Additional information
| Weight | 0.450 kg |
|---|---|
| Published Year |



$ 6.18 $ 8.24
ভূমিকা
মূলত: ‘সুপ্রিয় দিনলিপি’ শিরোনামে আমার এই লেখাগুলো যে শুধুমাত্র দৈনন্দিন জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, লেখাগুলো যে আসলেই মান-সম্পন্ন, পরিশীলিত এবং এতে যে সামগ্রিকভাবে একটি স্পষ্ট বক্তব্য বা ম্যাসেজ বিদ্যমান থাকে এবং তা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতেও প্রকাশিতও হচ্ছে- এই সামগ্রিক ব্যাপারটি আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি বহু বছর পরে, ১৯৯৮ সালের দিকে যখন ‘দৈনিক ভোরের কাগজ’ এ আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। তখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এর বিবিএ (অনার্স) এর শিক্ষার্থী। এরপর জীবনের বিভিন্ন সময়ে সাহিত্য, ছোট-গল্প, বিভিন্ন ন্যাশনাল ইস্যু, উপন্যাসের সমালোচনা, বঙ্গবন্ধুর জীবনী, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন বিষয়াবলীর ওপর আমার আর্টিক্যাল ও কলামগুলো একে একে দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক ভোরের কাগজ, দৈনিক আজাদী ইত্যাদি জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হতে থাকে। দ্যাট মীনস্ সিরিয়াসলি কাউন্ট করলে আমার লেখালেখির বয়স হচ্ছে বিশ (২০) বছর। কিন্তু যেহেতু আমি প্রফেশনাল রাইটার নই, তাই আমার লেখাগুলো প্রকাশিত হয় অনিয়মিতভাবে এবং সংখ্যায় খুবই কম। ‘সুপ্রিয় দিনলিপি’ শিরোনামে এখনো আমি ক্লান্তিহীনভাবে লিখে যাচ্ছি। এই পর্যন্ত আমার সেইসব লেখা সর্বমোট ১৯টি ডায়রীতে এসে দাঁড়িয়েছে। সেখান থেকে বাছাইকৃত কিছু লেখার ‘পরিবর্ধন -পরিমার্জিত’ রূপ নিয়েই রচিত ‘সুপ্রিয় দিনলিপি (দ্বিতীয় খণ্ড)’ পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করার নিমিত্তে। গ্রন্থটিকে রূপক অর্থে মূলতঃ ‘একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ’ও বলা যায়। এই গ্রন্থটিতে প্রধানত যে সময়কালের ঘটনাবলী বিশ্লেষনাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সেই সময়কাল হচ্ছে- ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল। অদূর ভবিষ্যতে ক্রমান্বয়ে ‘সুপ্রিয় দিনলিপি’ এর- তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম খণ্ডে পরবর্তী সময়কালের ঘটনাবলী বিশ্লেষণাত্মকভাবে তুলে ধরা হবে এবং একটা পর্যায়ে এর ইংলিশ ভার্সনও বের করা হবে- এইরকম একটি প্লান আমার রয়েছে।
আমি মনে করি,
“সময়ের সাথে সাথে নিজের মন ও মেধাকে আপডেটেড রেখে ধর্মীয় কুসংস্কার, বিজাতীয় সংস্কৃতির আধিপত্য ও দৌরাত্ম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, পারস্পারিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মেধার অবমূল্যায়ন, শিক্ষা-ব্যবস্থার ভগ্নদশা, শিক্ষকদের অবমূল্যায়নসহ সামাজিক আরও নানা অসঙ্গতি, দুর্নীতি পরিহার করে বাংলাদেশের যে নিজস্ব একটি আদর্শ, ঐতিহ্য, ইতিহাস, কৃষ্টি-কালচার, সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, রাজনৈতিক মূল্যবোধ রয়েছে- সামগ্রিকভাবে তার অনুশীলন করা- বাঙ্গালী জাতি হিসেবে আমাদের সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য। ১৯৭১ সালে সবাই সময়ের প্রয়োজনে যুদ্ধ করেছিল, তখন যুদ্ধ করে দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে ‘স্বাধীন’ করাই ছিলো তখনকার সময়ের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। আর এখন আকাশ-সংস্কৃতির এই আগ্রাসনের যুগে অর্থাৎ এই সময়ের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হচ্ছেÑ ‘আলোকিত এবং একই সঙ্গে মানবিক, দেশপ্রেমিক, নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন , অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, আধুনিক মানুষ ও চাই, যাতে করে একটি উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যেÑ আমরা বাংলাদেশের সকল মানুষ একসঙ্গে কাজ করতে পারি ঠিক সেই মুক্তিযুদ্ধের মতো।
অর্থাৎ বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে একটি আত্মনির্ভরশীল, সংস্কারমুক্ত, স্বশিক্ষিত, মেধাবী, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে হলে- আমাদের সকলকে আরেকটি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবে এবং যেখানে আমাদের মূল অস্ত্র হবেÑ আমাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা ও অন্যান্য সকল জাতীয় অর্জন এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধের বহিঃপ্রকাশ! ‘আলোকিত মানুষ চাই এবং একই সঙ্গে মানবিক, দেশপ্রেমিক, নৈতিকমূল্যবোধসম্পন্ন, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, আধুনিক মানুষও চাই’- মূলত এটাই হওয়া উচিত আধুনিক বাংলাদেশ এর শ্লোগান’।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর উপকার করতে চাইলেও করা যায় না, তার চেয়ে বরং আমরা যা করতে পারি তাই যদি করি তাহলে আপনা-আপনি পৃথিবীর উপকার হয়ে যায়’।
মূলত: পাঠকের ভালো লাগা এবং ভালোবাসাই হচ্ছে লেখকের প্রত্যাশা পূরণ। আশা করি, আপনারা কখনো আমাকে এবং আমার লেখাকে সেই ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করবেন না। আমি মূলত প্রফেশনাল রাইটার নই। আমার মূল পেশা ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা’ আর নেশাÑ ‘লেখালেখি করা’। ‘পেশা’য় জড়িত না থাকলে আমার এ পৃথিবীতে জীবন-ধারণ ও অস্তিত্ব রক্ষাই দুরূহ হয়ে উঠবে কিন্তু ‘নেশা’টা আমার মাঝে-মধ্যে করলেও চলবে। ‘শিক্ষকতা’ পেশায় ব্যস্ত থাকার কারণে, এই গ্রন্থটির প্রতি হয়তবা পরিপূর্ণ মনোনিবেশ ঘটাতে পারিনি। ‘সুপ্রিয় দিনলিপি (প্রথম খণ্ড) অথবা সুপ্রিয় দিনলিপি (দ্বিতীয় খণ্ড)’ এর কোথাও যদি পাঠকেরা অতৃপ্তি কিংবা অসম্পূর্ণ ফিল করেন, তাহলে তাদের কাছে অনুরোধ- ‘আপনারা রেগুলারলি ‘সুপ্রিয় দিনলিপি’-এর পরবর্তী খণ্ডগুলো সংগ্রহ করবেন’। আশা করি, তাহলে আর কোনো অতৃপ্তিবোধ থাকবে না। উল্লেখ্য, সুপ্রিয় দিনলিপি (দ্বিতীয় খণ্ড) -এর পাঠকগণ ‘অনুপ্রাণন প্রকাশন’ থেকেই ‘সুপ্রিয় দিনলিপি (প্রথম খণ্ড)’-বইটি সংগ্রহ করতে পারবেন।
‘সুপ্রিয় দিনলিপি’ গ্রন্থটি প্রকাশের ব্যাপারে আমাকে বাংলাদেশের যে দু’জন স্বনামধন্য সাংবাদিক সবসময় সহযোগীতা ও উৎসাহ যুগিয়েছেন, তারা হচ্ছেনÑ ১. সাংবাদিক ‘সালিম সামাদ’ (বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য সাংবাদিক) যিনি ‘দি ডেইলী আওয়ার টাইমস্’ সহ আরও বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রে এ কাজ করছেন এবং তিনি ২০০৫ সালে প্রেসটিজিয়াস ঐবষষসধহ-ঐধসসবঃঃ অধিৎফ অর্জন করেন এবং একসময় ‘ইন্ডিয়া টু ডে’, ‘বাংলাদেশ অবজাভার’, ‘বিবিসি’সহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ঈড়ৎৎবংঢ়ড়হফবহঃ ধহফ জবঢ়ড়ৎঃবৎ হিসেবে কাজ করেছেন এবং ২. সাংবাদিক ‘রাশেদ রউফ’ যিনি বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় দৈনিক ‘দৈনিক আজাদী’র সহযোগী-সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত। তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য শিশু-সাহিত্যিক এবং কবি। তিনি ২০১৬ সালে ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন।
এ গ্রন্থটির প্রচ্ছদ নির্বাচন করেছেনÑ সাংবাদিক, কবি ও শিশু সাহিত্যিক ‘রাশেদ রউফ’ এবং গ্রন্থটি প্রকাশনা করেছেন ‘অনুপ্রাণন প্রকাশন’। হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে সাংবাদিক ‘সালিম সামাদ’, ‘রাশেদ রউফ’ এবং ‘অনুপ্রাণন প্রকাশন’ এর কর্ণধারসহ সকল কলাকুশলীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
