Additional information
| Weight | 0.96 kg |
|---|---|
| Published Year |



$ 0.24 $ 0.59
| Weight | 0.96 kg |
|---|---|
| Published Year |
অষ্টম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা
সম্পাদকীয়-
মহান একুশে- আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও এক দুঃখিনী বর্ণমালার ইতিহাস
বাংলা ভাষা ও বাংলা বর্ণমালার উদ্ভব ও বিবর্তনের একটি স্বতন্ত্র ও মৌলিক ইতিহাস রয়েছে। আমরা জানি যে, প্রাচীন কাল থেকে পাঁচটি স্তর পার হয়ে আধুনিক বর্ণমালা এসেছে। প্রাচীনকালে কোনো বর্ণমালা ছিলো না। গাছপালা-মানুষ-প্রাণী’র ছবি এঁকে মনের ভাব প্রকাশ করা হতো। এটা হচ্ছে বর্ণমালার প্রথম স্তর- “গ্রন্থিলিপি”। আনুমানিক দশ-বারো হাজার বছর আগে মানুষ গ্রন্থিলিপি দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করতো। এরপর এলো “ভাবলিপি”- সম্পূর্ণ ছবি না এঁকে সংকেত বা চিহ্ন বা প্রতীকের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম। ভাবলিপি ছিলো অনেকটা এমন- দিন বোঝাতে পূর্ণ বৃত্ত, অর্থাৎ সূর্য আঁকা হতো, আর রাত বোঝাতে অর্ধ বৃত্তের সাথে তারকা আঁকা হতো। এরপর এলো তৃতীয় স্তর- “শব্দলিপি”, এই স্তরে ব্যাপক হারে ছবির বদলে চিহ্নের ব্যবহার হতে লাগলো। শব্দলিপি আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে এলো চতুর্থ স্তর- “অক্ষরলিপি”। অক্ষরলিপি আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে পঞ্চম স্তর হিসেবে এলো “ধ্বনিলিপি”। এই ধ্বনিলিপি থেকেই আধুনিক বর্ণমালার উৎপত্তি। সেই সময় বিভিন্ন বর্ণে বা রঙে বিভিন্ন অক্ষর লিখা হতো, সেখান থেকেই অক্ষরের নাম হয়েছে বর্ণ, বর্ণমালা।
আমাদের বাঙলা বর্ণমালা এসেছে প্রাচীন ভারতীয় “ব্রাহ্মীলিপি” থেকে। পৌরাণিক উপ-কথামতে হিন্দু দেবতা ব্রহ্মা ভারতবর্ষের প্রাচীন লিপি আবিষ্কার করেছিলেন এবং ধ্বনির সাথে মানুষকে এই লিপি দান করেছিলেন, তার নামানুসারে ঐ লিপির নাম হয় ব্রাহ্মীলিপি। কেউ কেউ বলেন, বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণরা ছিলেন শ্রেষ্ঠ পুরোহিত। ব্রাহ্মণদের দ্বারা এই লিপি আবিষ্কৃত হয়েছিল বলেই এর নাম ব্রাহ্মীলিপি। যে যাই বলুক, ভারতবাসী নিজেরাই সৃষ্টি করেছিলেন ব্রাহ্মীলিপি। ব্রাহ্মীলিপির পেছনে ফিনিশীয় লিপির প্রভাব আছে বলে দাবী করা হয়। তবে প্রাচীন ভারতীয়রা সম্ভবত স্বাধীনভাবেই নিজেদের লিপি উদ্ভাবন করেছিল- কারণ ফিনিশীয় লিপির চেয়ে ব্রাহ্মীলিপির পার্থক্য অনেক। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতক থেকে ৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে ব্রাহ্মীলিপি প্রচলিত ছিল। এরপর “অশোক লিপি” বা “মৌর্য লিপি”তে এর বিবর্তন শুরু হয়। এর পরের ধাপে আসে “কুষাণ লিপি”, এগুলি কুষাণ রাজাদের আমলে প্রচলিত ছিল। এরপর ব্রাহ্মীলিপিটি উত্তরী ও দক্ষিণী- এই দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়। উত্তরী লিপিগুলির মধ্যে পূর্বদেশীয় গুপ্তলিপি প্রধান, এটি ৪র্থ ও ৫ম শতাব্দীতে প্রচলিত ছিল। গুপ্তলিপি থেকে আবির্ভাব হয় “কুটিল লিপির”, এটি ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শতক পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। কুটিল লিপি থেকে উদ্ভব হয় নাগরী লিপির। প্রাচীন নাগরী লিপির পূর্ব শাখা থেকে ১০ম শতকের শেষভাগে এসে উৎপত্তি হয়েছে বাঙলা লিপির। অর্থাৎ ব্রাহ্মীলিপি > অশোক লিপি বা মৌর্য লিপি > কুষাণ লিপি > উত্তরী গুপ্তলিপি (পূর্বদেশীয়) > কুটিল লিপি > নাগরী লিপি > বাঙলা লিপি।
ব্রাহ্মীলিপি থেকে সৃষ্ট বাঙলা বর্ণমালা দেখতে কিন্তু এখনকার বর্ণমালার মতো ছিলো না, সময়ের পরিবর্তনে বর্ণ’র চেহারারও পরিবর্তন হয়েছে। তখন যেহেতু ছাপাখানা ছিলো না, শুদ্ধতা বজায় থাকবে কী করে? তখন মানুষ হাতে কাব্য লিখতো, পুঁথি লিখতো। একেকজনের হাতের লেখা একেকরকম, দশজন দশরকম করে “ক” “খ” লিখেছে। এভাবেই পরিবর্তিত হতে হতে পাল্টে গেছে বাঙলা বর্ণমালা। কম্বোজের রাজা নয়পালদেবের ইর্দার দানপত্রে এবং প্রথম মহীপালের বাণগড়ের দানপত্রে সর্বপ্রথম আদি বাংলা বর্ণমালা দেখতে পাওয়া যায়। ব্রাহ্মীলিপি’র প্রথম পাঠোদ্ধার করেন প্রাচ্যবিদ্যা-বিশারদ প্রিন্সসেপ। আমাদের দেশের সিলেটের উপভাষারও কিছু বর্ণমালা ছিলো, আধুনিক বাঙলা বর্ণমালা থেকে একটু আলাদা, প্রায় অবিকৃত ‘নাগরী লিপি’র মতো।
এখন পর্যন্ত তিন ধরনের ব্রাহ্মীলিপির নমুনা আবিষ্কৃত হয়েছে, যাতে ৪৪টি বর্ণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে স্বরবর্ণ ৯টি, ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৫টি। বাঙলা বর্ণমালার “ঔ” ও “ঋ” ব্রাহ্মীলিপির স্বরবর্ণে না পাওয়া গেলেও ব্যঞ্জনবর্ণে এ দুটি বর্ণের নমুনা পাওয়া গেছে। আমরা এখন যে কয়টি স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ দেখি, আগে এর চেয়ে কয়েকটি বেশি ছিলো। এই তো কিছুদিন আগেও স্বরবর্ণতে ৯ ছিলো, এখন আর ৯-এর অস্তিত্ব নেই। এর সাথে ছিলো ঋৃ। ব্যঞ্জনবর্ণতে ছিলো ল (মূর্ধন্য ল), ছিলো হ্ল (মহাপ্রাণ ল), ছিলো ব (অন্তঃস্থ ব)। যুগে যুগে বাঙলা বর্ণমালার আকার-আকৃতি বদলাতে বদলাতে মুদ্রণযন্ত্রের ঢালাই ধাতুতে তৈরি বর্ণের কল্যাণে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা বর্ণমালার স্বরূপ মোটামুটি স্থির রূপ পায়।
বাংলা বর্ণমালা একসময় ব্রাহ্মীলিপি থেকে উদ্ভূত হলেও মধ্যযুগে এসে বাংলা বর্ণমালা বাংলার স্বাধীন শাসন ব্যবস্থার মতোই স্বতন্ত্র পথ ধরে বিবর্তিত হয়ে নিজস্ব একটি মৌলিক রূপ পরিগ্রহ করে। বাংলা বর্ণমালার এসব বিবর্তনের ইতিহাসের মধ্যেও বাংলার স্বাধীন পরিচয় নির্মাণ ও পরিগ্রহণের আকাক্সক্ষা সম্পৃক্ত রয়েছে।
