Additional information
| Weight | 0.365 kg |
|---|---|
| Published Year |
$ 4.01 $ 5.35
১৯০৬ সাল থেকে রচিত মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ী ক্ষুরধার গানগুলো নিয়ে কাজ করার তীব্র অনুভবে তাড়িত হই। গান নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা না-করার অভাব থেকে এ গবেষণার জন্ম। সুযোগ আসে ২০০৯ সালে। তা অবশ্য কিছু দূর এগোনোর পর শেষও হয়ে যায়। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আবার কাজটি শুরু হয় সরকারি অর্থায়নে। তখন নতুন করে সাজাই ফেলোশিপ গবেষণার সূচিপত্র।
আগে চেয়েছিলাম সময়ক্রমে গবেষণা কাজটা করতে; পরে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণা-সৃষ্টিতে দেশাত্মবোধক গানের ভূমিকা (১৯৪৭-৭১)’ গবেষণার অধ্যায় বিভাজন করি—
ভূমিকা, দেশাত্মবোধক গানের পটভূমি, ১৯৪৭-৫২ সনের ভাষা আন্দোলন পর্বের গান, ১৯৬৯-৭০ সনের গণ-অভ্যুত্থান পর্বের গান এবং ১৯৭১ সনে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ পর্বের গান।
তবে শেষের পর্বটিতে তিনটি সেমি-পর্ব যুক্ত হয়—প্রেরণামূলক বঙ্গবন্ধুর গান, সংগ্রামে-সংগীতে নারীর অবদান এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান।
গ্রন্থটিতে ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন এবং নজরুল স্বরলিপিকার সুধীন দাস এবং বিশিষ্ট গণ সংগীতশিল্পী শুভেন্দু মাইতি (যিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অর্থ সংগ্রাহক ছিলেন)—তিন বিশিষ্ট জনের সাক্ষাৎকার সংযোজিত হয়েছে। প্রায় ৯০০টি দেশপ্রেরণামূলক গানের তালিকা দেয়া হয়েছে।
গবেষণার দীর্ঘ পথে অনেক বাঁধার সম্মুখীন হই। তবে ধৈর্য ধারণ করে সবটা সহ্য করেছি; গবেষণা কর্মের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে। পরম করুণাময়ের অপার কৃপায় কাজটি শেষ করতে পেরেছি। তিনি সর্বোতভাবে সাহায্য করেছেন; সে প্রমাণ প্রতি মুহূর্তেই পেয়েছি। বাকিটা বিবেচনার ভার সম্মানিত পাঠকদের।
ফেলোশিপ গবেষণাটির প্রকল্প পরিচালক হিসেবে সার্বিক দায়িত্বে ছিলাম আমি।
যাদের আন্তরিকতা, সহযোগিতা পেয়েছি, তারা হলেন—
শ্রী গোবিন্দলাল দাস, শ্রী করুণাময় অধিকারী, জনাব ড. মূহ: আব্দুর রহীম খান, লিপিকা ভদ্র, সঞ্জয় কুমার বণিক, মল্লিকা দাস, ড. সাইম রানা, ড. সেলুবাসিত, ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন (গিয়াস শামীম), ড. রঘুনাথ ভট্টাচার্য, আবদুল মতিন, সুধীন দাস, শুভেন্দু মাইতি, মোবারক হোসেন খান, সেলিম রেজা প্রমুখ সুহৃদগণ। সবাইকে কৃতজ্ঞ-চিত্তে স¥রণ করছি।
সময়ে-অসময়ে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় যাদের, তারা হলেন আমার পূজনীয় শিক্ষক—ড. সাঈদ-উর রহমান এবং অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক।
গবেষণা কাজটির মূল্যায়ন করেছেন আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক। তার আশীর্বাদকে ভক্তি জানাই।
‘মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম’-এ প্রেরণাদায়ী গানগুলোর যাদুমন্ত্রে যুদ্ধ জয়ের নেশায় বীর বাঙালি দুর্বার গতিতে ছিনিয়ে এনেছে স্বাধীনতা।
সেই গানগুলোর পটভূমি এবং গানগুলো সম্পর্কে সকলে জানতে পারবেন যার সহযোগিতা, সহমর্মিতায় তিনি—অনুপ্রাণন প্রকাশনের সত্ত্বাধিকারী আবু এম ইউসুফ ভাই। এই ফেলোশিপ গবেষণা ও সমীক্ষা ধর্মীগ্রন্থটি অনুমোদন ও প্রকাশের উদ্যোগ নেবার জন্য তার প্রতি অপরিসীম আন্তরিকতা প্রকাশ করছি। ২০২০ সালের বইমেলার বই-প্রকাশনার সীমাহীন ব্যস্ত সময়ের মধ্যেও গ্রন্থটির নামকরণ করে তিনি কৃতজ্ঞাপাশেবদ্ধ করেছেন।
ড. শিল্পী ভদ্র
ঢাকা।
| Weight | 0.365 kg |
|---|---|
| Published Year |
চন্দন আনোয়ার। গল্পকার, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক। জন্ম: ৮ই জানুয়ারি, ১৯৭৮, নাটোর। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক পদে নিযুক্ত আছেন। লেখকের ‘শাপিত পুরুষ’ ‘ইচ্ছা মুত্যু’ ‘বাংলা ছোট গল্প’ ও ‘তিন গোত্রজ গল্পকার, মানিক-হাসান-ইলিয়াস’ সহ আরো অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে।
এই সময়ের কথাসাহিত্য-২
রবীন্দ্র-গল্পগুচ্ছে নারী বিষয়ক গ্রন্থটি একটি এম.ফিল গবেষণা-অভিসন্দর্ভ। ১৯৮৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে যার ডিগ্রি অর্জিত হয়। অর্থাৎ প্রায় একত্রিশ বছর আগে এর রচনাকাল। এটা অবিসংবাদিত যে, রবীন্দ্রনাথই বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ছোটগল্পকার। তাঁর পঁচানব্বইটি গল্প-সংকলনের নাম গল্পগুচ্ছ। সমগ্র গল্পগুচ্ছ এক বিশাল চরিত্রশালার অন্তঃরাজ্য। গল্পগুলো তাঁর অন্যান্য রচনাবলি থেকে ব্যতিক্রম এজন্যে যে, এখানে আছে ‘মাটির কাছাকাছি’ মানুষের জীবন-যাপন। নিম্নবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত Ñ এসব সাধারণ মানুষের জীবনের সমস্যা, সামাজিক সমস্যা, রাষ্ট্রীয় সংঘাত, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, রক্ষণশীলতার সঙ্গে প্রগতিশীলতার সংঘর্ষ, এমনকি সমাজের পতিত নারীর জীবন-চিত্রণও এখানে বাদ যায় নি। ‘শাস্তি’-র দুখি-ছিদাম-রাধা-চন্দরা বা ‘সমাপ্তি’-র মৃন্ময়ী, ‘দিদি’ গল্পের দিদি অথবা ‘বিচারক’-এর রক্ষিতা ক্ষিরোদাকে রবীন্দ্র-সাহিত্যের আর কোথাও পাওয়া যাবে না। তবে এটা ঠিক যে, গল্পগুচ্ছে আছে নারী-চরিত্রের প্রাধান্য। পুরুষ-চরিত্রের চেয়ে নারীচরিত্রগুলো অনেক বেশি উজ্জ্বল, অনেক বেশি শক্তিশালী ও জীবনঘনিষ্ঠ। ক্ষেত্র-বিশেষে নারীচরিত্রগুলো উপন্যাসের নারীচরিত্রের চেয়েও অধিক তাৎপর্যপূর্ণ ও ব্যঞ্জনাময়। ‘হৈমন্তী’ গল্পের হৈমন্তী, ‘স্ত্রীর পত্র’-এর মৃণাল, ‘নষ্টনীড়’-এর চারুলতা, ‘পয়লা নম্বর’-এর অনিলা, ‘রবিবার’-এর বিভা এবং ‘ল্যাবরেটরি’-র সোহিনী একেকটি যুগের একেকটি স্মারক। অভিসন্দর্ভটিতে সমকালীন জীবন ও সমাজকে যেমন বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তেমনি চরিত্রগুলোকেও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। আশা করা যায়, পাঠক এবং গবেষক উভয়েই এর দ্বারা উপকৃত হবেন।
