Additional information
| Weight | 0.452 kg |
|---|



$ 2.94
অনুপ্রাণন পঞ্চদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রে যুদ্ধ ও সংঘাত (দ্বিতীয় পর্ব) – সম্পাদকীয়-
মধ্যযুগের বাংলা গীতিকবিতা, পদ্য, সুর ও সঙ্গীত সাধারণ বাঙালিকে তার ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছিল। বস্তুত বিকশিত এই সাংস্কৃতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল। যদিও আধুনিক অর্থে ‘জাতীয়তাবাদ’ ধারণার জন্ম তখনো হয়নি, তবে সঙ্গীতই প্রথম বাঙালিকে একটি অভিন্ন ভাষিক, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিক পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে শিখিয়েছিল। মধ্যযুগের ঠিক প্রাক্কালে রচিত চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধন সঙ্গীত। এটিই প্রথম প্রমাণ করে যে, বাংলা ভাষা উচ্চমার্গের আধ্যাত্মিক ও শৈল্পিক ভাব প্রকাশের উপযুক্ত। চর্যাপদের গীতিগুলোতে তৎকালীন বাংলার নদী, নৌকা, শবর-শবরীদের জীবনযাত্রা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ফুটে উঠেছে, যা বাঙালির নিজস্ব ভৌগোলিক সত্তাকে প্রথম আকার দেয়। চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি ও জ্ঞানদাসের বৈষ্ণব পদাবলী জাত-পাত এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠার গান গেয়েছে। চণ্ডীদাসের অমর বাণী—”সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”—বাঙালিকে প্রথম চরম মানবতাবাদের পাঠ দেয়। শ্রী চৈতন্যদেবের সংকীর্তন আন্দোলন সঙ্গীতকে প্রাসাদের চার দেয়াল থেকে বের করে সাধারণ মানুষের মাঝে নিয়ে আসে। এই সাম্যবাদী চেতনা পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান ভিত্তি (ধর্মনিরপেক্ষতা) হয়ে দাঁড়ায়। মনসামঙ্গল বা চণ্ডীমঙ্গলের গানগুলোতে আর্য দেবতাদের পরিবর্তে বাংলার নিজস্ব লৌকিক দেব-দেবীর আরাধনা করা হতো। এই সঙ্গীতগুলোতে কোনো স্বর্গীয় দেবরাজ্যের কথা ছিল না, বরং ছিল বাংলার সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য, ঝড়-ঝঞ্ঝা এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প। এটি বাঙালির নিজস্ব স্বাজাত্যবোধ ও আত্মপরিচয়কে তীব্র করে তোলে। নাথ গীতি, ময়নামতীর গান এবং পরবর্তী সময়ে লালন শাহ ও অন্যান্য বাউলদের গান ছিল সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মবিরোধী। এই সঙ্গীতধারা হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছিল। বাঙালি যে ধর্মের চেয়েও বড় একটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, এই বোধ বাউল ও সুফি সঙ্গীতের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি সুসংহত হয়। নদীমাতৃক বাংলার মাঝিদের ভাটিয়ালি গান বা উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া গান ছিল একান্তই মাটির গান। এই সুরগুলো কোনো কৃত্রিম রাজকীয় প্রভাবে তৈরি হয়নি। এগুলো বাঙালির অবচেতন মনে একটি অভিন্ন “সাংস্কৃতিক স্বদেশ” গড়ে তুলেছিল। মধ্যযুগের সঙ্গীত বাঙালিকে তার ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছিল। এই সাংস্কৃতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল।
মধ্য ও আধুনিক যূগে বাঙ্গালীর জাতীয়তাবাদী সংগ্রামী চেতনা গঠনে গীত-কবিতা চর্চা ও সঙ্গীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মধ্যযুগের সাহিত্য মূলত ছিল দেব-দেবী বা ধর্মকেন্দ্রিক (যেমন: মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী)। তবে এই যুগেই প্রথম বাঙালি নিজের ভাষা ও ভূখণ্ডের প্রতি মমত্ববোধ প্রকাশ করতে শুরু করে, যা ছিল জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক ভিত্তি। সপ্তদশ শতকে যখন বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করা হতো, তখন কবি আব্দুল হাকিম তাঁর ‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় তীব্র ক্ষোভের সাথে লিখেছিলেন: “যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী / সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”
নিজের ভাষা ও দেশের প্রতি এই চরম আনুগত্যই পরবর্তীকালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান স্তম্ভ (ভাষাকেন্দ্রীক জাতীয়তাবাদ) হয়ে ওঠে। ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভাঙার প্রয়াসে আধুনিক যুগে তীব্র স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী কবিতার জন্ম হয়। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’-এ পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রথম জোরালো সুর তোলেন: “স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, / কে বাঁচিতে চায়? / দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, / কে পরিবে পায়?” মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর সনেট এবং মেঘনাদবধ কাব্যের মাধ্যমে বাঙালির ভেতর আত্মমর্যাদাবোধ ও বীরত্বের চেতনা জাগিয়ে তোলেন। তাঁর ‘কপোতাক্ষ নদ’ সনেটে বিদেশের মাটিতে বসেও স্বদেশের প্রতি যে আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা বাঙালিকে নিজের মাটির প্রতি টান অনুভব করতে শিখিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অসংখ্য কবিতা ও গীতিকবিতার (গান) মাধ্যমে বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলেন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তাঁর রচিত গীতকবিতাগুলো রাস্তায় রাস্তায় গেয়ে বাঙালিরা বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তাঁর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি বাঙালির জাতীয় ঐক্য ও আবেগের চিরন্তন প্রতীক হয়ে ওঠে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বিদ্রোহী’, ‘ভাঙার গান’ ও ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এর মতো কবিতা ও গানের মাধ্যমে বাঙালিকে সরাসরি সশস্ত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুপ্রেরণা দেন। তিনি ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন।ষাটের দশকে পাকিস্তানি নিপীড়নের বিরুদ্ধে শামসুর রাহমান তাঁর ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ বা ‘আসাদের শার্ট’ কবিতার মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেন। আল মাহমুদ, সুকান্ত ভট্টাচার্য (রবীন্দ্রোত্তর পর্বে), এবং নির্মলেন্দু গুণ-এর কবিতা বাঙালিকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গোবিন্দ হালদারের ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ বা ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’—এই গীতকবিতাগুলো রণক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের ও অবরুদ্ধ দেশবাসীকে মানসিকভাবে বাঁচিয়ে রেখেছিল এবং চূড়ান্ত বিজয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মধ্যযুগের কবিতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে সুপ্ত আত্মপরিচয় শুরু হয়েছিল, আধুনিক যুগে এসে তা তীব্র ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী এবং পরবর্তীতে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র (বাংলাদেশ) গঠনের প্রধান সাংস্কৃতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়।
