Additional information
| Weight | 0.190 kg |
|---|---|
| Published Year |
$ 1.24 $ 1.65
| Weight | 0.190 kg |
|---|---|
| Published Year |
আলতাফ হোসেন-এর জন্ম ২৭ অক্টোবর ১৯৪৯। পৈতৃক নিবাস কিশোরগঞ্জ। বাবার চাকরিসূত্রে শৈশব কৈশোর কেটেছে পাটনা, কলকাতা, চাটগাঁ, করাচি ও ঢাকায়। ১৯৬৪ থেকে পুরোপুরিভাবে ঢাকায় বসবাস। অনার্স ও এমএ করেছেন বাংলায়। আলিয়ঁস ফ্রঁসেস, ঢাকা থেকে দু-বছর ফরাসি ভাষা শিখে সনদ পেয়েছেন।
কফি জেগে থাকে
লেখক পরিচিতি :
প্রজ্ঞা মৌসুমী। জন্ম: এক শরতে দাদুবাড়ি কুমিল্লায়, বেড়ে ওঠা সুনামগঞ্জে। ঊনিশ বছর থেকে পড়াশুনার জন্যে প্রবাস জীবন। এক এসাইনমেন্টের জন্যে প্রথম ইংরেজি কবিতা লিখার শুরু। প্রথম জীবনের কবিতাগুলো ইংরেজিতেই লেখা, কিন্তু মন আঁকুপাঁকু করে বাংলায় লিখতে; তারই ফলশ্রুতিতে আজকের প্রথম কবিতা ফসল ‘পৌরাণিক রোদ এবং অতিক্রান্ত কাঠগোলাপ’। লেখক কবিতা ও গল্প লিখে পেয়েছেন অনেক পুরস্কার তাই বাংলা সাহিত্যের অত্যুজ্জল আলোয় নিজেকে উদ্ভাসিত করার স্বপ্ন দেখেন অহর্নিশ।
পৌরাণিক রোদ এবং অতিক্রান্ত কাঠগোলাপ
রনক জামান। জন্ম:১৬ই ডেসেম্বর ১৯৯১, মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলায়। লেখালেখির হাতেখড়ি ছোটবেলাতেই কবিতার প্রতি মুগ্ধতা থেকেই তার প্রতি ভালোবাসা। এটাই কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে, যৌথ কবিতাগুচ্ছ ‘মায়ানগরীর বৃষ্টিকথন’, কবিতার ই-বুক ‘শরীর ছোঁয়া আঙুলগুলো’ এবং অনুবাদ উপন্যাস ‘ললিতা’।
ঘামগুলো সব শিশিরফোঁটা
আলী রেজা। জন্ম: ১৯৫৭। মুক্তিযুদ্ধে আলোড়িত কবি, সত্তর দশকে মূলত ছোটকাগজে লেখালেখি শুরু করেন। সদ্য অবসরে যাওয়া একটি রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠানের বিপণন ব্যবস্থাপক। এটি কবির প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ।
আলী রেজা
কিছু একটা বলাটাই যখন বাধ্যবাধকতাÑবাহুল্য এবং আপেক্ষিক বাতুলতা বাদ রাইখা মাহবুব লীলেন থাইকা ধার কইরা বলতে হয়Ñ ‘আনফিট মিসফিট হইয়া হামাগুড়ি দিয়া হাঁটি, আর রাত্তিরে ক্যালেন্ডারের পাতায় দাগ টাইনা চিক্কুর দিয়া কইÑ যাহ শালা বাঁইচা গেলাম আরও একটা দিন।’
এইটা বড়োবেশি জৈবিক বাঁচা
মানবিক বাঁচনের স্বপ্নও দেখি না বহুদিন
বড়ো তরাসে আছি
বড়ো বেশি চাইপা আছি, নিজের গলা নিজে।
দ্বান্দ্বিক দ্বন্দ্ব বিষয়ক আজাইরা প্রলাপ
আত্মমুগ্ধ শিকল
লেখক পরিচিতি :
হামীম ফারুক। পুরো নাম: গোলাম ফারুক হামীম। জন্ম: ২৪শে অক্টোবর, ১৯৬৩, ঢাকা। প্রথম তারুণ্যে কাজ করেছেন ইংরেজি পত্রিকা নিউ নেশন-এ। সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে এখন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন। মূলস্রোতের সাহিত্য পত্রিকাগুলোতে একটানা লিখেছেন ১৯৮৭ পর্যন্ত। মাঝখানে বিরতি দিয়ে পুনরায় আগমন প্রথম কবিতার বই ‘রোদ ও ক্রোধ, মাঝখানে সাঁকো’ দিয়ে। একটি ই-বুক আছে, ‘নক্ষত্রের চিরকূট’। এটি লেখকের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ।
প্রকৃতি পুরাণ
ফারহানা খানম। জন্ম: ১৯শে এপ্রিল ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকায়। গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দীপে। ‘ভুগোল ও পরিবেশ’ বিষয়ে স্নাততোত্তর ডিগ্রী অর্জন করে ব্যাংকে চাকুরি শুরু করলেও বর্তমানে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। নয় ভাই-বোনের মাঝে সবার ছোট বলেই আদরও পেয়েছেন বেশি। প্রথম প্রকাশিত বই, ‘ইছামতি’ (কলকাতা থেকে প্রকাশিত)।
তৃষ্ণার্ত বালুতট
কাজী রহমান। পরবাসী লেখক নিজের পছন্দ মতো বাঁচতে দু-যুগ আগে মার্কিন মুলুকে চলে আসেন স্ত্রী ও প্রথম শিশুকন্যা সাথে নিয়ে। বড় হয়েছেন পুরনো ঢাকার গেন্ডারিয়া’য়। জ্ঞান হবার পরপরই নিজেকে আবিষ্কার করেছেন ঘরের পাশের গ্রন্থাগারে, বিভিন্ন শিশু সংগঠন আর সমাজসেবামূলক সংগঠনের আলোছায়ায়। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার দুরন্ত কিশোর স্বাধীনতার যুদ্ধ দেখেছেন কাছ থেকে আর আতঙ্কের দিন গুনেছেন সারাক্ষণ মুক্তিযোদ্ধা দু’ভাইয়ের ঘরে ফেরার অপেক্ষায়। গ্রাজুয়েশন করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কর্মজীবন কেটেছে বিদেশী এয়ার লাইন্সের কর্মকর্তা হিসেবে।
তারাধুলো জল ও নস্টালজিয়া
সিদ্দিক প্রামানিক। জন্ম: ২১শে আগস্ট ১৯৭৯, কুস্টিয়ার কুমারখালী থানার চরভবানীপুরগ্রামে। বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স শেষ করে বর্তমানে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন এবং বাম প্রগতিশীল সংগঠনের সক্রিয় সংগঠক ও সংস্কৃতকর্মী। প্রথম বই ‘হাঙরের সমুদ্রে মননশীল মাছ’।
উন্মাদের কনসার্ট
অরণ্যক তপু। জন্ম: ১৯৯৪ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর, ঢাকার ঝিগাতলা। পৈত্রিক নিবাস বরিশালের পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলায়। বর্তমানে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত। এটি লেখকের প্রথম প্রকাশিত বই।
ব্যথিত ভায়োলিন
আবু জাঈদ। জন্ম: ২২শে জুলাই ১৯৮৩, ঢাকা। পড়াশুনা অসমাপ্ত রেখে একসময় কবি বাউণ্ডুলে জীবনের এলোমেলো আলপথে নেমে যান বেঁচে থাকার প্রয়োজনে, তাই বলে কাব্যচর্চা থেমে থাকেনি। এক সন্তানের জনক। এটি লেখকের প্রথম প্রকাশিত বই।
মানচিত্রের ফাঁসি চাই
সম্পাদকীয়, অনুপ্রাণন– নবম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা
মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে শিল্প, সাহিত্য ও সঙ্গীতের ভূমিকা
শিল্প ও সাহিত্য কীভাবে মানুষের চেতনায় মানবিক মূল্যবোধের প্রেরণা সৃষ্টি করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেই আসতে পারে। তাহলে, এটা কি একটি সমস্যা? একই স্থানে, একই সময়ে, একই বিষয় বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মতামত আসলে আমাদের বোধের জগতে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করবে কি-না? এর উত্তর অবশ্যই না। কেননা শিল্প, সাহিত্য ও সঙ্গীত বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ নিয়েই ভিন্ন ভিন্ন মানবিক মূল্যবোধের বিষয় নিয়ে নিরীক্ষা করতে পারে। কোনো একক দৃষ্টিকোণ সম্পর্কে অটল বিশ্বাস উল্টো চেতনার জগতে গোঁড়ামির বীজ বপন করার প্রবণতার জন্ম দিতে পারে।