রবীন্দ্র-গল্পগুচ্ছে নারী
যাপিত জীবনে ঘটে যাওয়া আমাদের অনেক অভিজ্ঞতা কিংবা ঘটনাই হয়তো আমরা দ্বিতীয়বার ভেবে দেখি না, কিংবা ধরে নেই- এমনটাই তো হবার কথা। কেন একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে “স্যার” না বলাতে তিনি রেগে গেলেন কিংবা কেন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কিংবা গবেষণা নিয়ে গর্ব অনুভব না করে অন্য সবকিছু নিয়ে গর্ব অনুভব করছেন? কখনো আবার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ছেলেটি কেবলই অর্থের পেছনে ছুটছে; সেই ছুটতে গিয়ে জীবনের একটা লম্বা সময় হয়তো পার হয়ে গিয়েছে; মাঝখান থেকে জীবনকেই হয়তো আর উপভোগ করা হয়নি। আমাদের সবাইকে কী তবে সফল হতে হবে? সফল হতে গিয়ে চলার পথে অন্য কাউকে ফেলে দিয়ে বড় হওয়াটাই কি সফলতা, নাকি মানুষের মতো মানুষ হলে আমরা তাকে সফল বলবো? আমাদের যাপিত জীবনের গল্পগুলো হয়তো অন্যরকমও হতে পারতো। মানুষ হবার প্রবল আকুতিই হয়তো প্রতিফলিত হয়েছে এই বইটিতে।
এসো মানুষ হই
সাহিত্য নিয়ে আমি ভাবি।এরমাঝে,কবিতা আমার আরাধ্য বিষয়।কবিতার বিশ্বমাঠে
আমি বিচরণ করতে ভালোবাসি। এই যে বিচরণ,তা থেকে অনেক পুষ্প,অনেক পাতা
আমি ঘরে তুলি। সেগুলো বার বার ফিরে দেখি।
এই যে চয়নপর্ব- তা থেকে আকর নিয়ে আমি লিখি আমার মতো করে।
বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য,কবিতার মাঝে আমি বাঙালি কবিদের প্রাধান্য এজন্যে দিই-
কারণ আমিও এই ভাষারই একজন লেখক।এই গ্রন্থে তেমনই কিছু প্রিয় লেখক,তাঁদের
লেখা, শিল্প-সংস্কৃতি-কবিতার বিভিন্ন জ্যোতিরেখা নিয়ে আমি লিখেছি।
‘যতিকল্পের প্রতিপৃষ্ঠা’-নামটি এক আধ্যাত্মিক আদেশে পাওয়া। কারণ এই বইয়ের নাম আমি চার বার বদলিয়েছি মনে মনে। যা সাধারণত আমি করি না। আমার বইয়ের নাম এক ভাবনায়ই ঠিক হয়ে যায়। এই বইটির নাম,একটি ঝলকের মাধ্যমে একটি শক্তি আমাকে পৌঁছে দিয়েছে। সে এক মহান অভিজ্ঞতা। এর বেশি এখানে শেয়ার করা সঙ্গত হবে না।
বইয়ে ৩৩টি প্রবন্ধ আছে। পাঠকসমাজ, পড়ে নিজের মত মিলিয়ে দেখতে পারেন। এই বইটি খুব যত্নের সাথে প্রকাশ করেছে- অনুপ্রাণন প্রকাশন,ঢাকা।
এর স্বত্বাধিকারী শ্রদ্ধেয় আবু এম ইউসুফ ও তাঁর টিমের কাছে বিনীত কৃতজ্ঞতা।
সাহিত্য মানুষকে ভাবায়। আর সেই ভাবনার উদ্রেক করতে যারা কাজ করেন তারা সত্যিই মহান। আমাদের সকলের মহানুভবতা,সাহিত্যকে মানুষের আরও
কাছাকাছি নিয়ে আসুক।
সুপ্রিয় পাঠক-পাঠিকা, এই গ্রন্থ থেকে অন্তত কিছু লেখা আপনাদের ভালো লাগলেই
আমার সার্থকতা ।
অনেক প্রীতি সবাইকে।
ফকির ইলিয়াস
২৮ ডিসেম্বর ২০২১
নিউইয়র্ক
যতিকল্পের প্রতিপৃষ্ঠা
লেখকের কথা
জাপানের প্রাতঃস্মরণীয় মনীষী শিল্পাচার্য ওকাকুরা (কাকুজোও) তেনশিন বলেছিলেন, জাপান এশিয়ার জাদুঘর। আমি বলি, জাপান একটি বৈশ্বিক দর্পণ। বিশ্বের চতুর্দিক তথা চারটি মহাদেশের ছবি এই দর্পণে প্রতিফলিত হয়ে আসছে হাজার বছর ধরে। বিশ্বের প্রায় সব সংস্কৃতিরই ধারা এসে মিলিত হয়েছে জাপানের মূলধারার সঙ্গে। বিশেষ করে ধর্ম ও সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে এই দেশের জনধারায়। সন্দেহ নেই যে, চীন ও ভারতের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। মধ্য যুগ পর্যন্ত ক্রমাগত জাপান প্রভাবিত হয়েছে প্রাচীন চীন ও ভারতের ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস, পুরাণদ্বারা। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী, গোত্রের মানুষ প্রাচীনকালেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপবর্তী জাপানের ভূখণ্ডে এসে স্থানীয়দের সঙ্গে মিলেমিশে গেছে। যে কারণে জাপানিরা সংকর জাতির লোক। আর এর ফলেই জাপান হয়ে উঠেছে সংস্কৃতির মনোরম বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি দেশ। যার তুলনা খুঁজে পাওয়া যায় না। যে সংস্কৃতির টানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাঁচবার ভ্রমণ করেছেন জাপান। প্রতিবারই তিনি জাপানকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন।
জাপানে যারা আসেন প্রথমে তাদের কাছে সবকিছুই অদ্ভুত প্রতিভাত হয়। কেননা জাপানিদের জীবনধারাটাই স্বাতন্ত্রিক। কিন্তু দীর্ঘদিন এ দেশে বসবাস করলে পরে তাদের আর বুঝতে বাকি থাকে না যে, তারা সঠিক দেশেই এসে পড়েছেন! এখানে জীবনযাপন যেমন খুব বাস্তব ও কঠিন তেমনি স্বপ্নের বাস্তবায়ন বা ইচ্ছেপূরণের সমূহ সম্ভাবনাও বিদ্যমান। বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা। কাজের দেশ জাপান, ইচ্ছে করলে কাজ জোগাড় করা কঠিন কিছু নয়। আর রয়েছে উচ্চশিক্ষার বিস্তর সুযোগ। তবে, অবশ্যই জাপানিদের নিয়মনীতি মেনে চলা প্রথম ও শেষ শর্ত। কেননা, যতোই তারা বহির্বিশ্বের প্রভাব গ্রহণ করে একটি সর্বজনীন সংস্কৃতি ও বাতাবরণ নির্মাণ করে থাকুন না কেন, জাপানিরা কিন্তু মনেপ্রাণে ও আদর্শে জাপানিই। “জাপানিজম” বা “জাপানিত্ব” তাদের মধ্যে সর্বক্ষণ সর্বক্ষেত্রে জাগরুক। শান্তি ও বিশ্বাস এই দেশের মূল ভিত্তি। বিশ্বাস হারালে জাপানে আর বসবাস সম্ভবপর নয়, শান্তি বিঘিœত হওয়ার মতো কাজ জাপানিরা প্রশ্রয় দেন না। আস্থা, বিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম, মহাধৈর্যগুণ, অনুচ্চকণ্ঠ, সময়ানুগ, প্রতিবেশী-সম্প্রীতি, সহমর্মিতা, সমবায়মনস্কতা, অনুসন্ধিৎসা জাপানিদের চারিত্রিক পরিচয়। আর এইসব গুণাগুণ জাপানি সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে নিহিত আছে।
