Additional information
| Weight | 0.437 kg |
|---|---|
| Published Year |
$ 2.94
সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা- সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা (চতুর্থ পর্ব)
সর্বশেষ প্রকাশিত চতুর্থ পর্বে অবশিষ্ট ২৫ জন কবিকে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে মোট ৪টি পর্বে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিকের ১০০ কবির (যাদের জন্ম-সময়সীমা : ১৯৬৬-১৯৮৫) জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার, উল্লেখযোগ্য কবিতা ও কবি রচিত কবিতাসমূহের উপর সামগ্রিক আলোচনা সংকলিত করার আয়োজন সম্পন্ন হলো। সাম্প্রতিকের ১০০ কবিকে নিয়ে লেখা এসব প্রবন্ধ পাঠ করলে বাংলাদেশের সাহিত্যের বিশেষ করে কবিতার পাঠকরা আধুনিক, উত্তরাধুনিক ও নতুন ধারা- এই তিন ধারার কবি ও কবিতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। পাঠকরা অনুধাবন করবেন, বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের কবিদের কবিতা এবং সাম্প্রতিকের অর্থাৎ গত তিন দশকের কবিদের কবিতার মধ্যে সুস্পষ্ট একটি বাঁক বদল ঘটেছে। অত্যন্ত মেধাসম্পন্ন এই কবিদের অনেকেই তাদের শক্তিশালী উদ্ভাবনী শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছেন এবং তাদের এসব সাফল্য যথাযথ স্বীকৃতি লাভ করেছে। কবিতার পরিধি, গঠনশৈলী ও আবৃত্তির কারণে দশকের পর দশকে বিকশিত কবিতা অভিনব ধারায় পৌঁছেছে এবং শাখা উপশাখা ধরে বিচিত্র বিস্তার ঘটছে। ষাট, সত্তর ও আশি’র দশক বা এর পরবর্তী কবিরা কবিতায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন এবং ক্রমান্বয়ে কবিতায় এনেছেন নতুনত্ব। যেখানে কবির সৃষ্টিশীল রচনা সময়ের দাবিতে মানবিক চেতনা গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রেও অভিনব সাড়া জাগিয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিকের কবিদের অধিকাংশ কবিতায় আমরা দেখতে পাই সাবলীল ভাষা ব্যবহার করে সুচারুভাবে রচিত নান্দনিক চিত্রকল্প। পার্থিব অথবা অপার্থিব রূপক মিশ্রিত রিয়েলিজম, ম্যাজিক-রিয়েলিজম, সুররিয়েলিজম। আমরা দেখি, শহর কিংবা গ্রামীণ প্রান্তরের পটভূমিতে পাঠকের চেতনাকে জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত কিংবা বিচ্ছিন্ন করে দেখার একটি অভিনব প্রবণতা। সাম্প্রতিকের অধিকাংশ কবিতা গদ্য ছন্দে লেখা হলেও অনেকেই অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা ছাড়াও অন্ত্যমিলের কবিতা, পদ্য ও ছড়া লিখেছেন। অন্ত্যমিলের কবিতা, পদ্য ও ছড়ায় সামাজিক বিষয়বস্তু প্রাধান্য পেয়েছে যেখানে বেশ কিছু কবিতায় রম্য ঢঙের ব্যবহার পাঠকদের আকৃষ্ট করেছে।
একটি বিষয় লক্ষণীয়, রোমান্টিকতা পেরিয়ে বস্তুবাদের প্রভাব সত্ত্বেও বাংলাদেশের কবিতার ভুবন থেকে রোমান্টিকতার পরিপূর্ণ নির্বাসন কখনো ঘটেনি। যে বিষয়টি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য, মূলধারার সঙ্ঘবদ্ধ কবি ও কবিতার গোষ্ঠীবদ্ধতা থেকে বের হয়ে বাংলাদেশের কবিতা এখন প্রধানত ব্যক্তিবৃত্তে আবদ্ধ হচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কতিপয় বিচ্ছিন্ন কাব্যব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটেছে। তত্ত্ব এখন আর প্রভাবশালী কাব্য-প্রকল্প নয়। বর্তমান বাংলাদেশের কবিতাভুবনের বাস্তবতায় রাজনৈতিক মতাদর্শ কিছু সংখ্যক ব্যতিক্রম বাদে প্রভাব-বিস্তারকারী শক্তি নয়। একই কথা খাটে শিল্পসর্বস্বতার ক্ষেত্রে। এখানেও হয়তো দু-চারজন ব্যতিক্রমীকে দেখা যাবে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কবিতা বিচ্ছিন্ন যেসব ছোট ছোট ব্যক্তিক বৃত্তে বাঁধা সেখানে সৃজনশীলতার বিচারে সবাই নিজ নিজ ধারায় সর্বাধুনিক যেন তার কোনো পূর্বসূরি নেই।
বাংলার আধুনিক কবিতা সাহিত্যে সূচনা থেকেই পাশ্চাত্য, আফ্রিকা এমনকি ল্যাটিন আমেরিকার শক্তিশালী কবিদের কবিতার প্রভাব লক্ষ করা গেছে। সাম্প্রতিককালে বিদেশি প্রভাব মুক্ততার প্রবণতা গ্রহণ করে যে নতুন ধারার কবিতা লেখার প্রচেষ্টার প্রচলন ঘটেছে সেখানে প্রধানত গ্রামীণ সমাজ, পরিবেশ-প্রকৃতি, পারিবারিক গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের পাশাপাশি সমাজ ও রাজনীতির বিভিন্ন সংকটের প্রতিফলন দেখা যায়। এসব কবিতায় প্রমিত বাংলা শব্দের পাশাপাশি কিছু সংখ্যায় আঞ্চলিক বাংলা শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। আঞ্চলিক উচ্চারণের সঙ্গে মিল রেখে সেভাবে শব্দের বানান নিরূপণ করা হচ্ছে। বাংলা ভাষার বানান নির্ধারণ করার চার তত্ত্ব ও অন্যান্য প্রচলিত সূত্রের যৌক্তিকতা সম্পর্কে নতুন ধারার কবিরা প্রশ্ন তুলেছেন। একটি ভাষায় একই অর্থযুক্ত শব্দের বিভিন্ন বানান থাকতে পারে কিনা এটা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে। আলোচনা হওয়াও প্রয়োজন। কেননা বি-উপনিবেশবাদের যে দর্শনের উপর ভিত্তি করে নতুন ধারার কবিতা রচনা করার অনুপ্রেরণা গ্রহণ করা হয়েছে সেখানে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ প্রবেশের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর সেটা যদি ঘটে তাহলে কবিতার বিশ্বজনীন আবেদন হারিয়ে বাংলা কবিতা বাংলা সাহিত্যের সর্বোৎকৃষ্ট স্থান হারিয়ে ফেলতে পারে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের কবিতা সাহিত্যের যে মজবুত ভিত্তি আজ গড়ে উঠেছে তার উপরে দাঁড়িয়ে বাংলা কবিতাকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাহিত্যামোদীর কাছে পৌঁছানোর জন্য একদিকে যেমন অনুবাদ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন অন্যদিকে খেয়াল রাখা দরকার কবিতাও সৃজনশীল বিষয়, বোধ ও অভিব্যক্তিতে যেন সর্বজনীন রূপ গ্রহণ করার মাধ্যমে বিশ্বজনীন হতে পারে।
নভেম্বর ২০১২ সূচনা সংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর যাত্রা শুরু হয়। যাদের হাত ধরে ম্যাগাজিনটির জন্ম তাদের অনেকেই আমাদের মাঝে আজ নেই। ২৮ আগস্ট ২০১৯ সালে আমরা হারিয়েছি সম্পাদনা পরিষদের অন্যতম সদস্য কবি কুহক মাহমুদকে; যিনি সূচনা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে সার্বক্ষণিক পত্রিকাটির জন্য কাজ করেছেন। সম্প্রতি, গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ আমাদের ছেড়ে গেছেন শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদের আরেকজন সদস্য কবি ও গল্পকার সুলতানা শাহ্রিয়া পিউকে। আগস্ট ২০১৩ সাল থেকে তিনি অনুপ্রাণন-এর সঙ্গে যুক্ত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি অনুপ্রাণন-এর সঙ্গে থেকেছেন একজন গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে। কবি ও গল্পকার সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের এই অকাল চলে যাওয়া অনুপ্রাণন-এর সকল কর্মী, লেখক ও শুভানুধ্যায়ীকে গভীরভাবে শোকবিদ্ধ করেছে। শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর এই সংখ্যা আমরা আমাদের সহকর্মী সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের স্মৃতিতে উৎসর্গ করছি। পাশাপাশি ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর আগামী সংখ্যা সুলতানা শাহরিয়া পিউ স্মৃতি সংখ্যা হিসেবে প্রকাশ করার ঘোষণা প্রদান করছি।
| Weight | 0.437 kg |
|---|---|
| Published Year |
অনুপ্রাণনের চড়াই উৎরাই-
তরুণ লেখকদের শিল্প ও সাহিত্য চর্চার একটি মঞ্চ বা জমিন নির্মাণ করার কাজের অঙ্গীকার নিয়েই শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, যাত্রার সূচনা করেছিল। আজ দশ বছর পরে এসে যদি এই প্রশ্ন নিয়ে ফিরে তাকাই যে, এই অঙ্গীকার পূরণে অনুপ্রাণন কতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছে? অথবা, যদি প্রশ্ন রাখা যায় যে নবীন ও তরুণদের শিল্প-সাহিত্যের চর্চার ক্ষেত্রে অনুপ্রাণনের মঞ্চ বা জমিনটাই বা কতটুকু প্রসারিত? প্রশ্নের জবাবে অনুপ্রাণনের সফলতা ও ব্যর্থতার একটা প্রতিবেদন হয়তো দেয়া যাবে কিন্তু সে চিত্রটিকে আমাদের সমাজের সামগ্রিক প্রেক্ষিত ও সেটার সাথে সম্পর্কিত মানবিক বোধের ধারায় শিল্প-সাহিত্যের চর্চার বাস্তব পরিধি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।
ব্যক্তিক প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে গড়ে উঠে সংগঠন এবং সুগঠিত সাংগঠনিক চেষ্টার মধ্য দিয়ে বস্তুগত শর্ত ও পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। যে শর্ত ও পরিবেশের উপর ভিত্তি করে ভৌত উন্নয়নের পাশাপাশি জনগোষ্ঠীর সৃজনশীল মন, মনন, উদ্ভাবন-মনস্কতা, নান্দনিক ও মানবিক বোধ জাগ্রত হতে পারে এবং সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি অর্জন করা যেতে পারে। তাই, এই লক্ষ্য অর্জনের পথে যৎসামান্য অবদান হিসেবে অনুপ্রাণনের উদ্যোগে পরিচালিত সৃজনশীল শিল্প-সাহিত্য চর্চার কাজে আমাদের ব্যক্তিক ও সাংগঠনিক প্রচেষ্টা কতটুকু কার্যকর ছিল সেই মূল্যায়নের ভার অনুপ্রাণনের বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের হাতে। এই বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনার দ্বার সবসময় উন্মুক্ত থেকেছে।
বিগত প্রায় দশ বছরের ইতিহাসে অনুপ্রাণনের সম্পাদনা পরিষদ নানা ভাঙ্গা গড়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, যার ফলে প্রচেষ্টার প্রত্যাশিত গমনপথ ও গতিতে পরিবর্তন হয়েছে। অর্থাৎ অনুপ্রাণনের চলার পথ মসৃণ ছিল না। চড়াই, উৎরাই, অথবা কখনো বন্ধুর পথ অতিক্রম করেই অনুপ্রাণনকে অগ্রসর হতে হয়েছে।
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন এ-৪ সাইজের ১৬০টি পৃষ্ঠা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। ছাপার পূর্ববর্তী কাজ, কাগজ ও প্রেসের খরচ প্রতিটির বিনিময় মূল্য ৳ ১৫০/- দিয়ে হিসাব করলে পুরোটা খরচ উঠে আসে না। কর্পোরেট হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকার জন্য অনুপ্রাণন, বিজ্ঞাপন সংগ্রহ ও তা প্রকাশ করে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় নি। প্রথম থেকেই অনুপ্রাণনের সম্পাদকেরা কোন সম্মানী ছাড়াই একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। লেখকেরাও কোন সম্মানী ছাড়াই লেখা দিচ্ছেন। ফলে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে অনুপ্রাণনের বিনিময় মূল্য বৃদ্ধি করার প্রস্তাব জোরালো যুক্তি নিয়ে সামনে চলে আসছে। কিন্তু, অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক পত্রিকার বিনিময় মূল্য বাড়ালে পাঠকের উপর যে বাড়তি চাপ পরবে এই বিষয়েও অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদ সচেতন রয়েছে।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন ১০ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা
ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ১০ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা
সম্পাদকীয়, কুহক মাহমুদ স্মৃতি সংখ্যা। অনুপ্রাণন- অষ্টম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা-
অনুপ্রাণন ও কুহকের কথা
কুহকের কথা বলতে গেলে অনুপ্রাণনের কথা আসবেই। কেননা, কুহক অর্থাৎ কুহক মাহমুদ, শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর সাথে ২০১২ সালে জন্মলগ্ন থেকেই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন ৫টি বছর। কুহকের সাথে আমার পরিচয় সরসিজ আলীমের মাধ্যমে। কবি সরসিজ আলীম তখন ‘ভনে যাহা ভনে’ শিরোনামে একটা ট্যাবলয়েড সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করতেন। ফেসবুকের মাধ্যমেই কবি সরসিজ আলীমের সাথে আমার পরিচয়।
এই পরিচয়ের কিছুদিন পূর্বে হোসনে আরা বেগম নামে একজন মধ্যবয়সী মহিলা ফেসবুকে আমাকে নক করেন। তিনি তখন ফেসবুকে ‘ফেসবুক বইমেলা ২০১২’ নামে একটা গ্রুপের এডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে বই প্রকাশ এবং সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। এক বিকেলে আমরা ছবির হাটে মিলিত হই, যেখানে উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন তরুণ কবি-সাহিত্যিক। তারা হলেনÑ রেজওয়ান তানিম, স্থপতি রাজীব চৌধুরী, কবি সুমি সিকানদার, ফেসবুকের মানবিক গ্রুপের অঞ্জন, ইহতিশাম আহমাদ টিংকু এবং আরো দুই-একজন হবে যাদের নাম এই মুহূর্তে আমার ঠিক মনে পড়ছে না। পরে এই বৈঠকগুলো পাবলিক লাইব্রেরির ক্যান্টিনের সামনের বাঁধানো উঠোনে অথবা কখনো কখনো হোসনে আরা বেগমের শ্যামলীর বাসায়ও অনুষ্ঠিত হতো। এই আলোচনা বৈঠকগুলোর মধ্য দিয়েই প্রথমে আমরা পাবলিক লাইব্রেরির সেমিনার-কক্ষে একটি ‘নবীন লেখক সমাবেশ অনুষ্ঠান’ করার সিদ্ধান্তে উপনীত হই। এই পর্যায়ে কবি সরসিজ আলীমও এই উদ্যোগের সাথে যুক্ত হয়। সমাবেশ অনুষ্ঠানের পর প্রথম বৈঠকে যখন একটি ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত হয় এবং যখন পত্রিকার জন্য একটি নাম ও একটি সম্পাদনা পরিষদ গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়, তখন কবি সুমি সিকানদার পত্রিকাটির নাম ‘অনুপ্রাণন’ করার প্রস্তাব আনেন, যে প্রস্তাবটি সংখ্যাগরিষ্ঠ উদ্যোক্তাদের সমর্থন লাভ করায় গৃহীত হয়। ওই বৈঠকগুলোতে পত্রিকার সম্পাদনা পরিষদ গঠন নিয়ে আলোচনা হলে সর্বসম্মতিতে আমার নাম প্রকাশক, হোসনে আরা বেগম সম্পাদক, কবি সরসিজ আলীম নির্বাহী সম্পাদক এবং সহ-সম্পাদক হিসেবে রেজওয়ান তানিম, রাজীব চৌধুরী, সুমি সিকান্দার, ইহতিশাম আহমাদ টিংকুসহ আরো দুই-একজনের নাম প্রস্তাব হয়। এই প্রস্তাব গৃহীত হলে ঠিক করা হয় যে, সম্পাদক ও সম্পাদনা পরিষদের সদস্যরা পত্রিকার কাজে অভিজ্ঞ আরো দুই-একজন ব্যক্তি যুক্ত করে সম্পাদনা পরিষদ সম্প্রসারিত করতে পারবেন।
