভৃতি সমস্ত কিছুই খুটিয়ে-খুটিয়ে তুলে ধরেছেন গল্পে, ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের পাশাপাশি নদী-আকাশ গাছগাছালি-পানি গরু-ছাগল অন্ধকার নৌকা ঝাউবন-প্রেম-ভালোবাসা-যৌনক্ষুধা-অত্যাচার-লালসা কাঁটাঝোপ সকাল-দুপুর গ্রাম-শহর শহরতলী-বসতি ভোরের সোনালি রোদ্দুর তারপর এসেছে বেকারত্ব-দাম্পত্যকলহ-হীনতা প্রভৃতি কোনো কিছুই তার বিশ্লেষণের বাইরে যায়নি, সমস্ত উপাদান নিজের মতো ছকে সাজিয়ে পরিবেশন করেছেন পাঠকের দরবারে। মৃত্তিকা সংলগ্ন জনমানুষের যে জীবনালেখ্য, যে বৈচিত্র্যময় পরিবেশের অনুসন্ধান, তাকে কি বলবো, অবশ্যই জীবনের গল্প, জীবন এখানে বৈচিত্র্যময়-অনুভূতিপ্রবল আর তিক্ত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।
গ্রামীণ জীবনের বিচিত্র রূপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিলো তারাশঙ্করের, কঠিন ও অসুন্দর কর্কশ সংসারের চিত্র তিনি এঁকেছেন অনেক, গল্পের চরিত্রগুলো বিচিত্র পেশাজীবী-বৃত্তিধারী, গল্প ভাষাও ভিন্ন ধরনের। জীবনানন্দ দাশ বাংলাসাহিত্যে এমনই একজন, গল্পে তিনি চরিত্রের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়েছেন, গ্রামীণ জীবন-সমাজচিত্র তার নখদর্পণে, বেশ জমিয়ে বলতে পারেন, ভিন্ন-ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে যেতেও জুড়ি নেই, কোথাও-কোথাও বড় বেশি তাড়াহুড়োও দৃষ্টিগোচর হয়। গল্প জমতে না জমতে দেখা গেলো বনফুলের মতো শেষও হয়ে গেলো, তখনই পাঠক কেমন একটু হোঁচট খায় বৈ কি! তারপরও একাধিক বিচিত্র জীবিকা এসেছে গল্পে, তার গল্প বিকৃতির ভাষা ভিন্ন ধরনের, গল্পের উদ্দিষ্ট অভিপ্রায়ের কেন্দ্রীয় ভাববস্তুর উপযোগী আবহবদ্ধ-বিশ্লেষণী ভাষা প্রথম থেকে ব্যবহার করেন, জীবনানন্দের কয়েকটি গল্প নিয়ে আলোচনা করলে দেখা যাবে গল্পের শক্তিমত্তা কতোখানি, গল্পের মনস্তাত্ত্বিকতা ও বিষয়বিন্যাস আলোচ্য প্রবন্ধে তুলে ধরা।
‘গ্রাম ও শহরের গল্প’ শুধুমাত্র অনুভূতির ওপর নির্ভর করেই গড়ে ওঠেনি, গল্পটি একটা ঘেরাটোপের মধ্যে আবদ্ধ, এখানে একটা শক্তমক্ত কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে, চরিত্র আছে তিনটি, ঘটনা-উপঘটনার ভেতর দিয়ে কাহিনী এগিয়ে গেছে, ত্রিকোণ প্রেমের একটা সুখানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে, প্রকাশ, যে কিনা একজন সচ্ছল চাকুরে, তার স্ত্রী শচী শুধুমাত্র গৃহকত্রী, গুছিয়ে সংসার করছে, সন্তান হয়নি বলে কষ্টও নেই তেমন। এদের মাঝে জুটেছে পুরোনো বন্ধু সোমেন, যে কিনা খবরের কাগজে কাজ করে, শচী বিয়ে করেছে প্রকাশকে, সুখের সংসার লক্ষেèৗয়ে থেকে কলকাতায় এসেছে তারা, কলকাতার পরিবেশ তেমন একটা ভালোও লাগে না প্রকাশের, কেমন একটা ঘিনঘিনে স্বভাবের সে, সোমেনকে একদিন রাস্তা থেকে তুলে আনে প্রকাশ, সেই থেকে অবাধ যাতায়াত শুরু হয়ে যায় এ-বাড়িতে সোমেনের, ক্রমে-ক্রমে আবার ভালোবাসা যেন দানা বেঁধে ওঠে, কেউই ভুল করছে না তবুও ভুলের মধ্যে হারিয়ে যেতে থাকে শচী। একটা নেশা তাদের হাওয়ায় তুলে নিয়ে যায়, সময়ে-অসময়ে আসা-যাওয়ার ভেতর দিয়ে নতুন করে ভালোবাসা জাগ্রত হলে শচী ফিরে যেতে চায় অতীতে, তার কামনা-বাসনা ফুলে-ফেঁপে ওঠে, সোমেন বলে, মনে পড়ে একদিন বকমোহনার নদীর পাড়ে ভাঁট শ্যাওড়া জিউলি ময়নাকাটা আলোকলতার জঙ্গলে তোমাকে ছেড়ে দিয়েছিলাম…শচীর মধ্যে গ্রাম্যজীবনের প্রতি যে আকর্ষণ তাতে সোমেন আরো আগুন উসকে দেয়, এই নস্টালজিয়া তাকে কোনোক্রমে আর স্বস্তি দেয় না, তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, ভাবাবেগে বলে ওঠে, চলো না পাড়াগাঁয়ে, বকমোহনা নদীর ধারে! সোমেন বললো, সে পাড়াগাঁর জীবন তুমি কোনোদিন ফিরে পাবে না, সেই তেলাকুচো-ফণীমনসা বনধুঁধুল কোনো অন্ধকারে কোনো জ্যোৎস্নার কতো দূরে চলে গিয়েছে, আমরা তো আর সেখানে নেই, কি হবে সেসব দিয়ে? পেছনের স্মৃতিময় জীবনের গল্পগুলো একে একে সামনে এলেও তা যে আর কোনোদিন পুনরাবৃত্তি হবে না, অর্থাৎ মানুষ ইচ্ছে করলেই আর পেছনে ফিরে যেতে পারে না, বর্তমানেই থাকতে হয়, অতীত সে তো মৃত একটা ধ্বংসস্তূপ, তাকে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না, যেমন শচী ইচ্ছে করলেই প্রকাশকে ছাড়তে পারবে না এবং সোমেন ইচ্ছে করলেই শচীকে ফিরে পাবে না, সময় এবং স্মৃতি