ফারহানা আকতার
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ
১৫ জানুয়ারি ২০২০
| Weight | 0.450 kg |
|---|---|
| Published Year |
১৯০৬ সাল থেকে রচিত মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ী ক্ষুরধার গানগুলো নিয়ে কাজ করার তীব্র অনুভবে তাড়িত হই। গান নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা না-করার অভাব থেকে এ গবেষণার জন্ম। সুযোগ আসে ২০০৯ সালে। তা অবশ্য কিছু দূর এগোনোর পর শেষও হয়ে যায়। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আবার কাজটি শুরু হয় সরকারি অর্থায়নে। তখন নতুন করে সাজাই ফেলোশিপ গবেষণার সূচিপত্র।
আগে চেয়েছিলাম সময়ক্রমে গবেষণা কাজটা করতে; পরে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণা-সৃষ্টিতে দেশাত্মবোধক গানের ভূমিকা (১৯৪৭-৭১)’ গবেষণার অধ্যায় বিভাজন করি—
ভূমিকা, দেশাত্মবোধক গানের পটভূমি, ১৯৪৭-৫২ সনের ভাষা আন্দোলন পর্বের গান, ১৯৬৯-৭০ সনের গণ-অভ্যুত্থান পর্বের গান এবং ১৯৭১ সনে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ পর্বের গান।
তবে শেষের পর্বটিতে তিনটি সেমি-পর্ব যুক্ত হয়—প্রেরণামূলক বঙ্গবন্ধুর গান, সংগ্রামে-সংগীতে নারীর অবদান এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান।
গ্রন্থটিতে ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন এবং নজরুল স্বরলিপিকার সুধীন দাস এবং বিশিষ্ট গণ সংগীতশিল্পী শুভেন্দু মাইতি (যিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অর্থ সংগ্রাহক ছিলেন)—তিন বিশিষ্ট জনের সাক্ষাৎকার সংযোজিত হয়েছে। প্রায় ৯০০টি দেশপ্রেরণামূলক গানের তালিকা দেয়া হয়েছে।
গবেষণার দীর্ঘ পথে অনেক বাঁধার সম্মুখীন হই। তবে ধৈর্য ধারণ করে সবটা সহ্য করেছি; গবেষণা কর্মের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে। পরম করুণাময়ের অপার কৃপায় কাজটি শেষ করতে পেরেছি। তিনি সর্বোতভাবে সাহায্য করেছেন; সে প্রমাণ প্রতি মুহূর্তেই পেয়েছি। বাকিটা বিবেচনার ভার সম্মানিত পাঠকদের।
ফেলোশিপ গবেষণাটির প্রকল্প পরিচালক হিসেবে সার্বিক দায়িত্বে ছিলাম আমি।
যাদের আন্তরিকতা, সহযোগিতা পেয়েছি, তারা হলেন—
শ্রী গোবিন্দলাল দাস, শ্রী করুণাময় অধিকারী, জনাব ড. মূহ: আব্দুর রহীম খান, লিপিকা ভদ্র, সঞ্জয় কুমার বণিক, মল্লিকা দাস, ড. সাইম রানা, ড. সেলুবাসিত, ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন (গিয়াস শামীম), ড. রঘুনাথ ভট্টাচার্য, আবদুল মতিন, সুধীন দাস, শুভেন্দু মাইতি, মোবারক হোসেন খান, সেলিম রেজা প্রমুখ সুহৃদগণ। সবাইকে কৃতজ্ঞ-চিত্তে স¥রণ করছি।
সময়ে-অসময়ে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় যাদের, তারা হলেন আমার পূজনীয় শিক্ষক—ড. সাঈদ-উর রহমান এবং অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক।
গবেষণা কাজটির মূল্যায়ন করেছেন আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক। তার আশীর্বাদকে ভক্তি জানাই।
‘মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম’-এ প্রেরণাদায়ী গানগুলোর যাদুমন্ত্রে যুদ্ধ জয়ের নেশায় বীর বাঙালি দুর্বার গতিতে ছিনিয়ে এনেছে স্বাধীনতা।
সেই গানগুলোর পটভূমি এবং গানগুলো সম্পর্কে সকলে জানতে পারবেন যার সহযোগিতা, সহমর্মিতায় তিনি—অনুপ্রাণন প্রকাশনের সত্ত্বাধিকারী আবু এম ইউসুফ ভাই। এই ফেলোশিপ গবেষণা ও সমীক্ষা ধর্মীগ্রন্থটি অনুমোদন ও প্রকাশের উদ্যোগ নেবার জন্য তার প্রতি অপরিসীম আন্তরিকতা প্রকাশ করছি। ২০২০ সালের বইমেলার বই-প্রকাশনার সীমাহীন ব্যস্ত সময়ের মধ্যেও গ্রন্থটির নামকরণ করে তিনি কৃতজ্ঞাপাশেবদ্ধ করেছেন।
ড. শিল্পী ভদ্র
ঢাকা।
মুক্তি-সংগ্রামের গান
জন্ম ২ জানুয়ারি ১৯৮৩ নোয়াখালীতে। ২০০০ সালের মাঝামাঝিতে লেখালেখিতে সচেতনভাবে মনোযোগী হন। সিরিয়াস লেখার পাশাপাশি রম্য রচনাও করেছেন। পেশায় পা-ুলিপি সম্পাদক এবং সাংবাদিক।
গল্পকথায় ৩৫ গল্পকার
Katatarer Epar-Opar
Hundred Faces Of Women
১৯৫৮ সালে জিম ম্যাকিনলি নামের এক আমেরিকান মিশনারি কার্যক্রম চালানোর উদ্দেশ্যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে সপরিবারে ফেনী অবস্থানকালে পাক বাহিনীর অতর্কিত বিমান হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিল তাঁর পরিবার। সুযোগ পেয়েও তিনি পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ ত্যাগ করতে রাজি হননি। নিজের জীবন বাজি রেখে বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের ফসল ৮ মাসের দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত ‘ডেথ টু লাইফ’। নাহার তৃণার বাংলা রূপান্তর ‘মৃত্যু পেরিয়ে জীবন’। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকার মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিলেও সেদেশের অসংখ্য হৃদয়বান মানুষ নিজ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বাঙালিদের জন্য খুলে দিয়েছিলেন উদারতা ও মমত্বের দুয়ার। ম্যাকিনলি রচিত এই স্মৃতিকথা তারই এক অনন্য উদাহরণ।
Mrittu Periye Jibon By JIm Mckinley, Translated By Nahar Trina - এক আমেরিকান মিশনারির একাত্তরের স্মৃতি
ভূমিকা
১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে সক্রিয় প্রচার-কর্মী, বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচন ছিল বাঙালি জাতির চূড়ান্ত মুক্তির লড়াইয়ের প্রস্তুতি পর্ব। বাংলার গণমানুষের মুক্তির অগ্রদূত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর বাসভবন ৩২ নম্বর ধানমন্ডিই হয়ে ওঠে বাঙালি জাতির মূল ঠিকানা। অধীর আগ্রহে জাতি, দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় যেমন বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ৭০-এ নৌকায় আমাকে ও আওয়ামী লীগকে ভোট দাও, আমি তোমাদের চূড়ান্ত বিজয় এনে দিব। তাই জাতির বিজয়ের স্বাদের অপেক্ষায় ’৭১-এর অগ্নিঝরা মার্চ-বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির উদ্দেশে নির্দেশনা দেন। শহর-বন্দর, গ্রামগঞ্জে সর্বত্র শত্রুর বিরুদ্ধে প্রস্তুত হওয়ার জন্যÑ যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক এবং এলাকায় এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গঠনের নির্দেশ দিলেন। আমি আমাদের এলাকায় শরণখোলা থানা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের কর্মী। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাÑ মাতৃভূমি হানাদারমুক্ত করতে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। আমাদের দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবনে মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী সংগঠিত হয়। অতঃপর সুন্দরবনে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা ঘাঁটি গড়ে ওঠে। বিশাল মুক্তিবাহিনীর দল, মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনের তত্ত্বাবধানে অস্ত্র চালানো যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শুরু হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে যা সুন্দরবন সাবসেক্টর হেডকোয়ার্টার হিসেবে পরিচিত। আমি সুন্দরবন সাবসেক্টর অঞ্চল সুন্দরবন মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেই। বগী মুক্তিবাহিনীর রিক্রুটিং সেন্টারে রিক্রুট হই নিয়মিত যোদ্ধা হিসেবে। এখানে পহেলা অক্টোবরে পাঞ্জাবীর গানবোট প্রতিরোধ সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হাবিলদার আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করি। এরপরে সুন্দরবন মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্প হয়লাতলা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। তখন ওই ক্যাম্প ইনচার্জ কমান্ডার ছিলেন এম. আফজাল হুসাইন, আমাদের প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন বীরপ্রতীক আলী আহমে¥দ খান। অতঃপর হানাদার শত্রুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেই। বিশেষ করে সাবসেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনের নির্দেশে শেখ শামসুর রহমানের কমান্ডে সুন্দরবন নারকেলবাড়িয়া অ্যান্টি স্মাগলিং স্কোয়াডে যোগ দেই। মহান মুক্তিযুদ্ধে আমার অংশগ্রহণ ও ভূমিকা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ গর্ব ও সৌভাগ্যের বিষয়।