অর্থাৎ, মানবিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের উৎস এবং অভিব্যক্তি সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো সুত্র বা সংজ্ঞা নির্বাচন করা হয়তো সংকীর্ণতার দিকেই ঠেলে দিতে পারে। আমরা যেমন মানবিক সমাজ চাই, সাথে সাথে আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুত্ববাদী সমাজ চাই। সমাজে যদি মুক্তমত ও ভিন্নমতের চর্চা বা অনুসরণ করার সুযোগ রহিত থাকে তবে মুক্তমনা ও মানবিক শিল্প-সাহিত্য ও সঙ্গীতের চর্চা বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী হতে দেখা যেতে পারে। তবে মুক্তমত অর্থে অতিশয়োক্তি আমরা দেখতে চাই না। আমরা চাইবো না সমাজের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ এবং অশান্তি সৃষ্টি করে–এরকম মানবতাবিরোধী শিল্প-সাহিত্য অথবা সঙ্গীতের চর্চা অবারিত হোক। শিল্প-সাহিত্য ও সঙ্গীত সৃষ্টির সৃজনশীল প্রেরণা ভিন্নতর কোণ থেকে উৎসারিত হলেও লক্ষ্য একটাই হওয়া বাঞ্ছনীয় যেন সেসব সৃষ্টিশীল কাজের অভিব্যক্তি, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের মধ্যে উপস্থিত থাকে নান্দনিকতা; জাতি-উপজাতি-বর্ণ-সম্প্রদায় ও লিঙ্গ নির্বিশেষে বিস্তৃত হয় মানবিক সহমর্মিতা, প্রেম, সাম্য ও সমতা। মনে রাখতে হবে যে, ইহজগতে মানুষ বিভিন্ন সামাজিক প্রথা-প্রচলন, বিশ্বাস ও কুসংস্কারের কারণে বহুমাত্রিক শোষণ ও নিপীড়নের দুর্ভোগ নিয়ে জীবন যাপন করছে। যদি সৃজনশীল ও নান্দনিক শিল্প-সাহিত্য ও সঙ্গীত এর লক্ষ্য হয় পশ্চাৎপদ প্রথা-প্রচলন, জাতি-উপজাতি-ধর্ম-সম্প্রদায়-বর্ণ ও লিঙ্গ বৈষম্য এবং নানাবিধ কুসংস্কার এর হাত থেকে মুক্তির জন্য মানুষের চেতনা জাগ্রত করা, তবেই বলা যেতে পারে যে, সেসব সৃজনশীল ও নান্দনিক শিল্প-সাহিত্য ও সঙ্গীত এর মানবিক মূল্য রয়েছে।
সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্য, নাট্যকলা, চলচ্চিত্র, নৃত্যকলা, সঙ্গীত, কারুশিল্প, ভাস্কর্য-শিল্প, স্থাপত্যকলা, এবং শিল্পের সকল মাধ্যমের মধ্য দিয়েই মানুষের রুচি ও সংস্কৃতির আত্মপরিচয়, উন্মেষ ও উপলব্ধি ঘটে–মানুষের চেতনায় তার স্বপ্নের জগতটি দানা বাঁধে ও বিকশিত হয়। সংস্কৃতির বিকাশ সাধনের জন্য শিল্পের এই মাধ্যমগুলো একেবারে যেন মনের এক-একটি জানালা। এই জানালাগুলো ব্যবহার করে যেমন একটি সংস্কৃতির ইতিবাচক রূপান্তর সম্ভব, ঠিক সেরকম মনের এসব জানালা দিয়েই কলুষিত বাতাস প্রবেশ করে একটি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই কোনো শিল্পকর্মটি সমাজের ইতিবাচক মানবতাবাদী রূপান্তর এর পক্ষে, আর কোন শিল্প ও সাহিত্যকর্মে মানবিক সংস্কৃতির উন্মেষ ও বিকাশের জন্য ক্ষতিকর উপাদান বিদ্যমান–এটা শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়ে। সাহিত্য, নাট্যকলা, চলচ্চিত্র, নৃত্যকলা, সঙ্গীত, কারুশিল্প, ভাস্কর্য-শিল্প, স্থাপত্যকলা, এবং শিল্পের অন্যান্য মাধ্যম দিয়ে যেসব কর্ম আমাদের জগতে প্রবেশ করছে–সেসব কর্মসমুহের প্রত্যেকটি কাজের নিবিড় ও যথার্থ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যুক্তিসঙ্গত এবং বিশ্লেষণমূলক আলোচনা-সমালোচনা প্রকাশ করা তাই অত্যন্ত জরুরী একটা কাজ। পশ্চাৎপদ সমাজে এসব আলোচনা-সমালোচনা রচনা ও প্রকাশ করার কাজে বাধা আসতে পারে। কিন্তু, এই বাধা কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলার প্রেরণা সৃজন করা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়ে। সেজন্য কবি, সাহিত্যিক, নাট্য-কলাবিদ, নাট্যশিল্পী, চলচ্চিত্রনির্মাতা, চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত কলাকুশলী ও শিল্পী, নৃত্য-কলাবিদ ও নৃত্যশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক ও সঙ্গীতশিল্পী, কারুশিল্পী, ভাস্কর এবং স্থপতিবৃন্দকে সমাজে ইতিবাচক রূপান্তর আনয়নের প্রয়োজনে প্রতিবাদী ও সংগ্রামী হয়ে ওঠার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
কিন্তু, সমাজে এ বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে যে, সমাজ পরিবর্তনের কাজে প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধভাবে তো নয়ই এমনকি স্ব স্ব অবস্থান থেকেও প্রতিবাদী সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের কাজ না। শিল্পী ও সাহিত্যিকদের এই অংশের মত হচ্ছে, সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া রাজনৈতিক কর্মী অথবা সামাজিক আন্দোলনের সাথে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাজ। যেন শিল্পীর কাজ সুন্দরের অন্বেষণ করা, অন্তর্নিহিত সত্যের নয়।
আবার, কোনো কোনো কবি, সাহিত্যিক, নাট্য-কলাবিদ, নাট্যশিল্পী, চলচ্চিত্রনির্মাতা, চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত কলাকুশলী ও শিল্পী, নৃত্য-কলাবিদ ও নৃত্যশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক ও সঙ্গীতশিল্পী, কারুশিল্পী, ভাস্কর এবং স্থপতিবৃন্দকে সমাজের ক্ষমতাধর অধিকর্তাদের তোষণেই ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়েই এসব শিল্পী ও সাহিত্যিকরা তাদের কাজে এসব চিহ্ন রেখে গেছেন। প্রতিক্রিয়াশীল শিল্প ও সাহিত্য বর্জন না করে শিল্পী ও সাহিত্যিক সমাজের একটি অংশকে নান্দনিকতার দোহাই দিয়ে ঐসব শিল্পকর্মকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। কিন্তু, সত্যি কি সমাজের পরিবর্তন কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে এবং সেসব শিল্প, সাহিত্য ও সঙ্গীতকে কালজয়ী আসনে সমাসীন করার কাজে তারা কি সফলতা লাভ করতে পারে?
