Additional information
| Weight | 0.318 kg |
|---|---|
| Published Year |
$ 0.59
| Weight | 0.318 kg |
|---|---|
| Published Year |
সম্পাদকীয়, নবম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা-
কবি ও কবিতার অনুপ্রাণন—
সূচনা লগ্ন থেকেই শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন, সাহিত্যের এই বিশেষ শাখা অর্থাৎ কবিতা বিভাগটির উপর বিশেষ যত্ন দিয়ে এসেছে। কেননা সাহিত্য রচনায় কবিতাই একমাত্র শাখা যেখানে কবির অন্তরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা অনুভূতিটি উপচে বের হয় কবিতায়। যেখানে কোনো প্লট-পরিকল্পনা বা পূর্বপ্রস্তুতির চিহ্ন খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। হতে পারে কবির সেই কথাগুলো নির্গত হয়েছিল কোনো অস্থির অথবা কোনো বেদনার অথবা কোন শান্ত-সমাহিত ধ্যানের মুহূর্তে। হৃদয় মথিত কোনো নান্দনিক অথবা কোনো মানবতবাদী ভাব সৃষ্টি ও রচনার গভীর অনুপ্রেরণায়। কিন্তু স্বতস্ফুর্তভাবে নির্গত শক্তিশালী কোনো অনুভূতি যে কোনো আকারে প্রকাশিত হলেই কী সেটা কবিতা হয়ে উঠতে পারে? কবিতা—সাহিত্য রচনাশৈলীর এমনই একটি বিশেষ ধারা যেখানে শব্দ ও ছন্দ পার¯পরিকভাবে ক্রিয়াশীল থাকতে দেখা যায়। কবিতায় শব্দগুলো একসাথে জুড়ে থেকে কোনো প্রকার উচ্চারণ, ধ্বনি, চিত্র অথবা চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে থাকে যা কি-না সরাসরি বর্ণনা করতে গেলে হতে পারে অনেক জটিল অথবা বিমূর্ত। কবিতা রচনায় প্রচ্ছন্ন থাকে ছন্দ ও মাত্রা অর্থাৎ অক্ষর অথবা শব্দাংশের সংখ্যার সম্মিলন অথবা বিন্যাস। কিন্তু, কবিতার এসব গঠন প্রক্রিয়া সবসময় সচেতনভাবে কতটুকু কবির মনে ঘটে থাকে, সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুমান করা কঠিন।
বাংলা ভাষার হাজার বছরের ইতিহাসে সাহিত্যের আরম্ভ অনেকটাই গীতিকবিতা দিয়েই। যেখানে উচ্চারণ ও ছন্দের মিলের সাথে যুক্ত ছিল সুর। বিষয়বস্তুতে গভীর ব্যক্তি অনুভূতির থেকে অগ্রাধিকার পেল সামাজিক-রাজনৈতিক কাহিনী। কেননা, তখন সমাজই ছিল সব, ব্যক্তির অস্তিত্ব একপ্রকার ছিল না বললেই চলে। তাই সেসব কাহিনীতে ছিল সমাজ ও রাজনীতি, ক্ষেত্রবিশেষে শাসকের গুনকীর্তন আবার ক্ষেত্রবিশেষে প্রথা-প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা, রোমান্টিক প্রেমের জনপ্রিয় আখ্যান, যৌনতা, অথবা বীরের শৌর্য-বীর্য, জন্ম-মৃত্যু, প্রেম অথবা বিবাহ।
চর্যাপদ দিয়েই বাংলা কবিতার গোড়াপত্তন। চর্যাপদ কতগুলো আশ্চর্য বিপরীতধর্মী কবিতার সমাহার। তাই চর্যাপদের আরেক নাম—চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয়। চর্যাপদে বর্ণিত সাধন তত্ত্ব, তৎকালীন বাংলার সমাজ জীবনের চিত্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশের অপরূপ বর্ণনা, সকলই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে প্রমাণিত ও গৃহীত। কিন্তু, চর্যাপদের ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধীতা, অভিজাতদের ধর্মদর্শন ও ধর্মানুষ্ঠানের প্রতি বিদ্রুপ উচ্চারণ ইত্যাদী’তে লোকায়তিক বৌদ্ধ ও জৈনরা যে সেই খ্রিস্টপূর্ব থেকেই ব্রাহ্মণ্য-বিধানকে অমান্য করে এসেছে, তারই কতক প্রতিচ্ছবি মেলে চর্যাপদের কোনো কোনো পদ্যে। বাঙালি জাতিসত্ত্বার মূলে রয়েছে—হিন্দু লৌকিক, বৌদ্ধ লৌকিক, ইসলাম লৌকিক; এরকম সকল লৌকিকগণ। এই লৌকিক অনভিজাত বা প্রাকৃত বাঙালিই হচ্ছে প্রকৃত বাঙালি। আঠারো শতক পর্যন্ত রচিত সাহিত্য এই প্রাকৃত বাঙালির উপভোগ্য ছিল। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য, বাংলায় রূপান্তরিত রামায়ণ-মহাভারত-ভগবত, বৈষ্ণব পদাবলি, চৈতন্যের জীবনী, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, ইত্যাদী সকল সাহিত্যের ক্ষেত্রেই একথা প্রযোজ্য। সে সময়ের লোকসাধারণের কবিরা এই ‘লৌকিক করিয়া’ ‘লৌকিকের মতে’, মূলধারায় কবিতা তথা সাহিত্য রচনা করতেন।
কিন্তু তারপর পরে একটি দীর্ঘ ছেদ। বাংলা সাহিত্যে কথিত অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে বড়ু চণ্ডীদাস নিয়ে আসেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। এ কাব্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়লীলাচ্ছলে জীবাত্মা-পরমাত্মা লীলা লীলায়িত হলেও মধ্যযুগের শুরুতে একাব্য অনবদ্য ভূমিকা রাখে। তবে মধ্যযুগ বিশেষভাবেই বিখ্যাত মঙ্গলকাব্যের জন্য। প্রায় পাঁচশ বছর ধরে বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন শ্রেণির মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছে। যদিও মঙ্গলকাব্যগুলোর রূপ প্রায় একই রকম। কতিপয় মঙ্গলকাব্যে কবিতার ভারী যাদু থাকলেও সবচেয়ে বেশি ছিল সমকালীন সামাজিক জীবনের বোধ ও পরিচয়। বাংলাদেশের মধ্যযুগের ইতিহাস জানতে হলে মঙ্গলকাব্য অবশ্যপাঠ্য। বৈষ্ণব পদাবলি আমাদের স্বপ্নে বিভোর করে। বৈষ্ণব পদাবলির পাত্র-পাত্রী কৃষ্ণ-রাধাকে কেন্দ্র করে যে কবিতাগুলো রচিত হয়েছিলো সেগুলো বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
রাজসভায় রচিত হলেও মধ্যযুগের সাহিত্য কেবল অভিজাতদের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেনি। মধ্যযুগে সামাজিক বৈষম্য প্রকট থাকলেও, পুরোহিত-মোল্লাদের দাপট থাকলেও, অভিজাত কর্তৃক উৎপীড়ন থাকলেও, সে যুগের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বাংলার প্রাকৃতজনেরই প্রাধান্য ছিল। যারা আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসবিদ, তাদের অনেকের মতে, মধ্যযুগের সর্বশেষ কবি হলেন ভারতচন্দ্র আর আধুনিক যুগের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন। মাঝখানে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত হলো ‘যুগসন্ধির কবি’।
মধ্যযুগের বিদায়ী দামামা বেজে ওঠে, যখন ১৭৫৭-তে আমরা স্বাধীনতা হারাই। বণিক শাসক হয়। অনেক পরিবর্তনের সাথে সাথে সাহিত্যের পরিবর্তন বা পতন ঘটে। ভারতচন্দ্রের রচনায় দেখা যায় পতনের ছাপ। বলা হয়ে থাকে ১৭৬০ থেকে ১৮৩০ এই সত্তর বছর বাংলা সাহিত্যের পতন ঘটেছিল। সে সময় কবিয়াল ও শায়েরদের উদ্ভবে এক নিম্নরুচি সম্পন্ন সাহিত্য রচিত হয়। অর্থাৎ, কবিগান। কবিগানকে গর্ব করার মতো সাহিত্য বলতে অনেকে নারাজ। কবিয়াল ও শায়েররা বিকিয়ে গেলেও কোনো কোনো কবিগান বা শায়েরি আজো বাংলার প্রাকৃতজনের মনে শেকড় গেড়ে আছে সেসবের অনবদ্য ছন্দ ও সুরের নান্দনিকতার কারণে।
বাংলা কবিতায় আধুনিকতা আনেন মাইকেল মধুসূদন। মহাকাব্য রচনা করে বাংলা কবিতার রূপ বদলে দেন। শুধু তাই নয় তিনি বাংলা পয়ারকে এক নতুন রূপে উপস্থাপন করেন। ব্যবহার ক্লান্ত ছন্দরীতিকে মধুসূদন করে তোলেন প্রবাহমান (অমিত্রাক্ষর)। এর আগে অবশ্য ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতায় আধুনিকতার হাল্কা আলোকচ্ছটা দেখা যায়। তবে মধুসূদন একাই এক ধাক্কায় বাংলা সাহিত্যকে অনেক এগিয়ে দিয়ে গেছেন। মধুসূদনের দেখাদেখি অনেকে (হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, কায়কোবাদ) মহাকাব্য রচনার চেষ্টা করেন। কিন্তু, শেষপর্যন্ত ওগুলো মহাকাব্য না হয়ে আখ্যানকাব্য হয়ে ওঠে।