এর কিছুদিন পর যখন হোসনে আরা বেগমের বাসায় সম্পাদনা পরিষদের প্রথম সভা হয়, তখন সেই সভায় কবি কুহক মাহমুদ ‘অগ্রদূত’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার মনি মোহাম্মদ এবং তাহমিদের নাম যুক্ত হয়। ওই সভায় কবি কুহক মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। ওই সভাতেই কবি কুহক মাহমুদের সাথে আমার পরিচয়। সেই সভায় লেখা সংগ্রহসহ পত্রিকা বের করার যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তসমূহ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই সূচনা সংখ্যার লেখা বাছাই এবং অনুপ্রাণনে অন্যান্য বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপের সদস্যদের যুক্ত করা নিয়ে কবি সরসিজ আলীম এবং হোসনে আরা বেগমের মধ্যে তুমুল বিতর্ক হয় এবং সেই বিতর্ক এমন তিক্ততার পর্যায়ে উপনীত হয় যে, সূচনা সংখ্যাটির কাজ যখন প্রেসে চলছিল, ঠিক তখন হোসনে আরা বেগম পত্রিকার সম্পাদক পদ থেকে এবং রাজীব চৌধুরী, সুমি সিকানদারসহ আরো দুই-একজন অনুপ্রাণন ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পরিস্থিতিতে পত্রিকাটিতে আমার নাম প্রকাশক ও সম্পাদক, সরসিজ আলীমের নাম নির্বাহী সম্পাদক এবং সহ-সম্পাদক হিসেবে শুধুমাত্র রেজওয়ান তানিম, কুহক মাহমুদ, মনি মোহাম্মদ ও তামজিদের নাম যুক্ত করে শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন পত্রিকার সূচনা সংখ্যা নভেম্বর ২০১২-এ প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে কুহক মাহমুদ অনুপ্রাণন পত্রিকাটির সাথে পাঁচ বছর যুক্ত ছিলেন। এই পাঁচটি বছরে কুহকের সাথে অনুপ্রাণনের মিথস্ক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ এই সম্পাদকীয়’র পরিসরে দেয়া সম্ভব না।
শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন একটি অবাণিজ্যিক পত্রিকা। এই অবাণিজ্যিক কথাটির অর্থ বারবার ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন দেখা যায়। যেহেতু মনে করা হয়, পত্রিকাটি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি সচেতন থেকে স্বাধীন ও মুক্ত মতামতের চর্চা ও প্রকাশ করবে, অর্থাৎ পত্রিকাটি আর্থিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দল অথবা কোনো সামাজিক সংগঠন অথবা দেশের সরকার অথবা করপোরেট মহলের পৃষ্ঠপোষকতার প্রত্যাশা করবে না। অতএব পত্রিকার পাঠকের কাছে সামান্য যে বিনিময়-মূল্য পত্রিকাটি গ্রহণ করবে, তা দিয়েই পত্রিকাটির যাবতীয় প্রকাশনা খরচ চালানো হবে।
যে কারণে অনুপ্রাণনের সাথে যুক্ত সবাইকে মোটামুটি স্বেচ্ছাশ্রম অথবা সামান্য কিছু সম্মানীর টাকায় চলতে হতো। ২৮ আগস্ট ২০১৯ তারিখে তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে অর্থাৎ ৬ আগট ফেসবুকে তাঁর সর্বশেষ পোস্টে অনুপ্রাণনের প্রাথমিক পর্যায়ের অর্থসংকটকালে কবি কুহকের সেই কৃচ্ছ্রসাধন ও কষ্টের কথাই বর্ণনা করেছিলেনÑ
“বাজেট ১০০ টাকা। বাসা থেকে বাসে গুলিস্তান ১০ টাকা। সেখান থেকে বাসে কাঁটাবন। শাহবাগ আসলেই জ্যাম। কোনোদিন হেঁটে বা প্রচণ্ড খিদায় নেমে পড়তাম বাস থেকে। হোটেলে প্রবেশ করে করুণ চোখে দু’টি পরোটা আর ডাল দিয়ে নাশতা করে হাঁটতাম। তারপর অফিস। কাজ। দুইটা না বাজতেই খিদা! সস্তাদরের হোটেলে ২৫ টাকার ভাত-ডিম বা মাছ, ডাল নেই। চলে যেত খাবার। কতদিন ১০ টাকা বেশি দিয়ে সবজি বা অন্য তরকারি নিতে পারিনি! আবার অফিস। কাজ। এই করেই সন্ধ্যা।
পুরি-চা ১০ টাকা। আবার কাজ। ৬০ টাকা শেষ। অফিস শেষ করে হাঁটতাম। ভার্সিটির মাঝ দিয়ে গুলিস্তান। বাসের লাইনের অপেক্ষা। কোনোদিন ৫ টাকার বাদাম। তারপর বাসা। ফিরতে ফিরতে রাত ১০টা। মেয়ে অপেক্ষা করত খাবার নিয়ে। ছেলে-মা অন্য বাড়ি থাকত। মেন্যু বেশিরভাগ ডিম ভাজা, ডাল। পেট পুরে খেতাম। আহ! কি সব দিন গিয়েছে। আনন্দ বেদনার। স্মৃতি কাঁদায়। (৬ আগস্ট, ২০১৯)”
সে সময়ে পত্রিকার কাজ করার পাশাপাশি কবি কুহক মাহমুদ অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে “গোধূলির প্রস্থানে জ্বালাও পূর্ণিমা (ফেব্রুয়ারি ২০১৪)” এবং “না-মানুষ (নভেম্বর ২০১৪)” শিরোনামে দু’টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই বই দুইটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এই সংখ্যার স্মৃতিচারণ বিভাগে প্রকাশিত হয়েছে। বলতে গেলে কবি কুহক মাহমুদ অনুপ্রাণনের সাথে যুক্ত হওয়ার পূর্ব থেকেই যকৃতের সংক্রমণজনিত রোগে আক্রান্ত ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও রোগের চিকিৎসা করা দূরে থাক, শরীরের প্রতি যতœ নেয়া দূরে থাক, তাঁর চলমান জীবন যাপন পদ্ধতি তাঁর শরীরের ক্ষতিই বৃদ্ধি করেছে। এসব ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার জন্য বারবার বলা সত্ত্বেও কবি কুহক মাহমুদ কারো কথারই কর্ণপাত করেনি। যার ফলে যথাযথ চিকিৎসা ও সেবার অভাবে তাঁর শরীরের অবস্থা দিনে দিনে অবনতি হতে থাকে। অসুস্থতার জন্য গত প্রায় দু’বছর কুহক আর সময় দিতে পারেনি অনুপ্রাণনকে। বলেছিলাম, না-মানুষের ২য় খ- লিখে দেন প্রকাশ করি। বলল, পারবো না। এই শরীরে কুলায় না।
কুহক মাহমুদের অকাল মৃত্যুতে আমরা শোকগ্রস্ত। অনুপ্রাণন-এর সাথে যুক্ত সকলের পক্ষ থেকে কুহকের বিদেহি আত্মার শান্তি কামনা করি। তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে “কুহক মাহমুদ স্মৃতি সংখ্যা” হিসেবে নিবেদন করি শিল্প ও সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণনের ৮ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যাটি।
অষ্টম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
সম্পাদকীয়-
মহান একুশে- আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও এক দুঃখিনী বর্ণমালার ইতিহাস
বাংলা ভাষা ও বাংলা বর্ণমালার উদ্ভব ও বিবর্তনের একটি স্বতন্ত্র ও মৌলিক ইতিহাস রয়েছে। আমরা জানি যে, প্রাচীন কাল থেকে পাঁচটি স্তর পার হয়ে আধুনিক বর্ণমালা এসেছে। প্রাচীনকালে কোনো বর্ণমালা ছিলো না। গাছপালা-মানুষ-প্রাণী’র ছবি এঁকে মনের ভাব প্রকাশ করা হতো। এটা হচ্ছে বর্ণমালার প্রথম স্তর- “গ্রন্থিলিপি”। আনুমানিক দশ-বারো হাজার বছর আগে মানুষ গ্রন্থিলিপি দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করতো। এরপর এলো “ভাবলিপি”- সম্পূর্ণ ছবি না এঁকে সংকেত বা চিহ্ন বা প্রতীকের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম। ভাবলিপি ছিলো অনেকটা এমন- দিন বোঝাতে পূর্ণ বৃত্ত, অর্থাৎ সূর্য আঁকা হতো, আর রাত বোঝাতে অর্ধ বৃত্তের সাথে তারকা আঁকা হতো। এরপর এলো তৃতীয় স্তর- “শব্দলিপি”, এই স্তরে ব্যাপক হারে ছবির বদলে চিহ্নের ব্যবহার হতে লাগলো। শব্দলিপি আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে এলো চতুর্থ স্তর- “অক্ষরলিপি”। অক্ষরলিপি আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে পঞ্চম স্তর হিসেবে এলো “ধ্বনিলিপি”। এই ধ্বনিলিপি থেকেই আধুনিক বর্ণমালার উৎপত্তি। সেই সময় বিভিন্ন বর্ণে বা রঙে বিভিন্ন অক্ষর লিখা হতো, সেখান থেকেই অক্ষরের নাম হয়েছে বর্ণ, বর্ণমালা।
আমাদের বাঙলা বর্ণমালা এসেছে প্রাচীন ভারতীয় “ব্রাহ্মীলিপি” থেকে। পৌরাণিক উপ-কথামতে হিন্দু দেবতা ব্রহ্মা ভারতবর্ষের প্রাচীন লিপি আবিষ্কার করেছিলেন এবং ধ্বনির সাথে মানুষকে এই লিপি দান করেছিলেন, তার নামানুসারে ঐ লিপির নাম হয় ব্রাহ্মীলিপি। কেউ কেউ বলেন, বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণরা ছিলেন শ্রেষ্ঠ পুরোহিত। ব্রাহ্মণদের দ্বারা এই লিপি আবিষ্কৃত হয়েছিল বলেই এর নাম ব্রাহ্মীলিপি। যে যাই বলুক, ভারতবাসী নিজেরাই সৃষ্টি করেছিলেন ব্রাহ্মীলিপি। ব্রাহ্মীলিপির পেছনে ফিনিশীয় লিপির প্রভাব আছে বলে দাবী করা হয়। তবে প্রাচীন ভারতীয়রা সম্ভবত স্বাধীনভাবেই নিজেদের লিপি উদ্ভাবন করেছিল- কারণ ফিনিশীয় লিপির চেয়ে ব্রাহ্মীলিপির পার্থক্য অনেক। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতক থেকে ৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে ব্রাহ্মীলিপি প্রচলিত ছিল। এরপর “অশোক লিপি” বা “মৌর্য লিপি”তে এর বিবর্তন শুরু হয়। এর পরের ধাপে আসে “কুষাণ লিপি”, এগুলি কুষাণ রাজাদের আমলে প্রচলিত ছিল। এরপর ব্রাহ্মীলিপিটি উত্তরী ও দক্ষিণী- এই দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়। উত্তরী লিপিগুলির মধ্যে পূর্বদেশীয় গুপ্তলিপি প্রধান, এটি ৪র্থ ও ৫ম শতাব্দীতে প্রচলিত ছিল। গুপ্তলিপি থেকে আবির্ভাব হয় “কুটিল লিপির”, এটি ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শতক পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। কুটিল লিপি থেকে উদ্ভব হয় নাগরী লিপির। প্রাচীন নাগরী লিপির পূর্ব শাখা থেকে ১০ম শতকের শেষভাগে এসে উৎপত্তি হয়েছে বাঙলা লিপির। অর্থাৎ ব্রাহ্মীলিপি > অশোক লিপি বা মৌর্য লিপি > কুষাণ লিপি > উত্তরী গুপ্তলিপি (পূর্বদেশীয়) > কুটিল লিপি > নাগরী লিপি > বাঙলা লিপি।
ব্রাহ্মীলিপি থেকে সৃষ্ট বাঙলা বর্ণমালা দেখতে কিন্তু এখনকার বর্ণমালার মতো ছিলো না, সময়ের পরিবর্তনে বর্ণ’র চেহারারও পরিবর্তন হয়েছে। তখন যেহেতু ছাপাখানা ছিলো না, শুদ্ধতা বজায় থাকবে কী করে? তখন মানুষ হাতে কাব্য লিখতো, পুঁথি লিখতো। একেকজনের হাতের লেখা একেকরকম, দশজন দশরকম করে “ক” “খ” লিখেছে। এভাবেই পরিবর্তিত হতে হতে পাল্টে গেছে বাঙলা বর্ণমালা। কম্বোজের রাজা নয়পালদেবের ইর্দার দানপত্রে এবং প্রথম মহীপালের বাণগড়ের দানপত্রে সর্বপ্রথম আদি বাংলা বর্ণমালা দেখতে পাওয়া যায়। ব্রাহ্মীলিপি’র প্রথম পাঠোদ্ধার করেন প্রাচ্যবিদ্যা-বিশারদ প্রিন্সসেপ। আমাদের দেশের সিলেটের উপভাষারও কিছু বর্ণমালা ছিলো, আধুনিক বাঙলা বর্ণমালা থেকে একটু আলাদা, প্রায় অবিকৃত ‘নাগরী লিপি’র মতো।
এখন পর্যন্ত তিন ধরনের ব্রাহ্মীলিপির নমুনা আবিষ্কৃত হয়েছে, যাতে ৪৪টি বর্ণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে স্বরবর্ণ ৯টি, ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৫টি। বাঙলা বর্ণমালার “ঔ” ও “ঋ” ব্রাহ্মীলিপির স্বরবর্ণে না পাওয়া গেলেও ব্যঞ্জনবর্ণে এ দুটি বর্ণের নমুনা পাওয়া গেছে। আমরা এখন যে কয়টি স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ দেখি, আগে এর চেয়ে কয়েকটি বেশি ছিলো। এই তো কিছুদিন আগেও স্বরবর্ণতে ৯ ছিলো, এখন আর ৯-এর অস্তিত্ব নেই। এর সাথে ছিলো ঋৃ। ব্যঞ্জনবর্ণতে ছিলো ল (মূর্ধন্য ল), ছিলো হ্ল (মহাপ্রাণ ল), ছিলো ব (অন্তঃস্থ ব)। যুগে যুগে বাঙলা বর্ণমালার আকার-আকৃতি বদলাতে বদলাতে মুদ্রণযন্ত্রের ঢালাই ধাতুতে তৈরি বর্ণের কল্যাণে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা বর্ণমালার স্বরূপ মোটামুটি স্থির রূপ পায়।
বাংলা বর্ণমালা একসময় ব্রাহ্মীলিপি থেকে উদ্ভূত হলেও মধ্যযুগে এসে বাংলা বর্ণমালা বাংলার স্বাধীন শাসন ব্যবস্থার মতোই স্বতন্ত্র পথ ধরে বিবর্তিত হয়ে নিজস্ব একটি মৌলিক রূপ পরিগ্রহ করে। বাংলা বর্ণমালার এসব বিবর্তনের ইতিহাসের মধ্যেও বাংলার স্বাধীন পরিচয় নির্মাণ ও পরিগ্রহণের আকাক্সক্ষা সম্পৃক্ত রয়েছে।
অথচ ১৯৪৭-এর পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের অপরাপর প্রাদেশিক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ সিন্ধি, বেলুচি, পাঞ্জাবি ও পশতু ভাষার বর্ণলিপির মতোই বাংলা বর্ণমালা পরিবর্তন করে ফারসি-আরবি অথবা ল্যাটিন বর্ণমালা ব্যবহার করে লেখার পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। বাংলা ভাষা ও বাংলা বর্ণমালা তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর ভাষা ও ভাষায় ব্যবহৃত বর্ণমালা হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যালঘু ভারতীয় মুসলমান অভিজাত শ্রেণির ভাষা ও বর্ণমালা অর্থাৎ উর্দুকেই এবং ফারসি-আরবি লিপিকেই পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ও বর্ণমালা হিসেবে চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। পাকিস্তানের সিন্ধ, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও উঃ পঃ সীমান্ত প্রদেশে এখনও শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাদেশিক ভাষা স্থান করে নিতে পারেনি। পাকিস্তানের এরকম অসভ্য, আধিপত্যবাদী, অমানবিক এবং অন্যায় পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বাঙলায় গর্জে ওঠে প্রতিবাদ কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে বাঙালির এই দাবি এবং প্রতিবাদের যুক্তি অনুধাবন করার চেষ্টা গ্রহণ না করে তৎকালীন পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বুলেটের মাধ্যমে জবাব দেওয়ার পথ গ্রহণ করে। বুকের রক্ত দিয়ে সেদিন বাঙালি তাদের মাতৃভাষা ও বর্ণমালার অধিকার আদায় করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং এই বাঙলায় বাঙলা ভাষা ও বর্ণমালা ব্যবহারের দাবি মেনে নিতে পাকিস্তানি শাসকদের বাধ্য করেছিল। এটাই ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস।
সভ্যতা, মানবতা ও ন্যায়ের পক্ষে ১৯৫২ সনে বাঙালির এই ভাষা সংগ্রাম প্রতিষ্ঠিত মানবিকতার ন্যায্য যুক্তির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে পরিচালিত ছিল বলেই এই আন্দোলন সারা বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে আজ পৃথিবীতে প্রত্যেক মাতৃভাষার মর্যাদাবোধ জাগ্রত হয়েছে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালনের জন্য জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভ করেছে।
সপ্তম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