একাত্তরের সুন্দরবন
লেখকের কথা-
পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। এর দ্বারা একটি সময়ে সংঘটিত নানান ঘটনার বিশ্লেষণ করা যায়। তাই, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও বহুমুখী দিকগুলো অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করতে সেই সময়ে প্রকাশিত পত্রিকার রিপোর্টগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।
২০১৬’র নভেম্বরে দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক আশফাক ভাই একদিন বললেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষ ১৭ দিনে (ডিসেম্বর ০১ – ডিসেম্বর ১৭) আন্তর্জাতিক পত্রিকায় প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক রিপোর্টগুলোর অনুবাদ নিয়ে একটি ধারাবাহিক সিরিজ করে দেয়ার জন্য। শুনেই আমি রাজি হয়ে যাই। দৈনিক ইত্তেফাকে ২০১৬’এর ০১ ডিসেম্বর হতে ১৫ ডিসেম্বর (১৪ ডিসেম্বর বাদে) পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ১৪টি রিপোর্টের অনুবাদ প্রকাশ হয়েছিল।
এই বইতে সেই ১৪টি রিপোর্টের অনুবাদ সহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মোট ২০টি রিপোর্টের অনুবাদ রয়েছে। ডিসেম্বর ০১-১৭ এর ১৮টি রিপোর্ট ও মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় মার্চের ০২ টি রিপোর্টের অনুবাদ সংযুক্ত হলো।
অনুবাদগুলো ভাবানুবাদ এবং পত্রিকার রিপোর্টগুলো মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টের সংগ্রহশালা হতে সংগ্রহীত।
এই অনুবাদ রিপোর্টগুলো বই আকারে প্রকাশের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন সহযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টের সভাপতি শান্তা আনোয়ার।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের শেষ ১৬ দিন
জন্মের শহর : সিলেট।
বেড়ে ওঠা : সিলেট, রাঙ্গামাটি, চট্টগ্রাম।
স্কুল জীবন থেকে লেখালেখির শুরু, কবিতা আর রবীন্দ্রনাথকে ভালোবেসে।
এক সময় মনে হয়েছিল বিপ্লব করবেন তাই নামের আগে যুক্ত করেছিলেন ‘আসাবিক’ অর্থাৎ ‘আমি সারকারখানা স্কুলে বিপ্লব করবো’।
কিছুদিন আন্ডারগ্রাউন্ড সাহিত্য পত্রিকায় লেখালেখি চলছিল।
গদ্য পদ্য দুটোতেই দৌড়-ঝাঁপ। আবৃত্তি খুব প্রিয় বলে কবিতার সুষমা, শব্দ-উপমা, চিত্রকল্পের বেসুমার লাগামহীন টানই হয়তো আলাদা করে রাখে অপরাহœ সুসমিতোকে, ভিন্নতায়।
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও কানাডায় প্রোগ্রামিং নিয়ে পড়াশোনা কবিতার রম্য প্রেম থেকে তাকে আলাদা করে রাখতে পারেনি।
লালমনিরহাটে বছর পাঁচেক ম্যাজিস্ট্রেসি করেছেন। ত্রাণ মন্ত্রণালয়েও কিছুদিন। এখন কানাডার মন্ট্রিয়ল শহরে কাজ করেন, খান। লেখালেখির বাইরে আবৃত্তি, অভিনয়, টেলি-জার্নাল, বড়দের-ছোটদের নিয়ে নানা রকম সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে সমান আগ্রহ। এক সময় গ্রুপ-থিয়েটার করতেন। একটা শর্ট ফিল্মে অভিনয় করেছেন।
বিদেশ ভ্রমণ: ভারত, নেদারল্যা-স, কানাডা ও আমেরিকা।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : তুমি পারো, ঐশ্বর্য (২০১০), রাষ্ট্রপতির মতো একা (২০১৪)
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : চিড়িয়াখানা বা ফেসবুক ও অন্যান্য গল্প (২০১৬)
মিরর
লেখকের কথা
প্রতিটি মানুষের জীবনেই রয়েছে অজস্র গল্প। গল্প ছাড়া মানুষের জীবন হতেই পারে না! আর সেইসব গল্প বাস্তবতার- আদৌ কল্পনার নয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের নানা রকম সম্পর্ক গড়ে ওঠে শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। গল্পগুলো সেই সম্পর্কজাত। যা জীবদ্দশায় ভুলে যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। যারা লিখতে পারেন তারা চেষ্টা করেন সেইসব জীবনস্মৃতির গল্পগুলোকে জনসম্মুখে তুলে ধরতে লেখনীর মাধ্যমে। আর যারা লেখায় অভ্যস্ত নন, তারা নিভৃতে মনের ভেতরে সেসব লালন করেন এবং সময়-সুযোগ পেলে অন্যকে বলেন। অনেক লেখক আছেন যারা বিভিন্ন সময় নানা চরিত্রের মানুষের কাছ থেকে তাদের জীবনে অর্জিত অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতার গল্প, দুঃখ-বেদনার গল্প, হাসি-খুশির ঘটনা, বিয়োগান্তক কাহিনী ইত্যাদি শুনে উপন্যাস বা গল্পে রূপ দেন।
সাধারণ মানুষ বলি আর বিশিষ্টজন বলি; লেখক বলি আর শিল্পী বলি- তাদের জীবনের গল্পগুলো সাধারণ গল্প নয় বলেই গণমাধ্যমে বা পাঠ্যপুস্তকে সেগুলো প্রকাশিত হয়ে থাকে। শিক্ষামূলক গল্পের যেমন শেষ নেই তেমনি প্রেম-ভালোবাসা, ব্যর্থতা, আশা-নিরাশা, বিচ্ছেদ, লড়াইমুখর গল্পেরও সীমা-পরিসীমা নেই। সেসব জীবনস্মৃতির গল্প পড়ে আমরা বিচিত্র চরিত্র, চিন্তা ও মন মানসিকতার মানুষকে চিনতে, জানতে পারি। এর মধ্যে অনেক গল্পই আছে সাহিত্যরসে টইটুম্বুর- রোমান্টিক, ভাবনার উদ্রেককারী এবং শিক্ষামূলক।
গল্প সাধারণত দুধরনের বলা যায়, এক হচ্ছে, বানানো গল্প বা কল্পলোকের গল্প। দুই হচ্ছে, জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার বাস্তব গল্প। বানানো গল্পগুলোর চেয়ে জীবনস্মৃতির গল্পগুলো বেশি নাড়া দেয় মানুষ তথা পাঠককে। কারণ সেইসব গল্প অনেক মানুষের জীবনের গল্প। বানানো গল্প যেভাবে সুন্দর ভাষা ও অলঙ্কারে আদর্শ চিত্রকলার মতো করে প্রকাশ করা হয়, জীবনস্মৃতির বাস্তব গল্পগুলো সেই রঙে আঁকা সম্ভব হয় না। এতে করে গল্পের প্রাণ হারিয়ে যায়, সংবেদনশীলতা শীতল হয়ে পড়ে। হারিয়ে যায় আকর্ষণও। বানানো গল্প মনে থাকে না, যদি না তাতে বাস্তবতার নোনাজলের ধারা প্রবাহবান থাকে।
মানুষ হিসেবে আমিও ব্যতিক্রম নই। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আমার এই ষাট ছুঁইছুঁই বয়সে বহু ঘটনার সঙ্গে বেড়ে উঠেছি, অর্জিত হয়েছে বিস্তর অভিজ্ঞতা। কত চরিত্রের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটেছে তার হিসেব নেই। সেইসব ঘটনা অমূল্য স্মৃতি এবং অকাট্য সম্পর্ক। এই সম্পর্ক এতই অম্ল-মধুর যে, পড়ন্ত বেলায় এসে যতই ভাবি ততই নিজেকে ফিরে ফিরে দেখার সাধ জাগে, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে যুগপৎ আনন্দিত এবং বিষণ হই। জীবনস্মৃতির সেইসব অজানা গল্পগুলোই পড়ে অনেকে নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নেন। যুগ যুগ ধরে এটাই সাহিত্যে চলে আসছে। এভাবে কালজয়ী, রসোত্তীর্ণ গল্পও আমরা অনেক পেয়েছি। ভবিষ্যতেও পাব।