সর্বদা জ্বলন্ত শিখা হয়ে জ্বালায় বনভূমি-মনভূমি, হয়তো মানুষ দাবানল বলে কিন্তু বুকের ভেতর যে আগুন জ্বলে তাকে কি বলবে, অন্তর্জ¡ালা, নাকি আত্মার কষ্ট! যে মানুষ একবার চলে আসে, সে কি আর ফিরে যেতে পারে, পাড়াগাঁর মাঠ জঙ্গল কিংবা একটা সন্ধ্যা অথবা একটা রাত্রি, সোমেন বলে, তুমি তো ফিরে চলে আসবে আবার, মেয়েরা ভুলে যায় যতো সহজে, কারণ তারা পরিবর্তিত হতে সময় নেয় না, কিন্তু কি নিয়ে থাকবো আমি, ওই ক্ষতে আর আঘাত দিও না…এ-গল্পে জীবনানন্দের আত্মাকে দেখতে পাওয়া যায়, সোমেন যেন জীবনানন্দ হয়ে রূপান্তিত হয়েছে গল্পের আখ্যানে। নগরজীবনের আনন্দ যেভাবে এসেছে তেমনি পুরোনো স্মৃতি বা ফেলে আসা গ্রামীণ জীবনের যে আকর্ষণ তাও স্পষ্ট জলছবি হয়ে ফুটে উঠেছে ‘গ্রাম ও শহরের গল্পে’। গ্রামীণ এবং নাগরিক জীবনের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে তিনি সুকৌশলে পৌঁছাতে পেরেছেন বলেই তো জীবনশিল্পী। বাংলা ছোটগল্প গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের বিস্তৃত উপাখ্যানে সুসমৃদ্ধ। এমনকি গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের সমবায়ী তরঙ্গও দুর্নিরীক্ষা নয়। কিন্তু যান্ত্রিক কোলাহলে সমস্ত স্মৃতি ও ঐতিহ্য আবেগ, কোমল অনুভবময়তা কালের নির্মম পদপাতে পিষ্ট-বিনষ্ট হয়ে গ্রামীণ সমাজ ও জীবনের ক্রমশ নাগরিক হয়ে ওঠার হৃদয় চুরমার করা হাহাকারে শিল্পিত রূপান্তর বাংলা ছোটগল্পের এলাকার দুর্লভ। পরের গল্পে জীবন যন্ত্রণার ছবি অঙ্কিত হয়েছে।
‘মেয়ে মানুষ’ জীবনানন্দের গুরুত্বপূর্ণ গল্প, মনস্তাত্ত্বিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে মানুষ কখনো নিজেকে হারিয়ে ফেলে, তখন সে নিজেই সৌন্দর্যের একটি রূপ নির্মাণ করে, অথবা কদাচিৎ তুলে ধরে, এখানে তারই প্রকাশ পেয়েছে, হেমেন এবং দ্বিজেন গল্পের প্রধান চরিত্র, হেমেন ছোট্ট একটা ব্যবসা থেকে প্রচুর অর্থের মালিক, কিন্তু দ্বিজেন মূলত আইনজীবী, অথচ দুজনই নিঃসন্তান, সন্তানের হাহাকার সেভাবে কারো মধ্যে না থাকলেও একটা শূন্যতা তাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, হেমেনের স্ত্রী চপলা স্বামীহৃদয় নারী, আর দ্বিজেন স্ত্রী লীলা অন্যমূর্তির মানুষ, কিন্তু লীলার স্বামী সুদর্শন হলেও হেমেন সুপুরুষ নয়, দু’বন্ধুর জীবনের স্ত্রী প্রভাব নিয়েই গল্পের মূল বিষয়, কঠোর পরিশ্রম এবং সংগ্রামের জীবন অতিবাহিত করবার পর আর্থিক উন্নতি লাভ করে হেমেন, কিন্তু নিঃসন্তান তারা, মানসিকভাবে বিমর্ষ-অবসন্ন, তাই স্বপ্নহীন জীবন যেন, তাদের জীবনে মেয়েমানুষ একটা বিশাল প্রভাব বিস্তার করে আছে, মানুষ সত্যি সত্যিই ওই একটা শেকড়ের কাছে বারংবার ফিরে আসে, স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্কের গভীর যে বন্ধন, তা কেবল অর্থবিত্তের উপর দাঁড়িয়ে থাকে না, শ্রদ্ধা-ভক্তি বা বিশ্বাস-ভালোবাসা জীবনের জন্য প্রয়োজন হয়, কিন্তু লীলা ওই সত্যকে মানতে চায় না, জীবনানন্দ প্রত্যক্ষ করেছেন একজন পুরুষের জীবনে হৃদয়বতী নারীর প্রেম কতোটা আবশ্যক, বিবাহিত স্ত্রীর কাছে থেকেই হোক বা পরস্ত্রীর নিকট থেকেই হোক কিংবা অন্য কোনো নারী থেকেই হোক না কেন, প্রতি পুরুষই নারী ভালোবাসা পেতে ইচ্ছুক, জীবনানন্দ সচেতন কথাশিল্পী বলেই হেমেন-চপলা দ্বিজেন-লীলার ভেতরের দ্বন্দ্ব চাক্ষুস করেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমাজের বা সংসারের এই টানাপোড়েন মানুষের জীবনকে অতিক্রম করে এবং তারপরও মানুষ নিজের প্রয়োজনে নিজেকে গড়ে তোলে।
‘মা হবার কোনো সাধ’ গল্পে জীবনের লেনদেনের হিসাব বেশ সাবলীলভাবে ধরা দিয়েছে, জীবন সত্যি বিচিত্র বিভীষিকাময় ছবি হয়তো একেই বলে, গল্পের প্রধান চরিত্র প্রমথ, যে গ্রাম থেকে সুদূর কলকাতায় একটা মেসে থাকে, চাকুরী সন্ধান করাটাই যেন তার একটা কাজ, সে বছর দুই আগে বিয়ে করেছে, মেয়েটির নাম শেফালী, জীবনের কোনো মানেই সে বোঝে না, হয়তো বোঝার মতো বয়স তার হয়নি বা পরিস্থিতির মধ্যে সে পড়েনি, শেফালী অন্তঃসত্ত্বা, গ্রাম থেকে স্বামীকে সে চিঠি লেখে পাতার পর পাতা কাকুতি ভরা প্রেমে সিক্ত, কতো গল্প তাতে রঙে রঙিন হয়ে থাকে, দিন দিন সে আসন্নপ্রসবা হয়, গর্ভাবস্থার প্রথমদিকে প্রমথ বেশ কয়েক মাস গ্রামেই ছিলো, অথচ শেফালী যখন ক্রমে অসুস্থ হয়ে