| Weight | 0.452 kg |
|---|
সম্পাদকীয়-
মহান একুশে- আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও এক দুঃখিনী বর্ণমালার ইতিহাস
বাংলা ভাষা ও বাংলা বর্ণমালার উদ্ভব ও বিবর্তনের একটি স্বতন্ত্র ও মৌলিক ইতিহাস রয়েছে। আমরা জানি যে, প্রাচীন কাল থেকে পাঁচটি স্তর পার হয়ে আধুনিক বর্ণমালা এসেছে। প্রাচীনকালে কোনো বর্ণমালা ছিলো না। গাছপালা-মানুষ-প্রাণী’র ছবি এঁকে মনের ভাব প্রকাশ করা হতো। এটা হচ্ছে বর্ণমালার প্রথম স্তর- “গ্রন্থিলিপি”। আনুমানিক দশ-বারো হাজার বছর আগে মানুষ গ্রন্থিলিপি দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করতো। এরপর এলো “ভাবলিপি”- সম্পূর্ণ ছবি না এঁকে সংকেত বা চিহ্ন বা প্রতীকের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম। ভাবলিপি ছিলো অনেকটা এমন- দিন বোঝাতে পূর্ণ বৃত্ত, অর্থাৎ সূর্য আঁকা হতো, আর রাত বোঝাতে অর্ধ বৃত্তের সাথে তারকা আঁকা হতো। এরপর এলো তৃতীয় স্তর- “শব্দলিপি”, এই স্তরে ব্যাপক হারে ছবির বদলে চিহ্নের ব্যবহার হতে লাগলো। শব্দলিপি আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে এলো চতুর্থ স্তর- “অক্ষরলিপি”। অক্ষরলিপি আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে পঞ্চম স্তর হিসেবে এলো “ধ্বনিলিপি”। এই ধ্বনিলিপি থেকেই আধুনিক বর্ণমালার উৎপত্তি। সেই সময় বিভিন্ন বর্ণে বা রঙে বিভিন্ন অক্ষর লিখা হতো, সেখান থেকেই অক্ষরের নাম হয়েছে বর্ণ, বর্ণমালা।
আমাদের বাঙলা বর্ণমালা এসেছে প্রাচীন ভারতীয় “ব্রাহ্মীলিপি” থেকে। পৌরাণিক উপ-কথামতে হিন্দু দেবতা ব্রহ্মা ভারতবর্ষের প্রাচীন লিপি আবিষ্কার করেছিলেন এবং ধ্বনির সাথে মানুষকে এই লিপি দান করেছিলেন, তার নামানুসারে ঐ লিপির নাম হয় ব্রাহ্মীলিপি। কেউ কেউ বলেন, বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণরা ছিলেন শ্রেষ্ঠ পুরোহিত। ব্রাহ্মণদের দ্বারা এই লিপি আবিষ্কৃত হয়েছিল বলেই এর নাম ব্রাহ্মীলিপি। যে যাই বলুক, ভারতবাসী নিজেরাই সৃষ্টি করেছিলেন ব্রাহ্মীলিপি। ব্রাহ্মীলিপির পেছনে ফিনিশীয় লিপির প্রভাব আছে বলে দাবী করা হয়। তবে প্রাচীন ভারতীয়রা সম্ভবত স্বাধীনভাবেই নিজেদের লিপি উদ্ভাবন করেছিল- কারণ ফিনিশীয় লিপির চেয়ে ব্রাহ্মীলিপির পার্থক্য অনেক। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতক থেকে ৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে ব্রাহ্মীলিপি প্রচলিত ছিল। এরপর “অশোক লিপি” বা “মৌর্য লিপি”তে এর বিবর্তন শুরু হয়। এর পরের ধাপে আসে “কুষাণ লিপি”, এগুলি কুষাণ রাজাদের আমলে প্রচলিত ছিল। এরপর ব্রাহ্মীলিপিটি উত্তরী ও দক্ষিণী- এই দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়। উত্তরী লিপিগুলির মধ্যে পূর্বদেশীয় গুপ্তলিপি প্রধান, এটি ৪র্থ ও ৫ম শতাব্দীতে প্রচলিত ছিল। গুপ্তলিপি থেকে আবির্ভাব হয় “কুটিল লিপির”, এটি ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শতক পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। কুটিল লিপি থেকে উদ্ভব হয় নাগরী লিপির। প্রাচীন নাগরী লিপির পূর্ব শাখা থেকে ১০ম শতকের শেষভাগে এসে উৎপত্তি হয়েছে বাঙলা লিপির। অর্থাৎ ব্রাহ্মীলিপি > অশোক লিপি বা মৌর্য লিপি > কুষাণ লিপি > উত্তরী গুপ্তলিপি (পূর্বদেশীয়) > কুটিল লিপি > নাগরী লিপি > বাঙলা লিপি।
ব্রাহ্মীলিপি থেকে সৃষ্ট বাঙলা বর্ণমালা দেখতে কিন্তু এখনকার বর্ণমালার মতো ছিলো না, সময়ের পরিবর্তনে বর্ণ’র চেহারারও পরিবর্তন হয়েছে। তখন যেহেতু ছাপাখানা ছিলো না, শুদ্ধতা বজায় থাকবে কী করে? তখন মানুষ হাতে কাব্য লিখতো, পুঁথি লিখতো। একেকজনের হাতের লেখা একেকরকম, দশজন দশরকম করে “ক” “খ” লিখেছে। এভাবেই পরিবর্তিত হতে হতে পাল্টে গেছে বাঙলা বর্ণমালা। কম্বোজের রাজা নয়পালদেবের ইর্দার দানপত্রে এবং প্রথম মহীপালের বাণগড়ের দানপত্রে সর্বপ্রথম আদি বাংলা বর্ণমালা দেখতে পাওয়া যায়। ব্রাহ্মীলিপি’র প্রথম পাঠোদ্ধার করেন প্রাচ্যবিদ্যা-বিশারদ প্রিন্সসেপ। আমাদের দেশের সিলেটের উপভাষারও কিছু বর্ণমালা ছিলো, আধুনিক বাঙলা বর্ণমালা থেকে একটু আলাদা, প্রায় অবিকৃত ‘নাগরী লিপি’র মতো।
এখন পর্যন্ত তিন ধরনের ব্রাহ্মীলিপির নমুনা আবিষ্কৃত হয়েছে, যাতে ৪৪টি বর্ণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে স্বরবর্ণ ৯টি, ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৫টি। বাঙলা বর্ণমালার “ঔ” ও “ঋ” ব্রাহ্মীলিপির স্বরবর্ণে না পাওয়া গেলেও ব্যঞ্জনবর্ণে এ দুটি বর্ণের নমুনা পাওয়া গেছে। আমরা এখন যে কয়টি স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ দেখি, আগে এর চেয়ে কয়েকটি বেশি ছিলো। এই তো কিছুদিন আগেও স্বরবর্ণতে ৯ ছিলো, এখন আর ৯-এর অস্তিত্ব নেই। এর সাথে ছিলো ঋৃ। ব্যঞ্জনবর্ণতে ছিলো ল (মূর্ধন্য ল), ছিলো হ্ল (মহাপ্রাণ ল), ছিলো ব (অন্তঃস্থ ব)। যুগে যুগে বাঙলা বর্ণমালার আকার-আকৃতি বদলাতে বদলাতে মুদ্রণযন্ত্রের ঢালাই ধাতুতে তৈরি বর্ণের কল্যাণে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা বর্ণমালার স্বরূপ মোটামুটি স্থির রূপ পায়।
বাংলা বর্ণমালা একসময় ব্রাহ্মীলিপি থেকে উদ্ভূত হলেও মধ্যযুগে এসে বাংলা বর্ণমালা বাংলার স্বাধীন শাসন ব্যবস্থার মতোই স্বতন্ত্র পথ ধরে বিবর্তিত হয়ে নিজস্ব একটি মৌলিক রূপ পরিগ্রহ করে। বাংলা বর্ণমালার এসব বিবর্তনের ইতিহাসের মধ্যেও বাংলার স্বাধীন পরিচয় নির্মাণ ও পরিগ্রহণের আকাক্সক্ষা সম্পৃক্ত রয়েছে।