বাংলা কবিতায় মহাকাব্যের ধুমধাম চলাকালে রোমান্টিকতা নিয়ে উঁকি দেন বিহারীলাল। বাংলা কবিতার তিনি-ই প্রথম রোমান্টিক ও খাঁটি আধুনিক কবি। রবীন্দ্রনাথ যাকে ‘ভোরের পাখি’ বলেছেন। আত্মভাবপ্রধান কবিতার জন্ম বিহারীলালের হাতে হলেও বিকাশ ঘটে রবীন্দ্রনাথের হাতে। অগ্নিকুণ্ডে পতঙ্গ পতনের মত বিহারীলাল চলে গেলেও তার কবিতার পথ ধরে আসে—সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, দেবেন্দ্রনাথ সেন, গোবিন্দচন্দ্র দাস, অক্ষয়কুমার বড়াল, ডিএল রায় ও রবীন্দ্রনাথ। প্রথম মহাযুদ্ধের মাধ্যমে বদলে যাওয়া ইউরোপীয় চেতনার প্রভাব পড়ে আমাদের জীবন ও সাহিত্যে। দু’দণ্ড দেরিতে হলেও সেই প্রভাব আমাদের কবিতায় এসে ভালভাবেই পড়ে। আধুনিক কবিতাগুলো বিশশতকের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হয়ে ওঠে।
বিশশতকের গোড়ার দিকে বাংলা কবিতায় রবীন্দ্র-যুগ চলাকালে রবীন্দ্রাগুনে পুড়েছেন অনেকেই। তবে রবীন্দ্র-বলয় থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টাও করেছেন অনেকে। তাদের মধ্যে মোহিতলাল, যতীন্দ্রনাথ বিশেষ করে কাজী নজরুল ইসলাম। যিনি একইসাথে প্রেম ও দ্রোহের কবি। তার কবিতায় যেমন বিদ্রোহ আছে তেমনি আছে কৈশোরিক প্রেমের কাতরতা। বিশ শতকের তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি সময়ে আধুনিক কবিতার রমরমা হাট বসে বাংলা সাহিত্যে। বাংলা কবিতায় বাঙালির প্রথাগত বিশ্বাস, সুন্দর, কল্যাণ, আবেগ, স্বপ্ন, সুখ-দুঃখ ও কাতরতা বিসর্জন দিয়ে আধুনিক কবিগণ নগরের কথা ও ক্লান্তি, অবিশ্বাস, নিরাশার কথা ফুটিয়ে তোলেন কবিতায়। কবিতায় পাল্টে যায় বাঙালির চেতনা। বুদ্ধদেব, জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু ও অমিয়, এই পাঁচজন কবিকে রবীন্দ্রনাথের পর আধুনিক কবিতা সৃষ্টিকারী বাংলা ভাষার প্রধান কবি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কিন্তু তারপর অচিরেই এই পঞ্চকবিকে অনুসরণ করে আসলেন সমর ও সুকান্ত।
সাহিত্যে রক্ষণশীলতা ও প্রগতিশীলতা মুখোমুখী দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় প্রায়শই। বিশ শতকের গোড়াতেই আধুনিক সাহিত্যকে অশালীন বলে গালিগালাজ করে প্রবন্ধ ও বই ছাপেন ঊনিশ শতকের বিভিন্ন রক্ষণশীলেরা। আসলে সাহিত্য কখনো অশালীন বা অশ্লীল হয় না। বিশেষ করে কবিতা। কবিতায় সব বলা যায় সব রকম ভাবে। এছাড়া অশ্লীল কথাটি আপেক্ষিক। শ্লীল-অশ্লীল নিয়ে বাগ-বিতণ্ডা না করে বরং সাহিত্যকে নিরপেক্ষ মন ও মননেই দেখা উচিত। ইতিহাস থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, যখনই রাষ্ট্রযন্ত্র বা শাসকশ্রেণি সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর শাসন-শোষণ, অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে তখনই যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখচ্ছবি, অর্থাৎ কবি-সাহিত্যিকরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন কবিতা অথবা নানা ধরনের গদ্য রচনার মাধ্যমে। যে সাহিত্যগুলো নানাভাবে বিভিন্ন আন্দোলনেও প্রেরণা জুগিয়েছে। ঊনবিংশ শতককে কখনো বলা যায় বাংলা গণসংগীতের স্ফুরণকাল। সেভাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও দেশ ভাগের পর পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন আন্দোলনের হাত ধরে রচিত হয়েছে বহু প্রতিবাদী সাহিত্য, কবিতা ও গণসংগীত। পাকিস্তানিরা প্রথম যখন আমাদের ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানলো, শুরু হলো আন্দোলন। মাহবুব উল আলম চৌধুরী লিখলেন একুশের প্রথম এবং অমর এক কবিতা—‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসীর দাবী নিয়ে এসেছি’। তবে একুশের প্রথম কবিতাটি ইতিহাস থেকে প্রায় হারিয়েই গেছে। অর্থাৎ, হানাদারদের বহু হয়রানি ও তল্লাশির দাপটে কবিতাটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারিসহ কবির বাসা কয়েকবার সার্চ করে লুকানো দু’একটি কপি পর্যন্ত নিয়ে যায় পুলিশ। পরবর্তীতে কবিতাটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে শহীদ আসাদের শার্ট নিয়ে লিখলেন শামসুর রাহমান, যা আন্দোলনকে বেগবান ও সফল করে তুললো। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রচিত হয়েছে বহু প্রতিবাদী ও প্রেরণাদীপ্ত কবিতা, সাহিত্য এবং গণসংগীত। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর নির্মলেন্দু গুণ সামরিক শাসনের কড়া পাহারার মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে (১৯৭৭) বীরদর্পে পড়ে শোনালেন তার অগ্নিঝরা কবিতা—
“সমবেত সকলের মত আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি
রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেই সব গোলাপের একটি গোলাপ
গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায়
শেখ মুজিবের কথা বলি।”
নির্মলেন্দু গুণ-ই প্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কবিতার বিষয় করে তুললেন। তারপর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখলেন জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামালসহ আরো অনেকে। অর্জুনের মত বীর সময় দোষে নপুংসক সাঁজলেও কবি কখনো তেমনটি হয় না বা হওয়া উচিত না। কবি হবে মজলুম, প্রয়োজনে নির্বাসিত। বলবে মানুষের (সংখ্যাগরিষ্ঠ) কথা, মানবতার কথা। রুদ্র পেলেন বাতাসে লাশের গন্ধ আর তসলিমা সব বয়স্কা বালিকাদের গোল্লা হতে ছুটে বেরুনোর আহ্বান জানালেন কবিতায়। তারপর ’৯০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত হয় কিছু প্রতিবাদী কবিতা ও গণসংগীত।
ইতিহাসের একটি বিশ্লেষণে প্রতিভাত হয় যে, ’৯০-এর দশকের পর থেকে কবিতার পাঠক সংখ্যায় যেন ভাটা পড়েছে। ইদানীং কবি দেখলেই বলাবলি শুরু হয়—কবিতার এখন আর দিন নেই, কবিতা এখন পাঠক খায় না, কবিতার বই বাজারে কাটে না ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে এখানেই ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে যে তথাপি কবির সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে বৈ কমছে না। বিশেষতঃ কবিতা প্রকাশ করতে এখন আর প্রকাশকের পেছনে লাইন দিতে হয় না। চাইলেই ফেসবুক ওয়ালে কবিতা ছুড়ে দেয়া যায়। হাইকোর্টের সামনে থেকে মূর্তি সরানো ও অন্যত্র স্থাপন নিয়ে এখনি সহস্র কবিতা ছুড়ে দেয়া যায়। এখন মিনিটে মিনিটে রচিত হচ্ছে কবিদের ভ্রুণের চেয়েও বেশি সংখ্যক কবিতা। প্রযুক্তির কল্যাণে কবি ও কবিতার পাঠক এখন একবারে মুখোমুখী দণ্ডায়মান। এটা ভাল। কিছুদিন পূর্বেও যেটা সম্ভব ছিল না খুব বেশি। শাসন-শোষণ, অত্যাচার-নির্যাতন বা আগ্রাসন কি এখন হচ্ছে না? তবে আমরা সে রকম কোনো কবিতা পাচ্ছি না—কিন্তু কেন?