জাপান প্রবাসের চার দশক হতে চললো। এই দীর্ঘ সময়ে জাপানকে দেখা, জানা ও পড়ার মধ্য দিয়ে যে ধারণা ও অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে তারই প্রতিফলন রয়েছে এই গ্রন্থের ২৫টি ছোটবড় প্রবন্ধের পরতে পরতে। প্রবন্ধগুলো ২০১৫ থেকে ২০০২১ পর্যন্ত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার উপসম্পাদকীয়, সাহিত্য সাময়িকী, সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন এবং সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। সংকলনভুক্ত করার তাগিদে নতুন করে তথ্য-উপাত্ত সংশোধিত ও সংযোজিত করার প্রয়াস নিয়েছি। আশা করি পাঠক বহুকিছু জানতে পারবেন এই প্রবন্ধগুলো থেকে যা বাঙালির ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনকে উন্নত করার জন্য শিক্ষণীয় বলে বিশ্বাস করি। সেইসঙ্গে জানা যাবে বাংলাদেশ ও জাপান সম্পর্কবিষয়ক তথ্যসমূহ যা দুর্লভ বলেই বিবেচিত।
উদীয়মান “অনুপ্রাণন প্রকাশন” কর্তৃপক্ষ এর আগে “জানা অজানা জাপান” ৩য় খণ্ড প্রকাশ করে আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন। এবারও ৪র্থ খণ্ড প্রকাশ করে আমাকে চিরঋণী করছেন। এজন্য জানাই আনত ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। যেহেতু প্রবন্ধগুলো গবেষণামূলক, তাই ভুলভ্রান্তি যেমন থাকবে, তেমনি লেখকের মতামতের সঙ্গে পাঠকের মতভিন্নতা থাকাই স্বাভাবিক। তার জন্য সকল দায়দায়িত্ব লেখকেরই, প্রকাশকের নয়।
Jana Ajana Japan Part-4 By Probir Bikash Sarkar
স্বকৃত নোমান। কথাসাহিত্যিক। জন্ম ১৯৮০ সালের ৮ই নভেম্বর, ফেনির পরশুরাম উপজেলার বেলোনিয়ায়। শৈশবে ঊর্দু, আরবি ও পারসি সাহিত্যে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে সেলিম আল দীনের কাছ থেকে পাশ্চাত্য ও বাংলা সাহিত্যের গভীর পাঠ গ্রহণ করেন। বর্তমানে ঢাকায় সাপ্তাহিক সংবাদ ম্যাগাজিন এই সময় এর সহযোগী সম্পাদক হিসাবে কর্মরত। ২০১২ সালে এইচএসবিসি কালি কলম সাহিত্য পুরস্কার পান। ‘বেগানা’ ‘হীরকডানা’ ও ‘নিশিররঙ্গিলা’ উপন্যাসসহ মোট প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা
কথাসাহিত্যের অলিগলি
জন্ম : ০২ জানুয়ারি, ১৯৮৩-তিতাহাজরা, বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী। বেড়ে ওঠা পাহাড়তলী, চট্টগ্রামে। লেখাজোখার প্রতি আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই।
প্রথম লেখা ছাপা হয় মাসিক রহস্যপত্রিকায়। ২০০০ সালের মাঝামাঝি লেখালেখিতে সচেতনভাবে মনোযোগী হন। তার লেখা প্রকাশিত হতে থাকে দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিকসহ অজস্র পত্রপত্রিকায়। সমানতালে লিখেছেন লিটল ম্যাগাজিনেও। দীর্ঘদিন যাবত সম্পাদনা করছেন পাঠকপ্রিয় লিটল ম্যাগাজিন ‘প্রকাশ’। গল্প লিখতে এবং গল্পকার পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সিরিয়াস লেখার পাশাপাশি রম্য ধাঁচের রচনায়ও মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। মাসিক উন্মাদ অতঃপর দৈনিক প্রথম আলোর তুমুল জনপ্রিয় ফান ম্যাগাজিন আলপিন-এর মাধ্যমে রম্যচর্চার হাতেখড়ি। এরপর থেকে লিখেছেন দৈনিক পত্রিকার ক্রোড়পত্র হিসেবে প্রকাশিত বিভিন্ন রম্য-বিদ্রƒপ সাময়িকীতে।
পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন পা-ুলিপি সম্পাদনা, লেখালেখি এবং সাংবাদিকতাকে। বর্তমানে একটি জাতীয় দৈনিকে সাব এডিটর হিসেবে কর্মরত।
প্রকাশ (নির্বাচিত গল্প বিষয়ক প্রবন্ধ)
ফকির ইলিয়াস৷ মূলত: কবি৷ এছাড়া অবাধ যাতায়াত আছে প্রবন্ধ ও গ্রন্থসমালোনায়৷ সাংবাদিক হিসাবেও ব্যাপক পরিচিতি আছে৷ প্রবাসে বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি-লালন ও চর্চায় তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন৷ এযাবত্ প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা তেরটি৷ বিভিন্ন দেশের সাহিত্য পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে নিয়মিত লেখা ছাপা হচ্ছে৷ ‘ঠিকানা শ্রেষ্ট গ্রন্থ পুরস্কার’ ‘ফোবানা সাহিত্য পুরস্কার’সহ আরও অকে পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন দেশে ও বিদেশে৷ বর্তমানে স্বপরিবারে নিউইয়র্কে বসবাস করছেন৷
সাহিত্যের শিল্পঋণ
জন্ম: ১ জানুয়ারি, ১৯৭৪।
জন্মস্থান- মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার রাজারচর কাজিকান্দি গ্রামে।
প্রকাশিত বই-
১. কাব্যগ্রন্থ- বিরুপা’র শূঁড়িবাড়ি(২০১৪)
২. অণুগল্প সংকলন- পঞ্চাশ(২০১৫)
৩. মহাপ্রভু ও অন্যান্য অণুগল্প(২০১৬)
৪. কাব্যগ্রন্থ- একজ্বলাপঙক্তি(২০১৬)
অণুগল্পের অস্তিত্ব আছে
আত্মবিস্মৃত এবং আত্মবিস্মৃতিপ্রবণ এক জনসম্প্রদায়ের নাম ‘বাঙালি’। বাঙালি বারবারই তার আত্মপরিচয় ভুলে গিয়েছে, ভুলে থেকেছে, ভুলতে চেয়েছে এবং ভুলে যেতে চায়। আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে বাঙালি কখনো উচ্চাভিলাষী, কখনো হীনমন আবার কখনো-বা বিভ্রান্ত। এই জনসম্প্রদায় আত্ম ভুলে বারবারই অপরের রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নিয়েছে, অপরের পরিচয় গায়ে মেখে গৌরব বোধ করেছে ও করছে। এমনকি, তাকে কোথাও বাঙালি বলে চিহ্নিত করা হলে কিংবা বাঙালি বলে চিহ্নিত হয়ে পড়লে সে হীনমন বোধ করেছে এবং করে থাকে। তথাপি ‘বাঙালি’ শব্দটির প্রতি এই জনসম্প্রদায়ের রয়েছে এক অদ্ভুত মোহ। যদিও-বা সে ধার করা পরিচয়টিকেই তার আত্মপরিচয় হিসেবে প্রাধান্য দেয়, কিন্তু সবকিছুর সাথেই আবার ‘বাঙালি’ শব্দটিকেও জুড়ে রাখতে চায়। হয়তো-বা এটা