অথচ ১৯৪৭-এর পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের অপরাপর প্রাদেশিক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ সিন্ধি, বেলুচি, পাঞ্জাবি ও পশতু ভাষার বর্ণলিপির মতোই বাংলা বর্ণমালা পরিবর্তন করে ফারসি-আরবি অথবা ল্যাটিন বর্ণমালা ব্যবহার করে লেখার পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। বাংলা ভাষা ও বাংলা বর্ণমালা তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর ভাষা ও ভাষায় ব্যবহৃত বর্ণমালা হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যালঘু ভারতীয় মুসলমান অভিজাত শ্রেণির ভাষা ও বর্ণমালা অর্থাৎ উর্দুকেই এবং ফারসি-আরবি লিপিকেই পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ও বর্ণমালা হিসেবে চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। পাকিস্তানের সিন্ধ, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও উঃ পঃ সীমান্ত প্রদেশে এখনও শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাদেশিক ভাষা স্থান করে নিতে পারেনি। পাকিস্তানের এরকম অসভ্য, আধিপত্যবাদী, অমানবিক এবং অন্যায় পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বাঙলায় গর্জে ওঠে প্রতিবাদ কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে বাঙালির এই দাবি এবং প্রতিবাদের যুক্তি অনুধাবন করার চেষ্টা গ্রহণ না করে তৎকালীন পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বুলেটের মাধ্যমে জবাব দেওয়ার পথ গ্রহণ করে। বুকের রক্ত দিয়ে সেদিন বাঙালি তাদের মাতৃভাষা ও বর্ণমালার অধিকার আদায় করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং এই বাঙলায় বাঙলা ভাষা ও বর্ণমালা ব্যবহারের দাবি মেনে নিতে পাকিস্তানি শাসকদের বাধ্য করেছিল। এটাই ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস।
সভ্যতা, মানবতা ও ন্যায়ের পক্ষে ১৯৫২ সনে বাঙালির এই ভাষা সংগ্রাম প্রতিষ্ঠিত মানবিকতার ন্যায্য যুক্তির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে পরিচালিত ছিল বলেই এই আন্দোলন সারা বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে আজ পৃথিবীতে প্রত্যেক মাতৃভাষার মর্যাদাবোধ জাগ্রত হয়েছে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালনের জন্য জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভ করেছে।
সপ্তম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
মাতৃভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়
বিভিন্ন দেশ, জাতি ও সমাজের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয় মুছে দিয়ে চিরকালের জন্য নিজ শাসন ও শোষণের আওতায় নিয়ে আসার জন্য এক একটি জাতি ও উপজাতির নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে আক্রমণ করে দুর্বল করে দিয়ে সুকৌশলে একক একটি ভাষা ও সংস্কৃতি জাতিতে জাতিতে চাপিয়ে দেয়া- সাম্রাজ্যবাদী শোষণ বিস্তারের প্রাথমিক পরিকল্পনারই একটি অপকৌশল। আধুনিক বিশ্বে বাঙ্গালীর জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করা ও বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যে অধ্যায়ের মধ্যে আমাদের ভাষা, সাহিত্য শুধু নয়, আমাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব এবং আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের মহান সংগ্রামেরই ঐতিহাসিক সূত্রপাত। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের স্মরণে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে অমর একুশে বইমেলা- বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে তথা বাঙালী চেতনাকে সম্প্রসারিত ও সুদৃঢ় করে তোলার কাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আমাদের জাতীয় জীবনে অমর একুশে বইমেলার অপরিসীম ভূমিকাকে গুরুত্বের সাথে আমাদের অনুধাবন করতে হবে এবং এই বইমেলার গুণগত মান এমনভাবে পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত করতে হবে যেন এর সুফল সারা বছর জুড়ে আমাদের জাতীয় জীবনে সফলভাবে কার্যকরী থাকে।
ভাষা, শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির উৎকর্ষ সাধনের যে কোন প্রচেষ্টায় দেশের গণমানসের অন্তর্নিহিত শক্তিকে মানসম্পন্ন কাজে রূপান্তরিত করাটাই জরুরী। তাছাড়া, প্রতিনিয়ত নতুন চিন্তার উন্মেষ ঘটানো এবং সেসব নতুন নতুন চিন্তার বাস্তবায়ন একটি জাতির সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সুদৃঢ়ভাবে সচল রাখতে এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন মোকাবেলা করতে সবল ও সক্ষম করে তুলতে পারে। একুশে বইমেলাকে ঘিরে সেসব কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর ঘটাতে আমরা কতটুকু সক্ষম হচ্ছি- এটাই আমাদের সামনে মূল প্রশ্ন। গণমানসের অনুবাদই প্রতিভার একমাত্র ধর্ম নয়। গনমানসের সংগঠনে সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে উপযোগী রূপান্তর ঘটানোর প্রচেষ্টাই একুশে বইমেলার মতো এই বিরাট কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। কিন্তু, আমরা এই বিরাট কর্মযজ্ঞের মাঝে গনমানসের সংগঠনে রূপান্তর ঘটার মত সৃজনশীল কর্মসূচি গ্রহণ করতে দেখি না। আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যে একুশে বইমেলাকে বন্দী রাখার মত অপচয় কীভাবে বন্ধ করার যায়- এ নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। সত্যের এই পরিণতি মনে রাখাটা খুবই জরুরী- যে সাধনার অগতি বন্ধ্যত্ব আনে, সেই বন্ধ্যত্বের মাঝেই স্বকীয়তা, স্বাতন্ত্র্য, আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের বিনাশ ঘটে। আমাদের সচেতন থাকতে হবে যে, একটি জাতির নিজস্ব প্রতিভা ও সৃজনশীলতার চর্চাকে বিপথে পরিচালিত করার অপচেষ্টা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ সবসময় চটকদার কর্মসূচি আমাদের মাঝে হাজির করবে।