সম্পাদকীয়, অনুপ্রাণন—নবম বর্ষ প্রথম সংখ্যা
ফেব্রুয়ারি যখন আসে তখনই আমরা আমাদের ভাষা তথা, বাঙলা ভাষা ব্যবহারের পরিধি, মান, চর্চা এবং গবেষণার ক্ষেত্র ঘিরে অপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা সমালোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি; কিন্তু ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনার পর এবং বিশেষ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৮ বছর পর আজও আমরা সারা বছর বাঙলা ভাষার সমৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য কোনো পদ্ধতিগত ও সদা চলমান কোনো কর্মসূচি প্রণয়ন করতে সক্ষম হইনি। এই অক্ষমতার কারণ আমার জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যের মাঝেই বিদ্যমান।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তিনটি ভাগে বিভক্ত–বাংলা মাধ্যম, আরবি/ফারসি মাধ্যম এবং ইংরেজি মাধ্যম। ইংরেজি অথবা আরবি/ফারসি মাধ্যমে যারা পড়াশোনা করে একটি বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে সীমিত কয়েক শ্রেণি পর্যন্ত বাঙলা ভাষা ও বাঙলা ব্যাকরণের সাথে তাদের যৎসামান্য পরিচয় ঘটে। কিন্তু সেটা দৈনন্দিন জীবনে কথ্যভাষা ছাড়া লিখিত কোনো নথি, রচনা, প্রবন্ধ অথবা প্রতিবেদন লেখার জন্য যথেষ্ট হয়ে ওঠে না। যার ফলে, সরকারি কার্যক্রম চালানোর জন্য নথিতে অথবা আইন ও বিচারব্যবস্থার কাজে ব্যবহৃত যাবতীয় আইন, আদেশ ও রায়ের সকল প্রতিবেদনে অথবা চিকিৎসা ও বিজ্ঞানচর্চার উচ্চতর স্তরে বাঙলা ভাষার ব্যবহার সঙ্কুচিত হওয়া অনেকটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। আর সেটাই হতে আমরা দেখে থাকি।
আইন ও বিচারের নথি প্রস্তুতিতে অথবা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শ্রেণি অথবা মেডিকেল শিক্ষা ও চর্চার কাজে সহজে ব্যবহৃত হতে পারে সেজন্য সহজ ও বোধগম্য শব্দ সংবলিত উপযোগী এবং পূর্ণাঙ্গ পরিভাষা কোষ তৈরি করতে আমরা এখনও সফল হইনি। এই কাজটা কঠিন কিন্তু তাই বলে কাজটা শুরুই কি হলো? আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোনো কোনো কাজ যদি হয়ে থাকে, সেটাও অত্যন্ত নগণ্য এবং অস¤পূর্ণ। একটা ক্ষুদ্র এবং অসম্পূর্ণ পরিভাষা কোষ দিয়ে কি কোনো একটি গ্রন্থ সম্পূর্ণ অনুবাদ হতে পারে? তাই আমরা আইন, বিচারব্যবস্থা, বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণার সকল ক্ষেত্রে এখনো বাঙলা ভাষার প্রচলন করতে পারিনি।
আইন, বিচারব্যবস্থা, চিকিৎসা-বিজ্ঞানসহ সকল বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে শুধু নয়, সাহিত্য ক্ষেত্রেও বিদেশি ভাষা থেকে বাঙলায় অনুবাদ এবং বাঙলা ভাষা থেকে বিদেশি ভাষায় অনুবাদের ক্ষেত্রটিও অবহেলিত রয়ে গেছে। ব্যক্তি উদ্যোগে যৎসামান্য যেটুকু হচ্ছে সেটা বাঙলা সাহিত্যকে বিদেশে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য বিন্দুসম প্রচেষ্টাই বলা যেতে পারে। বাঙলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে তোলার জন্যই উভয়বিধ অনুবাদের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি ও প্রসার ঘটানো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অথচ এটা আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা কতটুকু বোঝেন এটা জানা খুব কষ্ট। অথচ বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে তারা আপসহীন সংগ্রামী। কিন্তু জাতিকে সমৃদ্ধ করে তোলার ক্ষেত্রে ভাষার বহুমাত্রিক বিকাশ যে কতটুকু প্রয়োজনীয় সেটা তারা কী আদৌ বোঝেন?
পৃথিবীতে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ রয়েছে যাদের মাতৃভাষা বাঙলা। শুধু এই সংখ্যাটার জোরেই আমরা জাতিসংঘে অন্যান্য প্রচলিত ভাষাসমূহের পাশাপাশি বাঙলা ভাষাকেও ব্যবহারের জন্য অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করতে চাই। কিন্তু শুধু সংখ্যার জোরেই কি জাতিসংঘের কাছে এই দাবি গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব? বস্তুতপক্ষে আমরা যদি বাঙলা ভাষাকে বিশ্বের একটি অন্যতম ভাষা হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, তাহলে বাঙলা ভাষাকে উচ্চতর জ্ঞান-বিজ্ঞান, আইন ও বিচারব্যবস্থা পরিচালনার জন্য উপযোগী করে তুলতে হবে। যদি আন্তর্জাতিকভাবে বাঙলা ভাষা ব্যবহার করতে গিয়ে কোনো কোনো প্রতিশব্দের অভাবে বিকল্প হিসেবে বিদেশি ভাষাই ব্যবহার করতে হয় তাহলে কি করে আমরা বাঙলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক অথবা বহুদেশীয় কোনো ফোরামে ব্যবহারে জন্য অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হতে পারি? এই বক্তব্যের সাথে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয় মিলিয়ে ফেলা যাবে না। কেননা, ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ, বাঙালির ভাষার জন্য সংগ্রাম ও আত্মদানের প্রতি সম্মান দেখানোর কারণেই সম্ভব হয়েছে। এর সাথে বহুজাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য প্রচলিত অন্যান্য ভাষাসমূহের পাশাপাশি বাঙলা ভাষাকে ব্যবহারের জন্য গ্রহণ করার সম্পর্ক নেই। এটা সফল করে তুলতে চাইলে বাঙলা ভাষার বিকাশ ও সমৃদ্ধি এবং পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিকাশ ও সমৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে।
বক্তব্যটিকে বাঙলা ভাষার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ এবং সমৃদ্ধির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রেখে বলতে চাই যে, প্রয়োজন ছিল পরিভাষা এবং অনুবাদ সাহিত্যের বিকাশ এবং সমৃদ্ধির জন্য একটি স্বতন্ত্র এবং দক্ষ ও মেধাবী সাহিত্যিক ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় পারদর্শী ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। কিন্তু বেসরকারিভাবে এই কাজটা করা সম্ভব না। এটা করতে হলে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে এবং যার জন্য চাই সরকারের সিদ্ধান্ত। কেন যে সরকার আজ অবধি এডহক-ভিত্তিতে দেশ ও জাতির জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি বাঙলা একাডেমিকেই দিয়ে রাখলো সেটা আমার বোধগম্য না।
এদিকে মাদরাসা ও ইংরেজি শিক্ষা থেকে পাস করে বেরিয়ে আসা ছাত্রদের উচ্চতর শিক্ষা এবং সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে। এ-কথা জানা সত্ত্বেও যে উচ্চতর শিক্ষায় অথবা চাকরি-জীবনে আগত এসব ছাত্ররা বাঙলা ভাষা ব্যবহার না করে অন্য বিদেশি ভাষা ব্যবহার করার প্রবণতা নিয়ে উচ্চশিক্ষা এবং চাকরিতে ঢোকে। যার ফলে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রে অথবা সরকারি প্রশাসন এবং আইন ও বিচারব্যবস্থার উচ্চতর মহলে সার্বিকভাবে বাঙলা ভাষা ব্যবহার প্রচেষ্টায় তাদের আগ্রহী হয়ে উঠতে দেখা যায় না। বরঞ্চ উল্টোটাই ঘটে। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে বিদেশি ভাষা ব্যবহার পরিহার করার প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে অনীহার ফলে একপ্রকার বাধা সৃষ্টি করতেও তাদের দেখা যায়।
ভাষার বহুমাত্রিক বিকাশ যদি না ঘটে, তাহলে বদ্ধজলের মতোই ভাষা ও একপ্রকার বন্ধ্যা অবস্থায় পতিত হয়। বিকাশ না ঘটলে যে কোনো অস্তিত্ব সঙ্কুচিত হতে থাকে এবং সঙ্কুচিত হতে হতে একসময় সেই বস্তুর অস্তিত্বই হুমকির মধ্যে পড়ে। কথ্য অথবা লিখিত ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে অস্তিত্বের এই বিনাশ শুরু হয় নানা বাঙলা শব্দ বা প্রতিশব্দের বদলে বিদেশি শব্দের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে যেটা এখন হরহামেশা ঘটছে। নাগরিক কথাবার্তায় অথবা লেখালেখিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলার বদলে আরবি অথবা ইংরেজি শব্দের ব্যবহার এখন আমরা প্রায়শই হতে দেখছি, কিন্তু তবুও আমাদের সাহিত্যিক অথবা বুদ্ধিজীবী মহলে কিংবা নীতিনির্ধারক মহলের টনক নড়তে দেখা যায় না। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই যে এটা প্রকৃত বাঙলা শব্দের অভাবে হচ্ছে, সেটা যে তা নয়। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে, এদের মন-মানসিকতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদী সচেতনতা ততোটুকু দৃঢ় নয়। এটা কেন হচ্ছে? কেন বহুসংখ্যক নাগরিক বাঙলার বদলে আরবি অথবা ইংরেজি ব্যবহারে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন?
জ্ঞান-বিজ্ঞান অথবা প্রযুক্তির উচ্চতর ক্ষেত্রে যখন বাঙলা প্রতিশব্দের অভাব হয়, তখন সম্পূর্ণভাবেই বাঙলা ভাষার বদলে ইংরেজি ব্যবহার যেন অপরিহার্য হয়ে যায়। সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে এই বাঙলায় একসময় আরবি, ফারসি অথবা উর্দু শব্দ সুকৌশলে ব্যবহার করার একটা প্রবণতা কোনো কোনো কবি-সাহিত্যিকের ক্ষেত্রে ঘটেছে, কিন্তু সেটা ছিল পাকিস্তান আমল এবং পাকিস্তানি শাসক মহলকে তোষণ করার জন্যই এটা সচেতনভাবেই করা হতো। কিন্তু এখন কেন আরবি, ফারসি, উর্দু অথবা ইংরেজি শব্দের ব্যবহার বেড়ে চলেছে। বাঙলা ভাষার বিকাশের ক্ষেত্রে যেহেতু চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে কাজ হচ্ছে না তাই বাঙলা ভাষার অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ছে এবং এর জন্য ত্রিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা শতভাগ দায়ী। তাহলে আমরা কি করতে পারি? এটা কি বলতে পারি যে, ভাষার জন্য আমাদের সংগ্রামের পরিসমাপ্তি ঘটেছে?
আমাদের একথা বুঝে নিতে হবে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাঙলা ভাষার অস্তিত্ব সুরক্ষা করা, এর বিকাশ ঘটানো এবং চলমান রাখা এবং সকল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাঙলা ভাষার সমৃদ্ধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করা চলার আন্দোলন ও সংগ্রাম, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের চাইতেও জটিল ও কঠিন। যার জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য চাই নিয়মানুবর্তিতা ও অধ্যবসায়।
খুব নীরবে হলেও বিশ্বজুড়ে ভাষার ব্যবহার এবং প্রসার নিয়ে চলছে এক তীব্র প্রতিযোগিতা। আর এই প্রতিযোগিতার পেছনে রয়েছে উন্নত রাজনীতি এবং অর্থনীতির অধিকারী দেশ ও জাতিসমূহের উৎপাদিত পণ্যসমূহের বাজার সম্প্রসারণ করার সম্প্রসারণবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা। যেসব পরিকল্পনাকে তারা কোনো কোনো সময় তাদের নিজ জাতি ও দেশের সুরক্ষা নীতির অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে বলে প্রচার করে থাকে। এসব পরিকল্পনার বিষয় আমাদের বুঝতে হবে। ভাষা, যা কিনা শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, চিত্র ও চলচ্চিত্রের বাহক সেগুলো তারা ছড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্বব্যাপী এবং স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তাদের তৈরি সাহিত্য, সংগীত ও চলচ্চিত্রের বাজার ক্রমেই সম্প্রসারিত করে চলেছে। আমাদের দেশেই বিদেশিদের বিদেশি ভাষার বই এবং চলচ্চিত্রের যে বাজার রয়েছে, সে তুলনায় আমাদের বাঙলা সাহিত্য অথবা চলচ্চিত্রের বিদেশি বাজার নিতান্তই ক্ষুদ্র। এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আমরা যদি আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও চলচ্চিত্রের বিদেশি বাজার সৃষ্টি না করতে পারি এবং সেসব বাজার সম্প্রসারিত না করতে পারি, এই প্রতিযোগিতার কোনো ভবিষ্যৎকালে একদিন আমাদের প্রাণপ্রিয় বাঙলা ভাষাই বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে।
সারা বিশ্বে নানা দেশে ছড়িয়ে প্রায় সোয়া কোটি বাঙালি রয়েছে। যাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম ক্রমেই বাঙলা ভাষা ব্যবহারের সীমিত সুযোগ পাওয়াতে বাঙলা ভাষা, সংগীত অথবা চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এইভাবে চলতে থাকলে প্রবাসী বাঙালি সমাজে বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিলোপ ঘটবে এবং তারা মানসিকভাবে স¤পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। প্রবাসী বাঙালিদের ব্যক্তি উদ্যোগে গুটিকয়েক বাঙলা ভাষা শিক্ষা স্কুল এবং সংগীত বিদ্যালয় আছে, যা কি-না প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আমাদের বিদেশি দূতাবাসগুলো এই ব্যাপারটাই নজর দেয়ার একটা বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে এবং বিদেশে বিশেষ করে যে সকল শহরে অধিক সংখ্যায় প্রবাসী পরিবার রয়েছে সেখানে বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র এবং পাশাপাশি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। যেসব লাইব্রেরিতে বাঙলা ভাষায় রচিত অথবা বাঙলা ভাষায় অনূদিত সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প ও কলাবিভাগের গ্রন্থসমূহ এবং বাঙলা চলচ্চিত্রের একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার থাকতে পারে। পাশাপাশি বাঙলা ভাষা ও সংগীত শিক্ষার জন্য স্কুল থাকতে পারে।
আমাদের দেশে যদি ব্রিটিশ কাউন্সিল, ইউএস, রুশ অথবা ফ্রেঞ্চ কালচারাল সেন্টার থাকতে পারে, তবে প্রবাসে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে আমরা কেন ‘বাঙলা শিল্প-সাহিত্য কেন্দ্র’ নাম দিয়ে বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে তাদের পরিচিতি অক্ষুণ্ন রাখার জন্য পদক্ষেপ নিতে পারি না? এবং এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আমাদের জাতীয় বাজেটে এই কর্মসূচি গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখার কথা ভাবি না?