একটি সেনাবাহিনী উদ্দীপনামূলক সঙ্গীত ঠোঁটে করেই ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করে। আবেগপূর্ণ নাট্যকলা, বাগ্মী বক্তৃতা অথবা অসাধারণ গান, ভাস্কর্য ও অভাবনীয় সৌধ নির্মাণ করে ধর্ম তাদের বাণী মানুষের মনে সঞ্চার ঘটায়। জাতিগত গোষ্ঠী–সঙ্গীত ও নৃত্যের মাঝে তাদের সাংস্কৃতিক শেকড় খুঁজে পায়। অসাধারণ স্থাপত্যশিল্প, যেমন: রোডস্ (জযড়ফবং) এ অবস্থিত সূর্য দেবতা হেলিওস এর অতিকায় মূর্তি, জাপানের একটি পীঠস্থানে ১০৩ টন ওজনের সর্ববৃহৎ বুদ্ধ-মূর্তি, স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, ইত্যাদি কোনো সম্প্রদায় বা জাতি’র আদর্শের প্রতীক হিসেবে মানুষের গভীরে প্রোথিত হতে থাকে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী যে, যখন একটি নতুন সম্প্রদায় অথবা জাতি-গোষ্ঠী পুরানো কোনো সম্প্রদায় অথবা জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করে তখন পুরানো শাসনব্যবস্থায় প্রচলিত নৃত্য ও সঙ্গীত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তাদের আদর্শিক গ্রন্থসমুহ পুড়িয়ে ফেলা হয়, মন্দির ও পীঠস্থানগুলো বিনষ্ট করা হয়, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যকর্ম সমূহ মাটিতে গুঁড়িয়ে ফেলা হয়। আবার অন্যদিকে উদাহরণ হিসেবে দেখা যায় যে, শাসকের আমূল পরিবর্তনের কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সম্রাট শাহজাহানের তাজমহল রক্ষা পায় প্রেমের অভিব্যক্তি, স্থাপত্য ও মর্মর পাথরে নান্দনিক অলংকরণ শিল্পের এক অসাধারণ নিদর্শন হিসেবে। যদিও শাহজাহান নিজ সন্তানের হাতে বন্দী হয়ে অনেক দুঃখ-কষ্টে নিজের শেষ জীবনটি অতিবাহিত করেন কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী যে, অনেক নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার মধ্যে দিয়েই তিনি শাসক হিসেবে আবির্ভূত হন। একটা সময় পর্যন্ত সম্রাট শাহজাহান নিকৃষ্টতম কূটচাল আশ্রয় করে দোর্দণ্ড প্রতাপ নিয়েই প্রজাদের শোষণ করে ও প্রতিপক্ষদের নৃশংসভাবে হত্যা অথবা দমন করে রাজ্যের বিস্তার ঘটান এবং রাজ্যের শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন। কথিত আছে যে বিশ হাজার শ্রমিক ও শিল্পী যারা তাজমহল নির্মাণ করেছিল তাদেরকে শুধু দাসের মতোই শোষণ করা হয়নি, একটি বড় অংশকে শিল্পের কলাকৌশলের গোপনীয়তা রক্ষা করার অজুহাতে সম্রাট শাহজাহান হত্যা করেছিলেন। অথচ শাহজাহান ও নুরজাহানের প্রেম বিবৃত করে অন্য ভাষায় তো বটেই এমনকি বাংলা ভাষায় গান ও কবিতা রচিত হয়েছে।
ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে শাসকশ্রেণি কর্তৃক শিল্প-সাহিত্য ও সঙ্গীতের উপর নানারূপ আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে দেখা গেছে। ব্যতিক্রমী শিল্পী-সাহিত্যিকদের উপর নেমে এসেছে দমন ও নির্যাতনের স্টিম রোলার। আধুনিক কালে, হয়তো শিল্পকলার উপর সবচেয়ে নাটকীয় আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে দেখা যায় নাৎসি, কট্টর কমিউনিস্ট এবং মৌলবাদী ও কট্টর এক শ্রেণির ইসলামপন্থীর শাসনে। হিটলারের জার্মানী, মাও সে তুং এর চীন, স্ট্যালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন অথবা আফগানিস্তানে মোল্লা ওমরের শাসনের অধীনে যেসব শিল্প, সাহিত্য অথবা সঙ্গীত গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, সাধারণ শৈল্পিক সূত্রসমুহ অনুসরণ করে সেসব শিল্প, সাহিত্য অথবা সঙ্গীতকে নিষ্ফলা এবং বৈচিত্র্যহীন হিসেবেই বিবেচনা করা যেতে পারে। একটি সুনির্দিষ্ট মতবাদের প্রচার, প্রজ্ঞাপন সৃষ্টি করার প্রচেষ্টার প্রভাবে শিল্পকর্মটি হয়ে ওঠে নিস্তেজ ও অনুজ্জ্বল। এইরূপ শিল্প-সাহিত্য ও সঙ্গীত মানুষের জন্য কথা না বলে, তাদের নির্দেশ করেই কথা বলে। যেখানে মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার পরিবর্তে রাষ্ট্রের আশা-আকাক্সক্ষার কথাই প্রকাশ ঘটেছে। মানুষের চেতনার বিশোধনের পরিবর্তে এসব শিল্প রচনার উদ্দেশ্য মানুষের আবেগ-অনুভূতি-ভাবনার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
যে কোনো কালে যখন কোনো কবি, সাহিত্যিক, নাট্য-কলাবিদ, নাট্যশিল্পী, চলচ্চিত্রনির্মাতা, চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত কলাকুশলী ও শিল্পী, নৃত্য-কলাবিদ ও নৃত্যশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক ও সঙ্গীতশিল্পী, কারুশিল্পী, ভাস্কর এবং স্থপতি তার কাজটি মুক্ত পরিবেশে সৃজন করে থাকেন অথবা যে কোনো সময় যখন বহির্জগতে প্রতিকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও শিল্পীরা তারা নিজের অভ্যন্তরে বন্ধনহীন মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে সক্ষম হতে পারেন, তাহলে সেই অবস্থায় প্রকাশিত শিল্পকর্মটি হয়তো মানবতাবাদী এবং উদারনৈতিক মানুষের ভালোবাসা ও প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হতে পারে অথবা যে কোনো মানুষকে চেতনাগতভাবে মানবতাবাদী হয়ে ওঠার গভীর উদ্দীপনা এবং অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতে পারে।