গত শতাব্দীর শেষভাগে, নিয়ন্ত্রিত শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চা বনাম মুক্ত ও স্বাধীনভাবে শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুফলতা ও কুফলতা নিয়ে বিতর্কের এক রকম অবসান ঘটায় এখন দেশে দেশে মুক্ত ও স্বাধীন শিল্প ও সাহিত্যের চর্চার পক্ষেই জনমত গড়ে উঠেছে। কিন্তু, মুক্তচিন্তার প্রকাশের কারনে শাসক শ্রেণি বিব্রত হয় বলে শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও নিয়ন্ত্রণ একেবারে উঠে যায় নি। সেন্সরশিপ আরোপ এবং গত কয়েক দশকে মুক্তচিন্তা চর্চাকারীদের উপর কট্টরপন্থীদের সশস্ত্র আক্রমণ ছাড়াও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নানা বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ ও নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ হতে দেখা যাচ্ছে। এসব প্রচেষ্টা শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পথে বাধা। শত শত বছরের ইতিহাস এই সাক্ষ্য দেয় যে নতুন ও মুক্ত চিন্তার চর্চা ও সম্পৃক্ততা ছাড়া শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গনমানুষের নান্দনিক অভিব্যক্তি বাধাহীন বিকাশ লাভ করে না। নিয়ন্ত্রিত বিকাশ যে বাস্তবে ঘটে না এবং অবশেষে বন্ধ্যত্ব ও স্থবিরতার কবলে পরে ধ্বংস হয়ে যায় এর ঐতিহাসিক প্রমাণ যেমন দুঃখজনক তেমনই বাস্তব।
কিন্তু, এটাও মনে রাখতে হবে যে মুক্ত, স্বাধীন ও প্রতিযোগিতামূলক শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার নামে নৈরাজ্য একেবারেই কাম্য নয়। বলতে গেলে, দেখা যাচ্ছে যে সাহিত্য চর্চা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে দুধরনের প্রবণতা এই ক্ষেত্রটিকে দারুণ ক্ষতির সামনে দাড় করিয়েছে। কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতা যতই মান বিচারে নিরপেক্ষতার কথা বলুক না কেন, বাস্তব কিন্তু তা বলে না। ফলে এমন একটি সুবিধাভোগী শিল্পী ও সাহিত্যিক চক্র তৈরি হচ্ছে যাদের তৈরি শিল্প-সাহিত্যের মান সম্পর্কে ক্রমাগতভাবে ভুল বার্তা দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে একটি গড় মানের মধ্যে আটকিয়ে রাখা হচ্ছে। ফলে প্রতিভাবান শিল্পী ও সাহিত্যিকদের মাঝে এমন একটা হতাশা তৈরি হচ্ছে যে তাদের হাত দিয়ে বাংলা শিল্প ও সংস্কৃতিতে যে উচ্চ স্তরের বিকাশ ঘটানো সম্ভব ছিল সেই পথ দুঃখজনকভাবে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে যে ঘটনাটি ঘটছে, সেটাও খুব দুঃখজনক। একুশে বইমেলাকে কেন্দ্র করে এর উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে একদল শিক্ষানবিস লেখক নিজ খরচে বই প্রকাশ করে এবং তাঁর পক্ষে দল পাকিয়ে নিজেকে কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রচারনায় লিপ্ত হচ্ছেন। এসব সাহিত্যকর্ম একেবারেই মানসম্পন্ন নয় ফলে প্রজন্ম বাংলা সাহিত্যের মান সম্পর্কে ভুল ধারণা প্রাপ্ত হচ্ছেন। অনুপ্রাণন আশা করে যে, শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে মননশীল, সৃজনশীল ও মানসম্পন্ন শিল্প ও সাহিত্যের চর্চা ও সাধনার পক্ষে গভীর সচেতনতা নিয়ে একটি মুক্ত ও স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠবে।
সপ্তম বর্ষ প্রথম সংখ্যা
সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন: ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়
গত নভেম্বর ২০১২ থেকে অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকাটি প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর সাহিত্য ও শিল্প বিভাগের বিবিধ সৃজনশীল ও মননশীল লেখায় সমৃদ্ধ হয়ে নিয়মিত ভাবেই প্রকাশিত হয়ে আসছিল। কিন্তু, পঞ্চম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যাটি বৃহৎ কলেবরে অর্থাৎ নিয়মিত ১৬ ফর্মার বদলে ১৯ ফর্মা আকারে প্রকাশিত হওয়ার পর পরবর্তী ৫ টি সংখ্যা প্রকাশ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সম্পাদকের অসুস্থতা ছাড়াও অলিখিতভাবে সম্পাদনা পরিষদের যে সদস্যবন্ধুটি পত্রিকার কাজে অফিস সমন্বয়কের গুরুদায়িত্ব পালন করছিলেন নিরবচ্ছিন্ন ধারায় প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাজ চালিয়ে যেতে তিনি নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতে থাকলে পত্রিকার কাজে ছেদ পড়তে থাকে। তাছাড়া সম্পাদনা পরিষদের আর একজন বন্ধু অন্য একটি অনলাইন পত্রিকার কাজে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করার ফলে তাঁর পক্ষে অনুপ্রাণন পত্রিকায় প্রয়োজনীয় সময় দেয়া আর সম্ভব হয়ে উঠছিল না। সম্পাদনা পরিষদের অন্য আর একজন সংগঠক পর্যায়ের সদস্য পত্রিকার চাইতে গ্রন্থ প্রকাশনায় বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়ায় প্রকৃতপক্ষে অনুপ্রাণন পত্রিকাটি প্রকাশের কাজে লোকবলের এক বিরাট সংকট দেখা যায়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে- ২০১২’এর নভেম্বরে অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকাটি প্রকাশ করার উদ্যোগ যারা নিয়েছিলেন তারা প্রত্যেকেই শিল্প ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে যার যার নিজ অবদান ও স্বাক্ষর রাখার উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রম ও ব্যক্তিগত অনুদানের ভিত্তিতে পত্রিকাটির প্রকাশনার কাজের যাবতীয় কাজ ও ব্যয় নির্বাহ করার অভিপ্রায় গ্রহণ করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, সমাজ সংস্কৃতিতে এবং বিশেষ করে তরুণদের মনের মাঝে মানবতা, সহমর্মীতা, সৃজনশীলতা, মননশীলতা, শিল্পরুচি, নান্দনিকতা এবং মুক্তচিন্তার চর্চার জানালাটাকে উন্মূক্ততর করার কাজে নিয়োজিত অনুপ্রাণনের এই প্রচেষ্টা যেন বাধাহীন হয় এবং কোনভাবেই যেন প্রতিষ্ঠা ও কর্পোরেট ভোগবাদীতার কূট সাংস্কৃতিক আবর্তে পড়ে দিক হারিয়ে না যায়।
যশ ও প্রতিষ্ঠার মোহ যখন শিল্পীকে পেয়ে বসে তখন শিল্পচর্চা তপস্যা অথবা সাধনা থাকে না। কিন্তু, এটাই বাস্তব যে তপস্যা ও সাধনা ছাড়া শিল্পের উৎকর্ষতার শীর্ষ স্পর্শ সম্ভব হয়ে ওঠে না। প্রতিষ্ঠা ও কর্পোরেট ভোগবাদের বলয়ে যেসব শিল্প-সাহিত্য চর্চা ও উদ্যোগ ফেনার মত আমাদের চারদিক ভরিয়ে তুলছে সেসবের স্থায়িত্ব সম্পর্কে কী কোন সন্দেহ থাকা উচিত?