জীবনস্মৃতির এই গল্পগুলো ‘সম্পর্ক’ শিরোনামে একটি গল্পসংকলনে পত্রস্থ করে স্বনামধন্য প্রকাশনা সংস্থা ‘অনুপ্রাণন প্রকাশন’ ঢাকা প্রকাশ করে আমাকে চিরঋণী করেছেন। আশা করি গল্পগুলো পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেবে।
‘অনুপ্রাণন’কে জানাই অন্তঃস্থল থেকে অজস্র ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
প্রবীর বিকাশ সরকার, টোকিও.জাপান, ৭, অক্টোবর, ২০১৭
জীবনস্মৃতির গল্প সম্পর্ক
প্রত্যেক মানুষের জীবনে স্মৃতি থাকে। স্মৃতি মানেই ঘটনা। অমøমধুর, বেদনাবিধুর যতো ঘটনা ঘটে মানুষের জীবনে সে-সবই স্মৃতি।
স্মৃতি- স্মৃতিকাতর করে অর্থাৎ নস্টালজিক করে তোলে মানুষকে। স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্ক থাকে মানুষের। তারা নানা মুখাবয়বের, নানা পেশার এবং নানা চরিত্রের। আবার তাদেরকে ঘিরে আরও অনেক মানুষের সম্পর্ক জড়িত থাকে। আর এই নিয়েই মানবজীবন।
আমার জীবননৌকোও অগণন স্মৃতিসম্ভারে ভরপুর, সজ্জিত। বিশেষ করে, আমার শৈশব থেকে যৌবনের উত্থানকালের ২৪-২৫টি বছরের অসংখ্য স্মৃতি আছে, যেগুলো নিয়েই এই আত্মজৈবনিক উপন্যাস “অতলান্ত পিতৃস্মৃতি” গ্রন্থটি। আমার এই সময়টাকে আমি যাঁর চোখ দিয়ে ফিরে দেখতে চেয়েছি তিনি আমার জন্মদাতা পরম শ্রদ্ধেয় পিতা। যা কিছু ঘটেছে, যা আজকে স্মৃতি- সবকিছুরই সাক্ষী আমার বাবা। আর সেখানেই পিতা-পুত্রের সম্পর্কটা সৃষ্টি হয়েছে। কী সেই সম্পর্ক? সেই সম্পর্ক যা সহজে লেখা যায় না। না পড়লে তা জানাও যাবে না।
পড়ার পর হয়তো অনেকেই মিলিয়ে দেখবেন তাঁদের জীবনের সঙ্গে, কেউ কেউ বিষণœও হতে পারেন। কেউ কেউ পড়ে বিস্মিত হবেন! আবার কেউবা ক্ষোভ প্রকাশ করবেন, ক্ষুব্ধ হবেন। কিন্তু যা সত্য, তাই তুলে ধরতে গিয়ে আদৌ কার্পণ্য করিনি। কাউকে ছোটও করিনি, কাউকে বড়ও করিনি। মানুষ হিসেবে এখানেই আমার সীমাবদ্ধতা, পরিপূর্ণতা এবং তৃপ্তি বলে মনে করি।
অতলান্ত পিতৃস্মৃতি
ননসেন্স সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ সম্ভবত শৈশব থেকে। ১৯৭০-এর দশকে সুকুমার রায়ের সাথে সম্যক পরিচয়ের পর তা বিশেষ আকর্ষণে পরিণত হয়। ৯০-এর দশকের প্রথম দিকে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার আগে লিমেরিকের সাথে জানাশোনা অল্পই ছিল। ফিরলাম এডওয়ার্ড লিয়ারের লিমেরিক এবং আরও অন্য অনেক ‘ননসেন্স’ পদ্য হাতে করে। পরে শুরু হয় তার থেকে অনুবাদের চেষ্টা। লিয়ারের লিমেরিক ছাড়া অন্য লিমেরিকও হাতে আসে। তার থেকেও চলে বঙ্গানুবাদ।
বঙ্গানুবাদের পাশাপাশি নিজের লিমেরিক লেখাও চলতে থাকে। তার থেকে কিছু লিমেরিক এখানে ছাপা হল। সুখ ও স্বাস্থ্যের জন্য হাসি বা আনন্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এই লিমেরিকগুলি যদি পাঠকের জন্য কিছু হাসি বা আনন্দের জোগান দিতে পারে তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করব।
-হোসাইন রিদওয়ান আল খান
১ জুলাই, ২০১৮
খ্যাংড়া ঠ্যাঙা চিমশে ঢ্যাঙা
সম্পাদকীয়-
অনুপ্রাণন: বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের পথ-পরিক্রমা
অনুপ্রাণনের পক্ষ থেকে ছোটগল্পের এই বিশেষ আয়োজন বা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশকে কেন্দ্র করে প্রথমেই যে প্রশ্নটা উঠতে পারে যে, কোনটাকে আমরা ছোটগল্প বলবো? বিশ্বসাহিত্যে কথাসাহিত্যের বিশেষ ধারা ছোটগল্পের সংজ্ঞা ও ধারণার মাঝে যেভাবে বদল হয়েছে বাংলা সাহিত্যে ঠিক সেভাবে হয়নি।
বাংলা সাহিত্যে কথাসাহিত্যের বিশেষ ধারা ছোটগল্পের আবির্ভাব ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। বহুল স্বীকৃত ধারণা এটাই যে, ছোটগল্প বলতে সাধারণত তাকেই বোঝায় যে কথা বা কাহিনী যা আধঘণ্টা থেকে এক বা দু’ঘণ্টার মধ্যে এক নাগাড়ে পড়ে শেষ করা যায়। কিন্তু গল্প বা উপন্যাস আকারে ছোট হলেই কী তাকে ছোটগল্প বলা যাবে? না, কারণ আমরা এটা বোঝার চেষ্টা করেছি যে, ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এতে বিন্দুতে সিন্ধুর বিশালতা থাকতে হবে, অর্থাৎ অল্প কথায় অধিক ভাব ব্যক্ত করতে হবে। উপন্যাসের সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য এখানেই। ছোটগল্পে উপন্যাসের বিস্তার থাকে না, কিন্তু থাকে ভাবের গভীরতা ও ব্যাপকতা। উপন্যাস পড়ে পাঠক পরিতৃপ্তি লাভ করে, কিন্তু ছোটগল্প থেকে পায় কোনো চিন্তা অথবা কোনো ভাবের শক্তিশালী ইঙ্গিতমাত্র। কাহিনীর কোনো বিশেষ রূপ বা কোনো বিশেষ অংশকে অবলম্বন করে ক্ষুদ্র কলেবরে নিগূঢ় ভাব অথবা চিন্তা যেখানে নিগূঢ় সত্যের ব্যঞ্জনার সার্থক অবস্থান থাকে তবে এর মাঝেই ‘ছোটগল্প’ সার্থকভাবে হয়ে উঠতে পারে।
ছোটগল্পের প্রকৃতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) তাঁর ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায় যা বলেছেন, সেই সংজ্ঞার মাঝে ছোটগল্প আর আবদ্ধ নেই। কেননা ছোটগল্প ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা ছোট ছোট দুঃখকথা, নিতান্তই সহজ সরলের মাঝে আর আবদ্ধ নেই। তবে ঐ যে ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’ কথাটা হয়তো থাকবে বহুকাল যতদিন ছোটগল্প দ্রুপদী সত্যেকে লতিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টায় নিয়োজিত থাকবে।
বিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত রচিত ছোটগল্পগুলোকে বিষয়বস্তুর দিক থেকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যেমন:
১) প্রেমের গল্প, ২) সামাজিক গল্প, ৩) ঐতিহাসিক গল্প, ৪) প্রকৃতি ও মানুষ সম্পর্কিত গল্প, ৫) রূপক বা সাঙ্কেতিক গল্প, ৬) অতিপ্রাকৃত, ৭) ব্যঙ্গ বা হাস্যরসাত্মক, ৮) মনস্তাত্ত্বিক গল্প, ৯) গার্হস্থ্যবিষয়ক গল্প, ১০) বিজ্ঞানবিষয়ক গল্প, ১১) উদ্ভট গল্প, ১২) মনুষ্যত্বের প্রাণিবিষয়ক গল্প, ১৩) বস্তুনিষ্ঠ গল্প, এবং ১৪) বিদেশি পটভূমিকায় রচিত গল্প।
যদিও বাংলা ছোটগল্পের প্রথম আভাস পাওয়া যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪)—যুগলাঙ্গুরীয় (১৮৭৪) ও রাধারাণী (১৮৭৫) গল্পে এবং পরে যোগ দেন পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৪-১৮৮৯), ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৪৭-১৯১৯), স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫-১৯৩২) ও নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত; কিন্তু প্রকৃত অর্থে বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক ছোটগল্পকার হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ‘দেনা-পাওনা’ (১৮৯০) গল্পটিই প্রথম সার্থক ছোটগল্প হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক ছোটগল্পকারদের মধ্যে প্রথমেই উল্লেখযোগ্য কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৬৩-১৯৪৯) নাম। এর পরের ছোটগল্পকার হলেন প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬), প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (১৮৭৩-১৯৩২), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৭৬-১৯৩৮), চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯৩৮), মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৮৮-১৯২৯), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০০-১৯৭৬), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৫-১৯৫৬), প্রবোধকুমার সান্যালের (১৯০৫-১৯৮৩) ইত্যাদি কথাসাহিত্যিকদের নাম উল্লেখযোগ্য।