আজকাল কবিতার বিষয় কী কী, সেটা কিন্তু আমরা হাতের মুঠোয়-ই দেখতে পাচ্ছি। আমরা আজ যা হাতের মুঠোয় দেখতে পাচ্ছি তা যদি নজরুল আগেই বলে যেতে পারেন তার কবিতায়, তাহলে কী আমাদের এখনকার কবিগণ আগামী বিশ্ব সম্পর্কে ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাদের কবিতায়, অথবা এর চেয়েও পরবর্তী কিছু। আজকাল কবিতায় নারীকে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, বিদ্যমান প্রাকৃতিক পরিবেশের চিত্র কবিতায় কতোটা স্থান পাচ্ছে নিশ্চয়ই চর্যাপদে বর্ণিত বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর এখনকার সৌন্দর্য এক হবে না। মঙ্গলকাব্য পড়ে যদি বাংলাদেশের মধ্যযুগের সামাজিক অবস্থা (ইতিহাস) জানা যায়, তবে আমাদের আজকের কবিদের কবিতা বা সাহিত্যে সমকালীন পঁচনশীল পুঁজিবাদের ভোগসর্বস্ব কায়েমী স্বার্থবাদী ও পাশাপাশি আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তি মানসিকতার যে সমকালীন সমাজ বাস্তবতা, সেই সমাজ বাস্তবতার ঠাঁই পাওয়াটাই স্বাভাবিক।
বাঙালির জমিতে কলের লাঙল পড়েছে, ছনের চাল হয়েছে টিনের এবং সেই চালে বসেছে কাক, শাদা কাক। মোড় নিচ্ছে আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা। নেওয়াটাই হয়তো স্বাভাবিক। সময়কে তো আর অস্বীকার করা যায় না। কালে কালে মহাকাল অবধি কবিগণই মানুষের সমস্ত অনুভূতি কে বাঁচিয়ে রাখে। কবিদের গর্ভেই বাঁচে মানুষ। আমাদের এই কবিসকল কি পারবেন মানুষের মানবিক অনুভূতিগুলোকে কবিতায় বন্দি করে মহাকাল অবধি দীর্ঘজীবন দিতে নাকি ফেসবুক বা প্রযুক্তি নামক কালের গর্ভে হারিয়ে যাবেন কাক ও কাল যত কিছুকেই আমরা আপন করে নিই না কেন? তাতে কোনো দোষ নেই, তবে লৌকিক বাংলার গভীর মানবিক চেতনার স্বকীয়তা কতটুকু বজায় থাকছে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যে বাংলা সাহিত্যের দেবী চিরকাল কাব্যজীবি, কবিতার স্বাদ ছাড়া সে বাঁচবে কী করে। আমরা কি কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি?
নবম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা
সম্পাদকীয়
শিল্প-চেতনার ঐক্য
দেশে-বিদেশে সাধারণভাবে এটাই ধরে নেয়া হয় যে কবি-সাহিত্যিক ও শিল্পীরা সাধারণ মানুষদের তুলনায় সমাজ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন, সক্রিয় এবং অগ্রসর ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি গোষ্ঠী। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এই গোষ্ঠীর সকলেই সমমনা এবং তারা একক কোন সংগঠনে মিলিত অবস্থায় রয়েছেন। এর কারণসমুহ সময়ের সাথে সম্পর্কিত সমাজের আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতির বাস্তব ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যেতে পারে।
ভাষা, শব্দ, কণ্ঠ, বাদ্যযন্ত্র, রঙ, তুলি অথবা যে কোন উপকরণ ব্যবহার করে সুর ও সুন্দরের চর্চা, অভিব্যক্তি ও নির্মান যা মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে, হৃদয়ে আবেগ-অনুভূতি আন্দোলিত করে, মন মুগ্ধ করে অথবা মেধা ও মননে গভীর ছাপ ফেলে যায়- কবি-সাহিত্যিক ও শিল্পীরা সেই কাজেই নিজের প্রতিভা বিকাশের সাধনায় নিয়োজিত থেকে সমাজে সুর ও সুন্দরের সৃষ্টি করে যেতে থাকেন। সুতরাং তাঁদের স্বাভাবিক অবস্থান কুৎসিত, অন্যায়, অন্যায্য ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে এবং এটাই একান্তভাবে প্রত্যাশিত। সেখানে বিভেদের কী কোন অবকাশ থাকে? সত্য ও সুন্দরের আরাধনা করতে চাইলে একজন শিল্পীকে বুদ্ধিবৃত্তির পরিচর্যায় নিমগ্ন হতে হবে এবং অনস্বীকার্যভাবে কুসংস্কার, ভীরুতা, জরাজীর্ণতা ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। কিন্তু, বাস্তবে আমরা কী দেখতে পাই? শুদ্ধ শিল্পসিদ্ধি এবং বাস্তবজীবন বীক্ষণ বোধ ব্যক্তি ও ক্ষেত্র বিশেষে যেন সম্পর্কবিহীন দুটো সেতুবিহীন রাজ্যের মতো বিভক্ত রয়ে যায়। কিন্তু, এটা কেন?