পড়ে, সেসময় প্রমথ কলকাতা পালিয়ে যায়, জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো যাকে বলে, কিন্তু শেফালী নিয়মিত চিঠি লেখে, কয়েকটি টাকা যেন পাঠায়, কারণ গর্ভের শিশুটিকে নিয়ে খুব কষ্ট পাচ্ছে, দুধ-ডিম-কলা বা ভালো কিছু খাওয়াটা প্রয়োজন, নয়তো সে নিশ্চিত মারা যাবে, এভাবে বাঁচার আর ইচ্ছেও তার নেই, তারপরও সে বাঁচতে চায়, জীবনকে সুন্দরভাবে দেখতে চায়। কিন্তু তার স্বামী প্রমথ বেকার, একটা চাকুরীর জন্য কলকাতায় পড়ে আছে, শাশুড়িও দেখতে পারে না শেফালীকে, ডানা কাটা পরীর মতো শেফালীর মা হবার কোনো সাধ ছিলো না, কারণ সে জানতো, মা হলে তার স্বামী প্রমথকে চাকুরীর সন্ধানে যেতে হবে, খরচের বিষয়টা দেখতে হবে, অর্থাৎ স্বামীকে কাছ ছাড়া করার কোনো ইচ্ছে তার ছিলো না, তারপরও একটা শিশু আসছে এবং সে কারণে প্রমথকে কাজের জন্য অথবা শেফালীর কষ্ট দেখতে না হয় সেজন্য দূরে পালিয়ে থাকতে হয়, নিয়মিত চিঠি আসে এবং সে পড়ে, জীবনের প্রতি ঘৃণা ধরে যায়, সর্বশেষে বারো টাকা পাঠাতে বলে, কলিকাতার মেসের খরচা থেকে বারো টাকা পাঠানো কঠিন, কিন্তু বারো টাকা না হলেই নয়, বাচ্চা হওয়ার জন্য ওই টাকা অতি প্রয়োজনীয়, চিঠির ভাষা রঙের মতো বদলে যায়, ভালোবাসা যেন আরো প্রগাঢ় হয়ে ধরা পড়ে, প্রমথ তবুও নিশ্চুপ থাকে, তার যেন কিছুই করার নেই, দরিদ্রতা এভাবেই মানুষকে কর্তব্যজ্ঞান থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। তারপর এক পূর্ণিমার দিন টেলিগ্রাম এলো, শেফালীর মেয়ে হয়েছে মেয়ে, কিন্তু শেফালী চলে গেছে, গল্পে যে মস্ত একটা ধাক্কা, তা হলো দারিদ্র্যে আশাহীন জীবনের জীবন। মানুষ বুঝি এভাবেই হেরে যায়, হারতে-হারতে জীবন হয় ধোঁয়ার ধূসর পা-ুলিপি।
সম্বোধনহীন চিঠির আকারে লেখা গল্প ‘সঙ্গ নিঃসঙ্গ’, চিঠি এবং ডায়েরির মতো ভঙ্গি, কখনো মনে হবে কতোগুলো চিঠি পরপর সাজানো, ‘মা হবার কোনো সাধ’ গল্পের মতোই একই আঙ্গিকে নির্মিত রচনা, ঘটনাপ্রবাহে আছে অনেক কবিত্বময়তা, আছে বিরহকাতর উপমা, অনেকটা কবিতার মতো করেই বলা, তবে গল্পের বা চিঠির বিষয় ভিন্ন, পত্রলেখক একজন হতভাগ্য পুরুষ, যার জীবনে অনেক শখ ছিলো, বউ তার পা টিপে দেবে, পাখা দিয়ে বাতাস করবে, কিন্তু বাস্তব বড়ই কঠিন, তিন বছরের বিবাহিত জীবন, অথচ স্ত্রী অনুপমা বাপের বাড়ি, বিয়ের পর কয়েক মাস স্বামীর কাছে ছিলো, আজ বাড়ি অন্ধকার, মা কাশী গিয়েছে বিধবা বোন চারুকে নিয়ে, বাপ আর গল্পকথক ছেলে দুই বিঘের উপর বাড়িতে থাকে, বাড়ি-ঘরের প্রাচীনতম অবস্থা, দেখাশোনার কোনো মেয়েমানুষ নাই, তাই চারদিকে জঙ্গল, শিয়ালের চিৎকার, লক্ষ্মীপেঁচা-জোনাকি তো আছেই, ইঁদুর-ছুঁচা-সাপও বাড়ির আনাচে-কানাচে বাসা বেঁধেছে, তেলাপোকা-চামচিকেয় ভরা বাড়ি, কাজের মানুষ হিমাংশুর মা রান্না করে দেয় বটে, তা মুখে দেওয়া না গেলেও খেতে হয় বাধ্য হয়ে, এসব কথা ইনিয়ে-বিনিয়ে পত্রের মাধ্যমে জানায়, পত্রের ভাষায় স্বভাবতই প্রত্যাশিত রোমান্টিক বা অনন্ত বিকাশিত প্রেমের রূপায়ণ দৃষ্টি কাড়ে, অথচ প্রত্যাশা কখনো পূরণ হয় না, দীর্ঘশ্বাসের একটা কু-ুলী হয়ে সঞ্চিত হয়, অনুপমা পিতাগৃহে গেছে তিন বছর, স্বামী বেচারির কোনো খোঁজ-খবর নেয় না, সে নিজের ভেতর নিজে মৃতপ্রায়, একটা জিজ্ঞাসা এবং হতাশা সর্বসময় কাজ করে, জীবনানন্দের অন্যান্য গল্পের মতোই হতাশা-বিচ্ছেদ মৃত্যু-কষ্ট দুঃখ-দৈন্যতা ‘সঙ্গ নিঃসঙ্গ’ গল্পেও ফুটে উঠেছে।
‘কুষ্ঠের স্ত্রী’ গল্পের প্রধান চরিত্র সুশোভন, যার মুখপোড়া দাগ দেখে লোকে কুষ্ঠের দাগ বলে এবং বিয়েও হতে চায় না, অনেক ভালো-সুন্দরী পাত্রী হাতছাড়া হয়, কন্যাপক্ষকে যতোই বোঝানো যায় কিন্তু তারা গঙ্গাযাত্রীর কাছে মেয়ে বিসর্জন দেবে না। অবশেষে বাপ-মা নেই, এমন একটা এতিম মেয়ে অতসীকে পাওয়া গেলো, যে বুড়ো মামার ঘাড়ে আছে, যথারীতি বিয়ে হলেও অতসী প্রথমে চন্দনের ফোঁটা মনে করে কিছু না বুঝলেও পরে শিউরে ওঠে, ভয়ে দূরে সরে যায় এবং সে একসময় বলে যেহেতু তুমি আমার মামাকে ঠকিয়েছো, আমাকে ঠকিয়েছো, তোমার বিষয়-সম্পত্তি আমাকে সব লিখে দেবে, নয়তো মামার সঙ্গে চিরকালের মতো চলে যাবো। পরবর্তী সময়ে সুশোভন দেখে, অতসীর দাঁতের দু’পাটি ক্ষয় ধরেছে, মুখের ভেতরটা পায়খানার গহ্বরের মতো গভীর বিকৃত ছোট-বড় এবড়ো-থেবড়ো খাদ। স্নানের পর মনে হলো যতোটা সুন্দরী ভেবেছিলো প্রকৃতপক্ষে তা সম্পূর্ণ ভুল, হয়তো চোখের ভুল, মানুষ কি এভাবেই নেশায় পড়ে ভালোমন্দ বিচার না করে অন্ধকারে হারিয়ে যায়। গল্পটি একটা দোলাচলের নবদাম্পত্যজীবন কাহিনী, নবজীবনের স্বাদের পূর্বেই একটা ভাঙাগড়া একটা অমীমাংসিত কুহুকের হাতছানি।