বিভাগ-পূর্বকালে ছোটগল্প রচনায় খ্যাতি লাভ করেছিলেন এমন আরো কয়েকজন লেখক হলেন—দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার, রাজশেখর বসু, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, মনোজ বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সৈয়দ মুজতবা আলী প্রমুখ।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের সাহিত্যে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, অল্পকালের মধ্যেই এ-দেশীয় লেখকদের সৃষ্টিশীল রচনায় তা পূর্ণ হয়ে ওঠে। সাহিত্যের অপরাপর শাখার মতো ছোটগল্পের শাখাটিও ক্রমাগত ঋদ্ধতর হয়।
বাংলাদেশে ছোটগল্প রচনার ধারা বেগবান হয় চল্লিশের দশকে। এ সময় গল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে গৃহীত হয় গ্রাম ও নগর জীবনের কাহিনী। অনেক গল্পে স্থান পায় দেশবিভাগের মর্মান্তিক পরিণতি। আবার দেশ বিভাগের আগেকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও তেতাল্লিশের মন্বন্তরও কোনো কোনো গল্পের উপজীব্য হয়। আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯), আবু রুশদ (১৯১৯-) এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১) ছোটগল্পের প্রথম পর্বের তিন খ্যাতিমান লেখক। আবুল মনসুর প্রধানত হাস্যব্যঙ্গাত্মক অথচ গভীর সমাজমনস্ক ছোটগল্পের রচয়িতা। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ভ-ামি তাঁর তীক্ষè সমালোচনার লক্ষ্য। প্রায়শ সমাজবিরোধী ব্যক্তিরা তাঁর গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়েছে। আবু রুশদ ছোটগল্পে নগরজীবনের প্রথম সার্থক ভাষ্যকার। নাগরিক জীবনের জটিলতা এবং দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তিনি বহু গল্প রচনা করেছেন। বাংলাদেশের গ্রাম, এর পশ্চাৎপদতা, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ইত্যাদি বিষয় বাঙময় হয়ে উঠেছে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গল্পে। এ সময়ের আরও দুজন গল্পকার ফজলুল হক (১৯১৬-১৯৪৯) ও সোমেন চন্দ (১৯২০-১৯৪২) গল্প রচনায় অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।
পঞ্চাশের দশকে পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সাহিত্যজগতে লক্ষ করা যায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি। পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে বাঙালির আত্মচেতনার বিকাশ ঘটে ১৯৫২-এর ভাষা-আন্দোলনে। এর ফলে তখন সমাজ ও সাহিত্য উভয়ই প্রবলভাবে আলোড়িত হয়। ভাষা-আন্দোলনের পরের বছরই এর গৌরবময় স্মৃতিকে ধারণ করে কবি হাসান হাফিজুর রহমানের (১৯৩২-১৯৮৩) সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় একুশের সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারি। এতে সমকালীন সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অবদান উপস্থাপিত হয়। এর অনুসরণে পরবর্তীকালে বহুসংখ্যক পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। সমকাল, কণ্ঠস্বর, পূর্বমেঘ, উত্তরণ, ছোটগল্প, পূর্বপত্র, সাম্প্রতিক, গণসাহিত্য, বিপ্রতীপ প্রভৃতি একুশে ফেব্রুয়ারিই সার্থক উত্তরাধিকারী। এ চেতনায় ছোটগল্পও সমৃদ্ধ হতে থাকে প্রচুর গল্পকারের লেখনী-প্রভাবে।
এ সময় ছোটগল্পে নবীন-প্রবীণ লেখকদের হাতে বিচিত্র বিষয়ের রূপায়ণ ঘটে। ইব্রাহীম খাঁ (১৮৯৪-১৯৭৮), মাহবুব-উল আলম (১৮৯৮-১৯৮১), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩), আবু জাফর শামসুদ্দীন (১৯১১-১৯৮৮), শওকত ওসমান (১৯১৭-১৯৯৮), সরদার জয়েনউদ্দীন (১৯১৮-১৯৮৬), আবদুল হক (১৯১৮-১৯৯৭), শামসুদ্দিন আবুল কালাম (১৯২৬-১৯৯৮), আবু ইসহাক (১৯২৬-২০০৩), আশরাফ সিদ্দিকী (১৯২৭-), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯), জহির রায়হান (১৯৩৩-১৯৭২) প্রমুখ এ সময়কার উল্লেখযোগ্য গল্পকার। এঁদের মধ্যে বিষয়বৈচিত্র্যে, শিল্পচেতনার অনন্যতায় এবং প্রকাশভঙ্গির প্রাতিস্বিকতায় উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠেন শওকত ওসমান ও আলাউদ্দিন আল আজাদ। এ দুজনের মাধ্যমেই পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের ছোটগল্প অর্জন করে সামাজিক বাস্তবতার এক নতুন মাত্রা। গ্রামীণ ও শহুরে জীবন চিত্রণে এবং বিচিত্র চরিত্র নির্মাণে শওকত ওসমানের কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। আলাউদ্দীন আল আজাদের মধ্যে দুই বিপরীতধর্মী শিল্পচেতনার সমন্বয় লক্ষণীয়। নরনারীর মনোজাগতিক বিশ্লেষণে, যৌনতা চিত্রণে এবং সামাজিক চরিত্র উন্মোচনে আজাদ সমান দক্ষতার পরিচয় দেন।
এ প্রসঙ্গে আরও দুজন গল্পকারের দুটি গল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—শাহেদ আলীর ‘জিবরাইলের ডানা’ (জিবরাইলের ডানা, ১৯৫৩) এবং মাহবুব-উল আলমের ‘মফিজন’ (মফিজন, ১৯৫৪)। গল্প দুটিতে মানুষের অভাবক্লিষ্ট জীবন, ধর্মের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক শোষণ, সামাজিক নিষ্ঠুরতার প্রেক্ষাপটে নারীর হৃদয়বৃত্তির প্রকাশ এবং গ্রামবাংলার অবহেলিত নারীসমাজকে সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিক মর্যাদাদানের বিষয় চমৎকারভাবে চিত্রিত হয়েছে। এভাবে ভাষা-আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়ে ছোটগল্পে সমাজ ও জীবনের স্বরূপ নানাভাবে প্রতিফলিত হতে থাকে; বিভিন্ন গল্পে প্রচারিত হতে থাকে মানবতাবাদ, সমাজসচেতনতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা।
ষাটের দশক থেকে ছোটগল্পের দুটি বিশেষ দিক লক্ষণীয় হয়ে ওঠে: সমকালীন ঘটনার ব্যাপক প্রতিফলন এবং ব্যক্তিসত্তার বিভিন্নমুখী বিশ্লেষণ। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্র ও সমাজ তরঙ্গবিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৯৫৮-এর সামরিক শাসন, ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের ছোটগল্প। লায়লা সামাদ (১৯২৮-১৯৮৯), সুচরিত চৌধুরী (১৯২৯-১৯৯৪), আবদুল গাফফার চৌধুরী (১৯৩১-), হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-১৯৮৩), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-), শওকত আলী (১৯৩৬-), জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত (১৯৩৯-), হাসান আজিজুল হক (১৯৩৯-), হাসনাত আবদুল হাই (১৯৩৯-), রাহাত খান (১৯৪০-), আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-), আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭), সেলিনা হোসেন (১৯৪৭-) প্রমুখ গল্পকারের আত্মপ্রকাশ ঘটে ষাটের দশকের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে। এঁদের মধ্যে বিষয়বস্তু, প্রকরণ ও ভাষাশৈলীর ক্ষেত্রে নতুনত্ব আনয়নের জন্য সৈয়দ শামসুল হক, শওকত আলী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, হাসান আজিজুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বিশেষভাবে স্মরণীয়। এঁরা গল্প রচনায় প্রয়োগ করেন বিশ্লেষণধর্মিতা, অন্তর্মুখী ব্যঞ্জনা, আঞ্চলিক জীবন ও উপভাষা।
শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের সঙ্কট ও গ্রামীণ জীবনকে আধুনিক শিল্পচেতনায় উপস্থাপনে সৈয়দ শামসুল হক বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। নরনারীর সম্পর্ক, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা প্রভৃতি প্রাধান্য পেলেও শওকত আলী শেষ পর্যন্ত সমষ্টি মানুষের জীবনকেই রূপায়িত করার প্রতি অধিকতর মনোযোগী হন। তিনি নিম্নজীবী-হতদরিদ্র মানুষের কাহিনী বর্ণনায় বিশেষ সিদ্ধি অর্জন করেন।