আমাদের নন্দনবোধের সাগরে প্রকৃতি যেমন একটা বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে, ঠিক তেমনই জীবন যাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশ চেতনা কী বাস্তব পর্যবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়? এই দুটি বিষয়কে কল্পনা বা বাস্তবে কী কোন প্রভাবেই বিচ্ছিন্ন করা যায়? অসীমের অন্বেষণ ও স্বপ্নচারিতা একজন শিল্পীর থাকতে পারে। সৌন্দর্যের সন্ধানে অসীম ও অনন্তের দিকে যাত্রা করাও দোষের নয়। পরম সত্যের সৃষ্টির রহস্যকে ঘিরে অনুসন্ধান অনুসন্ধিৎসা আলো-অন্ধকারের উজ্জীবনে না হয় ক্লান্তিতে হয়ত হাবুডুবু খাবে। কখনো কখনো অন্ধকারের স্তব্ধতা নৈঃশব্দের দ্যোতকরূপে চেতনায় সংগুপ্ত থাকবে কিন্তু চিন্তায় সংকীর্ণতা, স্বার্থবাদী ও ক্ষমতাশালী উপনিবাশবাদী শক্তি পরিচালিত ভেদ ভাবনা অথবা মৌলবাদ কখনো মানবমুক্তির স্বপ্নের উজ্জ্বল আলোকে স্পর্শ করতে সাহায্য করতে পারবে না।
কালোত্তীর্ণ শিল্প কী জীবন বিচ্ছিন্ন ছিল? মানুষের দেহ ও তার অবয়বকে, তার যাপিত জীবনের সংগ্রাম অথবা উৎসবের বাইরে মানুষকে ছুঁড়ে দিয়ে মৌলবাদী কোন বিশ্বাসে শৃঙ্খলিত করার কোন অপচেষ্টায় সেসব শিল্প কর্ম কী লিপ্ত ছিল? এমন কোন অভিযোগ অথবা এমন কোন বিশেষণে সেসব শিল্প কর্মকে কী বিশেষায়িত করা সম্ভব? মানবসভ্যতার ইতিহাসে কালোত্তীর্ণ শিল্পের আধারে আত্মার মুক্তি কখনোই অধিক যথার্থ প্রশ্ন ছিল না- যতনা ছিল প্রেম, মানবতা ও মানব মুক্তির বিষয়াবলী। আর এ-কারণেই বুঝে নেয়া দরকার যে ক্ষমতার বর্বরতা ও নৃশংসতার সঙ্গী-সমর্থক হয়ে কখনোই প্রেম, মানবতা ও সুন্দরের পূজা সার্থক সিদ্ধি লাভ করতে পারে না। কেননা যখন ঘৃণা অথবা প্রেম থেকে শিল্পকে যে কোন একটাকে বেঁছে নেয়ার প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় তখন মানবতাই শিল্পের ধর্ম হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। কেননা- প্রেমই সুন্দর এবং প্রেমই মানবতার বৈশিষ্ট।
যদিও প্রতিটি মানুষের মধ্যেই সংবেদনশীলতা বিরাজমান কিন্তু এর মাত্রা ও স্বাতন্ত্র্য সবার অস্তিত্বে সমভাবে লালিত হয় না। যারা একটু অধিক মাত্রায় সংবেদনশীল তাদের ইন্দ্রিয় সদা জাগ্রত থাকে, তাঁরা প্রকৃতি থেকে সৃষ্টির চিরন্তনতার নির্যাস পায়, অসীমের অস্তিত্ব এবং সৃষ্টিতত্ত্বের মহিমা হৃদয়াঙ্গম করতে পারে। শিল্পী সমাজের সদস্যগণ জীবন প্রবাহের সব উপকরণের মধ্যে সত্য, সুন্দর, সততা ও সরলতাকে অবিচ্ছেদ্যতার সাথে তাঁর অস্তিত্ব দিয়ে আকাঙ্খা করেন। মানুষ ও মানবজাতির কল্যাণ চিন্তায় হন সবচেয়ে অগ্রগামী এবং এ-কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বৈষয়িক জীবনে বঞ্চিত রয়ে যান। বৈষয়িকভাবে তাঁর বঞ্চিত হওয়া অবাঞ্ছিত নয়, কারণ লেখক ভোগবাদের উপাসক নন, তিনি উপাসক প্রেম ও সত্যের- যে প্রেম, যে সহমর্মিতা, যে ভালোবাসা, মানবজাতির চিন্তা-চেতনা ও জীবন যাপনের সেই সত্য ও সুন্দরতা- যে সত্য থেকে, যে সৌন্দর্য থেকে জীবন সত্য- সদা প্রসারিত ও স্পন্দিত।
জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি যাই থাকুক না কেন, ন্যূনতম ক্ষুধা ও তৃষ্ণার দাবি মিটিয়ে শিল্পী তাঁর মনে কল্পনার একটি সুন্দর জগৎ সৃষ্টি করেন, যে জগতে অপ্রাপ্তির ইতিহাসও প্রমূর্ত হয়ে ওঠে। কল্পনাকে সত্য বলে উপলব্ধি করে লেখক বিশ্বের স্বর্ণযুগ কল্পনা করেন। যদিও স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যে অন্তহীন শূন্যতা থাকে তবুও শিল্পী যেমন নিজে স্বপ্ন দেখেন তেমনই অন্যকেও স্বপ্ন দেখাতে ভালোবাসেন। এসব সুন্দর স্বপ্ন দেখতে দেখতে একসময় অন্যদের মনোজগৎও স্বাপ্নিক ও সুন্দর হয়ে ওঠে। অনেকের ধারণা- শিল্পী শুধু কল্পনারাজ্যে বিরাজ করেন কিন্তু হৃদয়রাজ্যেও যে তাঁর অপ্রতিহত অবস্থান সে বিষয়টি ভেবে দেখেন না। একজন শিল্পী যুক্তিকে স্বীকার করেন, গ্রহণ করেন, ব্যবহার করেন হৃদয় দিয়ে এবং সেভাবেই সৌন্দর্য ও সত্যের অভিন্নতাকে প্রত্যক্ষ করেন। শিল্পী তাঁর চারপাশের সমাজ সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণ করে অভিজ্ঞতা সঞ্জাত অন্তরের নির্যাসটুকু শিল্পিতরূপে ছেনী-হাতুরী, রং-তুলি অথবা কলমের ডগা থেকে শূন্যতার সময়পটে চিহ্নিত করেন। নৃশংসতা, বর্বরতা, দমন-নিপীড়নের সাথে যেমন সত্য ও সুন্দরের ঐক্য হতে পারে না তেমনই একজন শিল্পী সমকালীন সমাজের শক্তির বিভাজনে অবশ্যই নির্যাতিতের পক্ষেই তার অবিচ্ছেদ্য অবস্থান নিশ্চিত করেন। এটাই শিল্পী সমাজের ঐক্যের মূল সূত্র। অনুপ্রাণন, শিল্প-চেতনার ঐক্যের এই মূল সূত্রের দিকেই সবাইকে ধাবিত করার প্রচেষ্টা করে যেতে চায়।
সপ্তম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা
অনুপ্রাণনের চড়াই উৎরাই-
তরুণ লেখকদের শিল্প ও সাহিত্য চর্চার একটি মঞ্চ বা জমিন নির্মাণ করার কাজের অঙ্গীকার নিয়েই শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, যাত্রার সূচনা করেছিল। আজ দশ বছর পরে এসে যদি এই প্রশ্ন নিয়ে ফিরে তাকাই যে, এই অঙ্গীকার পূরণে অনুপ্রাণন কতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছে? অথবা, যদি প্রশ্ন রাখা যায় যে নবীন ও তরুণদের শিল্প-সাহিত্যের চর্চার ক্ষেত্রে অনুপ্রাণনের মঞ্চ বা জমিনটাই বা কতটুকু প্রসারিত? প্রশ্নের জবাবে অনুপ্রাণনের সফলতা ও ব্যর্থতার একটা প্রতিবেদন হয়তো দেয়া যাবে কিন্তু সে চিত্রটিকে আমাদের সমাজের সামগ্রিক প্রেক্ষিত ও সেটার সাথে সম্পর্কিত মানবিক বোধের ধারায় শিল্প-সাহিত্যের চর্চার বাস্তব পরিধি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।
ব্যক্তিক প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে গড়ে উঠে সংগঠন এবং সুগঠিত সাংগঠনিক চেষ্টার মধ্য দিয়ে বস্তুগত শর্ত ও পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। যে শর্ত ও পরিবেশের উপর ভিত্তি করে ভৌত উন্নয়নের পাশাপাশি জনগোষ্ঠীর সৃজনশীল মন, মনন, উদ্ভাবন-মনস্কতা, নান্দনিক ও মানবিক বোধ জাগ্রত হতে পারে এবং সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি অর্জন করা যেতে পারে। তাই, এই লক্ষ্য অর্জনের পথে যৎসামান্য অবদান হিসেবে অনুপ্রাণনের উদ্যোগে পরিচালিত সৃজনশীল শিল্প-সাহিত্য চর্চার কাজে আমাদের ব্যক্তিক ও সাংগঠনিক প্রচেষ্টা কতটুকু কার্যকর ছিল সেই মূল্যায়নের ভার অনুপ্রাণনের বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের হাতে। এই বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনার দ্বার সবসময় উন্মুক্ত থেকেছে।
বিগত প্রায় দশ বছরের ইতিহাসে অনুপ্রাণনের সম্পাদনা পরিষদ নানা ভাঙ্গা গড়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, যার ফলে প্রচেষ্টার প্রত্যাশিত গমনপথ ও গতিতে পরিবর্তন হয়েছে। অর্থাৎ অনুপ্রাণনের চলার পথ মসৃণ ছিল না। চড়াই, উৎরাই, অথবা কখনো বন্ধুর পথ অতিক্রম করেই অনুপ্রাণনকে অগ্রসর হতে হয়েছে।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন এ-৪ সাইজের ১৬০টি পৃষ্ঠা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। ছাপার পূর্ববর্তী কাজ, কাগজ ও প্রেসের খরচ প্রতিটির বিনিময় মূল্য ৳ ১৫০/- দিয়ে হিসাব করলে পুরোটা খরচ উঠে আসে না। কর্পোরেট হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকার জন্য অনুপ্রাণন, বিজ্ঞাপন সংগ্রহ ও তা প্রকাশ করে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় নি। প্রথম থেকেই অনুপ্রাণনের সম্পাদকেরা কোন সম্মানী ছাড়াই একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। লেখকেরাও কোন সম্মানী ছাড়াই লেখা দিচ্ছেন। ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনুপ্রাণনের বিনিময় মূল্য বৃদ্ধি করার প্রস্তাব জোরালো যুক্তি নিয়ে সামনে চলে আসছে। কিন্তু, অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক পত্রিকার বিনিময় মূল্য বাড়ালে পাঠকের উপর যে বাড়তি চাপ পরবে এই বিষয়েও অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদ সচেতন রয়েছে।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন ১০ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা
সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন: ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়
গত নভেম্বর ২০১২ থেকে অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকাটি প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর সাহিত্য ও শিল্প বিভাগের বিবিধ সৃজনশীল ও মননশীল লেখায় সমৃদ্ধ হয়ে নিয়মিত ভাবেই প্রকাশিত হয়ে আসছিল। কিন্তু, পঞ্চম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যাটি বৃহৎ কলেবরে অর্থাৎ নিয়মিত ১৬ ফর্মার বদলে ১৯ ফর্মা আকারে প্রকাশিত হওয়ার পর পরবর্তী ৫ টি সংখ্যা প্রকাশ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সম্পাদকের অসুস্থতা ছাড়াও অলিখিতভাবে সম্পাদনা পরিষদের যে সদস্যবন্ধুটি পত্রিকার কাজে অফিস সমন্বয়কের গুরুদায়িত্ব পালন করছিলেন নিরবচ্ছিন্ন ধারায় প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাজ চালিয়ে যেতে তিনি নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতে থাকলে পত্রিকার কাজে ছেদ পড়তে থাকে। তাছাড়া সম্পাদনা পরিষদের আর একজন বন্ধু অন্য একটি অনলাইন পত্রিকার কাজে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করার ফলে তাঁর পক্ষে অনুপ্রাণন পত্রিকায় প্রয়োজনীয় সময় দেয়া আর সম্ভব হয়ে উঠছিল না। সম্পাদনা পরিষদের অন্য আর একজন সংগঠক পর্যায়ের সদস্য পত্রিকার চাইতে গ্রন্থ প্রকাশনায় বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়ায় প্রকৃতপক্ষে অনুপ্রাণন পত্রিকাটি প্রকাশের কাজে লোকবলের এক বিরাট সংকট দেখা যায়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে- ২০১২’এর নভেম্বরে অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকাটি প্রকাশ করার উদ্যোগ যারা নিয়েছিলেন তারা প্রত্যেকেই শিল্প ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে যার যার নিজ অবদান ও স্বাক্ষর রাখার উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রম ও ব্যক্তিগত অনুদানের ভিত্তিতে পত্রিকাটির প্রকাশনার কাজের যাবতীয় কাজ ও ব্যয় নির্বাহ করার অভিপ্রায় গ্রহণ করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, সমাজ সংস্কৃতিতে এবং বিশেষ করে তরুণদের মনের মাঝে মানবতা, সহমর্মীতা, সৃজনশীলতা, মননশীলতা, শিল্পরুচি, নান্দনিকতা এবং মুক্তচিন্তার চর্চার জানালাটাকে উন্মূক্ততর করার কাজে নিয়োজিত অনুপ্রাণনের এই প্রচেষ্টা যেন বাধাহীন হয় এবং কোনভাবেই যেন প্রতিষ্ঠা ও কর্পোরেট ভোগবাদীতার কূট সাংস্কৃতিক আবর্তে পড়ে দিক হারিয়ে না যায়।
যশ ও প্রতিষ্ঠার মোহ যখন শিল্পীকে পেয়ে বসে তখন শিল্পচর্চা তপস্যা অথবা সাধনা থাকে না। কিন্তু, এটাই বাস্তব যে তপস্যা ও সাধনা ছাড়া শিল্পের উৎকর্ষতার শীর্ষ স্পর্শ সম্ভব হয়ে ওঠে না। প্রতিষ্ঠা ও কর্পোরেট ভোগবাদের বলয়ে যেসব শিল্প-সাহিত্য চর্চা ও উদ্যোগ ফেনার মত আমাদের চারদিক ভরিয়ে তুলছে সেসবের স্থায়িত্ব সম্পর্কে কী কোন সন্দেহ থাকা উচিত?
বছরখানেক বন্ধ থাকার পরও যখন আমরা অনুপ্রাণনের এই সংখ্যাটি প্রকাশের উদ্যোগ নেই তখন আমরা আমাদের পত্রিকার পাঠক, লেখক ও শুভান্যুধ্যায়ীদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সারা পেয়েছি। এই সারা থেকে এই বিশ্বাস আমাদের জন্মেছে যে, আমরা যে পথ অবলম্বন করে এগিয়ে চলতে চাই সেই পথে বাস্তবেই সঙ্গ-সাথীর আমাদের কোন অভাব নেই। এখনও আমাদের দেশের তরুণ সমাজের একটি বিরাট অংশ মিথ্যা যশ, প্রতিষ্ঠা ও কর্পোরেট ভোগবাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে শিল্প-সাহিত্যের মানবিক ও নান্দনিক চর্চা অব্যহত রাখতেই অধিক আগ্রহী। তাই, লেখা আহ্বানে যে সংখ্যক মানসম্পন্ন লেখা আমরা পেয়েছি সেগুলো দিয়ে অনায়াসেই দুটো সংখ্যা প্রকাশ করা সম্ভব ছিল। চলতি সংখ্যার জন্য লেখা বাছাই করতে গিয়ে আমাদের অনেক সময় দিতে হয়েছে এবং স্থান সংকুলানের অভাবে প্রায় অর্ধেক লেখাই পরবর্তী সংখ্যার জন্য রেখে দিতে হয়েছে।
লেখা বাছাই করতে গিয়ে আবারো আমাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, সাহিত্য আলোচনা ও সমালোচনা বিভাগে আমরা যথেষ্ট সমৃদ্ধ লেখা পাচ্ছি না যেখানে পেশাদার সমালোচকের কলমের স্পর্শ আরো তীক্ষè অথচ আরো গঠনমূলক হতে পারে। বিশেষ করে কবি ও কবিতা নিয়ে আমাদের আরো তীক্ষè, তীব্র ও গঠনমূলক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কেননা সাহিত্য জগতে কবি ও কবিতার সংখ্যা যতই বাড়ছে কিন্তু আগ্রহী কবিতার পাঠকের সংখ্যা যেন সেই তূলনায় বৃদ্ধি হচ্ছে না। মনে হয়, কবি ও পাঠকের মাঝে বোধ, অনুভব ও ভাষার কোন একটা অন্তর থেকে যাচ্ছে যে অন্তরটি ঘুচে যাওয়া অত্যন্ত জরুরী কেননা বোধ করি, মূলত কবিতার মধ্যেই রয়েছে তরুণ সমাজের জন্য ভবিষ্যতের বিশেষ বার্ত্তা। অর্থাৎ সাহিত্যের সত্যপাঠ।
দেশে এখন হেমন্ত ঋতু। হাওরের অকাল বন্যা ও দেশব্যাপী অতিবৃষ্টির ফলে ফসলহানী ঘটায় এবছর দেশের সামগ্রিক সমাজ জীবনে খাদ্যের ঊর্ধ্বমূল্য সকল মানুষকেই কষ্ট দিয়েছে। হেমন্তের নতুন ফসল যেমন কৃষকের ঘড়ে ঘড়ে জীবনে ঘুরে দাড়ানোর বার্ত্তা দিয়ে যাচ্ছে- দীর্ঘ বিরতির পর অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিকের এই সংখ্যাটি এ-বছর অনুপ্রাণনের ঘুরে দাঁড়ানোরই প্রতীক ও স্বাক্ষর হোক- এটাই আশাবাদ।
ষষ্ঠ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ১০ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা
তৃতীয় বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
স্বপঞ্জয় চৌধুরী মূলত কবি হলেও কথাসাহিত্যে তার হাত বেশ পরিপক্ক। শুধু পরিপক্ক বললে ভুল হবে, আধুনিক ছোটগল্পের সকল বৈশিষ্ট্যই তার লেখায় বিদ্যমান। চিন্তাকে ভেঙেচুড়ে সে নতুন ফরম্যাট দাঁড় করতে সিদ্ধহস্ত। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পগুলোর সাথে আমি বেশ পরিচিত। তার লেখায় রয়েছে মা, মাটি, প্রকৃতি, জাতীয় চেতনা ও নিম্নবর্গীয় মানুষের আর্তি। তিনি গল্প লেখেন জীবন ও বাস্তবতার অভিধায়। কল্পনার উচ্চস্তরে তিনি খুঁজে বেড়ান মানুষের না বলা নিগূঢ় কথার ধ্বনি। ‘মৃৎচক্রের দিনগুলি’ নাম ভূমিকার গল্পটি মূলত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা। আমাদের জাতীয় চেতনা ও ঐতিহ্যকে তিনি এইগল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের ষোলটি গল্প রয়েছে যা আমার মতো আপনাদেরও তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম হবে বলে আমার বিশ^াস।
গৌতম তালুকদার
কবি ও গল্পকার
কোলকাতা, ভারত।
মৃতচক্রের দিনগুলো - Mritachakrer Dinguli
কবি সিদ্ধিলাভ করেন তখনই যখন তিনি তার নিজস্ব কাব্যভাষা খুঁজে পান। দীর্ঘদিন হতে মোহাম্মদ আন্ওয়ারুল কবীর কবিতা লিখে আসছেন এবং সময়ের সাথে সাথে তার কবিতার উত্তরণ সুষ্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। স্বকীয় কাব্যভাষায় অনন্য শৈলীতে লেখা কবীরের কবিতা সমকালীন অন্যান্য কবিদের কবিতা থেকে ভিন্নতা এনে দিয়েছে। ছোট ক্যানভাসে গভীর ভাবনায় পাঠককে নিমজ্জিত করা – কবীরের কবিতার বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য। এছাড়া বিজ্ঞানের সাথে কবিতার মেলবন্ধন আনয়নে কবীরের জুড়ি নেই। এ কাব্যের বেশকিছু কবিতা এর সাক্ষ্য দিবে।
‘জলছাপে বিম্বিত সময়’ অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত কবীরের দ্বিতীয় কাব্য। আশা করছি এ গ্রন্থটিও কাব্যরসিক পাঠকদের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে।
– প্রকাশক
জলছাপে বিম্বিত সময় - Jolochape Bimbito Samoy
মুঠোর মধ্যে আটকে রাখা যায় জল বা বালু?