বছরখানেক বন্ধ থাকার পরও যখন আমরা অনুপ্রাণনের এই সংখ্যাটি প্রকাশের উদ্যোগ নেই তখন আমরা আমাদের পত্রিকার পাঠক, লেখক ও শুভান্যুধ্যায়ীদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সারা পেয়েছি। এই সারা থেকে এই বিশ্বাস আমাদের জন্মেছে যে, আমরা যে পথ অবলম্বন করে এগিয়ে চলতে চাই সেই পথে বাস্তবেই সঙ্গ-সাথীর আমাদের কোন অভাব নেই। এখনও আমাদের দেশের তরুণ সমাজের একটি বিরাট অংশ মিথ্যা যশ, প্রতিষ্ঠা ও কর্পোরেট ভোগবাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে শিল্প-সাহিত্যের মানবিক ও নান্দনিক চর্চা অব্যহত রাখতেই অধিক আগ্রহী। তাই, লেখা আহ্বানে যে সংখ্যক মানসম্পন্ন লেখা আমরা পেয়েছি সেগুলো দিয়ে অনায়াসেই দুটো সংখ্যা প্রকাশ করা সম্ভব ছিল। চলতি সংখ্যার জন্য লেখা বাছাই করতে গিয়ে আমাদের অনেক সময় দিতে হয়েছে এবং স্থান সংকুলানের অভাবে প্রায় অর্ধেক লেখাই পরবর্তী সংখ্যার জন্য রেখে দিতে হয়েছে।
লেখা বাছাই করতে গিয়ে আবারো আমাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, সাহিত্য আলোচনা ও সমালোচনা বিভাগে আমরা যথেষ্ট সমৃদ্ধ লেখা পাচ্ছি না যেখানে পেশাদার সমালোচকের কলমের স্পর্শ আরো তীক্ষè অথচ আরো গঠনমূলক হতে পারে। বিশেষ করে কবি ও কবিতা নিয়ে আমাদের আরো তীক্ষè, তীব্র ও গঠনমূলক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কেননা সাহিত্য জগতে কবি ও কবিতার সংখ্যা যতই বাড়ছে কিন্তু আগ্রহী কবিতার পাঠকের সংখ্যা যেন সেই তূলনায় বৃদ্ধি হচ্ছে না। মনে হয়, কবি ও পাঠকের মাঝে বোধ, অনুভব ও ভাষার কোন একটা অন্তর থেকে যাচ্ছে যে অন্তরটি ঘুচে যাওয়া অত্যন্ত জরুরী কেননা বোধ করি, মূলত কবিতার মধ্যেই রয়েছে তরুণ সমাজের জন্য ভবিষ্যতের বিশেষ বার্ত্তা। অর্থাৎ সাহিত্যের সত্যপাঠ।
দেশে এখন হেমন্ত ঋতু। হাওরের অকাল বন্যা ও দেশব্যাপী অতিবৃষ্টির ফলে ফসলহানী ঘটায় এবছর দেশের সামগ্রিক সমাজ জীবনে খাদ্যের ঊর্ধ্বমূল্য সকল মানুষকেই কষ্ট দিয়েছে। হেমন্তের নতুন ফসল যেমন কৃষকের ঘড়ে ঘড়ে জীবনে ঘুরে দাড়ানোর বার্ত্তা দিয়ে যাচ্ছে- দীর্ঘ বিরতির পর অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিকের এই সংখ্যাটি এ-বছর অনুপ্রাণনের ঘুরে দাঁড়ানোরই প্রতীক ও স্বাক্ষর হোক- এটাই আশাবাদ।
ষষ্ঠ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
বর্তমান বাংলাদেশে কবিতার ছদ্মবেশে যারা নির্মাণ করে যাচ্ছেন চিন্তা আর বিমূর্ত বোধের সুনিপুণ ভাস্কর্য, এমরান হাসান তাদের একজন। শিল্পিত বোধ-যাপনের ভেতর দিয়ে এমরান হাসান সৃষ্টি করেন এক অনার্য ঘরানার সাহসী ওঙ্কার। তার চিন্তানির্মাণকৌশল আপোষহীন, প্রথাবিরোধী। নিজস্ব ভাবনাগুলোকে অতিক্রম করে নতুন সত্যের জন্ম দেয় তার নির্মিত চিন্তা। জাগতিক মোহ, তৃষ্ণা আর প্রেমময় তন্দ্রাচ্ছন্নতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাঁর কবিতা। অনশ্বর বোধের সুনিবিড় তৈলচিত্রের গভীর আহ্বান ও রূপকচৈতন্যের বিমূর্ত আলোর মননশীলতা সময়ের পাঠচিন্তাকে পৌঁছে দেয় সুপ্রাচীন এক স্বচ্ছ সরোবরে।
Mohoniyo Mrittikagon by Emran Hasan
শফিক হাসানের দেখা বাংলার মুখ আদতে কেমন!
‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’
তারপরের কথা—‘একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশির বিন্দু’।
মনে এই খেদ যেন না থাকে, শফিক হাসান বেরিয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের নানা জায়গা প্রাণভরে দেখতে। তার বর্ণনা রম্য, সহাস্য আনন্দময় ও প্রাঞ্জল। নানা সব জায়গার ভেতরে—লালনের স্মৃতিভরা স্থান, কেওক্রাডং চূড়া, মুজিবনগর, কক্সবাজার, চট্টগ্রামের নানা জায়গা, সমুদ্র ও পর্বত, রেলযাত্রায় তূর্ণা নিশিথায় নিশিযাপন এবং জলজোছনায় ভেসে যাওয়া হাতিরঝিল—এমনি মায়াময়, সুরভিময় নানা স্থানে। আমরা যখন ফট করে বাইরে ঘুরতে যাই কখনো কি ভাবি দেশের কতটুকু দেখেছি।
না, শফিক হাসান তেমন কোনো খেদ করবেন না যেদিন বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়বেন। ‘দেখি বাংলার মুখ’ এমনই একটি গ্রন্থ। সবকিছু দেখার আগে নিজেদের দেখো। অপূর্ব। সুন্দর ঝরঝরে গদ্যে দেখার সেইসব বর্ণনা আমাদের দেশটাকে নতুন করে চেনাবে। আমি এই গ্রন্থের বহুল প্রচার কামনা করি।
সালেহা চৌধুরী
ঢাকা
মার্চ, ২০২৪
Dekhi Banglar Mukh by Shafique Hasan
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থে সর্বমোট নয়টি গল্প রয়েছে। প্রতিটি গল্পে রয়েছে ভিন্নস্বাদ ও ভিন্নমাত্রা। এসব জীবনের গল্প। আমাদের জীবনে রয়েছে দুঃখ-যন্ত্রণা, ব্যথা-বেদনা, কষ্ট-বঞ্চনা-লাঞ্ছনা আর চাওয়া-পাওয়ার তীব্র গড়মিল। এরই মধ্যে রয়েছে আবার টুকরো-টুকরো হাসি-কান্না, সুখ-শান্তি, প্রশান্তি আর সর্বোপরি প্রেম-ভালোবাসা। সবকিছু মিলিয়েই আমাদের এই অমূল্য জীবন। আর এসবকিছু নিয়েই রচিত হয় আমাদের জীবনের অফুরন্ত গল্প।
এই গল্পগুলোতে রয়েছে সমাজের একেবারে বাস্তবচিত্র আর সমকালীন জীবনের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। গল্পগুলো একবার পড়লেই ভালো লেগে যাবে। ভালোলাগার মতো গল্পগুলো পাঠকের সামনে হাজির হয়েছে সুবিন্যস্তভাবে। ‘আফসারের চোখে জল’, ‘অন্ধজনে আলো দাও’, ‘আত্মহত্যার আগে’, ‘জীবনের প্রশ্নোত্তর মেলে না’, ‘সৌরভের হাতে ফুল ছিল’, ‘কবি সাহেবের প্রেম’ ইত্যাদি চিত্তাকর্ষক নামের গল্পগুলোতে পাঠক সাহিত্যরসে ডুবে পরিতৃপ্ত হতে পারবেন।