করেও সে আড়ালে, নিভৃতে একান্তে ভীষণ লজ্জা বোধ করে থাকে আর নিজের কাছে থেকেই নিজের মুখ লুকাতে চায়। এমনই হীনমন এই জনসম্প্রদায়। ইতিহাসের কোনো কালে যদি এমন দেখা যায় যে, এই জনসম্প্রদায় বাঙালিত্বের জয়গান করছে ও নিজেকে সেই নামরূপে জাহির করছে, তবে, তার বহুসহস্রাব্দের ঐতিহাসিক অবস্থান বিচারে মনে হতে পারেজ্জতা নিতান্তই কালের ভ্রান্তি কিংবা দীর্ঘ স্বপ্নের মাঝে সামান্যকালের অঘটনজনিত ছেদ। কিন্তু, এটি তো অকাট্য সত্যি যে, তার বাঙালিত্ব প্রকৃতই তার অস্তিত্বের ভিত্তি, সত্তার আধার। ফলে একে মুছে ফেলাও যায় না। কখনো-বা মুছে ফেলতে চায় কিন্তু, পারে না, এর কারণও এই যে, বাঙালিত্ব তার শিকড় যা তার রক্তে বিস্তৃত এবং ভূমিতে প্রোথিত। এ-ই তার দ্বিধা আর দ্বন্দ্বের যুপকাষ্ঠ। বাঙালি তার অস্তিত্বের সূত্রপাতে, উত্থানে, বিকাশে ও বিস্তারে সভ্যতার বিশেষ বৈশিষ্ট্যে এবং ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে সমাজ বিকাশের কার্যকারণগত জটিলতায় প্রায় জীবন্মৃত। সভ্যতা বিকাশের কালপরিক্রমা ও সংঘটনাসমূহের দ্বিধান্বিত পরিনামমুখ বাঙালিকে এমন এক দ্বিধায় আটকে রেখেছে যে, তার এই অবস্থার একটাই শিরোনাম হতে পারে ‘ত্রিশঙ্কু’। এ-ই তার সংকট।
বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকটই প্রধান প্রতিপাদ্য এই আলোচনায়। কেমন তাদের আত্মপরিচয়ের স্বরূপ? বাঙালি, একটি জনসম্প্রদায় যাদের আত্মপরিচয় চিহ্নিত হয় ‘বাঙালি’ পারিভাষিক শব্দটি দিয়ে। এই জনসম্প্রদায় কবে বাঙালি বলে চিহ্নিত হলো আর কীরূপে ও কীসের ভিত্তিতেই-বা এই বাঙালিত্ব চিহ্নিত হলো তা যথেষ্ট অনুসন্ধানের বিষয়। তথ্য পাই যে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের দিকে ঐতরেয় আরণ্যকে ‘বঙ্গা’ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। পাণিনির অষ্ট্যাধ্যায়ীর ভাষ্যে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে ‘সুহ্মাঃ, পুণ্ড্রাঃ, বঙ্গাঃ’র উল্লেখ দৃশ্যমান রয়েছে। এবং সহস্রাব্দের পুরোনো চর্যাগীতিতেও বাঙ্গালী, বঙ্গাল (দঙ্গাল?) নামের দেশের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু, সেইকালে বা সেইকাল থেকেই ‘বাঙালি’ নামের কোনো জাতিত্ববোধের জনসম্প্রদায় পাওয়া যায় না, যদিও সেকালে জনসম্প্রদায়ের অস্তিত্ব বিরল ছিলো না। ফলে অনুমান সহজ যে আদিতেই ‘বাঙালি’ শব্দটি জাতীয়তা কিংবা জাতিসত্তার পরিচয়জ্ঞাপক কোনো পরিভাষা ছিলো না। বরং এই শব্দটি একটি জনসম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিচয়-পরম্পরার সাক্ষ্য বহন করে। জাতিসত্তা চিহ্নিত করণের ও জাতীয়তা নির্ধারণের নিমিত্তে মানুষের যে চেতনা, জ্ঞানপ্রবণতা ও মনোভঙ্গি তা একেবারেই নতুন; অদূর অতীতের উনিশ, বিশশতকের মানুষের আধুনিক উন্মাদনার ফল হলো জাতীয়তাবোধ। আরো স্পষ্ট করে বলা যায় যে, তা আসলে পাশ্চাত্যের কিছু দেশ থেকে আসা একটি ধারণা। এ-ও স্বীকার্য যে মানুষের সাংস্কৃতিক, ভাষাতাত্ত্বিক কিংবা নৃতাত্ত্বিক আত্মপরিচয়ের ঠিকুজি অনুসন্ধান তাদের হাতেই শুরু। আর আমরা তাদের উপনিবেশের থাবায় পড়ে তাদেরই উদ্যোগে প্রায়, তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক তৎপরতার কল্যাণ বা অপকল্যাণে আমাদের আত্ম-অহংকারের ভিত্তি খুঁজতে গিয়ে এই ‘বাঙালি’ পরিভাষাটি পেয়েছি আমাদের জাতি-পরিচয়ের স্মারক রূপে। জ্ঞান সাধক আহমদ শরীফ উল্লেখ করছেন এভাবে যে, ‘সুতরাং আজকের সংহত বাঙালী জাতি গড়ে উঠেছে বিদেশী বিজাতি-বিভাষীর শাস্ত্র-সংস্কৃতি, জীবন-জীবিকার সম্পৃক্ত জীবনচর্যা গ্রহণ করেই।’১ এ-ই আসলে ভারতবর্ষের মানুষের এবং বাঙালির উপনিবেশ যাপনের ফল। উপনিবেশের কারণে বাহিরের জ্ঞানের সংস্পর্শে বাঙালিরা নিজের জ্ঞানচেতনাও পেয়েছে এবং নিজস্বতায় চিন্তা করতে গিয়ে তার কিছু দ্বিধাও এসেছে অনিবার্যতায়। বাঙালির এখনো দ্বিধাঙ্কিত প্রশ্ন এই যে, এই বাাঙালি জাতিত্বের ভিত্তি কি? ভিত্তি কি তার শিকড়ভূমি, সংস্কৃতি নাকি ভাষা? কেন না, পাশ্চাত্যের জ্ঞান এই বিষয়ক নির্দিষ্টতা দেয় না। বিশ^জুড়েই, জাতিসত্তা কিংবা জাতীয়তার ভিত্তি কী হবে তার কোনো বিষয়গত ও তাত্ত্বিক নির্দিষ্টতা নেই। যদিও বিষয়টি স্থির নয়, তবু, সাংস্কৃতিক ভিত্তিকেই অধিক গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে নানা কারণেই। বাঙালির জন্য বিবেচনা এই যেজ্জবঙ্গ বা বঙ্গাল প্রাচীন, তার মানুষের পরম্পরা প্রচীন ফলে তার সংস্কৃতিও প্রাচীন। বঙ্গালের মানুষের ভাষাটির নাম যে বাঙলা ছিলো এই সাক্ষ্য পাওয়া দূরহ। ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে ‘বাংলা’ নামে যে ভাষাটির পরিচয় মেলে সেটি অন্তত বাঙালির প্রকরণ পরম্পরার চেয়ে পুরোনো নয়। প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে বাংলা নামের ভাষাটির প্রতিষ্ঠিত লিখিত ও কথ্যরূপ পাওয়া যায়। কিন্তু, বাঙালির সাংস্কৃতিক প্রবাহ ঠিক কতো পুরোনো তা নির্দিষ্ট করে নির্ণয় করা যায় না। সেটি সুনির্দিষ্ট করে নির্ধারণ করা না গেলেও ঐতিহাসিক নিদর্শনগত ভিত্তির গণনা যে তা প্রায় পাঁচ সহস্রাব্দেরও পুরোনো। খ্রিস্টপূর্ব পনের’শ অব্দের কাছাকাছি সময়ে ভারতবর্ষে আর্যগণের আগমনেরও অনেক আগের নানান সাংস্কৃতিক উপাদান, বিশ^াস ও লোকচর্চা বাঙালির বর্তমান সংস্কৃতিতে এখনো বিরাজমান। ফলে, সংস্কৃতিই কি নয় বাঙালির যথার্থ আত্মপরিচয়ের স্মারক? সুতরাং, বলা যায় বাঙালির যথার্থ পরিচয় তার সংস্কৃতিতেই মেলে। তবু ভাষাভিত্তিক পরিচয়টিও অগ্রাহ্য করা যায় না। আর আধুনিককালে এসে জাতিপরিচয়ের ভিত্তিকারণ হিসেবে ধর্মকে গ্রহণ করার প্রবণতাও এই বিষয়ক গ্রাহ্যতা-অগ্রাহ্যতার সীমানা ভেঙেছে। এরই ফলে বাঙালির আত্মপরিচয়ের বিবেচনাটিই আজ বিভ্রান্তির করালে, হুমকির মুখে। বলা যায় তার আত্মপরিচয়ের ঠিকুজি যেন লুট হয়েছে।