নবম বর্ষ প্রথম সংখ্যা
সম্পাদকীয়, অনুপ্রাণন—১০ম বর্ষ ২য় সংখ্যা
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, চীনের উহান প্রদেশ থেকে গতবছর অর্থাৎ ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম করোনা সংক্রমণের সংবাদ মিলে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নভেল করোনা ভাইরাসটি ২০১৯-এর ডিসেম্বরেই চীনে শনাক্ত হয়েছিল, ফলে ভাইরাসটির নামের সাথে ১৯ সংখ্যাটি জুড়ে গিয়ে এর পুরো নাম হয় কোভিড-১৯। চীন থেকে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুতই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গিয়ে অতিমারীর আকার ধারণ করে।
এই ভাইরাসটি কৃত্রিম না প্রাকৃতিক এই নিয়ে কূটনৈতিক বিতর্ক আছে। বিজ্ঞান এটাকে প্রাকৃতিক বলেই রায় দিয়েছে। কৃত্রিম হলে চীনের দায় আছে না হলে নয়, এটা ঠিক নিশ্চিত বলে দেয়া যায় না। প্রকৃতিতে পশুপাখির শরীরে, বিশেষ করে লোমে ও লালায় নানারকম ভাইরাস আছে। গৃহপালিত জীবজন্তুর শরীরে যে সকল ভাইরাস আছে, সেসব ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে ক্ষতির মাত্রা খুব কম, কিন্তু বন্যপ্রাণির শরীরে মানুষের জন্য ক্ষতিকর ও প্রাণঘাতী যেসব ভাইরাসের উপস্থিতি রয়েছে সেসব ভাইরাসের মধ্য থেকে অনেকগুলো সম্পর্কে প্রাণিবিজ্ঞানে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। নভেল করোনা ভাইরাস উহানের একটি বন্যপ্রাণির বাজার থেকেই ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রকৃতির জীববৈচিত্র্য ও ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে বন্যপ্রাণি আহরণ ও নিধন বিশ্বজুড়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই বাজারে বন্যপ্রাণি এবং গৃহপালিত জীবজন্তু ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য আনয়ন করা এবং তার ফলে জনস্বাস্থ্য হানিকর ভাইরাস পশুর দেহ থকে মানবসমাজে প্রবেশের পথ করে দেয়া কোনোভাবেই বিচক্ষণ ও নীতিসম্মত কাজ বলে মেনে নেয়া যায় না।
আমরা যদি অতিমারীর বিশ্ব-ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, ৫৪১ থেকে ৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিউবোনিক প্লেগের সংক্রমণের ফলে ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ, তৎকালীন বাইজেন্টাইন ও কনস্ট্যান্টিনোপল সাম্রাজ্যভুক্ত সকল এলাকা, মিশর এবং আরব উপদ্বীপে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জনগোষ্ঠীর প্রাণহানি ঘটে। মধ্যযুগে ১৩৩১ সালে চীন থেকে একই বিউবোনিক প্লেগের বিশ্বমহামারী দ্বিতীয়বার শুরু হয়। প্লেগের এই মহামারী এবং পাশাপাশি চলমান গৃহযুদ্ধে তখন চীনের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মৃত্যু ঘটে। ক্রমে চীন থেকে তখনকার বিশ্ববাণিজ্যের গমনপথ ধরে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় এই প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে। ১৩৪৭ সাল থেকে ১৩৫১ সাল, এই চার বছরে ইউরোপের ন্যূনতম এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীর মৃত্যু হয়। শুধুমাত্র সিয়েনা এবং ইতালিতে বিউবোনিক প্লেগে মৃত্যুর হার ছিল প্রায় অর্ধেক। তারপর পুনরায় ১৮৫৫ সনে চীনে বিউবোনিক প্লেগ দ্বারা সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। উল্লেখ করা যায় যে, বিউবনিক প্লেগ একধরনের বাদামি ইঁদুরের শরীর থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়েছিল যা কি-না চীনের বাজারে তখন বিক্রয় হতে দেখা গিয়েছিল। চীন থকে বিউবোনিক প্লেগের তৃতীয় ঢেউ ক্রমেই পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। আর তখন শুধুমাত্র ইন্ডিয়াতেই এই প্লেগের সংক্রমণের ফলে প্রায় এক কোটি কুড়ি লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। মোম্বাইয়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এই প্লেগের সংক্রমণ রোধকল্পে সংক্রমিত অধিবাসী সহকারে একেকটি পাড়া-মহল্লা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ফ্র্যাঙ্ক স্নোডেন উল্লেখ করেছেন যে, এতে করে যে সত্যি কোনো উপকার হয়েছে কেউ তার প্রমাণ দিতে পারেনি। এগনোলো ডি টুরা নামে চতুর্দশ শতাব্দীর একজন কাহিনিকারের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, এই ভয়ানক ঘটনার সত্য বিবরণ মানুষের জিহ্বা দিয়ে উচ্চারণ করাই অসম্ভব। বলা যেতে পারে যে, এই ভয়াবহ ঘটনা যে দেখেনি, সে বিশেষভাবে আশীর্বাদপ্রাপ্ত। সংক্রমিত ব্যক্তির বাহুমূল এবং কুঁচকি অস্বাভাবিক ফুলে যায় এবং কথা বলতে বলতেই ধপ করে পড়ে মৃত্যু লাভ করতে থাকে। মৃতের সংখ্যাধিক্যের কারণে তাদেরকে গণকবরে দাফন করা হয়। ফ্লোরেন্স নগরীর জিয়োভানি বোকাচ্চিওর বর্ণনায়, মৃতদেহ সৎকারের জন্য ন্যূনতম শ্রদ্ধাটুকু দেখানো হয়নি যেটা কি-না একটি মৃত ছাগলের জন্যও প্রাপ্য হতে পারতো। কেউ কেউ মৃতদেহ বাড়িতে লুকিয়ে রাখতো। অনেকেই সংক্রমণের ভয়কে মানসিকভাবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু তারপরও ভুগতে ভুগতে মানুষ এক পর্যায়ে বেপরোয়া হয়ে যায়। বোকাচ্চিওর ভাষায়, পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানুষ অতিরিক্ত মদ্যপান করতে থাকে, নাচে-গানে মত্ত হয়ে থাকে এবং পৃথিবীর যাবতীয় সুখ এবং আনন্দ উপভোগ করাতেই নিজেদের নিয়োজিত করতে থাকে। সংক্রমণ ও মহামারীর বিষয়টি তারা ঘাড় থেকে এমনভাবে ঝেড়ে ফেলতে চাইতো যেন সেটা একটা বিশাল কৌতুক ছাড়া আর কিছু না। আমরা সেই একই ধরনের পরিণতির দিকে এগোচ্ছি কি-না?
অতীত অতিমারীর বিশ্ব-ইতিহাসে দেখা যায় যে, সংক্রমণের ধাপগুলোর মধ্যে প্রথম ঢেউ থেকে দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় ঢেউ অধিক থেকে অধিকতর প্রাণঘাতী হয়েছে। অন্যদিকে টিকা আবিষ্কারের ইতিহাসে বিজ্ঞানীরা চমক দেখিয়ে করোনা ভাইরাসের বিশ্বব্যাপী প্রাদুর্ভাব ও অতিমারীর এক বছরের কম সময়ের মধ্যে টিকা আবিষ্কার ও প্রয়োগ শুরু করেছেন। যার ফলে আশা করা যায় যে, সংক্রমণের দ্বিতীয় ধাপটি হয়তো অতীতের মতো ততটা মারাত্মক আকার ধারণ করবে না। কিন্তু তারপরও জীবন অথবা জীবিকা এসব প্রশ্নে, বিশেষ করে লকডাউনের মধ্যেও কীভাবে অর্থনীতিকে ন্যূনতম চলমান রাখা যায়, এসব প্রশ্নে বাস্তবে সর্বোত্তম ভারসাম্য রক্ষা করা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দেখা যাচ্ছে যে, সরকারের দেয়া লকডাউন নীতিমালা ও স¦াস্থ্যবিধি যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে না। তার পরিবারের অন্ন জোগাড়ের প্রয়োজনের চাপে উপার্জনক্ষম মানুষ ঘরে বসে থাকতে পারছে না।
কিন্তু, অন্যদিক নভেল করোনা ভাইরাস মানুষের শরীরে পুনঃপৌনিক সংক্রমণের মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে রূপান্তরিত হয়ে আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। যার ফলে, সংক্রমণের প্রথম ঢেউ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও ভাইরাসের রূপান্তরিত রূপ এই বছরের মার্চ থেকে ক্রমেই প্রাথমিক নিয়ন্ত্রণের বাঁধ ভেঙে দিয়ে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের চূড়া যে প্রথম ঢেউয়ের থেকে আরো উঁচু এটা মৃত্যু ও সংক্রমণের হার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই বোঝা যায়। বাংলাদেশে এ-পর্যন্ত কোভিড-১৯ এ সংক্রমিত হয়েছে প্রায় ৮ লাখ এবং একইসময়ে বিশ্বে সংক্রমণের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৬৩ লাখ। মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশে প্রায় ১২ হাজার এবং বিশ্বে প্রায় ৩৪ লাখ। সংক্রমণ ও মৃত্যুর নিছক সংখ্যাগুলোর মধ্যে এক একজনের আপন হারানোর অপার বেদনা লুকিয়ে আছে। আর আমরা আপন হারানোর বেদনার মতোই বেদনা অনুভব করি যখন আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার জগৎ থেকে হারিয়ে যায় তারকা ব্যক্তিরা। এই সংখ্যার শ্রদ্ধাস্মরণ বিভাগে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এপার ও ওপার বাংলার ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের এরকম কয়েকজন ব্যক্তির জীবন ও কর্ম নিয়ে এক বা একাধিক আলোচনা। যারা সকলেই এই করোনাকালে সম্প্রতি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তা ছাড়াও এই সংখ্যাটিতে অতিমারীর অভিঘাতের নানাদিক উঠে এসেছে শিল্প ও সাহিত্যের নানা শাখায়। অন্তর্ভুক্ত গল্প ও কবিতার কোনো কোনোটির মাঝে আমরা দেখতে পাই, অতিমারীর আঘাতের চিহ্ন। মানবতার অসহায়ত্ব ও দুর্ভোগের করুণ বর্ণনা এসব রচনাকে করেছে অশ্রুসিক্ত।
এই অতিমারীর মধ্যে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন পত্রিকাটির নিয়মিত প্রকাশনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন ছিল। অনুপ্রাণন পত্রিকাটির ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা থেকে ৯ম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা নির্ধারিত সময় থেকে কিছুটা দেরিতে হলেও প্রকাশিত হয়েছে। ১০ম বর্ষ ১ম সংখ্যাটি ফেব্রুয়ারি, ২০২১ একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হওয়া নির্ধারিত ছিল, কিন্তু বইমেলা পিছিয়ে যাওয়ায় সেটা প্রকাশিত হয় ২ এপ্রিল ২০২১। এই অতিমারীর মধ্যে অমর একুশে বইমেলা শুরু হয় ১৭ মার্চ এবং লকডাউনের বিধিনিষেধের মধ্যে শেষ হয় ১২ এপ্রিল। অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে ২০২০-২০২১ অতিমারীকালে এ-পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে ৬৮টি গ্রন্থ। গ্রন্থগুলোর কোনো কোনোটাতে উঠে এসেছে অতিমারীর অনুভব চিত্র।
বাঙালি, লেখক-আড্ডার মধ্য দিয়ে সৃজনশীল সাহিত্যের সূত্র খুঁজে পায়। বিভিন্ন লোকালয় ভ্রমণের মাধ্যমে গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলো ধরা দেয় এবং চলমান জীবনের নানামাত্রিক রূপ তাদের গল্প-উপন্যাসে উঠে আসে। অতিমারীর পূর্বে ঢাকা শহরে এবং দেশের জেলা পর্যায়ে লেখক আড্ডার কতগুলো আয়োজনের কর্মসূচি নিয়মিত অথবা অনিয়মিতভাবে বছরজুড়ে চলতে থেকেছে। লেখকরা ব্যক্তি এবং গ্রুপ পর্যায়ে লেখার বিষয়বস্তু তৈরির জন্য, গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য বই সংগ্রহ ও বইপড়ার কাজ চালিয়ে গেছে। কিন্তু এই অতিমারীর সময় আড্ডা বন্ধ হয়ে যায়। লাইব্রেরি বন্ধ থাকায় লেখার জন্য, গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ভ্রমণ অথবা বই সংগ্রহের কাজে বিঘ্ন ঘটেছে। কিন্তু তাতে কি লেখা বন্ধ থেকেছে? অতিমারীকালে লেখকরাও নতুন পরিস্থিতির, নয়া-স্বাভাবিক অবস্থার সাথে লেখার কার্যক্রমের রুটিন ও পদ্ধতি পরিবর্তন করে তাদের লেখা চালিয়ে গেছে। এই প্যান্ডেমিকের লকডাউন বা বিধিনিষেধ অথবা সতর্ক অবস্থান নিয়ে বাসায় থাকার সময় অনেক নতুন লেখকের জন্ম হয়েছে। যারা আগে থেকে লেখালেখি করতো অথবা যারা নতুন লেখক তারা সবাই লেখালেখির মধ্য দিয়েই ঘরবন্দী সময়টাকে নিয়োজিত করেছে।