বাকসংযম কাব্যময়তা ও প্রতীকতা সৃষ্টিতে এবং সমাজজীবনের গভীর প্রদেশ উন্মোচনে হাসান আজিজুল হকের সাফল্য অসাধারণ। গল্পকার হিসেবে ব্যাপক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সম্মানও অর্জন করেন তিনি। বাস্তব ও পরাবাস্তবের আলোছায়া, মানবচরিত্রের রহস্যময়তা এবং সংক্ষুব্ধ সমকাল—জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ও আবদুল মান্নান সৈয়দের গল্পের মৌল উপাদান। ছোটগল্পের স্বল্প পরিসরেও অস্তিত্বের সঙ্কট, জীবনের ক্লিন্নতা ইত্যাদি বিষয়কে প্রকাশ করতে গিয়ে জ্যোতিপ্রকাশ গল্পের আঙ্গিক ও ভাষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। দুর্বিনীত প্রধান (১৯৬৫), বহে না সুবাতাস (১৯৬৭), সীতাংশু তোর সমস্ত কথা (১৯৬৯) প্রভৃতি তাঁর প্রধান গল্পগ্রন্থ। জটিল বর্ণনারীতি, ব্যতিক্রমধর্মী শব্দব্যবহার, কাব্যিক পরিচর্যা ইত্যাদি বাংলাদেশের ছোটগল্পে এসেছে আবদুল মান্নান সৈয়দের মাধ্যমে। প্রতীকতা, পরাবাস্তবতা ও আধুনিক অস্তিত্ববাদের নিরিখে ব্যক্তি-সমাজের যোগসূত্র অনুসন্ধান তাঁর গল্পকে দিয়েছে বিশিষ্টতা।
ষাটের দশকে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে এরকম গল্পকারদের মধ্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সর্ব অর্থেই ব্যতিক্রমধর্মী। গ্রাম-নগর উভয় প্রেক্ষাপটেই তিনি ছিলেন সাবলীল। পুরান ঢাকা তাঁর গল্পে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর গল্পের চরিত্রসমূহ লোভ-লালসা, ভালোবাসা-ঘৃণা, হিংস্রতা-ক্রুরতায় অর্জন করে সর্বজনীনতা। বাংলাদেশের ছোটগল্পে একটি নতুন গল্পভাষা নির্মিত হয় তাঁর হাতে। তাঁর গদ্যের ইতিবাচক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল তাঁর সার্থক ছোটগল্পগুলো। একেবারে চলিত কথ্যভঙ্গিকে মার্জিত চলিত গদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে তিনি এক বেগবান ভাষা সৃষ্টি করেন, যা উভয় বাংলার প্রচলিত আদর্শ গদ্যরীতি থেকে আলাদা এবং যা একান্তই তাঁর। আলোচ্য গল্পকারবৃন্দ ছাড়াও যাঁরা স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় রেখেছেন তাঁরা হলেন সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, বশীর আল হেলাল, রাহাত খান, হাসনাত আবদুল হাই, সেলিনা হোসেন প্রমুখ।
ষাটের দশক বাংলাদেশের ছোটগল্পে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে এ দশক অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক পত্র-পত্রিকাও এ সময় থেকেই প্রচুর পরিমাণে প্রকাশিত হতে থাকে। দেশে আসতে শুরু করে বিদেশি প্রগতিশীল সাহিত্যের অনূদিত গ্রন্থাদি। গল্পকারের সংখ্যাপ্রাচুর্যেও এ দশক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে ষাটের দশকের ধারাই আরো গতিশীল হয় এবং মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত নতুন নতুন গল্পকারের আবির্ভাবে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে ছোটগল্পের জগৎ। হেলেনা খান (১৯২৯-), শহীদ আখন্দ (১৯৩৫-), আবুবকর সিদ্দিক (১৯৩৬-), মাহমুদুল হক (১৯৪০-), বুলবন ওসমান (১৯৪০-), বিপ্রদাশ বড়–য়া (১৯৪২-) হাজেরা নজরুল (১৯৪২-), আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১), ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ (১৯৪৫-), ফরিদা হোসেন (১৯৪৫-), কায়েস আহমেদ (১৯৪৮-১৯৯২), হুমায়ুন আহমেদ (১৯৪৮-) প্রমুখ গল্পকারের আত্মপ্রকাশ মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তীকালে হলেও মুক্তিযুদ্ধের পরেই তাঁরা খ্যাতি অর্জন করেন। অন্তিম ষাটের এ প্রজন্মকে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী ও স্বাধীনতা-পরবর্তী দুই প্রজন্মের সেতুবন্ধ বলে অভিহিত করা যায়। এঁদের মধ্যে আবুবকর সিদ্দিক (ভূমিহীন দেশ, ১৯৮৫; চরবিনাশকাল, ১৯৮৭; মরে বাঁচার স্বাধীনতা, ১৯৮৭), মাহমুদুল হক (প্রতিদিন একটি রুমাল, ১৯৯৪), আহমদ ছফা (নিহত নক্ষত্র, ১৯৬৯), কায়েস আহমেদ (অন্ধ তীরন্দাজ, ১৯৭৮; লাশকাটা ঘর, ১৯৮৭) প্রভৃতি গল্পকার বিষয় ও ভঙ্গির ক্ষেত্রে মৌলিক পরিচয় দিয়েছেন।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা লাভের পরে ছোটগল্পে অনিবার্যভাবে যুক্ত হয় মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি। যুদ্ধ এবং যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতার আলোকে রচিত হয় বিপুলসংখ্যক ছোটগল্প। তবে ষাটের দশকের ছোটগল্পে আঙ্গিক ও ভাষার ক্ষেত্রে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছিল, সত্তরের দশকে তা লক্ষিত হয় না। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে ছোটগল্পে সর্বাধিক লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এর বিষয়বৈচিত্র্য। মহসিন শস্ত্রপাণি (১৯৪৫-), সাযযাদ কাদির (১৯৪৭-), শান্তনু কায়সার (১৯৫০-), হরিপদ দত্ত, মুস্তাফা পান্না (১৯৫২-), ভাস্কর চৌধুরী (১৯৫২-), মঞ্জু সরকার (১৯৫৩-), সুশান্ত মজুমদার (১৯৫৪-), ইমদাদুল হক মিলন (১৯৫৫-), আহমদ বশীর (১৯৫৫-), ইসহাক খান (১৯৫৫-), আহমদ মুসা (১৯৫৭-), মঈনুল আহসান সাবের (জ. ১৯৫৮) প্রমুখ স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম দশকের গল্পকার। মহসিন শস্ত্রপাণি (জনশ্রুতি, ১৯৭৯), মুস্তাফা পান্না (লোকসকল, ১৯৮৪), মঞ্জু সরকার (অবিনাশী আয়োজন, ১৯৮২) প্রমুখ যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের অভাব-বঞ্চনা-শোষণের চিত্র তুলে ধরেন। সুশান্ত মজুমদার (ছেঁড়াখোঁড়া জমি, ১৯৮৫; রাজা আসেনি বাদ্য বাজাও, ১৯৯৪; শরীরে শীত ও টেবিল গু-াপা-া, ১৯৯৮), আহমদ বশীর (অন্য পটভূমি, ১৯৮১), মঈনুল আহসান সাবের (পরাস্ত সহিস, ১৯৮২; অরক্ষিত জনপদ, ১৯৮৩; আগমন সংবাদ, ১৯৮৪) স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের বিশিষ্ট রূপকার।
সত্তরের দশকে মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, সামরিক শাসনের দুঃসহ বাস্তবতা, দারিদ্র্য, বেকার সমস্যা, নারীনির্যাতন, সন্ত্রাস প্রভৃতির প্রভাব পড়ে ছোটগল্পে। স্বাধীনতার পর থেকে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যগ্রন্থগুলো দেশে অবাধে আসতে শুরু করে। অন্যদিকে মিডিয়া-টেকনোলজির অভাবিত উন্নতির ফলে তথ্য ও অন্যান্য বিষয়ে লেখক-পাঠক উভয়ের অভিজ্ঞতার পরিধি বৃদ্ধি পায়। সাহিত্যের ক্ষেত্রে এ নতুন অভিজ্ঞতাও যুক্ত হতে থাকে। তাই অন্তিমসত্তর থেকে আশির দশকের এবং সাম্প্রতিক বাংলা গল্পে বিষয়বস্তু, প্রকাশভঙ্গি ও ভাষার ক্ষেত্রে বেশ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এমনকি কোনো কোনো গল্পকারের গল্পকে ছোটগল্পের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিকও বলা চলে। আবু হাসান শাহরিয়ার, অনামিকা হক লিলি, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, বিশ্বজিত চৌধুরী, মহীবুল আজিজ, ওয়াহিদ রেজা, আনিসুল হক, মনির জামান, মামুন হুসাইন, সেলিম মোরশেদ, হুমায়ুন মালিক, সেলিম মোজাহার, শাহনাজ মুন্নী, রাজীব নূর, ফাহমিদুল হক, অদিতি ফাল্গুনি, আহসান ইকবাল, প্রশান্ত মৃধা প্রমুখ সত্তরের শেষ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ধারা পর্যন্ত সৃষ্টিশীল গল্পকার হিসেবে খ্যাত।
এঁদের মধ্যে মামুন হুসাইনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আশির দশকের এ গল্পকার প্রচলিত বাংলা গল্পে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারার সূচনা করেন। বিষয়ভাবনা ও প্রকাশভঙ্গিতে বাংলা ছোটগল্পে তাঁর পূর্বে এমন আর কাউকে দেখা যায়নি। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত তাঁর গল্পগ্রন্থ শান্ত সন্ত্রাসের চাঁদমারি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। তাঁর গল্পে বাস্তব ও কল্পজগতের সঙ্গে নিজস্ব দার্শনিক বোধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তাঁর গল্পগুলো কেবল প্রচলিত ধারার ব্যতিক্রমই নয়, সেগুলোতে বাংলাদেশের জীবন আশ্চর্য রকমভাবে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।