বাঙালির আত্মপচরিয়ের সংকটটি অন্য আর কিছুই নয়, তার সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বিভ্রান্তির পরিনাম যা বিভিন্ন কালে ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাব বলয়ে থেকে বাঙালির সমাজচৈতন্যে প্রবেশ করেছে। বাহিরের শক্তি যেমন বাঙালির সাংস্কৃতিক, ভাষাভিত্তিক আত্মপরিচয়টিকে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে এবং চাইছে, তেমনই বাঙালি নিজেও অনেকাংশেই তার বাঙালিত্বকে আর মনে রাখতে চায় না বা অন্যভাবে চিনতে চায় নিজেকে। তারা অন্য কোনো পরিচয়ের গৌরব…
বাঙালির দ্বিধার চলক
ভূমিকা
কবিতার ভেতর ঘুমিয়ে থাকে এক অদ্ভুত জীবন কিংবা জীবনের গভীরে লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত কবিতা। সে গভীর আর অদ্ভুতের উপলব্ধিই আমার তপস্যা। সে তপস্যা জড়িয়ে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে কোনো কোনো মুহূর্তে যখন প্রাত্যহিক জীবনের আর সব কাজ ঘর গেরস্থালি তুচ্ছ হয়ে পড়ে। এ আমার বহুকালের যাপন। কিন্তু তা নিয়ে লিখবো কখনও এমন সাহস ছিল না। দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদক কবি ওবায়েদ আকাশের প্ররোচনায় প্রথমবারের মতো সৈয়দ শামসুল হকের পরানের গহীন ভিতর, আবুল হাসান ও নির্মলেন্দু গুণের কবিতাগুলো নিয়ে লেখা গড়গড় করে বেরিয়ে যায় আমার কলম ধরে যা সংবাদ সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৪/২০১৫ সালে। পরবর্তীতে কবি ও প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ নূরুল হকের আস্কারায় রফিক আজাদের কবিতা, রবীন্দ্রনাথের কবিতায় মৃত্যু চেতনা ও নিজেরই আগ্রহে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের যে কবিতাগুলো স্টেজে উপস্থাপিত হয়েছিল সেগুলো নিয়ে লিখে ফেলি অনায়াসে। তাই এ গ্রন্থের সকল লেখা আমার কাছে অনুভবের সহজ বর্ণনার গদ্য হিসেবে স্বীকৃত যা উপরে উল্লেখ করা দুজনের কারণে না হলে হয়তো কোনোদিন লিখিত হতোই না। এই লেখাগুলো সংকলিত করে গ্রন্থ হিসেবে সাদরে প্রকাশের দায়িত্ব নিয়ে অগ্রজ লেখক ও প্রকাশক আবু এম ইউসুফ ভাই কৃতজ্ঞতার চেয়ে মায়ার বাঁধনে বেঁধে নিলেন।
মগ্নচৈতন্যের কবি ও কবিতা
স্বপঞ্জয় চৌধুরী মূলতঃ কবি, তিনি যখন গদ্য লেখেন কাব্যিক উপস্থাপনাগুণে ভাষা হয়ে ওঠে সতত সঞ্চরণশীল নদীর মতোই উপভোগ্য ও গতিময়। প্রতিভাবান এ তরুণ লেখকের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত অসংখ্য লেখা থেকে সাহিত্য সন্দর্শন, কবিতা ও শিল্পকলার নন্দন, নীতিশাস্ত্র, দর্শন, চলচ্চিত্রসহ বহুবিচিত্র বিষয় সুনির্বাচিত আটাশটি নিবন্ধ সমন্বয়ে তার প্রথম প্রবন্ধ সঙ্কলন ” নিগুঢ় শিল্পের কথাচিত্র “-এ প্রাগুক্ত ভাষিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক মূল্যবান তথ্যের সন্নিবেশ এবং যুক্তিনির্ভর সূক্ষ্মদর্শী পর্যালোচনা অত্যন্ত চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সুলিখিত গ্রন্থটি লেখক, গবেষকসহ সবশ্রেণির সাহিত্যমোদি পাঠকের প্রয়োজন মিটিয়ে তাদের অনুসন্ধিৎসু মনে নতুন চিন্তার খোরাক জোগাবে ।
মাহফুজ আল-হোসেন
কবি ও প্রাবন্ধিক
নিগুঢ় শিল্পের কথাচিত্র
লেখকের কথা
প্রতিটি মানুষের জীবনেই রয়েছে অজস্র গল্প। গল্প ছাড়া মানুষের জীবন হতেই পারে না! আর সেইসব গল্প বাস্তবতার- আদৌ কল্পনার নয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের নানা রকম সম্পর্ক গড়ে ওঠে শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। গল্পগুলো সেই সম্পর্কজাত। যা জীবদ্দশায় ভুলে যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। যারা লিখতে পারেন তারা চেষ্টা করেন সেইসব জীবনস্মৃতির গল্পগুলোকে জনসম্মুখে তুলে ধরতে লেখনীর মাধ্যমে। আর যারা লেখায় অভ্যস্ত নন, তারা নিভৃতে মনের ভেতরে সেসব লালন করেন এবং সময়-সুযোগ পেলে অন্যকে বলেন। অনেক লেখক আছেন যারা বিভিন্ন সময় নানা চরিত্রের মানুষের কাছ থেকে তাদের জীবনে অর্জিত অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতার গল্প, দুঃখ-বেদনার গল্প, হাসি-খুশির ঘটনা, বিয়োগান্তক কাহিনী ইত্যাদি শুনে উপন্যাস বা গল্পে রূপ দেন।
সাধারণ মানুষ বলি আর বিশিষ্টজন বলি; লেখক বলি আর শিল্পী বলি- তাদের জীবনের গল্পগুলো সাধারণ গল্প নয় বলেই গণমাধ্যমে বা পাঠ্যপুস্তকে সেগুলো প্রকাশিত হয়ে থাকে। শিক্ষামূলক গল্পের যেমন শেষ নেই তেমনি প্রেম-ভালোবাসা, ব্যর্থতা, আশা-নিরাশা, বিচ্ছেদ, লড়াইমুখর গল্পেরও সীমা-পরিসীমা নেই। সেসব জীবনস্মৃতির গল্প পড়ে আমরা বিচিত্র চরিত্র, চিন্তা ও মন মানসিকতার মানুষকে চিনতে, জানতে পারি। এর মধ্যে অনেক গল্পই আছে সাহিত্যরসে টইটুম্বুর- রোমান্টিক, ভাবনার উদ্রেককারী এবং শিক্ষামূলক।
গল্প সাধারণত দুধরনের বলা যায়, এক হচ্ছে, বানানো গল্প বা কল্পলোকের গল্প। দুই হচ্ছে, জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার বাস্তব গল্প। বানানো গল্পগুলোর চেয়ে জীবনস্মৃতির গল্পগুলো বেশি নাড়া দেয় মানুষ তথা পাঠককে। কারণ সেইসব গল্প অনেক মানুষের জীবনের গল্প। বানানো গল্প যেভাবে সুন্দর ভাষা ও অলঙ্কারে আদর্শ চিত্রকলার মতো করে প্রকাশ করা হয়, জীবনস্মৃতির বাস্তব গল্পগুলো সেই রঙে আঁকা সম্ভব হয় না। এতে করে গল্পের প্রাণ হারিয়ে যায়, সংবেদনশীলতা শীতল হয়ে পড়ে। হারিয়ে যায় আকর্ষণও। বানানো গল্প মনে থাকে না, যদি না তাতে বাস্তবতার নোনাজলের ধারা প্রবাহবান থাকে।