অথচ ১৯৪৭-এর পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের অপরাপর প্রাদেশিক জনগোষ্ঠী অর্থাৎ সিন্ধি, বেলুচি, পাঞ্জাবি ও পশতু ভাষার বর্ণলিপির মতোই বাংলা বর্ণমালা পরিবর্তন করে ফারসি-আরবি অথবা ল্যাটিন বর্ণমালা ব্যবহার করে লেখার পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। বাংলা ভাষা ও বাংলা বর্ণমালা তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর ভাষা ও ভাষায় ব্যবহৃত বর্ণমালা হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যালঘু ভারতীয় মুসলমান অভিজাত শ্রেণির ভাষা ও বর্ণমালা অর্থাৎ উর্দুকেই এবং ফারসি-আরবি লিপিকেই পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ও বর্ণমালা হিসেবে চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। পাকিস্তানের সিন্ধ, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও উঃ পঃ সীমান্ত প্রদেশে এখনও শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাদেশিক ভাষা স্থান করে নিতে পারেনি। পাকিস্তানের এরকম অসভ্য, আধিপত্যবাদী, অমানবিক এবং অন্যায় পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বাঙলায় গর্জে ওঠে প্রতিবাদ কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে বাঙালির এই দাবি এবং প্রতিবাদের যুক্তি অনুধাবন করার চেষ্টা গ্রহণ না করে তৎকালীন পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বুলেটের মাধ্যমে জবাব দেওয়ার পথ গ্রহণ করে। বুকের রক্ত দিয়ে সেদিন বাঙালি তাদের মাতৃভাষা ও বর্ণমালার অধিকার আদায় করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং এই বাঙলায় বাঙলা ভাষা ও বর্ণমালা ব্যবহারের দাবি মেনে নিতে পাকিস্তানি শাসকদের বাধ্য করেছিল। এটাই ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস।
সভ্যতা, মানবতা ও ন্যায়ের পক্ষে ১৯৫২ সনে বাঙালির এই ভাষা সংগ্রাম প্রতিষ্ঠিত মানবিকতার ন্যায্য যুক্তির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে পরিচালিত ছিল বলেই এই আন্দোলন সারা বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে আজ পৃথিবীতে প্রত্যেক মাতৃভাষার মর্যাদাবোধ জাগ্রত হয়েছে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালনের জন্য জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভ করেছে।
সপ্তম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
তৃতীয় বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা
সম্পাদকীয়-
অনুপ্রাণন: বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের পথ-পরিক্রমা
অনুপ্রাণনের পক্ষ থেকে ছোটগল্পের এই বিশেষ আয়োজন বা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশকে কেন্দ্র করে প্রথমেই যে প্রশ্নটা উঠতে পারে যে, কোনটাকে আমরা ছোটগল্প বলবো? বিশ্বসাহিত্যে কথাসাহিত্যের বিশেষ ধারা ছোটগল্পের সংজ্ঞা ও ধারণার মাঝে যেভাবে বদল হয়েছে বাংলা সাহিত্যে ঠিক সেভাবে হয়নি।
বাংলা সাহিত্যে কথাসাহিত্যের বিশেষ ধারা ছোটগল্পের আবির্ভাব ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। বহুল স্বীকৃত ধারণা এটাই যে, ছোটগল্প বলতে সাধারণত তাকেই বোঝায় যে কথা বা কাহিনী যা আধঘণ্টা থেকে এক বা দু’ঘণ্টার মধ্যে এক নাগাড়ে পড়ে শেষ করা যায়। কিন্তু গল্প বা উপন্যাস আকারে ছোট হলেই কী তাকে ছোটগল্প বলা যাবে? না, কারণ আমরা এটা বোঝার চেষ্টা করেছি যে, ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এতে বিন্দুতে সিন্ধুর বিশালতা থাকতে হবে, অর্থাৎ অল্প কথায় অধিক ভাব ব্যক্ত করতে হবে। উপন্যাসের সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য এখানেই। ছোটগল্পে উপন্যাসের বিস্তার থাকে না, কিন্তু থাকে ভাবের গভীরতা ও ব্যাপকতা। উপন্যাস পড়ে পাঠক পরিতৃপ্তি লাভ করে, কিন্তু ছোটগল্প থেকে পায় কোনো চিন্তা অথবা কোনো ভাবের শক্তিশালী ইঙ্গিতমাত্র। কাহিনীর কোনো বিশেষ রূপ বা কোনো বিশেষ অংশকে অবলম্বন করে ক্ষুদ্র কলেবরে নিগূঢ় ভাব অথবা চিন্তা যেখানে নিগূঢ় সত্যের ব্যঞ্জনার সার্থক অবস্থান থাকে তবে এর মাঝেই ‘ছোটগল্প’ সার্থকভাবে হয়ে উঠতে পারে।
ছোটগল্পের প্রকৃতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) তাঁর ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায় যা বলেছেন, সেই সংজ্ঞার মাঝে ছোটগল্প আর আবদ্ধ নেই। কেননা ছোটগল্প ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা ছোট ছোট দুঃখকথা, নিতান্তই সহজ সরলের মাঝে আর আবদ্ধ নেই। তবে ঐ যে ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’ কথাটা হয়তো থাকবে বহুকাল যতদিন ছোটগল্প দ্রুপদী সত্যেকে লতিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টায় নিয়োজিত থাকবে।
বিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত রচিত ছোটগল্পগুলোকে বিষয়বস্তুর দিক থেকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যেমন:
১) প্রেমের গল্প, ২) সামাজিক গল্প, ৩) ঐতিহাসিক গল্প, ৪) প্রকৃতি ও মানুষ সম্পর্কিত গল্প, ৫) রূপক বা সাঙ্কেতিক গল্প, ৬) অতিপ্রাকৃত, ৭) ব্যঙ্গ বা হাস্যরসাত্মক, ৮) মনস্তাত্ত্বিক গল্প, ৯) গার্হস্থ্যবিষয়ক গল্প, ১০) বিজ্ঞানবিষয়ক গল্প, ১১) উদ্ভট গল্প, ১২) মনুষ্যত্বের প্রাণিবিষয়ক গল্প, ১৩) বস্তুনিষ্ঠ গল্প, এবং ১৪) বিদেশি পটভূমিকায় রচিত গল্প।
যদিও বাংলা ছোটগল্পের প্রথম আভাস পাওয়া যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪)—যুগলাঙ্গুরীয় (১৮৭৪) ও রাধারাণী (১৮৭৫) গল্পে এবং পরে যোগ দেন পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৪-১৮৮৯), ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৪৭-১৯১৯), স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫-১৯৩২) ও নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত; কিন্তু প্রকৃত অর্থে বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক ছোটগল্পকার হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ‘দেনা-পাওনা’ (১৮৯০) গল্পটিই প্রথম সার্থক ছোটগল্প হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক ছোটগল্পকারদের মধ্যে প্রথমেই উল্লেখযোগ্য কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৬৩-১৯৪৯) নাম। এর পরের ছোটগল্পকার হলেন প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬), প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (১৮৭৩-১৯৩২), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৭৬-১৯৩৮), চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯৩৮), মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৮৮-১৯২৯), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০০-১৯৭৬), মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৫-১৯৫৬), প্রবোধকুমার সান্যালের (১৯০৫-১৯৮৩) ইত্যাদি কথাসাহিত্যিকদের নাম উল্লেখযোগ্য।