এসব শিল্প-সাহিত্যকর্মে কি জনবিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতার স্বাক্ষর থেকেছে? আমার হাতে পত্রিকার জন্য যেসব লেখা অথবা পুস্তক প্রকাশের জন্য যেসব পাণ্ডুলিপি এসেছে, আমার পর্যবেক্ষণে মনে হয়েছে যে, এই নয়া-স্বাভাবিক পরিস্থিতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লেখার ধারায় পরিবর্তনের কোনো ছাপ ফেলতে পারেনি। স্বাভাবিক জীবনের তীব্র আকাক্সক্ষা নয়া-স্বাভাবিকতাকে গৌণ বোধেরই একটা অন্তহীন প্রচেষ্টা। আর যেসব লেখায় অতিমারী কবলিত নাগরিক অথবা গ্রাম্য জীবনের বাস্তব চিত্র এসেছে সেসব বাস্তব চিত্রে অতিমারীর ভয়াবহতা অথবা ভয়ঙ্কর রূপটি মুখ্য হয়ে ওঠেনি। যদিও আমরা দেখতে পাই, প্রতিদিনই মানুষের মৃত্যু হচ্ছে কিন্তু এর সংখ্যাটা স্বাভাবিক পরিস্থিতির মোট মৃত্যুহারকে অল্পই প্রভাবিত করেছে। এ-রকম একটা ধারণা থেকেই হয়তো মানুষ লকডাউনের বিধিনিষেধ অথবা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা হালকাভাবেই নিয়েছে।
কিন্তু তাহলেও দেশে গত মার্চ ২০২০ থেকে কোভিড-১৯ এ সংক্রমিত হওয়ার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে কেনাবেচায় পণ্যভেদে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বই কেনাবেচার মোট মূল্যমান স্বাভাবিক সময়েও এমনিতে কম। তারপর এই নয়া-স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সেটা কমে নেমে এসেছে স্বাভাবিক পরিস্থিতিকালে বিক্রয় মূল্যমানের তুলনায় শতকরা ২৫ ভাগে। তবে এটা যদি সাময়িক পরিস্থিতি হয়, তাহলে যে ক্ষতিসাধন হয়েছে সেটা হয়তো স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে এলে অধিকাংশ প্রকাশক ও সংশ্লিষ্ট মুদ্রণশিল্প মিটিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু অতিমারী যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে পুস্তক প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পে যে ক্ষতি হবে, সে ক্ষতির ফলে প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পের একটি বিরাট অংশ এই জগত থেকে চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে। মানুষের জীবিকা রক্ষা করার তাড়নার বাস্তবতায় ব্যাপকহারে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন অথবা লকডাউনের নীতিমালা উপেক্ষা করার যে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে, এসব ঘটনা যাদের জীবিকা প্রকাশনা এবং মুদ্রণশিল্পের ওপর নির্ভরশীল তাদের একটি বিরাট অংশকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না। কারণ, বইপড়া এই নয়া-স্বাভাবিককালের একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা দূর করার মাধ্যম হয়ে উঠতে আবারো ব্যর্থ হচ্ছে। এই অতিমারীকালে অনলাইনে কেনাবেচার পরিমাণ সামগ্রিক বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, সেটা বই ও পত্রিকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়নি।
আমাদের দেশে প্রকাশকদের মধ্যে বই অথবা ম্যাগাজিন প্রকাশের ধরনের ওপর ভিত্তি করে কতগুলো ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম ভাগটি পাঠ্যপুস্তক, নোট অথবা গাইড বইয়ের প্রকাশক। দ্বিতীয় ভাগটি পাঠ্যপুস্তক, নোট অথবা গাইড বই প্রকাশের পাশাপাশি সৃজনশীল সাহিত্য অথবা গবেষণাগ্রন্থও প্রকাশ করে থাকে। আর তৃতীয় ভাগটি শুধুমাত্র সৃজনশীল সাহিত্য অথবা গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করে থাকে।
এই তিনটি ভাগ বা শ্রেণির প্রকাশকরা সকলেই এই অতিমারীকালে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকতো, তবে প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগের প্রকাশকরা ক্ষতিগ্রস্ততার হাত থেকে বেশ ভালোভাবেই রক্ষা পেতো। অন্যদিকে যেসব প্রকাশক শুধুমাত্র সৃজনশীল সাহিত্য ও সামাজিক গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করে তাদের পরিস্থিতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকা-না থাকার সাথে সম্পর্কিত নয়। অতিমারীর কারণে বই ক্রয়-বিক্রয় সামগ্রিক হ্রাস পাওয়ার সাথেই তাদের অর্থনীতি জড়িত এবং যেটা শোচনীয় বললেও কম বলা হবে।
বাস্তবে আমাদের জানা দরকার যে, এই অতিমারীকালে কাদের আয় হ্রাস পেয়েছে এবং কাদের আয় যে পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে সে পরিমাণ হ্রাস তাদের আর্থিক সচ্ছলতার ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলেনি? কারা সৃজনশীল সাহিত্য, বই ও ম্যাগাজিনের মূল ক্রেতা? যাদের আয় সামগ্রিক হ্রাস পেয়েছ, তারাই কি সৃজনশীল সাহিত্য পুস্তক ও ম্যাগাজিনের ক্রেতা? আবার দৃশ্যত. এই অতিমারীকালেও কাপড়-জামার ঈদবাজার সরগরম হলেও সামগ্রিক ঈদের কেনাবেচার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে কি-না? না-কি স্বাভাবিক ছিল? না-কি স্বাভাবিক পরিস্থিতির সময়কাল থেকে কম ছিল? বস্তুত কাপড়-জামার ঈদবাজার এই অতিমারীকালে বেশ চাঙ্গা দেখা গেলেও সামগ্রিক হিসাবে আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ অতীত স্বাভাবিক পরিস্থিতিকালের চেয়ে কম ছিল। বস্তুত এই অতিমারীকালে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের খরচের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে এবং খরচের সিংহভাগ ব্যয়িত হচ্ছে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে এই অতিমারীকালে যাদের আয় তাৎপর্যপূর্ণভাবে হ্রাস পায়নি এবং যারা সৃজনশীল সাহিত্যের বই পড়ে, তারা হয়তো এই অতিমারীকালেও বই কেনা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় অংশটি যারা আয়ের একটি ভাগ কষ্ট করে হলেও সৃজনশীল সাহিত্য অথবা গবেষণাগ্রন্থ ক্রয়ের জন্য ব্যয় করতো, অর্থের অভাবে তারা এই অতিমারীকালে বইয়ের বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না; করলেও ক্রয়ের পরিমাণ খুব বড় আকারেই হ্রাস পেয়েছে।
অর্থাৎ একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা এবং অন্যদিকে বইয়ের ক্রেতাদের আয় হ্রাস, সামগ্রিকভাবেই বই ও ম্যাগাজিন প্রকাশনা এবং মুদ্রণশিল্পে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। অর্থনীতির অন্যান্য খাতে সরকার ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্পসুদে ঋণ দিয়ে এই অতিমারীকালে প্রণোদনা দিয়েছে, কিন্তু পুস্তক প্রকাশনা এবং মুদ্রণশিল্পের মালিকরা ব্যাংকখাত থেকে স্বল্পসুদে ঋণ গ্রহণ করার সুযোগ নানাকারণেই গ্রহণ করতে পারছে না। প্রকৃতপক্ষে প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বার্ষিক এককালীন অনুদানের কর্মসূচি নিয়ে সরকারের এগিয়ে আসা এখন এই অতিমারীকালে সময়ের দাবি। শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকার তালিকা করে বার্ষিক এককালীন এই অনুদান প্রদান করার ব্যবস্থা করতে পারে।
সর্বশেষে, করোনাকালের গদ্য নিয়ে কথা। প্রশ্ন হচ্ছে, করোনাকালের গদ্যের বিষয়বস্তু কী হতে পারে? অবশ্যই অতিমারী ও অতিমারীর অভিঘাত। অতিমারীর অভিঘাত শুধু মানুষের অসুস্থতা, দেহত্যাগ এবং পরিবার ও সমাজে তার বাস্তব ও মানসিক অভিঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। করোনাকালের গদ্যের মধ্যে আসতে পারে বহুমাত্রিক বিষয়। যেমন- চিকিৎসা, প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায় অথবা সামগ্রিকভাবেই এই অতিমারীর বিরুদ্ধে জীবন ও জীবিকা রক্ষার লড়াই। অতিমারীর প্রেক্ষিতে রাষ্ট্র ও সমাজের ভূমিকা সম্বন্ধীয় চিন্তাভাবনা। নয়া-স্বাভাবিক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিকের বর্ণনা, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ এবং সুপারিশ। কবিতা ও গল্পের পাশাপাশি করোনাকালের গদ্য রচনায় কোনো কোনো লেখক মনোনিবেশ করতে পারেন।
১০ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা
সম্পাদকীয়-
শিল্পী গোষ্ঠীর সমাজ-সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন
শিল্পী ও সাহিত্যিকদের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধভাবে একমাত্র নান্দনিক সৃজনের ঘেরাটোপে বন্দী না থেকে সমাজে বসবাসের শর্তাবলী ও পরিবেশ একজন শিল্পী ও সাহিত্যিক’কে অন্য যে কোন সচেতন নাগরিকের মতোই একান্তভাবে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে উৎসারিত ও গৃহীত সকল মতামত প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে তাঁর কাজে প্রকাশ করতে দেখা যেতে পারে। বিশেষতঃ একজন শিল্পী ও সাহিত্যিক পরিবেশ ও সমাজের ক্ষেত্রে গভীরভাবে সংবেদনশীল হওয়ার কারনে তাদের সৃজনশীল কাজে ও রচনায় সমাজের রীতি-নীতি, অর্থনীতি ও রাজনীতির ভাল-মন্দ এবং দোষ-গুণের প্রতিফলন থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না বরঞ্চ এই থাকাটাই যেন স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্র মত প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা রকম সীমা বেঁধে দেয়। এসব সীমার মধ্য থেকেই শিল্প চর্চার বিভিন্ন মাধ্যম ও অবলম্বনের সাহায্য নিয়ে একজন শিল্পী অথবা সাহিত্যিকের যেমন প্রচ্ছন্নভাবে নিজের মতটি প্রকাশ করার প্রচেষ্টা থাকে তেমনই আবার শিল্পী-সাহিত্যিকবৃন্দ দ্রোহী হয়ে মত প্রকাশের ফলে রাষ্ট্রের অথবা কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর কোপানলে পড়ে নির্যাতিত হওয়া এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির হাতে তাদের সহিংস আক্রমণের শিকার হতেও আমরা দেখেছি।
তাই, এখানে প্রশ্ন এটা নয় যে, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের সৃজনশীল কাজে ও রচনায় সমাজের রীতি-নীতি, পরিবেশ, অর্থনীতি ও রাজনীতির ভাল-মন্দ এবং দোষ-গুণ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ অথবা প্রচ্ছন্নভাবে তাদের ব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন থাকবে কি-না? বাস্তবে প্রশ্নটা হচ্ছে সামাজিক-রাজনৈতিক এবং পরিবেশগত সমস্যা সম্পর্কে রাষ্ট্র ও জনগণকে সচেতন করা এবং সেসব সমস্যা দূর করার জন্য সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিল্পী ও সাহিত্যিকদের ভূমিকা কীভাবে নির্ধারিত হবে? বরঞ্চ, প্রশ্নটা দুটো হচ্ছে-
ক. শিল্পী ও সাহিত্যিকবৃন্দ নিজেরাই কোন সামাজিক সংগঠন করবে কি-না অথবা পেশাজীবীদের অন্য কোন বৃহত্তর সামাজিক সংগঠনে সম্পৃক্ত হবে কি-না? এবং
খ. স্রেফ শিল্পীদের নিজস্ব অথবা অন্য কোন বৃহত্তর সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে সমাজের কোন ন্যায্য দাবী অথবা সমাজের কোন বাস্তব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পরিচালিত রাজপথের আন্দোলনে ফেস্টুন-ব্যানার নিয়ে নিজেরা সম্পৃক্ত হবে কি-না? এবং
গ. যদি শিল্পী ও সাহিত্যিকবৃন্দ নিয়মিতভাবে কোন সামাজিক সংগঠনমূলক কার্যক্রমে সক্রিয় হয়ে যায় এবং সামাজিক ইস্যুতে রাজপথের আন্দোলনে নেমে পড়ে অথবা সরাসরি কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হয়ে যায় তাহলে সময় ও মনোসংযোগ দ্বিধান্বিত হয়ে বাধা পড়ে শিল্প ও সাহিত্য চর্চার মান ও গুণাগুণের ক্ষেত্রে শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা কোন ক্ষতি বা সমস্যার সম্মুখীন হবে কি-না?