প্রকৃতপক্ষে, তাহলে নান্দনিকতার কোনো সুনির্দিষ্ট মানবিক তত্ত্ব সাজিয়ে দেয়ার চেষ্টার কোনো প্রয়োজন নেই। যথাযথ কোনো বিশদ বিবরণ-বিবৃতি, অভিব্যক্তি অথবা বার্তা প্রদানের চেষ্টা করারও কোনো প্রয়োজন নাই। আমাদের যেটা করা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে জাতি-উপজাতি-ধর্মীয় সম্প্রদায় ও লিঙ্গ নির্বিশেষে একটি স্বাধীন, সহমর্মী, মানবতাবাদী ও বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা গ্রহণ করার জন্য সৎ ও আন্তরিকভাবে সকল মানুষের মনে সুগভীর অনুপ্রেরণা বিস্তার করা। এই কাজটি একটি সৃজনশীল কাজ এবং কোনো বাধাহীন সহজ-সরল পথে অগ্রসর হওয়ার সুযোগও সীমিত। কিন্তু এর কোনো বিকল্প আছে বলে আমার ধারণায় আসে না। তবে এটা বুঝি যে, এই অনুপ্রেরণা হৃদয়ে প্রোথিত হলে–কবি, সাহিত্যিক, নাট্য-কলাবিদ, নাট্যশিল্পী, চলচ্চিত্রনির্মাতা, চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত কলাকুশলী ও শিল্পী, নৃত্য-কলাবিদ ও নৃত্যশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক ও সঙ্গীতশিল্পী, কারুশিল্পী, ভাস্কর এবং স্থপতিরা নিজেদের স্বাভাবিক কাজের মধ্যেই যে শিল্প সৃজন করবেন কি-না, সেটাই মানবিক বোধ ধারণ করবে এবং একজন মানবতাবাদীর কাছে অতি প্রিয় হয়ে উঠবে।
পরিশেষে এটা বুঝে নিতে হবে যে, ইতিহাসের অধ্যায়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সত্যেরও পরিবর্তন ঘটতে দেখা গেছে। কিন্তু সুন্দর তার রূপ পরিবর্তন করলেও বোধ এবং অনুভূতিতে সুন্দরের কোনো পরিবর্তন হয় না। তাই, সত্যের মধ্যে সুন্দর এর অনুসন্ধান অনেক সময় বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, সুন্দর সৃষ্টির মধ্যে সত্যের অনুসন্ধান ও প্রতিষ্ঠা করেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে। কেননা কবি, সাহিত্যিক, নাট্য-কলাবিদ, নাট্যশিল্পী, চলচ্চিত্রনির্মাতা, চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত কলাকুশলী ও শিল্পী, নৃত্য-কলাবিদ ও নৃত্যশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক ও সঙ্গীতশিল্পী, কারুশিল্পী, ভাস্কর এবং স্থপতিরা মিলিতভাবে শিল্পের সকল কর্মীরা চিন্তা-চেতনা, আবেগ ও অনুভূতিতে আমাদের সমাজের অগ্রসর অংশেরই প্রতিনিধি।
উদার পুঁজিবাদ ও মুক্ত বাজার, মানুষের মূল্যবোধের জমিনটিতে পচন ঘটিয়ে চলেছে। মাটিতে যখন পচন ঘটে তখন আর কোনো কিছুই নির্মল থাকতে পারে না। মানুষ কষ্টে আছে। তাই, অবশ্যই সমাজের অগ্রসর অংশটির সামনে পরিবর্তন সাধনের লক্ষ্যে নান্দনিক অথচ সত্য শিল্প, সাহিত্য ও সঙ্গীত সৃজনের একটি মহান দায়িত্ব এসে পড়েছে। অনুপ্রাণন এই দায়িত্বের স্থানটিকে মজবুত করে গড়ে তোলার কাজে অবিরাম প্রচেষ্টায় নিয়োজিত থাকতে চাই।
নবম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা
১৯৪৭ সালে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয় ভারতকে দ্বিখণ্ডিত করার মধ্য দিয়ে। অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও সত্য যে ব্রিটিশরাজ ভারতকে হিন্দু সংখ্যা-প্রধান ও মুসলমান সংখ্যা-প্রধান হিসেবে দুটি দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে যায়। এ-সময় বাংলার কিছু নেতা বাংলাকেও ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করতে সচেষ্ট হয়। ১৯০৫ সালে যে সব দল ও নেতা ব্রিটিশ কর্তৃক বাংলা বিভাগের বিরোধিতা করেন, তারাই ভারতের স্বাধীনতার প্রাক্কালে বাংলা বিভাগে সচেষ্ট হয়। কেননা তাঁদের বিশ্লেষণ ছিল এমন যে, বাংলা প্রদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠী শিক্ষাসহ সকল ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকলেও সংখ্যাধিক্যের জন্য মুসলমানরাই বাংলাকে শাসন করবে। যে-কারণে তাদের নেতৃবৃন্দ বাংলার একাংশ, মূলত পশ্চিমবঙ্গকে হিন্দু ধর্ম-প্রধান ভারতের অঙ্গীভূত করতে চায়। ১৯৪৬ সাল থেকেই শুরু হয় উত্তেজনা।
১৯৪৬ সালে কলকাতায় হয় মহাদাঙ্গা, যা ইতিহাসে ‘দ্য গ্রেট কিলিং’ নামে অভিহিত হয়েছে। কলকাতা দাঙ্গাই বাংলাভাগের মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই মনে করতে থাকে ভাংলা ভাগেই রয়েছে সমাধান।
ব্রিটিশরাজও রাজি হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গ ভারতে এবং পূর্ব-বাংলা হয় পাকিস্তানের প্রদেশ। উভয় বাংলা থেকেই মানুষের দেশান্তর চলতে থাকে; যা ’৪৬ সালে শুরু হয়ে ষাটের দশক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। একটি প্রদেশ যখন ভাগ হয় এবং দুই অংশ দুই দেশের অংশ হয়ে যায়, মানুষ তখন উভয় প্রদেশের মানুষ এক অংশ ত্যাগ করে অপর অংশে গমণ করে; তখন তাদের পরিচয় হয় ‘শরণার্থী’। এক দেশের মানুষ অন্য দেশে শরণার্থী হিসেবে বসবাস জন্য আবাসন, কর্মসংস্থান, লেখাপড়া, মোট কথা জীবনের সর্বক্ষেত্রে নেমে আসে চূড়ান্ত অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা।
বাংলা ভাগ নিয়ে ‘৪৬ এর ১৫ই আগস্ট থেকে ’৪৭ এর পুরো আগস্ট জুড়ে ঘটতে থাকে একটার পর একটা ঘটনা। হিন্দু-মুসলমান প্রায় সমান হওয়ার কারণে সেখানে গণভোট হলো। গণভোটে সিলেটবাসী পাকিস্তানে যোগদানের ইচ্ছা পোষণ করলেও মুসলিমপ্রধান করিমগঞ্জ মহকুমায় ১৪ই আগস্ট থেকে পাকিস্তানী পতাকা উড়লেও ৭দিন পরে মহকুমাটি কেন, কিভাবে ভারতের অন্তভর্ভূক্ত হলো? মুসলিমপ্রধান মুর্শিদাবাদ ও মালদা কেন, কিভাবে ভারতের অন্তর্ভূক্ত হলো?