বিভাগ-পূর্বকালে ছোটগল্প রচনায় খ্যাতি লাভ করেছিলেন এমন আরো কয়েকজন লেখক হলেন—দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার, রাজশেখর বসু, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, মনোজ বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সৈয়দ মুজতবা আলী প্রমুখ।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের সাহিত্যে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, অল্পকালের মধ্যেই এ-দেশীয় লেখকদের সৃষ্টিশীল রচনায় তা পূর্ণ হয়ে ওঠে। সাহিত্যের অপরাপর শাখার মতো ছোটগল্পের শাখাটিও ক্রমাগত ঋদ্ধতর হয়।
বাংলাদেশে ছোটগল্প রচনার ধারা বেগবান হয় চল্লিশের দশকে। এ সময় গল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে গৃহীত হয় গ্রাম ও নগর জীবনের কাহিনী। অনেক গল্পে স্থান পায় দেশবিভাগের মর্মান্তিক পরিণতি। আবার দেশ বিভাগের আগেকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও তেতাল্লিশের মন্বন্তরও কোনো কোনো গল্পের উপজীব্য হয়। আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯), আবু রুশদ (১৯১৯-) এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১) ছোটগল্পের প্রথম পর্বের তিন খ্যাতিমান লেখক। আবুল মনসুর প্রধানত হাস্যব্যঙ্গাত্মক অথচ গভীর সমাজমনস্ক ছোটগল্পের রচয়িতা। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ভ-ামি তাঁর তীক্ষè সমালোচনার লক্ষ্য। প্রায়শ সমাজবিরোধী ব্যক্তিরা তাঁর গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়েছে। আবু রুশদ ছোটগল্পে নগরজীবনের প্রথম সার্থক ভাষ্যকার। নাগরিক জীবনের জটিলতা এবং দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তিনি বহু গল্প রচনা করেছেন। বাংলাদেশের গ্রাম, এর পশ্চাৎপদতা, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ইত্যাদি বিষয় বাঙময় হয়ে উঠেছে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গল্পে। এ সময়ের আরও দুজন গল্পকার ফজলুল হক (১৯১৬-১৯৪৯) ও সোমেন চন্দ (১৯২০-১৯৪২) গল্প রচনায় অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।
পঞ্চাশের দশকে পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সাহিত্যজগতে লক্ষ করা যায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি। পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে বাঙালির আত্মচেতনার বিকাশ ঘটে ১৯৫২-এর ভাষা-আন্দোলনে। এর ফলে তখন সমাজ ও সাহিত্য উভয়ই প্রবলভাবে আলোড়িত হয়। ভাষা-আন্দোলনের পরের বছরই এর গৌরবময় স্মৃতিকে ধারণ করে কবি হাসান হাফিজুর রহমানের (১৯৩২-১৯৮৩) সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় একুশের সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারি। এতে সমকালীন সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অবদান উপস্থাপিত হয়। এর অনুসরণে পরবর্তীকালে বহুসংখ্যক পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। সমকাল, কণ্ঠস্বর, পূর্বমেঘ, উত্তরণ, ছোটগল্প, পূর্বপত্র, সাম্প্রতিক, গণসাহিত্য, বিপ্রতীপ প্রভৃতি একুশে ফেব্রুয়ারিই সার্থক উত্তরাধিকারী। এ চেতনায় ছোটগল্পও সমৃদ্ধ হতে থাকে প্রচুর গল্পকারের লেখনী-প্রভাবে।
এ সময় ছোটগল্পে নবীন-প্রবীণ লেখকদের হাতে বিচিত্র বিষয়ের রূপায়ণ ঘটে। ইব্রাহীম খাঁ (১৮৯৪-১৯৭৮), মাহবুব-উল আলম (১৮৯৮-১৯৮১), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩), আবু জাফর শামসুদ্দীন (১৯১১-১৯৮৮), শওকত ওসমান (১৯১৭-১৯৯৮), সরদার জয়েনউদ্দীন (১৯১৮-১৯৮৬), আবদুল হক (১৯১৮-১৯৯৭), শামসুদ্দিন আবুল কালাম (১৯২৬-১৯৯৮), আবু ইসহাক (১৯২৬-২০০৩), আশরাফ সিদ্দিকী (১৯২৭-), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯), জহির রায়হান (১৯৩৩-১৯৭২) প্রমুখ এ সময়কার উল্লেখযোগ্য গল্পকার। এঁদের মধ্যে বিষয়বৈচিত্র্যে, শিল্পচেতনার অনন্যতায় এবং প্রকাশভঙ্গির প্রাতিস্বিকতায় উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠেন শওকত ওসমান ও আলাউদ্দিন আল আজাদ। এ দুজনের মাধ্যমেই পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের ছোটগল্প অর্জন করে সামাজিক বাস্তবতার এক নতুন মাত্রা। গ্রামীণ ও শহুরে জীবন চিত্রণে এবং বিচিত্র চরিত্র নির্মাণে শওকত ওসমানের কৃতিত্ব অবিস্মরণীয়। আলাউদ্দীন আল আজাদের মধ্যে দুই বিপরীতধর্মী শিল্পচেতনার সমন্বয় লক্ষণীয়। নরনারীর মনোজাগতিক বিশ্লেষণে, যৌনতা চিত্রণে এবং সামাজিক চরিত্র উন্মোচনে আজাদ সমান দক্ষতার পরিচয় দেন।
এ প্রসঙ্গে আরও দুজন গল্পকারের দুটি গল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—শাহেদ আলীর ‘জিবরাইলের ডানা’ (জিবরাইলের ডানা, ১৯৫৩) এবং মাহবুব-উল আলমের ‘মফিজন’ (মফিজন, ১৯৫৪)। গল্প দুটিতে মানুষের অভাবক্লিষ্ট জীবন, ধর্মের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক শোষণ, সামাজিক নিষ্ঠুরতার প্রেক্ষাপটে নারীর হৃদয়বৃত্তির প্রকাশ এবং গ্রামবাংলার অবহেলিত নারীসমাজকে সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিক মর্যাদাদানের বিষয় চমৎকারভাবে চিত্রিত হয়েছে। এভাবে ভাষা-আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়ে ছোটগল্পে সমাজ ও জীবনের স্বরূপ নানাভাবে প্রতিফলিত হতে থাকে; বিভিন্ন গল্পে প্রচারিত হতে থাকে মানবতাবাদ, সমাজসচেতনতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা।
ষাটের দশক থেকে ছোটগল্পের দুটি বিশেষ দিক লক্ষণীয় হয়ে ওঠে: সমকালীন ঘটনার ব্যাপক প্রতিফলন এবং ব্যক্তিসত্তার বিভিন্নমুখী বিশ্লেষণ। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্র ও সমাজ তরঙ্গবিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৯৫৮-এর সামরিক শাসন, ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের ছোটগল্প। লায়লা সামাদ (১৯২৮-১৯৮৯), সুচরিত চৌধুরী (১৯২৯-১৯৯৪), আবদুল গাফফার চৌধুরী (১৯৩১-), হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-১৯৮৩), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-), শওকত আলী (১৯৩৬-), জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত (১৯৩৯-), হাসান আজিজুল হক (১৯৩৯-), হাসনাত আবদুল হাই (১৯৩৯-), রাহাত খান (১৯৪০-), আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-), আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭), সেলিনা হোসেন (১৯৪৭-) প্রমুখ গল্পকারের আত্মপ্রকাশ ঘটে ষাটের দশকের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে। এঁদের মধ্যে বিষয়বস্তু, প্রকরণ ও ভাষাশৈলীর ক্ষেত্রে নতুনত্ব আনয়নের জন্য সৈয়দ শামসুল হক, শওকত আলী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, হাসান আজিজুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বিশেষভাবে স্মরণীয়। এঁরা গল্প রচনায় প্রয়োগ করেন বিশ্লেষণধর্মিতা, অন্তর্মুখী ব্যঞ্জনা, আঞ্চলিক জীবন ও উপভাষা।
শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের সঙ্কট ও গ্রামীণ জীবনকে আধুনিক শিল্পচেতনায় উপস্থাপনে সৈয়দ শামসুল হক বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। নরনারীর সম্পর্ক, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা প্রভৃতি প্রাধান্য পেলেও শওকত আলী শেষ পর্যন্ত সমষ্টি মানুষের জীবনকেই রূপায়িত করার প্রতি অধিকতর মনোযোগী হন। তিনি নিম্নজীবী-হতদরিদ্র মানুষের কাহিনী বর্ণনায় বিশেষ সিদ্ধি অর্জন করেন।
বাকসংযম কাব্যময়তা ও প্রতীকতা সৃষ্টিতে এবং সমাজজীবনের গভীর প্রদেশ উন্মোচনে হাসান আজিজুল হকের সাফল্য অসাধারণ। গল্পকার হিসেবে ব্যাপক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সম্মানও অর্জন করেন তিনি। বাস্তব ও পরাবাস্তবের আলোছায়া, মানবচরিত্রের রহস্যময়তা এবং সংক্ষুব্ধ সমকাল—জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ও আবদুল মান্নান সৈয়দের গল্পের মৌল উপাদান। ছোটগল্পের স্বল্প পরিসরেও অস্তিত্বের সঙ্কট, জীবনের ক্লিন্নতা ইত্যাদি বিষয়কে প্রকাশ করতে গিয়ে জ্যোতিপ্রকাশ গল্পের আঙ্গিক ও ভাষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। দুর্বিনীত প্রধান (১৯৬৫), বহে না সুবাতাস (১৯৬৭), সীতাংশু তোর সমস্ত কথা (১৯৬৯) প্রভৃতি তাঁর প্রধান গল্পগ্রন্থ। জটিল বর্ণনারীতি, ব্যতিক্রমধর্মী শব্দব্যবহার, কাব্যিক পরিচর্যা ইত্যাদি বাংলাদেশের ছোটগল্পে এসেছে আবদুল মান্নান সৈয়দের মাধ্যমে। প্রতীকতা, পরাবাস্তবতা ও আধুনিক অস্তিত্ববাদের নিরিখে ব্যক্তি-সমাজের যোগসূত্র অনুসন্ধান তাঁর গল্পকে দিয়েছে বিশিষ্টতা।
ষাটের দশকে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে এরকম গল্পকারদের মধ্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সর্ব অর্থেই ব্যতিক্রমধর্মী। গ্রাম-নগর উভয় প্রেক্ষাপটেই তিনি ছিলেন সাবলীল। পুরান ঢাকা তাঁর গল্পে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর গল্পের চরিত্রসমূহ লোভ-লালসা, ভালোবাসা-ঘৃণা, হিংস্রতা-ক্রুরতায় অর্জন করে সর্বজনীনতা। বাংলাদেশের ছোটগল্পে একটি নতুন গল্পভাষা নির্মিত হয় তাঁর হাতে। তাঁর গদ্যের ইতিবাচক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল তাঁর সার্থক ছোটগল্পগুলো। একেবারে চলিত কথ্যভঙ্গিকে মার্জিত চলিত গদ্যের সঙ্গে মিশিয়ে তিনি এক বেগবান ভাষা সৃষ্টি করেন, যা উভয় বাংলার প্রচলিত আদর্শ গদ্যরীতি থেকে আলাদা এবং যা একান্তই তাঁর। আলোচ্য গল্পকারবৃন্দ ছাড়াও যাঁরা স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় রেখেছেন তাঁরা হলেন সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, বশীর আল হেলাল, রাহাত খান, হাসনাত আবদুল হাই, সেলিনা হোসেন প্রমুখ।
ষাটের দশক বাংলাদেশের ছোটগল্পে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে এ দশক অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক পত্র-পত্রিকাও এ সময় থেকেই প্রচুর পরিমাণে প্রকাশিত হতে থাকে। দেশে আসতে শুরু করে বিদেশি প্রগতিশীল সাহিত্যের অনূদিত গ্রন্থাদি। গল্পকারের সংখ্যাপ্রাচুর্যেও এ দশক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে ষাটের দশকের ধারাই আরো গতিশীল হয় এবং মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত নতুন নতুন গল্পকারের আবির্ভাবে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে ছোটগল্পের জগৎ। হেলেনা খান (১৯২৯-), শহীদ আখন্দ (১৯৩৫-), আবুবকর সিদ্দিক (১৯৩৬-), মাহমুদুল হক (১৯৪০-), বুলবন ওসমান (১৯৪০-), বিপ্রদাশ বড়–য়া (১৯৪২-) হাজেরা নজরুল (১৯৪২-), আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১), ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ (১৯৪৫-), ফরিদা হোসেন (১৯৪৫-), কায়েস আহমেদ (১৯৪৮-১৯৯২), হুমায়ুন আহমেদ (১৯৪৮-) প্রমুখ গল্পকারের আত্মপ্রকাশ মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তীকালে হলেও মুক্তিযুদ্ধের পরেই তাঁরা খ্যাতি অর্জন করেন। অন্তিম ষাটের এ প্রজন্মকে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী ও স্বাধীনতা-পরবর্তী দুই প্রজন্মের সেতুবন্ধ বলে অভিহিত করা যায়। এঁদের মধ্যে আবুবকর সিদ্দিক (ভূমিহীন দেশ, ১৯৮৫; চরবিনাশকাল, ১৯৮৭; মরে বাঁচার স্বাধীনতা, ১৯৮৭), মাহমুদুল হক (প্রতিদিন একটি রুমাল, ১৯৯৪), আহমদ ছফা (নিহত নক্ষত্র, ১৯৬৯), কায়েস আহমেদ (অন্ধ তীরন্দাজ, ১৯৭৮; লাশকাটা ঘর, ১৯৮৭) প্রভৃতি গল্পকার বিষয় ও ভঙ্গির ক্ষেত্রে মৌলিক পরিচয় দিয়েছেন।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা লাভের পরে ছোটগল্পে অনিবার্যভাবে যুক্ত হয় মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি। যুদ্ধ এবং যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতার আলোকে রচিত হয় বিপুলসংখ্যক ছোটগল্প। তবে ষাটের দশকের ছোটগল্পে আঙ্গিক ও ভাষার ক্ষেত্রে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছিল, সত্তরের দশকে তা লক্ষিত হয় না। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে ছোটগল্পে সর্বাধিক লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এর বিষয়বৈচিত্র্য। মহসিন শস্ত্রপাণি (১৯৪৫-), সাযযাদ কাদির (১৯৪৭-), শান্তনু কায়সার (১৯৫০-), হরিপদ দত্ত, মুস্তাফা পান্না (১৯৫২-), ভাস্কর চৌধুরী (১৯৫২-), মঞ্জু সরকার (১৯৫৩-), সুশান্ত মজুমদার (১৯৫৪-), ইমদাদুল হক মিলন (১৯৫৫-), আহমদ বশীর (১৯৫৫-), ইসহাক খান (১৯৫৫-), আহমদ মুসা (১৯৫৭-), মঈনুল আহসান সাবের (জ. ১৯৫৮) প্রমুখ স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম দশকের গল্পকার। মহসিন শস্ত্রপাণি (জনশ্রুতি, ১৯৭৯), মুস্তাফা পান্না (লোকসকল, ১৯৮৪), মঞ্জু সরকার (অবিনাশী আয়োজন, ১৯৮২) প্রমুখ যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের অভাব-বঞ্চনা-শোষণের চিত্র তুলে ধরেন। সুশান্ত মজুমদার (ছেঁড়াখোঁড়া জমি, ১৯৮৫; রাজা আসেনি বাদ্য বাজাও, ১৯৯৪; শরীরে শীত ও টেবিল গু-াপা-া, ১৯৯৮), আহমদ বশীর (অন্য পটভূমি, ১৯৮১), মঈনুল আহসান সাবের (পরাস্ত সহিস, ১৯৮২; অরক্ষিত জনপদ, ১৯৮৩; আগমন সংবাদ, ১৯৮৪) স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের বিশিষ্ট রূপকার।