এখানে উল্লেখ্য যে, অন্য সামাজিক সংগঠনের আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা অথবা সংহতি প্রকাশ, ঘড়ে বসে শিল্পী-সাহিত্যিকদের নিজস্ব সংগঠন করা অথবা ফেস্টুন ব্যানার নিয়ে রাজপথে নেমে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া ইত্যাদী নানা উপায়ে একজন শিল্পী অথবা সাহিত্যিকের পক্ষে সামাজিক আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। একজন শিল্পী অথবা সাহিত্যিক সামাজিক আন্দোলনের সাথে কীভাবে যুক্ত হবেন সেটা একান্তভাবেই তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এবং এটাও বাস্তব সত্য যে একজন সংবেদনশীল ও সচেতন শিল্পী অথবা সাহিত্যিক ন্যায্য দাবী ও বক্তব্য নিয়ে পরিচালিত চলমান সামাজিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আত্মকেন্দ্রিক চিন্তায় আবদ্ধ হয়ে কোনভাবেই নিষ্ক্রিয় এবং নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না।
১৯৬৯ এর গণভ্যুত্থান অথবা ১৯৭১ এর মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলিতে শিল্পী সমাজের সদস্যবৃন্দকে সংগঠিতভাবে ফেস্টুন-ব্যানার নিয়ে আন্দোলনে-সংগ্রামে-মিছিলে যুক্ত হতে আমরা দেখেছি। ৭১’এর স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে এমনকি প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে নিয়ে শিল্পী ও সাহিত্যিকদের মুক্তিযুদ্ধে সংযুক্ত হতে আমরা দেখেছি। এর পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা বিভিন্নভাবে সংগঠিত হয়েছেন। এসব আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র।
স্বাধীনতার পর শিল্পী ও সাহিত্যিকদের যেসব সংগঠন গঠিত হয়েছে সংগঠনভেদে সেগুলোর মূল লক্ষ্যই ছিল জোটবদ্ধভাবে শিল্প চর্চা, আলোচনা-সমালোচনা, শিল্পের প্রচার-প্রসার, পরোক্ষভাবে ব্যক্তির প্রচার ও প্রসারলাভের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা থেকে বিপণন কৌশল অবলম্বন করা পর্যন্ত। তাছাড়া, রাষ্ট্রীয়, সরকারী অথবা বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, সংবাদ-মাধ্যম, কর্পোরেট অথবা নন-কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পদক-পুরস্কার অথবা আনুকূল্য লাভের জন্য এসব কোন কোন ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংগঠন ও জোটের তৎপরতার সুযোগ গ্রহণ করতেও আমরা দেখেছি। শিল্প ও সাহিত্যকেন্দ্রিক নানা তৎপরতা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও এসব সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে সৃজনশীল অথবা মননশীল শিল্পগুণের মান ও রুচির উৎকর্ষতা লাভের ক্ষেত্রে এসব সংগঠন বিশেষ কোন অবদান রাখতে বিশেষ কোন সাহায্য করেছে বলে এরকম উদাহরণ পাওয়া যায় না। দলীয় অথবা ব্যক্তিগত লাভালাভের বিষয়গুলো সেখানে খুবই নগ্নভাবে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে এবং যার ফলে দেশে মাঝারী মানের শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতাই হয়েছে অত্যন্ত অধিকহারে। অন্যদিকে প্রচার, প্রসার ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে মৌলিক, মননশীল ও উচ্চতর মানসম্পন্ন শিল্প ও সাহিত্যকর্ম পাঠকদের কাছে ব্যপকভাবে পৌঁছানোর সুযোগ লাভ করতে পারেনি। এবং যার ফলে সত্যিকার প্রতিভাবান শিল্পী ও সাহিত্যিকেরা হতাশা থেকে প্রচারবিমুখতা ও আত্মকন্দ্রিকতার ক্ষুদ্র গ-ির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছেন।
এছাড়া, রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্য চর্চা ও গবেষণা এবং তাঁদের সাহিত্যকর্মকে আধুনিক শিশু-কিশোর ও তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য দেশে কয়েকটি সরকারী-বেসরকারী সংগঠন কাজ করছেন। কিন্তু, রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্যকর্মের আক্ষরিক পঠন ও মুখস্থ করার উপরই এসব সংগঠনকে বেশী জোর দিতে দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের মাঝে যে মানবিক চেতনা ও যে দার্শনিক নির্যাস রয়েছে তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের সাথে অধিকহারে দেশের শিশু-কিশোর ও তরুণদের পরিচয় করিয়ে দেয়া খুব জরুরী। কেননা এতে করে দেশের নতুন প্রজন্মের মনের মাঝে মানবিক চেতনা ও সুন্দর রুচিবোধ স্থান করে নিতে পারে। এসব বিবেচনা করে রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্য চর্চা ও গবেষণার জন্য যেসকল সংস্থা ও সংগঠন কাজ করছেন সেসকল সংগঠন দক্ষতার সাথে তাঁদের কাজের পরিধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে চলুক- এটাই প্রত্যাশা করি।
প্রথম থেকেই শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, ব্যক্তি, দলীয়, গোষ্ঠী অথবা কর্পোরেট তৎপরতার বাইরে নিজের স্বাধীন অবস্থান রক্ষা করে দেশের নবীন ও তরুণ প্রতিভাবান শিল্পী ও সাহিত্যকদের পরিচ্ছন্ন ও মানসম্পন্ন শিল্প-চর্চার জন্য অনুপ্রেরনা যুগিয়ে এসেছে। সপ্তম বর্ষে পদার্পন করে ‘অনুপ্রাণন’ অবিচলভাবেই ঐ ঘোষিত পথেই তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে চায়। অনুপ্রাণন-এর মূল পৃষ্ঠপোষক অনুপ্রাণন-এর পাঠকেরাই। তাই, বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সপ্তম বর্ষে পদার্পণ করতে পেরে অনুপ্রাণন-এর লেখক এবং পাঠকেরা অবশ্যই বিশেষ অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য।
সপ্তম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা
সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন: ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়
গত নভেম্বর ২০১২ থেকে অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকাটি প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর সাহিত্য ও শিল্প বিভাগের বিবিধ সৃজনশীল ও মননশীল লেখায় সমৃদ্ধ হয়ে নিয়মিত ভাবেই প্রকাশিত হয়ে আসছিল। কিন্তু, পঞ্চম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যাটি বৃহৎ কলেবরে অর্থাৎ নিয়মিত ১৬ ফর্মার বদলে ১৯ ফর্মা আকারে প্রকাশিত হওয়ার পর পরবর্তী ৫ টি সংখ্যা প্রকাশ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সম্পাদকের অসুস্থতা ছাড়াও অলিখিতভাবে সম্পাদনা পরিষদের যে সদস্যবন্ধুটি পত্রিকার কাজে অফিস সমন্বয়কের গুরুদায়িত্ব পালন করছিলেন নিরবচ্ছিন্ন ধারায় প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কাজ চালিয়ে যেতে তিনি নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতে থাকলে পত্রিকার কাজে ছেদ পড়তে থাকে। তাছাড়া সম্পাদনা পরিষদের আর একজন বন্ধু অন্য একটি অনলাইন পত্রিকার কাজে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করার ফলে তাঁর পক্ষে অনুপ্রাণন পত্রিকায় প্রয়োজনীয় সময় দেয়া আর সম্ভব হয়ে উঠছিল না। সম্পাদনা পরিষদের অন্য আর একজন সংগঠক পর্যায়ের সদস্য পত্রিকার চাইতে গ্রন্থ প্রকাশনায় বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়ায় প্রকৃতপক্ষে অনুপ্রাণন পত্রিকাটি প্রকাশের কাজে লোকবলের এক বিরাট সংকট দেখা যায়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে- ২০১২’এর নভেম্বরে অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকাটি প্রকাশ করার উদ্যোগ যারা নিয়েছিলেন তারা প্রত্যেকেই শিল্প ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে যার যার নিজ অবদান ও স্বাক্ষর রাখার উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রম ও ব্যক্তিগত অনুদানের ভিত্তিতে পত্রিকাটির প্রকাশনার কাজের যাবতীয় কাজ ও ব্যয় নির্বাহ করার অভিপ্রায় গ্রহণ করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, সমাজ সংস্কৃতিতে এবং বিশেষ করে তরুণদের মনের মাঝে মানবতা, সহমর্মীতা, সৃজনশীলতা, মননশীলতা, শিল্পরুচি, নান্দনিকতা এবং মুক্তচিন্তার চর্চার জানালাটাকে উন্মূক্ততর করার কাজে নিয়োজিত অনুপ্রাণনের এই প্রচেষ্টা যেন বাধাহীন হয় এবং কোনভাবেই যেন প্রতিষ্ঠা ও কর্পোরেট ভোগবাদীতার কূট সাংস্কৃতিক আবর্তে পড়ে দিক হারিয়ে না যায়।
যশ ও প্রতিষ্ঠার মোহ যখন শিল্পীকে পেয়ে বসে তখন শিল্পচর্চা তপস্যা অথবা সাধনা থাকে না। কিন্তু, এটাই বাস্তব যে তপস্যা ও সাধনা ছাড়া শিল্পের উৎকর্ষতার শীর্ষ স্পর্শ সম্ভব হয়ে ওঠে না। প্রতিষ্ঠা ও কর্পোরেট ভোগবাদের বলয়ে যেসব শিল্প-সাহিত্য চর্চা ও উদ্যোগ ফেনার মত আমাদের চারদিক ভরিয়ে তুলছে সেসবের স্থায়িত্ব সম্পর্কে কী কোন সন্দেহ থাকা উচিত?
বছরখানেক বন্ধ থাকার পরও যখন আমরা অনুপ্রাণনের এই সংখ্যাটি প্রকাশের উদ্যোগ নেই তখন আমরা আমাদের পত্রিকার পাঠক, লেখক ও শুভান্যুধ্যায়ীদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সারা পেয়েছি। এই সারা থেকে এই বিশ্বাস আমাদের জন্মেছে যে, আমরা যে পথ অবলম্বন করে এগিয়ে চলতে চাই সেই পথে বাস্তবেই সঙ্গ-সাথীর আমাদের কোন অভাব নেই। এখনও আমাদের দেশের তরুণ সমাজের একটি বিরাট অংশ মিথ্যা যশ, প্রতিষ্ঠা ও কর্পোরেট ভোগবাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে শিল্প-সাহিত্যের মানবিক ও নান্দনিক চর্চা অব্যহত রাখতেই অধিক আগ্রহী। তাই, লেখা আহ্বানে যে সংখ্যক মানসম্পন্ন লেখা আমরা পেয়েছি সেগুলো দিয়ে অনায়াসেই দুটো সংখ্যা প্রকাশ করা সম্ভব ছিল। চলতি সংখ্যার জন্য লেখা বাছাই করতে গিয়ে আমাদের অনেক সময় দিতে হয়েছে এবং স্থান সংকুলানের অভাবে প্রায় অর্ধেক লেখাই পরবর্তী সংখ্যার জন্য রেখে দিতে হয়েছে।
লেখা বাছাই করতে গিয়ে আবারো আমাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, সাহিত্য আলোচনা ও সমালোচনা বিভাগে আমরা যথেষ্ট সমৃদ্ধ লেখা পাচ্ছি না যেখানে পেশাদার সমালোচকের কলমের স্পর্শ আরো তীক্ষè অথচ আরো গঠনমূলক হতে পারে। বিশেষ করে কবি ও কবিতা নিয়ে আমাদের আরো তীক্ষè, তীব্র ও গঠনমূলক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কেননা সাহিত্য জগতে কবি ও কবিতার সংখ্যা যতই বাড়ছে কিন্তু আগ্রহী কবিতার পাঠকের সংখ্যা যেন সেই তূলনায় বৃদ্ধি হচ্ছে না। মনে হয়, কবি ও পাঠকের মাঝে বোধ, অনুভব ও ভাষার কোন একটা অন্তর থেকে যাচ্ছে যে অন্তরটি ঘুচে যাওয়া অত্যন্ত জরুরী কেননা বোধ করি, মূলত কবিতার মধ্যেই রয়েছে তরুণ সমাজের জন্য ভবিষ্যতের বিশেষ বার্ত্তা। অর্থাৎ সাহিত্যের সত্যপাঠ।
দেশে এখন হেমন্ত ঋতু। হাওরের অকাল বন্যা ও দেশব্যাপী অতিবৃষ্টির ফলে ফসলহানী ঘটায় এবছর দেশের সামগ্রিক সমাজ জীবনে খাদ্যের ঊর্ধ্বমূল্য সকল মানুষকেই কষ্ট দিয়েছে। হেমন্তের নতুন ফসল যেমন কৃষকের ঘড়ে ঘড়ে জীবনে ঘুরে দাড়ানোর বার্ত্তা দিয়ে যাচ্ছে- দীর্ঘ বিরতির পর অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিকের এই সংখ্যাটি এ-বছর অনুপ্রাণনের ঘুরে দাঁড়ানোরই প্রতীক ও স্বাক্ষর হোক- এটাই আশাবাদ।
ষষ্ঠ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
কবি ও প্রাবন্ধিক স্বপঞ্জয় চৌধুরীর দ্বিতীয় প্রবন্ধের বই “শিল্প সাহিত্যের নিবিড় অনুসন্ধান ও পাঠ বিশ্লেষণ: নিভৃত ভাবনার জলযান” মূলত তাঁর দীর্ঘদিনের পাঠাভ্যাস ও চিন্তার প্রকৃষ্ট ফসল। এ গ্রন্থে তিনি মোট ২৪ টি নিবন্ধ সংযোজন করেছেন। যাতে তিনি আলোকপাত করার চেষ্টা করেছেন কবিতা, সাহিত্য, দর্শন, ও চলচ্চিত্রসহ শিল্পকলার বিভিন্ন মাধ্যমের দিকে। কবিতা ও কথাসাহিত্যের নন্দনতাত্তি¡ক ভেতরবাড়ির আনাচকানাচ পর্যবেক্ষণ করে তা তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র ও লিটলম্যাগ নিয়েও প্রয়াস চালিয়েছেন তাঁর নিবন্ধের বইটিতে। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কবি সাহিত্যিকদের বিভিন্ন লেখাকে তিনি পাঠ পরবর্তী বিশ্লেষণের মাধ্যমে এক ভিন্ন শিল্পরূপে দাঁড় করিয়েছেন যা সত্যিই প্রশংসনীয়। গদ্যসাহিত্যের বিকাশমান ধারায় তাঁর এ গ্রন্থটি সিরিয়াস ও মনোযোগী পাঠকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাবে বলে আশাকরি।
– আহমেদ শিপলু।
কবি ও নন্দনতাত্ত্বিক, সম্পাদক – ‘মগ্নপাঠ’
Shilpo sahityer Nibir Anusondhan O Path Bislation - Nibir Vabonar Jalzan - Swapanjoy Chowdhury
সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা- সাম্প্রতিকের কবি ও কবিতা সংখ্যা (চতুর্থ পর্ব)
সর্বশেষ প্রকাশিত চতুর্থ পর্বে অবশিষ্ট ২৫ জন কবিকে নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে মোট ৪টি পর্বে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিকের ১০০ কবির (যাদের জন্ম-সময়সীমা : ১৯৬৬-১৯৮৫) জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার, উল্লেখযোগ্য কবিতা ও কবি রচিত কবিতাসমূহের উপর সামগ্রিক আলোচনা সংকলিত করার আয়োজন সম্পন্ন হলো। সাম্প্রতিকের ১০০ কবিকে নিয়ে লেখা এসব প্রবন্ধ পাঠ করলে বাংলাদেশের সাহিত্যের বিশেষ করে কবিতার পাঠকরা আধুনিক, উত্তরাধুনিক ও নতুন ধারা- এই তিন ধারার কবি ও কবিতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। পাঠকরা অনুধাবন করবেন, বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের কবিদের কবিতা এবং সাম্প্রতিকের অর্থাৎ গত তিন দশকের কবিদের কবিতার মধ্যে সুস্পষ্ট একটি বাঁক বদল ঘটেছে। অত্যন্ত মেধাসম্পন্ন এই কবিদের অনেকেই তাদের শক্তিশালী উদ্ভাবনী শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছেন এবং তাদের এসব সাফল্য যথাযথ স্বীকৃতি লাভ করেছে। কবিতার পরিধি, গঠনশৈলী ও আবৃত্তির কারণে দশকের পর দশকে বিকশিত কবিতা অভিনব ধারায় পৌঁছেছে এবং শাখা উপশাখা ধরে বিচিত্র বিস্তার ঘটছে। ষাট, সত্তর ও আশি’র দশক বা এর পরবর্তী কবিরা কবিতায় ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন এবং ক্রমান্বয়ে কবিতায় এনেছেন নতুনত্ব। যেখানে কবির সৃষ্টিশীল রচনা সময়ের দাবিতে মানবিক চেতনা গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রেও অভিনব সাড়া জাগিয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিকের কবিদের অধিকাংশ কবিতায় আমরা দেখতে পাই সাবলীল ভাষা ব্যবহার করে সুচারুভাবে রচিত নান্দনিক চিত্রকল্প। পার্থিব অথবা অপার্থিব রূপক মিশ্রিত রিয়েলিজম, ম্যাজিক-রিয়েলিজম, সুররিয়েলিজম। আমরা দেখি, শহর কিংবা গ্রামীণ প্রান্তরের পটভূমিতে পাঠকের চেতনাকে জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত কিংবা বিচ্ছিন্ন করে দেখার একটি অভিনব প্রবণতা। সাম্প্রতিকের অধিকাংশ কবিতা গদ্য ছন্দে লেখা হলেও অনেকেই অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা ছাড়াও অন্ত্যমিলের কবিতা, পদ্য ও ছড়া লিখেছেন। অন্ত্যমিলের কবিতা, পদ্য ও ছড়ায় সামাজিক বিষয়বস্তু প্রাধান্য পেয়েছে যেখানে বেশ কিছু কবিতায় রম্য ঢঙের ব্যবহার পাঠকদের আকৃষ্ট করেছে।