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আবুল ফয়েজ, যার বাড়ি বহরমপুর তথা মুর্শিদাবাদ। ১৯৪৬ সালের আগস্টে সে পড়াশোনা করত কলকাতা মেডিকেলের প্রথম বর্ষে। তরুন ফয়েজ দাঙ্গার সম্ভাবনা আঁচ করতে পারেনি। দাঙ্গা হতে যাচ্ছে সে বুঝতে পারে ১৫ই আগস্ট যখন কলকাতা শহরে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সে কোনোক্রমে আশ্রয় নেয় মুসলিম ছাত্রাবাস- বেকার হোস্টেলে। দাঙ্গা থামলে বহরমপুরে গিয়ে জানতে পারে জলঙ্গিতে তাদের আদি পৈত্রিক নিবাস পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, তার বাবার জমি দখল হয়ে গিয়েছে। বহরমপুরেও তার জীবনাশংকা দেখা দিলে রাজশাহীতে চাচার বাসায় চলে আসে। তিন মাস পরে কলকাতায় ফিরে জানতে পারে দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির কারণে তাকে ক্লাস করার সুযোগ দেয়া হবে না। বহরমপুরেও বসবাস কঠিন হয়ে উঠলে রাজশাহীতে গিয়ে দুই বছর মেয়াদী গ্রাজুয়েশানে ভর্তি হয়। লেখাপড়া শেষে চাকরি নেয় কুষ্টিয়াতে। দুই বোনকে পর্যায়ক্রমে এদেশ নিয়ে আসে। তার মা আসতে চাইলেও সরকারি চাকুরে বাবা আসতে চায় না; উপরন্তু তার বাবা হারানো জমি উদ্ধারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এরই মধ্যে পদ্মার পানিপ্রবাহের মতো জীবনপ্রবাহও বইতে থাকে- ঘটতে একের পর এক ঘটনা। বাংলা বিভাগের সাথে সাথে ফয়েজের পরিবারও দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ে। ইতিহাসের প্রেক্ষিতে উপন্যাস লেখার কষ্টকর দিক হচ্ছে উপন্যাসের চরিত্রসমূহকে ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্তকরণ। ‘সীমান্তের দুই পারে’ সেই কাজটিই সম্পন্ন হয়েছে দক্ষতার সাথে। রাজনৈতিক ঘটনাক্রম ফয়েজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকে কিভাবে পর্যুদস্ত করে তুলল তার নির্মম অথচ নির্মোহ বয়ান লেখক উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। পরিশেষে ফয়েজের পরিবার মর্মান্তিক পরিস্থিতির শিকার হয়।
Sheemanter Dui Paree by Md. Rezaul Karim
সম্পাদকীয়-
মহান একুশে- আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও এক দুঃখিনী বর্ণমালার ইতিহাস
বাংলা ভাষা ও বাংলা বর্ণমালার উদ্ভব ও বিবর্তনের একটি স্বতন্ত্র ও মৌলিক ইতিহাস রয়েছে। আমরা জানি যে, প্রাচীন কাল থেকে পাঁচটি স্তর পার হয়ে আধুনিক বর্ণমালা এসেছে। প্রাচীনকালে কোনো বর্ণমালা ছিলো না। গাছপালা-মানুষ-প্রাণী’র ছবি এঁকে মনের ভাব প্রকাশ করা হতো। এটা হচ্ছে বর্ণমালার প্রথম স্তর- “গ্রন্থিলিপি”। আনুমানিক দশ-বারো হাজার বছর আগে মানুষ গ্রন্থিলিপি দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করতো। এরপর এলো “ভাবলিপি”- সম্পূর্ণ ছবি না এঁকে সংকেত বা চিহ্ন বা প্রতীকের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম। ভাবলিপি ছিলো অনেকটা এমন- দিন বোঝাতে পূর্ণ বৃত্ত, অর্থাৎ সূর্য আঁকা হতো, আর রাত বোঝাতে অর্ধ বৃত্তের সাথে তারকা আঁকা হতো। এরপর এলো তৃতীয় স্তর- “শব্দলিপি”, এই স্তরে ব্যাপক হারে ছবির বদলে চিহ্নের ব্যবহার হতে লাগলো। শব্দলিপি আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে এলো চতুর্থ স্তর- “অক্ষরলিপি”। অক্ষরলিপি আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে পঞ্চম স্তর হিসেবে এলো “ধ্বনিলিপি”। এই ধ্বনিলিপি থেকেই আধুনিক বর্ণমালার উৎপত্তি। সেই সময় বিভিন্ন বর্ণে বা রঙে বিভিন্ন অক্ষর লিখা হতো, সেখান থেকেই অক্ষরের নাম হয়েছে বর্ণ, বর্ণমালা।
আমাদের বাঙলা বর্ণমালা এসেছে প্রাচীন ভারতীয় “ব্রাহ্মীলিপি” থেকে। পৌরাণিক উপ-কথামতে হিন্দু দেবতা ব্রহ্মা ভারতবর্ষের প্রাচীন লিপি আবিষ্কার করেছিলেন এবং ধ্বনির সাথে মানুষকে এই লিপি দান করেছিলেন, তার নামানুসারে ঐ লিপির নাম হয় ব্রাহ্মীলিপি। কেউ কেউ বলেন, বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণরা ছিলেন শ্রেষ্ঠ পুরোহিত। ব্রাহ্মণদের দ্বারা এই লিপি আবিষ্কৃত হয়েছিল বলেই এর নাম ব্রাহ্মীলিপি। যে যাই বলুক, ভারতবাসী নিজেরাই সৃষ্টি করেছিলেন ব্রাহ্মীলিপি। ব্রাহ্মীলিপির পেছনে ফিনিশীয় লিপির প্রভাব আছে বলে দাবী করা হয়। তবে প্রাচীন ভারতীয়রা সম্ভবত স্বাধীনভাবেই নিজেদের লিপি উদ্ভাবন করেছিল- কারণ ফিনিশীয় লিপির চেয়ে ব্রাহ্মীলিপির পার্থক্য অনেক। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতক থেকে ৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে ব্রাহ্মীলিপি প্রচলিত ছিল। এরপর “অশোক লিপি” বা “মৌর্য লিপি”তে এর বিবর্তন শুরু হয়। এর পরের ধাপে আসে “কুষাণ লিপি”, এগুলি কুষাণ রাজাদের আমলে প্রচলিত ছিল। এরপর ব্রাহ্মীলিপিটি উত্তরী ও দক্ষিণী- এই দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়। উত্তরী লিপিগুলির মধ্যে পূর্বদেশীয় গুপ্তলিপি প্রধান, এটি ৪র্থ ও ৫ম শতাব্দীতে প্রচলিত ছিল। গুপ্তলিপি থেকে আবির্ভাব হয় “কুটিল লিপির”, এটি ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শতক পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। কুটিল লিপি থেকে উদ্ভব হয় নাগরী লিপির। প্রাচীন নাগরী লিপির পূর্ব শাখা থেকে ১০ম শতকের শেষভাগে এসে উৎপত্তি হয়েছে বাঙলা লিপির। অর্থাৎ ব্রাহ্মীলিপি > অশোক লিপি বা মৌর্য লিপি > কুষাণ লিপি > উত্তরী গুপ্তলিপি (পূর্বদেশীয়) > কুটিল লিপি > নাগরী লিপি > বাঙলা লিপি।
ব্রাহ্মীলিপি থেকে সৃষ্ট বাঙলা বর্ণমালা দেখতে কিন্তু এখনকার বর্ণমালার মতো ছিলো না, সময়ের পরিবর্তনে বর্ণ’র চেহারারও পরিবর্তন হয়েছে। তখন যেহেতু ছাপাখানা ছিলো না, শুদ্ধতা বজায় থাকবে কী করে? তখন মানুষ হাতে কাব্য লিখতো, পুঁথি লিখতো। একেকজনের হাতের লেখা একেকরকম, দশজন দশরকম করে “ক” “খ” লিখেছে। এভাবেই পরিবর্তিত হতে হতে পাল্টে গেছে বাঙলা বর্ণমালা। কম্বোজের রাজা নয়পালদেবের ইর্দার দানপত্রে এবং প্রথম মহীপালের বাণগড়ের দানপত্রে সর্বপ্রথম আদি বাংলা বর্ণমালা দেখতে পাওয়া যায়। ব্রাহ্মীলিপি’র প্রথম পাঠোদ্ধার করেন প্রাচ্যবিদ্যা-বিশারদ প্রিন্সসেপ। আমাদের দেশের সিলেটের উপভাষারও কিছু বর্ণমালা ছিলো, আধুনিক বাঙলা বর্ণমালা থেকে একটু আলাদা, প্রায় অবিকৃত ‘নাগরী লিপি’র মতো।
এখন পর্যন্ত তিন ধরনের ব্রাহ্মীলিপির নমুনা আবিষ্কৃত হয়েছে, যাতে ৪৪টি বর্ণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে স্বরবর্ণ ৯টি, ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৫টি। বাঙলা বর্ণমালার “ঔ” ও “ঋ” ব্রাহ্মীলিপির স্বরবর্ণে না পাওয়া গেলেও ব্যঞ্জনবর্ণে এ দুটি বর্ণের নমুনা পাওয়া গেছে। আমরা এখন যে কয়টি স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ দেখি, আগে এর চেয়ে কয়েকটি বেশি ছিলো। এই তো কিছুদিন আগেও স্বরবর্ণতে ৯ ছিলো, এখন আর ৯-এর অস্তিত্ব নেই। এর সাথে ছিলো ঋৃ। ব্যঞ্জনবর্ণতে ছিলো ল (মূর্ধন্য ল), ছিলো হ্ল (মহাপ্রাণ ল), ছিলো ব (অন্তঃস্থ ব)। যুগে যুগে বাঙলা বর্ণমালার আকার-আকৃতি বদলাতে বদলাতে মুদ্রণযন্ত্রের ঢালাই ধাতুতে তৈরি বর্ণের কল্যাণে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা বর্ণমালার স্বরূপ মোটামুটি স্থির রূপ পায়।
বাংলা বর্ণমালা একসময় ব্রাহ্মীলিপি থেকে উদ্ভূত হলেও মধ্যযুগে এসে বাংলা বর্ণমালা বাংলার স্বাধীন শাসন ব্যবস্থার মতোই স্বতন্ত্র পথ ধরে বিবর্তিত হয়ে নিজস্ব একটি মৌলিক রূপ পরিগ্রহ করে। বাংলা বর্ণমালার এসব বিবর্তনের ইতিহাসের মধ্যেও বাংলার স্বাধীন পরিচয় নির্মাণ ও পরিগ্রহণের আকাক্সক্ষা সম্পৃক্ত রয়েছে।
অথচ ১৯৪৭-এর পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের অপরাপর প্রাদেশিক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ সিন্ধি, বেলুচি, পাঞ্জাবি ও পশতু ভাষার বর্ণলিপির মতোই বাংলা বর্ণমালা পরিবর্তন করে ফারসি-আরবি অথবা ল্যাটিন বর্ণমালা ব্যবহার করে লেখার পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। বাংলা ভাষা ও বাংলা বর্ণমালা তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর ভাষা ও ভাষায় ব্যবহৃত বর্ণমালা হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যালঘু ভারতীয় মুসলমান অভিজাত শ্রেণির ভাষা ও বর্ণমালা অর্থাৎ উর্দুকেই এবং ফারসি-আরবি লিপিকেই পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ও বর্ণমালা হিসেবে চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। পাকিস্তানের সিন্ধ, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও উঃ পঃ সীমান্ত প্রদেশে এখনও শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাদেশিক ভাষা স্থান করে নিতে পারেনি। পাকিস্তানের এরকম অসভ্য, আধিপত্যবাদী, অমানবিক এবং অন্যায় পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বাঙলায় গর্জে ওঠে প্রতিবাদ কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে বাঙালির এই দাবি এবং প্রতিবাদের যুক্তি অনুধাবন করার চেষ্টা গ্রহণ না করে তৎকালীন পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বুলেটের মাধ্যমে জবাব দেওয়ার পথ গ্রহণ করে। বুকের রক্ত দিয়ে সেদিন বাঙালি তাদের মাতৃভাষা ও বর্ণমালার অধিকার আদায় করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং এই বাঙলায় বাঙলা ভাষা ও বর্ণমালা ব্যবহারের দাবি মেনে নিতে পাকিস্তানি শাসকদের বাধ্য করেছিল। এটাই ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস।