এগুলো শুধু গল্প নয়। মানবজীবনের নিখাদ ঘটনাপ্রবাহ। আর এগুলো আশাহত ও বেদনাবিধুর জীবনের জীবন্ত কথামালা ও উজ্জ্বলতম ছবি।
Afsarer Chokhe Jol by Sayeed Rafiqul Haque
স্প্যানিশে Historia শব্দটি যেমন ‘ইতিহাস’ অর্থে ব্যবহৃত হয়, তেমনি ‘গল্প’ অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যদিও শাস্ত্রীয় বিচারে এ দুয়ের পার্থক্য সত্য ও মিথ্যার মতোই পরস্পর-বিরোধী। কিন্তু লাতিন আমেরিকান লেখকরা, বিশেষ করে কথাসাহিত্যিকরাই এই দুইয়ের ভেদরেখা বা পরস্পরবিরোধিতাকে কখনো কখনো এতটাই মুছে দিয়েছেন যে তা পড়তে গিয়ে মনে হবে ইতিহাস ও গল্প যেন সহোদরা। আর এই কারণে লাতিন আমেরিকান কোনো লেখকের গল্প বা আখ্যানগুলো ইতিহাস হয়ে ওঠার শোরগোল তুলে বৈষম্যবিরোধী পাঠকের ইতিহাসপাঠের ক্ষুধা মেটায়। কিন্তু বিপরীতে ঐতিহাসিকরা ওই রকম কিছু করেছেন কখনো? করাটাই ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু এদুয়োর্দো গালেয়ানো আসার আগে পর্যন্ত কখনোই তা ঘটতে দেখা যায়নি। গালেয়ানো মূলত ঐতিহাসিক। অসামান্য সব ইতিহাস গ্রন্থের জনক। এক একটি গ্রন্থে তিনি ইতিহাসের শিরা-উপশিরা উন্মোচন করে দেখিয়েছেন মানুষের রক্তের ক্রন্দন। পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণী শক্তিতে তিনি অসামান্য এক ইতিহাসবিদ হলেও, The Mirror নামক বইটি লেখার আগে পর্যন্ত ইতিহাসের ঘটনাকে গল্পে রূপান্তরিত করার সৃজনী পরীক্ষা তিনি করেননি। বইটি একই সঙ্গে যেমন ইতিহাসের, তেমনি গল্পেরও। গল্প ও ইতিহাস এমন এক সঙ্গমে রঙিন হয়ে উঠেছে যা পাঠবিমুখ পাঠককেও উজ্জীবিত করে তোলে। এই গ্রন্থের আরও একটি বড় আকর্ষণ এর বৈশ্বিক পরিসর আর সর্বজনীনতা, কিন্তু গালেয়ানোর শৈল্পিক মিতভাষিতায় তা হয়ে উঠেছে বহনযোগ্য এক দর্পণের মতো, যেখানে যেকোনো কাল, যেকোনো জাতি, এমনকি ইতিহাস-বঞ্চিত অজ্ঞাতকুলশীল ব্যক্তিও তার নিজের চেহারা দেখে নিজেকে চিনে নিতে পারবে। এটি এমনই এক দর্পণ যেখানে পৃথিবীর অন্য সব মহাদেশের মতো আমাদের এই উপমহাদেশ, এমনকি রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের ঘটনাও প্রতিফলিত হয়েছে ঐতিহাসিক নিষ্ঠায় আর সাহিত্যিক সুজনশীলতায়। অমূল্য হীরকখণ্ডের এই লোভনীয় ভার পাঠকদের হাতে তুলে দিচ্ছেন বিশ্বস্ত বাংলা তর্জমায় আসাদ মিরণ।
Dorpon (Mirror) by Eduardo Galeano. Translated by Asad Miron
এই পদাবলি একই সাথে বিক্ষত এবং শুশ্রুষা। বেদনা এবং উপশম। নাড়িছেঁড়া আর্তনাদ এবং সান্ত্বনা।
কবিতাগুলি বিদ্রোহ, বিক্ষোভ, রাষ্ট্রবিপ্লবের ডাক দিচ্ছে না, বরং বসতে চাইছে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত মানুষের পাশে। একলা হয়ে পড়া মানুষকে বলতে চাইছে আমি আছি তোমার পাশে। কবিতাগুলো থেকে চুঁইয়ে পড়া অশ্রু-রক্ত একাত্ম হচ্ছে যন্ত্রণামথিত পাঠকহৃদয়ের রক্তক্ষরণের সাথে।
এমন সংবেদনশীল পদাবলি সাম্প্রতিক কবিতার জগতে বিরল হয়ে উঠছে। এই কবিতাগুলি তাই সত্যিকারের কবিতা।
‘ধ্রুপদ সন্ন্য্যাসে’ নিয়ে বাংলা কবিতার জগতে পদার্পণ করা শাহানা আকতার মহুয়া অনুচ্চকিত কিন্তু অবশ্যপাঠ্য কবি হয়ে উঠেছেন আজ।
পাঠককে তার কবিতার ভুবনে স্বাগতম।
– জাকির তালুকদার
Nishiddho Symphony by Shahana Aktar Mahuya
জন্ম– ক্ষমা করো, আবার ফেরার জন্য
কেন জানতে হবে ডুবসাঁতার
স্মৃতির ভারে বরফাচ্ছন্ন নির্জন আন্দিজ
বরফের জমাট সরিয়ে তবুও নিই নিশ্বাস
কেউ তো স্মৃতি নিয়ে পালকের মতো হালকা উড়াল
তুমি অরুণিমা ঠিক উড়ছো যেমন
স্মৃতি ভার– স্মৃতি পালক
শৈশবে কেনা অনেক রঙিন ঘুড়ির কাগজ
ঠিক কতোটা ভার হলে নদীতে বসেছে
বাণিজ্যের হাট
আমিই বিক্রি করছি আমার মুখোশ
অন্তরালে তোমার মুখ
এবং প্রথম চুম্বনের শিহরন
অসম্পূর্ণ বৃন্দাবন - Osompurna Brindhabon
‘পিতার কঙ্কাল’ গল্পগ্রন্থের গল্পগুলি আমার চেনা, নিজ চোখে দেখা। আমাদের জীবনেরই প্রতিফলন। গল্প জীবন থেকে আসে। গল্পের জন্য ঘুরতে হয় না, খুঁজতে হয় না, হাতড়াতে হয় না চারপাশ! গল্পরা নিজে এসে ধরা দেয়। এ গল্পগুলিও সহজে ধরা দিয়েছে।
যিনি জীবনের ওপারে পাড়ি জমান তিনি চলে যান না চিরতরে! থেকে যান স্মৃতিতে, হৃদয়ে, লৌকিকতায় কিংবা জাদুবাস্তবতায়। ফিরে ফিরে আসেন নানান ভাবে। নাগরিক জীবনের যন্ত্রণা, গ্রামীণ জীবনের অমৃত এবং গরল, মানবিকতা ও পাশবিকতা খুঁজে পাবেন গল্পগুলিতে। আছে মাতৃত্বের মহত্ব, বন্ধুত্বের উদারতা, মুখোশধারীর পশুত্ব। এইসব নিয়েই মানব-জীবন। ভাল-মন্দ, আনন্দ-বেদনা, জয়-পরাজয়, অধীনতা-স্বাধীনতা নিয়ে এগিয়ে চলে জীবন। থামে না, জীবন থামার জন্য নয়। চলাই জীবনের নিয়ম। ‘পিতার কঙ্কাল’ গল্পগ্রন্থটিতে বলা হয়েছে জীবনের এই বহমানতার কথা।
Pitar Konkal by Afroza Parveen
সম্পাদকীয়, অনুপ্রাণন–১০ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা
শিল্প-সাহিত্যে নারীর ভাষা, ভাষ্য ও দৃষ্টিকোণ নির্মাণে শিল্পী ও সাহিত্যিকদের ভূমিকা