অষ্টম বর্ষ প্রথম সংখ্যা
ভূমিকা
মূলত: ‘সুপ্রিয় দিনলিপি’ শিরোনামে আমার এই লেখাগুলো যে শুধুমাত্র দৈনন্দিন জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, লেখাগুলো যে আসলেই মান-সম্পন্ন, পরিশীলিত এবং এতে যে সামগ্রিকভাবে একটি স্পষ্ট বক্তব্য বা ম্যাসেজ বিদ্যমান থাকে এবং তা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতেও প্রকাশিতও হচ্ছে- এই সামগ্রিক ব্যাপারটি আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি বহু বছর পরে, ১৯৯৮ সালের দিকে যখন ‘দৈনিক ভোরের কাগজ’ এ আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। তখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এর বিবিএ (অনার্স) এর শিক্ষার্থী। এরপর জীবনের বিভিন্ন সময়ে সাহিত্য, ছোট-গল্প, বিভিন্ন ন্যাশনাল ইস্যু, উপন্যাসের সমালোচনা, বঙ্গবন্ধুর জীবনী, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন বিষয়াবলীর ওপর আমার আর্টিক্যাল ও কলামগুলো একে একে দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক ভোরের কাগজ, দৈনিক আজাদী ইত্যাদি জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হতে থাকে। দ্যাট মীনস্ সিরিয়াসলি কাউন্ট করলে আমার লেখালেখির বয়স হচ্ছে বিশ (২০) বছর। কিন্তু যেহেতু আমি প্রফেশনাল রাইটার নই, তাই আমার লেখাগুলো প্রকাশিত হয় অনিয়মিতভাবে এবং সংখ্যায় খুবই কম। ‘সুপ্রিয় দিনলিপি’ শিরোনামে এখনো আমি ক্লান্তিহীনভাবে লিখে যাচ্ছি। এই পর্যন্ত আমার সেইসব লেখা সর্বমোট ১৯টি ডায়রীতে এসে দাঁড়িয়েছে। সেখান থেকে বাছাইকৃত কিছু লেখার ‘পরিবর্ধন -পরিমার্জিত’ রূপ নিয়েই রচিত ‘সুপ্রিয় দিনলিপি (দ্বিতীয় খণ্ড)’ পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করার নিমিত্তে। গ্রন্থটিকে রূপক অর্থে মূলতঃ ‘একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ’ও বলা যায়। এই গ্রন্থটিতে প্রধানত যে সময়কালের ঘটনাবলী বিশ্লেষনাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সেই সময়কাল হচ্ছে- ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল। অদূর ভবিষ্যতে ক্রমান্বয়ে ‘সুপ্রিয় দিনলিপি’ এর- তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম খণ্ডে পরবর্তী সময়কালের ঘটনাবলী বিশ্লেষণাত্মকভাবে তুলে ধরা হবে এবং একটা পর্যায়ে এর ইংলিশ ভার্সনও বের করা হবে- এইরকম একটি প্লান আমার রয়েছে।
আমি মনে করি,
“সময়ের সাথে সাথে নিজের মন ও মেধাকে আপডেটেড রেখে ধর্মীয় কুসংস্কার, বিজাতীয় সংস্কৃতির আধিপত্য ও দৌরাত্ম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, পারস্পারিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মেধার অবমূল্যায়ন, শিক্ষা-ব্যবস্থার ভগ্নদশা, শিক্ষকদের অবমূল্যায়নসহ সামাজিক আরও নানা অসঙ্গতি, দুর্নীতি পরিহার করে বাংলাদেশের যে নিজস্ব একটি আদর্শ, ঐতিহ্য, ইতিহাস, কৃষ্টি-কালচার, সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, রাজনৈতিক মূল্যবোধ রয়েছে- সামগ্রিকভাবে তার অনুশীলন করা- বাঙ্গালী জাতি হিসেবে আমাদের সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য। ১৯৭১ সালে সবাই সময়ের প্রয়োজনে যুদ্ধ করেছিল, তখন যুদ্ধ করে দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে ‘স্বাধীন’ করাই ছিলো তখনকার সময়ের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। আর এখন আকাশ-সংস্কৃতির এই আগ্রাসনের যুগে অর্থাৎ এই সময়ের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হচ্ছেÑ ‘আলোকিত এবং একই সঙ্গে মানবিক, দেশপ্রেমিক, নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন , অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, আধুনিক মানুষ ও চাই, যাতে করে একটি উন্নত ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যেÑ আমরা বাংলাদেশের সকল মানুষ একসঙ্গে কাজ করতে পারি ঠিক সেই মুক্তিযুদ্ধের মতো।
অর্থাৎ বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে একটি আত্মনির্ভরশীল, সংস্কারমুক্ত, স্বশিক্ষিত, মেধাবী, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে হলে- আমাদের সকলকে আরেকটি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবে এবং যেখানে আমাদের মূল অস্ত্র হবেÑ আমাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা ও অন্যান্য সকল জাতীয় অর্জন এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধের বহিঃপ্রকাশ! ‘আলোকিত মানুষ চাই এবং একই সঙ্গে মানবিক, দেশপ্রেমিক, নৈতিকমূল্যবোধসম্পন্ন, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, আধুনিক মানুষও চাই’- মূলত এটাই হওয়া উচিত আধুনিক বাংলাদেশ এর শ্লোগান’।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর উপকার করতে চাইলেও করা যায় না, তার চেয়ে বরং আমরা যা করতে পারি তাই যদি করি তাহলে আপনা-আপনি পৃথিবীর উপকার হয়ে যায়’।
মূলত: পাঠকের ভালো লাগা এবং ভালোবাসাই হচ্ছে লেখকের প্রত্যাশা পূরণ। আশা করি, আপনারা কখনো আমাকে এবং আমার লেখাকে সেই ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করবেন না। আমি মূলত প্রফেশনাল রাইটার নই। আমার মূল পেশা ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা’ আর নেশাÑ ‘লেখালেখি করা’। ‘পেশা’য় জড়িত না থাকলে আমার এ পৃথিবীতে জীবন-ধারণ ও অস্তিত্ব রক্ষাই দুরূহ হয়ে উঠবে কিন্তু ‘নেশা’টা আমার মাঝে-মধ্যে করলেও চলবে। ‘শিক্ষকতা’ পেশায় ব্যস্ত থাকার কারণে, এই গ্রন্থটির প্রতি হয়তবা পরিপূর্ণ মনোনিবেশ ঘটাতে পারিনি। ‘সুপ্রিয় দিনলিপি (প্রথম খণ্ড) অথবা সুপ্রিয় দিনলিপি (দ্বিতীয় খণ্ড)’ এর কোথাও যদি পাঠকেরা অতৃপ্তি কিংবা অসম্পূর্ণ ফিল করেন, তাহলে তাদের কাছে অনুরোধ- ‘আপনারা রেগুলারলি ‘সুপ্রিয় দিনলিপি’-এর পরবর্তী খণ্ডগুলো সংগ্রহ করবেন’। আশা করি, তাহলে আর কোনো অতৃপ্তিবোধ থাকবে না। উল্লেখ্য, সুপ্রিয় দিনলিপি (দ্বিতীয় খণ্ড) -এর পাঠকগণ ‘অনুপ্রাণন প্রকাশন’ থেকেই ‘সুপ্রিয় দিনলিপি (প্রথম খণ্ড)’-বইটি সংগ্রহ করতে পারবেন।
‘সুপ্রিয় দিনলিপি’ গ্রন্থটি প্রকাশের ব্যাপারে আমাকে বাংলাদেশের যে দু’জন স্বনামধন্য সাংবাদিক সবসময় সহযোগীতা ও উৎসাহ যুগিয়েছেন, তারা হচ্ছেনÑ ১. সাংবাদিক ‘সালিম সামাদ’ (বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য সাংবাদিক) যিনি ‘দি ডেইলী আওয়ার টাইমস্’ সহ আরও বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রে এ কাজ করছেন এবং তিনি ২০০৫ সালে প্রেসটিজিয়াস ঐবষষসধহ-ঐধসসবঃঃ অধিৎফ অর্জন করেন এবং একসময় ‘ইন্ডিয়া টু ডে’, ‘বাংলাদেশ অবজাভার’, ‘বিবিসি’সহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ঈড়ৎৎবংঢ়ড়হফবহঃ ধহফ জবঢ়ড়ৎঃবৎ হিসেবে কাজ করেছেন এবং ২. সাংবাদিক ‘রাশেদ রউফ’ যিনি বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় দৈনিক ‘দৈনিক আজাদী’র সহযোগী-সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত। তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য শিশু-সাহিত্যিক এবং কবি। তিনি ২০১৬ সালে ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন।