সত্তরের দশকে মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, সামরিক শাসনের দুঃসহ বাস্তবতা, দারিদ্র্য, বেকার সমস্যা, নারীনির্যাতন, সন্ত্রাস প্রভৃতির প্রভাব পড়ে ছোটগল্পে। স্বাধীনতার পর থেকে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যগ্রন্থগুলো দেশে অবাধে আসতে শুরু করে। অন্যদিকে মিডিয়া-টেকনোলজির অভাবিত উন্নতির ফলে তথ্য ও অন্যান্য বিষয়ে লেখক-পাঠক উভয়ের অভিজ্ঞতার পরিধি বৃদ্ধি পায়। সাহিত্যের ক্ষেত্রে এ নতুন অভিজ্ঞতাও যুক্ত হতে থাকে। তাই অন্তিমসত্তর থেকে আশির দশকের এবং সাম্প্রতিক বাংলা গল্পে বিষয়বস্তু, প্রকাশভঙ্গি ও ভাষার ক্ষেত্রে বেশ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এমনকি কোনো কোনো গল্পকারের গল্পকে ছোটগল্পের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিকও বলা চলে। আবু হাসান শাহরিয়ার, অনামিকা হক লিলি, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, বিশ্বজিত চৌধুরী, মহীবুল আজিজ, ওয়াহিদ রেজা, আনিসুল হক, মনির জামান, মামুন হুসাইন, সেলিম মোরশেদ, হুমায়ুন মালিক, সেলিম মোজাহার, শাহনাজ মুন্নী, রাজীব নূর, ফাহমিদুল হক, অদিতি ফাল্গুনি, আহসান ইকবাল, প্রশান্ত মৃধা প্রমুখ সত্তরের শেষ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ধারা পর্যন্ত সৃষ্টিশীল গল্পকার হিসেবে খ্যাত।
এঁদের মধ্যে মামুন হুসাইনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আশির দশকের এ গল্পকার প্রচলিত বাংলা গল্পে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারার সূচনা করেন। বিষয়ভাবনা ও প্রকাশভঙ্গিতে বাংলা ছোটগল্পে তাঁর পূর্বে এমন আর কাউকে দেখা যায়নি। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত তাঁর গল্পগ্রন্থ শান্ত সন্ত্রাসের চাঁদমারি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। তাঁর গল্পে বাস্তব ও কল্পজগতের সঙ্গে নিজস্ব দার্শনিক বোধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তাঁর গল্পগুলো কেবল প্রচলিত ধারার ব্যতিক্রমই নয়, সেগুলোতে বাংলাদেশের জীবন আশ্চর্য রকমভাবে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।
অষ্টম বর্ষ প্রথম সংখ্যা
অষ্টম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা
সম্পাদকীয়
শিল্প-চেতনার ঐক্য
দেশে-বিদেশে সাধারণভাবে এটাই ধরে নেয়া হয় যে কবি-সাহিত্যিক ও শিল্পীরা সাধারণ মানুষদের তুলনায় সমাজ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন, সক্রিয় এবং অগ্রসর ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি গোষ্ঠী। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এই গোষ্ঠীর সকলেই সমমনা এবং তারা একক কোন সংগঠনে মিলিত অবস্থায় রয়েছেন। এর কারণসমুহ সময়ের সাথে সম্পর্কিত সমাজের আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতির বাস্তব ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যেতে পারে।
ভাষা, শব্দ, কণ্ঠ, বাদ্যযন্ত্র, রঙ, তুলি অথবা যে কোন উপকরণ ব্যবহার করে সুর ও সুন্দরের চর্চা, অভিব্যক্তি ও নির্মান যা মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে, হৃদয়ে আবেগ-অনুভূতি আন্দোলিত করে, মন মুগ্ধ করে অথবা মেধা ও মননে গভীর ছাপ ফেলে যায়- কবি-সাহিত্যিক ও শিল্পীরা সেই কাজেই নিজের প্রতিভা বিকাশের সাধনায় নিয়োজিত থেকে সমাজে সুর ও সুন্দরের সৃষ্টি করে যেতে থাকেন। সুতরাং তাঁদের স্বাভাবিক অবস্থান কুৎসিত, অন্যায়, অন্যায্য ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে এবং এটাই একান্তভাবে প্রত্যাশিত। সেখানে বিভেদের কী কোন অবকাশ থাকে? সত্য ও সুন্দরের আরাধনা করতে চাইলে একজন শিল্পীকে বুদ্ধিবৃত্তির পরিচর্যায় নিমগ্ন হতে হবে এবং অনস্বীকার্যভাবে কুসংস্কার, ভীরুতা, জরাজীর্ণতা ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। কিন্তু, বাস্তবে আমরা কী দেখতে পাই? শুদ্ধ শিল্পসিদ্ধি এবং বাস্তবজীবন বীক্ষণ বোধ ব্যক্তি ও ক্ষেত্র বিশেষে যেন সম্পর্কবিহীন দুটো সেতুবিহীন রাজ্যের মতো বিভক্ত রয়ে যায়। কিন্তু, এটা কেন?
আমাদের নন্দনবোধের সাগরে প্রকৃতি যেমন একটা বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে, ঠিক তেমনই জীবন যাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশ চেতনা কী বাস্তব পর্যবেক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়? এই দুটি বিষয়কে কল্পনা বা বাস্তবে কী কোন প্রভাবেই বিচ্ছিন্ন করা যায়? অসীমের অন্বেষণ ও স্বপ্নচারিতা একজন শিল্পীর থাকতে পারে। সৌন্দর্যের সন্ধানে অসীম ও অনন্তের দিকে যাত্রা করাও দোষের নয়। পরম সত্যের সৃষ্টির রহস্যকে ঘিরে অনুসন্ধান অনুসন্ধিৎসা আলো-অন্ধকারের উজ্জীবনে না হয় ক্লান্তিতে হয়ত হাবুডুবু খাবে। কখনো কখনো অন্ধকারের স্তব্ধতা নৈঃশব্দের দ্যোতকরূপে চেতনায় সংগুপ্ত থাকবে কিন্তু চিন্তায় সংকীর্ণতা, স্বার্থবাদী ও ক্ষমতাশালী উপনিবাশবাদী শক্তি পরিচালিত ভেদ ভাবনা অথবা মৌলবাদ কখনো মানবমুক্তির স্বপ্নের উজ্জ্বল আলোকে স্পর্শ করতে সাহায্য করতে পারবে না।
কালোত্তীর্ণ শিল্প কী জীবন বিচ্ছিন্ন ছিল? মানুষের দেহ ও তার অবয়বকে, তার যাপিত জীবনের সংগ্রাম অথবা উৎসবের বাইরে মানুষকে ছুঁড়ে দিয়ে মৌলবাদী কোন বিশ্বাসে শৃঙ্খলিত করার কোন অপচেষ্টায় সেসব শিল্প কর্ম কী লিপ্ত ছিল? এমন কোন অভিযোগ অথবা এমন কোন বিশেষণে সেসব শিল্প কর্মকে কী বিশেষায়িত করা সম্ভব? মানবসভ্যতার ইতিহাসে কালোত্তীর্ণ শিল্পের আধারে আত্মার মুক্তি কখনোই অধিক যথার্থ প্রশ্ন ছিল না- যতনা ছিল প্রেম, মানবতা ও মানব মুক্তির বিষয়াবলী। আর এ-কারণেই বুঝে নেয়া দরকার যে ক্ষমতার বর্বরতা ও নৃশংসতার সঙ্গী-সমর্থক হয়ে কখনোই প্রেম, মানবতা ও সুন্দরের পূজা সার্থক সিদ্ধি লাভ করতে পারে না। কেননা যখন ঘৃণা অথবা প্রেম থেকে শিল্পকে যে কোন একটাকে বেঁছে নেয়ার প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় তখন মানবতাই শিল্পের ধর্ম হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। কেননা- প্রেমই সুন্দর এবং প্রেমই মানবতার বৈশিষ্ট।
যদিও প্রতিটি মানুষের মধ্যেই সংবেদনশীলতা বিরাজমান কিন্তু এর মাত্রা ও স্বাতন্ত্র্য সবার অস্তিত্বে সমভাবে লালিত হয় না। যারা একটু অধিক মাত্রায় সংবেদনশীল তাদের ইন্দ্রিয় সদা জাগ্রত থাকে, তাঁরা প্রকৃতি থেকে সৃষ্টির চিরন্তনতার নির্যাস পায়, অসীমের অস্তিত্ব এবং সৃষ্টিতত্ত্বের মহিমা হৃদয়াঙ্গম করতে পারে। শিল্পী সমাজের সদস্যগণ জীবন প্রবাহের সব উপকরণের মধ্যে সত্য, সুন্দর, সততা ও সরলতাকে অবিচ্ছেদ্যতার সাথে তাঁর অস্তিত্ব দিয়ে আকাঙ্খা করেন। মানুষ ও মানবজাতির কল্যাণ চিন্তায় হন সবচেয়ে অগ্রগামী এবং এ-কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বৈষয়িক জীবনে বঞ্চিত রয়ে যান। বৈষয়িকভাবে তাঁর বঞ্চিত হওয়া অবাঞ্ছিত নয়, কারণ লেখক ভোগবাদের উপাসক নন, তিনি উপাসক প্রেম ও সত্যের- যে প্রেম, যে সহমর্মিতা, যে ভালোবাসা, মানবজাতির চিন্তা-চেতনা ও জীবন যাপনের সেই সত্য ও সুন্দরতা- যে সত্য থেকে, যে সৌন্দর্য থেকে জীবন সত্য- সদা প্রসারিত ও স্পন্দিত।
জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি যাই থাকুক না কেন, ন্যূনতম ক্ষুধা ও তৃষ্ণার দাবি মিটিয়ে শিল্পী তাঁর মনে কল্পনার একটি সুন্দর জগৎ সৃষ্টি করেন, যে জগতে অপ্রাপ্তির ইতিহাসও প্রমূর্ত হয়ে ওঠে। কল্পনাকে সত্য বলে উপলব্ধি করে লেখক বিশ্বের স্বর্ণযুগ কল্পনা করেন। যদিও স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যে অন্তহীন শূন্যতা থাকে তবুও শিল্পী যেমন নিজে স্বপ্ন দেখেন তেমনই অন্যকেও স্বপ্ন দেখাতে ভালোবাসেন। এসব সুন্দর স্বপ্ন দেখতে দেখতে একসময় অন্যদের মনোজগৎও স্বাপ্নিক ও সুন্দর হয়ে ওঠে। অনেকের ধারণা- শিল্পী শুধু কল্পনারাজ্যে বিরাজ করেন কিন্তু হৃদয়রাজ্যেও যে তাঁর অপ্রতিহত অবস্থান সে বিষয়টি ভেবে দেখেন না। একজন শিল্পী যুক্তিকে স্বীকার করেন, গ্রহণ করেন, ব্যবহার করেন হৃদয় দিয়ে এবং সেভাবেই সৌন্দর্য ও সত্যের অভিন্নতাকে প্রত্যক্ষ করেন। শিল্পী তাঁর চারপাশের সমাজ সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণ করে অভিজ্ঞতা সঞ্জাত অন্তরের নির্যাসটুকু শিল্পিতরূপে ছেনী-হাতুরী, রং-তুলি অথবা কলমের ডগা থেকে শূন্যতার সময়পটে চিহ্নিত করেন। নৃশংসতা, বর্বরতা, দমন-নিপীড়নের সাথে যেমন সত্য ও সুন্দরের ঐক্য হতে পারে না তেমনই একজন শিল্পী সমকালীন সমাজের শক্তির বিভাজনে অবশ্যই নির্যাতিতের পক্ষেই তার অবিচ্ছেদ্য অবস্থান নিশ্চিত করেন। এটাই শিল্পী সমাজের ঐক্যের মূল সূত্র। অনুপ্রাণন, শিল্প-চেতনার ঐক্যের এই মূল সূত্রের দিকেই সবাইকে ধাবিত করার প্রচেষ্টা করে যেতে চায়।
সপ্তম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা
অনুপ্রাণন পঞ্চদশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা- বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রে যুদ্ধ ও সংঘাত (দ্বিতীয় পর্ব) – সম্পাদকীয়-
মধ্যযুগের বাংলা গীতিকবিতা, পদ্য, সুর ও সঙ্গীত সাধারণ বাঙালিকে তার ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছিল। বস্তুত বিকশিত এই সাংস্কৃতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল। যদিও আধুনিক অর্থে ‘জাতীয়তাবাদ’ ধারণার জন্ম তখনো হয়নি, তবে সঙ্গীতই প্রথম বাঙালিকে একটি অভিন্ন ভাষিক, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিক পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে শিখিয়েছিল। মধ্যযুগের ঠিক প্রাক্কালে রচিত চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধন সঙ্গীত। এটিই প্রথম প্রমাণ করে যে, বাংলা ভাষা উচ্চমার্গের আধ্যাত্মিক ও শৈল্পিক ভাব প্রকাশের উপযুক্ত। চর্যাপদের গীতিগুলোতে তৎকালীন বাংলার নদী, নৌকা, শবর-শবরীদের জীবনযাত্রা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ফুটে উঠেছে, যা বাঙালির নিজস্ব ভৌগোলিক সত্তাকে প্রথম আকার দেয়। চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি ও জ্ঞানদাসের বৈষ্ণব পদাবলী জাত-পাত এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠার গান গেয়েছে। চণ্ডীদাসের অমর বাণী—”সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”—বাঙালিকে প্রথম চরম মানবতাবাদের পাঠ দেয়। শ্রী চৈতন্যদেবের সংকীর্তন আন্দোলন সঙ্গীতকে প্রাসাদের চার দেয়াল থেকে বের করে সাধারণ মানুষের মাঝে নিয়ে আসে। এই সাম্যবাদী চেতনা পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান ভিত্তি (ধর্মনিরপেক্ষতা) হয়ে দাঁড়ায়। মনসামঙ্গল বা চণ্ডীমঙ্গলের গানগুলোতে আর্য দেবতাদের পরিবর্তে বাংলার নিজস্ব লৌকিক দেব-দেবীর আরাধনা করা হতো। এই সঙ্গীতগুলোতে কোনো স্বর্গীয় দেবরাজ্যের কথা ছিল না, বরং ছিল বাংলার সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য, ঝড়-ঝঞ্ঝা এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প। এটি বাঙালির নিজস্ব স্বাজাত্যবোধ ও আত্মপরিচয়কে তীব্র করে তোলে। নাথ গীতি, ময়নামতীর গান এবং পরবর্তী সময়ে লালন শাহ ও অন্যান্য বাউলদের গান ছিল সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মবিরোধী। এই সঙ্গীতধারা হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছিল। বাঙালি যে ধর্মের চেয়েও বড় একটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, এই বোধ বাউল ও সুফি সঙ্গীতের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি সুসংহত হয়। নদীমাতৃক বাংলার মাঝিদের ভাটিয়ালি গান বা উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া গান ছিল একান্তই মাটির গান। এই সুরগুলো কোনো কৃত্রিম রাজকীয় প্রভাবে তৈরি হয়নি। এগুলো বাঙালির অবচেতন মনে একটি অভিন্ন “সাংস্কৃতিক স্বদেশ” গড়ে তুলেছিল। মধ্যযুগের সঙ্গীত বাঙালিকে তার ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবতাবাদী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছিল। এই সাংস্কৃতিক ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল।
মধ্য ও আধুনিক যূগে বাঙ্গালীর জাতীয়তাবাদী সংগ্রামী চেতনা গঠনে গীত-কবিতা চর্চা ও সঙ্গীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মধ্যযুগের সাহিত্য মূলত ছিল দেব-দেবী বা ধর্মকেন্দ্রিক (যেমন: মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী)। তবে এই যুগেই প্রথম বাঙালি নিজের ভাষা ও ভূখণ্ডের প্রতি মমত্ববোধ প্রকাশ করতে শুরু করে, যা ছিল জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক ভিত্তি। সপ্তদশ শতকে যখন বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করা হতো, তখন কবি আব্দুল হাকিম তাঁর ‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় তীব্র ক্ষোভের সাথে লিখেছিলেন: “যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী / সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।”