ভাষা সমভাষীদের মধ্যে ভাব বিনিময়ের সহজ ও বোধগম্য উপায়। কিন্তু যখনই বৈষম্যমূলক সমাজ জাতি, বর্ণ, ধর্ম, শ্রেণি, অঞ্চল ও লিঙ্গভেদ সৃষ্টি করে, তখন সমভাষীদের মধ্যে নানারকম উপভাষা, আঞ্চলিক ভাষা এবং একইসাথে উপ-সংস্কৃতিতে জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ে। ভাষা ও ভাষ্যের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে তর্ক ও ক্ষেত্রবিশেষে বিবাদ দেখা দিতে পারে। শব্দ ও বাক্যের ব্যবহার ভেদের সাথে সাথে উচ্চারণেরও নানা ভেদ ও ব্যতিক্রম সৃষ্টি হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, বাক্যগঠন, শব্দ ব্যবহার এবং উচ্চারণে বিভেদ ঘোচালেই মানুষে মানুষে বাস্তব ভেদাভেদসমূহ দূর হয়ে যায়। সমাজে যে সকল বর্ণ, শ্রেণি, লিঙ্গ ও অন্যান্য প্রকার ভেদাভেদ রয়েছে, সেসব ভেদাভেদের শেকড় সমাজের গভীরে নিহিত। এ সকল ভেদাভেদের পেছনে কলকাঠি নাড়ে ইতিহাস, পরম্পরা, প্রথা, প্রচলন, শাস্ত্র, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক-সামাজিক তত্ত্ব ও দর্শন। এসব ইতিহাস, পরম্পরা, প্রথা, প্রচলন, শাস্ত্র এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক-সামাজিক তত্ত্ব ও দর্শন নির্মাণ ও বর্ণনার ভাষা, ভাষ্য, শব্দ, বাক্য ও বাগধারার একটি নির্দিষ্ট ছক থাকে। প্রতিষ্ঠাতার নিজের অবস্থান সুরক্ষিত করার জন্য সংগঠিত, অন্যদিকে বৈষম্য দূর করার জন্য পরিবর্তন ও মানবিক বিকল্পের প্রয়াসে যারা ভাষা, ভাষ্য, শব্দ, বাক্য, বাগধারা অথবা প্রবাদের আলোচনা-সমালোচনা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করায় ব্রত রয়েছেন, তারা যেন এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ অথবা যদি তাদের কোনো সংগঠন থেকে থাকে, তবে সেটাও নিতান্ত দুর্বল।
সরল ও স্বাভাবিকভাবে দেখলে শিল্প-সাহিত্য দেশ, সমাজ, রাষ্ট্রের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং চলমান ঘটনারই প্রতিফলন। তাই সমাজে বিরাজমান ভেদাভেদ ও বৈষম্যের প্রতিফলন শিল্প-সাহিত্যে এসেছে। কিন্তু সবক্ষেত্রে সেসব প্রতিফলন যে, সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত ছিল তা নয়। ক্ষমতাশালী শ্রেণি-গোষ্ঠী, তাদের মত ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রচার ও প্রসারে যেমন ব্রতী হয়েছে, তেমন একইভাবে নানারকম লিখিত-অলিখিত সেন্সরশিপ আইনের প্রকাশ্য অথবা আড়ালে প্রয়োগ করার মাধ্যমে ক্ষমতার বাইরের শ্রেণি-গোষ্ঠীর প্রতিবাদী মানবিক ও নান্দনিক শিল্প-সাহিত্যকে দমন করেছে, নিশ্চিহ্ন করেছে অথবা নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছে নিষ্ঠুরভাবে। কোনো ভালো অথবা ন্যায্য কাজেও সমাজের ক্ষমতাধরদের রাগ-বিরাগ দেখা দিলে সেসব কাজ নিরুৎসাহিত করার উপায় নানাভাবেই উদ্ভাবিত হয়েছে, সুকৌশলে এসবের প্রয়োগ হয়েছে এবং হচ্ছে।
সুতরাং শিল্প-সাহিত্যে নারীর অংশগ্রহণ, নারীর ভাষা, ভাষ্য ও দৃষ্টিকোণ নির্মাণের পথে এক দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করা; এমনকি আত্মদানের অতীত ইতিহাস রয়েছে, যা কি-না সমকালীন সমাজেও চলমান রয়েছে। শিল্প-সাহিত্য শরীরী কোনো খেলা নয় যে, সেটার জন্য দুটো পৃথক মাঠ থাকবে, যেমন—পুরুষ ফুটবল-নারী ফুটবল বা পুরুষ হকি-নারী হকি। শিল্প-সাহিত্য বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ। নারী ও পুরুষের মাঝে বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতার বিভেদ রেখা টানার বিধান শাস্ত্রে উল্লেখ করে এই বিভেদ রেখাটাকে স্থায়ী করার চেষ্টা হয়েছে এবং সেই চেষ্টা চলমান রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, নারী ও পুরুষের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো বৈষম্য নেই। তাই যত চেষ্টাই করা হয়ে থাকুক না-কেন, শিল্প ও সাহিত্যচর্চার মাঠটাকে নারী-পুরুষে ভাগ করা যায়নি।
একজন শিল্পী অথবা সাহিত্যিককে প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থার বাস্তবতার সাথে লড়াই করেই নিজের স্থান করে নিতে হয়। আমরা বিষয়টা বুঝে নিতে পারি যে, কেন ইতিহাসে একজন পুরুষ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি পাওয়া যায়, কিন্তু একজন নারী মাইকেলেঞ্জেলো পাওয়া যায় নাই। প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাসে আমরা উল্লেখযোগ্য কোনো নারীশিল্পী অথবা সাহিত্যিকের নাম দেখতে পাই না। যদিও এসবকালে মৌখিক সাহিত্য রচিত হয়েছে, যা কি-না পরবর্তীতে নামহীন সাহিত্য হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এমনকি রেনেসাঁর যুগেও যখন শিল্প ও সাহিত্যের ব্যাপক জাগরণ ঘটেছিল, তখনও আমরা কি সে-রকম উল্লেখযোগ্য নারীশিল্পী অথবা সাহিত্যিকের নাম পাই? বস্তুত আধুনিক যুগে এসেই বহু লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নারীরা রচিত শিল্প-সাহিত্যে যেমন স্বমহিমা ও মর্যাদার স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে সে-রকম নিজের অসীম মানসিক শক্তি অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বল্প সংখ্যায় হলেও শিল্প ও সাহিত্যের জগতে শিল্পী অথবা লেখক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এসব কারণে নারীদের হৃদয়ের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মাত্রাটা অনেক সময়েই সমাজসচেতন ব্যক্তির কাছেও অননুধাবনযোগ্য হয়ে পড়ে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ভয়ার্ত শৈশব, অব্যক্ত কৈশোর, বৈষম্যের যৌবন, অতৃপ্তির দাম্পত্য, সামাজিক নিষ্পেষণ যে বিষয়বৈচিত্র্য, কোনোরকম রাখঢাক না করেই সেসব কাহিনির কতটা বাস্তবে উন্মোচন ও প্রকাশে সমাজ সাহসী হয়ে উঠবে? কিন্তু ইঞ্চি ইঞ্চি করে হলেও কুসংস্কারগুলো ঝেড়ে ফেলে সমাজ একটু একটু করে এগিয়েছে।
কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিল্প-সাহিত্যে নারীর অবয়বকে জন্মদাত্রী মায়ের অথবা যৌন আবেদনময়ী রমণীর বিভিন্ন প্রতীকী উপস্থাপন হয়েছে অনেকটা সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো করে। নারীকে শৃঙ্খলিত করার জন্য যেমন প্রতীক সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি নারীমুক্তির জন্যও প্রতীক রয়েছে। নারী নিজে কখনো প্রতীক হয়েছেন, নারীর পোশাকে প্রতীক ছড়িয়েছে, নারীকে অবমাননার জন্য প্রতীকের ব্যবহার হয়েছে। নারীর প্রতীকী উপস্থাপন শিল্পকলায়, সাহিত্যে, সভ্যতায় যেভাবে এসেছে, বাস্তবের নারী সেখান থেকে বহুদূরেই রয়ে গেছে। অথবা পুরো বিশ্বব্যবস্থা নারীকে প্রতীকী উপস্থাপনের মাধ্যমে বেঁধে ফেলতে চেয়েছে, নারী কেবলই সেই বাঁধন ছিঁড়ে বেরোবার জন্য নিরন্তর যুদ্ধ করে যাচ্ছে। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অজস্র প্রতীকের অচলায়তন ভেঙে এগিয়ে যাওয়াটাই নারী জীবনের প্রতিদিনের সংগ্রাম।
শিল্প-সাহিত্যে নারীর প্রবেশ ও অগ্রগতির পথে সমস্যার ব্যাপ্তি ও গভীরতা অনুধাবন করার জন্য নারীশিল্পী ও সাহিত্যিকদের শিল্প-সাহিত্য জগতে প্রারম্ভিক প্রবেশ করা, এগিয়ে আসা এবং অগ্রগতির বিষয়গুলো উল্লেখ করে, আমরা কিছুটা আলোচনা করতে পারি। সভ্যতার হাজার হাজার বছর পেরিয়ে গেছে যখন শিল্প-সাহিত্যচর্চায় একমাত্র পুরুষদেরই পদচারণা ছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপ যখন ধীরে ধীরে রেনেসাঁর দিকে গুটি গুটি পা বাড়াচ্ছিল, তখনও মাত্র অল্প কয়েকজন নারীশিল্পী অথবা সাহিত্যিক রেনেসাঁর প্রস্তুতি পর্বে ‘মর্ত্যরে ভগবান’ তথা পুরুষদের বাধা অতিক্রম করে নিজেদের প্রকাশ্যে নিয়ে আসার জন্য কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। এই সারিতে যে আটজন নারীর নাম উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা হয়ে থাকে, তারা হচ্ছেনÑ সোফোনিসবা এঙ্গুইসোলা, লেভিনা তিরলিঙ্ক, লাভিনিয়া ফনটানা, ক্যাথারিনা ভন হেমেসিন, এলিজাবেথ সিরানি, ক্লারা পিটার্স, জুডিথ লেইস্টার এবং আর্টমেসিয়া জেনটিলেসিন।
কিন্তু তারও অনেক পূর্বে সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীকালে পারস্য ও মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে সহস্রার্ধ মৌখিক গল্প মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে সম্রাট শাহরিয়ারের স্ত্রী শাহ্রজাদের কথাসাহিত্য হিসেবে। শাহ্রজাদের সৌভাগ্য যে, ইতিহাস তার নামটি মুছে বেনামী নামকরণ করেনি। পৃথিবীর কথাসাহিত্যের জগতে এ-রকম নানা বিষয়ভিত্তিক ১০০১টি গল্পের রচনা বিস্ময়কর, যেখানে প্রতিটি গল্পের শেষে সম্রাটের কাছে তার স্ত্রী শাহ্রজাদের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করার প্রার্থনা গৃহীত হওয়ার কথা যুক্ত রয়েছে। সিন্ধু সভ্যতায় গুহাচিত্র ও পাথরের ভাস্কর্যে নারী জন্মদাত্রী মাতা অথবা যৌন আবেদনময়ী বস্তু হিসেবেই চিত্রিত হয়েছে। বৈদিক পর্বে শাস্ত্রমতে, নারীর অবস্থান জন্মদাত্রী মাতার অবস্থান হিসেবে নারীকে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নির্দিষ্ট করে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, এই মর্যাদা লাভের কারণে নারী-পুরুষতন্ত্রের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত ছিল। বাস্তবে প্রাক-উপনিবেশবাদ আমল পর্যন্ত সিন্ধু ও ভারতীয় সভ্যতায় নারী, বংশ রক্ষাকারী মাতার বাইরে আর অন্য কোনো পরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠতে পারে নাই। চীন সভ্যতায়ও সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীতে তাং রাজত্বকালে নারীদের অবস্থানে স্বকীয়তা অর্জনের কিছু সুযোগ গ্রহণ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো নারীশিল্পী অথবা সাহিত্যিকের নাম পাওয়া যায় না। নারীদের নান্দনিক ক্ষুদ্র অঙ্কন ও সুচি শিল্পের নিদর্শন জাদুঘরে দেখতে পাওয়া যায়। বিশ্বসাহিত্যে প্রথম নারী কবি প্রাচীন গ্রিসের স্যাফো। ষষ্ঠ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে নব কবিদের একজন ছিলেন এই গীতিকবি। চর্যাপদকে বলা হয় বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন। চর্যাপদের পদকর্তাদের মধ্যে একজন নারী পদকর্তা ছিলেন বলে মত প্রকাশ করেছেন ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়। এই নারী পদকর্তার নাম কুক্কুরিপা। রজকিনীকে অনেকে চেনেন চণ্ডীদাসের প্রেমিকা হিসেবে। তাঁর আরেকটি পরিচয় আছে, তিনি একজন কবি। তিনি রামী ও রামমনি—এই দুই নামে কবিতা লিখতেন। তাঁর পদগুলোর নাম ছিল রামীর পদ। ঋগে¦দ-এ কয়েকজন নারী দার্শনিকের নাম পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে একজন লোপামুদ্রা। তিনি কৌষীতকি নামেও পরিচিত ছিলেন। ঋগে¦দে ২৭ জন নারী ঋষির রচিত সূক্তের উল্লেখ রয়েছে। ইতিহাসে এসব উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সংখ্যাবিচারে বলা যেতে পারে যে, বস্তুত আধুনিক যুগে এসেই নারীরা শিল্প-সাহিত্যে ধীর লয়ে প্রবেশ করার সুযোগ গ্রহণ করে, যখন শিল্প-সাহিত্যে নারীর ভাষা, ভাষ্য ও দৃষ্টিকোণ নির্মাণের বিবরণ পাওয়া যায়।