একটি বিষয় লক্ষণীয়, রোমান্টিকতা পেরিয়ে বস্তুবাদের প্রভাব সত্ত্বেও বাংলাদেশের কবিতার ভুবন থেকে রোমান্টিকতার পরিপূর্ণ নির্বাসন কখনো ঘটেনি। যে বিষয়টি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য, মূলধারার সঙ্ঘবদ্ধ কবি ও কবিতার গোষ্ঠীবদ্ধতা থেকে বের হয়ে বাংলাদেশের কবিতা এখন প্রধানত ব্যক্তিবৃত্তে আবদ্ধ হচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কতিপয় বিচ্ছিন্ন কাব্যব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটেছে। তত্ত্ব এখন আর প্রভাবশালী কাব্য-প্রকল্প নয়। বর্তমান বাংলাদেশের কবিতাভুবনের বাস্তবতায় রাজনৈতিক মতাদর্শ কিছু সংখ্যক ব্যতিক্রম বাদে প্রভাব-বিস্তারকারী শক্তি নয়। একই কথা খাটে শিল্পসর্বস্বতার ক্ষেত্রে। এখানেও হয়তো দু-চারজন ব্যতিক্রমীকে দেখা যাবে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কবিতা বিচ্ছিন্ন যেসব ছোট ছোট ব্যক্তিক বৃত্তে বাঁধা সেখানে সৃজনশীলতার বিচারে সবাই নিজ নিজ ধারায় সর্বাধুনিক যেন তার কোনো পূর্বসূরি নেই।
বাংলার আধুনিক কবিতা সাহিত্যে সূচনা থেকেই পাশ্চাত্য, আফ্রিকা এমনকি ল্যাটিন আমেরিকার শক্তিশালী কবিদের কবিতার প্রভাব লক্ষ করা গেছে। সাম্প্রতিককালে বিদেশি প্রভাব মুক্ততার প্রবণতা গ্রহণ করে যে নতুন ধারার কবিতা লেখার প্রচেষ্টার প্রচলন ঘটেছে সেখানে প্রধানত গ্রামীণ সমাজ, পরিবেশ-প্রকৃতি, পারিবারিক গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের পাশাপাশি সমাজ ও রাজনীতির বিভিন্ন সংকটের প্রতিফলন দেখা যায়। এসব কবিতায় প্রমিত বাংলা শব্দের পাশাপাশি কিছু সংখ্যায় আঞ্চলিক বাংলা শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। আঞ্চলিক উচ্চারণের সঙ্গে মিল রেখে সেভাবে শব্দের বানান নিরূপণ করা হচ্ছে। বাংলা ভাষার বানান নির্ধারণ করার চার তত্ত্ব ও অন্যান্য প্রচলিত সূত্রের যৌক্তিকতা সম্পর্কে নতুন ধারার কবিরা প্রশ্ন তুলেছেন। একটি ভাষায় একই অর্থযুক্ত শব্দের বিভিন্ন বানান থাকতে পারে কিনা এটা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে। আলোচনা হওয়াও প্রয়োজন। কেননা বি-উপনিবেশবাদের যে দর্শনের উপর ভিত্তি করে নতুন ধারার কবিতা রচনা করার অনুপ্রেরণা গ্রহণ করা হয়েছে সেখানে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ প্রবেশের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর সেটা যদি ঘটে তাহলে কবিতার বিশ্বজনীন আবেদন হারিয়ে বাংলা কবিতা বাংলা সাহিত্যের সর্বোৎকৃষ্ট স্থান হারিয়ে ফেলতে পারে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের কবিতা সাহিত্যের যে মজবুত ভিত্তি আজ গড়ে উঠেছে তার উপরে দাঁড়িয়ে বাংলা কবিতাকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাহিত্যামোদীর কাছে পৌঁছানোর জন্য একদিকে যেমন অনুবাদ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন অন্যদিকে খেয়াল রাখা দরকার কবিতাও সৃজনশীল বিষয়, বোধ ও অভিব্যক্তিতে যেন সর্বজনীন রূপ গ্রহণ করার মাধ্যমে বিশ্বজনীন হতে পারে।
নভেম্বর ২০১২ সূচনা সংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর যাত্রা শুরু হয়। যাদের হাত ধরে ম্যাগাজিনটির জন্ম তাদের অনেকেই আমাদের মাঝে আজ নেই। ২৮ আগস্ট ২০১৯ সালে আমরা হারিয়েছি সম্পাদনা পরিষদের অন্যতম সদস্য কবি কুহক মাহমুদকে; যিনি সূচনা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে সার্বক্ষণিক পত্রিকাটির জন্য কাজ করেছেন। সম্প্রতি, গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ আমাদের ছেড়ে গেছেন শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন সম্পাদনা পরিষদের আরেকজন সদস্য কবি ও গল্পকার সুলতানা শাহ্রিয়া পিউকে। আগস্ট ২০১৩ সাল থেকে তিনি অনুপ্রাণন-এর সঙ্গে যুক্ত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি অনুপ্রাণন-এর সঙ্গে থেকেছেন একজন গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে। কবি ও গল্পকার সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের এই অকাল চলে যাওয়া অনুপ্রাণন-এর সকল কর্মী, লেখক ও শুভানুধ্যায়ীকে গভীরভাবে শোকবিদ্ধ করেছে। শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর এই সংখ্যা আমরা আমাদের সহকর্মী সুলতানা শাহ্রিয়া পিউয়ের স্মৃতিতে উৎসর্গ করছি। পাশাপাশি ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন-এর আগামী সংখ্যা সুলতানা শাহরিয়া পিউ স্মৃতি সংখ্যা হিসেবে প্রকাশ করার ঘোষণা প্রদান করছি।
Quarterly Anupranan - Year- 13 Issue- 4; Samprotiker kobi O kobita Songkhya 4th Part
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা – সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা, প্রথম পর্ব- সম্পাদকীয়-
গত কয়েকবছর ধরে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিক এবং তাদের রচিত কবিতা ও গল্প নিয়ে আলোচনার চর্চা বিস্তৃত করে চলেছে। ২০২২ এ বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ কবি (যাদের জন্ম : ১৯১১ – ১৯৬৫), ২০২৩ এ বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার (যাদের জন্ম : ১৮৯৫ – ১৯৬৫) এবং ২০২৪ এ বাংলাদেশের নির্বাচিত সাম্প্রতিকের ১০০ কবি (যাদের জন্ম : ১৯৬৫ – ১৯৮৫); এসকল কবি ও গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা বিষয়ে তথ্য ভাণ্ডার গড়ে তোলার পাশাপাশি তাদের উল্লেখযোগ্য কবিতা অথবা গল্প এবং তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা সংকলিত করে প্রকাশ করার মাধ্যমে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কবি ও গল্পকারদের পরিচিতি এবং তাদের রচিত সাহিত্য সম্পর্কে সামষ্টিক আলোচনা সমূহ দেশের সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করে যাচ্ছে। আমরা মনে করি এভাবে বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিকদের মূল্যায়ণ করার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করার মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশের সাহিত্যের পরিচিতির ক্ষেত্রটি বিস্তার লাভ করতে পারে।
এই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ এ এসে শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন বাংলাদেশের সাম্প্রতিকের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার যাদের জন্ম ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫ এর মধ্যে হয়েছে, তাদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা বিষয়ে তথ্যের পাশাপাশি তাদের উল্লেখযোগ্য গল্প ও তাদের রচিত গল্পসাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা সংকলিত করার কাজ হাতে নিয়েছে।
এই সংখ্যায় প্রকাশিত হলো আলোচকদের থেকে লেখা প্রাপ্তির ভিত্তিতে গল্পকারদের বয়সানুক্রমে নির্বাচিত ১০০ জন সাম্প্রতিকের গল্পকারের মধ্যে থেকে ২৫ জন গল্পকারের জীবিনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তাদের উল্লেখযোগ্য গল্প ও রচিত গল্পসাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা।
বিগত তিন বছর অর্থাৎ ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ এ যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আমরা বাংলাদেশের ১০০ কবি ও গল্পকার নির্বাচিত করেছি বাংলাদেশের নির্বাচিত সাম্প্রতিকের গল্পকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা মোটামুটি একই নির্ণায়ক মানদণ্ড অনুসরণ করেছি।
প্রথমত আমরা বিবেচনা করেছি আধুনিক বাংলা ভাষায় চর্চাকারী সাম্প্রতিকের গল্পকার যারা ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জন্ম লাভ করেছেন অথবা যিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময়ই বাংলাদেশে বসবাস করেছেন অথবা যার প্রকাশনা ও পাঠকের মূল অংশটি ভৌগলিক ভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। দ্বিতীয়ত আমরা বিবেচনা করেছি যে গল্পকারের গল্পে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অবিভক্ত বাংলা সাহিত্যের সাধারণ ঐতিহ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জনগণের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সমাজ-বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে। তৃতীয়ত যে গল্পকারের এক বা একাধিক গল্প বাঙালি পাঠক মহলের বড় অংশে উল্লেখিত ও সমাদৃত হয়েছে। চতুর্থত আমরা মনে করি শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো জাতি তথা মানবজাতির সাধারণ ও উন্মুক্ত অধিকারের বিষয়। কোনো সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শিল্প-সাহিত্যের বিষয়গুলো বিবেচিত না হওয়াই কাম্য। কিন্তু তারপরও কতগুলো বিষয় থেকে যায় যেগুলো নিয়ে আপস করা কঠিন। আর তাছাড়া প্রজন্মকে কিছু বার্তা দেওয়া প্রয়োজন, যে বার্তা, বক্তব্য অথবা কর্ম, সমাজে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। যেমন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কারা বাঙালীর স্বাধীনতার পক্ষে ছিল আর কারা বিপক্ষে ছিল? যুদ্ধকালীন পক্ষ-বিপক্ষের প্রশ্নটি মানবতার পক্ষে অথবা বিপক্ষে থাকার মতোই একটি প্রশ্ন। যখন জাতীয় বিদ্বেষপ্রসূত হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা নিয়ে জেনোসাইড চলে তখন পক্ষের বিষয়টা শুধু রাজনৈতিক থাকে না, মানবিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই যখন কোনো শিল্পী বা সাহিত্যিক এরকম সঙ্কটপূর্ণ সময়ে বা পরবর্তী সময়ে মানবতার পক্ষে না গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী যুদ্ধাপরাধীদের সাথে যুক্ত হয়ে থাকেন তাহলে সেটাকে নিছক ব্যক্তিগত বিষয় বলে গণ্য করা কঠিন হয়ে যায়। আর এই গণ্য করতে না পারার বিষয়টি অনুপ্রাণনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
একজন সাহিত্যিকও তার চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন নিয়ে আসেন কখনো সচেতনভাবে অথবা কখনো অবচেতনভাবেই। বাংলাদেশের সাম্প্রতিকের গল্পকারদের গল্পে পূর্বসুরীদের গল্পে নারী-পুরুষের প্রেম, পরকীয়া, বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের মনস্তত্ত্ব যেমন অনেকটা গ্রামীণ ছিলো, সেটা আর থাকেনি। চরিত্রের বাইরের চরিত্র অর্থাৎ পরিবার ও সমাজের সাথে যুক্ততা থেকে মুক্ত হতে কোন কোন সাম্প্রতিকের গল্পকার সফল হয়েছেন। তাই দেখা যায় প্রেম, পরকীয়া ও বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে কেউ না কেউ নাক গলানোর বিষয়টা পূর্বের মতো আর শক্তিশালী থাকেনি। আমরা এখন চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে ডিজিটাল বিষয়গুলোর উত্তরণ ঘটছে, ঘটছে জীবন-যাপনের চালচিত্র। মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে যেমন মানুষ সোচ্চার হচ্ছে তার পাশাপাশি ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রগুলোতে মানুষের অবস্থান দৃঢ়তর হতে দেখা যাচ্ছে। গ্রামের রূপান্তর কাহিনী হোক অথবা শহর থেকে নগরায়ণের দিকে উত্তরণের কাহিনী হোক প্রায় সকল ক্ষেত্রেই জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও পরিবার থাকলেও সাম্প্রতিকের গল্পকারদের মধ্যে ক্রমেই কাহিনী যতটা না পারিবারিক অথবা সামাজিক তার থেকে ব্যক্তিকে নিয়েই চর্চা বেশি হয়ে ওঠার প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে। গল্পের চরিত্রগুলোকে দেবতাতুল্য অথবা উল্টোদিকে শয়তানতুল্য করে অবাস্তব কাল্পনিক চরিত্র করে গড়ে তোলার ধারা থেকে বেরিয়ে এসে সাম্প্রতিকের গল্পকাররেরা কখনও বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বহুমাত্রিক ও বহুরৈখিক অথবা স্বপ্ন, অবাস্তব মানসিক চিত্র বা কাল্পনিকভাবে সৃষ্ট যা কিনা কোনো বাস্তবতার একটি রূপ হতে পারে অথবা সম্পূর্ণ কাল্পনিক ফ্যন্টাসি চরিত্র নির্মানে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিকের গল্পকারদের গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আলোচকরা এসব বিষয়কে আরো বিস্তৃতভাবে মূল্যায়ণ করেছেন।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 2; Contemporary Stories & Storytellers (Part-1)
অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা— গল্পকার ও গল্প সংখ্যা— তৃতীয় পর্ব— সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার ও তাদের উল্লেখযোগ্য গল্প নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষের যাত্রার তৃতীয় পর্বে প্রকাশিত হলো আরও ২৫ জন গল্পকারের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা; তাদের রচিত গল্প-সাহিত্য নিয়ে সামষ্টিক আলোচনা এবং একটি করে নির্বাচিত গল্প (আলোচকের পছন্দে)। সংখ্যাটিতে গল্পকারদের নিয়ে রচনাগুলোর অনুক্রম নির্ধারিত আলোচকদের থেকে লেখা প্রাপ্তির ভিত্তিতে বয়সানুক্রমে প্রস্তুত করা হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ গল্পকার ও তাদের লেখা গল্প নিয়ে ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন বিশেষ সংখ্যাগুলো প্রকাশের এই উদ্যোগের পদ্ধতিগত ন্যায্যতার প্রশ্ন নিয়ে গল্পকার ও গল্পসংখ্যার পূর্ববর্তী পর্ব দুটোয় সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। তবে সংখ্যাটি ১০০ কেন? ৯৯ বা ১০১ অথবা অন্য কোনো সংখ্যা কেন নয়? এটা নিয়ে দু’একজন প্রশ্ন রেখেছেন। গণনা অথবা পরিমাপ করার জন্য যে গাণিতিক বস্তু ব্যবহার করা হয়ে থাকে; সেটাকেই আমরা সংখ্যা বলি। সংখ্যা একটি বিমূর্ত ধারণা। কিন্তু সময় ও বস্তুর সাথে যুক্ত হয়ে এটি একেকটি বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করে থাকে। ইতিহাসযাত্রার মাইলফলক হিসেবে দুই বছর আগে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বর্ষপূর্তি অর্থাৎ সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছি। স্বাধীনতার এই পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপাদানগুলোতে যে বিবর্তন হয়েছে সেই বিবর্তনের ধারণা নেওয়ার জন্য একটি কোয়ান্টাম সময় অথবা বিবর্তনের সাথে জড়িত প্রতিনিধিদের একটা কোয়ান্টাম সংখ্যা নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের গল্প-সাহিত্যে চলমান বিবর্তনের ব্যাপ্তি, গভীরতা ও শ্রেণিভুক্ত সকল প্রকাশের অঙ্গ, ধারা ও উপাদান তুলে ধরার প্রয়োজন মেটানোর জন্য বহুল ব্যবহৃত একটা উপযুক্ত সংখ্যা বেছে নেওয়া যুক্তিযুক্ত ছিল বলেই আমাদের মনে হয়েছে। বিজ্ঞানসম্মত মেট্রিক ধারণায় ০.০১, ০.