‘অশ্বত্থের ডালে’ গল্পে একজন প্রধান চরিত্র নির্মল, যার আর্থিক দৈন্যতা ঘুরেফিরে ফুটে উঠেছে, ওর বাবা-মা আছে, বোনও আছে, একটি মেয়ে এবং মেয়ের মা অর্থাৎ বউও আছে, কিন্তু তারপরও নির্মল সেখানে নেই, দারিদ্র্যের পোড়াকাষ্ঠে প্রতিনিয়ত জর্জরিত, জীবনে শখ-সাধ বলতে বই পড়া, অথচ তাও জোটে না, কলিকাতা থেকে নতুন-নতুন বই কিনে আনার সাধ্য নেই, আর তাই পুরোনো পত্রিকা পড়ে নিজেকে ভুলে থাকতে হয়, পাড়াগাঁর রাত্রি কাটে না, ঘুমও আসে না, পেঁচা-বাদুড়ের ডাক শোনে, জ্যোৎস্নার ভেতর খড়ের মাঠের খেঁকশিয়ালের দৌড় দেখে, জীবনটাকে ছোট নদী ভাবে, আবার নিজেকে গুটিয়ে নেয়, একদিন রাত্রের অন্ধকারে মজুমদারের উঠোনের দিকে যায়, সেখানে বংশলোচন নামের একজন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, সে কি ভূত নাকি মজুমদারের আত্মা, কিন্তু সে জীবনের অনেক গল্প করে, হয়তো ভৌতিক কিংবা রহস্যজনক কিছু হবে, তবে গল্পে যে মানুষের কথা এসেছে, সে তো জীবনের কাছ থেকে পুরোদস্তুর উপেক্ষিত।
‘জামরুলতলা’ গল্পেও সেই আর্থিক সংকট প্রকট হয়ে ধরা দিয়েছে, গ্রাম্যজীবনের রোমান্স হিসেবে জামরুলতলাকে দেখেছেন লেখক, হারানি নামের যে মেয়েটিকে কথক একটু-একটু ভালোবেসেছিলো, হয়তো তা পরিপূর্ণ না-ও হতে পারে, দেখাসাক্ষাৎ হতো কখনো-সখনো, সে হারানি কলিকাতায় বি.এ পড়বে, চাকুরী একটা করবে হয়তো, কিন্তু অবনী কি একটা কাজ করেছে, হারানির বাবার বয়সী অবনীর সঙ্গে বিয়ে, জীর্ণ অসুস্থ মানুষ কিনা সুন্দরী-সুশ্রী হারানির সাতপাঁকে বাঁধা কথকের মর্মপীড়ার কারণ হয়, চাকুরিহীন-রোজগারহীন কথক তাই শুধু নির্বাক দর্শক, তার বুকের ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই সমাজের কাছে, হারানিকে নিয়ে কিছু স্মৃতি আছে পোড়া দাগের মতো, জামরুলতলায় রোজ দুপুরবেলায় আসতো কিশোরী মেয়েটি, কথক টেবিলের ওপর কলম রেখে চুপচাপ দেখতো, সে দেখার মধ্যে অন্যরকম একটা নির্মল আনন্দ বা আকর্ষণ ছিলো, জীবনানন্দের গল্প ভিন্নধর্মী মেজাজ-স্বর এবং জীবনতৃষ্ণায় লালিত, জীবনের অনেক গভীরে তার গল্পের শেকড়, গল্পটি উত্তমপুরুষে লেখা, আশিরনখ যে কবি এবং গল্প লেখে, কখনো অন্তরের তাগিদে আবার কখনো বা গল্পকার হওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষায়, কথক বলে যায়, তার কথা একটানা নয়, কিছু অবিন্যস্ত-অসংলগ্ন এবং খাপছাড়া। ভাষায় যতোই বুনোট থাকুক না কেন, কাব্যিকতাকে আশ্রয় করে বেড়ে উঠলেও গল্প যেন ভাসা-ভাসা রয়ে যায়, জীবনানন্দের সেই এলোমেলো জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যার ফলে জামরুলতলা গল্পে গল্পকথক বলেছে, অনেক বাংলা গল্প অনেক জায়গায় তো পড়েছি, গল্পটা আমার সে সমস্ত গল্পের কোনো একটার মতো হবে নাকি? যে দ্বিধা নিয়ে তার পথ চলা তা যেন আরো স্পষ্ট হয়েছে। গল্পে অভিনতুন আঙ্গিক, কাহিনী উপস্থাপনের স্বতন্ত্রভঙ্গি গ্রামীণ পটভূমি, বিষয় ও ভাষাশৈলী আপাদমস্তক স্বাতন্ত্র্য, স্বতঃস্ফূর্ত তার বর্ণনাবিন্যাস, প্রয়োজনীয় ডিটেলস্ বা প্রতিবেশ বর্ণনায় জীবনানন্দ সার্থক।
‘রক্তমাংসহীন’ মনস্তাত্ত্বিক গল্প, এ গল্পে নির্মম সত্য হলো, দারিদ্র্য স্বামী মানুষটি বড় সহজ-সরল, নিজেকে গুছিয়ে রাখার মতো ক্ষমতাও নেই, দীর্ঘদিন পর স্ত্রী ঊষা বাপের বাড়ি যাবে, কিন্তু যাবে-যাবে করেও ইচ্ছে করেই যায়নি, এদিকে তিন বছর বিয়ে হওয়া, দারিদ্র্যের মধ্যে বাস, কিন্তু বাপের বাড়ি যাবে, সেখানেও বাপ-মা নেই, ভাই-বোন আছে, হয়তো সে কারণে বাপের বাড়ি যাওয়ার কোনো উৎসাহ নেই, স্বামী বেচারী বারংবার ঊষাকে সাবধান করে, স্টিমারে যেন ঠান্ডা না লাগে, বুঝে-শুনে যেতে, তার সঙ্গী আছে যদিও হিমাংশু, ঊষারই ভাই, নিঃসন্তান এক নারীর কষ্ট বেশ ফুটে উঠেছে গল্পে, তার যদি একটা বাচ্চা থাকতো, স্টিমারে স্পিরিট স্টোভ জ্বালিয়ে দুধ গরম করে খাওয়াতে হতো, গম্ভীর হয়ে ঊষা বলে, ছেলেপিলের সুখ আর পেলাম না, আমাদের দুজনের মাঝখানে এই শূন্যতাটা রয়ে গেলো। তারপর স্বামী