নিজের ভাষা ও দেশের প্রতি এই চরম আনুগত্যই পরবর্তীকালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান স্তম্ভ (ভাষাকেন্দ্রীক জাতীয়তাবাদ) হয়ে ওঠে। ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভাঙার প্রয়াসে আধুনিক যুগে তীব্র স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী কবিতার জন্ম হয়। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’-এ পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রথম জোরালো সুর তোলেন: “স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, / কে বাঁচিতে চায়? / দাসত্ব-শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, / কে পরিবে পায়?” মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর সনেট এবং মেঘনাদবধ কাব্যের মাধ্যমে বাঙালির ভেতর আত্মমর্যাদাবোধ ও বীরত্বের চেতনা জাগিয়ে তোলেন। তাঁর ‘কপোতাক্ষ নদ’ সনেটে বিদেশের মাটিতে বসেও স্বদেশের প্রতি যে আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা বাঙালিকে নিজের মাটির প্রতি টান অনুভব করতে শিখিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অসংখ্য কবিতা ও গীতিকবিতার (গান) মাধ্যমে বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলেন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তাঁর রচিত গীতকবিতাগুলো রাস্তায় রাস্তায় গেয়ে বাঙালিরা বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তাঁর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি বাঙালির জাতীয় ঐক্য ও আবেগের চিরন্তন প্রতীক হয়ে ওঠে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বিদ্রোহী’, ‘ভাঙার গান’ ও ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এর মতো কবিতা ও গানের মাধ্যমে বাঙালিকে সরাসরি সশস্ত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুপ্রেরণা দেন। তিনি ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন।ষাটের দশকে পাকিস্তানি নিপীড়নের বিরুদ্ধে শামসুর রাহমান তাঁর ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ বা ‘আসাদের শার্ট’ কবিতার মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেন। আল মাহমুদ, সুকান্ত ভট্টাচার্য (রবীন্দ্রোত্তর পর্বে), এবং নির্মলেন্দু গুণ-এর কবিতা বাঙালিকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গোবিন্দ হালদারের ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ বা ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’—এই গীতকবিতাগুলো রণক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের ও অবরুদ্ধ দেশবাসীকে মানসিকভাবে বাঁচিয়ে রেখেছিল এবং চূড়ান্ত বিজয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মধ্যযুগের কবিতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে সুপ্ত আত্মপরিচয় শুরু হয়েছিল, আধুনিক যুগে এসে তা তীব্র ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী এবং পরবর্তীতে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র (বাংলাদেশ) গঠনের প্রধান সাংস্কৃতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়।
Quarterly Anupranan Year- 15 Issue- 3 : War and Conflict in Art, Leterature and Movies of Bangladesh (2nd part)
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত শিক্ষকদের জন্য অবসরকালীন সময়ে নিয়মিত মাসিক পেনশন পদ্ধতি নেই। শিক্ষকগণ সরকারি অনুদান বা তাঁদের বেতন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অঙ্কের সঞ্চয় করেন, সেই সঞ্চয়ে সরকারের অংশ রয়েছে। চাকরি শেষে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ সেই অর্থ এককালীন পেয়ে থাকেন; তার একটি কল্যাণ ট্রাস্ট তহবিল ও অন্যটি অবসরভাতা। এই অর্থ শিক্ষকের হাতে পৌঁছাতে-পৌঁছাতে তিন-সাড়ে তিন কিংবা চার বছর লেগে যায়। এই সময়টুকু অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষার। কোনো কোনো শিক্ষক এই সময়ের বিন্দু বিন্দু মুহূর্ত গুনতে গুনতে পরপারে চলে যান। এমনই কষ্টকর অপেক্ষা, বেঁচে থাকার ক্লেশ ও অপমানের কাহিনি নিয়ে ‘অবসরভাতা ও বিবিধ দায়ভার’। একইসঙ্গে যোগ হয়েছে মানুষের জীবনযাপনের আকুলতা-স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ-বাস্তব-পরাবাস্তব-বঞ্চনা ও মানবিকতার পরিসরে চেনা-অচেনা অন্য কয়েকটি কাহিনি। সেই সকল কাহিনি বা গল্পের তেপান্তরে হারিয়ে যেতে স্বাগতম।
Oboshorvata O Bibidho Dayvar - Mahbub Ali
নব্বই দশক থেকে রুখসানার লেখালিখির শুরু। খুব কম লিখেই বিদগ্ধ পাঠকদের কাছে তিনি কিছু প্রত্যাশা সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছেন। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বেশ কয়েকটি বই। অনুবাদ করেছেন, আফগানিস্তানের নারী লেখকদের লেখা নিয়ে একটি গল্পগ্রন্থ। রুখসানার সাহিত্যকর্মের মৌলিক প্রবণতা হল তাঁর চেনাজানা জগতকে চারমাত্রা থেকে( ফোর ডাইমেনশন) দেখে একটি পরোক্ষ প্রতিবাদ ছুঁড়ে দেওয়া। ঘটনা বর্ণনা করে গভীর তল্লাসি চালিয়ে যেন তিনি খুঁজে আনেন চরিত্রগুলোর বিভিন্ন আবর্তন। এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলোর ক্ষেত্রেও তাঁর সেই স্বতন্ত্র শিল্পধারা কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। গল্পগুলোতে রয়েছে বিচিত্র পটভূমি ও বহুবিধ অভিজ্ঞতা। রুখসানার গল্পের চরিত্ররা গ্রাম, মফস্বলি শহর ব্যস্ত মহানগরের গন্ডি ছাড়িয়ে আমেরিকা প্রবাসী আবার কখনও মরুভূমির কোনো যাযাবর গোষ্ঠীর জীবনযাপন করে। ‘জোহেবা’ গল্পটি মাতৃত্বের গৌরব ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানে একরোখা। ‘বিষমপদী’ গল্পে অন্তরার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর নিঃসঙ্গতার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। আবার ‘কেভ’ গল্পে বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশের পরিসরে থেকেও একজন স্বনির্ভর বাঙালী তরুণীর ধর্মের দড়ি ছিঁড়ে বেরুতে না পারার যন্ত্রণার পাশে খাদিজা গল্পের খাদিজার দ্বিধাহীন সিদ্ধান্ত গ্রহনের সক্ষমতা চোখে পড়ে। রুখসানার গল্পের ধনী গরীব নারীচরিত্রগুলো কেউই মূক নয়। সাদা চোখে রুখসানার নারীদের সামান্য মনে হলেও অসামান্যা নারী চরিত্র এঁকেছেন। সব মিলিয়ে এ ধরণের গল্প পাঠককে চেনাঅচেনা নারীদের নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। গল্পগুলো পড়ার পর পাঠকের হয়ত আরও একবার খুঁজে দেখতে মন চাইবে, কোথায় কোন গল্পের কোন পৃষ্ঠায় রুখসানা লিখেছেন, ‘বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কে কবে হারাতে পেরেছে নারীদের?
Samudralata O Anyanyo Golpo - Rukhsana Kazol
Get access to your Orders, Wishlist and Recommendations.









There are no reviews yet.