মানুষ হিসেবে আমিও ব্যতিক্রম নই। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আমার এই ষাট ছুঁইছুঁই বয়সে বহু ঘটনার সঙ্গে বেড়ে উঠেছি, অর্জিত হয়েছে বিস্তর অভিজ্ঞতা। কত চরিত্রের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটেছে তার হিসেব নেই। সেইসব ঘটনা অমূল্য স্মৃতি এবং অকাট্য সম্পর্ক। এই সম্পর্ক এতই অম্ল-মধুর যে, পড়ন্ত বেলায় এসে যতই ভাবি ততই নিজেকে ফিরে ফিরে দেখার সাধ জাগে, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে যুগপৎ আনন্দিত এবং বিষণ হই। জীবনস্মৃতির সেইসব অজানা গল্পগুলোই পড়ে অনেকে নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নেন। যুগ যুগ ধরে এটাই সাহিত্যে চলে আসছে। এভাবে কালজয়ী, রসোত্তীর্ণ গল্পও আমরা অনেক পেয়েছি। ভবিষ্যতেও পাব।
জীবনস্মৃতির এই গল্পগুলো ‘সম্পর্ক’ শিরোনামে একটি গল্পসংকলনে পত্রস্থ করে স্বনামধন্য প্রকাশনা সংস্থা ‘অনুপ্রাণন প্রকাশন’ ঢাকা প্রকাশ করে আমাকে চিরঋণী করেছেন। আশা করি গল্পগুলো পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেবে।
‘অনুপ্রাণন’কে জানাই অন্তঃস্থল থেকে অজস্র ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
প্রবীর বিকাশ সরকার, টোকিও.জাপান, ৭, অক্টোবর, ২০১৭
জীবনস্মৃতির গল্প সম্পর্ক
আয়নায় বিধ্বস্ত মুখ
গতরাতে যে স্বপ্ন তুমি এঁকে দিলে স্বরন্দ্র চোখের ভেতর
তারপর থেকে আমি বুঝে গেছি, ভালোবাসা কোনো ভেড়ার
পাল নয়
যখন যেদিকে খুশি তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে।
যারা এসেছিল জীবনে, হাতে নিয়ে আলোকবর্তিকা
হয়তোবা আমি-ই করেছি তাদের বিতাড়িত
আর পাহাড়ের ঝরনার মত বয়ে যাওয়া কতগুলো
ব্যথা বহন করেছি নিজেই, তাঁরা তা টেরও পায়নি
কখনো-
এখনো কোনো কোনো দিন আয়নায় তাদের বিধ্বস্ত মুখগুলো
ভেসে ওঠে নিকষ অন্ধকারে, যতটা না আমি চাই
ভাবি, বুকের ভেতর অতীত বহন করা খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
আয়নায় বিধ্বস্ত মুখ
জন্ম ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল থানার সুরাশ্রম গ্রামে। পিতামহের প্রতিষ্ঠিত নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শুরু। তারপর নান্দাইল রোড হাই স্কুল, আঠাবাড়ি ডিগ্রি কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকল্যাণ ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন। এরপর চাকরিজীবনে বি.এড ও এম.এড ডিগ্রি লাভ করেন।
লেখালেখির শুরুটা খুব পরিকল্পিত না হলেও চাকরিজীবনের বেঁচে যাওয়া সময়ে কঠিন অধ্যবসায় ও অবিরাম লেখালেখির অভ্যাসটি জোরালেভাবেই তৈরি হয়েছে। বহুমাত্রিক এই লেখকের সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখাসহ একাডেমিক গ্রন্থ নিয়ে মোট ৯৫ গ্রন্থ ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।
ঘূর্ণিবায়ূ ও ধূসর কাবিন
বিশিষ্ট ছড়াকার, উপন্যাসিক, গবেষক, সম্পাদক প্রবীর বিকাশ সরকার এর জন্ম ১৯৫৯ সালে, বাংলাদেশের সিলেট জেলার সুনামগঞ্জে। ১৯৭৬ সালে চাঁদের হাট সংগঠনের সাহিত্য সম্পাদক থাকাকালীন সাহিত্যচর্চার সূচনা। ১৯৮৪ সালে জাপান গমন। তার আরো ১১টি প্রকাশিত গ্রন্থ রয়েছে।
জানা অজানা জাপান (তৃতীয় খণ্ড)
শীতের বিকেলে পিঠে রোদ লাগিয়ে আরাম করে শুয়ে ছিল হাতি। পাশের এক মাটির ঢিবি থেকে পিনপন নামের পিঁপড়েটি পিল পিল করে হাতির সামনে এসে বলে, কথা দিয়েছিলে চাঁদ দেখাবে। কই ডাকলে না তো। বিকেলের নরম রোদে আরামে চোখ বুজে এসেছিল হাতির, পিঁপড়ের গলা পেয়ে চোখ পিটপিট করে বলে, বলেছি যখন তখন দেখাব। আজ রাতেই দেখাব।
রাতে কেন এখনই দেখাও না।
আরে চাঁদ তো রাতে দেখা যায়। এই বনের সবাই যখন ঘুমায়, তখন চাঁদ চুপিচুপি আকাশের গায়ে ওঠে।
হাতির কথা মতো রাতে চাঁদ দেখতে হাজির হয় পিঁপড়েটি। হাতি বলে, কী দেখ? পিনপন বলে, লাঠির মতো কিছু একটা, আবার আমগাছের মতোও মনে হয়। দাঁড়াও একটু চড়ে আসি, দেখি কোনো বাসাটাসা বানানো যায় কি না। পিঁপড়েটি হাতির পা বেয়ে ওপরে উঠে যায়।
হাতি বলে, পেলে কিছু?
অনেক কিছু কিছুমিছু?
হাতি ভাবে মহা মুশকিলে পড়া গেল তো! এই পিঁপড়েটাকে নিয়ে চাঁদ দেখার আয়োজন করাটাই ভুল হয়েছে, তবু কথা যখন দিয়েছি, তা তো রাখতেই হবে। পিঁপড়ে বলে, বেশ মজা হচ্ছে, এখানেই বাসা বানাব ভাবছি।
নেমে এসো বলছি। আমার কেমন সুড়সুড়ি লাগছে।
চাঁদে আমি ঘর বানাব শুনে তোমার কি না সুড়সুড়ি লাগে, হে হে ভারি মজা তো!
আরে ওটা চাঁদ নয়, ওটা আমার … উঁ উঁ বলে চিৎকার করে ওঠে হাতিটি। পিঁপড়ে বলে, চাঁদে বেশ মজা চিমটিও কাটা যায়। দেখবে এসো।
আরে ওটা চাঁদ নয় ওটা আমার পা।
তোমার পা! হেহে এখন বলবে তো চাঁদের তোমার পা পড়েছে। মনের দুঃখে হাতি এবার বসে পড়ল।
…………………………………………………
…………………………………………………
…………………………………………………
হাতি ও পিঁপড়ের চাঁদ দেখা
জানালায় দেখা হলদে পরী - Janalay Dekha Holde Pari
জীবন হয়তো এক অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষারই নাম। হয়তো বায়োস্কোপ-দৃশ্যের মতোই রঙিন অথচ ক্ষণস্থায়ী, স্বপ্নীল অথচ আশাভঙ্গুর। তবু মরীচিকার মতো রহস্যময় জীবনের পেছনে মানুষ ছুটে বেড়ায় ক্লান্তিভোলা পথিকের মতো। হাঁটতে হাঁটতে কখনো ঠিক পথে যায়, কখনোবা পথেই পথ হারায়। এভাবে নানা বাঁক ও বক্রতা পেরিয়ে বারবার জীবনের কাছে পৌঁছাতে হয়। গোলাপের মতো দেখতে সুন্দর জীবন কখনো কখনো এতো কদাকার দেখায় যে, তখন চমকে উঠতে হয়। দেখা যায় যে, ওটা আসলে গোলাপ নয়, গোলাপের আকৃতি।
কিংবা মানুষ যেভাবে ভাবতে চায় না, যেভাবে দেখতে চায় না নিজের জীবনছবি, সেভাবেই তাকে দেখতে হয়, সে জীবনই তাকে বেছে নিতে হয়। জীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত কোণে দাঁড়িয়ে অবলোকন করতে হয় নিজেরই প্রতিকৃতি। এ কি জীবনের অনিবার্যতা, নাকি পরাজয়? এ কি স্বপ্নভঙ্গ, নাকি দুঃস্বপ্নের ঘোরটোপ?