বেচারী অজ্ঞাতসারেই কিন্তু অনিবার্যভাবেই ঊষাকে তার বাপের বাড়ি ভাই-বোনদের কাছে যেতে দেয়, যেন কয়েকদিন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে স্বামী, একটু নিরিবিলি একটু নিজের মতো করে থাকা যাকে বলে, যখন বলে, যাও কিছুদিন গিয়ে থাকো, অনেকদিন তো বাপের বাড়ি যাওনি…ঊষা ক্ষেপে যায়, তাই বুঝি তোমার চক্ষুশূল হয়েছি। স্ত্রী যেন কোনোভাবেই স্বামী ছেড়ে যেতে চায় না, দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যে থাকতে-থাকতে স্ত্রী ঊষাও নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে, সেখান থেকে দূরে যেতে তার মন সায় দেয় না, তারপরও যেতে হয় তাকে, যায় সে। এভাবে কয়েকদিন কেটে যায়, অজ্ঞাত অন্ধকারে হাত তার নিজের নিয়মে চলে, দিন দশেক পরে খবর এলো, ঊষার মৃত্যু! সন্ধ্যার সময় কলেরা…শেষ রাতে চলে গেছে, কলেরায় এ-রকম প্রায়ই হয়ে থাকে। মৃত্যু কি ভয়াবহ, তার কাছে ভালোবাসা বা দারিদ্র্য অথবা সন্তানহীনের কষ্টের কোনো দাম নেই, সে যেন ভয়ংকর একটা দানব, সমস্ত পৃথিবী অন্ধকার করে সে চলে যায়, তার কোনো হাত নেই, সবই নিয়তি!
‘শাড়ি’ গল্পে এক দারিদ্র্যনিমজ্জিত দম্পতি এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে, দরিদ্রতা যে একটা অভিশাপ তার প্রকাশ লক্ষ করা যায়। স্বামী রণজিৎ অনেক কষ্ট এবং যন্ত্রণা সহ্য করতে পারলেও স্ত্রী ঊষা বুঝেও বুঝতে চায় না, কিংবা কখনো-সখনো ভুলেই যায় যে তারা কতোটা বাস্তবতার মুখোমুখি, জীবনানন্দ হয়তো এভাবেই জীবনকে দেখেছেন, নানান রঙে নানান ভাবনায়, শাড়ি গল্পটিকে প্রতীকধর্মী বললেই হয়তো বেশ ইঙ্গিতবাহী হয়, ঊষার নিকটাত্মীয় রমেন বেড়াতে আসতে চায় কয়েক দিনের জন্য তাদের কাছে কিন্তু রণজিৎ সোজাসাপটা জবাব, নিষেধ করে দাও, নইলে পূর্বের মতো অপমান সহ্য করতে হবে মনে রেখো, মানুষ কতোখানি অসহায় হলে এমন কথা বলতে পারে, শেষাবধি দেখা যায় চিঠি কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলে ঘরে খিড়কি দিয়ে ফুপিয়ে-ফুপিয়ে কাঁদে ঊষা, হয়তো এছাড়া তার কি বা করার আছে! অথচ যখন দরজায় ফেরিওয়ালা বিশ্বেশ্বর কাপড়ের গাঁটরি নামায় এবং হাঁকে, বউমা কোথায়, নতুন ফ্যাশনের কাপড় এনেছি…তারপর সত্যি অবাক লাগে, কাপড় দেখার জন্য দুজন কেমন হুমড়ি খেয়ে পড়ে, নিজের জন্য কিনতে না পারলেও দেখে বা নেড়েচেড়ে শখ মেটায়, বেনারসী-ভাগলপুরী শাড়ির জন্য মন কেমন ছটফট করে, কিন্তু কেনার সমর্থ্য নেই, গাঁটরির প্রতি লোলুপতায় ঊষার মন কেমন করলেও চোখ দুটো ছানাবড়া হয়, তারপরও দেখার যে বিলাস তা থেকে তারা সরতে রাজি নয়, একটা আকাক্সক্ষা মরে গেলেও অবশিষ্ট পড়ে থাকে স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে, উভয়ের মধ্যে যে কিছুক্ষণ আগে একতরফা ঝগড়া হয়ে গেছে, তা যেন তাদের কারো স্মরণে নেই, তারা যে শাড়ির নেশায় মগ্ন, সেই মগ্নতার ভেতর দিয়ে মানুষ বাঁচে এবং হাসে অথবা ভালোবেসে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। গল্পের পটভূমি নিম্ন মধ্যবিত্ত একটা পরিবারকে কেন্দ্র করে, আবহ বেশ রহস্যময়তা সৃষ্টি করেছে, অনুভূতি সর্বদা কাজ করে, একটা দেয়াল ঘিরে আছে, সে দেয়াল ভাঙতে হবে। সে দেয়াল ভাঙনের ফলেই প্রত্যাশিত সেই সমাজ আসবে। বেঁচে থাকার জন্য সমাজতন্ত্রের চেতনা জাগ্রত আবশ্যক, সমাজকে যে অন্যভাবে দেখতে চায়, গাল্পিক জীবনযাপনের জন্য রাজনৈতিক আবহ-কালচেতনাকে শিল্পের ভাষায় চিত্রায়িত করেছেন, এ গল্পের তার স্বাক্ষর বহমান।
মূলত গ্রামীণ জনপদের ভাঙন-সামাজিক শোষণ, কখনো প্রতিবাদ বা বাঁচার সংগ্রাম, এ সমস্ত বিষয়াদি জীবনানন্দের গল্পজগত। বাংলাসাহিত্যাকাশে কথাশিল্পী জীবনানন্দ দাশ এক অনন্য প্রতিভা বলতেই হয়। তার জীবদ্দশায় গল্পগুলো আলোর মুখ দেখতে পারেনি। গল্পের ভাষা নির্মাণ বাক্যশৈলী ও গল্পের উপস্থাপনায় স্বীকৃত পাওয়া যায়, গ্রামীণ গল্প বাংলাসাহিত্যে প্রাণ, তার গল্পের বিশাল একটা অংশ গ্রামীণ জীবনধারার অস্বীকার করা যায় না।