এ গ্রন্থটির প্রচ্ছদ নির্বাচন করেছেনÑ সাংবাদিক, কবি ও শিশু সাহিত্যিক ‘রাশেদ রউফ’ এবং গ্রন্থটি প্রকাশনা করেছেন ‘অনুপ্রাণন প্রকাশন’। হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে সাংবাদিক ‘সালিম সামাদ’, ‘রাশেদ রউফ’ এবং ‘অনুপ্রাণন প্রকাশন’ এর কর্ণধারসহ সকল কলাকুশলীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
ফারহানা আকতার
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ
১৫ জানুয়ারি ২০২০
Suprio Dinlipi, Part-2
বর্তমান বাংলাদেশে কবিতার ছদ্মবেশে যারা নির্মাণ করে যাচ্ছেন চিন্তা আর বিমূর্ত বোধের সুনিপুণ ভাস্কর্য, এমরান হাসান তাদের একজন। শিল্পিত বোধ-যাপনের ভেতর দিয়ে এমরান হাসান সৃষ্টি করেন এক অনার্য ঘরানার সাহসী ওঙ্কার। তার চিন্তানির্মাণকৌশল আপোষহীন, প্রথাবিরোধী। নিজস্ব ভাবনাগুলোকে অতিক্রম করে নতুন সত্যের জন্ম দেয় তার নির্মিত চিন্তা। জাগতিক মোহ, তৃষ্ণা আর প্রেমময় তন্দ্রাচ্ছন্নতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাঁর কবিতা। অনশ্বর বোধের সুনিবিড় তৈলচিত্রের গভীর আহ্বান ও রূপকচৈতন্যের বিমূর্ত আলোর মননশীলতা সময়ের পাঠচিন্তাকে পৌঁছে দেয় সুপ্রাচীন এক স্বচ্ছ সরোবরে।
Mohoniyo Mrittikagon by Emran Hasan
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থে সর্বমোট নয়টি গল্প রয়েছে। প্রতিটি গল্পে রয়েছে ভিন্নস্বাদ ও ভিন্নমাত্রা। এসব জীবনের গল্প। আমাদের জীবনে রয়েছে দুঃখ-যন্ত্রণা, ব্যথা-বেদনা, কষ্ট-বঞ্চনা-লাঞ্ছনা আর চাওয়া-পাওয়ার তীব্র গড়মিল। এরই মধ্যে রয়েছে আবার টুকরো-টুকরো হাসি-কান্না, সুখ-শান্তি, প্রশান্তি আর সর্বোপরি প্রেম-ভালোবাসা। সবকিছু মিলিয়েই আমাদের এই অমূল্য জীবন। আর এসবকিছু নিয়েই রচিত হয় আমাদের জীবনের অফুরন্ত গল্প।
এই গল্পগুলোতে রয়েছে সমাজের একেবারে বাস্তবচিত্র আর সমকালীন জীবনের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। গল্পগুলো একবার পড়লেই ভালো লেগে যাবে। ভালোলাগার মতো গল্পগুলো পাঠকের সামনে হাজির হয়েছে সুবিন্যস্তভাবে। ‘আফসারের চোখে জল’, ‘অন্ধজনে আলো দাও’, ‘আত্মহত্যার আগে’, ‘জীবনের প্রশ্নোত্তর মেলে না’, ‘সৌরভের হাতে ফুল ছিল’, ‘কবি সাহেবের প্রেম’ ইত্যাদি চিত্তাকর্ষক নামের গল্পগুলোতে পাঠক সাহিত্যরসে ডুবে পরিতৃপ্ত হতে পারবেন।
এগুলো শুধু গল্প নয়। মানবজীবনের নিখাদ ঘটনাপ্রবাহ। আর এগুলো আশাহত ও বেদনাবিধুর জীবনের জীবন্ত কথামালা ও উজ্জ্বলতম ছবি।
Afsarer Chokhe Jol by Sayeed Rafiqul Haque
আমার পূর্বপুরুষরা এই গ্রামেরই বাসিন্দা। সে সম্পর্কে যথেষ্ঠ ধারণা পেয়েছি আগে। কিন্তু আমার মতো একজন আগুন্তুককে কি চিনতে পারবে তারা? অতীতে কল্পনার ঝুলিতে যে ছবি এঁকে রেখেছিলাম, মুহূর্তের মধ্যেই তা যেন আষাঢ়ে গল্পে পরিণত হয়ে গেলো। কিন্তু বাবাকে তো কখনো মিথ্যে বলতে শুনিনি।
অজানা-অচেনা আগুন্তুকের দিকে উৎসুক মানুষের নজর পড়ছে। টের পাচ্ছি। তবুও দ্বিধাহীন খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছি গ্রামটিকে। কোথায় সেই ছনের ঘর। কোথায় সেই দোচালা টিনের বাড়ি। কোথায় সেই বনবাদাড়ে ঘেরা বসতঘর। এ যে রীতিমতো অট্টালিকার অরণ্য, ইটপাথরের জঙ্গল। যে কল্প-ছবি বুকে নিয়ে এখানে পা ফেলেছি, সেটা যে দেখছি এই গ্রামের সম্পূর্ণ বিপরীতরূপ। তাহলে কি ভুল পথে পা বাড়িয়েছি আমি? নাকি আধুনিকতা এবং উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে গেছে সবকিছু? প্রতিনিয়ত পৃথিবী বদলায়, গ্রাম বদলাবে না কেন? সবকিছু দেখার পর অজ্ঞাত এক কবির কবিতার দুটি লাইন মনে পড়ে গেলো- ‘ক্রমশ বড় হয় শহর, ছোট হয় গ্রাম/ পাথরের কাছে হেরে যায় মানুষ।’
স্মৃতির ছায়াশিস - Smritir Chayashish
এই বইটি প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে মূলত: আমার শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণায়। অনেক দিন ধরে ওরা আমাকে ভূতের গল্প লেখার জন্য উৎসাহ দেয়। দশটা গল্পের মধ্যে চার পাঁচটার মতো গল্প পত্রিকা ও শিশু সাহিত্য গ্রন্থে প্রকাশিত হয়। এখানে প্রতিটি গল্পে শিশু কিশোরদের ঠাকুরমার কাছে ভূতের গল্প শোনা, ভূতকে নিয়ে কল্পনা করা, একাকিত্বে ভূতকে সঙ্গী মনে করা, ভূতের লেখাপড়ায় আগ্রহ, পরীর সাথে ভূতের বন্ধুত্ব, বাসাবাড়িতে ভূতের আতঙ্ক, বল আনতে গিয়ে ভূতের কবলে পড়া, করোনা কালীন সময়ে শ্মশানে লাশদের আহাজারি, শাকচুন্নী ও মেছো ভূতের গল্প, ভূত মামার সাহায্যে ফল খাওয়া সহ আরো নানান চমকে দেয়ার মতো কাহিনী সহজভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আশা করি এই গল্পগুলো পাঠকদের মনে রেখাপাত করবে। ছোটদের পাশাপাশি বড়রাও এই গল্পগুলো পড়ে উপভোগ করবে।
Vuter Kabole Ora Tinjon by Jonaki Dutta
ননসেন্স সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ সম্ভবত শৈশব থেকে। ১৯৭০-এর দশকে সুকুমার রায়ের সাথে সম্যক পরিচয়ের পর তা বিশেষ আকর্ষণে পরিণত হয়। ৯০-এর দশকের প্রথম দিকে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার আগে লিমেরিকের সাথে জানাশোনা অল্পই ছিল। ফিরলাম এডওয়ার্ড লিয়ারের লিমেরিক এবং আরও অন্য অনেক ‘ননসেন্স’ পদ্য হাতে করে। পরে শুরু হয় তার থেকে অনুবাদের চেষ্টা। লিয়ারের লিমেরিক ছাড়া অন্য লিমেরিকও হাতে আসে। তার থেকেও চলে বঙ্গানুবাদ।
বঙ্গানুবাদের পাশাপাশি নিজের লিমেরিক লেখাও চলতে থাকে। তার থেকে কিছু লিমেরিক এখানে ছাপা হল। সুখ ও স্বাস্থ্যের জন্য হাসি বা আনন্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এই লিমেরিকগুলি যদি পাঠকের জন্য কিছু হাসি বা আনন্দের জোগান দিতে পারে তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করব।
-হোসাইন রিদওয়ান আল খান
১ জুলাই, ২০১৮
খ্যাংড়া ঠ্যাঙা চিমশে ঢ্যাঙা
Dwitiyo Shrabone Prothom Kadam
মিলু শামসের নির্ভার গদ্যভাষার সঙ্গে পাঠককে নতুন করে পরিচয় করানোর কিছু নেই। বিষয়ের যুক্তিগ্রাহ্য বিশ্লেষনের সঙ্গে প্রকাশ ভঙ্গির সাবলীলতাকে তিনি এমনভাবে মিশিয়ে দেন যা পাঠককে এক নিশ্বাসে শেষ লাইন পর্যন্ত পড়ে যেতে বাধ্য করে। জীবন ও জগতকে দেখার তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রতিটি লেখা হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র। প্রখর ব্যক্তিত্বময় দৃঢ় একটি স্বর অণুরনিত হয় পাঠক মননে।
দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত তাঁর নিয়মিত কলামের নির্বাচিত কিছু কলাম নিয়ে সাজানো হয়েছে এই বইয়ের লেখাগুলো।
Sangbadiker Kalam By Milu Shams
রহস্য ও বৈচিত্র্যের মহাদেশ আফ্রিকা! দীর্ঘ এক পথ চলে গেছে দেশ হতে দেশান্তরে! সেই রহস্যে মোড়া ভূখণ্ডের প্রতিটি অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভৌগলিক বৈচিত্র্য যে কোন ভ্রমণকারী ও ভবঘুরের আগ্রহের স্থান।
“পূর্বআফ্রিকার তিনকাহন” একজন বাংলাদেশী নারী ভ্রমণকারীর পূর্ব আফ্রিকার তিন দেশ – কেনিয়া, উগান্ডা ও রুয়ান্ডা’র ভ্রমণ আখ্যান। লেখক পথ চলতে চলতে প্রাচীন ইতিহাসের মুখোমুখি হয়েছেন, দেখেছেন নানা জনপদ, জানবার চেস্টা করেছেন তাদের সংস্কৃতি, বুঝতে চেয়েছেন নানাবিধ ভাষার রহস্য। সেই সব আবেগ, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, স্বীকারোক্তি ও কৈফিয়তের হিসেবনিকেশ নিয়েই আবর্তিত “পূর্বআফ্রিকার তিনকাহন” ।
Purbaafricar Tinkahon by Eliza Binte Elahi
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.























There are no reviews yet.