মুঠোর ফাঁক গলে বের হয়ে যাবেই বালু বা জল। কেনো? নিজস্ব ব্যাকরণ বা ক্ষমতার প্রকাশ। ছোটগল্প এমনই শক্তির অপরূপ রহস্য। লুকিয়ে রাখা যায় না গল্পের রসবতী ফল, পেকে টসটসে বুকের আস্তিনে তীক্ষè ছুরির গতিতে বের হয়েই আসে কলমের ডগায়, রুদ্ধ মনের দুয়ার খুলে।
রোখসানা ইয়াসমিন মণি’র দ্বিতীয় গল্পের বই ‘অলৌকিক গৃহকোণ’। প্রথম গল্পের বই ‘ঘুঙুরবাড়ি’ বের হয়েছিল ২০২২ সালে। আঁকিয়ে শিল্পী হাতুড়ি বাটালী হাতে পাথরের বুকে খোদাই করেন বিম্বিত মনের অন্বয়, গল্পকার মণিও শব্দের কারুবাসনায়, কল্পমনের ইজেলে গল্পের ক্যানভাসে আঁকেন পীড়িত মনের আগুন সংরাগ, চলমান সময়ের বিদ্যুৎ কামনা ভৈরবী, সংসার যাতাকলের যন্ত্রনার শতকাহন, বৈরী সময়ের বিপরীতে সোনার বাটায় পান শুপারীর নি:স্ব সর্ম্পকের নির্যাস।
‘অলৌকিক গৃহকোণ’ গল্পগন্থের গল্পগুলো রক্তজবার তিল হয়ে জ্বলছে গল্পকারের অস্তিত্বের যাতাকলে যেমন, উল্টোপথে দগ্ধ পাঠকের মনের কার্নিসেও দিচ্ছে অনুগত শৌর্যবার্তা। বইয়ের নয়টি গল্প সহ¯্র দিগন্তের আলো ও অন্ধকারের এক প্রবাল দ্বীপ, যেখানে ওঠে ঝড়, ভাঙ্গে তীর, নাচে দানব, কাঁদে আয়াত দৃষ্টির অচলায়তন।
আসুন, রোখসানা ইয়াসমিন মণি’র গল্প পড়ি আর চেতনসমুদ্রের অলৌকিক জলে সাঁতার কাটতে থাকি…
Oloukik Grihokon - Rokshana Yesmin Mony
একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে টেকনোলজির মামদোবাজির এই সময়ে মানুষের সহজাত অনুভূতির ফল্গুধারা স্তিমিত না রহিত? এই প্রশ্নটির চাবুকের নিচে পড়বার সময় ও সুযোগই কারো যখন নেই, সেই তখনও কবিতা নাজিল হয় পৃথিবীর বুকে। আসলে বাক্যের প্রচল, চেনাজানা বুনটের মধ্যে দিয়ে তির্যক আলো ফেলে ফেলে ভিন্নতর, অকেজো অথচ জরুরী অভিনিবিশের আস্কারাই কবিতা । কবিতা ঠিক ততদিন জীয়মান বলে মনে হয় যতদিন ভাষা জীয়মান।
কবিতা আসলে শিশুর কান্নার মত। কবিতার যে স্পিকার বা পোয়েটিক পার্সোনা সে-ই যেন শিশুর মত আর্তি জানাচ্ছে পৃথিবীর আলোয় নিজেকে মেলে ধরতে। যেন বা শিশু তার মায়ের জন্য কাঁদছে।
খুব ছোট শিশু যেমন স্পষ্ট করে কিছু বলে না, কিন্ত মা ঠিকই বুঝতে পারে,ঠিক তেমন শিশুর মত অস্পষ্ট-স্পষ্ট কিছু বলতে চান কবি। এখানে পাঠককে আমি মা বলতে চাইছি না, মা হতে পারে অর্থবোধকতার বা অনুভবের সম্ভাবনা।
এই কবিতা আবার চৌদ্দ রকম হয়। সহস্র রকম হলেও কবিতাকে এক ভাবে না এক ভাবে হয়ে উঠতে হয়, ফুটে উঠতে হয়, ঢুকে যেতে হয় আলগোছে, অনবধানে– পাঠকের মনে!