বাংলাসাহিত্যে ছোটগল্প গ্রামীণ জীবন অতিক্রম করে ক্রমশ শহরমুখী হয়ে উঠছে, তুলনাসূত্রে উল্লেখ করা আবশ্যক, আমাদের ছোটগাল্পিকরা নিম্নবিত্ত বা গ্রামীণ জীবন চিত্রণে যতোখানি সুদক্ষ-স্বচ্ছন্দ-বস্তুনিষ্ঠ অপরদিকে কিন্তু নগরজীবনের মধ্যবিত্ত জীবনযাপন চিত্রণে অতোখানি আগ্রহী বা স্বচ্ছন্দ নয়। জীবনানন্দ দাশের কাব্যে ইউরোপীয় শিল্প মতবাদকে আত্মস্থ করে লোকজ মিথ-রূপকথা-পুরাণ ও ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে যুগগত ভাবকে বাণীরূপ দেন অবলীলায়। বিষয়-বিষয়ী ও ভাবের অন্তরে ফল্গুধারার ন্যায় বাহিত হয় অখ- কালচেতনা। এ কারণেই শ্বাশত সত্যের শানিত শরীর ঠেলে কোনো বিশেষ একটি শিল্প মতবাদ তার কাব্যদেহে কুত্রাপি প্রাধান্য বিস্তার করেছে, ফলত জীবনানন্দ দাশের কালচেতনা-উপস্থাপনার কৌশল হিসেবে গ্রামীণ জীবন থেকে আহরিত উপাদান ব্যবহার তাকে ত্রিশোত্তর বাংলাভাষী বা বাঙালি কবিদের দলভুক্ত না করে অভিষিক্ত করেছে স্বতন্ত্র মর্যাদায়।
মূলধারা সাহিত্যের রকমফের
দিনের বৃষ্টির চেয়ে রাতের বৃষ্টি অনেক বেশি আবেদন নিয়ে মানুষের কাছে ধরা দেয়। ঝড়ের রাতে মেঘের ডাক মানুষের মনে অজানা এক রহস্যের আভাস দেয়। শিক্ষা সফরে রাঙামাটি গিয়ে এমনই এক ঝড়ের রাতে অতিপ্রাকৃত সব গল্পের আসর জমে ওঠে। গল্পের মধ্যমণি বিশ্ববিদ্যালয়ের ষাটোর্ধ্ব বয়সের একজন অধ্যাপক। মেঝেতে থাকা অর্ধগলিত মোমের আলোর সাথে বৃদ্ধ এই শিক্ষকের তীক্ষ্ণ চোখ আর ভারী গলা পরিবেশকে আরো গম্ভীর করে তোলে। গ্রাম বাংলার প্রচলিত নানান ভৌতিক গল্পের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা তিনি ছাত্রদের মাঝে উপস্থাপন করেন। এক সময় যখন মনে হতে থাকে অতিপ্রাকৃত বলে কিছু হয় না, সকল কিছুই বিজ্ঞান। ঠিক তখন এই অধ্যাপকের কণ্ঠ হতে ভেসে আসে ভিন্ন সুর। এবার তিনি বলতে আরম্ভ করেন তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া বিচিত্র আর অদ্ভূত সব গল্প । অবারিত এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সকল ঘটনা ব্যাখার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। শেষ বেলায় এসেও কোথায় যেন একটা ‘কিন্তু’ থেকেই যায়…
রাত যত গভীর হতে থাকে আধ্যাত্মিকতা সবাইকে তত আচ্ছন্ন করতে থাকে।
Adhyattik by Ariful Alam
প্রজ্ঞা প্রসঙ্গে :
বাক্-ফসলের মতো জন্ম হয় আমি ও অ্যান্টি-আমি’র। নিজেকে ঘিরে এই অপব্যয়িত ঘুরে দেখা, এরপর বহিরঙ্গে ঘূর্ণন, এই নিয়েই কবিতার কাজ। কখনও কখনও মনে হয়, জেনবাদের Abstruseness হলো, কবিতা।
ভেদ আছে, সংযোগ আছে; আছে Zero Thinking- প্রকৃতই যা না, তাই যদি কবিতা হতো, তবে ঈশ্বর এবং কবিতায় পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যেতো না। আমি সেই খুঁজে ফেরার দিকে এক খণ্ড গোলাপযান।
গোলাপ ও আফিমের প্রজ্ঞা
লেখক পরিচিতি :
নাম: সৈয়দ রায়হান বিন ওয়ালী। লেখক নাম: সৈয়দ ওয়ালী। জন্ম: ১৭ জানুয়ারি ১৯৬৭, ঢাকা মেডিকেল, ঢাকা। জন্মের পর শৈশবের বেশ ক’বছর কেটেছে পুরনো ঢাকার বংশালে। তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পারিবারিক কারণে পিতার নানা বাড়ি গাজীপুরের কালিয়াকৈর জমিদার বাড়ির গ্রামীণ পরিবেশে কেটেছে শৈশব-কৈশোরের আরো ক’টা বছর (১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬)। যার সুবাদে গ্রামকে ভেতর থেকে নিবিড় করে দেখার যে এক অলঙ্ঘনীয় দৃষ্টি ও বোধ সেই ছোটকাল থেকেই গড়ে উঠেছিল তা আজও তেমন বেধক রকম ক্রিয়াশীল। কালিয়াকৈর জমিদার বাড়িতে বেশ ক’বছর কাটাবার পর ১৯৭৬ সালের পর সেই যে মোহাম্মদপুরে শুরু হয়েছিল জীবনের চাকা এখনো সেখানেই চলছে সে তার মতো করে পার্থক্য এটাই যে আগে বাড়ির কর্তা ছিলেন বাবা আর গত এক যুগের অধিক কাল ধরে সেই চরিত্রে লেখককে অভিনয় করে যেতে হচ্ছে।
বিনত খসড়া
চন্দন আনোয়ার। গল্পকার, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক। জন্ম: ৮ই জানুয়ারি, ১৯৭৮, নাটোর। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক পদে নিযুক্ত আছেন। লেখকের ‘শাপিত পুরুষ’ ‘ইচ্ছা মুত্যু’ ‘বাংলা ছোট গল্প’ ও ‘তিন গোত্রজ গল্পকার, মানিক-হাসান-ইলিয়াস’ সহ আরো অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে।
এই সময়ের কথাসাহিত্য-২
সিদ্দিক প্রামাণিকের কবিতায় টুকরো আখ্যান আর নাট্যমুহূর্তের ব্যবহার অভিনব। রহস্য আর রূপকের দক্ষ আড়ালে তিনি বলে যান নিজের সময়, জনপদ আর মানুষের বিচিত্র গল্প। পাঠক বিস্ময়ের অভিঘাতে থমকে যান, কখনো শোকে আর্দ্র, কখনো ক্রোধান্ধ হয়ে পড়েন। সবশেষে কবিতা-ই তার সারসত্য নিয়ে জেগে থাকে।