যাপিত জীবনে বহুমুখি প্রশ্নের গোলকধাঁধায় ক্লান্ত হয় কোনো কোনো মানুষের জীবন। কখনোবা ক্লান্তিহীনতাও পায় নবপ্রাণ।
এ রকম নানামুখি জীবনের গল্প নিয়ে আমিনুল ইসলাম সেলিম প্রথমবার হাজির হয়েছেন পাঠকের সামনে।
Shari O Anyanya Golpo - Aminul Islam Selim
রোবট শিশুর পিতা-মাতা
লালচুড়ি এক অনন্য জয়ের গল্প। রোশনি মা ছিলেন এক সাধারণ স্কুল পরিচ্ছন্নতাকর্মী। স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র মেয়ে সিমাকে নিয়ে তাঁর স্বপ্ন ছিল অসাধারণ। মেয়েকে স্কুলের ম্যাডাম বানানো। চারপাশে ছিল কটুক্তি, অবহেলা আর তিরস্কার। ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মেয়ে, এত পড়িয়ে কী হবে?’ কিন্তু রোশনি থামেননি। একদিন লালচুড়ি পরিয়ে মেয়েকে বলেছিলেন, ‘তুই ম্যাডাম হবি! তুই পারবি, তোকে পারতেই হবে।’
সেই লালচুড়িই হয়ে উঠল প্রতিজ্ঞার প্রতীক।
‘লালচুড়ি’ কেবল একটি মেয়ের সাফল্যগাথা নয়, এটি মা-মেয়ের জেদ, ভালোবাসা আর অসম্ভবকে সম্ভব করার অদম্য লড়াইয়ের গল্প।
এই উপন্যাসে আপনি খুঁজে পাবেন স্বপ্ন, ত্যাগ, চোখ ভেজানো আবেগ এবং এক সাহসিনী মেয়ের জয়ের গান। সিমার লালচুড়ি শুধু তার নিজের নয়, এটি প্রতিটি কিশোরীর জেগে ওঠার প্রতিজ্ঞা।
লালচুড়ির প্রেরণার শিখা ছুঁয়ে যাবে ছোটো-বড়ো সকলের হৃদয়।
Lal Curi by Obaidul Samir
Caitrer Akash Nissongo Cilo by Alok Acharja
গদ্যের খটখটে শিলাময় আস্তর বিদীর্ণ করে তারই গর্ভ থেকে উঠে আসে কবিতার কম্প্র সবুজ। জীবনের বিস্তৃত দৃশ্যমান ভ‚গোলে গদ্যের সংক্রাম যত প্রবল, তত তীব্র দ্রোহে জেগে ওঠে কবিতার প্রাণ-প্রতিবাদ। অনিকেত সুর-এর কবিতা ব্যক্তির একান্ত অনুভবজগতের দলছুট খেয়ালি বিমূর্ত লীলাচার নয়, আমাদের সামষ্টিক ও সাধারণ বস্তু-অভিজ্ঞতার সে স্বতঃস্ফ‚র্ত সরল প্রতিভ‚। বাংলা কবিতার ছিন্নপথে উন্মার্গচারিতার খেচর হতে তিনি নারাজ। প্রতীচ্য পন্থার আত্মরহিত অনুকরণে ‘আধুনিক’ গড্ডলিকা স্রোতের যাত্রীও তিনি নন। এই গ্রন্থে ধৃত তাঁর কাব্যপ্রচেষ্টা স্থানিক কৌম সমাজের চর্চিত জীবন, তার আলো ও আঁধি এবং ব্যক্তির আত্মনিমগ্ন ধ্যানজগতকে বাংলা কাব্যধারার নিজস্ব সহজ গীতল ধর্মে একটি একক অবিভাজ্য ভারসম দেহসমগ্রে জুৎসই মিলিয়ে দিয়েছে।
Ghurisokha, Tore Sathe - A Collectin of Poems - Aniket Sur
শহর মাত্রই একটি নদী। আর শহরে বসবাসকারী মানুষগুলো হচ্ছে নদীর জলে ভাসমান কচুরিপানা। কারো পানায় পাতা গজিয়েছে তো কারো পানায় বায়ুকুঠুরি। নদীতে যেমন জোয়ার-ভাটা হয়, শহরেও তেমনি জোয়ার-ভাটা হয়। জোয়ার কালে কচুরিপানারা সব ভেসে ভেসে চলতে থাকে স্রোতের সাথে। মানুষও সেরকম ভাবেই চলে, যখন বাতাস যেদিকে ধায়। সন্ধ্যায় আবার ভাটার টানে একইভাবে ফিরে আসে আপন ঠিকানায়। এই জোয়ার-ভাটার মাঝেও কখনো কখনো নদী বিশ্রাম নেয়, বুকে ধারণ করা বিশাল জলরাশিকে স্থবির করে রাখে ক্ষণিকের জন্য। আর ঠিক তখনই কচুরিপানারা স্ব স্ব দম্ভে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে মরিয়া হয়ে পড়ে। যদিও কচুরিপানারা এটা জানে, তার কান্ড থেকে বের হওয়া দীর্ঘ, তন্তুময়, বহুধা বিভক্ত মূলগুলো যত দীর্ঘই হোক না কেন, নদীর ছোট্ট একটা ঢেউ উপেক্ষা করার ক্ষমতা তাদের নেই। তাই হয়তো জলজ এই উদ্ভিদগুলো মাটির সাথে তাদের শিকড়ের সম্পর্ক স্থাপন করে না কখনো।
এই শহরের মানুষগুলোও জানে, নগর নদীর ছোট্ট একটা ঢেউ সবকিছু তছনছ করে দিতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। তবুও মানুষ প্রতিনিয়ত হাজারো স্বপ্ন নিয়ে ঢেউয়ের মতো ছুটে এসে আছড়ে পড়ছে এই শহর নামক নদীর বুকে। এই নিশ্চিত অনিশ্চয়তার মধ্যেই কি দিব্যি আগামীকালের স্বপ্ন দেখে। নানা শ্রেণির মানুষ, নানা রকম স্বপ্ন।
“নগর নদীর ঢেউ” একটি জীবনমুখী সামাজিক উপন্যাস; যেখানে লেখক তার যাপিত জীবনের সূক্ষ্ম বোধগুলিকে থরে থরে বিন্যস্ত করেছেন সুনিপুণ হাতে। একজন মধ্যবিত্ত অতি সাধারণ মানুষ থেকে পরিশ্রম আর মেধার সঠিক সন্নিবেশ ঘটিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করা একজন সফল মানুষের জীবনগল্প এটি। এই উপন্যাসে শহরকেন্দ্রিক জীবন-যাপনের নানা দিকগুলি উঠে এসেছে বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। উপন্যাসটির পটভূমি একটি দীর্ঘ কাহিনি। যেখানে শফিক নামের কেন্দ্রীয় চরিত্রটিকে ঘিরে গল্পের ডালপালা ছড়িয়েছে বিস্তর। পাশাপাশি ব্যক্তি জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ঘাত-প্রতিঘাত, আশা-আকাক্সক্ষা, খুনসুটি, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ, ভালোবাসা-ঘৃণা, প্রতিশোধ পরায়ণতা ইত্যাদি বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে নানা ঘটনার ধারাবাহিকতায়। উপন্যাসটির প্লট বা আখ্যান খুবই সুপরিকল্পিত ও সুবিন্যস্ত। প্লটের মধ্যে ঘটনা ও চরিত্রের ক্রিয়াকা-কে এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে যাতে তা বাস্তব জীবনকে প্রতিফলিত করে এবং কাহিনিকে আকর্ষণীয়, আনন্দদায়ক ও বাস্তবোচিত করে তোলে।
চলার পথে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যে বিষয়গুলি আমরা সাধারণত এড়িয়ে যাই, এই উপন্যাসে লেখক সেই বিষয়গুলিকে খুব গভীর অথচ সহজভাবে মেলে ধরেছেন। এবং প্রত্যেকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনার পেছনে নিজস্ব একটা ‘দর্শন’ রেখে গেছেন পাঠকের উদ্দেশ্যে, যা আসলে একজন গুণি লেখকের পক্ষেই সম্ভব।
একজন ভাড়াটে মাস্তান কাজের কন্ট্রাকসহ এডভ্যান্স টাকা হাতে নিয়ে যখন তার ক্লায়েন্টের বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় হাঁটে, তখন সে মনে মনে কী ভাবে বা ভাবতে পারে? সে হয়তো ভাবতে পারে, এই টাকাগুলি সে কোথায় কোথায় ফুর্তি করে কিভাবে উড়াবে। অথবা বিশেষ কোনো খায়েশ মেটানোর কথাও ভাবতে পারে। আর যাই’ই ভাবুক মাস্তান নিশ্চয় তার টাকাগুলি রাস্তায় ছিনতাই হয়ে যেতে পারে এই ভেবে দুশ্চিন্তা করবে না! সাধারণ মানুষ হয়তো এমনটাই ভাববেন। কিন্তু না, ঔপন্যাসিকের চিন্তা জগত তো সাধারণ মানুষের মতো নয়। একজন মাস্তানও তার টাকা লুট হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক নিয়ে গন্তব্যের দিকে দুরুদুরু বুকে চলতে পারে। লেখকের ভাষায়, “টাকার দুশ্চিন্তায় থাকা পথিকের কখনোই মাথার উপর খোলা আকাশে পূর্ণ চাঁদ দেখা হয়ে উঠবে না, এটাই স্বাভাবিক।”