রায়হান শরীফ - Raihan Sharif
নিজেকে বিক্রি করতে পারা কিংবা বিক্রি করার চেষ্টা করা অথবা নিজের বিরুদ্ধে নিজেকে দাঁড় করিয়ে বিশ্লেষণ করা এই সময়ের মুখচ্ছবি। সেখানে বাস্তব কিংবা কাল্পনিক চরিত্ররা একেকটি বিস্ময়! অন্ধকার ফুটপাত থেকে উঁচু মুখের থাবায় চলে যায় অন্ধ রেলগাড়ি। আর অতিরিক্ত ঘ্রাণে জড়িয়ে যায় মুদি থেকে গোরস্তান। মৃত্যুস্রোত ও গহীনের আলো আনন্দকে ডুবিয়ে দেয় চেহারার ঘনত্ব। তারপরও রক্তভ্রম, আহত কি-বোর্ড, শীতবইয়ের শর্তসমূহ ঘেউমারা পড়শি চোখের যাদুতে জেগে থাকে দীর্ঘপথ। পাশাপাশি হাঁটতে থাকা ছায়াগুলো কানে-মুখে ঢুকে যায়। আবার বেরিয়েও যায় উচ্চতায়, নিজস্বতায় অথবা নানা পরিচ্ছেদে। গল্পের বয়ানে উহ্য আছে এমন অনেক গোপন সাঁকো। পথ জুড়ে শর্তের ভেতরের চোখকে আবিষ্কার করার চেষ্টায় চারপাশে তৈরি হয়েছে খণ্ড খণ্ড দৌড়। ‘লাবণ্য দাশের সাথে দেখা হওয়ার পর’ গল্পগ্রন্থটি এমনই দশটি গল্প কিংবা দশটি পরিচ্ছেদে দাঁড়িয়ে আছে।
লাবণ্য দাশের সাথে দেখা হওয়ার পর
সুরতালির মা চমকে উঠল টর্চের আলোয়। এই টর্চ মারা তার পরিচিত। বহুদিন এটা নিয়ে পবনার সাথে কথা হয়েছে। এভাবে টর্চ মারা ঠিক নয়। তখন পবনার বয়স ছিল ত্রিশ-বত্রিশ। এখন পঞ্চাশোর্ধ। এই লোকটি আজ তার কাছে নয়, তার মেয়ের কাছে এসেছে। অদ্ভুত দুনিয়া! সুরতালির মা কুঁকড়ে ওঠে। কিন্তু কিছু বলার নেই। কেননা আজ তার গায়ে কোনো শক্তি নেই। শয্যাশায়ী। কতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে, জানা নেই। চোখ দুটোকে শক্ত করে ঢেকে ফেলে সুরতালির মা।
Pocha Kostorir Mrigonavi Ghran by S.M. Shamsul Alam
মানুষের চলার পথটা কখনোই সরল রেখায় আঁকা যায় না। জীবন একটা কিন্তু এর চলার পথে বাঁক অনেক। চলমান এই জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে একটা করে অধ্যায়ের সূচনা হয়। জীবনের এই অধ্যায়গুলো নানারকম জটিলতা এবং নাটকীয়তায় ভরপুর। প্রেম-বিরহ, হাসি-কান্না, জয়-পরাজয় প্রভৃতি অনুষঙ্গ নিয়ে জীবনের এই অধ্যায়গুলো হয়ে ওঠে বর্ণিল।
মানুষের এই অধ্যায়ে বিভক্ত জীবনের জটিলতা নিয়ে “দ্বিতীয় অধ্যায়” উপন্যাসের গল্প এগিয়ে গেছে। মফস্বলে বেড়ে ওঠা সাবিহা নামের একজন সাধারণ নারীর গল্প অঙ্কিত হয়েছে উপন্যাসের পাতায়। যে নারী তার প্রেম, মমতা, ত্যাগ দিয়ে হয়ে উঠেছেন একজন ভিন্নমাত্রার সংগ্রামী চরিত্রের মানুষ হিসেবে।
Ditiyo Odhyay - Khaled Parvez
দুর্জয় আহমেদ আরিয়ান বাংলাদেশ আর্মির একজন ইন্টেলিজেন্স অফিসার। পেন্টাগন তাকে ভাড়া করেছে, বাংলাদেশের আর এক কৃতি সন্তান আব্বাস আলী কে খুঁজে বের করার জন্য।
বলা হচ্ছে আব্বাস আলী আমেরিকার একটা ভয়ংকর টেরোরিস্ট গ্রুপের সদস্য ছিলো। সত্যি কি তাই?
বাংলাদেশের কোনো কৃতি সন্তান টেরোরিস্ট যে হতে পারে এইটা আরিয়ান এর কাছে বিশ্বাস যোগ্য নয়।
পেন্টাগনের আদেশেই আরিয়ান শুরু করেছিল নিখোঁজ আব্বাস আলীর খোঁজ ।
পাপের নগরী লাস ভেগাস থেকে শুরু করে সুদূর মেক্সিকো পর্যন্ত যেতে হলো আরিয়ান কে, হাওয়া হয়ে উবে যাওয়া আব্বাস আলীর সন্ধান করতে।
এর মধ্যে মেক্সিকোর কুখ্যাত এক স্মাগলারের একমাত্র কন্যার প্রেমে পড়লো সে ।
অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে, অনেক ট্রাজেডি তৈরি হবার পরে আরিয়ান এর সন্দেহ হতে লাগলো আসলেই কি আব্বাস আলী বলে কেউ আছে,,,,,,না সে আব্বাস আলী নামের মরীচিকার পিছনে দৌড়াচ্ছে?
পেন্টাগন কি তাকে সব সত্য বলেছে? সত্যি কি আব্বাস আলীর কোনো চিহ্ন আছে এই পৃথিবীর বুকে?
অন্যদিকে আরিয়ানের বুকের মধ্যে বাসা বেঁধেছে আদ্রিয়ানার প্রেম । আরেকদিকে শুরু হয়েছে পেন্টাগনের নতুন ষড়যন্ত্র।
আরিয়ান এখন কোনটাকে সামাল দিবে?
The Mastermind Criminal by Shapla Sadi
‘সব মেঘে বৃষ্টি হয় না’ একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস। এটি কথাসাহিত্যিক বাসার তাসাউফের একাধারে জীবনচরিত ও নব্বইয়ের দশকের সোনালি সময়ের স্মৃতিচারণ। পরিমার্জিত ও প্রাঞ্জল ভাষায় তিনি পুরনো সেই সব দিনের কথা ও সেই সব সময়ের মানুষের জীবন-যাপন এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার বর্ণনা করেছেন।
বাসার তাসাউফের জন্ম ও বেড়ে ওঠা অনন্তপুর নামের সবুজ বৃক্ষের ছায়া ছায়া মায়াময় নিভৃত এক গ্রামে। জন্মস্থান ও শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত সেই গ্রামের মানুষ, গাছপালা, পশু-পাখি, নদ-নদী তাকে লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত করেছে। বিশেষ করে তার কিষান পিতা তার জীবনজুড়ে এতটাই মিশে আছেন যে, এই উপন্যাসের সব পাতা ভরেও তিনি উপস্থিত আছেন। পিতা ছিলেন তার বেঁচে থাকার, স্বপ্ন দেখার একমাত্র উপাদান। কিন্তু আকস্মিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় পিতার মৃত্যুতে তিনি ভীষণ মুষড়ে পড়েন। তাই নিজের জবানে বলা নিজের জীবনকাহিনি লেখা শুরু করেছেন পিতার মৃত্যুর বর্ণনা দিয়ে। এরপর মানবজীবনের নানা চড়াই-উৎরাইয়ের কথা, বিশেষ করেÑ দরিদ্র কিষান পিতার পাতায় ছাওয়া লতায় ঘেরা ছোট কুটিরে জন্ম নিয়ে তিনি যে অপূর্ণতার হাহাকারে জীবন ভর দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন তা এমন ভাবে বর্ণনা করেছেন মনে হয়, যেন সেই দীর্ঘশ^াসের উষ্ণ আঁচ এসে আমাদের হৃদয়ও উত্তপ্ত করে তোলে। তার মায়ের দিনের পর দিন না খেয়ে থাকার বর্ণনা হৃদয়ের গহিনে এমনভাবে আঘাত করে যে, রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। বৃষ্টির জল আর পোকামাকড় খসে পড়া ছনের ছাউনির তলে একডজন মানুষের বসবাস আর খেয়ে না খেয়ে বেঁচে থাকার কথাগুলো এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যা পাঠকের চোখে জল এনে দেয়।
বাসার তাসাউফ বইয়ের ভূমিকা অংশে উল্লেখ করেছেন, ‘আমি একজন অসফল মানুষ। আমার আব্বা একজন দরিদ্র কিষান ছিলেন। ফলে অনেক নিগূঢ়তা ও নিষ্ঠুরতা অতিক্রম করে জীবন চলার পথে আমাকে চলতে হয়েছে, পার হতে হয়েছে অসর্পিল ও কণ্টকাকীর্ণ অনেক পথ। কিন্তু গন্তব্য আজো রয়ে গেছে অচিনপুরে। সব পথেরই নির্র্দিষ্ট একটা সীমানা থাকে। কিন্তু আমার জীবন চলার পথের যেন কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। আমি চলেছি তো চলেছি, না পেরিয়েছি সীমানা, না পেয়েছি গন্তব্য। জীবন চলার পথ অতিক্রম করে গন্তব্য পৌঁছাতে পারলে মানুষ অমরত্ব লাভ করে। অমরত্বে আমার লোভ ছিল না কোনোদিন। তাই হয়তো জীবনপথের দুর্গম সীমানা আমি আজো পার হতে পারিনি…।’
বলাবাহুল্য, একজন লেখক নিজের জীবনের গল্প নিজের জবানে বলার পর এর যে নিগূঢ় তাৎপর্য পাওয়া যায়, কাল্পনিক গল্পে তা পাওয়া যায় না। বাসার তাসাউফের এই বইয়ের গল্পে রূপকথার বয়ান নেই, আছে দরিদ্র এক কিষান পিতার ঘাম-জল সিঞ্চনের গল্প। নিতান্তই একজন ব্যর্থ মানুষের অপূর্ণতার গল্প। ব্যর্থতায় নিমজ্জিত হয়েও বাঁক বদল করে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার গল্প।
যে মেঘে বৃষ্টি য় না
‘আন্দোলন মানেই তৃষার কাছে বুকের ভেতর দাউ-দাউ করা এক উত্তেজনার নাম। নিরন্তর মিছিল, মিটিং, স্লোগানের সম্মোহন আর রক্ত গরম করা জ্বালাময়ী বক্তৃতার ক্রমাগত অগ্ন্যুৎপাত। বন্ধুরা, ভাইয়েরা, বিপ্লবী জনতা, সংগ্রামী সাথিরা- কত রকম সম্বোধন। সব মিলিয়ে উন্মাতাল এক পরিবেশ। গাছ-পাহাড়-বাড়িঘর ভাসানো এক পাহাড়ি ঢল যেন-বা। সমতলকে শত্রু ভেবে তছনছ করে ধেয়ে আসা এক ধোঁয়ার কুণ্ডলী। কোনোকিছু আয়ত্তে নেই, থাকে না কোনোদিন।’
‘সকালে ধ্বনির ঘুম ভাঙার পর পবিত্র মন নিয়ে ড্রয়িংরুমে যখন পা পড়বে তখন ওর চোখে পড়বে, একটা লাশ এলোপাতাড়ি শুয়ে রয়েছে ডিভানে। লোকটার পরনের লুঙি দিয়ে মুখ ঢাকা, নিম্নাঙ্গ প্রায় উন্মুক্ত। ভাবতেই শরীর রি-রি করে ওঠে ধ্বনির। এ লোকটাকেই একদিন ভালোবেসে তোলপাড় করেছিল ক্যাম্পাস জুড়ে? অথচ এখন শুধুই ছি!’