সভ্যতা, মানবতা ও ন্যায়ের পক্ষে ১৯৫২ সনে বাঙালির এই ভাষা সংগ্রাম প্রতিষ্ঠিত মানবিকতার ন্যায্য যুক্তির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে পরিচালিত ছিল বলেই এই আন্দোলন সারা বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে আজ পৃথিবীতে প্রত্যেক মাতৃভাষার মর্যাদাবোধ জাগ্রত হয়েছে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালনের জন্য জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভ করেছে।
সপ্তম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
রহস্য ও বৈচিত্র্যের মহাদেশ আফ্রিকা! দীর্ঘ এক পথ চলে গেছে দেশ হতে দেশান্তরে! সেই রহস্যে মোড়া ভূখণ্ডের প্রতিটি অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভৌগলিক বৈচিত্র্য যে কোন ভ্রমণকারী ও ভবঘুরের আগ্রহের স্থান।
“পূর্বআফ্রিকার তিনকাহন” একজন বাংলাদেশী নারী ভ্রমণকারীর পূর্ব আফ্রিকার তিন দেশ – কেনিয়া, উগান্ডা ও রুয়ান্ডা’র ভ্রমণ আখ্যান। লেখক পথ চলতে চলতে প্রাচীন ইতিহাসের মুখোমুখি হয়েছেন, দেখেছেন নানা জনপদ, জানবার চেস্টা করেছেন তাদের সংস্কৃতি, বুঝতে চেয়েছেন নানাবিধ ভাষার রহস্য। সেই সব আবেগ, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, স্বীকারোক্তি ও কৈফিয়তের হিসেবনিকেশ নিয়েই আবর্তিত “পূর্বআফ্রিকার তিনকাহন” ।
Purbaafricar Tinkahon by Eliza Binte Elahi
মা মরা মেয়ে টুনি। জন্মের সময় মাকে হারিয়েছে সে।ওর সাত ভাই, সবাই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। সবাই যে যার কাজে পৃথিবীর দুই-তিন মহাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে। টুনির বাবা এক সময় ছিলেন প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার। ছেলে মেয়েদের মানুষ করার ব্যাপারে তার কোন অবহেলা বা উদাসীনতা কখনো চোখে পড়ে নি।
বিশ বছরের চঞ্চল টুনি তার সামার ভেকেশনের সময় কাটাতে প্রতিদিনই বিভিন্ন নামের আইডি নিয়ে চ্যাট রুমে ঢুকে। একদিন অনেক ভেবে সে তার বাবার আদর করে দেয়া নামটাই সেট করে “টুনি-পাখি”!
সেদিনই পরিচয় জানে আলমের সাথে প্রথম পরিচয়। জানে আলম উপলব্ধি করে পরিবারের সবার আদরের চঞ্চল ছটফটে মেয়েটার বুকে একটা কষ্ট যেন সূক্ষ্ম কাঁটার মত বিঁধে আছে।
টুনি সামনের বছর বাবার সাথে কানাডায় যাবে বেড়াতে। জানে আলম অনেক খুশি হয়- যাক! টুনির সাথে দেখা হবে ওর! টুনি কানাডায় আসলে আর কিছুতেই ফিরে যেতে দিবে না। টুনি আলমের প্ল্যান শুনে ভীষণ লজ্জা পায়!
এবার তাই টুনি আলমকে তার অতীত জানাতে চায়। টুনির মনে হয়, নতুন সম্পর্ক শুরু করার আগে সব বলে দেয়াটা ভালো!টুনির মনে হয়, আলম মেনে নিবে ব্যাপারটা !
কিন্তু টুনি যখন আলমকে এসব বলে এর কোন প্রত্যুত্তর পায় না। টুনির চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে। হতাশায় টুনি তার ইয়াহু ম্যাসেঞ্জারের চ্যাট ডিজআ্যবল করে দেয় তক্ষুনি!
এদিকে তিন বছর পরে টুনির জীবন অনেক পালটে গিয়েছে! টুনির জীবনে আপন বলতে এখন দেশে কেউ নেই। ভাইয়া ভাবীরা যে যার মতো বিদেশে সেটেল্ড। টুনি একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে জয়েন করেছে।
পাঁচ বছর পর, টুনি ভাইয়ের ছেলের আকিকার জন্য বসুন্ধরায় টুকটাক কেনাকাটায় ব্যস্ত। এমন সময় টুনির সেল ফোনে হঠাৎ একটা অচেনা কল আসে। টুনি সাধারণত কখনোই অচেনা কল ধরে না। ৬-৭ বার একই নাম্বার থেকে রিং আসার পরে অফিস থেকে কোন জরুরি কল কিনা সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ফোনটা ধরে। অন্য প্রান্তের শুধুমাত্র “হ্যালো!” শুনেই টুনির মনে তোলপাড় শুরু হয়। বিধ্বংসী তোলপাড়!
তারপর কি হলো? এটা জানার জন্য পড়তে হবে রোমান্টিক উপন্যাস টুনি বউ।
Tuni Bou by Tamanna Chowdhury
জন্ম– ক্ষমা করো, আবার ফেরার জন্য
কেন জানতে হবে ডুবসাঁতার
স্মৃতির ভারে বরফাচ্ছন্ন নির্জন আন্দিজ
বরফের জমাট সরিয়ে তবুও নিই নিশ্বাস
কেউ তো স্মৃতি নিয়ে পালকের মতো হালকা উড়াল
তুমি অরুণিমা ঠিক উড়ছো যেমন
স্মৃতি ভার– স্মৃতি পালক
শৈশবে কেনা অনেক রঙিন ঘুড়ির কাগজ
ঠিক কতোটা ভার হলে নদীতে বসেছে
বাণিজ্যের হাট
আমিই বিক্রি করছি আমার মুখোশ
অন্তরালে তোমার মুখ
এবং প্রথম চুম্বনের শিহরন
অসম্পূর্ণ বৃন্দাবন - Osompurna Brindhabon
শফিক হাসানের দেখা বাংলার মুখ আদতে কেমন!
‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’
তারপরের কথা—‘একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশির বিন্দু’।
মনে এই খেদ যেন না থাকে, শফিক হাসান বেরিয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের নানা জায়গা প্রাণভরে দেখতে। তার বর্ণনা রম্য, সহাস্য আনন্দময় ও প্রাঞ্জল। নানা সব জায়গার ভেতরে—লালনের স্মৃতিভরা স্থান, কেওক্রাডং চূড়া, মুজিবনগর, কক্সবাজার, চট্টগ্রামের নানা জায়গা, সমুদ্র ও পর্বত, রেলযাত্রায় তূর্ণা নিশিথায় নিশিযাপন এবং জলজোছনায় ভেসে যাওয়া হাতিরঝিল—এমনি মায়াময়, সুরভিময় নানা স্থানে। আমরা যখন ফট করে বাইরে ঘুরতে যাই কখনো কি ভাবি দেশের কতটুকু দেখেছি।
না, শফিক হাসান তেমন কোনো খেদ করবেন না যেদিন বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়বেন। ‘দেখি বাংলার মুখ’ এমনই একটি গ্রন্থ। সবকিছু দেখার আগে নিজেদের দেখো। অপূর্ব। সুন্দর ঝরঝরে গদ্যে দেখার সেইসব বর্ণনা আমাদের দেশটাকে নতুন করে চেনাবে। আমি এই গ্রন্থের বহুল প্রচার কামনা করি।
সালেহা চৌধুরী
ঢাকা
মার্চ, ২০২৪
Dekhi Banglar Mukh by Shafique Hasan
স্বপ্নহীন চোখ বসন্ত খোজে না
প্রথম সাড়া জাগানো গল্পগ্রন্থ অবিনাশী আয়োজন প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাঙলা ছোটগল্পে নিজের প্রতিষ্ঠা ও সম্ভাবনা পোক্ত করেছেন মঞ্জু সরকার। অগস্ত্যযাত্রা লেখকের দ্বাদশ গল্পগ্রন্থ। কর্মজীবনে অবসর গ্রহণের পর শেষরক্ষার জন্য জন্মভূমির গ্রামে ফিরে যান নায়ক। উন্নয়নের গতিতে সেখানেও মানবিকতার অবক্ষয় এবং প্রকৃতি-পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্যয়। পরিবর্তিত গ্রামসমাজের পটভূমিতে রচিত গল্পগুলি প্রাণস্পর্শী হয়ে ওঠে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বুণন-দক্ষতায়। ফেসবুক নির্ভর এই প্রজন্মের শিকড়চ্যূত জীবনের ছায়া পড়েছে শিকড়ের রস ও সন্দেহ জাগানো ভালবাসা গল্পে। এ গ্রন্থের বড় আকর্ষণ সৌদি আরবের পটভূমিতে রচিত পাঁচটি গল্প। উদ্বাস্তু প্রবাসজীবনের অন্তরঙ্গ জীবনগাথা লেখকের গল্পভূবনের সীমা এবং স্বাদ বাড়িয়ে এনেছে নতুন মাত্রা। ক্ষমতার সঙ্গে থাকা ও বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত আত্মীয়-স্বজন গল্প দুটিতেও মূর্ত হয়ে উঠেছে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বাস্তবতা।
অগস্ত্যযাত্রা ও অন্যান্য গল্প
তন্ময় ও সুস্ময় নামের দুই জমজ ভাইয়ের কার্যকলাপ নিয়েই “আলোকিত মানুষ ” গল্পটি সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। এই দুভাই পড়ালেখায় বেশ মনোযোগী কিন্তু তাদের শিক্ষক পড়ালেখার পাশাপাশি তাদেরকে সামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার তাগিদ দেন। এক ঈদে তিনি তার শিক্ষার্থী দের প্রত্যেককে এমন এক একটা ভালো কাজ করতে বলেন, যে কাজের উজ্জ্বলতার রেশে তাদের চারপাশ আলোকিত হবে এবং তারা আলোকিত মানুষ হিসাবে পরিগণিত হবে।
সেই স্যারের আদেশমতো তারা আলোকিত মানুষ হওয়ার প্রচেষ্টা হিসাবে সমাজের অবহেলিত সমবয়সি রোজকার ময়লা নিতে আসা ছেলে রাজা আর টোকাই বাদশাকে ঈদের দিন তাদের বাসায় দাওয়াত দেয়। দুই ভাই তাদের প্রিয় লোভনীয় স্পেশাল খাবারের একটা মেন্যু তৈরি করে যেগুলো এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুগুলো কখনো টাটকা খায়নি। দোকানের শোকেসের কাচের বাইরে থেকে শুধুই চেয়ে চেয়ে দেখেছে। এই দুই জমজ ভাই তাদেরকে সেই খাবার চেখে দেখাবার প্রয়াস নেয়। এই মেন্যু ও খাবার স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ঘরে তৈরী করতে খুশিমনে এগিয়ে আসেন তাদের মা। সুস্ময় আগত সমবয়সি প্রত্যেক শিশুকে নতুন জামা, বই, খাতা, স্কুলব্যাগ আর তন্ময় তাদের অতি প্রয়োজনীয় জুতা ও স্যান্ডেল উপহার দেওয়ার পরিকল্পনা করে।
তাদের এসব পরিকল্পনা শুনে ও দেখে তাদের প্রিয় দাদু নাতিদের কাছে এই শুভকাজে নিজে অংশ গ্রহণ করার সুযোগ চান। তিনি রাজার মাকে তন্ময় ও সুস্ময়ের মায়ের সেলাই শেখার স্কুলে কাজ শেখানোর সুযোগ দেওয়র প্রস্তাব রাখেন। তিনি মনে করেন, রাজার মা ভালোভাবে কাজ শেখার পরে তাকে নতুন সেলাই মেশিন কিনে দিলে সে স্বনির্ভরতার পথে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। আর তরকারির ফেরিওয়ালা বাদশার বাবাকে তরকারির ফেরি করার সুবিধার্থে ভ্যানগাড়ি কিনে দিতে চান। এতে কষ্ট করে তাকে ঝুড়ি মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে না।
তন্ময় ও সুস্ময়ের পরিবারের মতো বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবার যদি এগিয়ে আসে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সুবিধাবঞ্চিতদের মুখে হাসি ফুটবে। পরিশেষে লেখিকার এই গল্পে বর্ণিত মানুষ গড়ার কারিগর সেই শিক্ষাককে স্যেলুট যিনি তার শিক্ষার্থীদের মাঝে আলোকিত মানুষ হবার অনুপ্রেরণা বেশ সফলভাবে জাগিয়ে তুলেছেন এবং সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করতে সফল হয়েছেন। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত। সেই শিশুদেরকে আলোকিত মানুষ হওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন পরিবারের পাশাপাশি তাদের শিক্ষকরা। এই গল্পে সেটাই লেখিকা অত্যন্ত সুন্দর ও প্রাঞ্জলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
আলোকিত মানুষ - Alokito Manush
বর্তমান বাংলাদেশে কবিতার ছদ্মবেশে যারা নির্মাণ করে যাচ্ছেন চিন্তা আর বিমূর্ত বোধের সুনিপুণ ভাস্কর্য, এমরান হাসান তাদের একজন। শিল্পিত বোধ-যাপনের ভেতর দিয়ে এমরান হাসান সৃষ্টি করেন এক অনার্য ঘরানার সাহসী ওঙ্কার। তার চিন্তানির্মাণকৌশল আপোষহীন, প্রথাবিরোধী। নিজস্ব ভাবনাগুলোকে অতিক্রম করে নতুন সত্যের জন্ম দেয় তার নির্মিত চিন্তা। জাগতিক মোহ, তৃষ্ণা আর প্রেমময় তন্দ্রাচ্ছন্নতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাঁর কবিতা। অনশ্বর বোধের সুনিবিড় তৈলচিত্রের গভীর আহ্বান ও রূপকচৈতন্যের বিমূর্ত আলোর মননশীলতা সময়ের পাঠচিন্তাকে পৌঁছে দেয় সুপ্রাচীন এক স্বচ্ছ সরোবরে।
Mohoniyo Mrittikagon by Emran Hasan
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.
























There are no reviews yet.