১, ১, ১০, ১০০ বহুল ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ সকল সংখ্যা। বিজ্ঞানের ধারাতেই শতকরা হিসাবে, বছর হিসাবে, জমির মাপে অথবা প্রতিনিধি নির্বাচনের সংখ্যায়— শতক সংখ্যাটি চলেই আসে। ১ সর্বদাই অবিভাজ্য ঐক্যের প্রতীক, সাথে মেট্রিক ধারণায় শূন্য সংখ্যাটি ১-এর সামনে অথবা পেছনে অবস্থান নিয়ে একের গুণিতককে নির্দেশিত করেছে। একের গুণিতক সংখ্যাই বাস্তবতাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। তবে বলে রাখা ভালো, সংখ্যাতত্ত্বের উপর ভর করে কোনো কুসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাসের সাথে এই সব ভাব বা বস্তুনিরপেক্ষ জ্যামিতিক মেট্রিক সংখ্যাগুলোর কার্যত কোনো সম্পর্ক নাই। অনুপ্রাণন কর্তৃক নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে নারীর সংখ্যা মাত্র উনিশজন। নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে গল্পকার নির্বাচনের একটি শর্ত ছিল জন্মসাল। নির্বাচিত গল্পকারের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম হচ্ছেন শামসুদ্দীন আবুল কালাম, যিনি ১৮৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কনিষ্ঠতম হচ্ছেন তারা যাদের জন্মসাল ১৯৬৫। সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য একবিংশ শতাব্দীতে এসে নিম্নগামী হয়েছে কিন্তু হ্রাসের গতির পেছনে বিংশ শতাব্দীতে নারী সাহিত্যচর্চাকারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। অনুপ্রাণনের গল্পকার ও গল্প সংখ্যাগুলোতে নির্বাচিত নারী গল্পকারদের গল্পসমূহ নিয়ে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে এই ধারণা স্পষ্ট হয়। স্মর্তব্য যে, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে সংখ্যাগত পার্থক্য শুধু বাংলার নয়— কম-বেশি সারা বিশ্বের। অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পে প্রবণতা হিসেবে রোমান্টিকতা ও নান্দনিকতার দিকে দৃষ্টি দেওয়ার তুলনায় সামাজিক বাস্তবতা অর্থাৎ পারিবারিক-সামাজিক, রাজনীতি-অর্থনীতির স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব ও সংকটের বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। গ্রাম ও শহর পৃথক পৃথকভাবে অথবা মিশ্রভাবেও এসেছে। গ্রাম-শহরের বিবর্তন ও রূপান্তরের ফলে সৃষ্ট ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, উৎপাদন অথবা কর্মস্থলের সমস্যা ও সংকটসমূহ চিত্রিত হয়েছে। পরিবর্তন কীভাবে যাপিত জীবনে মানসিক ও পারিপার্শ্বিক প্রতিক্রিয়া ঘটিয়েছে এসব মনস্তাত্ত্বিক বিষয় বিশ্লেষণ বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পে এসেছে নিখুঁতভাবে। মানুষের চিন্তাধারা কখনো এক জায়গায় থেমে থাকে না। একজন সাহিত্যিকও তার চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তন নিয়ে আসেন কখনো সচেতনভাবে অথবা কখনো অবচেতনভাবেই। বাংলাদেশের সাহিত্যে নারী-পুরুষের প্রেম, পরকীয়া, বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদের মনস্তত্ত্ব যেন এখনো অনেকটা গ্রামীণ। চরিত্রের বাইরের চরিত্র অর্থাৎ পরিবার ও সমাজের সাথে যুক্ততা থেকে মুক্ত হতে পারছে না। তাই দেখা যায় প্রেম, পরকীয়া ও বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে কেউ না কেউ নাক গলিয়েই যাচ্ছেন। আমরা এখন চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে ডিজিটাল বিষয়গুলোর উত্তরণ ঘটছে, ঘটছে জীবন-যাপনের চালচিত্র। মানবাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে যেমন মানুষ সোচ্চার হচ্ছে তার পাশাপাশি ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রগুলোতে মানুষের অবস্থান দৃঢ়তর হতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু, বিশেষ করে ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গল্পকারদের গল্পে সমাজই গুরুত্ব পেয়েছে বেশি।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন দ্বাদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা - গল্পকার ও গল্প সংখ্যাঃ তৃতীয় পর্ব
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণনের একাদশ বর্ষের ৪টি সংখ্যায় বাংলাদেশের ১০০জন নির্বাচিত কবি ও তাদের কবিতা নিয়ে আলোচনার তৃতীয় পর্বে এসে এই সংখ্যায় ২৩জন কবি ও তাদের কবিতা নিয়ে আলোচনা সমুহ সংকলিত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিকের একাদশ বর্ষ অর্থাৎ এ-বছরের প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যায় বাংলাদেশের ১০০জন নির্বাচিত কবি তালিকা থেকে প্রতিটি সংখ্যায় ২৭জন করে মোট ৫৪জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, প্রাপ্ত সম্মাননা ও পুরষ্কার, উল্লেখযোগ্য কবিতা এবং কবিতা নিয়ে বিশেষ আলোচনা ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় এই সংখ্যায় অর্থাৎ ৩য় পর্বে ২৩ জন এবং পরবর্তী ৪র্থ পর্বে আরো ২৩ জন কবি ও কবিতা নিয়ে মোট ১০০ জন কবির জীবনী, প্রকাশনা, পুরষ্কার ও সম্মাননা, উল্লেখযোগ্য কবিতা এবং কবিতা নিয়ে আলোচনা সংকলন সম্পন্ন হবে বলে আশা রাখছি।
বাংলাদেশের কবি ও তাদের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা দেখি যে, বাংলা সাহিত্যে বাংলাদেশের কবিদের অপরিসীম ভূমিকা ও অবদান রয়েছে। সাহিত্যমান বিবেচনায় তুলনামূলকভাবে কবিতাগুলো যে অত্যন্ত উচ্চস্থান দখল করে আছে, এটা নিঃসন্দেহেই বলা যায়। একদিকে নান্দনিক বিবেচনায় কবিতাগুলো যেমন উত্তীর্ণ, অন্যদিকে ঠিক তেমনই চলমান সমাজ, রাজনীতি, শোসিত মানুষের সংগ্রাম, জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম ও মানবিক চেতনায় উদ্ভাসিত কবিতামালা গণমানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। বাংলাদেশের কবিদের মূল বিষয় হিসেবে বাঙলার প্রকৃতি, মানবতা, মানব প্রেম, মাতৃস্নেহ, পিতৃস্নেহ, ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক সম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় ও সামাজিক মৌলবাদ বিরোধিতা, নারীবাদ ইত্যাদী বিষয়গুলো যেমন এসেছে ঠিক তেমনই পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে মানব-মানবীর প্রেম, বিরহ অথবা ব্যক্তি পরিচয়, আত্মানুসন্ধান, আত্মজিজ্ঞাসামূলক দার্শনিক বিষয়গুলো। ব্যক্তি, সমাজ ও দেশ কোনটাই অবহেলিত থাকেনি। জয়-পরাজয়, আশা-হতাশা, সংগ্রাম, সংক্ষুব্ধতা অথবা আপসকামিতা ছাড়িয়ে তাদের কবিতা হয়েছে মূলত জীবনধর্মী। তাই বাংলাদেশের কবিদের কবিতায় বহুলাংশে প্রকৃতি, প্রেম ও জীবনের অপার সৌন্দর্য সবসময় উঁচুতে তুলে ধরতে দেখা গেছে।
শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক, অনুপ্রাণন, একাদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা
অনুপ্রাণন চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা : সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যা তৃতীয় পর্ব- সম্পাদকীয়
অনুপ্রাণন নির্বাচিত সাম্প্রতিক কালের ১০০ গল্পকারকে নিয়ে চতুর্দশ বর্ষের বিশেষ আয়োজনের পারম্পরিক ধারাবাহিকতার তৃতীয় পর্বে এসে আরও ২৫ জন গল্পকারকে নিয়ে প্রকাশিত হলো সাম্প্রতিকের (জন্ম : ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫) গল্প ও গল্পকার সংখ্যা, তৃতীয় পর্ব। সাম্প্রতিকের গল্প ও গল্পকার সংখ্যার ১ম ও ২য় পর্বের মতো এই পর্ব অর্থাৎ ৩য় পর্বে ২৫ জন গল্পকারের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা প্রকাশের মাধ্যমে নির্বাচিত ১০০ গল্পকারের মধ্যে এ-পর্যন্ত মোট ৭৫ জন গল্পকারকে নিয়ে তথ্য ও আলোচনাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ প্রকাশের কাজ সম্পন্ন হলো। অবশিষ্ট ২৫ জন গল্পকারদের তথ্য ও সাহিত্য আলোচনা আগামী চতুর্থ পর্বে প্রকাশিত হবে বলে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব নির্মাণের মূল উপাদান হচ্ছে, সময় ও মানুষ। মানুষের চেতনাজাত রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম ও ভৌত প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রভাবিত সমাজ ও সংস্কৃতির বিচার ও বয়ান। গত চার বছর ধরে অনুপ্রাণন ত্রৈমাসিক শিল্প-সাহিত্য ম্যাগাজিনে গত শতাব্দীর প্রথম থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিকদের জীবনী, প্রকাশনা, পুরস্কার ও সম্মাননা সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা প্রবন্ধসমূহ সংকলিত করে যে সহায়ক সাহিত্যসম্পদ প্রস্তুত করা হচ্ছে সে-সকল সহায়ক সম্পদ বা উৎস ব্যবহার করে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গবেষণা হতে পারে। সেই গবেষণার একটি হতে পারে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের সমাজতত্ত্বের বস্তুনিষ্ঠ বয়ান।
আমরা এটা অধ্যয়ন করতে পারি- বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য কীভাবে সমাজ থেকে উদ্ভূত হলো, কী কী বৈশিষ্ট্য ধারণ করল, কীভাবে সাহিত্যে সমাজের প্রতিফলন ঘটাল এবং পাশাপাশি সমাজের ওপর সাহিত্য কী প্রভাব ফেলল? সাহিত্যে, ক্ষমতা, প্রতিযোগিতা ও সামাজিক কাঠামো কীভাবে কাজ করেছিল বা করে যাচ্ছে? এসব অধ্যয়ন থেকে হয়তো আমরা পেতে পারি এই তথ্য যে বাংলা দীর্ঘদিন উপনিবেশ থেকেছে। উপনিবেশ থাকাকালে ভিনদেশি শাসকের রাজনীতি, অর্থনীতির প্রভাবে পড়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির যেমন রূপান্তর ঘটেছে তেমনি বিকৃতিও ঘটেছে। ভিনদেশি উপনিবেশবাদী শক্তির প্রভাবের ফলে বাঙালির মননে এক গভীর আত্মপরিচয় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আর যখনই এই উপনিবেশবাদী মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে ভাষা, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে বাংলার মাটি ও পরিবেশজাত নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ধারায় নিয়ে এসে মুক্তচর্চা করার চেষ্টা বাঙালি করেছে তখনই ঔপনিবেশিক ধারার পৃষ্ঠপোষক ও কট্টরপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীর দিক থেকে আঘাত ও আক্রমণ এসেছে।
এই বিষয় ছাড়াও আমাদের অধ্যয়ন অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হতে পারে। যেমন, সমসাময়িক ছোটগল্পের আলোচনায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- গল্পকারেরা তাদের গল্পে কীভাবে সীমিত স্থান ব্যবহার করে পরিচয়, বিচ্ছিন্নতা, মনস্তাত্ত্বিক বাস্তববাদ এবং সামাজিক বিষয়গুলো (জাতি, শ্রেণি, ভোগবাদ) গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন। তাছাড়াও এই বিষয়েও আলোকপাত করা যেতে পারে যে কীভাবে প্রাণবন্ত চরিত্র, প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রাঞ্জল বর্ণনায় আধুনিক জটিলতাগুলো প্রতিফলিত করার জন্য বিভিন্ন শৈলী (ব্যঙ্গ, ভৌতিক, জাদুকরী বাস্তববাদ) ব্যবহার করা হয়েছে। আলোচনা ও অধ্যয়নে উঠে আসতে পারে যে কোনো কোনো সমালোচক সাম্প্রতিক রচিত গদ্যভাষায় নীরসতা বা অতি-সরলীকরণের প্রবণতার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দ্রুত পড়ে ফেলার উপযোগী করে রচনা করার বাইরে এসে ফর্ম এবং থিমকে আরও গভীরভাবে জড়িত করার প্রত্যাশা করেছেন। কোনো কোনো আলোচক কেবল গল্পের সারাংশে সীমাবদ্ধ না থেকে তার বাইরে গিয়ে গল্পের অর্থ প্রকাশে প্লট, চরিত্র, থিম এবং সাহিত্য কৌশলের (প্রতীকীকরণ, চিত্রকল্প) মতো উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে গল্পের অর্থ প্রকাশে তাদের কার্যকারিতা যথাযথ মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন।
অধ্যয়নে তুলে ধরা যেতে পারে যে সাহিত্য আলোচনাগুলো প্রস্তুত করতে গিয়ে বিশেষ করে চারটি বিষয়ের দিকে গভীর দৃষ্টি প্রদান করার প্রয়োজন হয়েছে। প্রথমেই এসেছে পরিচয় এবং অন্তর্ভুক্তি বোধের মতো বিষয়গুলো। যেমন সাংস্কৃতিক স্থানচ্যুতি, অভিবাসী মনস্তত্ব ও অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বায়িত বিশ্বে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত অথবা জাতীয় আত্ম-অনুসন্ধান। দ্বিতীয়ত, চরিত্র রূপসমূহের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। যেমন, বাস্তব ঘটনাসমূহের সাক্ষাৎ ব্যাখ্যা অথবা স্বগত ও বহুপাক্ষিক সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রগুলোর মনের অভ্যন্তরের জটিল ও অন্ধকার জগৎ উন্মোচন করা। তৃতীয়ত, গল্পের সামাজিক ভাষ্য অর্থাৎ ভোগবাদ, রাজনীতি, জাতি এবং শ্রেণি বিভাজনের সমালোচনা করার জন্য ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ ও অ্যাবসার্ডবাদ ব্যবহার করা। এবং চতুর্থত, রূপ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা অর্থাৎ অনন্য কাঠামো, বিভিন্ন অথবা বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গি (উত্তর-ঔপনিবেশিক, নারীবাদী ইত্যাদী) ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, ফ্যান্টাসি এবং জাদুকরী বাস্তবতার মতো ধারাগুলোর সাথে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে ছোটগল্পের আধুনিক বিভাজন বৈশিষ্ট্য আয়ত্তে নিয়ে আসা। কেউ কেউ এটাও মনে করেছেন যে সমসাময়িক গল্পগুলো সংকীর্ণ জনতাত্ত্বিক বা উপরে ভাসা বিষয়গুলোর উপর খুব বেশি কেন্দ্রীভূত হতে দেখা গেছে। তাছাড়া দ্রুত, সহজে হজমযোগ্য গল্পের বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে গভীর, জটিল অভিজ্ঞতা প্রদানের জন্য প্রস্তুত প্রকৃত শৈল্পিক সম্ভাবনাময় গল্পের চাহিদার ক্ষেত্রে ভাটা সৃষ্টি করে থাকতে পারে। সত্যিকার অর্থে উদ্ভাবন না করে নির্দিষ্ট ‘ধরনের’ (যেমন, অকার্যকর পরিবার, সমাজবিচ্ছিন্ন যুবক) উপর খুব বেশি নির্ভরশীল গল্পগুলো একঘেয়েমির উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শিল্প-সাহিত্য মানুষকে ধ্বংস নয় সৃজনশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। গভীর অনুভূতি, বোধ ও সংযোগের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যা ভাষাগত সীমানা ছাড়িয়ে মানুষে মানুষে, সংস্কৃতিতে সংস্কৃতিতে মেলবন্ধন ঘটায়। ব্যক্তি ও সমাজকে সৌন্দর্য, আনন্দ, দুঃখ, প্রেম, বেদনা ও জীবনের গভীরে নিয়ে যায়, যা তাকে আত্ম-অনুসন্ধান ও বিশ্বকে নতুনভাবে উপলব্ধিতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যচর্চা সকল প্রকার সংরক্ষণবাদ মুক্ত হয়ে মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন চেতনাবোধ অব্যহতভাবে ধারণ করে যাবে। সংরক্ষণবাদ মুক্ত মানবিকতার জাতীয় ও বিশ্বজনীন এই চেতনাবোধ থেকে বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্যচর্চা বিচ্ছিন্ন করার সকল অপচেষ্টা বাংলাদেশের কবি, গল্পকার, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকেরা মিলিতভাবে রুখে দেবে এটাই বাস্তব।
Quarterly Anupranan - Year- 14 Issue- 4; Contemporary Stories & Storytellers (Part-3)
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.




















There are no reviews yet.