Nitantoi Sadharon Meyer Golpo - Monish Roy
হাওরকেন্দ্রিক উপন্যাস বেশি নেই বাংলাদেশের সাহিত্যভুবনে। বিপুল পাঠকের কাছে এই জীবন অচেনা। শূন্যতাটুকু পূরণে এগিয়ে এসেছেন জল-মাটির কথক স্বাতী চৌধুরী। পাঠককে শামিল করলেন ‘স্বপ্নযাত্রা’য়। যাত্রাপথে উঠে এসেছে হাওরাঞ্চলের হাভাতে মানুষের মুখচিত্র। কালীপুর গ্রাম হয়ে খইলসার হাওরে কেন্দ্রীভূত হয় নানাবিধ ঘটনা ও দুর্ঘটনা। জলবেষ্টিত অঞ্চলের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ মূর্ত হয়ে উঠেছে জাদুকরী কলমে। সংস্কৃতিচর্চা- গান-বাজনায় মেতে-থাকাসহ নানা লোকজ উপাচার এতদাঞ্চলের দুঃখ-শোক ভুলে থাকার মূলমন্ত্র। এর মধ্যেও আসে প্রেম, হৃদয়-গহনের উঁকিঝুঁকি। সতত সমস্যাক্রান্তদের দুয়ারেও প্রেম আসে! মোহন সুর তোলে পাতার বাঁশিতে।
নিজস্ব জমি অপর্যাপ্ত যাদের, তারাই কামলা খাটে অন্যের জমিতে। পাওনা মেটাতে অনীহ জোতদার একসময় ঠিকই দেখিয়ে দেয় ক্রুর চেহারা। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জোতদারের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় শ্রমিকরা। অসন্তোষের ভেতরেই সৃষ্টি হয় নেতা। যে নেতা স্বপ্ন দেখে এলাকাবাসীকে নিয়ে একত্রে স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচার। মেঘ-বৃষ্টি পেরিয়ে, আশা-হতাশাকে উজিয়ে হাওরবাসী মাথা তুলে জাগবে। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্তি পেতে ভাগ্যান্বেষণে নামে তারা। খোঁজে নতুন পথ। বিকল্প পথ সন্ধানের নামই ‘স্বপ্নযাত্রা’। সংসারযাত্রা চলতেই থাকে, প্রজন্ম পেরিয়ে আসে আরেক প্রজন্ম। দ্বিতীয় ধাপেও সময়ের প্রয়োজনে আবির্ভাব ঘটে স্বপ্নবাজ নেতার। যথারীতি টিকে থাকে জোতদার-শ্রেণি।
স্বাতীর কাহিনী-বিস্তার কি বাস্তবতা উৎসারিত? নাকি নিছক কল্পনারাজ্যে বসবাস। নিজ চিন্তা-চেতনা বপন করেন পঙ্ক্তিসাম্রাজ্যে! সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখক সাম্যবাদী ঘোরে আচ্ছন্ন। সুদিনের স্বপ্ন-আশার পিদিমটুকু জ্বালিয়ে রাখেন। লেখকের মানসচেতনায় জাগরুক ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী; ন্যায্য সমাজব্যবস্থা।
শেষপর্যন্ত কী হয়! স্রোতে-ভাসা ভগ্ন সময়কে কাব্যিক ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন কুশলী লেখক স্বাতী চৌধুরী। অতুল স্বপ্নযাত্রা নিয়ে এল আনকোরা রসদ; পাঠকের জন্য যেন নবান্নের আনন্দ উদযাপন!
শফিক হাসান
কথাসাহিত্যিক
Shopno Jatra - Swati Chowdhury
‘দুঃখতন্ত্র : লেখকের উত্তরাধিকার’ গবেষণামূলক প্রবন্ধের সংকলন। এতে রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার গতি-প্রকৃতি, নির্মাণ ও নির্মিতির গভীর মনস্বী-বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হয়েছে। নজরুল থেকে শুরু করে শক্তি, মৃদুল, শৈলেশ্বরসহ আশি ও নব্বই দশকের কবিরা এসব প্রবন্ধে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন। কবিতায় সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতির তালাশ বইটিকে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত করেছে। এ বই আধুনিক বাংলা কবিতা-বিষয়ক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। বইটি মননশীল পাঠক ও গবেষকদের বিশেষ উপকারে আসবে বলে দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায়।
Dukkhotontro Lekhoker Uttoridhikar by Sumon Shams
কবিতা নিয়ে আসলেই কি ভাবা যায় ! কী ভাবা যায় ! ধরুন, আপনি একটি গাছের নীচে বসে আছেন। সামনেই একটি বড় পথ। সেই পথ দিয়ে মানুষজন যাতায়ত করছে। আপনি বসে বসে দেখছেন। এই যে মানুষেরা গেল আসলো, তারা একেকটা পরিচ্ছেদ। একেকটা গোপন কুটুরি! এই কুটুরি আপনি খুলতে পারছেন না। আপনি তাদের চেনেন না। জানেন না। তাদের গন্তব্য কোথায়- তাও অজানা আপনার!
কবিতা সেরকমই। আপনার সামনে দিয়েই বয়ে যায়। আপনি দেখেন। ছুঁতে পারেন না। এক রহস্যঘোর আপনাকে পরিভ্রমণ করে।
কবিতার কোনো ব্যাখ্যা দেয়া যায় না। ব্যাখ্যা চাওয়াও যায় না। একটা করাত আমাকে কাটছে। আমি দ্বিখণ্ডিত- বহুখণ্ডিত হচ্ছি। এই বহুখণ্ডের ভেতরে সে আলোর ফোয়ারা আমাকে কাছে ডাকে, এগিয়ে নেয়— সেটাই পংক্তিঘোর। কবিতায় ঘোর না থাকলে তা ফ্যাকাশে লাগে। অনেকটা ঘ্রাণহীন পাপড়ির মতো।
আমার ‘নির্বাচিত প্রেমের কবিতা’ প্রকাশ করছে বাংলাদেশের খ্যাতিমান প্রকাশনী সংস্থা ‘অনুপ্রাণন প্রকাশন’। এর সত্ত্বাধিকারী শ্রদ্ধেয় আবু এম ইউসুফ ও তাঁর টিমকে বিনীত ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
সুপ্রিয় পাঠক-পাঠিকা, সবাইকে প্রীতি।
ফকির ইলিয়াস
০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
নিউইয়র্ক
Nirbachito Premer Kabita by Faqir Eliyas
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.
































There are no reviews yet.