বাংলা কবিতায় সিদ্দিক পরিব্রাজকের মতো আসেননি, এখানে থাকতে এবং রাজত্ব করতেই এসেছেন। আতশবাজির খেলা নয়, বারুদের বিস্ফোরক ক্ষমতা-ই তাঁর পছন্দ। সহজেই বোঝা যায় এই কবির জামার আস্তিনে আরো অনেক জাদু উন্মোচনের অপেক্ষায়।
কবি ও কবিতার জয় হোক।
সরদার ফারুক
বাতিল বেশ্যার ডায়েরি
কবিতার পথ কণ্টকময়। চিরকাল কবির আরাধ্য, তবু কবিতা অধরা থেকে যায়। এটা সত্য, কবির ঔরসে কবিতার জন্ম। কিন্তু যখন কবি থাকেন না, তখন কবিতাই বহন করে কবির অলৌকিক স্বর।
এক যুগ ধরে কবিতা-পথের যাত্রী মুহাম্মদ ফরিদ হাসান। তার লেখাগুলো প্রধানত প্রেম, সৌন্দর্য চেতনা, দর্শন যাপনের অভিঘাতকে কেন্দ্র করে। সরল বাক্যবন্ধে কবিতায় তার উচ্চারণ চিরকালীন।
মিথ্যুক আবশ্যক তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। প্রিয় পাঠককে কবির শিল্পজগতে আমন্ত্রণ।
মিথ্যুক আবশ্যক - Mitthuk Abosshok
দুরবিন উল্টো হয়ে পড়ে আছে
গ্যালিলিও অন্ধ; সেই কবেই নিভে গেছে আলেকজান্দ্রিয়া; নালন্দার দীর্ঘশ্বাস গোপনে হজম করে বেড়ে উঠেছে ইতিহাসের অন্ধকার; বহু শতাব্দী নিভৃতে কেঁদেছে মহেঞ্জোদারো।
আমার বুকের ভেতরে নিয়ত পুড়ছেন জিওর্দানো ব্রুনো; লাঞ্ছিত হচ্ছেন হাইপেশিয়া; বেঘোরে গর্দানের ভয়ে অপমানিত আলোক-বর্তিকার মতো মাথা নত করে ঘরে ফিরছেন ইমানুয়েল কান্ট;
দ্রাবিঢ়-রমণীর অসহায়ত্বের উঠোনে সগর্বে গজিয়ে ওঠা যে ধর্ষকামী সভ্যতা, তার সাথে আঁতাত করে এই যে বৈঠা বাওয়ার তোড়; একে কি জীবন বলে !
দুরবিন উল্টো হয়ে পড়ে আছে;- এই
স্বপ্নের বাগানে কোনো কুসুমের দ্যাখা নেই
ব্যক্তিজীবনে, এবং সমাজ, রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক ঘুর্ণায়নে একের পর এক বিবিধ অন্ধকারের আগমন ঘটে চলেছে। সকল অন্ধকার সবার চোখে পড়ে না। সবাই একই ঘটনা বা দৃশ্যকে অন্ধকার বলে মনেও করেন না। কিন্তু যে-চোখ, তা দেখে, তার কাছে এগুলো অসহ্য বেদনার। অমেয় অন্ধকারের পরিত্রাণহীন বেদনা তাকে কুরে কুরে খায়। সেইসব পরিত্রাণহীন অন্ধকার রাজ্যের কিছু কিছু দৃশ্যকে কবিতায়ন করবার চেষ্টা এই পুস্তকটির প্রধান বৈশিষ্ট্য। এর এক-একটি কবিতা যেন আলোক-প্রত্যাশী প্রাণের পারিজাতে প্রষ্ফূটিত অন্ধকার রাজ্যের নিশানা…।
এই বইয়ের পাণ্ডুলিপি পড়ে নব্বইয়ের কবি শামীম নওরোজ লিখেছেন- ‘কবি বলছেন ‘অন্ধকার সিরিজ’, আমি এই কাব্যগ্রন্থের সকল কবিতা পড়ে বলতে চাচ্ছি ‘আলো সিরিজ’। আমার মনে হচ্ছে এই কাব্যের সকল শব্দে, পংক্তিতে ছড়িয়ে আছে আলো’–
ANDHAKAR SIRIJ by Kumar Deep
সিদ্দিক প্রামানিক। জন্ম: ২১শে আগস্ট ১৯৭৯, কুস্টিয়ার কুমারখালী থানার চরভবানীপুরগ্রামে। বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স শেষ করে বর্তমানে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন এবং বাম প্রগতিশীল সংগঠনের সক্রিয় সংগঠক ও সংস্কৃতকর্মী। প্রথম বই ‘হাঙরের সমুদ্রে মননশীল মাছ’।
উন্মাদের কনসার্ট
রাহমান ওয়াহিদ
জন্ম, বেড়ে ওঠা ও সর্বশেষ অবস্থান: জন্ম বগুড়ার কাহালু থানার পাইকড় গ্রামে, ১৯৫৬ সালের ১৭ জানুয়ারি। শহরের কাটনার পাড়ার করনেশন হাইস্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর ১৯৬৩ সালে বাবার চাকরির সুবাদে পাবনার রেল জংশনের শহর ঈশ্বরদীতে যাওয়া। সেখানে বেড়ে ওঠা এবং স্কুল কলেজ পেরোনো। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর। ১৯৮১ সালে সরকারী চাকরিতে যোগদান। ২০১৫ সালে সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত। চাকরির প্রয়োজনে ঢাকাতেই কেটেছে দীর্ঘ ২৭টি বছর। বগুড়ায় মাঝেমধ্যে আসা যাওয়া হতো। ২০১৭ সালের জুলাই থেকে বগুড়ার দক্ষিণ মালগ্রামে নিজ বাড়িতে আমৃত্যু অবস্থান চলছে। দুই কন্যার জনক। তারা সপরিবারে ঢাকায়।
লেখালেখি: ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির অভ্যেস। এখনও চলছে। মূলত কবি। কবিতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, মুক্তগদ্য ও শিশুতোষ গল্পও লিখছেন। দেশ-বিদেশের সাহিত্য পত্রিকাসহ স্থানীয় প্রধান প্রধান সব ক’টি জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত লিখে চলেছেন।
Raahman Wahid