এই শহরে মূলত দুই শ্রেণির পেশাজীবী মানুষের বসবাস। চাকরিজীবী আর ব্যবসায়ী। এখানে যে বা যারা একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক, সে বা তারা ব্যবসায়ী; হোক সেটা চায়ের একটি টং দোকান বা বহুমুখী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান। আর এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে যে বা যারা কাজ করতে আসে তারা চাকরিজীবী, হোক সে কাস্টমারের হাতে চায়ের কাপটি তুলে দেয়া কোনো ছোটু কিংবা গলায় টাই ঝুলিয়ে নয়টা-পাঁচটা ডিউটি করা কোনো কর্মকর্তা। দিনশেষে একদল মানুষ এই শহরে মালিক এবং একদল মানুষ চাকর। আর এই চাকর শ্রেণির মানুষের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লেখকের ভাষায় বর্ণিত হয়েছে এইভাবে, “যে প্রতিষ্ঠানের মালিকবৃন্দ মাস শেষ হতেই ঠিক সময়ে মাইনে দিতে পারে, তাদের শত অপরাধেও সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলার মুরুদ থাকে না চাকুরে নামক মেরুদন্ডহীন প্রাণীগুলোর।”
পুরো উপন্যাস জুড়েই নানা ঘটনার পাশাপাশি প্যারালালভাবে এমন সব দর্শনের বিস্তার ঘটিয়ে গেছেন লেখক, যা পাঠকের ভাবনা জগতে একটু হলেও নাড়া দিয়ে যাবে। ব্যাপারটি আবার এমনও নয় যে, লেখক বিনা কারণে শুধু তার নিজস্ব দর্শন কপচিয়ে গেছেন, বরং এই দর্শনগুলোই প্রতিটি ঘটনাকে একটি সঠিক উপলব্ধিতে এনে দাঁড় করিয়েছে।
পরিশেষে বলতে চাই, মানবজীবন সংক্রান্ত যে সত্যের উদঘাটন উপন্যাসের মধ্য দিয়ে পরিষ্ফূট হয় সেটাই লেখকের জীবনদর্শন। আমরা একটি উপন্যাসের মধ্যে একই সঙ্গে জীবনের চিত্র ও জীবনের দর্শন এই দুইকেই খুঁজি। এর ফলে সার্থক উপন্যাস পাঠ করলে পাঠক মানবজীবন সংক্রান্ত কোনো সত্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। এই উপন্যাসটি পাঠ শেষেও পাঠকের তেমনই এক উপলব্ধি হবে।
তুষার অপু
মহাখালী, ঢাকা
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১
নগর নদীর ঢেউ
পিঠে পাহাড় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রোদ
আমি নিঃস্বতার কাছে যাই
সেখানে মহান শূন্যতারা আছে
বেদনারা নিরালম্ব গাছ
গাছ খুব ভালো মানুষ
বিনয়ে লাম্পট্য নেই
তাই, নিবিড় হতে থাকে
জড়িয়ে থাকে শরীর অপার ঋজুতায়
জোছনাও জড়িয়ে যায় কখনো সখনো
পবিত্র প্রত্যয় মেখে নেয় ভোর
মেঘেদের কি পাঠগৃহ আছে
কিংবা, মৈথুন কাল?
মাছেদের বুক চিড়ে দেখা যেতে পারে
গহনতা নদীর,
শিকড় পুঁতে রেখেছি জলে ও জলসিজে
চিরদিন সেখানে টান, বোধের, গরিমার…!
দূরের ঝাউবন কবিতার মুসাফির
ঢাকা-শহর থেকে কিছুটা দূরে ধামরাইয়ে নিজের বিলাসবহুল বাড়িতে খুন হলেন একজন প্রবীণ ও সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক। শুরুতেই একটি স্বার্থান্বেষীমহল ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার ষড়যন্ত্র করতে থাকে। এজন্য তারা অধ্যাপকসাহেবের খুনের দায়ে গ্রেফতার করে তাঁর আপন-ভাগ্নে আজাদ কালামকে। কিন্তু এটা মেনে নিতে পারে না আজাদ কালামের আপন ছোটভাই আজাদ রায়হান। সে ভাইকে বাঁচাতে ই-মেইলে অনুরোধবার্তা পাঠায় তুখোড় গোয়েন্দা লালভাইয়ের কাছে। আজাদ রায়হানের অনুরোধক্রমে কেসটা হাতে নেন গোয়েন্দা লালভাই।
শুরুতেই লালভাই কেসটার মূলঘটনা-অনুসন্ধানে মনোনিবেশ করেন। তিনি এই খুনের মোটিভ ও প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করার জন্য একেবারে উঠেপড়ে লাগলেন। কিন্তু এতে প্রবলভাবে বাদ সাধে স্থানীয় থানার ওসি গোলাম মওলা। সে লালভাই ও তার সহকারীদের একরাতের মধ্যে ক্রসফায়ারে হত্যা করার হুমকিধমকি দিয়ে কেসটার তদন্ত-কাজ থেকে তাদের দূরে সরিয়ে দিতে চায়! শেষ পর্যন্ত কি লালভাই পারবেন এই কেসটার মূলরহস্য-উদ্ধার করতে?…আর মাত্র আড়াই দিনের মধ্যে লালভাই কেসটার এমন একটি সত্যউদ্ধার করলেন যাতে আরও বেশি হিং¯্র হয়ে উঠলো ওসি গোলাম মওলা! শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল—জানতে হলে পড়–ন ‘গোয়েন্দা লালভাই’ সিরিজের অনবদ্য প্রথম বই।
গোয়েন্দা লালভাই
মাহবুব মিত্র বিশ্বাস করেন মানুষই শিল্প; মানবতাই ধর্ম। মানুষবিহীন পৃথিবী শস্যহীন প্রান্তরের মতো। তিনি মনে করেন সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠ শিল্প মানুষের সৌন্দর্য। তাঁর প্রিয় বিখ্যাত দু’টি উক্তিÑ “মানুষ দেখার আনন্দে তুমি কখনো ক্লান্ত হয়ো না”, “ভুল মানুষের কাছে আমি নতজানু নই।” নীতির সাথে আপোসহীন চির প্রতিবাদী সতত ডানার মানুষ এক ক্লান্তিহীন গেয়ে যান ভালোবাসার গান, সমতার গান, মানবতার গান, সুন্দরের গান।
মাহবুব মিত্র বস্তুবাদী দার্শনিক মতবাদে বিশ্বাসী। আবার ভাববাদী দর্শনও মাঝে-মধ্যে তাঁকে ভাবায়। এই দুই মতবাদের ভিতর দিয়ে পথ হাঁটছেন। তিনি বুকে ধারণ করে আছেন সৃষ্টি জগতের সকল সুন্দরের নির্যাস। সাহিত্য ও শিল্পের বাগানে শব্দ বুনে-বুনে তৈরী করছেন মানব হৃদয়ের নৈবেদ্য। এই নিবিড় সংসারে একাকি নিঃসঙ্গ পথিক এক খুঁজে পেয়েছেন জীবনের সৌন্দর্যের অবিরাম ধারাপাত। তিনি মানব হৃদয়ে খুঁজে বেড়ান সুন্দরের স্বর্গভূমি।
তিনি সর্বদা আশাবাদী একজন প্রাণবন্ত-প্রফুল্ল মানুষ। তুমুল অন্ধকারের মাঝে খুঁজে ফেরেন আলোর ফোয়ারা। মানুষ তখনই মৃত যখন তার ভিতরের আনন্দ মরে যায়। চিরন্তন সুন্দরের জন্য হাহাকার-আকাক্সক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধের উপলব্ধি, স্বতন্ত্র বোধের-চেতনার আলোয় উদ্ভাসিত তাঁর ভাবনার আকাশ। তাঁর সুকুমার কোমল প্রবৃত্তি আপন আলোয় ভাস্বর, দীপ্ত-শোভান্বিত, সদা জাগ্রত।
শাদা কফিনে মেঘের শব্দ
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.






















There are no reviews yet.