বাংলা ভাষায় প্রথম নারী কবি চন্দ্রাবতী। তাঁর রচিত রামায়ণে তিনি রামের পুরুষালি বাহুবলের পরিবর্তে সীতার বঞ্চনা ও পীড়নের বর্ণনাকে মাহাত্ম্য দিয়েছেন। বলা যায়, নারীকবি চন্দ্রাবতী বাংলা সাহিত্যে নারীর ভাষা, ভাষ্য এবং দৃষ্টিকোণ নির্মাণের সূচনা করেন। নারী লেখক রচিত প্রথম উপন্যাসের নাম মনোত্তমা। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৬৭ সালে নবপ্রবন্ধ পত্রিকায়। তবে এ উপন্যাসের লেখকের কোনো নাম জানা যায়নি। লেখক-নামের স্থলে কেবল লেখা ছিল ‘হিন্দুকুল-কামিনী প্রণীত’। আবার বাঙালি মুসলমান নারীদের মধ্যে প্রথম পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যগ্রন্থ রচনা করেন ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী। ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর বইয়ের নাম ছিল রূপজালাল। ওই বছরই ঠাকুর পরিবারের মেয়ে ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় বোন স্বর্ণকুমারী দেবী লেখেন উপন্যাস, ‘দীপ নির্বাণ’। এ ছাড়া পৃথিবীর প্রথম নারী ঔপন্যাসিক বলা হয়, জাপানি লেখিকা মুরাসাকি শিকিবুকে। তাঁর উপন্যাসের নাম গেঞ্জি, যার ইংরেজি অনুবাদ দ্য টেল অব গেঞ্জি। বাঙালি মুসলমান নারীদের মধ্যে প্রথম গদ্যরচনার কৃতিত্ব হলো তাহেরুন্নেসার। ১৮৬৫ সালে ‘বামাগণের রচনা’ নামে বামাবোধিনী পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল তাঁর গদ্য। বাঙালি মুসলমান নারীদের মধ্যে প্রথম ঔপন্যাসিক হলেন এস এফ খাতুন। ১৯২১ সালে লেখা তাঁর উপন্যাসের নাম জোবেদা।
নারী শিল্পী ও লেখকদের শিল্প ও সাহিত্য রচনার কাজে নিয়োজিত হওয়ার পথ কখনো মসৃণ ছিল না—এখনো নেই। অন্যদিকে নারী অথবা পুরুষ শিল্পী ও সাহিত্যিকদের দ্বারা নারীর সামাজিক সমস্যাগুলো চিত্রিত করার কাজেও বিস্তর বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এ সকল পরিস্থিতিতে নারীদের মধ্যে শিল্প-সাহিত্যে আধুনিক নারীর সংগ্রামের ভাষ্য ও রূপরেখা নিয়ে নানা মতভেদও দেখা যায়। প্রশ্ন উঠেছে, এসব মতভেদ শিল্প-সাহিত্যে নারীর অবস্থান সৃষ্টিতে নারী আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কি-না? তবে আমরা মনে করি, মতভেদ থাকবেই এবং এসব মতভেদ দ্বান্দ্বিক নিয়মেই দূরীভূত হয়ে একটি নতুন স্তরে উন্নীত হতে পারে।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, শিল্প ও সাহিত্যে নারীর সরব উপস্থিতি কামনা করে। অনুপ্রাণন আশা করে, শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যম দিয়ে নারীর ভাষা, ভাষ্য এবং দৃষ্টিকোণ ক্রমেই সমাজে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করার কাজে যেন অগ্রসর হতে পারে।
১০ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা
রবিউল ইসলাম। হাস্যরসের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রসিক আর আড্ডাপ্রিয়। হাস্যরসিক বন্ধুপ্রিয় এ মানুষটির জন্ম ১৯৭৭ সালেÑ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাধীন গোমস্তাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী শিবরামপুর গ্রামে। লেখাপড়া করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে। বিভিন্ন গবেষণা পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর অনেক প্রবন্ধ, কবিতা ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে। ইতোপূর্বে লেখকের ‘কই মাছটি এখনো নড়ছে’ (২০১৯) এবং ‘বিরুদ্ধ বাতাসে বালক’ (২০২০) শিরোনামে দুটি রম্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। যাপিত জীবনের বাস্তবতা থেকে উৎসারিত তাঁর রম্যগল্পগুলো। গল্পগুলোতে ভারত সীমান্তের কোল ঘেঁষে বিরাজমান শিবরামপুর গ্রামের প্রকৃতি ও মানুষের সহজাত ঘটনা বর্ণিত হলেও এটি মূলত আবহমান গ্রামবাংলার রসময় চিত্র ।
রবিউল ইসলাম ২৬তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। তিনি ২০০৬ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজে প্রভাষক বাংলা পদে যোগদানের মাধ্যমে চাকুরিজীবন শুরু করেন। ইতোপূর্বে তিনি সহকারী অধ্যাপক, বাংলা পদে চাকুরি করেছেনÑ রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী, বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ, বদলগাছী, নওগাঁ ও ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজে। বর্তমানে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পি-এইচ.ডি গবেষণারত।
বাংলা সাহিত্যের বিচিত্র বিষয়ের তিনি একজন অনুসন্ধিৎসু পাঠক। লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত আছেন ছাত্রজীবন থেকেই।
‘চেরাগ আলীর ফুটবল কাল’ লেখকের প্রথম শিশুতোষ গ্রন্থ। এ গ্রন্থে তিনটি গল্প রয়েছে। গল্পগুলো শিশুদের উপযোগী করে লেখা হলেও যে কোনো বয়সের পাঠক এর গল্পরস থেকে বঞ্চিত হবেন না। গল্পগুলোতে লেখকের শৈশবকালীন স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা শিশুমনের উপযোগী করে ব্যক্ত করা হয়েছে। কাহিনি বর্ণনায় হালকা রসের আশ্রয় নেয়া হয়েছে Ñ যা শিশুমনে অফুরান আনন্দ জোগাবে।
এ গ্রন্থে লেখকের শৈশব কৈশোরের দুরন্ত ও ঘটনাবহুল দিনগুলোর ছবি জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
চেরাগ আলীর ফুটবল কাল
“আমি যেন শূন্যের মাঝে পূণ্য দেখি
কাব্যের মালা গলে পরে চিবুক খুঁজি
তন্ত্র-মন্ত্র সব যজ্ঞের কোলে হীন হয়
বোধিবৃক্ষরা বারামখানায় লীন রয়
স্বতন্ত্র এক পুবের হাওয়া মনে বয়
ভাঙতির নামে সকল আশা ক্ষীণ হয়।
এই নোটটা এখন তবে আয়নার মতো
জীবন নামের প্রেমের পরে কবিতা যতো
নোটটার কিন্তু কোনো মূল্যমান নেই
প্রেমের ধামে জুয়াড়ী যে হারাবে খেই।
আমাকে একটু ভাঙতি করে
একটুখানি খুচরো দাও
একবিন্দু ভালোবেসে
প্রেমের নায়ে শূন্যে যাও।”
বৃষ্টিরা একা আসেনা - Brisstira Eka Asey Na
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.





















There are no reviews yet.