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান বহুমাত্রিক প্রতিভার নিরবচ্ছিন্ন কুশিলব। সাহিত্য গবেষণা ও বিশ্লেষণসহ মৌলিক সৃষ্টিকর্মে তাঁর ভূমিকা অনবদ্য। কবিতার পথে তাঁকে দেখা গেলেও গদ্য তাঁর প্রধান ক্ষেত্র। সবকিছুর পাশাপাশি ফরিদ ছোটদের গল্পও লেখেন, যা দেখে অভিভূত হতে হয়। চমৎকার গদ্যে একেবারে শিশু পাঠকের জন্য তার গল্প নির্মাণকৌশল অতুলনীয়। তার ছাপ দেখতে পাচ্ছি ১২টি গল্প নিয়ে ফরিদের ‘গল্পগুলি পুচ্চিদের’শিশুতোষ গল্পগ্রন্থে। ছোট পরসরে, ছোট-ছোট কোমল সহজ বাক্যবন্ধনে রচিত এই গ্রন্থের প্রতিটি গল্পই স্বতন্ত্র চমক।
একদম শিশুদের নিয়ে, তাদের জন্য সুখপাঠ্য ১২টি গল্প, বিচিত্র বিষয়সমৃদ্ধ ‘গল্পগুলি পুচ্চিদের’। গল্পে এসেছে একদম শৈশবের চঞ্চলতা, স্কুল ও ক্লাসরুম খুনসুটি, বন্ধুদের ছোট-ছোট দ্বন্দ্ব ও রেষারেষি, পাখি, প্রজাপতি ইত্যাদির সঙ্গে সম্পর্ক আর ভৌতিক, জাদু বা স্বপ্নের বিষয়াবলি। ছোটদের জন্য চিরাচরিত গল্পে প্রবেশের আকর্ষণ ধরে রাখার মশলাপাতিও আছে গল্পগুলোতে।
প্রথম গল্প ‘জাদুর বাংলা বই’, ‘রাশেদ ও নীল ভূত’, ‘পার্থ রহস্য’-সহ প্রতিটি গল্পই হালকা রহস্য, একটু একটু চমক আর গল্পের উপাদানে হয়ে উঠেছে ছোটদের প্রকৃত খাঁটি সাহিত্য- যাকে আমরা বলি শিশুসাহিত্য।
প্রকৃত শিশুতোষ গদ্যের এখন আকাল চলছে আমাদের সাহিত্যে। এরকম সময় মুহাম্মদ ফরিদ হাসানের শিশুতোষ এই গল্পগ্রন্থটি মেঘে ঢাকা আকাশে একটুকরো আলোক। শুধু শিশু-কিশোর নয় এই বইটি তাদেরও পড়া উচিত যারা শিশুর জন্য নিখাঁদ একটি সাহিত্য ডোমেন-এর স্বপ্ন দেখেন।
অভিনন্দন মুহম্মদ ফরিদ হাসানকে। সেই সঙ্গে প্রকাশককেও।
-ফারুক হোসেন
শিশসাহিত্যিক ও ছড়াকার
Golpoguli Puchchider - Muhammad Farid Hasan
ফারহানা খানম। জন্ম: ১৯শে এপ্রিল ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকায়। গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দীপে। ‘ভুগোল ও পরিবেশ’ বিষয়ে স্নাততোত্তর ডিগ্রী অর্জন করে ব্যাংকে চাকুরি শুরু করলেও বর্তমানে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। নয় ভাই-বোনের মাঝে সবার ছোট বলেই আদরও পেয়েছেন বেশি। প্রথম প্রকাশিত বই, ‘ইছামতি’ (কলকাতা থেকে প্রকাশিত)।
তৃষ্ণার্ত বালুতট
চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা সহযোগে রেজা রাজা’র কবিতায় চেতন ও অবচেতনের অদৃশ্য জগত মূর্ত হয়ে ওঠে। তাঁর কবিতা স্বপ্ন, কল্পনা, কামনা, বাসনার চিরন্তন প্রবৃত্তিকে অনন্য কাব্য ভাষায় প্রকাশ করে। অভিজ্ঞতার ঐশ্বর্যে ঋদ্ধ এসব কবিতা। যেন ঘোরলাগা মধ্যাহ্নের মাতাল মিউজিক বেজে ওঠে তাঁর পংক্তির পর পংক্তিতে। জাগতিক যন্ত্রণা আর অযথা হট্টগোলে অসহায় কবি রচনা করেন অনন্য কবিতা। প্রেম, কামনা, বাসনা, নস্টালজিক আবেগ, অনুভূতি কবিতার পরতে পরতে আলো ছড়ায়। কবিতাগুলি বেশির ভাগই বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত।
মধ্যাহ্নের মাতাল মিউজিক
ছোটোদের উপযোগী সাহিত্য রচনা করতে হয় প্রাঞ্জল ভাষায়। নরম মনের স্বপ্নসাঁকো শাব্দিক ঝড়-ঝাপটায় যেন নড়ে না ওঠে। ওদের মনস্তাত্ত্বিক পরিমণ্ডলে যেন বিরূপ প্রভাব না পড়ে। বিকাশমান সৃষ্টিশীল চেতনার পথগুলো যেন রুদ্ধ না হয়। মগজের কোষে যেন বিরুদ্ধ বাতাস আঘাত করতে না পারে। তবে হ্যাঁ, যে সমাজে শিশুরা বেড়ে উঠছে, সেই সমাজের কুসংস্কার থেকে মুক্ত করতে, স্বপ্নখেকো অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ফিরিয়ে আনতে ওদের মানসজগতে মৃদু শাব্দিক টোকা দেওয়া বা জাগরণের মৃদু স্পন্দন তোলা যায়। তবে সেটাও করতে হবে অত্যন্ত সচেতনভাবে। নিখাদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশ্লেষণের মাধ্যমে। কাঁচা মস্তিষ্কের কতটুকু ধারণক্ষমতা এবং হাসতে হাসতে, খেলতে খেলতে, নাচতে নাচতে কতটুকু গ্রহণ করতে পারবে- সেসব বিষয়ে সুচারু মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সচেতনভাবে ‘মা ও কাশফুল’ গ্রন্থের গল্পগুলো রচনা করা হয়েছে। বর্জিত হয়েছে নেতিবাচক শব্দগুলো, বিষয়গুলো। প্রত্যেকটি গল্পেই শিশুদের মনোবিকাশের জন্য কোনো না কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উপাদান রয়েছে, যা নির্মল আনন্দের মধ্য দিয়ে শিশুকে নিয়ে যাবে আলোর জগতে। বড়োরাও গল্পগুলো পাঠ করে আনন্দ পাবে।
Ma O Kashful - Abedin Jony
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.





















There are no reviews yet.